নিরাপত্তাকর্মী-পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ছদ্মবেশে ডাকাত চক্র

বারবার কারাভোগেও থামেনি

নিজেদের পরিচয় গোপন করার জন্য ডাকাত চক্রের সদস্যরা প্রথমে ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করে। পরে সেগুলো ব্যবহার করে টার্গেটকৃত দোকানের মার্কেটে নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে যোগদান করে। সেখানে কাজ করার সুবাদে মার্কেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থার খুটিনাটি খোঁজখবর নিতে থাকে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন হলে মার্কেটে দোকানও ভাড়া নেয়া হয়। একপর্যায়ে টার্গেটকৃত জায়গায় লুট করার পর আত্মগোপনে গিয়ে নিজেদের মধ্যে সবধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় চক্রের সদস্যরা। কিছুদিন অতিবাহিত হলে আবারো নতুন লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে মাঠে নামতো তারা। এভাবে একযুগ ধরে ব্যাংক ডাকাতি ও একাধিক স্বর্ণের দোকানে লুট করা হয়। এসব ঘটনায় কারাভোগ করেও দমে যায়নি তারা।

সর্বশেষ গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর কচুক্ষেতের রজনীগন্ধা টাওয়ারের নিচতলায় রাঙাপরী জুয়েলার্স নামে একটি স্বর্ণের দোকান থেকে প্রায় ৩০০ ভরি স্বর্ণ লুটের ঘটনায় এ ডাকাত চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তারা হলেনÑ মূলহোতা মো. রাজা মিয়া (৫৪), তার সহযোগী মো. কাউসার হোসেন ওরফে বাচ্চু মাস্টার (৪২) ও মো. মাসুদ খান (৪২)। গত সোমবার রাতে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ঢাকার মুন্সীগঞ্জ ও বরিশাল জেলা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১৯ দশমিক ৭০ গ্রাম স্বর্ণ ও নগদ তিন লাখ ২৯ হাজার ১৮০ টাকা উদ্ধার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা রাঙাপরী জুয়েলার্সে স্বর্ণ ডাকাতির কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা সংঘবদ্ধ ব্যাংক ডাকাতি ও স্বর্ণালঙ্কার লুট চক্রের সক্রিয় সদস্য। এই চক্রের সদস্য সংখ্যা ৮-১০ জন। তারা বিভিন্ন পেশার আড়ালে দীর্ঘদিন যাবৎ পারস্পারিক যোগসাজশে দেশের বিভিন্ন স্থানের স্বর্ণের দোকান লুট, ব্যাংক ডাকাতি ও বিভিন্ন মার্কেটে লুট করে আসছে। কচুক্ষেতের রাঙাপরী জুয়েলার্সে স্বর্ণ ডাকাতির আগেও চক্রটি ২০১৪ সালে ব্রাক ব্যাংকের জয়পুরহাট শাখার ভল্ট ভেঙে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা লুট করে। এ ঘটনায় তারা ব্যাংকের পাশের একটি ঘরে একটি এনজিও’র নামে মিথ্যা পরিচয়ে ভাড়া নেয়। ভল্ট লুটের ১ সপ্তাহ আগে থেকে স্ক্রু ড্রাইভার ও শাবল দিয়ে দেয়াল কেটে ব্যাংকের ভল্টে ঢুকে ওই টাকা লুট করে পালিয়ে যায়।

