আগামীতে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত কি বেঁচে থাকবে?

বেকারত্ব, দারিদ্র, অর্থনৈতিক সংকটÑএসব বিপদের থেকেও ভারতে আজকে সবথেকে বড় বিপদ সাম্প্রদায়িকতা। ভারত রাষ্ট্রটি এখনও খাতা কলমে যে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নিয়ে আছে, সেই চরিত্রটি আগামীদিনে এই দেশ বজায় রাখতে পারবে কি নাÑএটাই এখন ভারতের শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের সব থেকে বড়ো জিজ্ঞাসা। ভারত যদি তার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখতে পারে আগামী দিনে, দেশের সংবিধানের খোলনলচে বদলে, ভারতকে রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করবার যে গভীর ষড়যন্ত্র গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির করছে, তা যদি সফল হতে না পারে, সেই ব্যর্থতার গ্লানি থেকে জেগে উঠবে একটা নতুন ভারত। সেই ভারত দারিদ্র্র্য, বেকারিসহ সব অর্থনৈতিক সংকটকে নিজের উদ্যমে, দেশের মানুষের সহযোগিতায় অতিক্রমের পথে হাঁটবে। আর যদি রাজনৈতিক হিন্দু ভারতে পরিণত হয়ে এই দেশটা অন্ধকারের গহীন অতলে ডুবে যায়, তাহলে আগামী দিনে ভারতের জন্যে রয়েছে কেবলই অন্ধকার। সুতীব্র আঁধারে নিমজ্জিত হওয়ার দুঃসহ বেদনা।

নরেন্দ্র মোদির প্রায় আট বছরের শাসনকালে গুড গভর্ন্যান্স বলে কোনো কিছুই ভারতবাসী পায়নি। পেয়েছে কেবলমাত্র সাম্প্রদায়িকতার নিত্যনতুন কৌশলের প্রয়োগ। মোদি সরকারের প্রশাসনিক উদ্যোগের প্রায় সব কটির অন্তরালেই ভীষণভাবে লুকিয়ে থেকেছে সাম্প্রদায়িক অভিপ্রায়। মোদি সরকারের সামনে এখন একমাত্র টার্গেট, তাদের মস্তিষ্ক আর এস এসের আগামী ২০২৫ সালের শতবর্ষ উদ্যাপন। তার আগেই ’২৪ সালে লোকসভার ভোট। তাই যে কোনো উপায়েই ’২৫ সালে একক গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় থাকতে হবে বিজেপিকে। আর সেই লক্ষ্যে তাদের জিততে হবে ’২৪ সালের লোকসভার ভোট। সেই লক্ষ্য পূরণেই এখন ভারত সরকারকে সর্বাত্মকভাবে পরিচালিত করে চলেছে গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির।

২০২৪ সালে বিজেপিকে জিততে গেলে উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতা ধরে রাখাটা জরুরি। হিন্দুত্বের পয়লা নম্বরের দুশমন, কমিউনিস্টরা যাতে কোন অবস্থাতেই ত্রিপুরায় ক্ষমতায় ফিরতে না পারে, সেই দিকটাও দেখা তাদের খুব জরুরি। আপাতত বিজেপির ‘স্বাভাবিক মিত্র’ তৃণমূল কংগ্রেস এবং তাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রিপুরাটাকে যেভাবে সামলে সুমলে দিয়ে বিজেপির জন্যে চাষাবাদ করে দিচ্ছেন, আরএসএস তাই তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির ত্রিপারায় ভবিষ্যৎ ঘিরে খুব একটা চিন্তিত নন। এই কিছুদিন আগে ও ত্রিপুরায় বিজেপিকে সামলাতে সেখানকার সিপিআই (এম) তৃণমূল কংগ্রেস ঘিরে ঠিক নরম নয়, আবার গরম ও ছিল না। বরংচ তাদের শীর্ষস্তরের রাজ্য নেতারা পশ্চিমবঙ্গের সতীর্থদের ‘অন্ধ’ তৃণমূল বিরোধিতা ঘিরে একটু নাক সিঁটকিয়েই চলছিলেন। মারাত্মক বিজেপিকে রুখতে তৃণমূল- এমন খানিকটা মানসিকতা থাকলেও, সঙ্ঘ-বিজেপির হয়ে জমিচাষ, অর্থাৎ; বিভাজনের রাজনীতিকে খাদের কিনারায় নিয়ে যেতে তৃণমূলের যে কি অবদান, সে সম্পর্কে ত্রিপুরার শীর্ষস্তরের বামপন্থিদের অজ্ঞতা দেখে তখন শিউরে উঠতাম।

