কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনেকে একাধিক মামলার আসামি

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে ভোটের দিন সব ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে অনেকে একাধিক মামলার আসামি, রয়েছে সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা; যার প্রভাব মেয়র ভোটেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। গতকাল নাসিকের পথে পথে সাধারণ মানুষ ও ভোটারদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

আলোচিত দুই প্রার্থী বিএনপির পদ হারানো তৈমুর আলম খন্দকার (স্বতন্ত্র-হাতি) এবং আওয়ামী লীগের সেলিনা হায়াৎ আইভীসহ (নৌকা) মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট সাতজন। প্রার্থী না হয়েও বরাবরের মতো আলোচনায় আছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান।

২৭টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৪৮ জন এবং ৯টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ৩২ জন প্রার্থী।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ওয়ার্ডেই শামীম ওসমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কেউ না কেউ কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাদের আইভীর অনুসারী বলা হচ্ছে।

এদিকে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অজুহাতে গিয়াসউদ্দীন, আবুল কালাম আজাদ, মোহাম্মদ আলীসহ নারায়ণগঞ্জ বিএনপির প্রভাবশালী নেতারা তৈমুরের প্রচারণায় দৃশ্যমান নেই। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র বলছে, রাজনীতিতে শামীম ওসমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আইভীকে ভোটে জেতাতে ‘কৌশলী’ হয়েছেন তারা।

অন্য এক সূত্রমতে, ওয়ার্ড পর্যায়ে শামীম ওসমানের অনুসারী কাউন্সিলর-সমর্থকদের সঙ্গে আইভীর সমর্থকদের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের প্রভাব এবারের ভোটেও পড়বে। প্রায় ২০ লাখ মানুষের এই নগরে ভোটার পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৩৫৭ জন। নারী ভোটার দুই লাখ ৫৭ হাজার ৫১৯ আর পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৫৯ হাজার ৮৩৪ জন।

এবারের নির্বাচনে নগরের ২৭টি ওয়ার্ডজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ভোট প্রার্থনায় ব্যস্ত প্রার্থীরা দিয়েছেন নানা প্রতিশ্রুতি। গতকাল মধ্যরাতে শেষ হয়েছে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা। আগামীকাল মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ভোট। ভোটাররা দুইবারের মেয়রকে আবারও চান নাকি নতুন কোন নগরপিতা বেছে নেবেন; দিন শেষে তাই এখন দেখার অপেক্ষা।

এদিকে নির্বাচনী প্রচারণাকালে গণমাধ্যমের কাছে আইভী ও তৈমুর একে-অন্যের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন। তবে দুই প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নির্বাচনী সংঘাতের ঘটনা নজরে আসেনি।

নাসিকের পথে পথে

গতকাল নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষ ও ভোটারদের সঙ্গে নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় সবাই ভোটের দিন কাউন্সিলর প্রার্থীদের মর্ধে সংঘাতের আশঙ্কা করছেন। সিদ্ধিরগঞ্জের সোনামিয়া মার্কেট সংলগ্ন একটি চায়ের (টঙ) দোকানের সামনে ‘মোটরসাইকেল’ থামালাম। বেলা তখন পৌনে ১১টা। দোকানের সামনে ছাউনির নিচে টুল পাতা। তবে বসার মতো জায়গা খালি নেই। দাঁড়িয়ে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে চোখ ঘুরাতে লাগলাম। বেশির ভাগ মধ্য বয়স্ক, দুজন প্রবীণ। তিনজনের হাতে চায়ের কাপ। বাকিরা (আট-৯ জন) এমনি বসে আছেন। চলছে নাসিক নির্বাচনের আলাপ।

এটা কত নম্বর ওয়ার্ড চাচা? আমার এমন প্রশ্নের জবাবে বেশ কয়েকজন একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘ছয়’।

‘রোববার তো ভোট, কী অবস্থা আপনাদের এলাকার?’ একজন উত্তর দিলেন ‘ভালোই’।

‘শুনলাম গ-গোল হয়েছে?’ এমন প্রশ্নের জবাবে একজন বললেন, ‘আমগো এইহানে না। নয়াআটি হইছে। বাদল কাউন্সিলরের এলকায়।’

‘ও আচ্ছা। ওইটা কত নম্বর ওয়ার্ড?’ উত্তরে আরেকজন বললেন, ‘তিন নম্বর। ওইখানে প্রায়ই গ্যানজাম হইতাছে। নূর হোসেনের ভাতিজা তো। জোর খাডায়। কয়দিন আগেও লাট্টু (লাটিম) মার্কার লোকজনরে মারছে। মামলাও খাইছে।’ ‘আপনাদের এলাকায় কেউ জোর খাটায় না?’ জবাবে প্রবীণ একজনের জবাব, ‘আছে কয়েকজন। তবে গ-গোল হয় নাই।’ এখানে কাউন্সিলর প্রার্থী কয়জন? উত্তরে একজন বললেন,‘ আছে মতিসাবসহ ছয়জন।’ রাস্তায় তাকিয়ে দেখি মতিউর রহমান নামের একজনের পোস্টার ঝুলছে। প্রতীক ঠেলাগাড়ি। সাড়ে ১১টার দিকে কয়েক কিলোমিটার সামনে এনায়েত নগর এলাকায় থামলাম। বিশাল ড্রেন আর রাস্তার কাজ হচ্ছে। মোড়ে ছোট কয়েকটা চায়ের দোকান। ঢুকলাম একটায়। সেখানেও চলছে নির্বাচনী আলাপ। কথা হলো তাদের কয়েকজনের সঙ্গেও। জানলাম এটা আট নম্বর ওয়ার্ড। মফিজুর রহমান নামে স্থানীয় এক লোক বললেন, এখনে রুহুল আমিন (করাত), মহসিন ভূঁইয়ার (লাটিম) মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে প্রার্থী আছেন আটজন।

