ফেরা না ফেরা

রাহমান ওয়াহিদ

রাতে ঘুমটা ভালো না হলেও অনেকটা ঝরঝরে মন নিয়েই বিছানা ছেড়েছে আশিকুর রহমান আশিক। বড়সড় বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই শরতের মিষ্টি সকাল তার শরীর ছুঁয়ে যায়। অনেকদিন পর এমন সকালও বেশ ভালো লাগে তার। অথচ পাশের বাড়ির সদ্য প্রয়াত মানুষটাকে নিয়ে শোকের বিষণœতা এখনও কাটেইনি। গেল রাত এগারোটার মধ্যে দাফন কাফন সব শেষ হলেও কারুরই তেমন ঘুম হয়নি সারা রাত। স্ত্রী মুশতারি রহমান ঘুমের ঘাটতি কাভার করতে এখনও বেড এ। পাশের ঘরে ঢাকা ভার্সিটি পড়ুয়া ছোট মেয়ে তিন্নিও সম্ভবত ঘুমোচ্ছে। ফোলা ফোলা চোখ নিয়েই কাল বিকেলে ঢাকা থেকে ফিরেছে সে। এমনিতেই ওর সাথে তেমন কথা হয় না আশিকের। কালও হয় নি। প্রয়াত প্রতিবেশি আব্দুল বারিক খুব ভালোবাসত তাকে। মৃত আংকেলের মুখের কাছে অনেকটা সময় নিস্তব্ধ হয়ে বসেছিল তিন্নি। তন্ময় হয়ে ভাবতে ভাবতে একসময় উঠে দাঁড়িয়ে আশিককে চেপে ধরেছিল খুব করে। আশিক বাধা দেয় নি। বাবার নিঃসঙ্গ হয়ে যাবার ব্যাপারটি কি তাকে ভাবাচ্ছে? নাকি বাবাকেও হারানোর ভয়? তবে যা-ইই হোক, এমন তরল আবেগকে প্রশ্রয় দিতে ইচ্ছে করে না আশিকের। শাম্মির বড় ভাই তারিক ঢাকাতেই বেসরকারি একটা ভার্সিটির মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারে। বারিক মাঝেমধ্যে মজা করে বলতো, ‘আপনার মেয়েটিকে কিন্তু আমি নিয়ে নেব আশিক ভাই। আপত্তি করতে পারবেন না।’ আশিক মুচকি হেসে চুপ থেকেছে। নেব বললেই তো আর নেয়া হয় না। তিন্নি যে একটা গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে সেটার যে কী যন্ত্রণা বারিক তা বুঝবে কী করে? ভেবে পায় না আশিক- যে মেয়ে স্কুল কলেজ পার করলো কোনো ঝামেলা ছাড়াই, তিন তিনটি ছেলের প্রপোজালকে ফিরিয়েছে নিজের বুদ্ধির জোরে, জিপিএও পেয়েছে ডাবল, সেই মেয়ে তার স্বপ্নের ঢাকা ভার্সিটির আঙিনায় পা রাখতে না রাখতেই এ্যাফেয়ারের কুয়োজলে ডোবে কী করে? এসব করে ইংরেজির মতো ভালো একটা সাবজেক্টে ফার্স্ট ক্লাস এ্যাচিভ করা কি চাট্টিখানি কথা? রবিনের মতো পুচকে একটা ছেলের লুজ ইমোশনই তার স্বপ্নের চেয়েও বড় হয়ে গেল! কীভাবে? বারবার ফিরে আসতে বলেছিল আশিক। শুধু ছোট্ট করে বলেছিল, ‘ফিরে আসার উপায় নেই বাবা!’ মুখের উপর বলে কী মেয়েটা! তার এতদিনের চেনা লক্ষ্মী মেয়েটা এখন এতটাই বেপরোয়া! এতটাই এ্যাগ্রেসিভ! রাগে ক্ষোভে এমন অবাধ্য একটা মেয়েকে আর কাছে রাখার দরকার মনে করেনি আশিক। মেয়েকে তাই হোস্টেলে রেখে সদ্য অবসরে যাওয়া জীবন নিয়ে নিজের জন্ম শহরের বাড়িতে চলে এসেছে সে। এসে যে খুব খারাপ কিছু হয়েছে তা নয়। খুব হাসিখুশি বারিক সাহেবকে পেয়ে দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল আশিকের। ফুড ডিপার্টমেন্টের স্টোর কীপার বারিক তাকে বেশ ভালোই সঙ্গ দিচ্ছিল। আশিক যে তার চেয়ে বড় অফিসার ছিল, বয়সের তফাৎটাও যে বছর ছয়েকের, তা কখনও দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি তাদের সম্পর্কে। অফিস থেকে ফিরে বারিক প্রায়ই আশিককে নিয়ে চলে যেত শহরতলীর চমৎকার এক বিলের ধারে। সারা বছরই পানি থাকে সেই বিলে। ছিপ দিয়ে মাছ ধরার নেশা ছিল বারিকের। বিলের ধারে বসে মাছ ধরার আনন্দের মধ্যে হাজারো রকমের কথায় মেতে উঠতো দুজনই। ঘরে বাইরের অনেক কথাই শেয়ারিং হতো তাদের। এত কাছের মানুষ সেই বারিক কোনো জানান না দিয়েই হুট করে চলে গেল! কী এমন বয়স? চুয়ান্নর কাছাকাছি হবে। সুঠাম শরীর। কোনো রোগটগের কথা কখনও শোনেনি আশিক। তবে টেনশন ছিল বাড়ির লোন শোধ করা নিয়ে। আর ছিল ছেলেটির বাসায় না ফেরার রহস্যজনক ব্যাপারটি। ভার্সিটি করোনায় বন্ধ থাকলেও বাড়িতে তার না-ফেরাটা বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল বারিককে। বসুন্ধরার ভাড়া বাসায় বন্ধুদের নিয়ে নেশাটেশায় জড়িয়ে পড়েছিল কিনা সেটার হদিস আর জানা হয়ে ওঠেনি বারিকের। মেয়ে শাম্মি মাস্টার্স শেষ না করে বিয়ে করবে না বলে বেশ কয়েকটি ভালো প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। মেয়ের এই সিদ্ধান্তটি মেনে নিতে পারেনি বারিক। কিন্তু আশিকের সেটা ভালোই লাগতো। শিক্ষাই যে মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্ত একটা জায়গা, বিয়ের পরে সেটা অর্জন করা যে হিমালয় জয়ের মতোই কষ্টসাধ্য ব্যাপার, সেটা বেশ ভালোই বুঝেছিল শাম্মি। আশিক তাই মেয়েকে সাপোর্ট করলে বারিক বলতো, ‘না আশিক ভাই, এখনকার ছেলেমেয়েদের মতিগতিই খুব ডেঞ্জারাস। কখন যে কী করে বসবে ঠিক নেই। মেয়েটার কোনো এ্যাফেয়ার নেই সত্যি, কিন্তু হতে কতক্ষণ, বলুন? চেহারাসুরত তো আর খারাপ না।’ এরপর থেকে এ নিয়ে আর কিছু বলেনি আশিক কিন্তু মনে মনে ভাবতো- আহা, তিন্নিটা যদি শাম্মির মতো হতো!