সেই অজ্ঞতার জবাব সেখানকার পৌর নির্বাচনে বামপন্থিরা পেয়েছেন। বিজেপিকে জেতাতে সঙ্ঘের নির্দেশে ত্রিপুরাতে কিভাবে হিন্দুত্ববাদীদের আড়কাঠি হয়ে মমতা এবং তার দল কাজ করেছে, সেই উপলব্ধিতে গত ১১ জানুয়ারি ত্রিপুরাতে এক জনসভায় মানিক সরকার বলেছেন; বিজেপির ছোটভাই ছিল তৃণমূল।

বিজেপি আর তৃণমূলের উপরে কুস্তি, ভেতরে দোস্তি ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের সিপিআই (এম) নেতাদের কথা, লড়াইকে একটা সময় পর্যন্ত ত্রিপুরার সিপিআই (এম) নেতারা কার্যত ব্যঙ্গ করতেন। পশ্চিমবঙ্গে গত ’২১ সালের ভোটে তৃণমূল জেতাতে সেখানকার একাধিক শীর্ষস্তরের নেতা ব্যক্তিগতস্তরে স্বস্তিই প্রকাশ করেছেন। তাদের কণ্ঠে বামপন্থিদের আসন শূন্য হওয়া নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা ছিল না।

তৃণমূল রুখতে পারে বিজেপিকে, সংকীর্ণতাবাদীদের এই তত্ত্বকে খানিকটা স্বীকৃতি দেয়ার ফলশ্রুতি ত্রিপুরায় বামেরা পেয়েছে সেখানকার পৌর ভোটে। তারপর তাদের তৃণমূল আর বিজেপির অদৃশ্য সম্পর্ক ঘিরে বোধদয় কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক বলতে হয়।

কিন্তু উত্তরপ্রদেশে সদ্য বিজেপি ত্যাগী স্বামী প্রসাদ মৌর্য, অখিলেশ যাদবের হাত ধরা আর যে রাজ্যে যেদল শক্তিশালী, সেই রাজ্যে সেই দলের সঙ্গের আসন সমঝোতা করার ক্ষেত্রে সিপিআইয়ের (এম) কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ছাড়পত্র প্রদান- আর এস এসের সাম্প্রদায়িক অভিযানকে রোখার ক্ষেত্রে কতোটা সহায়ক হবে, তা নিয়ে সন্দেহ এবং সংশয় থেকেই যায়। কমিউনিস্ট পার্টির কাছে সমাজবদলের জন্যে লড়াই, না ভোটে জেতা- কোনটা বেশি আবশ্যক, হয়তো ভারতীয় কমিউনিস্টদের কাছে তা পরিষ্কার নয় এখন ও। তাই বাবরি মসজিদের তালা খুলে দিয়ে যে কংগ্রেস সমস্যাটাকে আরও জটিল করে তুলেছিল, পশ্চিমবঙ্গে তাদের হাত ধরে ও উত্তরপ্রদেশে তার হাত ধরছে না সিপিআই (এম)। আর যে সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবের প্রশাসনিক অপদার্থতা, নাকি ইচ্ছাকৃত শৈত্য, কোনটা ঠিক এখন ও বোঝা না গেলেও, বাস্তব হলো, তার মুখ্যমন্ত্রিত্বের কালের মুজফফরনগর দাঙ্গা, যেটি কার্যত মুসলমানবিরোধী গণহত্যাই ছিল, তার জেরেই নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি একক গরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতা দখল করে, সেই দলের হাত সিপিআই (এম) ধরলে আরএসএস- বিজেপির সাম্প্রদায়িক অভিযানকে কতখানি আটকানো যাবেÑতা নিয়ে ঘোরতর সংশয় রয়েছে।

মুলায়ম সিং যাদব, ভি পি সিং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে পরের সময়ে যে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন, তা কতখানি আন্তরিক ছিল, আর কতখানি ভোটের দিকে তাকিয়ে ছিলÑতা নিয়ে এখন রীতিমতো সংশয় তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে একই সোফায় যেভাবে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগফত এবং মুলায়ম সিং যাদবের ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে সঙ্ঘের সঙ্গে মূলায়মের সমীকরণ ঘিরে ও অনেক জল্পনা কল্পনা চলছে। সিপিআই (এম) যখন আজ দাদরির শেখ আখলাখের পরিবারের ওপর অখিলেশ যাদবের পুলিশের হেনস্তার কথা ভুলে গিয়ে তাদের সঙ্গে ভোট সমঝতার কথা ভাবছে, তখন মনে হচ্ছে, সত্যিই সঙ্ঘের শতবর্ষকে সামনে রেখে বিজেপির ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বদলে দেয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