মিজমিজি, শিমরাইল, আদমজী ইপিজেড, কদমতলী, তাঁতখানা, ধনকু-া, কালীরবাজার, ডিআইটিসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে চাষাড়া শহীদ মিনারে গিয়ে থামলাম। সেখানে কথা হলে, এক সময় নগর বিএনপির আলোচিত এক কর্মীর সঙ্গে। এখন তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় নেই। তবে এবার ভোটের হাওয়া মাখাতে এলাকায় এসেছেন। সঙ্গে আছে তার এক বন্ধু, যে নিজের পরিচয় দিল শামীম ওসমানের কর্মী হিসেবে।

ভোটে (মেয়র) কে জিতবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির ওই কর্মী বলেন, ‘যদি ব্যক্তি ইমেজ ধরেন, আইভী অনেক আগাইয়া আছে। তৈমুর ভাই অনেক পিছে। আবার আওয়ামী লীগ-বিএনপি হিসাব করলে ভিন্ন।’ কেমন ভিন্ন ব্যাখ্যা করতে বললে তিনি বলেন, ‘আমগো যারা দাপটওয়ালা বিএনপি নেতা, ধরেন গিয়াসভাই, মোহাম্মদ আলীভাই, বন্দরের কালাম ভাই; কেউ তো মাঠে নাই। শুনছি তারা গোপনে আইভীরে সাপোর্ট দিছে। খালি কামালভাই (নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল) আছে তৈমুর ভাইয়ের লগে।’

সাপোর্টের বিষয়টা কতটুকু গ্রহণযোগ্য, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আরে ভাই, বোঝেন না কেন? আইভী ফেল করলে, শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জের রাজা। বিএনপির নারায়ণগঞ্জে কোন খাওয়া নাই। আইভীরে মাঠে রাখলেই অহন (এখন) বিএনপির লাভ।’

মেয়র পদে সমর্থন কার বেশি? এমন প্রশ্ন ছিল শামীম ওসমানের কর্মী দাবি করা লোকটির কাছে। তিনি বললেন, ‘আপনে অবস্থা দেখছেন? অহন আওয়ামী লীগের কে আইভীর পক্ষে, আর কে বিপক্ষে, বোঝা খুব মুশকিল। আমারা অহন আর মেয়র ভোট লাইয়া মাথা ঘামাই না। টার্গেট অইল (হইল) কাউন্সিলর। ২৭টার মধ্যে ২০টা যদি আমগো অয় (হয়), তহন কী অইব?’

হাসতে হাসতে সেই আবার বলল, ‘তহন (তখন) দেখবেন খেলা। আইভী পাশ করলেও গদিতে আরাম কইরা বইতে (বসতে) পারবো না।’

কউন্সিলার প্রার্র্থীদের আমলনামা

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল পর্যন্ত স্বস্তিতে থেকেছেন সাধারণ ভোটাররা। তবে এই নির্বাচনের ২৭টি ওয়ার্ডের কয়েকজন বিতর্কিত কাউন্সিলর প্রার্থীকে নিয়ে ভোটের দিন বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা করছেন নগরবাসী। এইসব প্রার্থীদের অনেকেই বর্তমান কাউন্সিলর পদে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, গুম, খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থাও অর্ধশতাধিক কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছেন। এসব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে সাধারণ ভোটারদের মাঝে। তবে কোন শঙ্কা ছাড়াই ১৬ জানুয়ারি ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, এই নির্বাচনে সাতজন মেয়র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৪৮ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৩৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া প্রার্থীদের হলফনামা পর্যালোচনা করে জানা যায়, বেশ কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। কোন কোন মামলায় অব্যাহতি পেলেও অনেকের মামলা এখনও চলমান রয়েছে। তবে চলমান মামলায় জামিনে রয়েছেন তারা।

সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডে আবারও প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা ওমর ফারুক। তিনি এবার ঝুড়ি প্রতীকে লড়ছেন। তার বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় তিনটি মামলা থাকলেও তিনি সবগুলোতে অব্যাহতি পেয়েছেন। সর্বশেষ মামলাটি ২০১৭ সালে করা হয়েছিল। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়েছেন সাবেক ইউপি সদস্য আবদুর রহিম। তার প্রতীক ঘুড়ি। এছাড়া এই ওয়ার্ডে লাটিম প্রতীক নিয়ে লড়ছেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুজিবুর রহমানের ছেলে মাহমুদুর রহমান।

মুজিবুর রহমান নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওমানের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত। ওমর ফারুক ছাড়া বাকি দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে বর্তমানে ও আগে কোন মামলা নেই বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। এই ওয়ার্ডে জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে ওমর ফারুকেরই।

বিএনপি দলীয়ভাবে কোন নির্বাচনে অংশ না নিলেও এই নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক তৈমুর আলম খন্দকার। তিনি ছাড়াও তার ভাই মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদও কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা কাউন্সিলর প্রার্থীও রয়েছেন। ২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী ইকবাল হোসেন জেলা বিএনপির সাবেক অর্থবিষয়ক সম্পাদক। তিনি ২০১৬ সালেও কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক ভূঁইয়া রাজু তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। রাজুর প্রতি শামীম ওসমানের সমর্থন রয়েছে বলে জানা গেছে। এই ওয়ার্ডে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ইকবাল হোসেন ও আমিনুল হক আলোচিত সাত খুনের মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন। তবে তারা দু’জনই এই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। আমিনুলের বিরুদ্ধে আরও দুই হত্যা মামলাসহ চারটি মামলা ছিল। বর্তমানে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে করা মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। এই ওয়ার্ডে আরেক প্রার্থী শফিকুল ইসলাম সাত খুনের ঘটনায় নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের শ্যালক। তার বিরুদ্ধেও হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজির আটটি মামলা ছিল। সেগুলোতে খালাসপ্রাপ্ত তিনি।

