কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য

দেশ খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা লাভ করেছে গত প্রায় এক দশক আগেই। অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে খাদ্যের উৎপাদন বেশি হচ্ছে। তবে কৃষকের দুর্দশা কমছে না। কৃষির উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল পাচ্ছেন না। পরিবহন, কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি বা শ্রমিক সংকট, সার সংকট থেকে শুরু করে যাবতীয় খরচ বেড়েই চলছে। মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অভিযোগ, এক মণ ধানের উৎপাদন খরচ পড়ছে ১২ থেকে সাড়ে ১২০০ টাকা, আর বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ৮ থেকে ৯০০ টাকায়।

কৃষক ফসল্যের ন্যায্য মূল না পেলেও ভোক্তদের বেশি দাম খাদ্য ক্রয় করতে হচ্ছে। মাঝখানে সুবিধা নিচ্ছে মিল মালিক তথা বাজার সিন্ডিকেটকারীরা। সরকার কৃষিতে প্রতি বছর মোটা অঙ্কের টাকা ভতুর্কি দিলেও কৃষক এর সুবিধা পাচ্ছে না। উল্লেখ্য, ভতুর্কির সিংহভাগই দেয়া হচ্ছে কৃষি আধুনিকরণে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে দানাদার ফসলের উৎপাদন সাড়ে ৪ কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ৪ কোটি ৭০ লাখ টন প্রায়। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ধান, গম ও ভুট্টাসহ দানাদার ফসলের উৎপাদন ছিল চার কোটি ৫৫ লাখ টন। এছাড়া কন্দাল ফসলের (আলু, শাকসবজি, পাট ইত্যাদি) উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৯৭ লাখ টনের বেশি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই০ সূত্রে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে চালের উৎপাদন বেশি হচ্ছে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে চালের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন, গম ১২ লাখ এবং ভুট্টা ৫৭ লাখ টন। অপরদিকে শাকসবজি, মসলা, তেল জাতীয় পণ্যের উৎপাদনও বাড়ছে। গত অর্থবছরে আলুর উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৬ লাখ টন, শাকসবজি ১ কোটি ৯৭ লাখ টন, তেল জাতীয় ফসল ১২ লাখ টন ও ডাল ৯ লাখ টন। এছাড়া ডাল ১১ লাখ ২০ হাজার, তেলবীজ সাড়ে ১০ লাখ টন, পেঁয়াজ ২৩ লাখ, রসুন ৬ লাখ, ধনিয়া ৭ হাজার, আড়া ২ লাখ ৫০ হাজার ও হলুদ ১ লাখ ৫০ হাজার টন উৎপাদন হয়। মোট মসলা জাতীয় পণ্যে উৎপাদন ছিল ৩৫ লাখ টন। অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে চালের উৎপাদন বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) থেকে জানা যায়, মাথাপিছু বার্ষিক চালের (দানাদার) চাহিদা ১৫২ কেজি। এতে করে ১৬ কোটি ৬৪ লাখ জনসংখ্যার জন্য বার্ষিক চাহিদা ২ কোটি ৫৩ লাখ টন। যদি জনসংখ্যা ১৭ কোটি হয়, তাহলে বার্ষিক চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি টন। অর্থাৎ বর্তমানে চাহিদার চেয়ে খাদ্যের উৎপাদন বেশি। সূত্র : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে এ খাতে স্থির মূল্যে জিডিপির অবদান গত অর্থবছরে ছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। বিবিএসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশে খানা পরিবারের সংখ্যা ২ কোটি ৮৬ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬৩টি। কৃষি পরিবার ১ কোটি ৫১ লাখ ৮৩ হাজার ১৮৩টি। মোট ফসলি জমির পরিমাণ ১ কোটি ৫৪ লাখ ৩৮ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৮৫ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর। সেচের আওতায় ৭৪ লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর, পতিত ২ লাখ ২৩ হাজার, এক ফসলি জমি ২২ লাখ ৫৩ হাজার, ২ ফসলি জমি ৩৯ লাখ ১৪ হাজার ও ৩ ফসলি জমির পরিমাণ ১৭ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর (সূত্র : বিবিএস)।

