সুখী দেশের তালিকা

এম এ কবীর

জীবনকে আমরা যেভাবে দেখি, জীবন আমাদের সেভাবে দেখে না। জীবনের বোঝা যে মানুষ যত টানে সে মানুষ তত মূল্যহীন হয়। ঘুড়িটা পাখিকে উড়তে দেখে মনে করে সেও বুঝি পাখির মতো উড়তে উড়তে প্রেমিক হয়ে যাবে। কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। পাখি যতক্ষণ ইচ্ছে তার পাখার ওপর ভর করে উড়তে পারে, বেচারা ঘুড়ি চাইলেও পারে না। ঘুড়ির সাধ আছে সাধ্য নেই। পাখির স্বাধীনতা আছে, ঘুড়ির স্বাধীনতা নেই। জীবনের বোঝা টানা মানুষটা ঠিক ঘুড়ির মতো।

বৈশি^ক মহামারী করোনার থাবা আর যুদ্ধের ত্রাসের মধ্যে সুখী দেশের তালিকা করা বেশ কঠিন। করোনায় প্রায় ৪৭ কোটি মানুষ আক্রান্ত এবং প্রায় ৬১ লাখ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা সংঘাতের রক্তাক্ত রণাঙ্গনের অসংখ্য আহত, নিহত, বাস্তুচ্যুত মানুষের আহাজারির মধ্যেও প্রণীত হয়েছে সুখী দেশের তালিকা, যার আনুষ্ঠানিক নাম World Happiness Report (WHR)। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে বিশ^ যখন সুখবিষয়ক আলোচনায় মগ্ন, তখন চলমান করোনার চতুর্থ ঢেউের আসন্ন পদধ্বনি আরও মারাত্মক হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞগণ। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন BA-2 ভ্যারিয়েন্ট হু হু করে ছড়িয়ে বৃদ্ধি করতে পারে ভয়াবহ সংক্রমণ, যা থেকে নিরাপদে নেই বিশ^বাসী।

বিদ্যমান সংকুলকালে সুখের বার্তার মতো যুদ্ধ এবং মহামারীর এই ঘোরতর অস্থির, বিপজ্জনক ও অন্ধকার পরিস্থিতিতে উজ্জ্বল আলোর কথা জানিয়েছে World Happiness Report (WHR)- ২০২২। রিপোর্ট অনুযায়ী, সবচেয়ে সুখী দেশের তালিকায় সাত ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ ১৫৩টি দেশের মধ্যে আছে তালিকার ৯৪ নম্বরে। পূর্ববর্তী রিপোর্টে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০১তম। জাতিসংঘের এই ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে পরপর পাঁচ বছর বিশে^র সবচেয়ে সুখী দেশের শীর্ষ অবস্থানে আছে ফিনল্যান্ড।

বর্তমানে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের স্থান এ তালিকায় রয়েছে ৯৮ নম্বরে। ইউক্রেনে সেনা অভিযান চালানো রাশিয়ার স্থান তালিকায় ৮০ নম্বরে। ইউক্রেনে হামলার কারণে পুতিন সরকারের বিরুদ্ধে রাশিয়ায় নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আর দাঙ্গা ও সংঘাতকবলিত আফগানিস্তান তালিকার সবচেয়ে শেষে স্থান পেয়েছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, সুখের ক্ষেত্রে সার্বিয়া, বুলগেরিয়া এবং রোমানিয়া, এই তিনদেশের অর্জন অনেক বেশি। পক্ষান্তরে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে লেবানন, ভেনিজুয়েলা এবং আফগানিস্তানে। করোনা মহামারী ছাড়াও সুখের দিক থেকে কিছু কিছু দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ সন্ত্রাস, সংঘাত, আত্মকলহ ও নিরাপত্তার সংকট থেকে উদ্ভূত যুদ্ধ বা যুদ্ধাবস্থা। দক্ষিণ এশিয়ায় এবারও ভারতের ওপরে রয়েছে পাকিস্তান। তবে শুধু পাকিস্তানই নয়, বাংলাদেশ, চীন, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ প্রায় সব প্রতিবেশী দেশই ভারতের ওপরে রয়েছে। তালিকায় ২১ ধাপ ওপরে উঠেছে চীন। গত বারের তালিকায় চীন ছিল ৯৩ নম্বরে। নয়া তালিকায় চীনের ঠাঁই ৭২-এ। তালিকায় শ্রীলঙ্কা রয়েছে ১২৭ নম্বরে।