৩ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহজালাল বাদল। তিনি এবারও প্রার্থী হয়েছে। সাত খুন মামলার দ-প্রাপ্ত আসামি নূর হোসেনের ভাতিজা শাহজালাল বাদল সাংসদ শামীম ওসমানেরও ঘনিষ্ঠজন। অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির অভিযোগে চারটি মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে বাদলের বিরুদ্ধে। এছাড়া আগে আরও আটটি মামলা থেকে খালাস ও অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি। তার সঙ্গে যুবলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের লড়াই হবে। তবে তার বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই।

৪ নম্বর ওয়ার্ডে ত্রিমুখী লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই ওয়ার্ডে লাটিম প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন বর্তমান কাউন্সিলর আরিফুল হক হাসান। জাতীয় শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি আবদুল মতিন মাস্টারের ছেলে আরিফুল সাংসদ শামীম ওসমানের অনুসারী। তিনি এক সময় সাত খুন মামলায় ফাঁসির দ-প্রাপ্ত নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত ছিলেন। আরিফুলের বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদকের দুটি মামলা আছে। উচ্চ আদালতে নির্দেশে সেগুলো স্থগিত আছে।

এই নির্বাচনে ঘুড়ি প্রতীকে দাঁড়িয়েছেন আরিফুলের চাচাতো ভাই নজরুল ইসলাম। তিনি দুই মামলার আসামি। এছাড়া ঠেলাগাড়ি প্রতীকে কাউন্সিলর পদপ্রার্থী সাত খুন মামলায় ফাঁসির দ-প্রাপ্ত নূর হোসেনের ছোট ভাই নুর উদ্দিন মিয়া। নুর উদ্দিনের পক্ষে নূর হোসেনের অনুসারীরা কাজ করছেন। তার বিরুদ্ধে সাতটি মামলা বিচারাধীন। এর আগে দুটি মামলায় খালাসপ্রাপ্ত তিনি।

৫ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর গোলাম মুহাম্মদ সাদরিল বিএনপির সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিনের ছেলে। তিনি এবার লড়ছেন ব্যাডমিন্টন প্রতীকে। হত্যা-বিস্ফোরকসহ ১৭ মামলার আসামি সাদরিল। দুটিতে খালাস পেয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের আনিসুর রহমান আনিসকে সমর্থন দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমান। আনিস ঠেলাগাড়ি প্রতীকে লড়ছেন।

৬ নম্বর ওয়ার্ডে লড়াই হবে শামীম ওসমানের দুই ঘনিষ্ঠজন মতিউর রহমান ও সিরাজুল ইসলাম ম-লের মধ্যে। তাদের মধ্যে বর্তমান কাউন্সিলর মতিউর রহমান ঠেলাগাড়ি ও সাবেক কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম ঝুড়ি প্রতীকে লড়ছেন। দু’জনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ দুই ডজনেরও বেশি মামলা রয়েছে। মতিউরের বিরুদ্ধে ২৩টি মামলার ১৭টিতে খালাস ও ৩টিতে অব্যাহতি পেয়েছেন বর্তমান সরকারের আমলে। একটি স্থগিত আছে। সিরাজুলের পাঁচটি মামলা আছে। মতিউর রহমান সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের সভাপতি ও সিরাজুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি।

৭ নম্বর ওয়ার্ডে ১২ জন প্রার্থী। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কয়েক মাস আগে মারা গেছেন। এই ওয়ার্ডে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছেন মিজানুর রহমান রিপন ও ফজলুল হক জুয়েল। তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা না থাকলেও আরেক প্রার্থী মো. সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে বর্তমানে একটি হত্যা মামলা তদন্তাধীন আছে। দুটি মামলায় তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন।

৮ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর রুহুল আমিন মোল্লা এগিয়ে থাকলেও তার লড়াই হবে শামীম ওসমান ঘনিষ্ঠ মহসিন ভূঁইয়ার সঙ্গে। রুহুলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা রয়েছে। মহসিন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনসহ দুটি মামলায় খালাস পেয়েছেন।

৯ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর ইস্রাফিল প্রধান। বিএনপি থেকে শামীম ওসমানের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন। এবার তিনি করাত প্রতীকে লড়ছেন। ইস্রাফিলের বিরুদ্ধে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের একটি মামলা রয়েছে। তার লড়াই হবে বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি মিষ্টি কুমড়া প্রতীকে লড়ছেন। ১০ নম্বর ওয়ার্ডে লিয়াকত আলী বিস্ফোরকের তিনটিসহ সন্ত্রাস দমন আইনে ৯টি মামলার আসামি।

১১ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি নেতা অহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যা-বিস্ফোরকসহ সাতটি মামলা ছিল, এর মধ্যে ছয়টিতে খালাস পান। ১২ নম্বর ওয়ার্ডে মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত হাশেমের বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরকসহ পাঁচ মামলার বিচার চলছে। এর আগে তিনি সাত মামলায় খালাস পান। শওকত জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি কিসমত হাশেমের ভাই। তার বিপক্ষে সেলিম খানকে সমর্থন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে বিএনপি নেতা হলেও শওকত হাশেম নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ। এক সময় প্রতারণার মামলার আসামি হয়েছিলেন ১৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী দিদার খন্দকার। ওই মামলায় খালাস পেলেও তিনি বর্তমানে বিস্ফোরকসহ পাঁচ মামলার আসামি। মামলাগুলো সাক্ষ্য ও অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে আছে বলে জানা গেছে।

