স্বাধীনতা, সমদৃষ্টি ও উন্নয়ন

দেশি-বিদেশি নানা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতির চিত্র স্পষ্ট। পদ্মা সেতুর মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন করতে চলেছে। এটি অনেক বড় ব্যাপার। কিন্তু এর পাশাপাশি নেতিবাচকতাও কম পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা ও রাজনীতির কদর্যতা দূর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ-এ কথা মনে রাখতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো-নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা। স্বাধীনতা অর্জন করেছি আমরা ৫০ বছর পূর্বে কিন্তু মুক্তি এখনও পাওয়া যায়নি কেন-এই জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার উপলব্ধি দরকার। আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল, “মুক্তির সংগ্রাম”। এই মুক্তি কার কাছ থেকে কার মুক্তি। শোষিতদের মুক্তি শোষকের কাছ থেকে। ঔপনিবেশিক আমলের পাকিস্তানি শোষকদের কাছ থেকে, পাকিস্তানের বিখ্যাত বাইশ পরিবারে কাছ থেকে মুক্তি ঘটেছে কিন্তু তাদের জায়গায় ক্ষমতাশালী বাঙালিরা সংখ্যায় অজস্র গুণ বেড়ে প্রান্তিক মানুষদের শোষণ অব্যাহত রেখেছে। শোষনের জন্য প্রয়োজন ক্ষমতা। সে ক্ষমতা আবার ব্যবসায়ী, আমলা, আইনজীবী, চিকিৎসকদের ক্ষমতা নয়, ক্ষমতা হতে হবে নিরঙ্কুশ এবং তা’ প্রয়োগ করার জন্য হতে হবে আইনপ্রণেতা। তাই দলে দলে নির্বাচনের পূর্বে সম্ভাব্য ক্ষমতা গ্রহণকারীদের দলে যোগদানের হিড়িক পড়ে যায়। ভোটের রাজনীতির অঙ্কে, বিত্তশালীরা টিকিট পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অনেক দুঃর্মুখেরা বলে থাকেন, যে টিকিট নাকি অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে থাকে। পঁচাত্তরের পর, সব রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার টিকিট বিক্রির সংস্কৃতি চালু হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের “পল্লীবন্ধুর” অবদান সবচেয়ে বেশি। তবে পল্লীবন্ধু যে কাজের সূচনা করে গিয়েছিলেন, পরবর্তীতে সব দলই তার এই মহান আবিষ্কারকে অত্যন্ত উৎসাহ ব্যাঞ্জকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাত থেকে নির্বাসনে চলে গেছে। বড় অসহায়, তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদরা। রাজনীতি এখন ক্ষমতাশালীদের হাতের লাঠি। যে লাঠিতে ভর করে তারা সামনের দিকে এগিয়ে যান।

