নির্বাক লাবণ্য ল্যান্সডাউন রোড

এস এম তিতুমীর

তার ভাবনাগুলো আড় করে একটা সূর্য ওঠে। যেখানে কতিপয় আলোর ব্যঞ্জনা তাকে ঘিরে রাখে। কাঁদায়-হাসায় আবার নির্জনতার নিস্তব্ধতা তাকে একা পেলে অনেক সময়ই নৃত্যের ঝঙ্কার তোলে। তাই তার ঘরের পাশ দিয়ে আমরা যখন যাই তখন কোনো সাড়া না পেলে বিস্ময়ের এক ঝাঁক স্বচ্ছ কাচপোকা আমাদের মাথার মধ্যে উড়ে এসে বসে। লোকটা যে ঘরের মধ্যে একা একা কী করে, সে এক অপার রহস্য। কেউ একজন আমাকে বলল ও জানালার ফাঁক দিয়ে দেখেছে, ও নাকি ঘরের মধ্যে শুধু পায়চারি করে আর তার চারপাশে হাজারো রূপসী। বলিস কী! আমার বিস্ময় ভরা চোখ কপালে উঠলো। না না এ তো হতে দেয়া যায় না। তারপরও কানকথা না শুনে পরখ-চোখের আস্থাকে আলো করে যে পথ আমি এতোদিন আলিঙ্গন করে চলেছি তার অমসৃণতা আমাকে যতই ব্যথা দিক না কেন, তার সাথে তো আর স্টান্টবাজি করা যায় না। আসলটাকে জানতে জানতে হয়তো ফুরিয়ে যাবো, ফুরিয়ে যাবে হয়তো সোনালি ডানার চিল, পথের সবুজ ঘাস। আর সুদর্শন লক্ষ্মীপেঁচার বৈরিতা নিয়ে যে সংসার তা। তার অজান্তে তাকে দেখবো বলে জানালার পাশে যেতে না যেতই বারান্দা থেকে অনুচ্চ স্বর ভেসে এলো-

কে ওখানে? ও লাবণ্য?

-নাহ্ কেউ না, আমি সাবিত্রী, সাবিত্রীপ্রসন্ন।

-তা আপনি ওখানে কেন ভেতরে আসুন।

না থাক, এ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই আর কি।

আচ্ছা লাবণ্য দু’চার দিনের মধ্যে এখানে কি সুবোধ এসেছিলো?

- কোন সুবোধের কথা বলছেন?

-আরে ওই যে তোমার প্রতিবেশি বন্ধু।

-না, শুনেছি সুবোধদা নাকি হাওড়া গেছে, আজ-কালের মধেই ফিরবে।

- আচ্ছা, ঘরমুখো ছোঁড়াটা কেমন আছে?

-ওর কথা আর কী বলি, ওইতো কদিন ধরে ঘরেই বন্দি হয়ে আছে, বুঝলেন না দাদা স্বেচ্ছায় নির্বাসন। কবেকার কোন ধানসিঁড়ি নদীর জলে গা ধুয়েছে সেই নাকি তার অমৃতজল, শোধনের পবিত্র তরল। এখন সে নদী কেমন আছে, তার জল আছে কি না অথবা আদৌ তার অস্তিত্ব জন্মের শিকড়কে ধরে রেখেছে কি না তা কে জানে। অথচ বায়না- ও জলে ধুয়ে দাও গা। থাক, ওসব কথা। আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে কেন, এভাবে কি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কথা হয়?

-এই তো হলো, আচ্ছা ও কি আমার ডাকেও সাড়া দিবে না? এমনটা ভেবেও এগুনোর সাহস হলো না।

-আচ্ছা আজ তবে আসি, ওকে একাই থাকতে দাও।

এ কথা বলে সরল পথের বাঁকে মিলিয়ে গেল সাবিত্রী। যেমন করে রঙধনু মিলিয়ে যায় আকাশে। আমরাও কোনো কোনো সময় মিলিয়ে যাই, যেতে হয়, নিজেকে জাগিয়ে তোলার জন্যে। সংসার, একে কি বলবো সুখের আধার নাকি সুখের প্রপঞ্চক। আপনজন ছেড়ে যত দূরে যাই ততই একা হয়ে যাই। মিলিয়ে যাই, হারিয়ে যাই নিজের মাঝে। প্রিয়জনের কাছে পাওয়া সুখ কিংবা আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে খুঁজে পাওয়া হৃদয়ের উষ্ণতা অথবা বর্ণিল অঙ্গীকারের বিপক্ষ ভাষা, সবই খেয়ে ফেলে মানুষের মধ্যে বসে থাকা আরেক মানুষ। নতুনের লাবণ্যে লতিয়ে ওঠা লকলকে আলো পুনরায় মানুষকে মোহিত করে। কিন্তু কোথাও মনের কোনো এক কোণে আপন বলে যে ব্যথা তা জেগে থাকে সুপ্ততায়, নীরবে। একজন নিস্পৃহ লাজুক, অনুচ্চ কণ্ঠ, মৃদুভাষী, আত্মমগ্ন, নির্লিপ্ত, নিঃসঙ্গতা-প্রিয়, নির্জনতাকামী, প্রচারবিমুখ মানুষও যে আন্দোলিত করতে পারে সংসারে অন্যদের মন তা তার চোখে চোখ না পড়লে হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না। চোখ যেমন মনের কথা বলে, তেমনি প্রেমের কথাও বলে। লাবণ্য সেই চোখের সাথে যে সংসার পেতেছে, আবেগ উচ্ছ্বাস সুখ-আহ্লাদ আর স্বপ্ন পুরোটাই এক করে নিয়েছে তার তুলনা আটপৌরের কিছু উপরে না। যাকে উজ্জ্বলতার আকরে আয়ত্তে নিয়ে আনন্দবিলাস স্রোতে বয়ে চলা আদরের সাম্পানে মোহাবিষ্ট। ঘর নাই দোর নাই, নাই ছাতার মতো একখণ্ড আকাশ, অখণ্ড-উদার উদ্দাম মেঘের ভিতর জ্বলে ওঠা বিদ্যুৎ। মাঝে মাঝে বজ্রপতন, অন্ধ আদমের অনুপম অনুভূতি। অনুরাগ, খুঁনসুটি- করমচার কাচাপাকা রঙে। ফুটে ওঠা কুমুদী বুকের নিচে কামজ্বরে পোড়া মধু আর কালো ভ্রমরের আশনাই। বলে দেয়, শুধুই দু’জন, দুজনার- চোখ রেখে প্রহরায়, ওই নিরাকার। এমন চিত্রের বিপরীতে লাবণ্যের ঘর পোড়া গরু। ছাই-ধূসর তল

