সানি লিওনের ঢাকা সফর ও প্রতিবাদ সমাচার

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অনলাইন মিডিয়াগুলোতে কয়েক দিন আলোচনার শীর্ষে অবস্থান করছিল বলিউড অভিনেত্রী সানি লিওনের বাংলাদেশ সফর। সানি লিওনের সঙ্গে তার স্বামী ড্যানিয়েল ওয়েবারও এসেছেন। গানবাংলা টিভির কর্ণধার ও সংগীতশিল্পী কৌশিক হোসেন তাপসের আমন্ত্রণে তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সানি লিওন বাংলাদেশে আসেন। এর আগে সেলিম খান প্রযোজিত ‘সোলজার’ সিনেমার শুটিংয়ের জন্য সানি লিওন এবং ভারতের ১০ জন অভিনয়শিল্পীকে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দেয়া হয়েছিল; কিন্তু সানি লিওন তার নামটি গোপন করে একজন মার্কিন নাগরিক পরিচয়ে আবেদন করায় তা পরবর্তী সময়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে। পরিচয় গোপন করে অনুমতি নেয়া আইনবহির্ভূত বিধায় তার ওয়ার্ক পারমিট পরবর্তী সময়ে বাতিল করা হয়। সানি লিওনের আসল নাম কারেনজিৎ কৌর ভোহরা, ‘সানি লিওন’ তার মিডিয়া জগতের ‘পোশাকি নাম’। জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক হলেও তিনি কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রেরও নাগরিক। মনে হয়, তথ্য মন্ত্রণালয় তার বাংলাদেশে আসা পছন্দ করছিল না বলেই নামের বিভ্রান্তির কথা বলেছে। কারণ, ২০১৫ সালেও একটি ইভেন্টে অংশ নিতে সানি লিওনের বাংলাদেশে আসার কথা ছিল, কিন্তু ধর্মীয় সংগঠনগুলোর প্রবল আপত্তির কারণে ইভেন্টের আয়োজকেরা তার সফর বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশে পা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামি ঐক্যজোটের নেতারা তাকে তার নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সরকারের কাছে দাবি করে। ইসলামি ঐক্যজোটের মতে সানি লিওন ‘চরিত্র ধ্বংসকারী’ বিতর্কিত নারী, তিনি বাংলাদেশে এলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের অনুভূতিতে আঘাত লাগবে। সানি লিওন শুধু সিনেমার একজন অভিনেত্রী নন, পর্ণ ছবির একজন উঁচু দরের অভিনেত্রীও ছিলেন। পর্ণ ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রীরা চাপিয়ে দেয়া সংজ্ঞা অনুসারে যৌনকর্মী। তিনি নামীদামি অভিনেত্রী হওয়ায় তার যৌনকর্ম সবাই আগ্রহভরে দেখে। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে খুব বেশি নারী পর্ণ ছবিতে অভিনয় না করায় অল্পদিনেই তিনি অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, যা কাজে লাগিয়ে তিনি পর্ণ ছবির অভিনয় ছেড়ে দিয়ে পরে বলিউডের জগতে পদার্পণ করেন। মাঝেমধ্যে ওয়াজে তার যৌনকর্ম সম্পর্কে যেভাবে জীবন্ত বর্ণনা দেয়া হয় তাতে ধারণা করা যায়, বক্তা নিজে স্বচক্ষে উপভোগ না করলে এমন বর্ণনা দেয়া সম্ভব হতো না। সানি লিওন দেখতে সুন্দরী, অভিনেত্রী, একজন ওজনদার নর্তকীও। এখনো তিনি বোম্বের চলচ্চিত্র জগতে আইটেম গানের একচ্ছত্র অভিনেত্রী। কিন্তু ইসলামি ঐক্যজোট এবং হেফাজতে ইসলামের দৃষ্টিতে সানি লিওন শুধু যৌনকর্মী, মানুষ হিসেবে তার অন্য কোন পরিচয় নেই। তাই তাদের অভিমত অনুযায়ী যৌনকর্মী সানি লিওন বাংলাদেশে এলে এর মাটি অপবিত্র হয়ে যাবে, মুসলমানের হৃদয়ে আঘাত লাগবে।