সমাজে এখনও সবচেয়ে সম্মানিত পেশাজীবী হলেন শিক্ষক সমাজ। সম্প্রতি একজন ভাইস চ্যান্সেলরের অবসর গ্রহণের পর তার গ্রামের বাড়িতে কয়েকশ’ মোটরসাইকেলসহ শোভাযাত্রা করেছেন। শিক্ষক অত্যন্ত সীমিত আয়ের মানুষ। পেট ঢাকে তো পিট ঢাকে না, এ রকম যদি কেউ চিন্তা করে থাকেন তাহলে এটি সম্পূর্ণ ভুল চিন্তা। শিক্ষকরা তো সমাজ বিচ্ছিন্ন জীব নন। তাই তারাও এখন প্রতিযোগিতার মাঠে আছেন। তবে সব শিক্ষক যে একই মূল্যবোধ ধারণ করছেন তা কিন্তু ঠিক নয়। তো আমাদের সেই ভাইস চ্যান্সেলর সাহেব কী বার্তা দিতে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়িতে? বার্তা একটিই, আমি “আসিতেছি” তোমাদের সব দুঃখ, কষ্ট মোচনের জন্য। তোমাদের দুঃখও দূর হবে আমার দুঃখ ও ঘুচবে। আর যদি না ঘুচে তাহলে, মোটরসাইকেলে শোভা যাত্রায় যারা আছে, তারা তোমাদের দুঃখ চিরদিনের জন্য দূর করে দেবে। অতএব, সাধু-সাবধান। দু-তিন বছর আগে আমাদের আর একজন ভাইস চ্যান্সেলর সাহেব ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাকে যদি যুবলীগের সভাপতি করা হয় তাহলে তিনি ভাইস চ্যান্সেলর পদ থেকে পদত্যাগ করতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সংশ্লিষ্ট কারো কানের ভেতর দিয়া, তার এই বাণী “মরমে পশিতে” পারেনি। তবে তিনি একটি উপকার করে গিয়েছেন সেটি হলো, তিনি তার এবং তাদের ক্ষমতাকাক্সক্ষাকে খোলাসা করে গেছেন জাতির সামনে।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের অডিও ফাঁসের মাধ্যমে যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দগ দগে ঘা জাতির সামনে উন্মোচিত হয়, অনেক সচেতন নাগরিক কিন্তু খুব বিস্মিত হননি। অনেকেই ধরে নিয়েছেন, অডিও ফাঁসের মাধ্যমে তিনি এবং তার আচরণ দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনমনের কারণে আরও “মুরাদ হাসান” এখনও পর্দার পেছনে অশ্লীল এবং অনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। সভ্য সমাজে রাজনীতির বিকল্প কিন্তু এখনও তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক মতবাদ হসাবে গণতন্ত্রেরও তেমন কোন বিকল্প দেখা যায় না। তার মানে আমাদের বাঁচতে হলে, সবাই মিলে গণতন্ত্রকে পরিপুষ্ট করতে হবে। গণতন্ত্রকে পরিপুষ্ট করতে হলে, নাগরিকদের সম্মান দিতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান অনুশীলিত রাজনীতিতে নাগরিকদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হচ্ছে না। নাগরিকদের বিশেষ করে প্রান্তিক, দরিদ্র, হতদরিদ্র মানুষেরা রাজনৈতিক দলের হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। প্রান্তিক মানুষদের আরও দূরে ঠেলে দেয়ার কারণ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিনষ্ট করে ফেলা।

উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের স্বাধীনতার একটি বড় সম্পর্ক আছে। স্বাধীনতা ও সব মানুষের প্রতি সমদৃষ্টি প্রদান করা না গেলে গাণিতিক উন্নয়ন হবে, এ কথাটি বলা যায় কিন্তু বৈষম্য হ্রাস করা যাবে না। এ বিষয়টি নিয়ে আধুনিক যুগে সব চেয়ে উঁচু গলায় কথা বলেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। উন্নয়ণ, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা যে পরস্পর সংযুক্ত, অমর্ত্য সেনের মতো আর কেউ এতো উচ্চকিত নন। এ কথাটি বঙ্গবন্ধু তার দূর দৃষ্টি দিয়ে বুঝেছিলেন বহু পূর্বে। এ জন্য তিনি মানুষের মুক্তির প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি স্বাধীনতা ও মুক্তি দুটি শব্দকে দুটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করেছিলেন। স্বাধীনতাকে তিনি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির অর্থে ব্যবহার করেছিলেন আর মুক্তি বলতে সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্তি লাভ করে বৈষম্য হীন সমাজ গঠনকে বুঝিয়েছিলেন। এ কারণে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে স্বজ্ঞানে তিনি বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। তাই আমরা দেখে থাকি, খুব স্বাভাবিকভাবে বায়াত্তরের সংবিধানে বৈষম্য নিরসন ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজতন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। স্বাধীনতার ৫০ বছর হয়ে গেছে এবং স্বাধীনতার অনেক সুফল আমরা পেয়েছি। কিন্তু মুক্তির সংগ্রামের সুফল আমরা পাইনি বললেই চলে। আমাদের গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে। মূল প্রতিষ্ঠানগুলো, অর্থাৎ বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, জবাবদিহি, ভোটের অধিকার এবং সেই সঙ্গে শিক্ষার মান, স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ-এই ধরনের লক্ষ্য অর্জনের মাপকাঠিতে আমাদের অভীষ্ট মুক্তি থেকে আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি।

