শিক্ষার মানোন্নয়নে যেতে হবে বহুদূর

বাপ্পু সিদ্দিকী

একজন শিশু জন্মের পর তার পরিবারের স্নেহচ্ছায়ায় দিন দিন বেড়ে উঠে। এ সময় সে জীবনের কিছু মৌলিক বিষয় আয়ত্ত করে ফেলে, যা তার সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশে দরিদ্র শিশুরা কোন রকম বর্ণ পরিচয়, সংখ্যা পরিচয় ব্যতিরেকেই স্কুলে যখন আসতে শুরু করে তখন শিক্ষিত মা-বাবার সন্তানরা পরিবার থেকে আগেভাগেই বর্ণ পরিচয়সহ সংখ্যা গণনার ধারণা ও দক্ষতা নিয়ে স্কুলে প্রবেশ করে।

দরিদ্র ও নিরক্ষর পরিবারের সন্তানরা প্রতিযোগিতায় উচ্চবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের সন্তানদের তুলনায় পিছিয়ে থেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসা শুরু করে। এটা খুবই স্বাভাবিক তারা দরিদ্র বলেই বিদ্যালাভের পূর্বে তাদের জীবিকার কথা ভাবতে হয়। তাদের এগিয়ে নিতে চাইলে তাদের পুরো শিক্ষাটা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্কুলেই দিতে হবে, নইলে শিক্ষাব্যবস্থার শুরুতেই ধনী-দরিদ্র, এবং স্বাক্ষর-নিরক্ষর শ্রেণীর অভিবাবকদের সন্তানের মধ্যে এক বিশাল বৈষম্য সৃষ্টি হয়ে যাবে।

যেহেতু আমাদের প্রাথমিক স্তরে ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী দরিদ্র ও নিরক্ষর পরিবারের, তাই এদের পিছিয়ে রেখে দিনবদলের বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে না। প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলিকে সেই লক্ষ্যে সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে; যেহেতু বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ও মানবিক গুণসম্পন্ন একজন মানুষ গড়ার মূল ভিত্তিই হলো তার প্রাথমিক শিক্ষা, তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু ও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির কোন বিকল্প থাকতে পারে না।

আমাদের সমৃদ্ধির লাল-সবুজ প্রত্যয়ে আমরা খুঁজে পেতে চাই এক অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সার্বজনীন বাংলাদেশকে। যে দেশে কেউ বেকার থাকবে না; কেউ শিক্ষা বঞ্চিত বা নিরক্ষর থাকবে না; সকলেই হবে শিক্ষিত ও আলোকিত। তাই সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ এখনই প্রয়োজন।

বাংলাদেশের নাগরিকদের স্বীকৃত পাঁচটি মৌলিক অধিকারের একটি শিক্ষা। শিক্ষিত মানুষ উন্নয়নের চাবিকাঠি আর শিক্ষিত জাতি দারিদ্র্য বিমোচনে উন্নয়নের আলোকবর্তিকা। দেশের ২০ কোটি মানুষকে মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলাই বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি উদ্যোগে দিন দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দেশে এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার। এর মধ্যে সরকারি ৬৫ হাজার।

প্রায় প্রত্যেক গ্রামেই এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ, যার মধ্যে ছাত্রীর হার ৫০.৭৫ শতাংশ। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক এবং মেয়েদের ভেতর লেখাপড়ার আগ্রহ তুলনামূলক বেশি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আমি লক্ষ্য করেছি প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। মাধ্যমিকেও এ হার খুব কম নয়।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় পর্যায়ে ‘শিখন সংকট’ (Problem of learning) অত্যন্ত প্রকট। সংখ্যায় ও গুণগতমানে উপযুক্ত শিক্ষক গ্রামের স্কুলগুলোতে খুবই কম, শহরের স্কুলগুলোতে এর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও দরিদ্র শ্রেণীর অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের প্রাইভেট পড়াতে বা গৃহ শিক্ষকের আনুকূল্য লাভে সক্ষম হন না। পক্ষান্তরে শিক্ষিত ও সচ্ছল মা-বাবা নিজেরাও পড়াশোনার ব্যাপারে তাদের নিজ সন্তানদের সহায়তা দিতে পারেন। শিক্ষকদের একটি বড় অংশ প্রাইভেট পড়াতে বেশি উৎসাহী হওয়াতে শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত পড়াশোনায় বিঘœ ঘটে।

