সুনামগঞ্জে আরও ২ স্থানে বাঁধ ভেঙে ফসলহানি, ঝুঁকিপূর্ণ বেশ কয়েকটি

গতকাল সন্ধ্যায় বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্র সোনার থাল হাওরে এবং শাল্লা উপজেলার কৈয়ার বন্ধ পুটিয়া হাওরে পানি প্রবেশ করেছে। স্থানীয়দের মতে, এতে চন্দ্র সোনার থাল হাওরের ৪০০ হেক্টর ও শাল্লা উপজেলার কৈয়ার বন্ধ পুটিয়া হাওরের ৪০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে।

এর আগের দিন সোমবার উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার বাঘার হাওরে ও খললির হাওরে পানি প্রবেশ করে। এছাড়া মধ্যনগর উপজেলার ঘনিয়াউরি হাওরে ও পানি প্রবেশ করে ফসল তলিয়ে যায়। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড এগুলোর দায় নিচ্ছে না।

কৃষকদের চোখের সামনেই ভেসে যাচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি। এদিকে নিজেদের জমির ফসল তলিয়ে যাওয়া দেখে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও কাঁচি হাতে নেমেছে ধান কাটতে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতার বাইরে হওয়ায় এই এলাকায় হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে কোন প্রকল্প নেয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাঘার বাঁধ এলাকায় প্রায় এক হাজার একর জমি রয়েছে। এই এলাকায় হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এমন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রকল্প না দিয়ে অপ্রয়োজনীয় জায়গায় প্রকল্প দিয়ে সরকারের টাকা লোপাট করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) দাবি করছে সার্ভে টিমের ম্যাজারমেন্ট অনুযায়ী প্রকল্প দেয়া হয়েছে। এই হাওরের বাঁধটি আওতার বাইরে।

শাল্লার দামপুর গ্রামের কৃষক আবদুল আওয়াল বলেন, ১০ কেয়ার (কেদার) জমি চাষ করেছি। এই হাওরেই সকল জমি। আমার চোখের সামনেই সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। এখন ছেলে মেয়ে নিয়ে কিভাবে চলবো

সেই চিন্তাই করছি।

পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র জনি সরকার জানায়, ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর বাবার কান্না দেখে নিজেই কাঁচি হাতে ধান কাটতে এসেছি। কিন্তু ধান এখনো পাকেনি। এরপরও তলিয়ে যাওয়ার চেয়ে কিছু ধান ঘরে নিতে পারলে কিছু দিনের খাবার হবে।

শাল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী (এসও) আবদুল কাইয়ুম বলেন, আমাদের আওতার হাওর রক্ষা বাঁধ এখনো ভাঙেনি। বাঘার হাওরে পানি প্রবেশ করেছে এটা আমাদের তালিকার বাইরে।

আমাদের আওতায় যে বাঁধগুলো রয়েছে সর্বাক্ষণিক মনিটরিং করছি। ঝুঁকিপূর্ণ কোন বাঁধ শাল্লায় নেই।

শাল্লা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আবু তালেব জানান, এ বাঁধ পরিকল্পনার বাইরে ছিল। কৃষকরা প্রতিবছর ঝুঁকি নিয়েই এখানে ধান চাষ করেন। এবার পানি ওভার ফ্লো হয়ে এই হাওরে ঢুকে পড়েছে।

তিনি আরও জানান, আমরা খোঁজ নিয়ে শুনেছি, ৭-৮ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। আমরা তাদের বলেছি দ্রুত ধান কাটতে আর যারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের আমরা সহায়তার আওতায় নিয়ে আসবো।

মধ্যনগর উপজেলার মেঘনা, মরিচা করি, শোল ডুয়ারি, গজতলা, ও শালদিগা জাঙ্গাল ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। গনিয়া কুরি হাওরে পানি প্রবেশ করে ফসল তলিয়ে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

জামালগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী অফিসার বিশ্বজিৎ দেব জানান, মোট ৩৬টি পিআইসির মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আছে হালির হাওরের গইননার ভাঙ্গা বাঁধ, শনির হাওরের নান্টুখালী ক্লোজার ও মহালিয়া হাওরের বেড়িবাঁধ। বাকিগুলো এখন পর্যন্ত ভালো আছে। তিনি আরও বলেন, কাকঁড়ার গর্ত দিয়ে পানি প্রবেশ করে সুড়ঙ্গ তৈরি করে বাঁধের সর্বনাশ করে। বৌলাই নদীর পূর্ব পাড়ে হালির হাওর আর পশ্চিম পাড়ে শনির হাওর। এই বৌলাই নদীতে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল যাদুকাটা নদী হয়ে প্রবেশ করে। নদীর গভীরতা কম হওয়ার কারণে ধারণ ক্ষমতা কম থাকায় পানির চাপে বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা থাকে। জামালগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ ইউএনও বিশ্বজিত দেব ও তাহিরপুর উপজেলার চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল সার্বক্ষণিক লোকজন নিয়ে বাঁধের কাজ করছেন।

তাহিরপুর উপজেলার ইউএনও রায়হান কবির ফসল রক্ষার জন্য যাদুকাটা পাটলাই ও বৌলাই নদীতে মালবাহী নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করেছেন। যাদুকাটা বালু পাথর মহালের ইজারাদার সেলিম আহমদ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ রেখে স্বেচ্ছাশ্রমে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ করার অনুরোধ করেছেন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন সবাইকে বাঁধের কাজে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

জগন্নাথপুর উপজেলার ২৮টি পিআইসির মধ্যে ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ। এদিকে হাওর বাঁচাও আন্দোলন আগামীকাল হাওরের ফসল রক্ষাবাঁধের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

image
আরও খবর
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আশাব্যঞ্জক আলোচনা হয়েছে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে
পানি উন্নয়ন বোর্ডকে মিলিটারি কায়দায় কাজ করতে বললেন প্রধানমন্ত্রী
ফ্রিল্যান্সিংয়ে বদলে যাওয়া জীবন
মহাসড়কে পণ্যবাহী গাড়ি থামানো যাবে না
রংপুরের তারাগঞ্জে পুলিশ প্রটেকশনে বিধবার জমি দখলের চেষ্টা
নিরাপত্তাকর্মী-পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ছদ্মবেশে ডাকাত চক্র
উত্তীর্ণ ৭৯ হাজার ৩৩৭ জন, এগিয়ে মেয়েরা
সবার সেরা খুলনার মীম
৬ বছরেও তামাককর কাঠামো বাস্তবায়ন হয়নি, সহজ লভ্যতায় হুমকিতে জনস্বাস্থ্য
হাওরের বাঁধ কি ফসল রক্ষায় কাজে আসছে
অনলাইনে জন্মসনদ

বুধবার, ০৬ এপ্রিল ২০২২ , ২৩ চৈত্র ১৪২৮ ০৪ রমাদ্বান ১৪৪৩

সুনামগঞ্জে আরও ২ স্থানে বাঁধ ভেঙে ফসলহানি, ঝুঁকিপূর্ণ বেশ কয়েকটি

লতিফুর রহমান রাজু, সুনামগঞ্জ

image

গতকাল সন্ধ্যায় বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্র সোনার থাল হাওরে এবং শাল্লা উপজেলার কৈয়ার বন্ধ পুটিয়া হাওরে পানি প্রবেশ করেছে। স্থানীয়দের মতে, এতে চন্দ্র সোনার থাল হাওরের ৪০০ হেক্টর ও শাল্লা উপজেলার কৈয়ার বন্ধ পুটিয়া হাওরের ৪০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে।

এর আগের দিন সোমবার উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার বাঘার হাওরে ও খললির হাওরে পানি প্রবেশ করে। এছাড়া মধ্যনগর উপজেলার ঘনিয়াউরি হাওরে ও পানি প্রবেশ করে ফসল তলিয়ে যায়। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড এগুলোর দায় নিচ্ছে না।

কৃষকদের চোখের সামনেই ভেসে যাচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি। এদিকে নিজেদের জমির ফসল তলিয়ে যাওয়া দেখে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও কাঁচি হাতে নেমেছে ধান কাটতে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতার বাইরে হওয়ায় এই এলাকায় হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে কোন প্রকল্প নেয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাঘার বাঁধ এলাকায় প্রায় এক হাজার একর জমি রয়েছে। এই এলাকায় হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এমন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রকল্প না দিয়ে অপ্রয়োজনীয় জায়গায় প্রকল্প দিয়ে সরকারের টাকা লোপাট করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) দাবি করছে সার্ভে টিমের ম্যাজারমেন্ট অনুযায়ী প্রকল্প দেয়া হয়েছে। এই হাওরের বাঁধটি আওতার বাইরে।