পরবর্তীতে র‌্যাবের অভিযানে রাজা মিয়াসহ ৭ জন গ্রেপ্তার হয়। এ ঘটনায় রাজা মিয়া ৩ বছর কারাভোগ করে। একইভাবে তারা ২০১৮ সালে সিদ্ধিরগঞ্জে দুটি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি করে ৪৫৫ ভরি স্বর্ণ ও ২ লাখ টাকা লুট করে। পরবর্তীতে র‌্যাবের অভিযানে রাজাসহ চক্রের ৩ জন গ্রেপ্তার হয় এবং কারাভোগ করে। এরপর ২০২০ সালে ডেমরার হাজী হোসেন প্লাজায় স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি করে ২৩০ ভরি স্বর্ণ ও দেড় লাখ টাকা লুট করে। উক্ত ঘটনার আনুমানিক দুই মাস আগে এই চক্রের ৩ সদস্য মিথ্যা পরিচয়ে একটি সিকিউরিটিজ কোম্পানির গার্ড হিসেবে মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে যোগ দেয়। এতদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে তারা গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম ছিল।

র‌্যাবের মুখপাত্র বলেন, রাঙাপরী জুয়েলার্সে লুটের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঘটনার দেড় মাস আগে রজনীগন্ধা মার্কেটে ভুয়া পরিচয়ে একটি দোকান ভাড়া নেয় চক্রের সদস্য। ওই দোকানে নাম সর্বস্ব মালামাল রেখে কৌশলে চুরির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামাদি মজুদ করা হয়। লুট চক্রের মূলহোতা গ্রেপ্তারকৃত রাজা মিয়া ও তার সহযোগী কাউসার মাস্টারসহ অজ্ঞাত আরও ৩-৫ জন সদস্য ঘটনার দিন রাত ১২টায় মিরপুর-১৪ নম্বর গোলচত্বরে একত্রিত হয়। গ্রেপ্তারকৃত মাসুদ তাদেরকে রাত ১টা নাগাদ রজনীগন্ধা মার্কেটে আসতে বলে। এই সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত মাসুদ মার্কেটের অন্য নিরাপত্তাকর্মীদের কৌশলে খাবার ও পানীয়ের সঙ্গে চেতনানাশক সেবন করিয়ে তাদের অজ্ঞান করে। পরিকল্পনা মোতাবেক অন্যরা মার্কেটের সামনে আসলে মাসুদ ও তার এক সহযোগী গেটের তালা খুলে তাদেরকে আগেই ভাড়াকৃত দোকানের ভেতর নিয়ে যায়।

কাউসার মাস্টার ও তার এক সহযোগী মার্কেটের বাইরের চারপাশ নজরদারিতে থাকে। পরবর্তীতে রাত ২টার দিকে কাউসার মাস্টারের দোকান হতে আগে থেকে মজুদ করে রাখা তালা ভাঙার যন্ত্রপাতি দিয়ে দুটি দোকানের তালা এবং শাটার ভেঙে রাজা মিয়াসহ আরও ২/৩ জন দোকানের ভেতরে যায়। দোকানের ভেতর থাকা স্বর্ণলঙ্কার ও নগদ টাকা লুট করে তাদের ভাড়াকৃত দোকানে নিয়ে যায়। ঘটনা চলাকালীন সময়ে মাসুদ দোকানের বাহিরে পাহারা দেয়। দোকানে যে স্বর্ণালঙ্কার লুট হয়েছে তা যেন আগে থেকে না বুঝা যায় সে জন্য তারা দোকানে নতুন তালা লাগিয়ে দেয়। অতঃপর ভোরে লুটকৃত মালামালসহ কেরানীগঞ্জে কাউসার মাস্টারের আগে থেকে ভাড়াকৃত বাসায় চলে যায়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানায়, ঘটনার দিন সকালেই তারা লুটকৃত স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা, নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে তাদের গ্রামের বাড়ি চলে যায়। এ চক্রের মূলহোতা গ্রেপ্তারকৃত রাজা মিয়া একজন দক্ষ তালা ভাঙার মেকার এবং অন্যরা বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী। গ্রেপ্তারকৃতরা খুব সাধারণ বেশভূষা ধারণ করে চলাফেরা করত যেন কেউ তাদেরকে কোন প্রকার সন্দেহ না করে। গ্রেপ্তারকৃত কাউসার মাস্টার সব প্রকার ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে রাজধানীর মিরপুরের একটি সিকিউরিটি এজেন্সির নাম ব্যবহার করে মাসুদকে রজনীগন্ধা মার্কেটে সিকিউরিটি গার্ড এ চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তারা বিভিন্ন সময়ে মার্কেটের সিকিউরিটিসহ অন্য বিষয়ের খোঁজখবর নিতে থাকে এবং স্বর্ণের দোকান লুটের পরিকল্পনা করতে থাকে। রাজা মিয়া তার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাউসারের ভাড়াকৃত দোকানে নাম সর্বস্ব মালামাল রেখে কৌশলে লুটের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামাদি মজুদ করে।