শিক্ষার মান হ্রাস পাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব। তদবির, তকদির ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে এক সময় ব্যাপকসংখ্যক বেকার গ্র্যাজুয়েট স্কুল শিক্ষক হয়ে গেছেন। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এদের দায় রাষ্ট্রকে বহন করতেই হবে। প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেও এরা স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে নিজেদের যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে পারছে না। এদের হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠে প্রশ্ন তৈরির ক্ষেত্রে। গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরতায় তারা অনেকেই সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করতে অক্ষম। গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি ও অঙ্কের উপযুক্ত ডিগ্রিধারী শিক্ষক নেই; এ কারণে দুটি বিষয়ে অপ্রতুল জ্ঞান নিয়ে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে তারা পরে সুবিধা করতে পারছে না।

বস্তুত এই দুর্বলতা নিয়েই প্রতি বছর হাজারো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার পথে যাত্রা করছে। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত শিক্ষকদের জ্ঞানের দুর্বলতা ও উপযুক্ত শিক্ষক সংখ্যার স্বল্পতা। ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে পর্যাপ্তসংখ্যক উপযুক্ত শিক্ষক অবিলম্বে নিয়োগ দিতে চাইলে শিক্ষকতার পেশাকে মূল্যায়িত করতে হবে; তা না হলে মাধ্যমিকে ভালো ফলাফলধারীরা এ পেশায় এগিয়ে আসবে না। মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেতন-ভাতা যদি আকর্ষণীয় করে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করা যায় তবেই এ পেশায় যোগ্যতা সম্পন্নরা এগিয়ে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।

সরকার ইতোমধ্যে মাধ্যমিক শিক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। আগামী বছর প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন করা হচ্ছে! ২০২৩ সাল থেকে দেশের ৬২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন কারিকুলামের পাইলটিং শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি থেকে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। ২০২৪ সালে নবম ও দশম শ্রেণীতে আর আর্টস, কমার্স, সায়েন্স বিভাগ থাকবে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নতুন কারিকুলাম বাস্তাবায়নে বিশাল আকারের বিনিয়োগ করা হবে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনা হবে।

জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, মূল্যবোধ ও সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎকর্ষতা সাধনই হবে মূল লক্ষ্য। জাতির জনক বলে গেছেন, মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি বিশ্ব দরবারে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারে না। তার যোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাই শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার দ্বার সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এখন বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা তৈরি করতে পারলেই শুধু লক্ষ্য পূরণে আমরা এগিয়ে যেতে পারব। ধনী-গরিবের সন্তানের জন্য আলাদা পাঠ্যক্রম, আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা নয়, একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।

তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে সেটিই হবে বর্তমান সরকারের বড় সাফল্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৬৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। আমাদের প্রত্যাশা ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা শতাংশের হিসেবে বৃদ্ধি পেয়ে ৮১ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

শিক্ষাব্যবস্থা আজ বহুলাংশে ডিজিটাল হয়েছে। এটি আমাদের একটা বড় অর্জন। করোনাকালে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল- তবু শিক্ষা কার্যক্রম একদম বন্ধ থাকেনি। ভার্চুয়ালি জুমের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থীরা ক্লাস করেছে, পরীক্ষা দিয়েছে; কিন্তু গ্রামাঞ্চলে আন্তর্জালিক শিক্ষা প্রসারের সুযোগ এখনো সীমিত। তবু আমরা আশাবাদী শত প্রতিকূলতা দূর করে আলো আসবেই। গুণগত ও মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত জাতিই হবে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর জাতি।

মানুষ তখনই সব কিছুকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারবে, যখন সে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ হবে। সেই মানুষই হবে সভ্যতার রথ চালক, জাতির সম্পদ। সেই লক্ষ্যে শিক্ষার মানোন্নয়নে আমাদের যেতে হবে আরও বহুদূর। শুধু শিক্ষক, শিক্ষাব্যবস্থা-সংক্রান্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোই নয়, শিক্ষার মান বাড়াতে এবং সব দৈন্যতা ঠেকাতে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