বড় মেয়ে মিন্নিও কি কম পোড়াচ্ছে? সে-ও তো এক জ্বলন্ত টিউমার। মেয়েটি স্কুলের দেয়াল না পেরোতেই এক সিনেমা ডিরেক্টরের হাত ধরে কীভাবে যে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল- টেরই পেল না কেউ। অনেক পরে জেনেছে আশিক- সে নাকি বাংলা সিনেমার এক উঠতি নায়িকা। প্রচণ্ড ঘৃণায়, লজ্জায়, অপমানে কারো সামনে দাঁড়াতে পারতো না আশিক। সারা জীবন এত সুনাম পাওয়া অফিসারের মেয়ে হয়ে গেল সিনেমার নজরকাড়া নায়িকা! বড় আদরের মেয়েটির এমনই ন্যক্কারজনক অধপতন! এরপর কাগজে মেয়েটির আধান্যাংটা রগরগে ছবি দেখে ঘেন্নায় রাগে মাথাটাকে আর ঠিক রাখতে পারেনি আশিক। তক্ষুনি সুইসাইডের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিল সে। কিন্তু পারে নি। কাপুরুষতার কাছে এমন লজ্জাকর সমর্পণে মন সায় দেয়নি তার। শেষ পর্যন্ত ছোট মেয়ে তিন্নিকে আশ্রয় করেই মিন্নির দেয়া রক্তক্ষরণের ক্ষতটাকে আড়াল করতে চেয়েছিল আশিক। কিন্তু পারলো কই? সে-ও তো বোনের অন্ধকার পথটিই ধরলো। একটা দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসে আশিকের। নিজের দিকে তাকায়। না, তাকে তেমন শোকার্ত মনে হচ্ছে না। কী যে হয়েছে তার যে-পাশের বাড়ির একটা জলজ্যান্ত মানুষ হার্ট এ্যাটাকে হঠাৎ ‘নেই’ হয়ে যাবার ব্যাপারটি তাকে তেমন স্পর্শই করছে না! অথচ তারই বেশি শক্ড হওয়ার কথা। বরং তার মনে হচ্ছে- মন্দ কী, এভাবে হুট করে যাওয়াই তো ভালো। কারো সেবাটেবার দরকার হলো না। এভাবে যেতে পারলে তেমন কষ্টও হবে না মুশতারির। প্রতিদিনই নায়িকা মেয়ে আর জামাই এর সাথে কথা হচ্ছে ভিডিও কলে। আনন্দ হাসিঠাট্টার কথা প্রায়ই কানে আসে আশিকের। খুব অবাক হয়ে ভাবে সে- মা হয়ে কীভাবে পারে এমন নোংরা একটা মেয়ের সাথে আদিখ্যেতার মতো রিলেশন রাখতে? কীভাবে সম্ভব? মাত্র দুটো সন্তানকে সে চোখে চোখে রাখতে পারলো না! নাকি নিজেই চায়নি মেয়েরা সম্মানের জায়গাটায় দাঁড়াক? সে নিজে স্কুলের দেয়াল পেরোতে পারেনি বলে? কিন্তু এ নিয়ে মুশতারিকে কিছু বলতেও ভালো লাগেনি আশিকের। আগে থেকেই দূরত্বে চলে যাওয়া স্ত্রীর সাথে দু’চারটে দরকারী কথা ছাড়া সারাদিনরাতে তেমন কথা হয় না। অনেকদিন থেকেই হয় না। মতের মিল না হলে, শেয়ারিং করার মতো না হলে, কথা বলাবলি হবে কী করে। এজন্য অবশ্য তেমন কষ্টও নেই আশিকের। দূরত্ব যেটা ছিল সেটা আরেকটু বেড়েছে তিন্নিকে ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে ঢাকায় রেখে আসার জন্য। তা বাড়–ক। এগুলো এখন আর কোন ইস্যু নয় আশিকের কাছে। সব সিদ্ধান্ত সে একা নিতেই অভ্যস্ত। আশিক না থাকলেও ব্যাংকে পেনশনের যে টাকাপয়সা আছে তাতে বেশ ভালোভাবেই চলে যাবার কথা মুশতারির। এর উপর দুই মেয়ে, জামাই এর নেকনজর তো আছেই। সেদিক থেকে বরং আশিকেরই আশেপাশে আর কেউ রইলো না। যা কথা হতো একমাত্র বারিকের সাথেই। বারিকই ভুলিয়ে দিত সব একাকীত্ব। সেই বারিক হঠাৎ চলে যাবার পর চারপাশের শূন্যতা অক্টোপাশের মতো চেপে ধরেছে আশিককে। যেন গিলে খাবে সে খানিক পরেই। সেখান থেকে একটা মুক্তি দরকার তার এখন। খুব দরকার।

০২.

বছর দেড়েক পর ভার্সিটি খোলার খবরে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল যেন তিন্নি। যেন কত যুগ ধরে দেখা হয়নি প্রিয় ক্যাম্পাস, প্রিয় বন্ধু বান্ধব। দেখা হয়নি প্রিয়মুখ রবিনকেও। একসঙ্গে অনেকগুলো আনন্দের ঝাঁপি বুকে নিয়ে সপ্তাহখানেক আগে ভার্সিটির আঙিনায় পা রেখেছিল তিন্নি। হোস্টেলে ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সাথে জম্পেশ আড্ডায় মেতে থাকলেও রবিনকে দেখে ততটা খুশি হতে পারে নি। সেই রোদ্দুর মুখ রবিনকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিল না সে। সেদিনের সুন্দর বিকেলটাকে কালো করে দিয়ে কী বললো রবিন এসব! তিন্নির জন্য কিছুই করতে পারবে না সে! শোকাচ্ছন্ন সারাটা রাতে বারিক আংকেলের মতো রবিনও যেন তার পাশে লাশ হয়ে শুয়েছিল। আর ওদের শেষ কথাগুলো রেকর্ডেড অডিওর মতো অবিরাম বেজে চলেছিল কানে।

‘এ তুমি কী বলছো রবিন? এখনি বিয়ের কথা কেন? মাত্র তো ফার্স্ট ইয়ার পার করলাম। আর আমাদের বোঝাপড়ারও তো একটা ব্যাপার আছে। আছে না?

‘সেটা কি এই এক বছরেও হয় নি? অনেক কিছুই তো আমরা শেয়ার করেছি। জেনেছি। বুঝেছি। তারপরেও...’

‘হ্যাঁ তারপরেও। একটা বছর জানাশোনা বোঝার জন্য কিছুই না। আমরা এখনও হালকা ইমোশনটাকেও ওভারকাম করতে পারিনি। তুচ্ছ কারণে আমাদের মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত স্টপ হয়ে যায়।’

‘বেশি ভালোবাসাবাসি থাকলে এমনটা হতেই পারে। এটা কোনো ইস্যু না তিন্নি। আমি বিয়ের কথা বলছিলাম...

‘কিসের বিয়ে? কেন বিয়ে? সেটাই তো বুঝছি না। আমরা এখনও তো স্টুডেন্ট। পড়াশোনার মধ্যে আছি। ভালো রেজাল্ট করার জন্য শুধু পড়াশোনাতেই ডুবে থাকার কথা এখন। এ্যাফেয়ারের সময়ও এখন না। তবু যখন সেটা হয়েই গ্যাছে, থাকুক সেটাও, বাট বিয়ে কেন? তোমার কি বিয়ে পাগলা রোগ ধরেছে?