র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, রাজা মিয়া ১৯৯০ সালে বাসের কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ শুরু করে। ২০০২ সালের দিকে বর্ণিত সংঘবদ্ধ চক্রটির সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে এবং সেই থেকেই সে অপরাধে জগতে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে বাস কন্ডাক্টরির পরিবর্তে অটোরিক্সা চালানো শুরু করে। সে অটোরিকশা চালানোর আড়ালে পরিকল্পনামতো লুট/ডাকাতির উদ্দেশে বিভিন্ন মার্কেটে রেকি করত। গ্রেপ্তারকৃত রাজা মিয়া একজন দক্ষ তালা-চাবির মেকার। সে অর্ধ-শতাধিক চুরি/ডাকাতির ঘটনায় জড়িত বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। বর্ণিত ঘটনায় সে দোকানে লুটের পরিকল্পনা করে এবং লুটের সময় স্বর্ণের দোকানে শাটারের তালা ভাঙার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। ইতোপূর্বে তার নামে চুরি ও ডাকাতি সংক্রান্ত দুটি মামলায় কারাভোগ করেছে।

গ্রেপ্তারকৃত কাউসার হোসেন মাধ্যমিক সম্পন্ন করে আরআরএমপির একটি প্রকল্পে চাকরি নেয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সাল থেকে ঢাকায় এক আইনজীবীর অফিস সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করে। ২০১৮ সালে মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে সংঘবদ্ধ ডাকাতি ও স্বর্ণালঙ্কার লুট চক্রের এক সদস্য আদালতে আসলে সেখানে কাউসারের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। ২০১৮ সালে সিদ্ধিরগঞ্জের স্বর্ণালঙ্কার লুটে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে এবং র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করে। অপরাধ জগতে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এবং ভুয়া সবকিছু তৈরি করতে সিদ্ধ বিধায় তাকে তাদের চক্রের সদস্যরা মাস্টার উপাধি দেয়।

আর মাসুদ ঢাকার একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ক্লিনার ও বয় হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে। চাইনিজ রেস্টুরেন্টে চাকরি করা অবস্থায় ২০১০ সালের দিকে এই চক্রের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে সখ্যতা গড়ে তোলে। সে ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জে একটি গার্মেন্টসে চাকরি নেয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে থাকা অবস্থায় নারায়নগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন হাজী আহসান উল্লাহ সুপার মার্কেটের দুটি স্বর্ণের দোকানের প্রায় ২ কেজি স্বর্ণ লুট করে। সেই লুটের ঘটনায় সে কারাভোগ করে। তার নামে ৩টি চুরির মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলেও জানান কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

আরও খবর
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আশাব্যঞ্জক আলোচনা হয়েছে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে
পানি উন্নয়ন বোর্ডকে মিলিটারি কায়দায় কাজ করতে বললেন প্রধানমন্ত্রী
ফ্রিল্যান্সিংয়ে বদলে যাওয়া জীবন
মহাসড়কে পণ্যবাহী গাড়ি থামানো যাবে না
রংপুরের তারাগঞ্জে পুলিশ প্রটেকশনে বিধবার জমি দখলের চেষ্টা
উত্তীর্ণ ৭৯ হাজার ৩৩৭ জন, এগিয়ে মেয়েরা
সবার সেরা খুলনার মীম
৬ বছরেও তামাককর কাঠামো বাস্তবায়ন হয়নি, সহজ লভ্যতায় হুমকিতে জনস্বাস্থ্য
সুনামগঞ্জে আরও ২ স্থানে বাঁধ ভেঙে ফসলহানি, ঝুঁকিপূর্ণ বেশ কয়েকটি
হাওরের বাঁধ কি ফসল রক্ষায় কাজে আসছে
অনলাইনে জন্মসনদ