কেন পিছিয়ে আছি আমরা কাক্সিক্ষত মুক্তির সোপান থেকে? এর কারণ ব্যবচ্ছেদ করলে অসংখ্য কারণকে চিহ্নিত করা যাবে। তবে সব চেয়ে বড় কারণ হলো-গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকিকরণ করতে না পারা। গণতান্ত্রিক শাসন হলো, নাগরিকের শাসন। গণতান্ত্রিক শাসন হলো, নাগরিকদের কাছে জবাদিহির শাসন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিককে ভয় পায় শাসক। ভিন্নমতকে তাই গ্রহণ করা, অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করা হলো গণতান্ত্রিক শাসনের মৌলবাণী। অন্যকে শ্রদ্ধা করার বিষয়টি মনে হয় আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আর অবশেষ নেই। সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান দীর্ঘদিন থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে অশ্লীল গালিগালাজ করে আসছিলেন। এমনকি তার নাতনি কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইনে স্নাতক, লিংকন্স ইন থেকে বার-অ্যাট-ল সনদ প্রাপ্ত রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই এমন একজন অরাজনৈতিক মানুষকেও অশ্লীল গালাগালি দিতে পিছপা হননি। এবার তিনি মুক্তি পাননি কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের অসৌজন্যতাকে প্রশ্রয় দিতে পারেননি। অন্য সময়ে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এ রকম অসৌজন্যমূলক আচরণের ক্ষেত্রে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। ভূতপূর্ব তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর কাজও ছিল রোজ একবার খালেদা জিয়াকে গালাগাল করা। ইনু সাহেব যতদিন মন্ত্রী ছিলেন এটাই করে এসেছেন। মন্ত্রিত্ব হারানোর পর তার মুখে হয় কুলুপ নয় তো তিনি কি বলেন তা আর মিডিয়া প্রকাশ করে না। রাজনীতিতে বিরুদ্ধাচারণ থাকবে। কিন্তু কতটা বলবে বা বলবে না তারও একটা সীমারেখা নিশ্চয়ই থাকবে। আমরা কোন আমলেই তা দেখিনি। এরশাদ আমলে কাজী জাফর, মওদুদ আহমেদরা যা মনে আসত তাই বলতেন। এককালের প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরী জ্ঞানী ডাক্তার, এখন অবশ্য নিভে যাওয়া বাতি। তিনিও কত আবোল-তাবোল কথা বলতেন। শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটূক্তি করতেন। তবে সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছিল সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরী।

স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী অতিক্রম করলাম আমরা। ৫০ বছর খুব কম সময় নয়। এবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে হবে রাষ্ট্রকে মানবিক করে গড়ে তোলার। মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারেন তৃণমূল থেকে ওঠে আসা নেতারা। যেমন বঙ্গবন্ধু ওঠে এসছিলেন টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত গ্রাম থেকে। কত ত্যাগ, দেশের প্রতি কত ভালোবাসা, অঙ্গীকার, দায়বদ্ধতাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি একজন মহান নেতা হতে পেরেছিলেন। যাকে অনন্তকাল বাংলাদেশ ও বাঙালি অনুসরণ করে যাবে। এরকম নেতাদের দেখা পাওয়ার জন্য আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে অবশ্যই সংস্কার করতে হবে। রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনতে হবে “বিজনেস ক্লাবের” সদস্যদের হাত থেকে। রাজনীতিকে হতে হবে জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও সাধারণ মানুষের সহজ অংশগ্রহণ সমৃদ্ধ। আমরা কী পারব তা করতে? পারতেই হবে আমাদের, কারণ সার্বিক মুক্তি পাওয়া ছিল, আমাদের স্বাধীনতার অঙ্গীকার।

[লেখক : কলাম লেখক ও উন্নয়ন গবেষক]

বৃহস্পতিবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২২ , ২৯ পৌষ ১৪২৮ ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