‘না তিন্নি ও রকম কিছু না। আমি লেট ম্যারেজের সন্তান। বাবার দু’বার স্ট্রোক হয়েছে। থার্ড টাইমে তার বাঁচার সম্ভাবনা নেই। সো ইচ্ছেটা তারই বেশি। একমাত্র সন্তান হয়ে আমি এখন কী করতে পারি, তুমিই বল।’

‘কী বলবো আমি? তোমার বাবাকে বোঝাও। অসুখ তো অনেকেরই হয়। তাই বলে স্টুডেন্ট লাইফ নষ্ট করে

ছেলেবউ দেখতে হবে? এটা কেমন আব্দার? আমার বাবা তো এই এ্যাফেয়ারটাকেই মেনে নিতে পারেনি। বলেছিল- ‘কোন এ্যাফেয়ার ট্যাফেয়ার চলবে না। আমার সাফ কথা।’ কই, বাবার কথা রাখতে পারলাম কই? তোমার ওপর ক্র্যাশ খেলাম। বাবা সেটা মানতে না পেরে আমাকে কাছেই রাখলো না। চলে গেল বগুড়ায়। তো কার জন্য এসব করলাম বল, তোমার জন্যই তো?’

‘সেটা ঠিক আছে তিন্নি। আমিও চাই না যে বিয়েটা এখুনি হোক। আমার নিজের কোনো এ্যাসেট থাকলে বিয়েটিয়ের কথা মুখেও আনতাম না। কিন্তু পড়ে গেছি বিপদে। এখন তোমার আপত্তি মানতে গেলে বাবা-মাকে ছেড়ে চলে আসতে হবে, পড়াশোনাটা আর হবে না...’

‘ভারি মুশকিল তো। এতো দেখছি সেকেলের সেই মরার আগে নাতবউ দেখার মতো ব্যাপার হয়ে গেল। তোমার বা-বামা দুজনই হাইলি এডুকেটেড, এযুগে বসেও তারা কীভাবে ভাবছেন এমন ডেসট্রাকটিভ, আনকালচার্ড ভাবনা। স্যরি রবিন। তোমার বাবামা সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলা আমার উচিত না, তবু না বলেও পারলাম না।’

‘না, ঠিক আছে। অড সিচুয়েশনে এমনটা হতেই পারে। কিন্তু তিন্নি আমার বাবামা কিন্তু অন্যরকম। তারা তোমাকে খুব পছন্দ করেছেন। বিয়ে হলে তোমার কোনো প্রবলেমই তারা হতে দেবেন না, বরং যতটা সম্ভব হেল্প করবেন বলেছেন।’

‘হেল্প করবেন ভালো কথা। তো সেই হেল্পটা তো আমি এখনই মেয়ে হিসেবে তাদের কাছে চাইতে পারি। তোমার বাবামার সাথে এ নিয়ে কি একটু কথা বলতে পারি?’

‘না, তিন্নি, সে পথও বন্ধ। বাবা কারো কথাই শুনছেন না, শুনবেনও না। সাফ বলে দিয়েছেন। এটাও বলেছেন তুমি আপত্তি করলে বাবা অন্য কোথাও মেয়ে দেখবেন।’

‘বাহ! দারুণ দারুণ! তো যাও দ্যাখো গে অন্য মেয়ে। বিয়ের পিঁড়িতে বসগে যাও। আমার আর প্রয়োজন কী তোমার?’

‘প্লিজ তিন্নি এভাবে বলো না। আমি কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি। সিচুয়েশনটা তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি শুধু। তোমাকে এসব বলতামও না, যদি আমার অল্টারনেট কোনো ওয়ে থাকতো।’

‘বাবা-মাকে ছেড়ে চলে আসতে পারবে? টিউশনি করে মেসে থেকে পড়াশোনা করার সাহস পাও? ইংরেজির ছাত্র। ভালো টিউশনি পেতে সমস্যা হবে না।’

বাবামাকে ছেড়ে আসতে পারবো ঠিকই কিন্তু দুদিন পরে বাবাই আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন, আনডাউটেডলি।’

‘তার মানে পারবে না। তার মানে আমি আর তোমার থাকছি না। এই তো? গলাটা কান্নায় কেঁপে ওঠে তিন্নির। একটু থেমে কাঁপা গলায় আবারও বলে,

‘বাট য়ু আর ম্যাচিউর্ড এনাফ রবিন। আমরা একটা রিলেশনে আছি। টেল মি, সেটার কী হবে? আমরা কি তাহলে এতদিন শুধু টাইম পাস করেছি? কোনো গোল কি ছিল না? তোমার বাবা মা যা-ই বলুন, তোমার নিজের কি কোনো সিদ্ধান্ত নেই? কেমন পুরুষ তুমি? আমি যে তোমাকে ভালোবাসার কথা বলে বাবাকে কষ্ট দিলাম, বললাম যে রবিন আমার পড়াশোনার কোনো ক্ষতি করবে না, তো সেই কথাটার কী হবে? শুধু নিজের ফ্যামিলির কথাই ভাবলে? আমার দিকটা নাথিং?’

‘তিন্নি, তুমি খুব ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছো। আমাকে ভুল বুঝছো শুধু শুধু। আমি তোমাকে মোটেও ছেড়ে যেতে চাইছি না। সব ফ্যামিলির প্রবলেম তো এক রকম হয় না। এটা তো বুঝতে হবে। বিয়েটা একটা রিলেশন। এর বেশি কিছু তো না। তুমি যদি একটু মেনে নিতে পারো বাকি দায়িত্বটা আমিই নেব। এখন যেমন আছো বিয়ের পরে তেমনটিই থাকবে। সেরকমই কথা হয়েছে বাবা-মার সাথে। আর গোলের কথা বলছো? সেটা তো শেষ পর্যন্ত বিয়েই। তাই না? তো সেটাকে একটু আগেভাগেই সেরে নিলে ক্ষতি কী?’

‘খুব তো বলছো বিয়েটা তেমন কিছু না। বিয়ের মানে বোঝ তুমি? একটা মেয়ের জন্য বিয়েটা অনেক কিছু। যতই বোঝাও আমাকে, বিয়ের পরে মেয়েকে ঘরের বউই হতে হয়। অনেকগুলো রিলেশনের সাথে রিলেটেড হতে হয়। পড়াশোনাটা হয়ে যায় তখন অফশনাল। বাবা-মা’র কাছেই যখন থাকবে তখন বউয়ের পড়াশোনা বাবা-মা চাইলে হবে, না চাইলে হবে না। তুমি চাইলেও হবে না। বোঝ এসব কিছু?

‘তাহলে আমি আর কী করতে পারি বল?