ভালোবেসে উঠে আসে চোখে-মুখে। ঠোঁট বেয়ে নেমে যায় চিবুকের কাছে, গানের পাখি ডানা মেললে গ্রীবা ধরে নেমে যায় আরো নিচে, বুক-খুলে বুনো দৌড়ে বনে গেলে তার শান্তি আসে শীতলের আস্তানায়। এমন অনুমানে লাবণ্য লোকটার কাছ থেকে একটু সরে গিয়ে মুখের সামনে এক গ্লাস পানি ধরলো।

- নেন, জলটুকু খেয়ে নেন।

-সরো সরে যাও এখান থেকে। আমাকে একটু একা থাকতে দাও। আমাকে একটু নির্জনতা দাও।

-সে না হয় থাকবেন তা বলে কিছ্ইু মুখে তুলবেন না তাহলে কেমন করে চলবে? জলটুকু থাক, না হয় মুসুম্বির রসটুকু মুখে দিন।

-ওহ আমাকে বিরক্ত কোরো না। যাও, একা থাকতে দাও।

একরাশ হতাশার ডাকাতরা এসে ছিনিয়ে নিলো সব আশা। লাবণ্যর মুখ মলিন হলো। লাবণ্য মনে মনে বললো, মানুষটা সারাজীবন একা-একাই থেকে গেল। ওর ভিতর ঢুকেও ওকে আমি খুঁজে পেলাম না আজ-অব্দি। ও একাই থাকুক, আমি না হয় ওর নাম নিয়েই পুড়ে হব ছাই।

সাবিত্রী দা আপনি এসেছেন ভালোই হোলো। ভিতরে যান ওর সাথে একটু কথা বলুনতো। ও তো কিছুই মুখে তুলছে না। শুধু বলছে একা থাকতে দাও একা থাকতে দাও। আরে বাবা কবি বলেই কি একা থাকতে হবে। আর বলি কাব্য করে কিবা সংসারে উদ্ধার কোরেছো। না একটু আনন্দ না একটু অর্থের সুখ। আর একটু ঘোরাঘুরি, ওতো তামাটে কপাল থেকে ভগবান জন্মের আগেই তুলে নিয়েছেন। আপিন একটু দেখুন তো। সবিত্রী ভিতরে গেল।

-ও সাবিত্রী এসেছো, তোমাকে যে কোথায় বসতে দিই বলোতো।

-এই তো তুমি বেশ আছো, তাহলে কিছু মুখে তুলছো না কেনো?

-ও আর বোলো না, ক’দিন থেকে নিজেকে আত্মগোপনে রেখে হিজলবনে খুঁজছি কৃষ্ণের বাঁশি। আর রাই, সে তো জান-ই, কেমন করে।

সাবিত্রী তুমি এসেছো ভালোই হয়েছে দ্যাখোতো এ ক’টা লাইন কেমন হয়েছে- ‘এইসব নিস্তব্ধতা শান্তির ভিতর / তোমাকে পেয়েছি আজ এতদিন পরে এই পৃথিবীর ’পর।/ দু-জনে হাঁটছি ভরা প্রান্তরের কোল থেকে আরো দূর প্রান্তরের ঘাসে;/ উসখুস খোঁপা থেকে পায়ের নখটি আজ বিকেলের উৎসাহী বাতাসে / সচেতন হয়ে উঠে আবার নতুন করে চিনে নিতে থাকে/ এই ব্যাপ্ত পটভূমি, -মহানিমে কোরালীর ডাকে / হঠাৎ বুকের কাছে সব খুঁজে পেয়ে।’

- বাহ্ সত্যি বন্ধু খুব ভালো হয়েছে। এর জন্যই তো বলি মাঝে মাঝে চলে যাওয়া ভালো নির্জনতার গ্রাসে। তোমার রাই তো তা বোঝে না, সে কেবলি তোমাকে চায় তার কোলাজিও কোলাহল মাঝে। আসলে তুমি আর তোমার ঘাস, তোমার দূর প্রান্তরীয় বাতাস, ছন্দ-বিন্যাস তোমার দৃষ্টি আর নিঃশ্বাস ভরপুর করে রেখেছে। তোমার নির্জনতাই সৃষ্টি করেছে তোমাকে, করেছে জনাকীর্ণ মুখে-মুখে।

-তুমি আমার ব্যাপারে একটু বাড়িয়েই বলো সাবিত্রী। আসলে তুমি যতাটা বলো আমি ততোটা না। একজন মানুষ লিখছে কেউ তাকে বুঝতে পারছে না তাইতো দ্যাখো যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের মতো মানুষও আমার ‘বোধ’ কবিতাকে বলছে একটা ইংরেজি কবিতার ব্যর্থ অনুবাদ। আমি যা উপলব্ধি করি তাকে আমার মতো করে লিখি। তুমি যদি বুঝতে না পারো তাহলে নিজেই লিখে ফেল। প্রত্যেকের নিজস্বতা আছে। আমার কথা কালোত্তীর্ণ হয়ে রবে এ বিশ্বাস নিয়েই একদিন আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবো। বুঝলে সাবিত্রী তখন হৈহৈ পড়ে যাবে।