আরএসএস-বিজেপির সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী আগ্রাসন রুখতে যে সামাজিক প্রক্রিয়ার দরকার ছিল, সেই পথে ভারতের কোনো অবিজেপি রাজনৈতিক দল ই ’৪৭ সালের পরে হাঁটেনি। জাতীয় আন্দোলনের সময়কালে সামাজিক প্রক্রিয়ার একটা প্রবণতা ছিল জাতীয় কংগ্রেসের ভেতরে। কমিউনিস্টদের ভেতরেও ছিল। এখন সেই প্রক্রিয়াটা লুপ্তপ্রায়। অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের মতো যেসব কর্মসূচি গান্ধীজী নিয়েছিলেন, সেগুলোর একটি ও আন্তরিকভাবে পরবর্তী সময়ে সময়ে কংগ্রেস এগিয়ে নিয়ে যায়নি। ’৪৩-এর মন্বন্তর থেকে ’৪৬-এর দাঙ্গা- সামাজিক ক্ষেত্রে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল কমিউনিস্টরা, পরবর্তীকালে আর সেভাবে তাদের দেখা যায়নি।

হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তিকে রুখতে হিন্দু- মুসলমানের সামাজিক মেলামেশার দিগন্তকে আরও অনেক বেশি প্রসারিত করবার যে প্রয়োজন ছিল, আরএসএস বৃত্তের বাইরে ভারতের একটি রাজনৈতিক দলই তা করেনি। ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির সম্যক চর্চার ভেতর দিয়ে সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির নটে গাছ টিকে পর্যন্ত সমূলে উৎপাটিত করতে পারা যেত। সেই কাজে কোন রাজনৈতিক দলই আত্মনিয়োগ করেনি। ভোট রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় আটকে থেকেছে রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে যেমন মুসলমান সমাজের হাড়ে সর্বনাশ রাজীব গান্ধী করেছিলেন শাহবানু মামলার প্রেক্ষিতে, ‘মুসলিম নারী অধিকার রক্ষা বিল’ এনে, তেমন ভাবেই সাম্প্রদায়িকতাকে নয়, সমর্থক বিজেপিকে রুখতে পিছিয়ে পড়া মানুষদের আর্থিক স্বাবলম্বনের এতটুকু ব্যবস্থা না করেই ম-ল কমিশনের সুপারিশ কার্যকরী করে আরএসএস-বিজেপিকে অযোধ্যা নিয়ে আরও তেড়েফুঁড়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিলেন বিশ্বনাথপ্রতাপ সিং।

মুলায়ম বা অখিলেশ কি প্রকৃত ই ধর্মনিরপেক্ষ? তারা যে যে পর্যায়ে উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময়কালে সেখানকার মুসলমানদের ভেতরে আধুনিক শিক্ষার হারে কোনো রকম ফের ঘটেছে? মুসলমান মেয়েরা কি ওই সময়কালে সরকারের উৎসাহ- সহযোগিতার দরুণ আরও বেশি করে আধুনিক স্কুল- কলেজমুখো হয়েছে? প্রযুক্তিগত শিক্ষার দিকে ঝুঁকেছে? সন্তানের জন্মের ক্ষেত্রে প্রাগৈতিহাসিক ধ্যানধারণার বাইরে এসে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় এসেছে? মুসলমান মেয়েদের ভেতরে ফাল্য বিবাহের একটু হলেও কমেছে? প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর মুসলমান পরিবারগুলোর ভেতরে পালস পোলিও টিকাকরণ ঘিরে মুলায়ম- অখিলেশের সরকারের সাফল্য কি এতটুকু আছে? অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালের বদলে পানিপড়া, তেলপড়া সন্তানদের ব্যবহারের রেওয়াজ প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুসলমান পরিবারগুলোর ভেতরে এতটুকু কমেছে?