‘কী করতে পারি মানে? কী পেয়েছো তুমি আমাকে? আমাকে ঘরের পুতুল বানাতে চাও? তোমরা যা চাইবে তাই হবে? অভিয়াসলি নট। তুমি অনেকবার পড়াশোনা শেষ করে নিজেকে স্টাবলিশড করার কথা বলেছো। সেই কথা থেকে সরে আসছো কেন? বাবা-মাকে কেন বলতে পারছো না জীবনটা আমাদের, ভাবনাটা আমাদেরই থাক? কেন পারছো না? কেন আমাকে ভালোবাসার নামে এতটা পথ টেনে এনেছ? কেন? কেন? আনসার মি।’

প্রচণ্ড ক্ষেভে ফেটে পড়ে তিন্নি। বাঁধ ভাঙা কান্না চলে আসে। হাঁটুর উপর মুখ রেখে গুমড়ে গুমড়ে কাঁদতে থাকে সে। হতবিহ্বল রবিন সান্ত¡নার কোনো ভাষা খুঁজে পায় না। কলা ভবনের সামনের মাঠটিতে শরতের বিকেলের মৃদুমন্দ বাতাস হঠাৎ ভারি হয়ে ওঠে। এমন একটা হঠাৎ বজ্রপাতের ধাক্কা সামাল দিতে না দিতেই আরেকটি ধাক্কা বেরিয়ে আসে তিন্নির হাতফোন থেকে। যুগল বজ্রের পতনে প্রায় নির্বাক হয়ে পড়ে তিন্নি। ওর কাঁপা ঠোঁটে শুধু অস্ফুট স¦রে উচ্চারিত হলো- বারিক আংকেল নেই!

০৩.

বাড়ি থেকে হাঁটাপথ দূরেই মহল্লার গোরস্থান। সেখানেই বারিকের কবর। বিষণœতায় আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে গোটা বাড়ি। মুশতারি রহমান একটু আগে ঘুম থেকে উঠে কিছু নাস্তা বানিয়ে নিয়ে গেছে বারিকের বাড়িতে। আশিকের নাস্তাও টেবিলে রেডি। কিন্তু খেতে ইচ্ছে করে না তার। বারিকের বাড়িতে তারও একবার যাওয়া উচিত। ছেলেমেয়েদুটোকে একটু সান্ত¡না দেয়ার জন্য হলেও ওদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। কিন্তু আশিকের মনে হয়- কী হবে এসব লোকদেখানো কাজ করে। কয়েকদিন গেলে এমনিতেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বরং এখন একটু যাওয়া দরকার বারিকের কবরের কাছেই। বারিক নিশ্চয়ই তার জন্য অপেক্ষা করছে। হয়তো বলছেও, ‘কী আশিক ভাই, রাতে একলা আমাকে মাটির গর্তে রেখে চলে গেলেন, একবার দেখতেও এলেন না!’ বলতেই পারে। খাটিয়া তোলার আগে বারিকের ফ্যামিলির সবাই আরেকবার জোরেশোরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। কান্না দেখে এমনিতেই অনেকের চোখ আর্দ্রতায় ভিজে যায় কিন্তু আশিকের চোখে জলের ছায়াটুকুও ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল- একটা মানুষ চলে গেলে কী এমন ক্ষতি? কিছুই তো আটকে থাকবে নারে বাবা। ফালতু এই কান্নাকাটির আনুষ্ঠানিকতা না করলেই কি নয়? আশিকটা যে বেঁচে থাকতেই ভেঙে চুর হয়ে যাচ্ছে- তার ভেতরেই যে রচিত হয়েছে আরেকটি নিঝুম কবর, সে খবর কে রাখে? সেজন্যে কি কোথাও কোন কান্না জমা হয়ে আছে?

রারিকের মাথার কাছে বসে আশিক। শুকনো মাটিগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করে। আর বিড়বিড় করে বলতে থাকে, ‘চলে গিয়ে ভালোই করলেন বারিক সাহেব। আমারও খুব যেতে ইচ্ছে করে এখন। আপনার মতো এভাবে যদি ঘুমিয়ে থাকতে পারতাম। আমি চলে গেলে কোথাও কোনো কান্না হবে না। সন্তানদের নিয়ে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বইতে হবে না। কিন্তু চাইলেও তো আর মাটির তলে যাওয়া যায় না বারিক সাহেব। সময় হতে হয়। আপনি থাকলে তবু নিজেকে বয়ে নিয়ে যেতে পারতাম... এখন কি তা আর পারবো...

‘অবশ্যই পারবে বাবা। আমি আছি তোমার সাথে।’ কাঁধে তিন্নির হাতের স্পর্শ পেয়ে হকচকিয়ে যায় আশিক। পিছন ফিরে তাকায় তিন্নির দিকে।

‘তিন্নি তুই! তুই এখানে কেন?’

‘তোমাকে নিতে এসেছি বাবা। আংকেলের মতো তোমাকে হারিয়ে যেতে দেব না। চল বাসায়।’

‘না আমি যাবো না। কোত্থাও যাবো না। তুই যা। আমাকে একলা থাকতে দে। যা।’

‘না বাবা, আমি যাবো না। তোমাকে নিয়েই তবে যাবো। ঢাকায় আবারো এক বাসায় একসঙ্গে থাকবো আমরা।’

‘না না এ হয় না তিন্নি। আমার কেউ নেই। তুই রবিনের সাথে আছিস, ওর সাথেই থাক। পড়াশোনার টাকা তো পাচ্ছিস। সমস্যা কী?’

‘রবিন আর নেই বাবা। ও আর কক্ষণও আসবে না। আর কেউই আসবে না। তোমার ইচ্ছের বাইরে আমি আর কখনও যাবো না বাবা। প্রমিজ। আমাকে একটিবার সুযোগ দাও।’ আশিকের কাঁধ চেপে ধরে ভেজা গলায় বলতে থাকে তিন্নি।

‘যান আশিক ভাই। মেয়ে যখন ভুল বুঝে ফিরে এসেছে ওকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে যান। ও ছোট। ভুল হতেই পারে। নষ্ট তো আর হয়ে যায় নি। ওকে কাছে টেনে নিন। বাবার ছায়া দিন। সন্তানদের বাবার ছায়াটা খুব দরকার। মেয়ের ভালোবাসাটাও এখন দরকার আপনার। ও কাছে থাকলে আপনার আর একা একা লাগবে না।’ কবর থেকে বারিকের অদৃশ্য আকুতি যেন শুনতে পায় আশিক। দ্বিধায় পড়ে যায় সে। আবারও বারিকের কণ্ঠ:

‘কী ভাবছেন আশিক ভাই? মৃত্যুর কথা? কবরের শান্তির কথা? না আশিক ভাই। এসব ভাববেন না। জীবন অনন্ত বহমান। আর মৃত্যু হলো থেমে যাওয়া। আপনি বেঁচে আছেন, তার মানে আপনি বয়ে চলেছেন। ইচ্ছে করে থেমে যাবেন কেন। যান, মেয়েটিকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করুন আশিক ভাই। যান।’

আশিকের মন থেকে প্রশ্ন তবু যায় না। -মৃত্যুর ঘন ছায়া থেকে উঠে আবার কোথায় যাবে সে? তিন্নি কি তার কথা রাখবে? নাকি আবারও ডুব দেবে অন্ধকারে? মুখ ভার করা তিন্নি ততক্ষণে ফিরে যেতে শুরু করেছে। তবে বাড়ির পথে নয়, পথ ছেড়ে অন্য এক দিকে। হতবিহ্বল আশিক একবার বারিকের কবরের দিকে, আরেকবার তিন্নির চলে যাওয়ার দিকে তাকায়। এ যেন অনেকটা জীবন আর মৃত্যুর দিকে ফিরে ফিরে তাকানো। ডাকবে কি সে তিন্নিকে? নাকি শূন্যতাতে ভর করেই কাটিয়ে দেবে বাকি জীবন? উত্তরটি খুঁজতে খুঁজতে উঠে দাঁড়ায় আশিক। তিন্নির ধীর পায়ে হেঁটে যাওয়া তখনও তার চোখের সামনে...।