আবার কী যেন হলো মানুষটা ভাবুক হলে গেল। সাবিত্রী অবস্থা বুঝে পা বাড়াতে উদ্যত হলো এমন সময় লাবণ্যের হাতে জলখাবার। -একটু কিছু মুখে দিয়ে যান। একটা তিলের নাড়– মুখে তুলে হয়েছে হয়েছে বলতে বলতে সাবিত্রী বের হয়ে গেল। তারপর লাবণ্যর উচ্চারণ- আজি কি বাজারে থলে যাবে নাকি উপোস থাকতে হবে। মেয়েদের মুখের দিকে তাকনো যায় না, আহা রে শুকিয়ে কেমন রোগা হয়ে গেছে। এই থাকলো তোমার থলে। লাবণ্য চলে গেল।

পাশের বাড়ির শম্ভুনাথ, সেও আজকাল কবিতা আওড়াতে আওড়াতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়। উঠতি বয়েস, হয়তো কাউকে ভালো লাগে। প্রেমের দু’টারটা কথা না হোক কবিতার একটা লাইন অন্তত মনে আছে। তা বলতে বলতেই হাঁকে- ‘মাথার ভিতরে / স্বপ্ন নয়- প্রেম নয়- কোনো এক বোধ কাজ করে’। অদ্ভুত তো, যে শোনে সেই আকৃষ্ট হয়ে যায়। প্রেম নয় তবু প্রেমইতো মনে হয়। শব্দের প্রেম, প্রেসয়ীর প্রেমকে একাকার করে দিয়েছে। শম্ভুর কণ্ঠ শুনে লাবণ্য বেরিয়ে বলে- তোমার বোধ যখন ভাই এতোই কাজ করে তাহলে যাও তো আমার বাজারটা এনে দাও তো। শম্ভু এ কথা শুনে ঝাঁ-দৌড়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

তখন চারদিকে তার স্বামীর আদলে ভালোবাসার প্রকাশ রমরম করছে। এতে অবশ্য লাবণ্যর খারাপ লাগে না। সে নিজেও ভালোবাসার তরলে ভেসে যায়। আর আড়াল থেকে শোনে- ‘তিলোত্তমা হবে তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়।/ তোমায় কেন দিইনি আমার সকল শূন্য করে’। ‘ব্যর্থ হয়ে থাকে যদি প্রণয়ের এতো আয়োজন, আগামী মিছিলে এসো স্লোগানে স্লোগানে হবে কথপোকথন। অকালের এই কালে সাধ হলে পথে ভালোবেসো। ধ্রুপদী পিপাসা নিয়ে আসো যদি, মাঠে এসো স্লোগানে স্লোগানে। প্রেমের ইন্সপিরেশনটাকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আমি তুলে দিলাম তোমার হাতে। কিন্তু স্বামীর মুখে যখন উপেক্ষার কথা শোনে তখন সত্যি লাবণ্যর মনোকষ্ট বেড়ে যায়- ‘‘আমারে যে ভালোবাসিয়াছে,/ আসিয়াছে কাছে, উপেক্ষা সে করেছে আমারে, ঘৃণা ক’রে চলে গেছে- যখন ডেকেছি বারে-বারে/ ভালোবেসে তারে;’ ভালোবাসার মানুষটিতো তাকে ছেড়ে যায়নি তবে কেন এই আক্ষেপ! আমি তো তাকে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি, সে কি বোঝে না!

‘দ্রোণফুল লেগে আছে মেরুন শাড়িতে তার- নিম-আমলকীলতা / হালকা বাতাসে। চুলের ওপরে উড়ে উড়ে পড়ে- মুখে চোখে শরীরের সর্বস্বতা ভ’রে,/ কঠিন এ সামাজিক মেয়েটিকে দ্বিতীয় প্রকৃতি মনে ক’রে।/ অন্ধকার থেকে খুঁজে কখন আমার হাত একবার কোলে তুলে নিয়ে গালে রেখে দিলো তার... নক্ষত্ররা চুরি ক’রে নিয়ে গেছে, ফিরিয়ে দেবে না তাকে আর।’ এ কথা শোনার পর লাবণ্যর ভালোবাসা আরো গভীরতা পায়। সমাজ তাকে সর্বংসহা রূপে স্বামীর পাশেই দেখে শেষাব্দি।

বিরহ জ্বালায় যে জ্বলে সেই বোঝে অদেখা আগুন কি। লাবণ্যের ঈর্ষার আারেক কারণ সুরঞ্জনা।