আর যদি মুসলমানদের অর্থনৈতিক জীবন ঘিরে প্রশ্ন তোলা হয়? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে মুলায়ম, অখিলেশের সঙ্গে আশ্চর্যজনক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। খানিকটা মমতার ‘গুরু’ সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়েরও। মুলায়ম, সিদ্ধার্থশঙ্কর, মমতা, অখিলেশ এমন কি লালুপ্রসাদ যাদব- এঁরা সবাই মুসলমানোকো মসিহাঁ সাজতে চেয়েছেন মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন, কর্মসংস্থানের প্রশ্নটিকে শিকেয় তুলে রেখে। সিদ্ধার্থশঙ্কর তার মুখ্যমন্ত্রিত্বকালে নিজেকে সংখ্যালঘু মুসলমানদের বন্ধু সাজতে রেড রোডে ঈদের নামাজে অংশ নিয়েছেন ফেজ টুপি মাথায় দিয়ে। কিন্তু মুসলমানদের ভেতরে বিজ্ঞানমুখী আধুনিক শিক্ষার প্রসারে তার ভূমিকা কি? কটা মুসলমানকে তিনি সরকারি চাকরির নিয়োগকর্তার হিন্দু সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, ভ্রুকুটিকে অস্বীকার করে চাকরি দিতে পেরেছিলেন? উত্তরপ্রদেশের আখ চাষ থেকে কার্পেট, বেনারসী শাড়ি- এইসব শিল্পগুলোর সঙ্গে যে হাজার হাজার নিম্নবিত্তের মুসলমানের পেটের ভাত জড়িয়ে আছে, তাদের ক্ষুধার অন্নের নিশ্চয়তায় মুলায়মের ভূমিকা কি? মুসলমান জনঘনত্ব যে জায়গাগুলোতে তার রাজ্যে বেশি, সেই এলাকার মুসলমান সহনাগরিকেরা যাতে পেটের ভাতের জন্য অন্যত্র কাজের তাগিদে চলে যেতে বাধ্য না হন- সেই শিলৃপ সম্ভাবনা তৈরিতে মুলায়ম থেকে অখিলেশ বা মমতার ভূমিকা কি? ফৈজাবাদের গরিব মুসলমানসহ নাগরিক আর মুর্শিদাবিদ- মালদহ জেলার গরিব, প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া মুসলমান সহনাগরিক- এদের বেশিরভাগই রোজগারের জন্য হয় মিডিল ইস্টে, নয়তো দক্ষিণ ভারতে বা গুজরাটের হীরা শিল্প, জড়ি শিল্পে কেন চলে যেতে বাধ্য হন?

শুধু মুখের কথায় মুসলমান সমাজের নিরাপত্তা দেয়া যায় না। তার জন্যে দরকার তাদের আর্থিক নিরাপত্তা। উত্তর প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করে সমাজবাদী পার্টি মুসলমানদের কর্মসংস্থানের জন্যে কি করেছে? সংসদে প্রথম বক্তৃতায় আখ চাষীদের জন্য রাহুল গান্ধীর চোখের জল বাঁধ মানেনি বাজপেয়ী জামানাতে। ড. মনমোহন সিং ক্ষমতায় থাকাকালীন সেই আখ চাষি, যাদের একটা বড় অংশ জন্মসূত্রে মুসলমান, তাদের জন্যে দুই দফার ইউপি এ সরকার কি করেছে?

ভারতের সব রাজনৈতিক দলই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে চিরদিনই তত্ত্বের কচকচানি করেই গিয়েছেন। সাম্প্রদায়িক শিবির তাদের মতাদর্শের দিক থেকেই ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী নয়। তাই ধর্মনিরপেক্ষতা বাঁচলো কি মরলোÑতা নিয়ে কোন সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তিরই এতটুকু মাথাব্যথা নেই। কিন্তু অবিজেপি বুর্জোয়া রাজনীতিকেরা? বামপন্থীরা? শুখনো কথায় কি ধর্মনিরপেক্ষতার চিঁড়ে ভিজবে? সংখ্যালঘুর স্বার্থ সুরক্ষিত করে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে টিকিয়ে রাখতে দরকার সংখ্যালঘুর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন। সংখ্যালঘু মুসলমানকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ভারতের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলো আজ পর্যন্ত কি ভূমিকা রেখেছে? বামপন্থিরা দলিত প্রশ্নে কাগজে-কলমে অত্যন্ত যতœবান। কিন্তু সংখ্যালঘুদের প্রশ্নে? মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বাবলম্বন, কর্মসংস্থানের প্রশ্নে? তখনই বামপন্থিদের কাছে বড়ো হয়ে ওঠে শ্রেণীর প্রশ্ন। শ্রেণী দৃষ্টিকোনের বাইরে তারা মুসলমানদের দেখতে কখনোই রাজি নন। অথচ দলিত, তপসিলি জাতি- উপজাতিদের প্রশ্নে যখন তাদের দলের নেতারা সোচ্ছার হন, তখন কি তাদের নেতৃত্বের কাছে শুনতে হয়; তুমি এত এসসিএস টি আর দলিত করো না।

যেমনটা শোনা প্রায় অভ্যাস হয়ে গিয়েছে; আমাদের তো কেবল ‘মুসলমান’ করলে চলবে না। সবটাই ‘ক্লাস’ অ্যাঙ্গেলে দেখতে হবে!