শাল্লার দামপুর গ্রামের কৃষক আবদুল আওয়াল বলেন, ১০ কেয়ার (কেদার) জমি চাষ করেছি। এই হাওরেই সকল জমি। আমার চোখের সামনেই সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। এখন ছেলে মেয়ে নিয়ে কিভাবে চলবো

সেই চিন্তাই করছি।

পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র জনি সরকার জানায়, ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর বাবার কান্না দেখে নিজেই কাঁচি হাতে ধান কাটতে এসেছি। কিন্তু ধান এখনো পাকেনি। এরপরও তলিয়ে যাওয়ার চেয়ে কিছু ধান ঘরে নিতে পারলে কিছু দিনের খাবার হবে।

শাল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী (এসও) আবদুল কাইয়ুম বলেন, আমাদের আওতার হাওর রক্ষা বাঁধ এখনো ভাঙেনি। বাঘার হাওরে পানি প্রবেশ করেছে এটা আমাদের তালিকার বাইরে।

আমাদের আওতায় যে বাঁধগুলো রয়েছে সর্বাক্ষণিক মনিটরিং করছি। ঝুঁকিপূর্ণ কোন বাঁধ শাল্লায় নেই।

শাল্লা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আবু তালেব জানান, এ বাঁধ পরিকল্পনার বাইরে ছিল। কৃষকরা প্রতিবছর ঝুঁকি নিয়েই এখানে ধান চাষ করেন। এবার পানি ওভার ফ্লো হয়ে এই হাওরে ঢুকে পড়েছে।

তিনি আরও জানান, আমরা খোঁজ নিয়ে শুনেছি, ৭-৮ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। আমরা তাদের বলেছি দ্রুত ধান কাটতে আর যারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের আমরা সহায়তার আওতায় নিয়ে আসবো।

মধ্যনগর উপজেলার মেঘনা, মরিচা করি, শোল ডুয়ারি, গজতলা, ও শালদিগা জাঙ্গাল ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। গনিয়া কুরি হাওরে পানি প্রবেশ করে ফসল তলিয়ে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

জামালগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী অফিসার বিশ্বজিৎ দেব জানান, মোট ৩৬টি পিআইসির মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আছে হালির হাওরের গইননার ভাঙ্গা বাঁধ, শনির হাওরের নান্টুখালী ক্লোজার ও মহালিয়া হাওরের বেড়িবাঁধ। বাকিগুলো এখন পর্যন্ত ভালো আছে। তিনি আরও বলেন, কাকঁড়ার গর্ত দিয়ে পানি প্রবেশ করে সুড়ঙ্গ তৈরি করে বাঁধের সর্বনাশ করে। বৌলাই নদীর পূর্ব পাড়ে হালির হাওর আর পশ্চিম পাড়ে শনির হাওর। এই বৌলাই নদীতে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল যাদুকাটা নদী হয়ে প্রবেশ করে। নদীর গভীরতা কম হওয়ার কারণে ধারণ ক্ষমতা কম থাকায় পানির চাপে বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা থাকে। জামালগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ ইউএনও বিশ্বজিত দেব ও তাহিরপুর উপজেলার চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল সার্বক্ষণিক লোকজন নিয়ে বাঁধের কাজ করছেন।

তাহিরপুর উপজেলার ইউএনও রায়হান কবির ফসল রক্ষার জন্য যাদুকাটা পাটলাই ও বৌলাই নদীতে মালবাহী নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করেছেন। যাদুকাটা বালু পাথর মহালের ইজারাদার সেলিম আহমদ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ রেখে স্বেচ্ছাশ্রমে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ করার অনুরোধ করেছেন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন সবাইকে বাঁধের কাজে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

জগন্নাথপুর উপজেলার ২৮টি পিআইসির মধ্যে ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ। এদিকে হাওর বাঁচাও আন্দোলন আগামীকাল হাওরের ফসল রক্ষাবাঁধের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।