-‘জানি আমি তোমার দু চোখ আজ আমাকে খোঁজে না। আর পৃথিবীর ‘পরে-’ বলে চুপ থাকলাম, কেবলি অশ্বত্থ পাতা পড়ে আছে ঘাসের ভিতরে।’ কাছে থেকেও কাছের জিনিস অনেকে দেখে না তবে প্রেয়সির চোখ ঠিকই দেখে- ‘সুরঞ্জনা, আজো তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছ; পৃথিবীর বয়সিনী তুমি এক মেয়ের মতন; কালো চোখ মেলে ওই নীলিমা দেখেছ; গ্রীক হিন্দু ফিনিশীয় নিয়মের রূঢ় আয়োজন। শুনেছ ফেনিল শব্দে তিলোত্তমা-নগরীর গায়ে। কী চেয়েছে? কী পেয়েছে- গিয়েছে হারায়ে।’ এসব বলতে বলতে বিধান রায় এলেন। তিনি লাবণ্যর স্বামীকে অনেক দূর থেকে চিনতেন আর জানতেন খুব কাছ থেকে। রাজ্যের দ্বায়িত্ব কাঁধে থাকলেও জানা মানুষের সান্নিধ্য জানাটাকে আরো শাণিত করে। কাব্যপ্রীতি তার মধ্যে তেমন নেই তবে সমাজ প্রীতি তো প্রবল। তাই কাব্যের কাছে আসা।-‘কণ্ঠস্থ প্রন্থের শব্দ উচ্চারণ করে / মোমের নিকট বসে মানুষের চোখ/ হারায়ে ফেলেছে গ্রন্থ / হারায়েছে মোমের আলোক / হারায়ে ফেলেছে এই শতাব্দীকে আজ / গোধূলির সূত মিত রমণী সমাজ।’ -কি বললে কবি এ যে আমার মনের কথা, মুখের কথা। সত্যি তো মিলে যাচ্ছে, আমি তোমায় কুর্নিশ করি, সাধু সাধু। আমার মন্ত্রিত্ব রাজত্ব¡ আজ অবনত তোমার শব্দ কোলে।

লাবণ্য ছাড়া তার আর কেউ নেই তা মর্মে মর্মে বিধান রায় জেনে গিয়েছিলেন তাই সাহায্যের হাতটা তার কাছেই লম্বা করলেন। নিজেকে যতটা খাটো করে পারা যায় ততটাই চেষ্টা করলেন। লাবণ্যর কান্নাড়ষ্ট কণ্ঠনালী শুকিয়ে ফ্যাসফেসে হয়ে গেল।

-আপনি এসেছেন বলেছেন এতেই ধন্য। ওকে আমি আগলিয়ে রাখবো হৃদয় দিয়ে। তার মতো আপাত নির্বিরোধ একজন মানুষ যে থাকতে চেয়েছে বাংলার আল-ক্ষেতে তার জন্য এ-ই যথষ্ট। আপনাদের প্রতি প্রণতি জানাই।

-এই শোনো। এতো এতো মানুষ আসছে। এতো এতো কথা বলছে আমার তো বেশ ভালোই লাগছে কতো সব উঁচু মর্যাদার মানুষ। তুমি এবার তোমার একাকীত্ব আমাকে দাও। এই লাবণ্য তোমার সব যন্ত্রণা এবার ব্লুটিং পেপারের মতো শুষে নিবে। তোমার বুকে ফুটবে দোলনচাঁপা সুগন্ধি ফুল। আর তুমি পেঁচাকে ভালোবাসো ইঁদুর ফড়িং জোনাকপোকার সাথে কথা বলো তারাও আমার বন্ধু হবে। তোমার ভোরের কাককে একটা বাসা বাঁধিয়ে দিবো। তাহলে হবে তো? প্লিজ আর অন্য কোনোখানে যেয়োনা আমাকে ছেড়ে, প্লিজ।

কথা তো কথাই। মন দিয়ে শুনলে মনে থাকতেও পারে আবার নাও পারে। কিন্তু লিখে দেয়া কথা তার ব্যাপ্তি বেশ বিস্তৃত। একটা পথের মতো। আদিগন্ত অফুরান। নদীর মতো বেগবান। তার ¯্রােতে ভাসতেও আনন্দ আবার ডুব দিয়ে মুক্তো-মাণিক তুলে আনাতেও আনন্দ। কথা হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর তার বিকৃতি তা তো ভয়ঙ্কর। তবু লাবণ্য স্বামীর সব কথা বুকের মধ্যে গেঁথে রাখে সযতনে। যে পথ একদিন স্বামীগৃহে এনেছিলো তাকে সে তখন কাচা ছিলো। সে পথ আজ নতুন করে প্রশস্ত হয়েছে, তার ধারে উঠেছে বড় বড় ইমারত। মানুষ টানা টাঙার পথে চেপে চেপে বসেছে ট্রামের লাইন। নিকট দূরেই তার পুপু শব্দ শুনতে পায় লাবণ্য। ক্যাচক্যাচ ঝাঁঝালো আড় তরঙ্গের সাথে থেমে থেমে ঘ্যাঁৎকষা বিরাম লাবণ্যসহ আশেপাশের সবার কাছে খুব গা সহা হয়ে গেছে। পিচ ঢালা চওড়া রোড়ের সুনসান জানালা খুলে মাঝে মাঝে লাবণ্য ঘরে পুরে নেয়। কারণ শূন্যতার মিলনে শূন্যতা পরোক্ষভাবে শূন্যতাকেই কাছেন ডাকে। লাবণ্য সে শূন্যতাই চায়। কারণ এক শূন্যতা আরেক শূন্যাতাকে কাছে আনে। আর লাবণ্য তো কাছেই থাকতে চায়। একেবারে বুকের বামে অনন্ত গভীরে। ‘অনন্ত জীবন যদি পাই আমি- তাহ’লে অনন্তকাল একা / পৃথিবীর পথে আমি ফিরি যদি দেখিব সবুজ ঘাস/ ফুটে ওঠে- দেখিব হলুদ ঘাস ঝরে যায়- দেখিব আকাশ’ লাবণ্য স্বামীর এ বুলি আওড়াতে আওড়াতে এবার খুলে দিলো দরজার খিল। আর তখন হাজারো শঙ্খচিল এসে নিয়ে গেল শব্দের সবটুকু জাল, প্রেমের ফুল তোলা রুমাল। তখন শুধু নিস্তব্ধ মুখোমুখি তার আর প্রশস্ত পথের আঁধার।

বৃহস্পতিবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২২ , ২৯ পৌষ ১৪২৮ ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