বৃহস্পতিবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২২ , ২৯ পৌষ ১৪২৮ ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ফেরা না ফেরা

রাহমান ওয়াহিদ
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

রাতে ঘুমটা ভালো না হলেও অনেকটা ঝরঝরে মন নিয়েই বিছানা ছেড়েছে আশিকুর রহমান আশিক। বড়সড় বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই শরতের মিষ্টি সকাল তার শরীর ছুঁয়ে যায়। অনেকদিন পর এমন সকালও বেশ ভালো লাগে তার। অথচ পাশের বাড়ির সদ্য প্রয়াত মানুষটাকে নিয়ে শোকের বিষণœতা এখনও কাটেইনি। গেল রাত এগারোটার মধ্যে দাফন কাফন সব শেষ হলেও কারুরই তেমন ঘুম হয়নি সারা রাত। স্ত্রী মুশতারি রহমান ঘুমের ঘাটতি কাভার করতে এখনও বেড এ। পাশের ঘরে ঢাকা ভার্সিটি পড়ুয়া ছোট মেয়ে তিন্নিও সম্ভবত ঘুমোচ্ছে। ফোলা ফোলা চোখ নিয়েই কাল বিকেলে ঢাকা থেকে ফিরেছে সে। এমনিতেই ওর সাথে তেমন কথা হয় না আশিকের। কালও হয় নি। প্রয়াত প্রতিবেশি আব্দুল বারিক খুব ভালোবাসত তাকে। মৃত আংকেলের মুখের কাছে অনেকটা সময় নিস্তব্ধ হয়ে বসেছিল তিন্নি। তন্ময় হয়ে ভাবতে ভাবতে একসময় উঠে দাঁড়িয়ে আশিককে চেপে ধরেছিল খুব করে। আশিক বাধা দেয় নি। বাবার নিঃসঙ্গ হয়ে যাবার ব্যাপারটি কি তাকে ভাবাচ্ছে? নাকি বাবাকেও হারানোর ভয়? তবে যা-ইই হোক, এমন তরল আবেগকে প্রশ্রয় দিতে ইচ্ছে করে না আশিকের। শাম্মির বড় ভাই তারিক ঢাকাতেই বেসরকারি একটা ভার্সিটির মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারে। বারিক মাঝেমধ্যে মজা করে বলতো, ‘আপনার মেয়েটিকে কিন্তু আমি নিয়ে নেব আশিক ভাই। আপত্তি করতে পারবেন না।’ আশিক মুচকি হেসে চুপ থেকেছে। নেব বললেই তো আর নেয়া হয় না। তিন্নি যে একটা গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে সেটার যে কী যন্ত্রণা বারিক তা বুঝবে কী করে? ভেবে পায় না আশিক- যে মেয়ে স্কুল কলেজ পার করলো কোনো ঝামেলা ছাড়াই, তিন তিনটি ছেলের প্রপোজালকে ফিরিয়েছে নিজের বুদ্ধির জোরে, জিপিএও পেয়েছে ডাবল, সেই মেয়ে তার স্বপ্নের ঢাকা ভার্সিটির আঙিনায় পা রাখতে না রাখতেই এ্যাফেয়ারের কুয়োজলে ডোবে কী করে? এসব করে ইংরেজির মতো ভালো একটা সাবজেক্টে ফার্স্ট ক্লাস এ্যাচিভ করা কি চাট্টিখানি কথা? রবিনের মতো পুচকে একটা ছেলের লুজ ইমোশনই তার স্বপ্নের চেয়েও বড় হয়ে গেল! কীভাবে? বারবার ফিরে আসতে বলেছিল আশিক। শুধু ছোট্ট করে বলেছিল, ‘ফিরে আসার উপায় নেই বাবা!’ মুখের উপর বলে কী মেয়েটা! তার এতদিনের চেনা লক্ষ্মী মেয়েটা এখন এতটাই বেপরোয়া! এতটাই এ্যাগ্রেসিভ! রাগে ক্ষোভে এমন অবাধ্য একটা মেয়েকে আর কাছে রাখার দরকার মনে করেনি আশিক। মেয়েকে তাই হোস্টেলে রেখে সদ্য অবসরে যাওয়া জীবন নিয়ে নিজের জন্ম শহরের বাড়িতে চলে এসেছে সে। এসে যে খুব খারাপ কিছু হয়েছে তা নয়। খুব হাসিখুশি বারিক সাহেবকে পেয়ে দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল আশিকের। ফুড ডিপার্টমেন্টের স্টোর কীপার বারিক তাকে বেশ ভালোই সঙ্গ দিচ্ছিল। আশিক যে তার চেয়ে বড় অফিসার ছিল, বয়সের তফাৎটাও যে বছর ছয়েকের, তা কখনও দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি তাদের সম্পর্কে। অফিস থেকে ফিরে বারিক প্রায়ই আশিককে নিয়ে চলে যেত শহরতলীর চমৎকার এক বিলের ধারে। সারা বছরই পানি থাকে সেই বিলে। ছিপ দিয়ে মাছ ধরার নেশা ছিল বারিকের। বিলের ধারে বসে মাছ ধরার আনন্দের মধ্যে হাজারো রকমের কথায় মেতে উঠতো দুজনই। ঘরে বাইরের অনেক কথাই শেয়ারিং হতো তাদের। এত কাছের মানুষ সেই বারিক কোনো জানান না দিয়েই হুট করে চলে গেল! কী এমন বয়স? চুয়ান্নর কাছাকাছি হবে। সুঠাম শরীর। কোনো রোগটগের কথা কখনও শোনেনি আশিক। তবে টেনশন ছিল বাড়ির লোন শোধ করা নিয়ে। আর ছিল ছেলেটির বাসায় না ফেরার রহস্যজনক ব্যাপারটি। ভার্সিটি করোনায় বন্ধ থাকলেও বাড়িতে তার না-ফেরাটা বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল বারিককে। বসুন্ধরার ভাড়া বাসায় বন্ধুদের নিয়ে নেশাটেশায় জড়িয়ে পড়েছিল কিনা সেটার হদিস আর জানা হয়ে ওঠেনি বারিকের। মেয়ে শাম্মি মাস্টার্স শেষ না করে বিয়ে করবে না বলে বেশ কয়েকটি ভালো প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। মেয়ের এই সিদ্ধান্তটি মেনে নিতে পারেনি বারিক। কিন্তু আশিকের সেটা ভালোই লাগতো। শিক্ষাই যে মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্ত একটা জায়গা, বিয়ের পরে সেটা অর্জন করা যে হিমালয় জয়ের মতোই কষ্টসাধ্য ব্যাপার, সেটা বেশ ভালোই বুঝেছিল শাম্মি। আশিক তাই মেয়েকে সাপোর্ট করলে বারিক বলতো, ‘না আশিক ভাই, এখনকার ছেলেমেয়েদের মতিগতিই খুব ডেঞ্জারাস। কখন যে কী করে বসবে ঠিক নেই। মেয়েটার কোনো এ্যাফেয়ার নেই সত্যি, কিন্তু হতে কতক্ষণ, বলুন? চেহারাসুরত তো আর খারাপ না।’ এরপর থেকে এ নিয়ে আর কিছু বলেনি আশিক কিন্তু মনে মনে ভাবতো- আহা, তিন্নিটা যদি শাম্মির মতো হতো!