বুধবার, ০৬ এপ্রিল ২০২২ , ২৩ চৈত্র ১৪২৮ ০৪ রমাদ্বান ১৪৪৩

নিরাপত্তাকর্মী-পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ছদ্মবেশে ডাকাত চক্র

বারবার কারাভোগেও থামেনি

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

নিজেদের পরিচয় গোপন করার জন্য ডাকাত চক্রের সদস্যরা প্রথমে ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করে। পরে সেগুলো ব্যবহার করে টার্গেটকৃত দোকানের মার্কেটে নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে যোগদান করে। সেখানে কাজ করার সুবাদে মার্কেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থার খুটিনাটি খোঁজখবর নিতে থাকে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন হলে মার্কেটে দোকানও ভাড়া নেয়া হয়। একপর্যায়ে টার্গেটকৃত জায়গায় লুট করার পর আত্মগোপনে গিয়ে নিজেদের মধ্যে সবধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় চক্রের সদস্যরা। কিছুদিন অতিবাহিত হলে আবারো নতুন লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে মাঠে নামতো তারা। এভাবে একযুগ ধরে ব্যাংক ডাকাতি ও একাধিক স্বর্ণের দোকানে লুট করা হয়। এসব ঘটনায় কারাভোগ করেও দমে যায়নি তারা।

সর্বশেষ গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর কচুক্ষেতের রজনীগন্ধা টাওয়ারের নিচতলায় রাঙাপরী জুয়েলার্স নামে একটি স্বর্ণের দোকান থেকে প্রায় ৩০০ ভরি স্বর্ণ লুটের ঘটনায় এ ডাকাত চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তারা হলেনÑ মূলহোতা মো. রাজা মিয়া (৫৪), তার সহযোগী মো. কাউসার হোসেন ওরফে বাচ্চু মাস্টার (৪২) ও মো. মাসুদ খান (৪২)। গত সোমবার রাতে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ঢাকার মুন্সীগঞ্জ ও বরিশাল জেলা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১৯ দশমিক ৭০ গ্রাম স্বর্ণ ও নগদ তিন লাখ ২৯ হাজার ১৮০ টাকা উদ্ধার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা রাঙাপরী জুয়েলার্সে স্বর্ণ ডাকাতির কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা সংঘবদ্ধ ব্যাংক ডাকাতি ও স্বর্ণালঙ্কার লুট চক্রের সক্রিয় সদস্য। এই চক্রের সদস্য সংখ্যা ৮-১০ জন। তারা বিভিন্ন পেশার আড়ালে দীর্ঘদিন যাবৎ পারস্পারিক যোগসাজশে দেশের বিভিন্ন স্থানের স্বর্ণের দোকান লুট, ব্যাংক ডাকাতি ও বিভিন্ন মার্কেটে লুট করে আসছে। কচুক্ষেতের রাঙাপরী জুয়েলার্সে স্বর্ণ ডাকাতির আগেও চক্রটি ২০১৪ সালে ব্রাক ব্যাংকের জয়পুরহাট শাখার ভল্ট ভেঙে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা লুট করে। এ ঘটনায় তারা ব্যাংকের পাশের একটি ঘরে একটি এনজিও’র নামে মিথ্যা পরিচয়ে ভাড়া নেয়। ভল্ট লুটের ১ সপ্তাহ আগে থেকে স্ক্রু ড্রাইভার ও শাবল দিয়ে দেয়াল কেটে ব্যাংকের ভল্টে ঢুকে ওই টাকা লুট করে পালিয়ে যায়।