নির্বাক লাবণ্য ল্যান্সডাউন রোড

এস এম তিতুমীর
image

তার ভাবনাগুলো আড় করে একটা সূর্য ওঠে। যেখানে কতিপয় আলোর ব্যঞ্জনা তাকে ঘিরে রাখে। কাঁদায়-হাসায় আবার নির্জনতার নিস্তব্ধতা তাকে একা পেলে অনেক সময়ই নৃত্যের ঝঙ্কার তোলে। তাই তার ঘরের পাশ দিয়ে আমরা যখন যাই তখন কোনো সাড়া না পেলে বিস্ময়ের এক ঝাঁক স্বচ্ছ কাচপোকা আমাদের মাথার মধ্যে উড়ে এসে বসে। লোকটা যে ঘরের মধ্যে একা একা কী করে, সে এক অপার রহস্য। কেউ একজন আমাকে বলল ও জানালার ফাঁক দিয়ে দেখেছে, ও নাকি ঘরের মধ্যে শুধু পায়চারি করে আর তার চারপাশে হাজারো রূপসী। বলিস কী! আমার বিস্ময় ভরা চোখ কপালে উঠলো। না না এ তো হতে দেয়া যায় না। তারপরও কানকথা না শুনে পরখ-চোখের আস্থাকে আলো করে যে পথ আমি এতোদিন আলিঙ্গন করে চলেছি তার অমসৃণতা আমাকে যতই ব্যথা দিক না কেন, তার সাথে তো আর স্টান্টবাজি করা যায় না। আসলটাকে জানতে জানতে হয়তো ফুরিয়ে যাবো, ফুরিয়ে যাবে হয়তো সোনালি ডানার চিল, পথের সবুজ ঘাস। আর সুদর্শন লক্ষ্মীপেঁচার বৈরিতা নিয়ে যে সংসার তা। তার অজান্তে তাকে দেখবো বলে জানালার পাশে যেতে না যেতই বারান্দা থেকে অনুচ্চ স্বর ভেসে এলো-

কে ওখানে? ও লাবণ্য?

-নাহ্ কেউ না, আমি সাবিত্রী, সাবিত্রীপ্রসন্ন।

-তা আপনি ওখানে কেন ভেতরে আসুন।

না থাক, এ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই আর কি।

আচ্ছা লাবণ্য দু’চার দিনের মধ্যে এখানে কি সুবোধ এসেছিলো?

- কোন সুবোধের কথা বলছেন?

-আরে ওই যে তোমার প্রতিবেশি বন্ধু।

-না, শুনেছি সুবোধদা নাকি হাওড়া গেছে, আজ-কালের মধেই ফিরবে।

- আচ্ছা, ঘরমুখো ছোঁড়াটা কেমন আছে?

-ওর কথা আর কী বলি, ওইতো কদিন ধরে ঘরেই বন্দি হয়ে আছে, বুঝলেন না দাদা স্বেচ্ছায় নির্বাসন। কবেকার কোন ধানসিঁড়ি নদীর জলে গা ধুয়েছে সেই নাকি তার অমৃতজল, শোধনের পবিত্র তরল। এখন সে নদী কেমন আছে, তার জল আছে কি না অথবা আদৌ তার অস্তিত্ব জন্মের শিকড়কে ধরে রেখেছে কি না তা কে জানে। অথচ বায়না- ও জলে ধুয়ে দাও গা। থাক, ওসব কথা। আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে কেন, এভাবে কি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কথা হয়?

-এই তো হলো, আচ্ছা ও কি আমার ডাকেও সাড়া দিবে না? এমনটা ভেবেও এগুনোর সাহস হলো না।

-আচ্ছা আজ তবে আসি, ওকে একাই থাকতে দাও।

এ কথা বলে সরল পথের বাঁকে মিলিয়ে গেল সাবিত্রী। যেমন করে রঙধনু মিলিয়ে যায় আকাশে। আমরাও কোনো কোনো সময় মিলিয়ে যাই, যেতে হয়, নিজেকে জাগিয়ে তোলার জন্যে। সংসার, একে কি বলবো সুখের আধার নাকি সুখের প্রপঞ্চক। আপনজন ছেড়ে যত দূরে যাই ততই একা হয়ে যাই। মিলিয়ে যাই, হারিয়ে যাই নিজের মাঝে। প্রিয়জনের কাছে পাওয়া সুখ কিংবা আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে খুঁজে পাওয়া হৃদয়ের উষ্ণতা অথবা বর্ণিল অঙ্গীকারের বিপক্ষ ভাষা, সবই খেয়ে ফেলে মানুষের মধ্যে বসে থাকা আরেক মানুষ। নতুনের লাবণ্যে লতিয়ে ওঠা লকলকে আলো পুনরায় মানুষকে মোহিত করে। কিন্তু কোথাও মনের কোনো এক কোণে আপন বলে যে ব্যথা তা জেগে থাকে সুপ্ততায়, নীরবে। একজন নিস্পৃহ লাজুক, অনুচ্চ কণ্ঠ, মৃদুভাষী, আত্মমগ্ন, নির্লিপ্ত, নিঃসঙ্গতা-প্রিয়, নির্জনতাকামী, প্রচারবিমুখ মানুষও যে আন্দোলিত করতে পারে সংসারে অন্যদের মন তা তার চোখে চোখ না পড়লে হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না। চোখ যেমন মনের কথা বলে, তেমনি প্রেমের কথাও বলে। লাবণ্য সেই চোখের সাথে যে সংসার পেতেছে, আবেগ উচ্ছ্বাস সুখ-আহ্লাদ আর স্বপ্ন পুরোটাই এক করে নিয়েছে তার তুলনা আটপৌরের কিছু উপরে না। যাকে উজ্জ্বলতার আকরে আয়ত্তে নিয়ে আনন্দবিলাস স্রোতে বয়ে চলা আদরের সাম্পানে মোহাবিষ্ট। ঘর নাই দোর নাই, নাই ছাতার মতো একখণ্ড আকাশ, অখণ্ড-উদার উদ্দাম মেঘের ভিতর জ্বলে ওঠা বিদ্যুৎ। মাঝে মাঝে বজ্রপতন, অন্ধ আদমের অনুপম অনুভূতি। অনুরাগ, খুঁনসুটি- করমচার কাচাপাকা রঙে। ফুটে ওঠা কুমুদী বুকের নিচে কামজ্বরে পোড়া মধু আর কালো ভ্রমরের আশনাই। বলে দেয়, শুধুই দু’জন, দুজনার- চোখ রেখে প্রহরায়, ওই নিরাকার। এমন চিত্রের বিপরীতে লাবণ্যের ঘর পোড়া গরু। ছাই-ধূসর তল