বড় মেয়ে মিন্নিও কি কম পোড়াচ্ছে? সে-ও তো এক জ্বলন্ত টিউমার। মেয়েটি স্কুলের দেয়াল না পেরোতেই এক সিনেমা ডিরেক্টরের হাত ধরে কীভাবে যে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল- টেরই পেল না কেউ। অনেক পরে জেনেছে আশিক- সে নাকি বাংলা সিনেমার এক উঠতি নায়িকা। প্রচণ্ড ঘৃণায়, লজ্জায়, অপমানে কারো সামনে দাঁড়াতে পারতো না আশিক। সারা জীবন এত সুনাম পাওয়া অফিসারের মেয়ে হয়ে গেল সিনেমার নজরকাড়া নায়িকা! বড় আদরের মেয়েটির এমনই ন্যক্কারজনক অধপতন! এরপর কাগজে মেয়েটির আধান্যাংটা রগরগে ছবি দেখে ঘেন্নায় রাগে মাথাটাকে আর ঠিক রাখতে পারেনি আশিক। তক্ষুনি সুইসাইডের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিল সে। কিন্তু পারে নি। কাপুরুষতার কাছে এমন লজ্জাকর সমর্পণে মন সায় দেয়নি তার। শেষ পর্যন্ত ছোট মেয়ে তিন্নিকে আশ্রয় করেই মিন্নির দেয়া রক্তক্ষরণের ক্ষতটাকে আড়াল করতে চেয়েছিল আশিক। কিন্তু পারলো কই? সে-ও তো বোনের অন্ধকার পথটিই ধরলো। একটা দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসে আশিকের। নিজের দিকে তাকায়। না, তাকে তেমন শোকার্ত মনে হচ্ছে না। কী যে হয়েছে তার যে-পাশের বাড়ির একটা জলজ্যান্ত মানুষ হার্ট এ্যাটাকে হঠাৎ ‘নেই’ হয়ে যাবার ব্যাপারটি তাকে তেমন স্পর্শই করছে না! অথচ তারই বেশি শক্ড হওয়ার কথা। বরং তার মনে হচ্ছে- মন্দ কী, এভাবে হুট করে যাওয়াই তো ভালো। কারো সেবাটেবার দরকার হলো না। এভাবে যেতে পারলে তেমন কষ্টও হবে না মুশতারির। প্রতিদিনই নায়িকা মেয়ে আর জামাই এর সাথে কথা হচ্ছে ভিডিও কলে। আনন্দ হাসিঠাট্টার কথা প্রায়ই কানে আসে আশিকের। খুব অবাক হয়ে ভাবে সে- মা হয়ে কীভাবে পারে এমন নোংরা একটা মেয়ের সাথে আদিখ্যেতার মতো রিলেশন রাখতে? কীভাবে সম্ভব? মাত্র দুটো সন্তানকে সে চোখে চোখে রাখতে পারলো না! নাকি নিজেই চায়নি মেয়েরা সম্মানের জায়গাটায় দাঁড়াক? সে নিজে স্কুলের দেয়াল পেরোতে পারেনি বলে? কিন্তু এ নিয়ে মুশতারিকে কিছু বলতেও ভালো লাগেনি আশিকের। আগে থেকেই দূরত্বে চলে যাওয়া স্ত্রীর সাথে দু’চারটে দরকারী কথা ছাড়া সারাদিনরাতে তেমন কথা হয় না। অনেকদিন থেকেই হয় না। মতের মিল না হলে, শেয়ারিং করার মতো না হলে, কথা বলাবলি হবে কী করে। এজন্য অবশ্য তেমন কষ্টও নেই আশিকের। দূরত্ব যেটা ছিল সেটা আরেকটু বেড়েছে তিন্নিকে ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে ঢাকায় রেখে আসার জন্য। তা বাড়–ক। এগুলো এখন আর কোন ইস্যু নয় আশিকের কাছে। সব সিদ্ধান্ত সে একা নিতেই অভ্যস্ত। আশিক না থাকলেও ব্যাংকে পেনশনের যে টাকাপয়সা আছে তাতে বেশ ভালোভাবেই চলে যাবার কথা মুশতারির। এর উপর দুই মেয়ে, জামাই এর নেকনজর তো আছেই। সেদিক থেকে বরং আশিকেরই আশেপাশে আর কেউ রইলো না। যা কথা হতো একমাত্র বারিকের সাথেই। বারিকই ভুলিয়ে দিত সব একাকীত্ব। সেই বারিক হঠাৎ চলে যাবার পর চারপাশের শূন্যতা অক্টোপাশের মতো চেপে ধরেছে আশিককে। যেন গিলে খাবে সে খানিক পরেই। সেখান থেকে একটা মুক্তি দরকার তার এখন। খুব দরকার।

০২.

বছর দেড়েক পর ভার্সিটি খোলার খবরে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল যেন তিন্নি। যেন কত যুগ ধরে দেখা হয়নি প্রিয় ক্যাম্পাস, প্রিয় বন্ধু বান্ধব। দেখা হয়নি প্রিয়মুখ রবিনকেও। একসঙ্গে অনেকগুলো আনন্দের ঝাঁপি বুকে নিয়ে সপ্তাহখানেক আগে ভার্সিটির আঙিনায় পা রেখেছিল তিন্নি। হোস্টেলে ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সাথে জম্পেশ আড্ডায় মেতে থাকলেও রবিনকে দেখে ততটা খুশি হতে পারে নি। সেই রোদ্দুর মুখ রবিনকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিল না সে। সেদিনের সুন্দর বিকেলটাকে কালো করে দিয়ে কী বললো রবিন এসব! তিন্নির জন্য কিছুই করতে পারবে না সে! শোকাচ্ছন্ন সারাটা রাতে বারিক আংকেলের মতো রবিনও যেন তার পাশে লাশ হয়ে শুয়েছিল। আর ওদের শেষ কথাগুলো রেকর্ডেড অডিওর মতো অবিরাম বেজে চলেছিল কানে।

‘এ তুমি কী বলছো রবিন? এখনি বিয়ের কথা কেন? মাত্র তো ফার্স্ট ইয়ার পার করলাম। আর আমাদের বোঝাপড়ারও তো একটা ব্যাপার আছে। আছে না?

‘সেটা কি এই এক বছরেও হয় নি? অনেক কিছুই তো আমরা শেয়ার করেছি। জেনেছি। বুঝেছি। তারপরেও...’

‘হ্যাঁ তারপরেও। একটা বছর জানাশোনা বোঝার জন্য কিছুই না। আমরা এখনও হালকা ইমোশনটাকেও ওভারকাম করতে পারিনি। তুচ্ছ কারণে আমাদের মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত স্টপ হয়ে যায়।’

‘বেশি ভালোবাসাবাসি থাকলে এমনটা হতেই পারে। এটা কোনো ইস্যু না তিন্নি। আমি বিয়ের কথা বলছিলাম...

‘কিসের বিয়ে? কেন বিয়ে? সেটাই তো বুঝছি না। আমরা এখনও তো স্টুডেন্ট। পড়াশোনার মধ্যে আছি। ভালো রেজাল্ট করার জন্য শুধু পড়াশোনাতেই ডুবে থাকার কথা এখন। এ্যাফেয়ারের সময়ও এখন না। তবু যখন সেটা হয়েই গ্যাছে, থাকুক সেটাও, বাট বিয়ে কেন? তোমার কি বিয়ে পাগলা রোগ ধরেছে?