[লেখক : সাবেক প্রধান শিক্ষক]

bappusiddique13@gmail.com

সোমবার, ০৪ এপ্রিল ২০২২ , ২১ চৈত্র ১৪২৮ ০১ রমাদ্বান ১৪৪৩

শিক্ষার মানোন্নয়নে যেতে হবে বহুদূর

বাপ্পু সিদ্দিকী

একজন শিশু জন্মের পর তার পরিবারের স্নেহচ্ছায়ায় দিন দিন বেড়ে উঠে। এ সময় সে জীবনের কিছু মৌলিক বিষয় আয়ত্ত করে ফেলে, যা তার সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশে দরিদ্র শিশুরা কোন রকম বর্ণ পরিচয়, সংখ্যা পরিচয় ব্যতিরেকেই স্কুলে যখন আসতে শুরু করে তখন শিক্ষিত মা-বাবার সন্তানরা পরিবার থেকে আগেভাগেই বর্ণ পরিচয়সহ সংখ্যা গণনার ধারণা ও দক্ষতা নিয়ে স্কুলে প্রবেশ করে।

দরিদ্র ও নিরক্ষর পরিবারের সন্তানরা প্রতিযোগিতায় উচ্চবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের সন্তানদের তুলনায় পিছিয়ে থেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসা শুরু করে। এটা খুবই স্বাভাবিক তারা দরিদ্র বলেই বিদ্যালাভের পূর্বে তাদের জীবিকার কথা ভাবতে হয়। তাদের এগিয়ে নিতে চাইলে তাদের পুরো শিক্ষাটা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্কুলেই দিতে হবে, নইলে শিক্ষাব্যবস্থার শুরুতেই ধনী-দরিদ্র, এবং স্বাক্ষর-নিরক্ষর শ্রেণীর অভিবাবকদের সন্তানের মধ্যে এক বিশাল বৈষম্য সৃষ্টি হয়ে যাবে।

যেহেতু আমাদের প্রাথমিক স্তরে ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী দরিদ্র ও নিরক্ষর পরিবারের, তাই এদের পিছিয়ে রেখে দিনবদলের বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে না। প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলিকে সেই লক্ষ্যে সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে; যেহেতু বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ও মানবিক গুণসম্পন্ন একজন মানুষ গড়ার মূল ভিত্তিই হলো তার প্রাথমিক শিক্ষা, তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু ও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির কোন বিকল্প থাকতে পারে না।

আমাদের সমৃদ্ধির লাল-সবুজ প্রত্যয়ে আমরা খুঁজে পেতে চাই এক অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সার্বজনীন বাংলাদেশকে। যে দেশে কেউ বেকার থাকবে না; কেউ শিক্ষা বঞ্চিত বা নিরক্ষর থাকবে না; সকলেই হবে শিক্ষিত ও আলোকিত। তাই সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ এখনই প্রয়োজন।

বাংলাদেশের নাগরিকদের স্বীকৃত পাঁচটি মৌলিক অধিকারের একটি শিক্ষা। শিক্ষিত মানুষ উন্নয়নের চাবিকাঠি আর শিক্ষিত জাতি দারিদ্র্য বিমোচনে উন্নয়নের আলোকবর্তিকা। দেশের ২০ কোটি মানুষকে মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলাই বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি উদ্যোগে দিন দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দেশে এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার। এর মধ্যে সরকারি ৬৫ হাজার।

প্রায় প্রত্যেক গ্রামেই এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ, যার মধ্যে ছাত্রীর হার ৫০.৭৫ শতাংশ। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক এবং মেয়েদের ভেতর লেখাপড়ার আগ্রহ তুলনামূলক বেশি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আমি লক্ষ্য করেছি প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। মাধ্যমিকেও এ হার খুব কম নয়।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় পর্যায়ে ‘শিখন সংকট’ (Problem of learning) অত্যন্ত প্রকট। সংখ্যায় ও গুণগতমানে উপযুক্ত শিক্ষক গ্রামের স্কুলগুলোতে খুবই কম, শহরের স্কুলগুলোতে এর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও দরিদ্র শ্রেণীর অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের প্রাইভেট পড়াতে বা গৃহ শিক্ষকের আনুকূল্য লাভে সক্ষম হন না। পক্ষান্তরে শিক্ষিত ও সচ্ছল মা-বাবা নিজেরাও পড়াশোনার ব্যাপারে তাদের নিজ সন্তানদের সহায়তা দিতে পারেন। শিক্ষকদের একটি বড় অংশ প্রাইভেট পড়াতে বেশি উৎসাহী হওয়াতে শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত পড়াশোনায় বিঘœ ঘটে।