ভালোবেসে উঠে আসে চোখে-মুখে। ঠোঁট বেয়ে নেমে যায় চিবুকের কাছে, গানের পাখি ডানা মেললে গ্রীবা ধরে নেমে যায় আরো নিচে, বুক-খুলে বুনো দৌড়ে বনে গেলে তার শান্তি আসে শীতলের আস্তানায়। এমন অনুমানে লাবণ্য লোকটার কাছ থেকে একটু সরে গিয়ে মুখের সামনে এক গ্লাস পানি ধরলো।

- নেন, জলটুকু খেয়ে নেন।

-সরো সরে যাও এখান থেকে। আমাকে একটু একা থাকতে দাও। আমাকে একটু নির্জনতা দাও।

-সে না হয় থাকবেন তা বলে কিছ্ইু মুখে তুলবেন না তাহলে কেমন করে চলবে? জলটুকু থাক, না হয় মুসুম্বির রসটুকু মুখে দিন।

-ওহ আমাকে বিরক্ত কোরো না। যাও, একা থাকতে দাও।

একরাশ হতাশার ডাকাতরা এসে ছিনিয়ে নিলো সব আশা। লাবণ্যর মুখ মলিন হলো। লাবণ্য মনে মনে বললো, মানুষটা সারাজীবন একা-একাই থেকে গেল। ওর ভিতর ঢুকেও ওকে আমি খুঁজে পেলাম না আজ-অব্দি। ও একাই থাকুক, আমি না হয় ওর নাম নিয়েই পুড়ে হব ছাই।

সাবিত্রী দা আপনি এসেছেন ভালোই হোলো। ভিতরে যান ওর সাথে একটু কথা বলুনতো। ও তো কিছুই মুখে তুলছে না। শুধু বলছে একা থাকতে দাও একা থাকতে দাও। আরে বাবা কবি বলেই কি একা থাকতে হবে। আর বলি কাব্য করে কিবা সংসারে উদ্ধার কোরেছো। না একটু আনন্দ না একটু অর্থের সুখ। আর একটু ঘোরাঘুরি, ওতো তামাটে কপাল থেকে ভগবান জন্মের আগেই তুলে নিয়েছেন। আপিন একটু দেখুন তো। সবিত্রী ভিতরে গেল।

-ও সাবিত্রী এসেছো, তোমাকে যে কোথায় বসতে দিই বলোতো।

-এই তো তুমি বেশ আছো, তাহলে কিছু মুখে তুলছো না কেনো?

-ও আর বোলো না, ক’দিন থেকে নিজেকে আত্মগোপনে রেখে হিজলবনে খুঁজছি কৃষ্ণের বাঁশি। আর রাই, সে তো জান-ই, কেমন করে।

সাবিত্রী তুমি এসেছো ভালোই হয়েছে দ্যাখোতো এ ক’টা লাইন কেমন হয়েছে- ‘এইসব নিস্তব্ধতা শান্তির ভিতর / তোমাকে পেয়েছি আজ এতদিন পরে এই পৃথিবীর ’পর।/ দু-জনে হাঁটছি ভরা প্রান্তরের কোল থেকে আরো দূর প্রান্তরের ঘাসে;/ উসখুস খোঁপা থেকে পায়ের নখটি আজ বিকেলের উৎসাহী বাতাসে / সচেতন হয়ে উঠে আবার নতুন করে চিনে নিতে থাকে/ এই ব্যাপ্ত পটভূমি, -মহানিমে কোরালীর ডাকে / হঠাৎ বুকের কাছে সব খুঁজে পেয়ে।’

- বাহ্ সত্যি বন্ধু খুব ভালো হয়েছে। এর জন্যই তো বলি মাঝে মাঝে চলে যাওয়া ভালো নির্জনতার গ্রাসে। তোমার রাই তো তা বোঝে না, সে কেবলি তোমাকে চায় তার কোলাজিও কোলাহল মাঝে। আসলে তুমি আর তোমার ঘাস, তোমার দূর প্রান্তরীয় বাতাস, ছন্দ-বিন্যাস তোমার দৃষ্টি আর নিঃশ্বাস ভরপুর করে রেখেছে। তোমার নির্জনতাই সৃষ্টি করেছে তোমাকে, করেছে জনাকীর্ণ মুখে-মুখে।

