জেলা পরিষদেও বসছে প্রশাসক, সমালোচনার মধ্যেই সংসদে বিল পাস

বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সংসদ সদস্যদের সমালোচনা ও বিরোধিতার মধ্যেই জেলা পরিষদে প্রশাসক বসানোর সুযোগ রেখে জাতীয় সংসদে জেলা পরিষদ সংশোধন বিল পাস হয়েছে। গতকাল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী (এলজিআরডি) মো. তাজুল ইসলাম বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগের বিলের ওপর দেয়া জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সংশোধনী প্রস্তাবগুলোর নিষ্পত্তি করা হয়।

সংশোধিত আইন অনুযায়ী, জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষে সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের জন্য প্রশাসক বসানোর সুযোগ থাকবে। আইনে সব জেলা পরিষদে একই সংখ্যার সদস্য না রেখে বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে প্রতি জেলায় ১৫ জন সাধারণ সদস্য এবং পাঁচজন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য থাকার বিধান ছিল। আইনের এই ধারা সংশোধন করে প্রত্যেক উপজেলায় (জেলার মোট উপজেলার সমানসংখ্যক) একজন করে সদস্য এবং চেয়ারম্যানসহ সদস্যদের মোট সংখ্যার এক তৃতীয়াংশ (নিকটবর্তী পূর্ণসংখ্যা) ও কমপক্ষে দুই জন নারী সদস্য নিয়ে জেলা পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এদিকে বিদ্যমান আইনে নির্বাচন কমিশনকে ভোটার তালিকা তৈরির কথা বলা হলেও পাস হওয়া বিলে নির্বাচন কমিশনকে বাদ দেয়া হয়েছে।

বিলে বলা হয়েছে, জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হলে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনায় সরকার প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারবে। জেলা পরিষদের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক জেলায় একজন চেয়ারম্যান, ১৫ সদস্য ও ৫ নারী সদস্য অর্থাৎ মোট ২১ সদস্যের পরিষদ রয়েছে। আইন অনুযায়ী জেলার অন্তর্গত সিটি করপোরেশনের (যদি থাকে) মেয়র ও কাউন্সিলর, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জেলা পরিষদের ভোটার।

বিলে নতুন উপধারা যুক্ত করে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সদস্য হিসেবে পরিষদের সভায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তবে তাদের ভোটাধিকার থাকবে না। বিলে জেলা পরিষদের কার্যক্রম সরকারের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আনা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পরিষদ প্রতি অর্থবছর শেষে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে সম্পাদিত কার্যাবলির ওপর একটি বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল করবে বলে বিলে বলা হয়েছে।

বিদ্যমান আইনে কেবল নতুন জেলা পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রশাসক নিয়োগের বিধান থাকলেও চলমান কোন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রশাসক নিয়োগের বিধান নেই। বিলে জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হলে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ যুক্ত করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে ৮২ নম্বর ধারা সংশোধন করে বলা হয়েছে এতে কোন জেলা পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে এবং পরবর্তী পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত পরিষদের কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য সরকার একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোন কর্মকর্তাকে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারবে। প্রশাসকের মেয়াদ ও অব্যাহতি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হবে।

মন্ত্রীর প্রস্তাব করা বিলে প্রশাসকের মেয়াদ ছিল না। তবে মন্ত্রী একটি সংশোধনী গ্রহণ করায় এখন প্রশাসকের মেয়াদ ১৮০ দিনের বেশি হবে না। একইসঙ্গে একাধিকবার কেউ প্রশাসক থাকতে পারবেন না।

প্রশাসক নিয়ে আপত্তি সংসদ সদস্যদের

এদিকে পাস হওয়া এই বিলে প্রশাসক নিয়োগের বিধানের বিরোধিতা করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তারা বলছেন, প্রশাসক নিয়োগের বিধান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু প্রশ্ন তোলেন জেলা পরিষদের কাজ কী তা আইনে বলা নেই। এই সংগঠনকে শক্তিশালী করারও দাবি জানান তিনি।

জাপার সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া একদিনও রাখা ঠিক হবে না। সংবিধানে বলা আছে, নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া কর আরোপ করা যাবে না। তাহলে ভোট না করে কেন প্রশাসক থাকবে?

বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নিয়োগ দেয়ার জন্য প্রশাসকের বিধান রাখা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ আছে। জেলা পরিষদের কাজ কী? এটা দুর্নীতির আখড়া। এর কাজ কী? এই আইনটি ত্রুটিপূর্ণ। যারা সদস্য হবেন তাদের কাজ কী? হারুন বিলটি প্রত্যাহারের দাবি করে বলেন, সরকার যদি চায় জেলা পরিষদকে কার্যকর প্রতিষ্ঠান করতে চাইলে নতুন করে আইন আনতে হবে।

গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানও বিলটিকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত দেন।

জাপার সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান বলেন, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্থলে অনির্বাচিত প্রশাসক বসানোর বিধান সংযোজন করা হয়েছে। পৌরসভা বিলে ১৮০ দিনের মেয়াদ দেয়া হলেও এখানে কোন সময় উল্লেখ করা হয়নি। এটা পরবর্তীতে বাতিল হয়ে যাবে।

জাপার সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, এটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর জন্য আদালতের প্রয়োজন নেই। এখানেই বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত।

জাপার সংসদ সদস্য রুস্তুম আলী ফরাজী বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে এসব সংস্থা চলবে বলে সংবিধানে বলা আছে। এই আইনে অনেক গলদ আছে।

