‘বিশৃঙ্খলায় ঢাকায় বাসে যাত্রী পরিবহন কম’

ঢাকা মহানগরীতে গণপরিবহন চলাচলের জন্য ৩৮৬টি রুটে মধ্যে বর্তমানে ১২৮টি রুট সচল আছে। এসব রুটে প্রায় সাত হাজার বাস-মিনিবাস চলাচল করে বলে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ জানায়। তবে এখন বাস্তবে প্রায় চার হাজার বাস চলাচল করে বলে এই খাতের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এসব বাসে দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ মানুষ পরিবহন করা হয়। অফিস যখন শুরু হয় এবং যখন ছুটি হয় এই দুই সময়ই গণপরিবহনে সবচেয়ে বেশি চাপ থাকে। দিনের অন্যান্য সময় যে পরিমাণ যাত্রী নিয়ে বাস চলাচল করে; অফিসের সময় তার দেড় গুণের বেশি যাত্রী পরিবহন করা হয় বলে বুয়েটের এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অফিস-আদালত খোলা রেখে শনিবার থেকে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে বাস-ট্রেন-লঞ্চ চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

অফিস খোলা কিন্তু অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করলে বাস সংকটের কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান সংবাদকে বলেন, ‘ঢাকা মহানগরীতে গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলার কারণে বাসে স্বাভাবিক সময় গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহন করা হয়। এর মধ্যে যদি অফিস খোলা রেখে অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করা হয় তাহলে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।’

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক সমীক্ষায় তথ্যমতে, ঢাকায় এক রুটে বিভিন্ন কোম্পানির বাসের মধ্যে চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। একটির পথ আগলে অন্য বাসে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। ফলে ঢাকা শহরের বাসগুলোর সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। যাত্রা সময়ও বিলম্বিত হচ্ছে। এতে রাজধানীর বাসপ্রতি যাত্রী চলাচল বিশ্বের অন্য শহরের তুলনায় অর্ধেকের কম হয়। এ ছাড়া যানজটের কারণে বাস নির্ধারিত ট্রিপ দিতে পারে না।

২০১৮ সালের পরিচালনা করা বুয়েটের এই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ঢাকার ছয় হাজার বাসে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ মানুষ চলাচল করে। অর্থাৎ বাসপ্রতি দৈনিক ৫০০ যাত্রী যাতায়াত করতে পারে। পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতের মুম্বাই শহরে বাস রয়েছে আরও কম, তিন হাজার ৬০০। তবে এসব বাসে যাত্রী বহন করা হয় দৈনিক গড়ে ৪৮ লাখ। অর্থাৎ বাসপ্রতি যাত্রী পরিবহনের হার এক হাজার ৩৩৩। আর সিঙ্গাপুর শহরে বাস রয়েছে তিন হাজার। এর মাধ্যমে ঢাকার চেয়ে বেশি প্রায় ৩২ লাখ যাত্রী দৈনিক পরিবহন করা হয়। এক্ষেত্রে বাসপ্রতি যাত্রীর সংখ্যা এক হাজার ৬৭।

এ বিষয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মোয়াজ্জেম হোসেন সংবাদকে বলেন, সিঙ্গাপুর ও মুম্বাইয়ে রয়েছে পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্ক। এক রুটে চলাচল করে একটি কোম্পানির বাস। এ জন্য এত বেশি সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা যায়। আবার বাসগুলোতে যাত্রীদের খুব বেশি ভিড়ও হয় না। অথচ ঢাকার বিভিন্ন বাসে যাত্রীদের প্রচ- চাপ থাকে সব সময়ই। যাত্রীদের মধ্যেও বাসে উঠার জন্য প্রতিযোগিতা লেগে যায়। অনেক যাত্রী নিয়মিতই দাঁড়িয়ে এমনকি দরজায় ঝুলেও যাতায়াত করেন। গত এক দশকে বাসে যাত্রী চলাচলের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আগামীতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। তবে পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্ক না গড়ে তোলা গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।’ এর মধ্যে আবার করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে অর্ধেক আসনে যাত্রী পরিবহন করা হলে বাস সংকটের কারণে যাত্রী চাপ আরও বেড়ে যাবে। তাই এই দুর্যোগের সময় বিআরটিসি সব বাস ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বাস যাত্রী পরিবহনে ব্যবহারের পরামর্শ দেন অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে এক সিট ফাঁকা রেখে বাস পরিচালনা করলে যাত্রীদের চাপ বেড়ে যাবে। এ জন্য সরকারি সংস্থার বাস ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাস যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার করা উচিত। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি যেসব প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে কাজ করার সুযোগ আছে তাদের অফিসে না আসার পরামর্শ আমার।’