‘না তিন্নি ও রকম কিছু না। আমি লেট ম্যারেজের সন্তান। বাবার দু’বার স্ট্রোক হয়েছে। থার্ড টাইমে তার বাঁচার সম্ভাবনা নেই। সো ইচ্ছেটা তারই বেশি। একমাত্র সন্তান হয়ে আমি এখন কী করতে পারি, তুমিই বল।’

‘কী বলবো আমি? তোমার বাবাকে বোঝাও। অসুখ তো অনেকেরই হয়। তাই বলে স্টুডেন্ট লাইফ নষ্ট করে

ছেলেবউ দেখতে হবে? এটা কেমন আব্দার? আমার বাবা তো এই এ্যাফেয়ারটাকেই মেনে নিতে পারেনি। বলেছিল- ‘কোন এ্যাফেয়ার ট্যাফেয়ার চলবে না। আমার সাফ কথা।’ কই, বাবার কথা রাখতে পারলাম কই? তোমার ওপর ক্র্যাশ খেলাম। বাবা সেটা মানতে না পেরে আমাকে কাছেই রাখলো না। চলে গেল বগুড়ায়। তো কার জন্য এসব করলাম বল, তোমার জন্যই তো?’

‘সেটা ঠিক আছে তিন্নি। আমিও চাই না যে বিয়েটা এখুনি হোক। আমার নিজের কোনো এ্যাসেট থাকলে বিয়েটিয়ের কথা মুখেও আনতাম না। কিন্তু পড়ে গেছি বিপদে। এখন তোমার আপত্তি মানতে গেলে বাবা-মাকে ছেড়ে চলে আসতে হবে, পড়াশোনাটা আর হবে না...’

‘ভারি মুশকিল তো। এতো দেখছি সেকেলের সেই মরার আগে নাতবউ দেখার মতো ব্যাপার হয়ে গেল। তোমার বা-বামা দুজনই হাইলি এডুকেটেড, এযুগে বসেও তারা কীভাবে ভাবছেন এমন ডেসট্রাকটিভ, আনকালচার্ড ভাবনা। স্যরি রবিন। তোমার বাবামা সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলা আমার উচিত না, তবু না বলেও পারলাম না।’

‘না, ঠিক আছে। অড সিচুয়েশনে এমনটা হতেই পারে। কিন্তু তিন্নি আমার বাবামা কিন্তু অন্যরকম। তারা তোমাকে খুব পছন্দ করেছেন। বিয়ে হলে তোমার কোনো প্রবলেমই তারা হতে দেবেন না, বরং যতটা সম্ভব হেল্প করবেন বলেছেন।’

‘হেল্প করবেন ভালো কথা। তো সেই হেল্পটা তো আমি এখনই মেয়ে হিসেবে তাদের কাছে চাইতে পারি। তোমার বাবামার সাথে এ নিয়ে কি একটু কথা বলতে পারি?’

‘না, তিন্নি, সে পথও বন্ধ। বাবা কারো কথাই শুনছেন না, শুনবেনও না। সাফ বলে দিয়েছেন। এটাও বলেছেন তুমি আপত্তি করলে বাবা অন্য কোথাও মেয়ে দেখবেন।’

‘বাহ! দারুণ দারুণ! তো যাও দ্যাখো গে অন্য মেয়ে। বিয়ের পিঁড়িতে বসগে যাও। আমার আর প্রয়োজন কী তোমার?’

‘প্লিজ তিন্নি এভাবে বলো না। আমি কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি। সিচুয়েশনটা তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি শুধু। তোমাকে এসব বলতামও না, যদি আমার অল্টারনেট কোনো ওয়ে থাকতো।’

‘বাবা-মাকে ছেড়ে চলে আসতে পারবে? টিউশনি করে মেসে থেকে পড়াশোনা করার সাহস পাও? ইংরেজির ছাত্র। ভালো টিউশনি পেতে সমস্যা হবে না।’

বাবামাকে ছেড়ে আসতে পারবো ঠিকই কিন্তু দুদিন পরে বাবাই আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন, আনডাউটেডলি।’

‘তার মানে পারবে না। তার মানে আমি আর তোমার থাকছি না। এই তো? গলাটা কান্নায় কেঁপে ওঠে তিন্নির। একটু থেমে কাঁপা গলায় আবারও বলে,

‘বাট য়ু আর ম্যাচিউর্ড এনাফ রবিন। আমরা একটা রিলেশনে আছি। টেল মি, সেটার কী হবে? আমরা কি তাহলে এতদিন শুধু টাইম পাস করেছি? কোনো গোল কি ছিল না? তোমার বাবা মা যা-ই বলুন, তোমার নিজের কি কোনো সিদ্ধান্ত নেই? কেমন পুরুষ তুমি? আমি যে তোমাকে ভালোবাসার কথা বলে বাবাকে কষ্ট দিলাম, বললাম যে রবিন আমার পড়াশোনার কোনো ক্ষতি করবে না, তো সেই কথাটার কী হবে? শুধু নিজের ফ্যামিলির কথাই ভাবলে? আমার দিকটা নাথিং?’

‘তিন্নি, তুমি খুব ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছো। আমাকে ভুল বুঝছো শুধু শুধু। আমি তোমাকে মোটেও ছেড়ে যেতে চাইছি না। সব ফ্যামিলির প্রবলেম তো এক রকম হয় না। এটা তো বুঝতে হবে। বিয়েটা একটা রিলেশন। এর বেশি কিছু তো না। তুমি যদি একটু মেনে নিতে পারো বাকি দায়িত্বটা আমিই নেব। এখন যেমন আছো বিয়ের পরে তেমনটিই থাকবে। সেরকমই কথা হয়েছে বাবা-মার সাথে। আর গোলের কথা বলছো? সেটা তো শেষ পর্যন্ত বিয়েই। তাই না? তো সেটাকে একটু আগেভাগেই সেরে নিলে ক্ষতি কী?’

‘খুব তো বলছো বিয়েটা তেমন কিছু না। বিয়ের মানে বোঝ তুমি? একটা মেয়ের জন্য বিয়েটা অনেক কিছু। যতই বোঝাও আমাকে, বিয়ের পরে মেয়েকে ঘরের বউই হতে হয়। অনেকগুলো রিলেশনের সাথে রিলেটেড হতে হয়। পড়াশোনাটা হয়ে যায় তখন অফশনাল। বাবা-মা’র কাছেই যখন থাকবে তখন বউয়ের পড়াশোনা বাবা-মা চাইলে হবে, না চাইলে হবে না। তুমি চাইলেও হবে না। বোঝ এসব কিছু?

‘তাহলে আমি আর কী করতে পারি বল?