২০২২ সালের রিপোর্টি অন্যান্য বছরের মতো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তৈরি হয়নি। হয়েছে চলমান বৈশি^ক মহামারিকালে। যে মহামারি শুধু মৃত্যু, আক্রান্ত, বেদনা এবং যন্ত্রণাই এনে দেয়নি, মানবতামুখী ঐক্য, সামাজিক সমর্থন এবং দানশীলতারও বৃদ্ধি করেছে। বিশ^বাসী যখন রোগ এবং যুদ্ধের সঙ্গে লড়াই করছে, তখন সুখের সার্বজনীন আকাক্সক্ষায় চলমান সংকটকালে মানবিক প্রয়োজনে একে অপরের সমর্থনে এগিয়ে আসার বিষয়গুলো ছিল মানবতার ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এ বছর ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের ১০তম বার্ষিকী সম্পন্ন হয়েছে। এ কারণে অতীতের মতো এবারও বিশ^ব্যাপী ১৫৩টি দেশের মানুষেরা কীভাবে তাদের নিজের জীবনকে মূল্যায়ন করে, তা রিপোর্ট করতে সারা দুনিয়ায় সমীক্ষা বা জরিপ গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করে ডেটা সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে মৌলিক যে সত্যটি গবেষণার মাধ্যমে প্রতিভাত হয়েছে যে, যুদ্ধ, সন্ত্রাস, দাঙ্গা, হাঙ্গামায় অশান্তি হয়, বরং মানুষের মধ্যে সুখের আগ্রহই সর্বজনীন এবং বিশ^জনীন। মানুষ সব সময় সুখ খোঁজে অথচ কখনো সুখের দেখা পায় না।

ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট প্রথম প্রকাশিত হওয়ার সময় বিশ^ সুখের প্রতিবেদনটিকে দুটি মূল ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। যথা- সুখ মূল্যায়ন বা মতামত বা সমীক্ষার মাধ্যমে পরিমাপযোগ্য করা এবং সুখের মূল নির্ধারকগুলো আনুমানিক বা কাল্পনিক নয়, বরং চিহ্নিত বা শনাক্তযোগ্য করা। এ দুটি মানদ-ের মাধ্যমে গবেষণা কাঠামোটি ব্যক্তির মাধ্যমে বিশে^র দেশগুলোর সামগ্রিক জীবনমান ও জীবন-প্রবাহে ‘সুখ’ নামক প্রপঞ্চকে মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যা করে। এ প্রতিবেদনের তথ্যাবলি প্রকারান্তরে বিশে^র দেশগুলোকে সুখী মানবসম্পদ, সমাজ, পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা অর্জনের নীতি প্রণয়ণে ও পদক্ষেপ গ্রহণে বিশেষভাবে সাহায্য করে ও পথ দেখায়। এক দশক আগে, সারা বিশে^র সরকারগুলো বিশ^ব্যাপী উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্রে ‘সুখ’ নামক ধারণাকে রাখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট আগ্রহী না হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে তাদের আগ্রহ ও ইচ্ছে বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছে। বিশ^ সুখের প্রতিবেদনের ফলে বিশ^ব্যাপী মানবিক সুখের মাধ্যমে বৃহত্তর কল্যাণের পথ খুঁজে বের করার বৈশি^ক সংকল্প বৃদ্ধি পেয়েছে। চলমান মহামারী এবং যুদ্ধের কারণে ব্যক্তিগত সুখ, সামাজিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তা ভয়ানক হুমকির সম্মুখীন, তথাপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায়, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়েছে। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট চালু হওয়ার পর থেকে সুখ এবং জীবনের সন্তুষ্টি যথাযথভাবে উপলব্ধি ও পরিমাপের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। ‘গ্যালাপ ওয়ার্ল্ড পোলে’ উপলব্ধ ডেটা দ্বারা তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