১৭ নম্বর ওয়ার্ডে মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য ও বর্তমান কাউন্সিলর আবদুল করিমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ দুটি মামলা বিচারাধীন। তিনি একটি চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। এর আগে সাতটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তার ওয়ার্ডে শক্ত কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।

১৮ নম্বরে কাউন্সিলর প্রার্থী সাবেক কাউন্সিলর কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে চেক প্রচারণার তিনটি মামলা ছিল। দুটিতে বাদীর সঙ্গে আপসরফা করেছেন, একটিতে খালাস পেয়েছেন। কামরুল হাসান ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ ও মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক। এই ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলর ছিলেন তিনি। এদিকে বর্তমান কাউন্সিলর কবির হোসাইনও প্রার্থী হয়েছেন। তিনি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। বছর দুই আগে একটি মারামারির ঘটনায় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

১৯ নম্বর ওয়ার্ডে লড়াই হবে বর্তমান কাউন্সিলর আওয়ামী লীগের ফয়সাল সাগরের ও নারায়ণগঞ্জ গাউসিয়া কমিটির সভাপতি মোখলেছুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে। মোখলেছুর আজমেরী ওসমানের ভগ্নিপতি পুলিশ কর্মকর্তা ইফতেখায়রুলের আত্মীয়। আওয়ামী লীগের সমর্থন আছে সাগরের পক্ষে।

২০ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর বিএনপির গোলাম নবী মুরাদের সঙ্গে লড়াই হবে বিএনপির আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী মোহাম্মদ শাহেন শাহর সঙ্গে। বিএনপি নেতা শাহেন শাহ সম্প্রতি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। ২১ নম্বর ওয়ার্ডে লড়ছেন বর্তমান কাউন্সিলর বিএনপির হান্নান সরকার। তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরকসহ পাঁচটি মামলা বিচারাধীন। হান্নান মহানগর বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক। তার প্রতিদ্বন্দ্বী শাহিন মিয়া তেমন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নন।

২২, ২৩ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রধান ছয় প্রার্থী ২৫টি মামলার আসামি। এর মধ্যে ২২ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর সুলতান আহমেদসহ ছয়জন প্রতিদ্বন্দ্বী। বিএনপি সমর্থক সুলতানের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক ও চাঁদাবাজিসহ চারটি মামলা বিচারাধীন আছে। বাকি পাঁচ প্রার্থীর তিনজনই সরকারি দলের নেতা। তাদের মধ্যে পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী জহিরুল ইসলাম একটি হত্যা মামলার আসামি। তিনি বর্তমানে জামিনে আছেন। আরেক প্রার্থী বন্দর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ খানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ চারটি মামলা রয়েছে।

২৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন দুলালের বিরুদ্ধে মাদকসহ তিনটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। দুলাল বর্তমান কাউন্সিলর। তিনি একটি মাদক মামলায় গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। তিনি ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ। এই ওয়ার্ডে আরেক প্রার্থী মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাউসারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরকসহ ১১টি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। আবুল কাউসার নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সাংসদ আবুল কালামের ছেলে। ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে মোহাম্মদ খোকন হত্যাসহ দুই মামলার আসামি।

২৫ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর এনায়েত হোসেনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তার বিরুদ্ধে আছেন সাইদুর রহমান লিটন। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর সামসুজ্জোহারই জয়ের সম্ভাবনা বেশি। এখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী আনোয়ার হোসেন বন্দর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রশিদের ভাই।

২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কামরুজ্জামান বাবুল মারা যান প্রায় ১০ মাস আগে। এখানে তার ভাই প্রার্থী হলেও লড়াই হবে সিরাজুল ইসলাম ও আলমগীর মিয়ার মধ্যে। সিরাজুল লড়ছেন লাটিম প্রতীকে অন্যদিকে আলমগীর ঘুড়ি প্রতীকে লড়ছেন।

১, ২, ৩ সংরক্ষিত কাউন্সিলর মাকসুদা মোজাফফর এবং ৪, ৫, ৬ সংরক্ষিত কাউন্সিলর মনোয়ারা বেগম নিজ নিজ ওয়ার্ডে এগিয়ে আছেন। ৭, ৮, ৯ সংরক্ষিত কাউন্সিলর মোসাম্মাৎ আয়শা আক্তার দিনার এবার লড়াই হবে তাসনুভা নওরিন ভূঁইয়ার সঙ্গে। ১০, ১১, ১২ সংরক্ষিত কাউন্সিলর মিনোয়ারা বেগম ও নূপুর বেগমের লড়াই হবে।

১৩, ১৪, ১৫ ওয়ার্ডে সংরক্ষিত কাউন্সিলর শারমীন হাবিব বিন্নী ও পপি রানী সরকারের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। গতবার অল্প ভোটে হেরেছিলেন পপি রানী। এইবার তার ভালো অবস্থান রয়েছে। ১৬, ১৭, ১৮ সংরক্ষিত কাউন্সিলর আফসানা আফরোজ বিভা এগিয়ে আছেন। তবে তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী সানজিদা আহমেদ জুয়েলী। ১৯, ২০, ২১ সংরক্ষিত কাউন্সিলর শিউলি নওশাদ ও মায়ানুর বেগমের লড়াই হবে। ২২, ২৩, ২৪ সংরক্ষিত কাউন্সিলর শাওন অংকন ও শাহনাজ ভূঁইয়ার লড়াই হবে। ২৫, ২৬, ২৭ সংরক্ষিত কাউন্সিলর হোসনে আরা বেগম ও সানিয়া আক্তারের লড়াই হবে।

শনিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২২ , ০১ মাঘ ১৪২৮ ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনেকে একাধিক মামলার আসামি

image

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে ভোটের দিন সব ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে অনেকে একাধিক মামলার আসামি, রয়েছে সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা; যার প্রভাব মেয়র ভোটেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। গতকাল নাসিকের পথে পথে সাধারণ মানুষ ও ভোটারদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

আলোচিত দুই প্রার্থী বিএনপির পদ হারানো তৈমুর আলম খন্দকার (স্বতন্ত্র-হাতি) এবং আওয়ামী লীগের সেলিনা হায়াৎ আইভীসহ (নৌকা) মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট সাতজন। প্রার্থী না হয়েও বরাবরের মতো আলোচনায় আছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান।

২৭টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৪৮ জন এবং ৯টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ৩২ জন প্রার্থী।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ওয়ার্ডেই শামীম ওসমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কেউ না কেউ কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাদের আইভীর অনুসারী বলা হচ্ছে।

এদিকে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অজুহাতে গিয়াসউদ্দীন, আবুল কালাম আজাদ, মোহাম্মদ আলীসহ নারায়ণগঞ্জ বিএনপির প্রভাবশালী নেতারা তৈমুরের প্রচারণায় দৃশ্যমান নেই। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র বলছে, রাজনীতিতে শামীম ওসমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আইভীকে ভোটে জেতাতে ‘কৌশলী’ হয়েছেন তারা।

অন্য এক সূত্রমতে, ওয়ার্ড পর্যায়ে শামীম ওসমানের অনুসারী কাউন্সিলর-সমর্থকদের সঙ্গে আইভীর সমর্থকদের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের প্রভাব এবারের ভোটেও পড়বে। প্রায় ২০ লাখ মানুষের এই নগরে ভোটার পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৩৫৭ জন। নারী ভোটার দুই লাখ ৫৭ হাজার ৫১৯ আর পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৫৯ হাজার ৮৩৪ জন।

এবারের নির্বাচনে নগরের ২৭টি ওয়ার্ডজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ভোট প্রার্থনায় ব্যস্ত প্রার্থীরা দিয়েছেন নানা প্রতিশ্রুতি। গতকাল মধ্যরাতে শেষ হয়েছে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা। আগামীকাল মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ভোট। ভোটাররা দুইবারের মেয়রকে আবারও চান নাকি নতুন কোন নগরপিতা বেছে নেবেন; দিন শেষে তাই এখন দেখার অপেক্ষা।

এদিকে নির্বাচনী প্রচারণাকালে গণমাধ্যমের কাছে আইভী ও তৈমুর একে-অন্যের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন। তবে দুই প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নির্বাচনী সংঘাতের ঘটনা নজরে আসেনি।

নাসিকের পথে পথে

গতকাল নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষ ও ভোটারদের সঙ্গে নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় সবাই ভোটের দিন কাউন্সিলর প্রার্থীদের মর্ধে সংঘাতের আশঙ্কা করছেন। সিদ্ধিরগঞ্জের সোনামিয়া মার্কেট সংলগ্ন একটি চায়ের (টঙ) দোকানের সামনে ‘মোটরসাইকেল’ থামালাম। বেলা তখন পৌনে ১১টা। দোকানের সামনে ছাউনির নিচে টুল পাতা। তবে বসার মতো জায়গা খালি নেই। দাঁড়িয়ে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে চোখ ঘুরাতে লাগলাম। বেশির ভাগ মধ্য বয়স্ক, দুজন প্রবীণ। তিনজনের হাতে চায়ের কাপ। বাকিরা (আট-৯ জন) এমনি বসে আছেন। চলছে নাসিক নির্বাচনের আলাপ।

এটা কত নম্বর ওয়ার্ড চাচা? আমার এমন প্রশ্নের জবাবে বেশ কয়েকজন একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘ছয়’।

‘রোববার তো ভোট, কী অবস্থা আপনাদের এলাকার?’ একজন উত্তর দিলেন ‘ভালোই’।

‘শুনলাম গ-গোল হয়েছে?’ এমন প্রশ্নের জবাবে একজন বললেন, ‘আমগো এইহানে না। নয়াআটি হইছে। বাদল কাউন্সিলরের এলকায়।’

‘ও আচ্ছা। ওইটা কত নম্বর ওয়ার্ড?’ উত্তরে আরেকজন বললেন, ‘তিন নম্বর। ওইখানে প্রায়ই গ্যানজাম হইতাছে। নূর হোসেনের ভাতিজা তো। জোর খাডায়। কয়দিন আগেও লাট্টু (লাটিম) মার্কার লোকজনরে মারছে। মামলাও খাইছে।’ ‘আপনাদের এলাকায় কেউ জোর খাটায় না?’ জবাবে প্রবীণ একজনের জবাব, ‘আছে কয়েকজন। তবে গ-গোল হয় নাই।’ এখানে কাউন্সিলর প্রার্থী কয়জন? উত্তরে একজন বললেন,‘ আছে মতিসাবসহ ছয়জন।’ রাস্তায় তাকিয়ে দেখি মতিউর রহমান নামের একজনের পোস্টার ঝুলছে। প্রতীক ঠেলাগাড়ি। সাড়ে ১১টার দিকে কয়েক কিলোমিটার সামনে এনায়েত নগর এলাকায় থামলাম। বিশাল ড্রেন আর রাস্তার কাজ হচ্ছে। মোড়ে ছোট কয়েকটা চায়ের দোকান। ঢুকলাম একটায়। সেখানেও চলছে নির্বাচনী আলাপ। কথা হলো তাদের কয়েকজনের সঙ্গেও। জানলাম এটা আট নম্বর ওয়ার্ড। মফিজুর রহমান নামে স্থানীয় এক লোক বললেন, এখনে রুহুল আমিন (করাত), মহসিন ভূঁইয়ার (লাটিম) মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে প্রার্থী আছেন আটজন।