স্বাধীনতা, সমদৃষ্টি ও উন্নয়ন

শেখর ভট্টাচার্য

দেশি-বিদেশি নানা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতির চিত্র স্পষ্ট। পদ্মা সেতুর মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন করতে চলেছে। এটি অনেক বড় ব্যাপার। কিন্তু এর পাশাপাশি নেতিবাচকতাও কম পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা ও রাজনীতির কদর্যতা দূর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ-এ কথা মনে রাখতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো-নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা। স্বাধীনতা অর্জন করেছি আমরা ৫০ বছর পূর্বে কিন্তু মুক্তি এখনও পাওয়া যায়নি কেন-এই জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার উপলব্ধি দরকার। আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল, “মুক্তির সংগ্রাম”। এই মুক্তি কার কাছ থেকে কার মুক্তি। শোষিতদের মুক্তি শোষকের কাছ থেকে। ঔপনিবেশিক আমলের পাকিস্তানি শোষকদের কাছ থেকে, পাকিস্তানের বিখ্যাত বাইশ পরিবারে কাছ থেকে মুক্তি ঘটেছে কিন্তু তাদের জায়গায় ক্ষমতাশালী বাঙালিরা সংখ্যায় অজস্র গুণ বেড়ে প্রান্তিক মানুষদের শোষণ অব্যাহত রেখেছে। শোষনের জন্য প্রয়োজন ক্ষমতা। সে ক্ষমতা আবার ব্যবসায়ী, আমলা, আইনজীবী, চিকিৎসকদের ক্ষমতা নয়, ক্ষমতা হতে হবে নিরঙ্কুশ এবং তা’ প্রয়োগ করার জন্য হতে হবে আইনপ্রণেতা। তাই দলে দলে নির্বাচনের পূর্বে সম্ভাব্য ক্ষমতা গ্রহণকারীদের দলে যোগদানের হিড়িক পড়ে যায়। ভোটের রাজনীতির অঙ্কে, বিত্তশালীরা টিকিট পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অনেক দুঃর্মুখেরা বলে থাকেন, যে টিকিট নাকি অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে থাকে। পঁচাত্তরের পর, সব রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার টিকিট বিক্রির সংস্কৃতি চালু হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের “পল্লীবন্ধুর” অবদান সবচেয়ে বেশি। তবে পল্লীবন্ধু যে কাজের সূচনা করে গিয়েছিলেন, পরবর্তীতে সব দলই তার এই মহান আবিষ্কারকে অত্যন্ত উৎসাহ ব্যাঞ্জকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাত থেকে নির্বাসনে চলে গেছে। বড় অসহায়, তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদরা। রাজনীতি এখন ক্ষমতাশালীদের হাতের লাঠি। যে লাঠিতে ভর করে তারা সামনের দিকে এগিয়ে যান।