সানি লিওনের আগমনে যদি বাংলাদেশের মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে তাহলে ভারতে তার অবস্থানের কারণে ওখানকার ২২ কোটি মুসলমানের মনেও তো আঘাত লাগার কথা। ভারতের কোন মুসলমান বা কোন মুসলিম সংগঠন থেকে ভারতে তার অবস্থানের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ হয়েছে বলে শুনিনি। কলকাতার সোনাগাজি পতিতালয় পৃথিবী বিখ্যাত, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে খদ্দের এবং পতিতা ওখানে গিয়ে যৌনকর্ম করে থাকে। এক সময় বাংলাদেশে অনেক পতিতালয় ছিল, এখনো কয়েকটি আছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ভোটের প্রত্যাশায় ধার্মিক সেজে লাঠিসোটা নিয়ে পতিতালয়গুলো উচ্ছেদ করে। সরকারের অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও কোন ব্যক্তি বা সংগঠন এভাবে জোর করে পতিতালয় উচ্ছেদ করার ক্ষমতা রাখে না। সরকারও ভোট চায়, তবে পতিতার ভোট নয়, উচ্ছেদকারীদের ভোট। উচ্ছেদ হওয়া পতিতারা কোথায় যাবে সে ভাবনা স্থানীয় নেতাদের ছিল না। তাদের নিশ্চয়ই কেউ বিয়ে করে ঘরের বউ করেনি, তারা এখন রাস্তায় রাস্তায় গ্রাহক খুঁজে বেড়ায়।

পতিতালয় ছাড়া কি পতিতা নেই? পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন, তাদের অনেকেই নারী সঙ্গ পছন্দ করেন। ব্যবসা পেতে হলে বিদেশি ব্যবসায়ীদের কারও কারও কক্ষে রাতযাপনে নারী সঙ্গ নিশ্চিত করতে হয়। আমাদের দেশের অনেক লোক বিদেশে গিয়ে নারীসঙ্গ নিশ্চিত করেন। প্রেসিডেন্ট এরশাদ মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি পাওয়ার সুবিধার্থে আরবি ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন; তখন সংবাদের প্রখ্যাত কলামিস্ট আবু জাফর শামছুদ্দীন তার সাপ্তাহিক কলাম ‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’য় এরশাদ সাহেবের কাছে জানতে চান, মধ্যপ্রাচ্যের রাজপুত ও ধনকুবরেরা যখন ভারতের বোম্বে গিয়ে সুন্দরীদের সঙ্গে রাত কাটান তখন তাদের তো ভাষার কোন প্রতিবন্ধকতা থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী মুসলমানরা শুধু ভারতে নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সুন্দরীদের খোঁজে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে থাকেন। মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবেরদের আকৃষ্ট করতে থাইল্যান্ডে যৌনকর্মীদের অনেকে আরবি শিখেছে, করোনার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের ভ্রমণ বন্ধ থাকায় থাইল্যান্ডের অনেক হোটেলের ব্যবসা লাটে উঠেছে, যৌনকর্মীদের জীবন নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। ১৯৮৯ সনে অনুষ্ঠিত সেন্টাল ব্যাংকিং কোর্সে বিভিন্ন দেশের প্রশিক্ষণার্থীদের সমাপনী ক্লাসে ব্যাংক নিগারা মালয়েশিয়ার গভর্নর আপসোস করে বলেছিলেন, ‘মালয়েশিয়ায় যৌনকর্মীরা প্রতিবেশী থাইল্যা-ের মতো অবাধে যৌনকর্ম করতে পারছে না বলে পর্যটন খাতে তাদের আয় কম। এমনকি মালয়েশিয়া থেকে অসংখ্য লোক যৌনকর্মের তাগিদে থাইল্যান্ড ভ্রমণ করে থাকে।’