মিজমিজি, শিমরাইল, আদমজী ইপিজেড, কদমতলী, তাঁতখানা, ধনকু-া, কালীরবাজার, ডিআইটিসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে চাষাড়া শহীদ মিনারে গিয়ে থামলাম। সেখানে কথা হলে, এক সময় নগর বিএনপির আলোচিত এক কর্মীর সঙ্গে। এখন তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় নেই। তবে এবার ভোটের হাওয়া মাখাতে এলাকায় এসেছেন। সঙ্গে আছে তার এক বন্ধু, যে নিজের পরিচয় দিল শামীম ওসমানের কর্মী হিসেবে।

ভোটে (মেয়র) কে জিতবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির ওই কর্মী বলেন, ‘যদি ব্যক্তি ইমেজ ধরেন, আইভী অনেক আগাইয়া আছে। তৈমুর ভাই অনেক পিছে। আবার আওয়ামী লীগ-বিএনপি হিসাব করলে ভিন্ন।’ কেমন ভিন্ন ব্যাখ্যা করতে বললে তিনি বলেন, ‘আমগো যারা দাপটওয়ালা বিএনপি নেতা, ধরেন গিয়াসভাই, মোহাম্মদ আলীভাই, বন্দরের কালাম ভাই; কেউ তো মাঠে নাই। শুনছি তারা গোপনে আইভীরে সাপোর্ট দিছে। খালি কামালভাই (নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল) আছে তৈমুর ভাইয়ের লগে।’

সাপোর্টের বিষয়টা কতটুকু গ্রহণযোগ্য, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আরে ভাই, বোঝেন না কেন? আইভী ফেল করলে, শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জের রাজা। বিএনপির নারায়ণগঞ্জে কোন খাওয়া নাই। আইভীরে মাঠে রাখলেই অহন (এখন) বিএনপির লাভ।’

মেয়র পদে সমর্থন কার বেশি? এমন প্রশ্ন ছিল শামীম ওসমানের কর্মী দাবি করা লোকটির কাছে। তিনি বললেন, ‘আপনে অবস্থা দেখছেন? অহন আওয়ামী লীগের কে আইভীর পক্ষে, আর কে বিপক্ষে, বোঝা খুব মুশকিল। আমারা অহন আর মেয়র ভোট লাইয়া মাথা ঘামাই না। টার্গেট অইল (হইল) কাউন্সিলর। ২৭টার মধ্যে ২০টা যদি আমগো অয় (হয়), তহন কী অইব?’

হাসতে হাসতে সেই আবার বলল, ‘তহন (তখন) দেখবেন খেলা। আইভী পাশ করলেও গদিতে আরাম কইরা বইতে (বসতে) পারবো না।’

কউন্সিলার প্রার্র্থীদের আমলনামা

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল পর্যন্ত স্বস্তিতে থেকেছেন সাধারণ ভোটাররা। তবে এই নির্বাচনের ২৭টি ওয়ার্ডের কয়েকজন বিতর্কিত কাউন্সিলর প্রার্থীকে নিয়ে ভোটের দিন বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা করছেন নগরবাসী। এইসব প্রার্থীদের অনেকেই বর্তমান কাউন্সিলর পদে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, গুম, খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থাও অর্ধশতাধিক কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছেন। এসব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে সাধারণ ভোটারদের মাঝে। তবে কোন শঙ্কা ছাড়াই ১৬ জানুয়ারি ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, এই নির্বাচনে সাতজন মেয়র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৪৮ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৩৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া প্রার্থীদের হলফনামা পর্যালোচনা করে জানা যায়, বেশ কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। কোন কোন মামলায় অব্যাহতি পেলেও অনেকের মামলা এখনও চলমান রয়েছে। তবে চলমান মামলায় জামিনে রয়েছেন তারা।

সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডে আবারও প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা ওমর ফারুক। তিনি এবার ঝুড়ি প্রতীকে লড়ছেন। তার বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় তিনটি মামলা থাকলেও তিনি সবগুলোতে অব্যাহতি পেয়েছেন। সর্বশেষ মামলাটি ২০১৭ সালে করা হয়েছিল। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়েছেন সাবেক ইউপি সদস্য আবদুর রহিম। তার প্রতীক ঘুড়ি। এছাড়া এই ওয়ার্ডে লাটিম প্রতীক নিয়ে লড়ছেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুজিবুর রহমানের ছেলে মাহমুদুর রহমান।

মুজিবুর রহমান নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওমানের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত। ওমর ফারুক ছাড়া বাকি দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে বর্তমানে ও আগে কোন মামলা নেই বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। এই ওয়ার্ডে জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে ওমর ফারুকেরই।

বিএনপি দলীয়ভাবে কোন নির্বাচনে অংশ না নিলেও এই নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক তৈমুর আলম খন্দকার। তিনি ছাড়াও তার ভাই মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদও কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা কাউন্সিলর প্রার্থীও রয়েছেন। ২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী ইকবাল হোসেন জেলা বিএনপির সাবেক অর্থবিষয়ক সম্পাদক। তিনি ২০১৬ সালেও কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক ভূঁইয়া রাজু তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। রাজুর প্রতি শামীম ওসমানের সমর্থন রয়েছে বলে জানা গেছে। এই ওয়ার্ডে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ইকবাল হোসেন ও আমিনুল হক আলোচিত সাত খুনের মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন। তবে তারা দু’জনই এই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। আমিনুলের বিরুদ্ধে আরও দুই হত্যা মামলাসহ চারটি মামলা ছিল। বর্তমানে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে করা মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। এই ওয়ার্ডে আরেক প্রার্থী শফিকুল ইসলাম সাত খুনের ঘটনায় নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের শ্যালক। তার বিরুদ্ধেও হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজির আটটি মামলা ছিল। সেগুলোতে খালাসপ্রাপ্ত তিনি।