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

শনিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২২ , ০১ মাঘ ১৪২৮ ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

আগামীতে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত কি বেঁচে থাকবে?

গৌতম রায়

বেকারত্ব, দারিদ্র, অর্থনৈতিক সংকটÑএসব বিপদের থেকেও ভারতে আজকে সবথেকে বড় বিপদ সাম্প্রদায়িকতা। ভারত রাষ্ট্রটি এখনও খাতা কলমে যে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নিয়ে আছে, সেই চরিত্রটি আগামীদিনে এই দেশ বজায় রাখতে পারবে কি নাÑএটাই এখন ভারতের শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের সব থেকে বড়ো জিজ্ঞাসা। ভারত যদি তার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখতে পারে আগামী দিনে, দেশের সংবিধানের খোলনলচে বদলে, ভারতকে রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করবার যে গভীর ষড়যন্ত্র গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির করছে, তা যদি সফল হতে না পারে, সেই ব্যর্থতার গ্লানি থেকে জেগে উঠবে একটা নতুন ভারত। সেই ভারত দারিদ্র্র্য, বেকারিসহ সব অর্থনৈতিক সংকটকে নিজের উদ্যমে, দেশের মানুষের সহযোগিতায় অতিক্রমের পথে হাঁটবে। আর যদি রাজনৈতিক হিন্দু ভারতে পরিণত হয়ে এই দেশটা অন্ধকারের গহীন অতলে ডুবে যায়, তাহলে আগামী দিনে ভারতের জন্যে রয়েছে কেবলই অন্ধকার। সুতীব্র আঁধারে নিমজ্জিত হওয়ার দুঃসহ বেদনা।

নরেন্দ্র মোদির প্রায় আট বছরের শাসনকালে গুড গভর্ন্যান্স বলে কোনো কিছুই ভারতবাসী পায়নি। পেয়েছে কেবলমাত্র সাম্প্রদায়িকতার নিত্যনতুন কৌশলের প্রয়োগ। মোদি সরকারের প্রশাসনিক উদ্যোগের প্রায় সব কটির অন্তরালেই ভীষণভাবে লুকিয়ে থেকেছে সাম্প্রদায়িক অভিপ্রায়। মোদি সরকারের সামনে এখন একমাত্র টার্গেট, তাদের মস্তিষ্ক আর এস এসের আগামী ২০২৫ সালের শতবর্ষ উদ্যাপন। তার আগেই ’২৪ সালে লোকসভার ভোট। তাই যে কোনো উপায়েই ’২৫ সালে একক গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় থাকতে হবে বিজেপিকে। আর সেই লক্ষ্যে তাদের জিততে হবে ’২৪ সালের লোকসভার ভোট। সেই লক্ষ্য পূরণেই এখন ভারত সরকারকে সর্বাত্মকভাবে পরিচালিত করে চলেছে গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির।

২০২৪ সালে বিজেপিকে জিততে গেলে উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতা ধরে রাখাটা জরুরি। হিন্দুত্বের পয়লা নম্বরের দুশমন, কমিউনিস্টরা যাতে কোন অবস্থাতেই ত্রিপুরায় ক্ষমতায় ফিরতে না পারে, সেই দিকটাও দেখা তাদের খুব জরুরি। আপাতত বিজেপির ‘স্বাভাবিক মিত্র’ তৃণমূল কংগ্রেস এবং তাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রিপুরাটাকে যেভাবে সামলে সুমলে দিয়ে বিজেপির জন্যে চাষাবাদ করে দিচ্ছেন, আরএসএস তাই তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির ত্রিপারায় ভবিষ্যৎ ঘিরে খুব একটা চিন্তিত নন। এই কিছুদিন আগে ও ত্রিপুরায় বিজেপিকে সামলাতে সেখানকার সিপিআই (এম) তৃণমূল কংগ্রেস ঘিরে ঠিক নরম নয়, আবার গরম ও ছিল না। বরংচ তাদের শীর্ষস্তরের রাজ্য নেতারা পশ্চিমবঙ্গের সতীর্থদের ‘অন্ধ’ তৃণমূল বিরোধিতা ঘিরে একটু নাক সিঁটকিয়েই চলছিলেন। মারাত্মক বিজেপিকে রুখতে তৃণমূল- এমন খানিকটা মানসিকতা থাকলেও, সঙ্ঘ-বিজেপির হয়ে জমিচাষ, অর্থাৎ; বিভাজনের রাজনীতিকে খাদের কিনারায় নিয়ে যেতে তৃণমূলের যে কি অবদান, সে সম্পর্কে ত্রিপুরার শীর্ষস্তরের বামপন্থিদের অজ্ঞতা দেখে তখন শিউরে উঠতাম।