-তুমি আমার ব্যাপারে একটু বাড়িয়েই বলো সাবিত্রী। আসলে তুমি যতাটা বলো আমি ততোটা না। একজন মানুষ লিখছে কেউ তাকে বুঝতে পারছে না তাইতো দ্যাখো যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের মতো মানুষও আমার ‘বোধ’ কবিতাকে বলছে একটা ইংরেজি কবিতার ব্যর্থ অনুবাদ। আমি যা উপলব্ধি করি তাকে আমার মতো করে লিখি। তুমি যদি বুঝতে না পারো তাহলে নিজেই লিখে ফেল। প্রত্যেকের নিজস্বতা আছে। আমার কথা কালোত্তীর্ণ হয়ে রবে এ বিশ্বাস নিয়েই একদিন আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবো। বুঝলে সাবিত্রী তখন হৈহৈ পড়ে যাবে।

আবার কী যেন হলো মানুষটা ভাবুক হলে গেল। সাবিত্রী অবস্থা বুঝে পা বাড়াতে উদ্যত হলো এমন সময় লাবণ্যের হাতে জলখাবার। -একটু কিছু মুখে দিয়ে যান। একটা তিলের নাড়– মুখে তুলে হয়েছে হয়েছে বলতে বলতে সাবিত্রী বের হয়ে গেল। তারপর লাবণ্যর উচ্চারণ- আজি কি বাজারে থলে যাবে নাকি উপোস থাকতে হবে। মেয়েদের মুখের দিকে তাকনো যায় না, আহা রে শুকিয়ে কেমন রোগা হয়ে গেছে। এই থাকলো তোমার থলে। লাবণ্য চলে গেল।

পাশের বাড়ির শম্ভুনাথ, সেও আজকাল কবিতা আওড়াতে আওড়াতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়। উঠতি বয়েস, হয়তো কাউকে ভালো লাগে। প্রেমের দু’টারটা কথা না হোক কবিতার একটা লাইন অন্তত মনে আছে। তা বলতে বলতেই হাঁকে- ‘মাথার ভিতরে / স্বপ্ন নয়- প্রেম নয়- কোনো এক বোধ কাজ করে’। অদ্ভুত তো, যে শোনে সেই আকৃষ্ট হয়ে যায়। প্রেম নয় তবু প্রেমইতো মনে হয়। শব্দের প্রেম, প্রেসয়ীর প্রেমকে একাকার করে দিয়েছে। শম্ভুর কণ্ঠ শুনে লাবণ্য বেরিয়ে বলে- তোমার বোধ যখন ভাই এতোই কাজ করে তাহলে যাও তো আমার বাজারটা এনে দাও তো। শম্ভু এ কথা শুনে ঝাঁ-দৌড়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

তখন চারদিকে তার স্বামীর আদলে ভালোবাসার প্রকাশ রমরম করছে। এতে অবশ্য লাবণ্যর খারাপ লাগে না। সে নিজেও ভালোবাসার তরলে ভেসে যায়। আর আড়াল থেকে শোনে- ‘তিলোত্তমা হবে তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়।/ তোমায় কেন দিইনি আমার সকল শূন্য করে’। ‘ব্যর্থ হয়ে থাকে যদি প্রণয়ের এতো আয়োজন, আগামী মিছিলে এসো স্লোগানে স্লোগানে হবে কথপোকথন। অকালের এই কালে সাধ হলে পথে ভালোবেসো। ধ্রুপদী পিপাসা নিয়ে আসো যদি, মাঠে এসো স্লোগানে স্লোগানে। প্রেমের ইন্সপিরেশনটাকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আমি তুলে দিলাম তোমার হাতে। কিন্তু স্বামীর মুখে যখন উপেক্ষার কথা শোনে তখন সত্যি লাবণ্যর মনোকষ্ট বেড়ে যায়- ‘‘আমারে যে ভালোবাসিয়াছে,/ আসিয়াছে কাছে, উপেক্ষা সে করেছে আমারে, ঘৃণা ক’রে চলে গেছে- যখন ডেকেছি বারে-বারে/ ভালোবেসে তারে;’ ভালোবাসার মানুষটিতো তাকে ছেড়ে যায়নি তবে কেন এই আক্ষেপ! আমি তো তাকে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি, সে কি বোঝে না!

‘দ্রোণফুল লেগে আছে মেরুন শাড়িতে তার- নিম-আমলকীলতা / হালকা বাতাসে। চুলের ওপরে উড়ে উড়ে পড়ে- মুখে চোখে শরীরের সর্বস্বতা ভ’রে,/ কঠিন এ সামাজিক মেয়েটিকে দ্বিতীয় প্রকৃতি মনে ক’রে।/ অন্ধকার থেকে খুঁজে কখন আমার হাত একবার কোলে তুলে নিয়ে গালে রেখে দিলো তার... নক্ষত্ররা চুরি ক’রে নিয়ে গেছে, ফিরিয়ে দেবে না তাকে আর।’ এ কথা শোনার পর লাবণ্যর ভালোবাসা আরো গভীরতা পায়। সমাজ তাকে সর্বংসহা রূপে স্বামীর পাশেই দেখে শেষাব্দি।

বিরহ জ্বালায় যে জ্বলে সেই বোঝে অদেখা আগুন কি। লাবণ্যের ঈর্ষার আারেক কারণ সুরঞ্জনা।