তাছাড়া, প্রতি বছরই ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের আকার ও পরিধি বাড়ছে এবং বিশে^র দেড় শতাধিক দেশকে বছরের পর বছর জরিপের মাধ্যমে কভার করায় পনের বছরের ডেটার প্রাপ্যতার এক অনন্য স্টক তৈরি হয়েছে। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে বিবেচনা করা ডেটার মাধ্যমে সারা বিশে^র মানুষ কীভাবে তাদের নিজেদের সুখকে মূল্যায়ন করে তার একটি স্ন্যাপশট পাওয়া যাচ্ছে। তদুপরি, সুস্থতার বিজ্ঞানবিষয়ক চর্চায় সাম্প্রতিক বাস্তবতার গভীর অন্তর্দৃষ্টিও তৈরি করছে এসব ডেটা। মানুষের অবস্থা বোঝার জন্য এবং কীভাবে মানুষ, সম্প্রদায় এবং দেশগুলোকে সুখী জীবনের দিকে অগ্রসর হতে সহায়তা করা যায়, তা বোঝার জন্য এসব তথ্য অবিশ^াস্যভাবে শক্তিশালী। বিগত ১০ বছরের মূল্যায়নে আরও দেখা গেছে, বছরের পর বছর ধরে বিশ^ সুখের প্রতিবেদনের তথ্যে সুখের প্রতি ব্যক্তিগত ও সামাজিক সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পারস্পরিক উদারতা, মানবিক সততা, সহমর্মিতা ও আত্মত্যাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ক্রমশই প্রাধান্য লাভ করেছে। এতে বিশ^নেতাদের জন্য রয়েছে সতর্কবাণী এবং সতর্কবার্তা।

ব্যক্তি স্বাধীনতা, সরকারের ওপর আস্থা, সুস্থ জীবনযাপনের প্রত্যাশার মতো মাপকাঠিও মাথায় রাখা হয়েছে এ রিপোর্ট তৈরির সময়। এসব মাপকাঠিতে অনেক দেশের মান যে আশানুরূপ নয়, তা স্পষ্ট। পৃথিবীর মোট ১৪৬টি দেশ থেকে তথ্যের ভিত্তিতে রিপোর্ট প্রণয়নকালে জাতিসংঘের ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক’ বিভিন্ন দেশের মানুষকে ফোন করে নানাবিধ প্রশ্ন করেছে। জানতে চাওয়া হয়, তারা সুখী কি না বা কেন সুখী ইত্যাদি। রিপোর্ট তৈরির সময় নজরে রাখা হয় দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধির হার, মানুষের গড় আয়ু, সামাজিক সহায়তা, কাজ করার স্বাধীনতা, দুর্নীতির মতো বিষয়গুলোও। প্রতিবেদন প্রণয়ন কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অক্সফোর্ডের ‘ওয়েলবিইং রিসার্চ সেন্টার’, ‘সেন্টার ফর সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট’, ‘ভ্যাঙ্কুভার স্কুল অব ইকোনমিকস’। ফলে মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য গবেষণার মাধ্যমে প্রণীত এ রিপোর্টের সুখী দেশের যে চিত্র উদ্ভাসিত হয়েছে, তা সবার কাছে বিশ^স্ততা অর্জন করেছে। সুতোর টান ঘুড়িটাকে পরাধীন করে রাখে। সুতোকে পরাধীন করে নাটাই। নাটাইকে পরাধীন করে মানুষ। আর মানুষকে পরাধীন করে মানুষ নিজেই। মানুষের এই পরাধীনতার অদৃশ্য সুতোটা পরাধীন হতে হতে কোথায় গিয়ে ঠেকে সেটা মানুষ নিজে জানে না। হয়তো জানে কিন্তু সেটা স্বীকার করতে চায় না। মানুষ সব সময় তার ভালোত্বকে প্রচার করে, মন্দত্বকে গোপন রাখে।