যৌনকর্ম দেশের সর্বত্র হচ্ছে। বৈধ আর অবৈধ। পেটের দায়ে কতজন দেহ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যান দেখা যায় না। কোন না কোন মাদ্রাসায় প্রায়ই বলাৎকার হচ্ছে, এই বলাৎকারের বিরুদ্ধে ইসলামি ঐক্যজোট বা হেফাজতে ইসলামকে সোচ্চার হতে দেখি না। বলাৎকার নিয়ে একটি ফতোয়া দেখলামÑচারজন শিশুকে বলাৎকার করার কারণে ভোলার মনপুরায় মাদ্রাসার ধর্ষক শিক্ষক মাওলানা ইসমাইলকে চিল্লায় গিয়ে শুদ্ধ হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পতিতা নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকতেন বলে একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োজিত আঞ্চলিক সেনাপ্রধান নিয়াজি সাহেব সময়মত তার কাছ থেকে কোন সিদ্ধান্তই পেতেন না। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী নূর জাহানের বিনিময়ে পাকিস্তান বিক্রির বাসনা পোষণ করতেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সঙ্গে ব্রিটিশ সুপার মডেল ক্রিস্টিন কীলারের সম্পর্ক ছিল, সুইমিংপুলে একসঙ্গে সাঁতার কাটার ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। খেলাফতের তুর্কি বাদশাহদের উপপতœী বা পতিতা পোষার কাহিনী তো আমরা ‘সুলতান সুলেমান’ সিরিয়ালে দেখতে পেয়েছি। মোঘল সম্রাটদের উপপতœী রাখার কাহিনীও বাংলাদেশের সবার জানা থাকার কথা। একাত্তরে পাকিস্তান আর্মি এবং রাজাকারেরা মিলে ২ লাখ বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করেছে, ওই ধর্ষকদের বিরুদ্ধে ইসলামি ঐক্যজোট কী কোন বিবৃতি দিয়েছিল?

সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষও বদলানোর কথা, কিন্তু কিছু মানুষ তাদের বিশ্বাসের জগদ্দল পাথরে আটকে আছে। সুন্দর-অসুন্দর, শ্লীল-অশ্লীল ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি সাপেক্ষ। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করে অপছন্দের সবকিছুকে ঘৃণা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। আমাদের সমাজে ‘বেশ্যা’ একটা গালি; কারণ তারা অর্থের বিনিময়ে দেহ বিক্রি করে। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে তো নথি সই হয়, চাকরিতে নিয়োগ হয়, নমিনেশন দেয়া হয়, দলীয় পদ বিক্রি হয়, আরও কত কিছু হয়। দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের বর্তমান মুরব্বি মাওলানা সাদ কান্ধলভী বলেছেন, কোরআন শরিফ শিখিয়ে যারা বেতন গ্রহণ করেন, তাদের বেতন বেশ্যার উপার্জনের চেয়েও খারাপ। তাই প্রত্যাশা, সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে বদলাতে হবে। আমি নিশ্চিত, ইসলামী ঐক্যজোটের নেতাকর্মীদের জিজ্ঞেস করলে অনেকেই বলবেন, সানি লিওনের পর্ণ ছবি দেখেননি। একই কথা বাংলাদেশের বেশির ভাগ মুসলমানের ক্ষেত্রেও প্রয়োজ্য। তাহলে বিষয়টি এপিডেমিক পর্যায়ের কোন ইস্যু নয়। আর যদি ধরে নিই, গোপনে সবাই দেখে, তার মানে সানি লিওন এবং পর্ণ ছবির একটা মার্কেট আছে। মার্কেট না থাকলে মাদ্রাসার ছাত্র এবং শিক্ষকের মোবাইলে পর্ণ ছবি পাওয়া যেত না। তাই কম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করলে তার তাৎপর্য থাকে না। যারা অতীতে সানি লিওনকে দেখেনি, ইসলামি ঐক্যজোটের কড়া বিবৃতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন মিডিয়াগুলোর হইচইয়ের কারণে এখন তারাও সানি লিওনকে মন ভরে দেখবে।

[লেখক : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক; সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টাকশাল]

রবিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২২ , ২০ চৈত্র ১৪২৮ ৩০ শাবান ১৪৪৩

সানি লিওনের ঢাকা সফর ও প্রতিবাদ সমাচার

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অনলাইন মিডিয়াগুলোতে কয়েক দিন আলোচনার শীর্ষে অবস্থান করছিল বলিউড অভিনেত্রী সানি লিওনের বাংলাদেশ সফর। সানি লিওনের সঙ্গে তার স্বামী ড্যানিয়েল ওয়েবারও এসেছেন। গানবাংলা টিভির কর্ণধার ও সংগীতশিল্পী কৌশিক হোসেন তাপসের আমন্ত্রণে তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সানি লিওন বাংলাদেশে আসেন। এর আগে সেলিম খান প্রযোজিত ‘সোলজার’ সিনেমার শুটিংয়ের জন্য সানি লিওন এবং ভারতের ১০ জন অভিনয়শিল্পীকে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দেয়া হয়েছিল; কিন্তু সানি লিওন তার নামটি গোপন করে একজন মার্কিন নাগরিক পরিচয়ে আবেদন করায় তা পরবর্তী সময়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে। পরিচয় গোপন করে অনুমতি নেয়া আইনবহির্ভূত বিধায় তার ওয়ার্ক পারমিট পরবর্তী সময়ে বাতিল করা হয়। সানি লিওনের আসল নাম কারেনজিৎ কৌর ভোহরা, ‘সানি লিওন’ তার মিডিয়া জগতের ‘পোশাকি নাম’। জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক হলেও তিনি কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রেরও নাগরিক। মনে হয়, তথ্য মন্ত্রণালয় তার বাংলাদেশে আসা পছন্দ করছিল না বলেই নামের বিভ্রান্তির কথা বলেছে। কারণ, ২০১৫ সালেও একটি ইভেন্টে অংশ নিতে সানি লিওনের বাংলাদেশে আসার কথা ছিল, কিন্তু ধর্মীয় সংগঠনগুলোর প্রবল আপত্তির কারণে ইভেন্টের আয়োজকেরা তার সফর বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশে পা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামি ঐক্যজোটের নেতারা তাকে তার নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সরকারের কাছে দাবি করে। ইসলামি ঐক্যজোটের মতে সানি লিওন ‘চরিত্র ধ্বংসকারী’ বিতর্কিত নারী, তিনি বাংলাদেশে এলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের অনুভূতিতে আঘাত লাগবে। সানি লিওন শুধু সিনেমার একজন অভিনেত্রী নন, পর্ণ ছবির একজন উঁচু দরের অভিনেত্রীও ছিলেন। পর্ণ ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রীরা চাপিয়ে দেয়া সংজ্ঞা অনুসারে যৌনকর্মী। তিনি নামীদামি অভিনেত্রী হওয়ায় তার যৌনকর্ম সবাই আগ্রহভরে দেখে। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে খুব বেশি নারী পর্ণ ছবিতে অভিনয় না করায় অল্পদিনেই তিনি অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, যা কাজে লাগিয়ে তিনি পর্ণ ছবির অভিনয় ছেড়ে দিয়ে পরে বলিউডের জগতে পদার্পণ করেন। মাঝেমধ্যে ওয়াজে তার যৌনকর্ম সম্পর্কে যেভাবে জীবন্ত বর্ণনা দেয়া হয় তাতে ধারণা করা যায়, বক্তা নিজে স্বচক্ষে উপভোগ না করলে এমন বর্ণনা দেয়া সম্ভব হতো না। সানি লিওন দেখতে সুন্দরী, অভিনেত্রী, একজন ওজনদার নর্তকীও। এখনো তিনি বোম্বের চলচ্চিত্র জগতে আইটেম গানের একচ্ছত্র অভিনেত্রী। কিন্তু ইসলামি ঐক্যজোট এবং হেফাজতে ইসলামের দৃষ্টিতে সানি লিওন শুধু যৌনকর্মী, মানুষ হিসেবে তার অন্য কোন পরিচয় নেই। তাই তাদের অভিমত অনুযায়ী যৌনকর্মী সানি লিওন বাংলাদেশে এলে এর মাটি অপবিত্র হয়ে যাবে, মুসলমানের হৃদয়ে আঘাত লাগবে।