-‘জানি আমি তোমার দু চোখ আজ আমাকে খোঁজে না। আর পৃথিবীর ‘পরে-’ বলে চুপ থাকলাম, কেবলি অশ্বত্থ পাতা পড়ে আছে ঘাসের ভিতরে।’ কাছে থেকেও কাছের জিনিস অনেকে দেখে না তবে প্রেয়সির চোখ ঠিকই দেখে- ‘সুরঞ্জনা, আজো তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছ; পৃথিবীর বয়সিনী তুমি এক মেয়ের মতন; কালো চোখ মেলে ওই নীলিমা দেখেছ; গ্রীক হিন্দু ফিনিশীয় নিয়মের রূঢ় আয়োজন। শুনেছ ফেনিল শব্দে তিলোত্তমা-নগরীর গায়ে। কী চেয়েছে? কী পেয়েছে- গিয়েছে হারায়ে।’ এসব বলতে বলতে বিধান রায় এলেন। তিনি লাবণ্যর স্বামীকে অনেক দূর থেকে চিনতেন আর জানতেন খুব কাছ থেকে। রাজ্যের দ্বায়িত্ব কাঁধে থাকলেও জানা মানুষের সান্নিধ্য জানাটাকে আরো শাণিত করে। কাব্যপ্রীতি তার মধ্যে তেমন নেই তবে সমাজ প্রীতি তো প্রবল। তাই কাব্যের কাছে আসা।-‘কণ্ঠস্থ প্রন্থের শব্দ উচ্চারণ করে / মোমের নিকট বসে মানুষের চোখ/ হারায়ে ফেলেছে গ্রন্থ / হারায়েছে মোমের আলোক / হারায়ে ফেলেছে এই শতাব্দীকে আজ / গোধূলির সূত মিত রমণী সমাজ।’ -কি বললে কবি এ যে আমার মনের কথা, মুখের কথা। সত্যি তো মিলে যাচ্ছে, আমি তোমায় কুর্নিশ করি, সাধু সাধু। আমার মন্ত্রিত্ব রাজত্ব¡ আজ অবনত তোমার শব্দ কোলে।

লাবণ্য ছাড়া তার আর কেউ নেই তা মর্মে মর্মে বিধান রায় জেনে গিয়েছিলেন তাই সাহায্যের হাতটা তার কাছেই লম্বা করলেন। নিজেকে যতটা খাটো করে পারা যায় ততটাই চেষ্টা করলেন। লাবণ্যর কান্নাড়ষ্ট কণ্ঠনালী শুকিয়ে ফ্যাসফেসে হয়ে গেল।

-আপনি এসেছেন বলেছেন এতেই ধন্য। ওকে আমি আগলিয়ে রাখবো হৃদয় দিয়ে। তার মতো আপাত নির্বিরোধ একজন মানুষ যে থাকতে চেয়েছে বাংলার আল-ক্ষেতে তার জন্য এ-ই যথষ্ট। আপনাদের প্রতি প্রণতি জানাই।

-এই শোনো। এতো এতো মানুষ আসছে। এতো এতো কথা বলছে আমার তো বেশ ভালোই লাগছে কতো সব উঁচু মর্যাদার মানুষ। তুমি এবার তোমার একাকীত্ব আমাকে দাও। এই লাবণ্য তোমার সব যন্ত্রণা এবার ব্লুটিং পেপারের মতো শুষে নিবে। তোমার বুকে ফুটবে দোলনচাঁপা সুগন্ধি ফুল। আর তুমি পেঁচাকে ভালোবাসো ইঁদুর ফড়িং জোনাকপোকার সাথে কথা বলো তারাও আমার বন্ধু হবে। তোমার ভোরের কাককে একটা বাসা বাঁধিয়ে দিবো। তাহলে হবে তো? প্লিজ আর অন্য কোনোখানে যেয়োনা আমাকে ছেড়ে, প্লিজ।

কথা তো কথাই। মন দিয়ে শুনলে মনে থাকতেও পারে আবার নাও পারে। কিন্তু লিখে দেয়া কথা তার ব্যাপ্তি বেশ বিস্তৃত। একটা পথের মতো। আদিগন্ত অফুরান। নদীর মতো বেগবান। তার ¯্রােতে ভাসতেও আনন্দ আবার ডুব দিয়ে মুক্তো-মাণিক তুলে আনাতেও আনন্দ। কথা হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর তার বিকৃতি তা তো ভয়ঙ্কর। তবু লাবণ্য স্বামীর সব কথা বুকের মধ্যে গেঁথে রাখে সযতনে। যে পথ একদিন স্বামীগৃহে এনেছিলো তাকে সে তখন কাচা ছিলো। সে পথ আজ নতুন করে প্রশস্ত হয়েছে, তার ধারে উঠেছে বড় বড় ইমারত। মানুষ টানা টাঙার পথে চেপে চেপে বসেছে ট্রামের লাইন। নিকট দূরেই তার পুপু শব্দ শুনতে পায় লাবণ্য। ক্যাচক্যাচ ঝাঁঝালো আড় তরঙ্গের সাথে থেমে থেমে ঘ্যাঁৎকষা বিরাম লাবণ্যসহ আশেপাশের সবার কাছে খুব গা সহা হয়ে গেছে। পিচ ঢালা চওড়া রোড়ের সুনসান জানালা খুলে মাঝে মাঝে লাবণ্য ঘরে পুরে নেয়। কারণ শূন্যতার মিলনে শূন্যতা পরোক্ষভাবে শূন্যতাকেই কাছেন ডাকে। লাবণ্য সে শূন্যতাই চায়। কারণ এক শূন্যতা আরেক শূন্যাতাকে কাছে আনে। আর লাবণ্য তো কাছেই থাকতে চায়। একেবারে বুকের বামে অনন্ত গভীরে। ‘অনন্ত জীবন যদি পাই আমি- তাহ’লে অনন্তকাল একা / পৃথিবীর পথে আমি ফিরি যদি দেখিব সবুজ ঘাস/ ফুটে ওঠে- দেখিব হলুদ ঘাস ঝরে যায়- দেখিব আকাশ’ লাবণ্য স্বামীর এ বুলি আওড়াতে আওড়াতে এবার খুলে দিলো দরজার খিল। আর তখন হাজারো শঙ্খচিল এসে নিয়ে গেল শব্দের সবটুকু জাল, প্রেমের ফুল তোলা রুমাল। তখন শুধু নিস্তব্ধ মুখোমুখি তার আর প্রশস্ত পথের আঁধার।