বৃহস্পতিবার, ০৭ এপ্রিল ২০২২ , ২৪ চৈত্র ১৪২৮ ০৫ রমাদ্বান ১৪৪৩

জেলা পরিষদেও বসছে প্রশাসক, সমালোচনার মধ্যেই সংসদে বিল পাস

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

image

বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সংসদ সদস্যদের সমালোচনা ও বিরোধিতার মধ্যেই জেলা পরিষদে প্রশাসক বসানোর সুযোগ রেখে জাতীয় সংসদে জেলা পরিষদ সংশোধন বিল পাস হয়েছে। গতকাল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী (এলজিআরডি) মো. তাজুল ইসলাম বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগের বিলের ওপর দেয়া জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সংশোধনী প্রস্তাবগুলোর নিষ্পত্তি করা হয়।

সংশোধিত আইন অনুযায়ী, জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষে সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের জন্য প্রশাসক বসানোর সুযোগ থাকবে। আইনে সব জেলা পরিষদে একই সংখ্যার সদস্য না রেখে বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে প্রতি জেলায় ১৫ জন সাধারণ সদস্য এবং পাঁচজন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য থাকার বিধান ছিল। আইনের এই ধারা সংশোধন করে প্রত্যেক উপজেলায় (জেলার মোট উপজেলার সমানসংখ্যক) একজন করে সদস্য এবং চেয়ারম্যানসহ সদস্যদের মোট সংখ্যার এক তৃতীয়াংশ (নিকটবর্তী পূর্ণসংখ্যা) ও কমপক্ষে দুই জন নারী সদস্য নিয়ে জেলা পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এদিকে বিদ্যমান আইনে নির্বাচন কমিশনকে ভোটার তালিকা তৈরির কথা বলা হলেও পাস হওয়া বিলে নির্বাচন কমিশনকে বাদ দেয়া হয়েছে।

বিলে বলা হয়েছে, জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হলে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনায় সরকার প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারবে। জেলা পরিষদের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক জেলায় একজন চেয়ারম্যান, ১৫ সদস্য ও ৫ নারী সদস্য অর্থাৎ মোট ২১ সদস্যের পরিষদ রয়েছে। আইন অনুযায়ী জেলার অন্তর্গত সিটি করপোরেশনের (যদি থাকে) মেয়র ও কাউন্সিলর, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জেলা পরিষদের ভোটার।

বিলে নতুন উপধারা যুক্ত করে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সদস্য হিসেবে পরিষদের সভায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তবে তাদের ভোটাধিকার থাকবে না। বিলে জেলা পরিষদের কার্যক্রম সরকারের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আনা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পরিষদ প্রতি অর্থবছর শেষে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে সম্পাদিত কার্যাবলির ওপর একটি বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল করবে বলে বিলে বলা হয়েছে।

বিদ্যমান আইনে কেবল নতুন জেলা পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রশাসক নিয়োগের বিধান থাকলেও চলমান কোন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রশাসক নিয়োগের বিধান নেই। বিলে জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হলে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ যুক্ত করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে ৮২ নম্বর ধারা সংশোধন করে বলা হয়েছে এতে কোন জেলা পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে এবং পরবর্তী পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত পরিষদের কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য সরকার একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোন কর্মকর্তাকে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারবে। প্রশাসকের মেয়াদ ও অব্যাহতি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হবে।

মন্ত্রীর প্রস্তাব করা বিলে প্রশাসকের মেয়াদ ছিল না। তবে মন্ত্রী একটি সংশোধনী গ্রহণ করায় এখন প্রশাসকের মেয়াদ ১৮০ দিনের বেশি হবে না। একইসঙ্গে একাধিকবার কেউ প্রশাসক থাকতে পারবেন না।

প্রশাসক নিয়ে আপত্তি সংসদ সদস্যদের

এদিকে পাস হওয়া এই বিলে প্রশাসক নিয়োগের বিধানের বিরোধিতা করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তারা বলছেন, প্রশাসক নিয়োগের বিধান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু প্রশ্ন তোলেন জেলা পরিষদের কাজ কী তা আইনে বলা নেই। এই সংগঠনকে শক্তিশালী করারও দাবি জানান তিনি।

জাপার সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া একদিনও রাখা ঠিক হবে না। সংবিধানে বলা আছে, নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া কর আরোপ করা যাবে না। তাহলে ভোট না করে কেন প্রশাসক থাকবে?

বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নিয়োগ দেয়ার জন্য প্রশাসকের বিধান রাখা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ আছে। জেলা পরিষদের কাজ কী? এটা দুর্নীতির আখড়া। এর কাজ কী? এই আইনটি ত্রুটিপূর্ণ। যারা সদস্য হবেন তাদের কাজ কী? হারুন বিলটি প্রত্যাহারের দাবি করে বলেন, সরকার যদি চায় জেলা পরিষদকে কার্যকর প্রতিষ্ঠান করতে চাইলে নতুন করে আইন আনতে হবে।

গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানও বিলটিকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত দেন।

জাপার সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান বলেন, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্থলে অনির্বাচিত প্রশাসক বসানোর বিধান সংযোজন করা হয়েছে। পৌরসভা বিলে ১৮০ দিনের মেয়াদ দেয়া হলেও এখানে কোন সময় উল্লেখ করা হয়নি। এটা পরবর্তীতে বাতিল হয়ে যাবে।

জাপার সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, এটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর জন্য আদালতের প্রয়োজন নেই। এখানেই বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত।

জাপার সংসদ সদস্য রুস্তুম আলী ফরাজী বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে এসব সংস্থা চলবে বলে সংবিধানে বলা আছে। এই আইনে অনেক গলদ আছে।