গুন্টার উভেন্টস, বর্তমান বয়স ৩৭ বছর। যখন তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর, তখন ভরা ক্লাসে সহপাঠীদের সামনে তাকে শাসন করেছিলেন শিক্ষিকা মারিয়া ভেরিল্যান্ডেন। সেদিনের ওই ছাত্রের দাবি, তিনি নির্দোষ ছিলেন। এমনি এমনি তাকে শাস্তি দিয়েছিলেন শিক্ষিকা। এরপর কেটে গেছে ৩০ বছরেরও বেশি সময়। তবে অপমানের ‘জ্বালা’ ভোলেনি গুন্টার উভেন্টস। তাই প্রতিশোধের আগুন মিটিয়েছে শিক্ষিকাকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। ঘটনাটি ঘটেছে ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামে। মারিয়া ভেরিল্যান্ডেনকে হত্যা করতে একদিন তার বাড়িতে ঢুকে ১০১ বার ছুরি দিয়ে কোপ বসায় গুন্টার উভেন্টস। এতে নিহত হন ওই শিক্ষিকা। দু’বছর পর আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে নেয় গুন্টার। তার স্বীকারোক্তি শুনে হতবাক আইনজীবীরাও।

তদন্তকারীদের গুন্টার জানায়, সেদিন ক্লাসে বিনা কারণে তাকে অপমান করেছিলেন শিক্ষিকা মারিয়া ভেরিল্যান্ডেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। তারপর ৩০ বছর কেটে গেলেও অপমানের জ্বালা মেটেনি। প্রতিশোধ নিতেই হবে। সেই উদ্দেশ্যে ২০২০ সালে অ্যান্টওয়ার্পে ওই শিক্ষিকার বাড়ি যায় গুন্টার। তারপর ৫৯ বছর বয়সী শিক্ষিকাকে ক্ষতবিক্ষত করে ছুরির আঘাতে। তদন্তে নেমে অপরাধীকে শনাক্ত করতে বেগ পায় পুলিশ। শিক্ষিকার পাশেই পড়েছিল তার মানিব্যাগ। সেখানে নগদ টাকা ছিল। বাড়ির আসবাবপত্রও ছিল যথাস্থানেই। তাহলে খুনের কারণ কী? ঘটনার ১৬ মাস পর ২০২০ সালের নভেম্বরে এক বন্ধুর কাছে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে গুন্টার। সেই বন্ধুই পুলিশকে জানানোর পর অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। দ্য গার্ডিয়ান জানায় আদালত খুনের দায়ে গুন্টারকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

সোমবার, ০৪ এপ্রিল ২০২২ , ২১ চৈত্র ১৪২৮ ০১ রমাদ্বান ১৪৪৩

সুখী দেশের তালিকা

এম এ কবীর

জীবনকে আমরা যেভাবে দেখি, জীবন আমাদের সেভাবে দেখে না। জীবনের বোঝা যে মানুষ যত টানে সে মানুষ তত মূল্যহীন হয়। ঘুড়িটা পাখিকে উড়তে দেখে মনে করে সেও বুঝি পাখির মতো উড়তে উড়তে প্রেমিক হয়ে যাবে। কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। পাখি যতক্ষণ ইচ্ছে তার পাখার ওপর ভর করে উড়তে পারে, বেচারা ঘুড়ি চাইলেও পারে না। ঘুড়ির সাধ আছে সাধ্য নেই। পাখির স্বাধীনতা আছে, ঘুড়ির স্বাধীনতা নেই। জীবনের বোঝা টানা মানুষটা ঠিক ঘুড়ির মতো।

বৈশি^ক মহামারী করোনার থাবা আর যুদ্ধের ত্রাসের মধ্যে সুখী দেশের তালিকা করা বেশ কঠিন। করোনায় প্রায় ৪৭ কোটি মানুষ আক্রান্ত এবং প্রায় ৬১ লাখ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা সংঘাতের রক্তাক্ত রণাঙ্গনের অসংখ্য আহত, নিহত, বাস্তুচ্যুত মানুষের আহাজারির মধ্যেও প্রণীত হয়েছে সুখী দেশের তালিকা, যার আনুষ্ঠানিক নাম World Happiness Report (WHR)। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে বিশ^ যখন সুখবিষয়ক আলোচনায় মগ্ন, তখন চলমান করোনার চতুর্থ ঢেউের আসন্ন পদধ্বনি আরও মারাত্মক হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞগণ। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন BA-2 ভ্যারিয়েন্ট হু হু করে ছড়িয়ে বৃদ্ধি করতে পারে ভয়াবহ সংক্রমণ, যা থেকে নিরাপদে নেই বিশ^বাসী।