সমাজে এখনও সবচেয়ে সম্মানিত পেশাজীবী হলেন শিক্ষক সমাজ। সম্প্রতি একজন ভাইস চ্যান্সেলরের অবসর গ্রহণের পর তার গ্রামের বাড়িতে কয়েকশ’ মোটরসাইকেলসহ শোভাযাত্রা করেছেন। শিক্ষক অত্যন্ত সীমিত আয়ের মানুষ। পেট ঢাকে তো পিট ঢাকে না, এ রকম যদি কেউ চিন্তা করে থাকেন তাহলে এটি সম্পূর্ণ ভুল চিন্তা। শিক্ষকরা তো সমাজ বিচ্ছিন্ন জীব নন। তাই তারাও এখন প্রতিযোগিতার মাঠে আছেন। তবে সব শিক্ষক যে একই মূল্যবোধ ধারণ করছেন তা কিন্তু ঠিক নয়। তো আমাদের সেই ভাইস চ্যান্সেলর সাহেব কী বার্তা দিতে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়িতে? বার্তা একটিই, আমি “আসিতেছি” তোমাদের সব দুঃখ, কষ্ট মোচনের জন্য। তোমাদের দুঃখও দূর হবে আমার দুঃখ ও ঘুচবে। আর যদি না ঘুচে তাহলে, মোটরসাইকেলে শোভা যাত্রায় যারা আছে, তারা তোমাদের দুঃখ চিরদিনের জন্য দূর করে দেবে। অতএব, সাধু-সাবধান। দু-তিন বছর আগে আমাদের আর একজন ভাইস চ্যান্সেলর সাহেব ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাকে যদি যুবলীগের সভাপতি করা হয় তাহলে তিনি ভাইস চ্যান্সেলর পদ থেকে পদত্যাগ করতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সংশ্লিষ্ট কারো কানের ভেতর দিয়া, তার এই বাণী “মরমে পশিতে” পারেনি। তবে তিনি একটি উপকার করে গিয়েছেন সেটি হলো, তিনি তার এবং তাদের ক্ষমতাকাক্সক্ষাকে খোলাসা করে গেছেন জাতির সামনে।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের অডিও ফাঁসের মাধ্যমে যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দগ দগে ঘা জাতির সামনে উন্মোচিত হয়, অনেক সচেতন নাগরিক কিন্তু খুব বিস্মিত হননি। অনেকেই ধরে নিয়েছেন, অডিও ফাঁসের মাধ্যমে তিনি এবং তার আচরণ দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনমনের কারণে আরও “মুরাদ হাসান” এখনও পর্দার পেছনে অশ্লীল এবং অনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। সভ্য সমাজে রাজনীতির বিকল্প কিন্তু এখনও তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক মতবাদ হসাবে গণতন্ত্রেরও তেমন কোন বিকল্প দেখা যায় না। তার মানে আমাদের বাঁচতে হলে, সবাই মিলে গণতন্ত্রকে পরিপুষ্ট করতে হবে। গণতন্ত্রকে পরিপুষ্ট করতে হলে, নাগরিকদের সম্মান দিতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান অনুশীলিত রাজনীতিতে নাগরিকদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হচ্ছে না। নাগরিকদের বিশেষ করে প্রান্তিক, দরিদ্র, হতদরিদ্র মানুষেরা রাজনৈতিক দলের হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। প্রান্তিক মানুষদের আরও দূরে ঠেলে দেয়ার কারণ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিনষ্ট করে ফেলা।

উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের স্বাধীনতার একটি বড় সম্পর্ক আছে। স্বাধীনতা ও সব মানুষের প্রতি সমদৃষ্টি প্রদান করা না গেলে গাণিতিক উন্নয়ন হবে, এ কথাটি বলা যায় কিন্তু বৈষম্য হ্রাস করা যাবে না। এ বিষয়টি নিয়ে আধুনিক যুগে সব চেয়ে উঁচু গলায় কথা বলেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। উন্নয়ণ, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা যে পরস্পর সংযুক্ত, অমর্ত্য সেনের মতো আর কেউ এতো উচ্চকিত নন। এ কথাটি বঙ্গবন্ধু তার দূর দৃষ্টি দিয়ে বুঝেছিলেন বহু পূর্বে। এ জন্য তিনি মানুষের মুক্তির প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি স্বাধীনতা ও মুক্তি দুটি শব্দকে দুটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করেছিলেন। স্বাধীনতাকে তিনি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির অর্থে ব্যবহার করেছিলেন আর মুক্তি বলতে সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্তি লাভ করে বৈষম্য হীন সমাজ গঠনকে বুঝিয়েছিলেন। এ কারণে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে স্বজ্ঞানে তিনি বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। তাই আমরা দেখে থাকি, খুব স্বাভাবিকভাবে বায়াত্তরের সংবিধানে বৈষম্য নিরসন ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজতন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। স্বাধীনতার ৫০ বছর হয়ে গেছে এবং স্বাধীনতার অনেক সুফল আমরা পেয়েছি। কিন্তু মুক্তির সংগ্রামের সুফল আমরা পাইনি বললেই চলে। আমাদের গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে। মূল প্রতিষ্ঠানগুলো, অর্থাৎ বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, জবাবদিহি, ভোটের অধিকার এবং সেই সঙ্গে শিক্ষার মান, স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ-এই ধরনের লক্ষ্য অর্জনের মাপকাঠিতে আমাদের অভীষ্ট মুক্তি থেকে আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি।