পরবর্তীতে র‌্যাবের অভিযানে রাজা মিয়াসহ ৭ জন গ্রেপ্তার হয়। এ ঘটনায় রাজা মিয়া ৩ বছর কারাভোগ করে। একইভাবে তারা ২০১৮ সালে সিদ্ধিরগঞ্জে দুটি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি করে ৪৫৫ ভরি স্বর্ণ ও ২ লাখ টাকা লুট করে। পরবর্তীতে র‌্যাবের অভিযানে রাজাসহ চক্রের ৩ জন গ্রেপ্তার হয় এবং কারাভোগ করে। এরপর ২০২০ সালে ডেমরার হাজী হোসেন প্লাজায় স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি করে ২৩০ ভরি স্বর্ণ ও দেড় লাখ টাকা লুট করে। উক্ত ঘটনার আনুমানিক দুই মাস আগে এই চক্রের ৩ সদস্য মিথ্যা পরিচয়ে একটি সিকিউরিটিজ কোম্পানির গার্ড হিসেবে মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে যোগ দেয়। এতদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে তারা গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম ছিল।

র‌্যাবের মুখপাত্র বলেন, রাঙাপরী জুয়েলার্সে লুটের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঘটনার দেড় মাস আগে রজনীগন্ধা মার্কেটে ভুয়া পরিচয়ে একটি দোকান ভাড়া নেয় চক্রের সদস্য। ওই দোকানে নাম সর্বস্ব মালামাল রেখে কৌশলে চুরির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামাদি মজুদ করা হয়। লুট চক্রের মূলহোতা গ্রেপ্তারকৃত রাজা মিয়া ও তার সহযোগী কাউসার মাস্টারসহ অজ্ঞাত আরও ৩-৫ জন সদস্য ঘটনার দিন রাত ১২টায় মিরপুর-১৪ নম্বর গোলচত্বরে একত্রিত হয়। গ্রেপ্তারকৃত মাসুদ তাদেরকে রাত ১টা নাগাদ রজনীগন্ধা মার্কেটে আসতে বলে। এই সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত মাসুদ মার্কেটের অন্য নিরাপত্তাকর্মীদের কৌশলে খাবার ও পানীয়ের সঙ্গে চেতনানাশক সেবন করিয়ে তাদের অজ্ঞান করে। পরিকল্পনা মোতাবেক অন্যরা মার্কেটের সামনে আসলে মাসুদ ও তার এক সহযোগী গেটের তালা খুলে তাদেরকে আগেই ভাড়াকৃত দোকানের ভেতর নিয়ে যায়।