শিক্ষার মান হ্রাস পাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব। তদবির, তকদির ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে এক সময় ব্যাপকসংখ্যক বেকার গ্র্যাজুয়েট স্কুল শিক্ষক হয়ে গেছেন। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এদের দায় রাষ্ট্রকে বহন করতেই হবে। প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেও এরা স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে নিজেদের যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে পারছে না। এদের হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠে প্রশ্ন তৈরির ক্ষেত্রে। গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরতায় তারা অনেকেই সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করতে অক্ষম। গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি ও অঙ্কের উপযুক্ত ডিগ্রিধারী শিক্ষক নেই; এ কারণে দুটি বিষয়ে অপ্রতুল জ্ঞান নিয়ে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে তারা পরে সুবিধা করতে পারছে না।

বস্তুত এই দুর্বলতা নিয়েই প্রতি বছর হাজারো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার পথে যাত্রা করছে। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত শিক্ষকদের জ্ঞানের দুর্বলতা ও উপযুক্ত শিক্ষক সংখ্যার স্বল্পতা। ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে পর্যাপ্তসংখ্যক উপযুক্ত শিক্ষক অবিলম্বে নিয়োগ দিতে চাইলে শিক্ষকতার পেশাকে মূল্যায়িত করতে হবে; তা না হলে মাধ্যমিকে ভালো ফলাফলধারীরা এ পেশায় এগিয়ে আসবে না। মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেতন-ভাতা যদি আকর্ষণীয় করে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করা যায় তবেই এ পেশায় যোগ্যতা সম্পন্নরা এগিয়ে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।

সরকার ইতোমধ্যে মাধ্যমিক শিক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। আগামী বছর প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন করা হচ্ছে! ২০২৩ সাল থেকে দেশের ৬২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন কারিকুলামের পাইলটিং শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি থেকে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। ২০২৪ সালে নবম ও দশম শ্রেণীতে আর আর্টস, কমার্স, সায়েন্স বিভাগ থাকবে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নতুন কারিকুলাম বাস্তাবায়নে বিশাল আকারের বিনিয়োগ করা হবে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনা হবে।

জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, মূল্যবোধ ও সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎকর্ষতা সাধনই হবে মূল লক্ষ্য। জাতির জনক বলে গেছেন, মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি বিশ্ব দরবারে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারে না। তার যোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাই শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার দ্বার সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এখন বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা তৈরি করতে পারলেই শুধু লক্ষ্য পূরণে আমরা এগিয়ে যেতে পারব। ধনী-গরিবের সন্তানের জন্য আলাদা পাঠ্যক্রম, আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা নয়, একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।

তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে সেটিই হবে বর্তমান সরকারের বড় সাফল্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৬৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। আমাদের প্রত্যাশা ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা শতাংশের হিসেবে বৃদ্ধি পেয়ে ৮১ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

শিক্ষাব্যবস্থা আজ বহুলাংশে ডিজিটাল হয়েছে। এটি আমাদের একটা বড় অর্জন। করোনাকালে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল- তবু শিক্ষা কার্যক্রম একদম বন্ধ থাকেনি। ভার্চুয়ালি জুমের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থীরা ক্লাস করেছে, পরীক্ষা দিয়েছে; কিন্তু গ্রামাঞ্চলে আন্তর্জালিক শিক্ষা প্রসারের সুযোগ এখনো সীমিত। তবু আমরা আশাবাদী শত প্রতিকূলতা দূর করে আলো আসবেই। গুণগত ও মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত জাতিই হবে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর জাতি।

মানুষ তখনই সব কিছুকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারবে, যখন সে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ হবে। সেই মানুষই হবে সভ্যতার রথ চালক, জাতির সম্পদ। সেই লক্ষ্যে শিক্ষার মানোন্নয়নে আমাদের যেতে হবে আরও বহুদূর। শুধু শিক্ষক, শিক্ষাব্যবস্থা-সংক্রান্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোই নয়, শিক্ষার মান বাড়াতে এবং সব দৈন্যতা ঠেকাতে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

[লেখক : সাবেক প্রধান শিক্ষক]

bappusiddique13@gmail.com