সেই অজ্ঞতার জবাব সেখানকার পৌর নির্বাচনে বামপন্থিরা পেয়েছেন। বিজেপিকে জেতাতে সঙ্ঘের নির্দেশে ত্রিপুরাতে কিভাবে হিন্দুত্ববাদীদের আড়কাঠি হয়ে মমতা এবং তার দল কাজ করেছে, সেই উপলব্ধিতে গত ১১ জানুয়ারি ত্রিপুরাতে এক জনসভায় মানিক সরকার বলেছেন; বিজেপির ছোটভাই ছিল তৃণমূল।

বিজেপি আর তৃণমূলের উপরে কুস্তি, ভেতরে দোস্তি ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের সিপিআই (এম) নেতাদের কথা, লড়াইকে একটা সময় পর্যন্ত ত্রিপুরার সিপিআই (এম) নেতারা কার্যত ব্যঙ্গ করতেন। পশ্চিমবঙ্গে গত ’২১ সালের ভোটে তৃণমূল জেতাতে সেখানকার একাধিক শীর্ষস্তরের নেতা ব্যক্তিগতস্তরে স্বস্তিই প্রকাশ করেছেন। তাদের কণ্ঠে বামপন্থিদের আসন শূন্য হওয়া নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা ছিল না।

তৃণমূল রুখতে পারে বিজেপিকে, সংকীর্ণতাবাদীদের এই তত্ত্বকে খানিকটা স্বীকৃতি দেয়ার ফলশ্রুতি ত্রিপুরায় বামেরা পেয়েছে সেখানকার পৌর ভোটে। তারপর তাদের তৃণমূল আর বিজেপির অদৃশ্য সম্পর্ক ঘিরে বোধদয় কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক বলতে হয়।

কিন্তু উত্তরপ্রদেশে সদ্য বিজেপি ত্যাগী স্বামী প্রসাদ মৌর্য, অখিলেশ যাদবের হাত ধরা আর যে রাজ্যে যেদল শক্তিশালী, সেই রাজ্যে সেই দলের সঙ্গের আসন সমঝোতা করার ক্ষেত্রে সিপিআইয়ের (এম) কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ছাড়পত্র প্রদান- আর এস এসের সাম্প্রদায়িক অভিযানকে রোখার ক্ষেত্রে কতোটা সহায়ক হবে, তা নিয়ে সন্দেহ এবং সংশয় থেকেই যায়। কমিউনিস্ট পার্টির কাছে সমাজবদলের জন্যে লড়াই, না ভোটে জেতা- কোনটা বেশি আবশ্যক, হয়তো ভারতীয় কমিউনিস্টদের কাছে তা পরিষ্কার নয় এখন ও। তাই বাবরি মসজিদের তালা খুলে দিয়ে যে কংগ্রেস সমস্যাটাকে আরও জটিল করে তুলেছিল, পশ্চিমবঙ্গে তাদের হাত ধরে ও উত্তরপ্রদেশে তার হাত ধরছে না সিপিআই (এম)। আর যে সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবের প্রশাসনিক অপদার্থতা, নাকি ইচ্ছাকৃত শৈত্য, কোনটা ঠিক এখন ও বোঝা না গেলেও, বাস্তব হলো, তার মুখ্যমন্ত্রিত্বের কালের মুজফফরনগর দাঙ্গা, যেটি কার্যত মুসলমানবিরোধী গণহত্যাই ছিল, তার জেরেই নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি একক গরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতা দখল করে, সেই দলের হাত সিপিআই (এম) ধরলে আরএসএস- বিজেপির সাম্প্রদায়িক অভিযানকে কতখানি আটকানো যাবেÑতা নিয়ে ঘোরতর সংশয় রয়েছে।

মুলায়ম সিং যাদব, ভি পি সিং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে পরের সময়ে যে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন, তা কতখানি আন্তরিক ছিল, আর কতখানি ভোটের দিকে তাকিয়ে ছিলÑতা নিয়ে এখন রীতিমতো সংশয় তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে একই সোফায় যেভাবে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগফত এবং মুলায়ম সিং যাদবের ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে সঙ্ঘের সঙ্গে মূলায়মের সমীকরণ ঘিরে ও অনেক জল্পনা কল্পনা চলছে। সিপিআই (এম) যখন আজ দাদরির শেখ আখলাখের পরিবারের ওপর অখিলেশ যাদবের পুলিশের হেনস্তার কথা ভুলে গিয়ে তাদের সঙ্গে ভোট সমঝতার কথা ভাবছে, তখন মনে হচ্ছে, সত্যিই সঙ্ঘের শতবর্ষকে সামনে রেখে বিজেপির ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বদলে দেয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