৩ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহজালাল বাদল। তিনি এবারও প্রার্থী হয়েছে। সাত খুন মামলার দ-প্রাপ্ত আসামি নূর হোসেনের ভাতিজা শাহজালাল বাদল সাংসদ শামীম ওসমানেরও ঘনিষ্ঠজন। অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির অভিযোগে চারটি মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে বাদলের বিরুদ্ধে। এছাড়া আগে আরও আটটি মামলা থেকে খালাস ও অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি। তার সঙ্গে যুবলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের লড়াই হবে। তবে তার বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই।

৪ নম্বর ওয়ার্ডে ত্রিমুখী লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই ওয়ার্ডে লাটিম প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন বর্তমান কাউন্সিলর আরিফুল হক হাসান। জাতীয় শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি আবদুল মতিন মাস্টারের ছেলে আরিফুল সাংসদ শামীম ওসমানের অনুসারী। তিনি এক সময় সাত খুন মামলায় ফাঁসির দ-প্রাপ্ত নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত ছিলেন। আরিফুলের বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদকের দুটি মামলা আছে। উচ্চ আদালতে নির্দেশে সেগুলো স্থগিত আছে।

এই নির্বাচনে ঘুড়ি প্রতীকে দাঁড়িয়েছেন আরিফুলের চাচাতো ভাই নজরুল ইসলাম। তিনি দুই মামলার আসামি। এছাড়া ঠেলাগাড়ি প্রতীকে কাউন্সিলর পদপ্রার্থী সাত খুন মামলায় ফাঁসির দ-প্রাপ্ত নূর হোসেনের ছোট ভাই নুর উদ্দিন মিয়া। নুর উদ্দিনের পক্ষে নূর হোসেনের অনুসারীরা কাজ করছেন। তার বিরুদ্ধে সাতটি মামলা বিচারাধীন। এর আগে দুটি মামলায় খালাসপ্রাপ্ত তিনি।

৫ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর গোলাম মুহাম্মদ সাদরিল বিএনপির সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিনের ছেলে। তিনি এবার লড়ছেন ব্যাডমিন্টন প্রতীকে। হত্যা-বিস্ফোরকসহ ১৭ মামলার আসামি সাদরিল। দুটিতে খালাস পেয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের আনিসুর রহমান আনিসকে সমর্থন দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমান। আনিস ঠেলাগাড়ি প্রতীকে লড়ছেন।

৬ নম্বর ওয়ার্ডে লড়াই হবে শামীম ওসমানের দুই ঘনিষ্ঠজন মতিউর রহমান ও সিরাজুল ইসলাম ম-লের মধ্যে। তাদের মধ্যে বর্তমান কাউন্সিলর মতিউর রহমান ঠেলাগাড়ি ও সাবেক কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম ঝুড়ি প্রতীকে লড়ছেন। দু’জনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ দুই ডজনেরও বেশি মামলা রয়েছে। মতিউরের বিরুদ্ধে ২৩টি মামলার ১৭টিতে খালাস ও ৩টিতে অব্যাহতি পেয়েছেন বর্তমান সরকারের আমলে। একটি স্থগিত আছে। সিরাজুলের পাঁচটি মামলা আছে। মতিউর রহমান সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের সভাপতি ও সিরাজুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি।

৭ নম্বর ওয়ার্ডে ১২ জন প্রার্থী। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কয়েক মাস আগে মারা গেছেন। এই ওয়ার্ডে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছেন মিজানুর রহমান রিপন ও ফজলুল হক জুয়েল। তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা না থাকলেও আরেক প্রার্থী মো. সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে বর্তমানে একটি হত্যা মামলা তদন্তাধীন আছে। দুটি মামলায় তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন।

৮ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর রুহুল আমিন মোল্লা এগিয়ে থাকলেও তার লড়াই হবে শামীম ওসমান ঘনিষ্ঠ মহসিন ভূঁইয়ার সঙ্গে। রুহুলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা রয়েছে। মহসিন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনসহ দুটি মামলায় খালাস পেয়েছেন।

৯ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর ইস্রাফিল প্রধান। বিএনপি থেকে শামীম ওসমানের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন। এবার তিনি করাত প্রতীকে লড়ছেন। ইস্রাফিলের বিরুদ্ধে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের একটি মামলা রয়েছে। তার লড়াই হবে বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি মিষ্টি কুমড়া প্রতীকে লড়ছেন। ১০ নম্বর ওয়ার্ডে লিয়াকত আলী বিস্ফোরকের তিনটিসহ সন্ত্রাস দমন আইনে ৯টি মামলার আসামি।

১১ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি নেতা অহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যা-বিস্ফোরকসহ সাতটি মামলা ছিল, এর মধ্যে ছয়টিতে খালাস পান। ১২ নম্বর ওয়ার্ডে মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত হাশেমের বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরকসহ পাঁচ মামলার বিচার চলছে। এর আগে তিনি সাত মামলায় খালাস পান। শওকত জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি কিসমত হাশেমের ভাই। তার বিপক্ষে সেলিম খানকে সমর্থন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে বিএনপি নেতা হলেও শওকত হাশেম নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ। এক সময় প্রতারণার মামলার আসামি হয়েছিলেন ১৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী দিদার খন্দকার। ওই মামলায় খালাস পেলেও তিনি বর্তমানে বিস্ফোরকসহ পাঁচ মামলার আসামি। মামলাগুলো সাক্ষ্য ও অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে আছে বলে জানা গেছে।