সানি লিওনের আগমনে যদি বাংলাদেশের মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে তাহলে ভারতে তার অবস্থানের কারণে ওখানকার ২২ কোটি মুসলমানের মনেও তো আঘাত লাগার কথা। ভারতের কোন মুসলমান বা কোন মুসলিম সংগঠন থেকে ভারতে তার অবস্থানের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ হয়েছে বলে শুনিনি। কলকাতার সোনাগাজি পতিতালয় পৃথিবী বিখ্যাত, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে খদ্দের এবং পতিতা ওখানে গিয়ে যৌনকর্ম করে থাকে। এক সময় বাংলাদেশে অনেক পতিতালয় ছিল, এখনো কয়েকটি আছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ভোটের প্রত্যাশায় ধার্মিক সেজে লাঠিসোটা নিয়ে পতিতালয়গুলো উচ্ছেদ করে। সরকারের অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও কোন ব্যক্তি বা সংগঠন এভাবে জোর করে পতিতালয় উচ্ছেদ করার ক্ষমতা রাখে না। সরকারও ভোট চায়, তবে পতিতার ভোট নয়, উচ্ছেদকারীদের ভোট। উচ্ছেদ হওয়া পতিতারা কোথায় যাবে সে ভাবনা স্থানীয় নেতাদের ছিল না। তাদের নিশ্চয়ই কেউ বিয়ে করে ঘরের বউ করেনি, তারা এখন রাস্তায় রাস্তায় গ্রাহক খুঁজে বেড়ায়।

পতিতালয় ছাড়া কি পতিতা নেই? পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন, তাদের অনেকেই নারী সঙ্গ পছন্দ করেন। ব্যবসা পেতে হলে বিদেশি ব্যবসায়ীদের কারও কারও কক্ষে রাতযাপনে নারী সঙ্গ নিশ্চিত করতে হয়। আমাদের দেশের অনেক লোক বিদেশে গিয়ে নারীসঙ্গ নিশ্চিত করেন। প্রেসিডেন্ট এরশাদ মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি পাওয়ার সুবিধার্থে আরবি ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন; তখন সংবাদের প্রখ্যাত কলামিস্ট আবু জাফর শামছুদ্দীন তার সাপ্তাহিক কলাম ‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’য় এরশাদ সাহেবের কাছে জানতে চান, মধ্যপ্রাচ্যের রাজপুত ও ধনকুবরেরা যখন ভারতের বোম্বে গিয়ে সুন্দরীদের সঙ্গে রাত কাটান তখন তাদের তো ভাষার কোন প্রতিবন্ধকতা থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী মুসলমানরা শুধু ভারতে নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সুন্দরীদের খোঁজে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে থাকেন। মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবেরদের আকৃষ্ট করতে থাইল্যান্ডে যৌনকর্মীদের অনেকে আরবি শিখেছে, করোনার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের ভ্রমণ বন্ধ থাকায় থাইল্যান্ডের অনেক হোটেলের ব্যবসা লাটে উঠেছে, যৌনকর্মীদের জীবন নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। ১৯৮৯ সনে অনুষ্ঠিত সেন্টাল ব্যাংকিং কোর্সে বিভিন্ন দেশের প্রশিক্ষণার্থীদের সমাপনী ক্লাসে ব্যাংক নিগারা মালয়েশিয়ার গভর্নর আপসোস করে বলেছিলেন, ‘মালয়েশিয়ায় যৌনকর্মীরা প্রতিবেশী থাইল্যা-ের মতো অবাধে যৌনকর্ম করতে পারছে না বলে পর্যটন খাতে তাদের আয় কম। এমনকি মালয়েশিয়া থেকে অসংখ্য লোক যৌনকর্মের তাগিদে থাইল্যান্ড ভ্রমণ করে থাকে।’