আরএসএস-বিজেপির সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী আগ্রাসন রুখতে যে সামাজিক প্রক্রিয়ার দরকার ছিল, সেই পথে ভারতের কোনো অবিজেপি রাজনৈতিক দল ই ’৪৭ সালের পরে হাঁটেনি। জাতীয় আন্দোলনের সময়কালে সামাজিক প্রক্রিয়ার একটা প্রবণতা ছিল জাতীয় কংগ্রেসের ভেতরে। কমিউনিস্টদের ভেতরেও ছিল। এখন সেই প্রক্রিয়াটা লুপ্তপ্রায়। অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের মতো যেসব কর্মসূচি গান্ধীজী নিয়েছিলেন, সেগুলোর একটি ও আন্তরিকভাবে পরবর্তী সময়ে সময়ে কংগ্রেস এগিয়ে নিয়ে যায়নি। ’৪৩-এর মন্বন্তর থেকে ’৪৬-এর দাঙ্গা- সামাজিক ক্ষেত্রে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল কমিউনিস্টরা, পরবর্তীকালে আর সেভাবে তাদের দেখা যায়নি।

হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তিকে রুখতে হিন্দু- মুসলমানের সামাজিক মেলামেশার দিগন্তকে আরও অনেক বেশি প্রসারিত করবার যে প্রয়োজন ছিল, আরএসএস বৃত্তের বাইরে ভারতের একটি রাজনৈতিক দলই তা করেনি। ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির সম্যক চর্চার ভেতর দিয়ে সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির নটে গাছ টিকে পর্যন্ত সমূলে উৎপাটিত করতে পারা যেত। সেই কাজে কোন রাজনৈতিক দলই আত্মনিয়োগ করেনি। ভোট রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় আটকে থেকেছে রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে যেমন মুসলমান সমাজের হাড়ে সর্বনাশ রাজীব গান্ধী করেছিলেন শাহবানু মামলার প্রেক্ষিতে, ‘মুসলিম নারী অধিকার রক্ষা বিল’ এনে, তেমন ভাবেই সাম্প্রদায়িকতাকে নয়, সমর্থক বিজেপিকে রুখতে পিছিয়ে পড়া মানুষদের আর্থিক স্বাবলম্বনের এতটুকু ব্যবস্থা না করেই ম-ল কমিশনের সুপারিশ কার্যকরী করে আরএসএস-বিজেপিকে অযোধ্যা নিয়ে আরও তেড়েফুঁড়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিলেন বিশ্বনাথপ্রতাপ সিং।

মুলায়ম বা অখিলেশ কি প্রকৃত ই ধর্মনিরপেক্ষ? তারা যে যে পর্যায়ে উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময়কালে সেখানকার মুসলমানদের ভেতরে আধুনিক শিক্ষার হারে কোনো রকম ফের ঘটেছে? মুসলমান মেয়েরা কি ওই সময়কালে সরকারের উৎসাহ- সহযোগিতার দরুণ আরও বেশি করে আধুনিক স্কুল- কলেজমুখো হয়েছে? প্রযুক্তিগত শিক্ষার দিকে ঝুঁকেছে? সন্তানের জন্মের ক্ষেত্রে প্রাগৈতিহাসিক ধ্যানধারণার বাইরে এসে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় এসেছে? মুসলমান মেয়েদের ভেতরে ফাল্য বিবাহের একটু হলেও কমেছে? প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর মুসলমান পরিবারগুলোর ভেতরে পালস পোলিও টিকাকরণ ঘিরে মুলায়ম- অখিলেশের সরকারের সাফল্য কি এতটুকু আছে? অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালের বদলে পানিপড়া, তেলপড়া সন্তানদের ব্যবহারের রেওয়াজ প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুসলমান পরিবারগুলোর ভেতরে এতটুকু কমেছে?