কাউসার মাস্টার ও তার এক সহযোগী মার্কেটের বাইরের চারপাশ নজরদারিতে থাকে। পরবর্তীতে রাত ২টার দিকে কাউসার মাস্টারের দোকান হতে আগে থেকে মজুদ করে রাখা তালা ভাঙার যন্ত্রপাতি দিয়ে দুটি দোকানের তালা এবং শাটার ভেঙে রাজা মিয়াসহ আরও ২/৩ জন দোকানের ভেতরে যায়। দোকানের ভেতর থাকা স্বর্ণলঙ্কার ও নগদ টাকা লুট করে তাদের ভাড়াকৃত দোকানে নিয়ে যায়। ঘটনা চলাকালীন সময়ে মাসুদ দোকানের বাহিরে পাহারা দেয়। দোকানে যে স্বর্ণালঙ্কার লুট হয়েছে তা যেন আগে থেকে না বুঝা যায় সে জন্য তারা দোকানে নতুন তালা লাগিয়ে দেয়। অতঃপর ভোরে লুটকৃত মালামালসহ কেরানীগঞ্জে কাউসার মাস্টারের আগে থেকে ভাড়াকৃত বাসায় চলে যায়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানায়, ঘটনার দিন সকালেই তারা লুটকৃত স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা, নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে তাদের গ্রামের বাড়ি চলে যায়। এ চক্রের মূলহোতা গ্রেপ্তারকৃত রাজা মিয়া একজন দক্ষ তালা ভাঙার মেকার এবং অন্যরা বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী। গ্রেপ্তারকৃতরা খুব সাধারণ বেশভূষা ধারণ করে চলাফেরা করত যেন কেউ তাদেরকে কোন প্রকার সন্দেহ না করে। গ্রেপ্তারকৃত কাউসার মাস্টার সব প্রকার ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে রাজধানীর মিরপুরের একটি সিকিউরিটি এজেন্সির নাম ব্যবহার করে মাসুদকে রজনীগন্ধা মার্কেটে সিকিউরিটি গার্ড এ চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তারা বিভিন্ন সময়ে মার্কেটের সিকিউরিটিসহ অন্য বিষয়ের খোঁজখবর নিতে থাকে এবং স্বর্ণের দোকান লুটের পরিকল্পনা করতে থাকে। রাজা মিয়া তার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাউসারের ভাড়াকৃত দোকানে নাম সর্বস্ব মালামাল রেখে কৌশলে লুটের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামাদি মজুদ করে।

র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, রাজা মিয়া ১৯৯০ সালে বাসের কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ শুরু করে। ২০০২ সালের দিকে বর্ণিত সংঘবদ্ধ চক্রটির সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে এবং সেই থেকেই সে অপরাধে জগতে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে বাস কন্ডাক্টরির পরিবর্তে অটোরিক্সা চালানো শুরু করে। সে অটোরিকশা চালানোর আড়ালে পরিকল্পনামতো লুট/ডাকাতির উদ্দেশে বিভিন্ন মার্কেটে রেকি করত। গ্রেপ্তারকৃত রাজা মিয়া একজন দক্ষ তালা-চাবির মেকার। সে অর্ধ-শতাধিক চুরি/ডাকাতির ঘটনায় জড়িত বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। বর্ণিত ঘটনায় সে দোকানে লুটের পরিকল্পনা করে এবং লুটের সময় স্বর্ণের দোকানে শাটারের তালা ভাঙার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। ইতোপূর্বে তার নামে চুরি ও ডাকাতি সংক্রান্ত দুটি মামলায় কারাভোগ করেছে।

গ্রেপ্তারকৃত কাউসার হোসেন মাধ্যমিক সম্পন্ন করে আরআরএমপির একটি প্রকল্পে চাকরি নেয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সাল থেকে ঢাকায় এক আইনজীবীর অফিস সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করে। ২০১৮ সালে মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে সংঘবদ্ধ ডাকাতি ও স্বর্ণালঙ্কার লুট চক্রের এক সদস্য আদালতে আসলে সেখানে কাউসারের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। ২০১৮ সালে সিদ্ধিরগঞ্জের স্বর্ণালঙ্কার লুটে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে এবং র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করে। অপরাধ জগতে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এবং ভুয়া সবকিছু তৈরি করতে সিদ্ধ বিধায় তাকে তাদের চক্রের সদস্যরা মাস্টার উপাধি দেয়।

আর মাসুদ ঢাকার একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ক্লিনার ও বয় হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে। চাইনিজ রেস্টুরেন্টে চাকরি করা অবস্থায় ২০১০ সালের দিকে এই চক্রের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে সখ্যতা গড়ে তোলে। সে ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জে একটি গার্মেন্টসে চাকরি নেয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে থাকা অবস্থায় নারায়নগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন হাজী আহসান উল্লাহ সুপার মার্কেটের দুটি স্বর্ণের দোকানের প্রায় ২ কেজি স্বর্ণ লুট করে। সেই লুটের ঘটনায় সে কারাভোগ করে। তার নামে ৩টি চুরির মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলেও জানান কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।