বৃহস্পতিবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২২ , ২৯ পৌষ ১৪২৮ ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

‘বিশৃঙ্খলায় ঢাকায় বাসে যাত্রী পরিবহন কম’

ঢাকা মহানগরীতে গণপরিবহন চলাচলের জন্য ৩৮৬টি রুটে মধ্যে বর্তমানে ১২৮টি রুট সচল আছে। এসব রুটে প্রায় সাত হাজার বাস-মিনিবাস চলাচল করে বলে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ জানায়। তবে এখন বাস্তবে প্রায় চার হাজার বাস চলাচল করে বলে এই খাতের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এসব বাসে দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ মানুষ পরিবহন করা হয়। অফিস যখন শুরু হয় এবং যখন ছুটি হয় এই দুই সময়ই গণপরিবহনে সবচেয়ে বেশি চাপ থাকে। দিনের অন্যান্য সময় যে পরিমাণ যাত্রী নিয়ে বাস চলাচল করে; অফিসের সময় তার দেড় গুণের বেশি যাত্রী পরিবহন করা হয় বলে বুয়েটের এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অফিস-আদালত খোলা রেখে শনিবার থেকে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে বাস-ট্রেন-লঞ্চ চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

অফিস খোলা কিন্তু অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করলে বাস সংকটের কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান সংবাদকে বলেন, ‘ঢাকা মহানগরীতে গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলার কারণে বাসে স্বাভাবিক সময় গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহন করা হয়। এর মধ্যে যদি অফিস খোলা রেখে অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করা হয় তাহলে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।’

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক সমীক্ষায় তথ্যমতে, ঢাকায় এক রুটে বিভিন্ন কোম্পানির বাসের মধ্যে চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। একটির পথ আগলে অন্য বাসে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। ফলে ঢাকা শহরের বাসগুলোর সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। যাত্রা সময়ও বিলম্বিত হচ্ছে। এতে রাজধানীর বাসপ্রতি যাত্রী চলাচল বিশ্বের অন্য শহরের তুলনায় অর্ধেকের কম হয়। এ ছাড়া যানজটের কারণে বাস নির্ধারিত ট্রিপ দিতে পারে না।

২০১৮ সালের পরিচালনা করা বুয়েটের এই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ঢাকার ছয় হাজার বাসে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ মানুষ চলাচল করে। অর্থাৎ বাসপ্রতি দৈনিক ৫০০ যাত্রী যাতায়াত করতে পারে। পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতের মুম্বাই শহরে বাস রয়েছে আরও কম, তিন হাজার ৬০০। তবে এসব বাসে যাত্রী বহন করা হয় দৈনিক গড়ে ৪৮ লাখ। অর্থাৎ বাসপ্রতি যাত্রী পরিবহনের হার এক হাজার ৩৩৩। আর সিঙ্গাপুর শহরে বাস রয়েছে তিন হাজার। এর মাধ্যমে ঢাকার চেয়ে বেশি প্রায় ৩২ লাখ যাত্রী দৈনিক পরিবহন করা হয়। এক্ষেত্রে বাসপ্রতি যাত্রীর সংখ্যা এক হাজার ৬৭।

এ বিষয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মোয়াজ্জেম হোসেন সংবাদকে বলেন, সিঙ্গাপুর ও মুম্বাইয়ে রয়েছে পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্ক। এক রুটে চলাচল করে একটি কোম্পানির বাস। এ জন্য এত বেশি সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা যায়। আবার বাসগুলোতে যাত্রীদের খুব বেশি ভিড়ও হয় না। অথচ ঢাকার বিভিন্ন বাসে যাত্রীদের প্রচ- চাপ থাকে সব সময়ই। যাত্রীদের মধ্যেও বাসে উঠার জন্য প্রতিযোগিতা লেগে যায়। অনেক যাত্রী নিয়মিতই দাঁড়িয়ে এমনকি দরজায় ঝুলেও যাতায়াত করেন। গত এক দশকে বাসে যাত্রী চলাচলের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আগামীতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। তবে পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্ক না গড়ে তোলা গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।’ এর মধ্যে আবার করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে অর্ধেক আসনে যাত্রী পরিবহন করা হলে বাস সংকটের কারণে যাত্রী চাপ আরও বেড়ে যাবে। তাই এই দুর্যোগের সময় বিআরটিসি সব বাস ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বাস যাত্রী পরিবহনে ব্যবহারের পরামর্শ দেন অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে এক সিট ফাঁকা রেখে বাস পরিচালনা করলে যাত্রীদের চাপ বেড়ে যাবে। এ জন্য সরকারি সংস্থার বাস ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাস যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার করা উচিত। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি যেসব প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে কাজ করার সুযোগ আছে তাদের অফিসে না আসার পরামর্শ আমার।’