বিদ্যমান সংকুলকালে সুখের বার্তার মতো যুদ্ধ এবং মহামারীর এই ঘোরতর অস্থির, বিপজ্জনক ও অন্ধকার পরিস্থিতিতে উজ্জ্বল আলোর কথা জানিয়েছে World Happiness Report (WHR)- ২০২২। রিপোর্ট অনুযায়ী, সবচেয়ে সুখী দেশের তালিকায় সাত ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ ১৫৩টি দেশের মধ্যে আছে তালিকার ৯৪ নম্বরে। পূর্ববর্তী রিপোর্টে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০১তম। জাতিসংঘের এই ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে পরপর পাঁচ বছর বিশে^র সবচেয়ে সুখী দেশের শীর্ষ অবস্থানে আছে ফিনল্যান্ড।

বর্তমানে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের স্থান এ তালিকায় রয়েছে ৯৮ নম্বরে। ইউক্রেনে সেনা অভিযান চালানো রাশিয়ার স্থান তালিকায় ৮০ নম্বরে। ইউক্রেনে হামলার কারণে পুতিন সরকারের বিরুদ্ধে রাশিয়ায় নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আর দাঙ্গা ও সংঘাতকবলিত আফগানিস্তান তালিকার সবচেয়ে শেষে স্থান পেয়েছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, সুখের ক্ষেত্রে সার্বিয়া, বুলগেরিয়া এবং রোমানিয়া, এই তিনদেশের অর্জন অনেক বেশি। পক্ষান্তরে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে লেবানন, ভেনিজুয়েলা এবং আফগানিস্তানে। করোনা মহামারী ছাড়াও সুখের দিক থেকে কিছু কিছু দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ সন্ত্রাস, সংঘাত, আত্মকলহ ও নিরাপত্তার সংকট থেকে উদ্ভূত যুদ্ধ বা যুদ্ধাবস্থা। দক্ষিণ এশিয়ায় এবারও ভারতের ওপরে রয়েছে পাকিস্তান। তবে শুধু পাকিস্তানই নয়, বাংলাদেশ, চীন, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ প্রায় সব প্রতিবেশী দেশই ভারতের ওপরে রয়েছে। তালিকায় ২১ ধাপ ওপরে উঠেছে চীন। গত বারের তালিকায় চীন ছিল ৯৩ নম্বরে। নয়া তালিকায় চীনের ঠাঁই ৭২-এ। তালিকায় শ্রীলঙ্কা রয়েছে ১২৭ নম্বরে।

২০২২ সালের রিপোর্টি অন্যান্য বছরের মতো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তৈরি হয়নি। হয়েছে চলমান বৈশি^ক মহামারিকালে। যে মহামারি শুধু মৃত্যু, আক্রান্ত, বেদনা এবং যন্ত্রণাই এনে দেয়নি, মানবতামুখী ঐক্য, সামাজিক সমর্থন এবং দানশীলতারও বৃদ্ধি করেছে। বিশ^বাসী যখন রোগ এবং যুদ্ধের সঙ্গে লড়াই করছে, তখন সুখের সার্বজনীন আকাক্সক্ষায় চলমান সংকটকালে মানবিক প্রয়োজনে একে অপরের সমর্থনে এগিয়ে আসার বিষয়গুলো ছিল মানবতার ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এ বছর ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের ১০তম বার্ষিকী সম্পন্ন হয়েছে। এ কারণে অতীতের মতো এবারও বিশ^ব্যাপী ১৫৩টি দেশের মানুষেরা কীভাবে তাদের নিজের জীবনকে মূল্যায়ন করে, তা রিপোর্ট করতে সারা দুনিয়ায় সমীক্ষা বা জরিপ গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করে ডেটা সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে মৌলিক যে সত্যটি গবেষণার মাধ্যমে প্রতিভাত হয়েছে যে, যুদ্ধ, সন্ত্রাস, দাঙ্গা, হাঙ্গামায় অশান্তি হয়, বরং মানুষের মধ্যে সুখের আগ্রহই সর্বজনীন এবং বিশ^জনীন। মানুষ সব সময় সুখ খোঁজে অথচ কখনো সুখের দেখা পায় না।

ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট প্রথম প্রকাশিত হওয়ার সময় বিশ^ সুখের প্রতিবেদনটিকে দুটি মূল ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। যথা- সুখ মূল্যায়ন বা মতামত বা সমীক্ষার মাধ্যমে পরিমাপযোগ্য করা এবং সুখের মূল নির্ধারকগুলো আনুমানিক বা কাল্পনিক নয়, বরং চিহ্নিত বা শনাক্তযোগ্য করা। এ দুটি মানদ-ের মাধ্যমে গবেষণা কাঠামোটি ব্যক্তির মাধ্যমে বিশে^র দেশগুলোর সামগ্রিক জীবনমান ও জীবন-প্রবাহে ‘সুখ’ নামক প্রপঞ্চকে মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যা করে। এ প্রতিবেদনের তথ্যাবলি প্রকারান্তরে বিশে^র দেশগুলোকে সুখী মানবসম্পদ, সমাজ, পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা অর্জনের নীতি প্রণয়ণে ও পদক্ষেপ গ্রহণে বিশেষভাবে সাহায্য করে ও পথ দেখায়। এক দশক আগে, সারা বিশে^র সরকারগুলো বিশ^ব্যাপী উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্রে ‘সুখ’ নামক ধারণাকে রাখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট আগ্রহী না হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে তাদের আগ্রহ ও ইচ্ছে বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছে। বিশ^ সুখের প্রতিবেদনের ফলে বিশ^ব্যাপী মানবিক সুখের মাধ্যমে বৃহত্তর কল্যাণের পথ খুঁজে বের করার বৈশি^ক সংকল্প বৃদ্ধি পেয়েছে। চলমান মহামারী এবং যুদ্ধের কারণে ব্যক্তিগত সুখ, সামাজিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তা ভয়ানক হুমকির সম্মুখীন, তথাপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায়, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়েছে। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট চালু হওয়ার পর থেকে সুখ এবং জীবনের সন্তুষ্টি যথাযথভাবে উপলব্ধি ও পরিমাপের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। ‘গ্যালাপ ওয়ার্ল্ড পোলে’ উপলব্ধ ডেটা দ্বারা তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

তাছাড়া, প্রতি বছরই ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের আকার ও পরিধি বাড়ছে এবং বিশে^র দেড় শতাধিক দেশকে বছরের পর বছর জরিপের মাধ্যমে কভার করায় পনের বছরের ডেটার প্রাপ্যতার এক অনন্য স্টক তৈরি হয়েছে। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে বিবেচনা করা ডেটার মাধ্যমে সারা বিশে^র মানুষ কীভাবে তাদের নিজেদের সুখকে মূল্যায়ন করে তার একটি স্ন্যাপশট পাওয়া যাচ্ছে। তদুপরি, সুস্থতার বিজ্ঞানবিষয়ক চর্চায় সাম্প্রতিক বাস্তবতার গভীর অন্তর্দৃষ্টিও তৈরি করছে এসব ডেটা। মানুষের অবস্থা বোঝার জন্য এবং কীভাবে মানুষ, সম্প্রদায় এবং দেশগুলোকে সুখী জীবনের দিকে অগ্রসর হতে সহায়তা করা যায়, তা বোঝার জন্য এসব তথ্য অবিশ^াস্যভাবে শক্তিশালী। বিগত ১০ বছরের মূল্যায়নে আরও দেখা গেছে, বছরের পর বছর ধরে বিশ^ সুখের প্রতিবেদনের তথ্যে সুখের প্রতি ব্যক্তিগত ও সামাজিক সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পারস্পরিক উদারতা, মানবিক সততা, সহমর্মিতা ও আত্মত্যাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ক্রমশই প্রাধান্য লাভ করেছে। এতে বিশ^নেতাদের জন্য রয়েছে সতর্কবাণী এবং সতর্কবার্তা।