‘কী করতে পারি মানে? কী পেয়েছো তুমি আমাকে? আমাকে ঘরের পুতুল বানাতে চাও? তোমরা যা চাইবে তাই হবে? অভিয়াসলি নট। তুমি অনেকবার পড়াশোনা শেষ করে নিজেকে স্টাবলিশড করার কথা বলেছো। সেই কথা থেকে সরে আসছো কেন? বাবা-মাকে কেন বলতে পারছো না জীবনটা আমাদের, ভাবনাটা আমাদেরই থাক? কেন পারছো না? কেন আমাকে ভালোবাসার নামে এতটা পথ টেনে এনেছ? কেন? কেন? আনসার মি।’

প্রচণ্ড ক্ষেভে ফেটে পড়ে তিন্নি। বাঁধ ভাঙা কান্না চলে আসে। হাঁটুর উপর মুখ রেখে গুমড়ে গুমড়ে কাঁদতে থাকে সে। হতবিহ্বল রবিন সান্ত¡নার কোনো ভাষা খুঁজে পায় না। কলা ভবনের সামনের মাঠটিতে শরতের বিকেলের মৃদুমন্দ বাতাস হঠাৎ ভারি হয়ে ওঠে। এমন একটা হঠাৎ বজ্রপাতের ধাক্কা সামাল দিতে না দিতেই আরেকটি ধাক্কা বেরিয়ে আসে তিন্নির হাতফোন থেকে। যুগল বজ্রের পতনে প্রায় নির্বাক হয়ে পড়ে তিন্নি। ওর কাঁপা ঠোঁটে শুধু অস্ফুট স¦রে উচ্চারিত হলো- বারিক আংকেল নেই!

০৩.

বাড়ি থেকে হাঁটাপথ দূরেই মহল্লার গোরস্থান। সেখানেই বারিকের কবর। বিষণœতায় আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে গোটা বাড়ি। মুশতারি রহমান একটু আগে ঘুম থেকে উঠে কিছু নাস্তা বানিয়ে নিয়ে গেছে বারিকের বাড়িতে। আশিকের নাস্তাও টেবিলে রেডি। কিন্তু খেতে ইচ্ছে করে না তার। বারিকের বাড়িতে তারও একবার যাওয়া উচিত। ছেলেমেয়েদুটোকে একটু সান্ত¡না দেয়ার জন্য হলেও ওদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। কিন্তু আশিকের মনে হয়- কী হবে এসব লোকদেখানো কাজ করে। কয়েকদিন গেলে এমনিতেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বরং এখন একটু যাওয়া দরকার বারিকের কবরের কাছেই। বারিক নিশ্চয়ই তার জন্য অপেক্ষা করছে। হয়তো বলছেও, ‘কী আশিক ভাই, রাতে একলা আমাকে মাটির গর্তে রেখে চলে গেলেন, একবার দেখতেও এলেন না!’ বলতেই পারে। খাটিয়া তোলার আগে বারিকের ফ্যামিলির সবাই আরেকবার জোরেশোরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। কান্না দেখে এমনিতেই অনেকের চোখ আর্দ্রতায় ভিজে যায় কিন্তু আশিকের চোখে জলের ছায়াটুকুও ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল- একটা মানুষ চলে গেলে কী এমন ক্ষতি? কিছুই তো আটকে থাকবে নারে বাবা। ফালতু এই কান্নাকাটির আনুষ্ঠানিকতা না করলেই কি নয়? আশিকটা যে বেঁচে থাকতেই ভেঙে চুর হয়ে যাচ্ছে- তার ভেতরেই যে রচিত হয়েছে আরেকটি নিঝুম কবর, সে খবর কে রাখে? সেজন্যে কি কোথাও কোন কান্না জমা হয়ে আছে?

রারিকের মাথার কাছে বসে আশিক। শুকনো মাটিগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করে। আর বিড়বিড় করে বলতে থাকে, ‘চলে গিয়ে ভালোই করলেন বারিক সাহেব। আমারও খুব যেতে ইচ্ছে করে এখন। আপনার মতো এভাবে যদি ঘুমিয়ে থাকতে পারতাম। আমি চলে গেলে কোথাও কোনো কান্না হবে না। সন্তানদের নিয়ে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বইতে হবে না। কিন্তু চাইলেও তো আর মাটির তলে যাওয়া যায় না বারিক সাহেব। সময় হতে হয়। আপনি থাকলে তবু নিজেকে বয়ে নিয়ে যেতে পারতাম... এখন কি তা আর পারবো...

‘অবশ্যই পারবে বাবা। আমি আছি তোমার সাথে।’ কাঁধে তিন্নির হাতের স্পর্শ পেয়ে হকচকিয়ে যায় আশিক। পিছন ফিরে তাকায় তিন্নির দিকে।

‘তিন্নি তুই! তুই এখানে কেন?’

‘তোমাকে নিতে এসেছি বাবা। আংকেলের মতো তোমাকে হারিয়ে যেতে দেব না। চল বাসায়।’

‘না আমি যাবো না। কোত্থাও যাবো না। তুই যা। আমাকে একলা থাকতে দে। যা।’

‘না বাবা, আমি যাবো না। তোমাকে নিয়েই তবে যাবো। ঢাকায় আবারো এক বাসায় একসঙ্গে থাকবো আমরা।’

‘না না এ হয় না তিন্নি। আমার কেউ নেই। তুই রবিনের সাথে আছিস, ওর সাথেই থাক। পড়াশোনার টাকা তো পাচ্ছিস। সমস্যা কী?’

‘রবিন আর নেই বাবা। ও আর কক্ষণও আসবে না। আর কেউই আসবে না। তোমার ইচ্ছের বাইরে আমি আর কখনও যাবো না বাবা। প্রমিজ। আমাকে একটিবার সুযোগ দাও।’ আশিকের কাঁধ চেপে ধরে ভেজা গলায় বলতে থাকে তিন্নি।

‘যান আশিক ভাই। মেয়ে যখন ভুল বুঝে ফিরে এসেছে ওকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে যান। ও ছোট। ভুল হতেই পারে। নষ্ট তো আর হয়ে যায় নি। ওকে কাছে টেনে নিন। বাবার ছায়া দিন। সন্তানদের বাবার ছায়াটা খুব দরকার। মেয়ের ভালোবাসাটাও এখন দরকার আপনার। ও কাছে থাকলে আপনার আর একা একা লাগবে না।’ কবর থেকে বারিকের অদৃশ্য আকুতি যেন শুনতে পায় আশিক। দ্বিধায় পড়ে যায় সে। আবারও বারিকের কণ্ঠ:

‘কী ভাবছেন আশিক ভাই? মৃত্যুর কথা? কবরের শান্তির কথা? না আশিক ভাই। এসব ভাববেন না। জীবন অনন্ত বহমান। আর মৃত্যু হলো থেমে যাওয়া। আপনি বেঁচে আছেন, তার মানে আপনি বয়ে চলেছেন। ইচ্ছে করে থেমে যাবেন কেন। যান, মেয়েটিকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করুন আশিক ভাই। যান।’

আশিকের মন থেকে প্রশ্ন তবু যায় না। -মৃত্যুর ঘন ছায়া থেকে উঠে আবার কোথায় যাবে সে? তিন্নি কি তার কথা রাখবে? নাকি আবারও ডুব দেবে অন্ধকারে? মুখ ভার করা তিন্নি ততক্ষণে ফিরে যেতে শুরু করেছে। তবে বাড়ির পথে নয়, পথ ছেড়ে অন্য এক দিকে। হতবিহ্বল আশিক একবার বারিকের কবরের দিকে, আরেকবার তিন্নির চলে যাওয়ার দিকে তাকায়। এ যেন অনেকটা জীবন আর মৃত্যুর দিকে ফিরে ফিরে তাকানো। ডাকবে কি সে তিন্নিকে? নাকি শূন্যতাতে ভর করেই কাটিয়ে দেবে বাকি জীবন? উত্তরটি খুঁজতে খুঁজতে উঠে দাঁড়ায় আশিক। তিন্নির ধীর পায়ে হেঁটে যাওয়া তখনও তার চোখের সামনে...।