কেন পিছিয়ে আছি আমরা কাক্সিক্ষত মুক্তির সোপান থেকে? এর কারণ ব্যবচ্ছেদ করলে অসংখ্য কারণকে চিহ্নিত করা যাবে। তবে সব চেয়ে বড় কারণ হলো-গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকিকরণ করতে না পারা। গণতান্ত্রিক শাসন হলো, নাগরিকের শাসন। গণতান্ত্রিক শাসন হলো, নাগরিকদের কাছে জবাদিহির শাসন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিককে ভয় পায় শাসক। ভিন্নমতকে তাই গ্রহণ করা, অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করা হলো গণতান্ত্রিক শাসনের মৌলবাণী। অন্যকে শ্রদ্ধা করার বিষয়টি মনে হয় আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আর অবশেষ নেই। সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান দীর্ঘদিন থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে অশ্লীল গালিগালাজ করে আসছিলেন। এমনকি তার নাতনি কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইনে স্নাতক, লিংকন্স ইন থেকে বার-অ্যাট-ল সনদ প্রাপ্ত রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই এমন একজন অরাজনৈতিক মানুষকেও অশ্লীল গালাগালি দিতে পিছপা হননি। এবার তিনি মুক্তি পাননি কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের অসৌজন্যতাকে প্রশ্রয় দিতে পারেননি। অন্য সময়ে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এ রকম অসৌজন্যমূলক আচরণের ক্ষেত্রে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। ভূতপূর্ব তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর কাজও ছিল রোজ একবার খালেদা জিয়াকে গালাগাল করা। ইনু সাহেব যতদিন মন্ত্রী ছিলেন এটাই করে এসেছেন। মন্ত্রিত্ব হারানোর পর তার মুখে হয় কুলুপ নয় তো তিনি কি বলেন তা আর মিডিয়া প্রকাশ করে না। রাজনীতিতে বিরুদ্ধাচারণ থাকবে। কিন্তু কতটা বলবে বা বলবে না তারও একটা সীমারেখা নিশ্চয়ই থাকবে। আমরা কোন আমলেই তা দেখিনি। এরশাদ আমলে কাজী জাফর, মওদুদ আহমেদরা যা মনে আসত তাই বলতেন। এককালের প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরী জ্ঞানী ডাক্তার, এখন অবশ্য নিভে যাওয়া বাতি। তিনিও কত আবোল-তাবোল কথা বলতেন। শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটূক্তি করতেন। তবে সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছিল সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরী।

স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী অতিক্রম করলাম আমরা। ৫০ বছর খুব কম সময় নয়। এবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে হবে রাষ্ট্রকে মানবিক করে গড়ে তোলার। মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারেন তৃণমূল থেকে ওঠে আসা নেতারা। যেমন বঙ্গবন্ধু ওঠে এসছিলেন টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত গ্রাম থেকে। কত ত্যাগ, দেশের প্রতি কত ভালোবাসা, অঙ্গীকার, দায়বদ্ধতাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি একজন মহান নেতা হতে পেরেছিলেন। যাকে অনন্তকাল বাংলাদেশ ও বাঙালি অনুসরণ করে যাবে। এরকম নেতাদের দেখা পাওয়ার জন্য আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে অবশ্যই সংস্কার করতে হবে। রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনতে হবে “বিজনেস ক্লাবের” সদস্যদের হাত থেকে। রাজনীতিকে হতে হবে জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও সাধারণ মানুষের সহজ অংশগ্রহণ সমৃদ্ধ। আমরা কী পারব তা করতে? পারতেই হবে আমাদের, কারণ সার্বিক মুক্তি পাওয়া ছিল, আমাদের স্বাধীনতার অঙ্গীকার।

[লেখক : কলাম লেখক ও উন্নয়ন গবেষক]