আর যদি মুসলমানদের অর্থনৈতিক জীবন ঘিরে প্রশ্ন তোলা হয়? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে মুলায়ম, অখিলেশের সঙ্গে আশ্চর্যজনক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। খানিকটা মমতার ‘গুরু’ সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়েরও। মুলায়ম, সিদ্ধার্থশঙ্কর, মমতা, অখিলেশ এমন কি লালুপ্রসাদ যাদব- এঁরা সবাই মুসলমানোকো মসিহাঁ সাজতে চেয়েছেন মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন, কর্মসংস্থানের প্রশ্নটিকে শিকেয় তুলে রেখে। সিদ্ধার্থশঙ্কর তার মুখ্যমন্ত্রিত্বকালে নিজেকে সংখ্যালঘু মুসলমানদের বন্ধু সাজতে রেড রোডে ঈদের নামাজে অংশ নিয়েছেন ফেজ টুপি মাথায় দিয়ে। কিন্তু মুসলমানদের ভেতরে বিজ্ঞানমুখী আধুনিক শিক্ষার প্রসারে তার ভূমিকা কি? কটা মুসলমানকে তিনি সরকারি চাকরির নিয়োগকর্তার হিন্দু সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, ভ্রুকুটিকে অস্বীকার করে চাকরি দিতে পেরেছিলেন? উত্তরপ্রদেশের আখ চাষ থেকে কার্পেট, বেনারসী শাড়ি- এইসব শিল্পগুলোর সঙ্গে যে হাজার হাজার নিম্নবিত্তের মুসলমানের পেটের ভাত জড়িয়ে আছে, তাদের ক্ষুধার অন্নের নিশ্চয়তায় মুলায়মের ভূমিকা কি? মুসলমান জনঘনত্ব যে জায়গাগুলোতে তার রাজ্যে বেশি, সেই এলাকার মুসলমান সহনাগরিকেরা যাতে পেটের ভাতের জন্য অন্যত্র কাজের তাগিদে চলে যেতে বাধ্য না হন- সেই শিলৃপ সম্ভাবনা তৈরিতে মুলায়ম থেকে অখিলেশ বা মমতার ভূমিকা কি? ফৈজাবাদের গরিব মুসলমানসহ নাগরিক আর মুর্শিদাবিদ- মালদহ জেলার গরিব, প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া মুসলমান সহনাগরিক- এদের বেশিরভাগই রোজগারের জন্য হয় মিডিল ইস্টে, নয়তো দক্ষিণ ভারতে বা গুজরাটের হীরা শিল্প, জড়ি শিল্পে কেন চলে যেতে বাধ্য হন?

শুধু মুখের কথায় মুসলমান সমাজের নিরাপত্তা দেয়া যায় না। তার জন্যে দরকার তাদের আর্থিক নিরাপত্তা। উত্তর প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করে সমাজবাদী পার্টি মুসলমানদের কর্মসংস্থানের জন্যে কি করেছে? সংসদে প্রথম বক্তৃতায় আখ চাষীদের জন্য রাহুল গান্ধীর চোখের জল বাঁধ মানেনি বাজপেয়ী জামানাতে। ড. মনমোহন সিং ক্ষমতায় থাকাকালীন সেই আখ চাষি, যাদের একটা বড় অংশ জন্মসূত্রে মুসলমান, তাদের জন্যে দুই দফার ইউপি এ সরকার কি করেছে?

ভারতের সব রাজনৈতিক দলই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে চিরদিনই তত্ত্বের কচকচানি করেই গিয়েছেন। সাম্প্রদায়িক শিবির তাদের মতাদর্শের দিক থেকেই ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী নয়। তাই ধর্মনিরপেক্ষতা বাঁচলো কি মরলোÑতা নিয়ে কোন সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তিরই এতটুকু মাথাব্যথা নেই। কিন্তু অবিজেপি বুর্জোয়া রাজনীতিকেরা? বামপন্থীরা? শুখনো কথায় কি ধর্মনিরপেক্ষতার চিঁড়ে ভিজবে? সংখ্যালঘুর স্বার্থ সুরক্ষিত করে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে টিকিয়ে রাখতে দরকার সংখ্যালঘুর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন। সংখ্যালঘু মুসলমানকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ভারতের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলো আজ পর্যন্ত কি ভূমিকা রেখেছে? বামপন্থিরা দলিত প্রশ্নে কাগজে-কলমে অত্যন্ত যতœবান। কিন্তু সংখ্যালঘুদের প্রশ্নে? মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বাবলম্বন, কর্মসংস্থানের প্রশ্নে? তখনই বামপন্থিদের কাছে বড়ো হয়ে ওঠে শ্রেণীর প্রশ্ন। শ্রেণী দৃষ্টিকোনের বাইরে তারা মুসলমানদের দেখতে কখনোই রাজি নন। অথচ দলিত, তপসিলি জাতি- উপজাতিদের প্রশ্নে যখন তাদের দলের নেতারা সোচ্ছার হন, তখন কি তাদের নেতৃত্বের কাছে শুনতে হয়; তুমি এত এসসিএস টি আর দলিত করো না।

যেমনটা শোনা প্রায় অভ্যাস হয়ে গিয়েছে; আমাদের তো কেবল ‘মুসলমান’ করলে চলবে না। সবটাই ‘ক্লাস’ অ্যাঙ্গেলে দেখতে হবে!

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]