যৌনকর্ম দেশের সর্বত্র হচ্ছে। বৈধ আর অবৈধ। পেটের দায়ে কতজন দেহ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যান দেখা যায় না। কোন না কোন মাদ্রাসায় প্রায়ই বলাৎকার হচ্ছে, এই বলাৎকারের বিরুদ্ধে ইসলামি ঐক্যজোট বা হেফাজতে ইসলামকে সোচ্চার হতে দেখি না। বলাৎকার নিয়ে একটি ফতোয়া দেখলামÑচারজন শিশুকে বলাৎকার করার কারণে ভোলার মনপুরায় মাদ্রাসার ধর্ষক শিক্ষক মাওলানা ইসমাইলকে চিল্লায় গিয়ে শুদ্ধ হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পতিতা নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকতেন বলে একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োজিত আঞ্চলিক সেনাপ্রধান নিয়াজি সাহেব সময়মত তার কাছ থেকে কোন সিদ্ধান্তই পেতেন না। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী নূর জাহানের বিনিময়ে পাকিস্তান বিক্রির বাসনা পোষণ করতেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সঙ্গে ব্রিটিশ সুপার মডেল ক্রিস্টিন কীলারের সম্পর্ক ছিল, সুইমিংপুলে একসঙ্গে সাঁতার কাটার ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। খেলাফতের তুর্কি বাদশাহদের উপপতœী বা পতিতা পোষার কাহিনী তো আমরা ‘সুলতান সুলেমান’ সিরিয়ালে দেখতে পেয়েছি। মোঘল সম্রাটদের উপপতœী রাখার কাহিনীও বাংলাদেশের সবার জানা থাকার কথা। একাত্তরে পাকিস্তান আর্মি এবং রাজাকারেরা মিলে ২ লাখ বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করেছে, ওই ধর্ষকদের বিরুদ্ধে ইসলামি ঐক্যজোট কী কোন বিবৃতি দিয়েছিল?

সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষও বদলানোর কথা, কিন্তু কিছু মানুষ তাদের বিশ্বাসের জগদ্দল পাথরে আটকে আছে। সুন্দর-অসুন্দর, শ্লীল-অশ্লীল ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি সাপেক্ষ। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করে অপছন্দের সবকিছুকে ঘৃণা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। আমাদের সমাজে ‘বেশ্যা’ একটা গালি; কারণ তারা অর্থের বিনিময়ে দেহ বিক্রি করে। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে তো নথি সই হয়, চাকরিতে নিয়োগ হয়, নমিনেশন দেয়া হয়, দলীয় পদ বিক্রি হয়, আরও কত কিছু হয়। দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের বর্তমান মুরব্বি মাওলানা সাদ কান্ধলভী বলেছেন, কোরআন শরিফ শিখিয়ে যারা বেতন গ্রহণ করেন, তাদের বেতন বেশ্যার উপার্জনের চেয়েও খারাপ। তাই প্রত্যাশা, সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে বদলাতে হবে। আমি নিশ্চিত, ইসলামী ঐক্যজোটের নেতাকর্মীদের জিজ্ঞেস করলে অনেকেই বলবেন, সানি লিওনের পর্ণ ছবি দেখেননি। একই কথা বাংলাদেশের বেশির ভাগ মুসলমানের ক্ষেত্রেও প্রয়োজ্য। তাহলে বিষয়টি এপিডেমিক পর্যায়ের কোন ইস্যু নয়। আর যদি ধরে নিই, গোপনে সবাই দেখে, তার মানে সানি লিওন এবং পর্ণ ছবির একটা মার্কেট আছে। মার্কেট না থাকলে মাদ্রাসার ছাত্র এবং শিক্ষকের মোবাইলে পর্ণ ছবি পাওয়া যেত না। তাই কম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করলে তার তাৎপর্য থাকে না। যারা অতীতে সানি লিওনকে দেখেনি, ইসলামি ঐক্যজোটের কড়া বিবৃতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন মিডিয়াগুলোর হইচইয়ের কারণে এখন তারাও সানি লিওনকে মন ভরে দেখবে।

[লেখক : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক; সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টাকশাল]