কৃষিতে সরকার মোটা অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ভর্তুকি রাখা হয়েছে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা, এর আগের অর্থবছরেও সমপরিমাণ ভতুর্কি রাখা হয়েছিল। জ্বালানি ও সারে বেশিরভাগ ভর্তুকি যাচ্ছে। বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ইউরিয়া সারের চাহিদা ২৮ লাখ টনের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টন তারা উৎপাদন করতে পারছে, বাকিটা আমদানি করতে হচ্ছে। বেশি দামে সার আমদানি করে কম দামে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। প্রতি কেজি ইউরিয়া কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করা হচ্ছে ১৪ টাকা কেজি।

এদিকে কৃষিতে জিডিপির অবদান কমতে শুরু করেছে। গত এক দশকে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এক দশক আগেও কৃষিতে জিডিপির অবদান বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু তা ক্রমেই কমে আসছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে কৃষিতে জিডিপির অবদান ছিল ১৮ দশমিক ০১ শতাংশ, যা গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে এসে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। গত অর্থবছরে (২০২০-২১) অর্থবছরে আরও কমে এসে দাঁড়ায় প্রায় ১২ শতাংশে। সরকার কৃষিতে মোটা অঙ্কের ভতুর্কি দিচ্ছে ঠিকই, তবে এ খাতকে আরও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল নিশ্চিত করতে হবে, মাঠপর্যায়ে যাতে কৃষিক সরাসরি ভতুর্কির সুফল পায় তাও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রক্ষা করতে হবে কৃষি জমি।

[লেখক : সাবেক কর কমিশনার; পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লি.]

শনিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২২ , ০১ মাঘ ১৪২৮ ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য

এসএম জাহাঙ্গীর আলম

দেশ খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা লাভ করেছে গত প্রায় এক দশক আগেই। অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে খাদ্যের উৎপাদন বেশি হচ্ছে। তবে কৃষকের দুর্দশা কমছে না। কৃষির উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল পাচ্ছেন না। পরিবহন, কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি বা শ্রমিক সংকট, সার সংকট থেকে শুরু করে যাবতীয় খরচ বেড়েই চলছে। মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অভিযোগ, এক মণ ধানের উৎপাদন খরচ পড়ছে ১২ থেকে সাড়ে ১২০০ টাকা, আর বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ৮ থেকে ৯০০ টাকায়।