১৭ নম্বর ওয়ার্ডে মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য ও বর্তমান কাউন্সিলর আবদুল করিমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ দুটি মামলা বিচারাধীন। তিনি একটি চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। এর আগে সাতটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তার ওয়ার্ডে শক্ত কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।

১৮ নম্বরে কাউন্সিলর প্রার্থী সাবেক কাউন্সিলর কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে চেক প্রচারণার তিনটি মামলা ছিল। দুটিতে বাদীর সঙ্গে আপসরফা করেছেন, একটিতে খালাস পেয়েছেন। কামরুল হাসান ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ ও মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক। এই ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলর ছিলেন তিনি। এদিকে বর্তমান কাউন্সিলর কবির হোসাইনও প্রার্থী হয়েছেন। তিনি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। বছর দুই আগে একটি মারামারির ঘটনায় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

১৯ নম্বর ওয়ার্ডে লড়াই হবে বর্তমান কাউন্সিলর আওয়ামী লীগের ফয়সাল সাগরের ও নারায়ণগঞ্জ গাউসিয়া কমিটির সভাপতি মোখলেছুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে। মোখলেছুর আজমেরী ওসমানের ভগ্নিপতি পুলিশ কর্মকর্তা ইফতেখায়রুলের আত্মীয়। আওয়ামী লীগের সমর্থন আছে সাগরের পক্ষে।

২০ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর বিএনপির গোলাম নবী মুরাদের সঙ্গে লড়াই হবে বিএনপির আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী মোহাম্মদ শাহেন শাহর সঙ্গে। বিএনপি নেতা শাহেন শাহ সম্প্রতি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। ২১ নম্বর ওয়ার্ডে লড়ছেন বর্তমান কাউন্সিলর বিএনপির হান্নান সরকার। তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরকসহ পাঁচটি মামলা বিচারাধীন। হান্নান মহানগর বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক। তার প্রতিদ্বন্দ্বী শাহিন মিয়া তেমন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নন।

২২, ২৩ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রধান ছয় প্রার্থী ২৫টি মামলার আসামি। এর মধ্যে ২২ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর সুলতান আহমেদসহ ছয়জন প্রতিদ্বন্দ্বী। বিএনপি সমর্থক সুলতানের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক ও চাঁদাবাজিসহ চারটি মামলা বিচারাধীন আছে। বাকি পাঁচ প্রার্থীর তিনজনই সরকারি দলের নেতা। তাদের মধ্যে পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী জহিরুল ইসলাম একটি হত্যা মামলার আসামি। তিনি বর্তমানে জামিনে আছেন। আরেক প্রার্থী বন্দর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ খানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ চারটি মামলা রয়েছে।

২৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন দুলালের বিরুদ্ধে মাদকসহ তিনটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। দুলাল বর্তমান কাউন্সিলর। তিনি একটি মাদক মামলায় গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। তিনি ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ। এই ওয়ার্ডে আরেক প্রার্থী মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাউসারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরকসহ ১১টি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। আবুল কাউসার নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সাংসদ আবুল কালামের ছেলে। ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে মোহাম্মদ খোকন হত্যাসহ দুই মামলার আসামি।

২৫ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর এনায়েত হোসেনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তার বিরুদ্ধে আছেন সাইদুর রহমান লিটন। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর সামসুজ্জোহারই জয়ের সম্ভাবনা বেশি। এখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী আনোয়ার হোসেন বন্দর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রশিদের ভাই।

২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কামরুজ্জামান বাবুল মারা যান প্রায় ১০ মাস আগে। এখানে তার ভাই প্রার্থী হলেও লড়াই হবে সিরাজুল ইসলাম ও আলমগীর মিয়ার মধ্যে। সিরাজুল লড়ছেন লাটিম প্রতীকে অন্যদিকে আলমগীর ঘুড়ি প্রতীকে লড়ছেন।

১, ২, ৩ সংরক্ষিত কাউন্সিলর মাকসুদা মোজাফফর এবং ৪, ৫, ৬ সংরক্ষিত কাউন্সিলর মনোয়ারা বেগম নিজ নিজ ওয়ার্ডে এগিয়ে আছেন। ৭, ৮, ৯ সংরক্ষিত কাউন্সিলর মোসাম্মাৎ আয়শা আক্তার দিনার এবার লড়াই হবে তাসনুভা নওরিন ভূঁইয়ার সঙ্গে। ১০, ১১, ১২ সংরক্ষিত কাউন্সিলর মিনোয়ারা বেগম ও নূপুর বেগমের লড়াই হবে।

১৩, ১৪, ১৫ ওয়ার্ডে সংরক্ষিত কাউন্সিলর শারমীন হাবিব বিন্নী ও পপি রানী সরকারের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। গতবার অল্প ভোটে হেরেছিলেন পপি রানী। এইবার তার ভালো অবস্থান রয়েছে। ১৬, ১৭, ১৮ সংরক্ষিত কাউন্সিলর আফসানা আফরোজ বিভা এগিয়ে আছেন। তবে তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী সানজিদা আহমেদ জুয়েলী। ১৯, ২০, ২১ সংরক্ষিত কাউন্সিলর শিউলি নওশাদ ও মায়ানুর বেগমের লড়াই হবে। ২২, ২৩, ২৪ সংরক্ষিত কাউন্সিলর শাওন অংকন ও শাহনাজ ভূঁইয়ার লড়াই হবে। ২৫, ২৬, ২৭ সংরক্ষিত কাউন্সিলর হোসনে আরা বেগম ও সানিয়া আক্তারের লড়াই হবে।