ব্যক্তি স্বাধীনতা, সরকারের ওপর আস্থা, সুস্থ জীবনযাপনের প্রত্যাশার মতো মাপকাঠিও মাথায় রাখা হয়েছে এ রিপোর্ট তৈরির সময়। এসব মাপকাঠিতে অনেক দেশের মান যে আশানুরূপ নয়, তা স্পষ্ট। পৃথিবীর মোট ১৪৬টি দেশ থেকে তথ্যের ভিত্তিতে রিপোর্ট প্রণয়নকালে জাতিসংঘের ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক’ বিভিন্ন দেশের মানুষকে ফোন করে নানাবিধ প্রশ্ন করেছে। জানতে চাওয়া হয়, তারা সুখী কি না বা কেন সুখী ইত্যাদি। রিপোর্ট তৈরির সময় নজরে রাখা হয় দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধির হার, মানুষের গড় আয়ু, সামাজিক সহায়তা, কাজ করার স্বাধীনতা, দুর্নীতির মতো বিষয়গুলোও। প্রতিবেদন প্রণয়ন কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অক্সফোর্ডের ‘ওয়েলবিইং রিসার্চ সেন্টার’, ‘সেন্টার ফর সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট’, ‘ভ্যাঙ্কুভার স্কুল অব ইকোনমিকস’। ফলে মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য গবেষণার মাধ্যমে প্রণীত এ রিপোর্টের সুখী দেশের যে চিত্র উদ্ভাসিত হয়েছে, তা সবার কাছে বিশ^স্ততা অর্জন করেছে। সুতোর টান ঘুড়িটাকে পরাধীন করে রাখে। সুতোকে পরাধীন করে নাটাই। নাটাইকে পরাধীন করে মানুষ। আর মানুষকে পরাধীন করে মানুষ নিজেই। মানুষের এই পরাধীনতার অদৃশ্য সুতোটা পরাধীন হতে হতে কোথায় গিয়ে ঠেকে সেটা মানুষ নিজে জানে না। হয়তো জানে কিন্তু সেটা স্বীকার করতে চায় না। মানুষ সব সময় তার ভালোত্বকে প্রচার করে, মন্দত্বকে গোপন রাখে।

গুন্টার উভেন্টস, বর্তমান বয়স ৩৭ বছর। যখন তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর, তখন ভরা ক্লাসে সহপাঠীদের সামনে তাকে শাসন করেছিলেন শিক্ষিকা মারিয়া ভেরিল্যান্ডেন। সেদিনের ওই ছাত্রের দাবি, তিনি নির্দোষ ছিলেন। এমনি এমনি তাকে শাস্তি দিয়েছিলেন শিক্ষিকা। এরপর কেটে গেছে ৩০ বছরেরও বেশি সময়। তবে অপমানের ‘জ্বালা’ ভোলেনি গুন্টার উভেন্টস। তাই প্রতিশোধের আগুন মিটিয়েছে শিক্ষিকাকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। ঘটনাটি ঘটেছে ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামে। মারিয়া ভেরিল্যান্ডেনকে হত্যা করতে একদিন তার বাড়িতে ঢুকে ১০১ বার ছুরি দিয়ে কোপ বসায় গুন্টার উভেন্টস। এতে নিহত হন ওই শিক্ষিকা। দু’বছর পর আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে নেয় গুন্টার। তার স্বীকারোক্তি শুনে হতবাক আইনজীবীরাও।

তদন্তকারীদের গুন্টার জানায়, সেদিন ক্লাসে বিনা কারণে তাকে অপমান করেছিলেন শিক্ষিকা মারিয়া ভেরিল্যান্ডেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। তারপর ৩০ বছর কেটে গেলেও অপমানের জ্বালা মেটেনি। প্রতিশোধ নিতেই হবে। সেই উদ্দেশ্যে ২০২০ সালে অ্যান্টওয়ার্পে ওই শিক্ষিকার বাড়ি যায় গুন্টার। তারপর ৫৯ বছর বয়সী শিক্ষিকাকে ক্ষতবিক্ষত করে ছুরির আঘাতে। তদন্তে নেমে অপরাধীকে শনাক্ত করতে বেগ পায় পুলিশ। শিক্ষিকার পাশেই পড়েছিল তার মানিব্যাগ। সেখানে নগদ টাকা ছিল। বাড়ির আসবাবপত্রও ছিল যথাস্থানেই। তাহলে খুনের কারণ কী? ঘটনার ১৬ মাস পর ২০২০ সালের নভেম্বরে এক বন্ধুর কাছে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে গুন্টার। সেই বন্ধুই পুলিশকে জানানোর পর অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। দ্য গার্ডিয়ান জানায় আদালত খুনের দায়ে গুন্টারকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]