কৃষক ফসল্যের ন্যায্য মূল না পেলেও ভোক্তদের বেশি দাম খাদ্য ক্রয় করতে হচ্ছে। মাঝখানে সুবিধা নিচ্ছে মিল মালিক তথা বাজার সিন্ডিকেটকারীরা। সরকার কৃষিতে প্রতি বছর মোটা অঙ্কের টাকা ভতুর্কি দিলেও কৃষক এর সুবিধা পাচ্ছে না। উল্লেখ্য, ভতুর্কির সিংহভাগই দেয়া হচ্ছে কৃষি আধুনিকরণে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে দানাদার ফসলের উৎপাদন সাড়ে ৪ কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ৪ কোটি ৭০ লাখ টন প্রায়। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ধান, গম ও ভুট্টাসহ দানাদার ফসলের উৎপাদন ছিল চার কোটি ৫৫ লাখ টন। এছাড়া কন্দাল ফসলের (আলু, শাকসবজি, পাট ইত্যাদি) উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৯৭ লাখ টনের বেশি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই০ সূত্রে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে চালের উৎপাদন বেশি হচ্ছে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে চালের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন, গম ১২ লাখ এবং ভুট্টা ৫৭ লাখ টন। অপরদিকে শাকসবজি, মসলা, তেল জাতীয় পণ্যের উৎপাদনও বাড়ছে। গত অর্থবছরে আলুর উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৬ লাখ টন, শাকসবজি ১ কোটি ৯৭ লাখ টন, তেল জাতীয় ফসল ১২ লাখ টন ও ডাল ৯ লাখ টন। এছাড়া ডাল ১১ লাখ ২০ হাজার, তেলবীজ সাড়ে ১০ লাখ টন, পেঁয়াজ ২৩ লাখ, রসুন ৬ লাখ, ধনিয়া ৭ হাজার, আড়া ২ লাখ ৫০ হাজার ও হলুদ ১ লাখ ৫০ হাজার টন উৎপাদন হয়। মোট মসলা জাতীয় পণ্যে উৎপাদন ছিল ৩৫ লাখ টন। অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে চালের উৎপাদন বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) থেকে জানা যায়, মাথাপিছু বার্ষিক চালের (দানাদার) চাহিদা ১৫২ কেজি। এতে করে ১৬ কোটি ৬৪ লাখ জনসংখ্যার জন্য বার্ষিক চাহিদা ২ কোটি ৫৩ লাখ টন। যদি জনসংখ্যা ১৭ কোটি হয়, তাহলে বার্ষিক চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি টন। অর্থাৎ বর্তমানে চাহিদার চেয়ে খাদ্যের উৎপাদন বেশি। সূত্র : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে এ খাতে স্থির মূল্যে জিডিপির অবদান গত অর্থবছরে ছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। বিবিএসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশে খানা পরিবারের সংখ্যা ২ কোটি ৮৬ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬৩টি। কৃষি পরিবার ১ কোটি ৫১ লাখ ৮৩ হাজার ১৮৩টি। মোট ফসলি জমির পরিমাণ ১ কোটি ৫৪ লাখ ৩৮ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৮৫ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর। সেচের আওতায় ৭৪ লাখ ৪৮ হাজার হেক্টর, পতিত ২ লাখ ২৩ হাজার, এক ফসলি জমি ২২ লাখ ৫৩ হাজার, ২ ফসলি জমি ৩৯ লাখ ১৪ হাজার ও ৩ ফসলি জমির পরিমাণ ১৭ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর (সূত্র : বিবিএস)।

কৃষিতে সরকার মোটা অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ভর্তুকি রাখা হয়েছে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা, এর আগের অর্থবছরেও সমপরিমাণ ভতুর্কি রাখা হয়েছিল। জ্বালানি ও সারে বেশিরভাগ ভর্তুকি যাচ্ছে। বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ইউরিয়া সারের চাহিদা ২৮ লাখ টনের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টন তারা উৎপাদন করতে পারছে, বাকিটা আমদানি করতে হচ্ছে। বেশি দামে সার আমদানি করে কম দামে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। প্রতি কেজি ইউরিয়া কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করা হচ্ছে ১৪ টাকা কেজি।

এদিকে কৃষিতে জিডিপির অবদান কমতে শুরু করেছে। গত এক দশকে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এক দশক আগেও কৃষিতে জিডিপির অবদান বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু তা ক্রমেই কমে আসছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে কৃষিতে জিডিপির অবদান ছিল ১৮ দশমিক ০১ শতাংশ, যা গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে এসে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। গত অর্থবছরে (২০২০-২১) অর্থবছরে আরও কমে এসে দাঁড়ায় প্রায় ১২ শতাংশে। সরকার কৃষিতে মোটা অঙ্কের ভতুর্কি দিচ্ছে ঠিকই, তবে এ খাতকে আরও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল নিশ্চিত করতে হবে, মাঠপর্যায়ে যাতে কৃষিক সরাসরি ভতুর্কির সুফল পায় তাও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রক্ষা করতে হবে কৃষি জমি।

[লেখক : সাবেক কর কমিশনার; পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লি.]