বাঙালি কূটনীতিকরা বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য জানায়

বাংলাদেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ যেমন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে তেমনি পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে গণহত্যার বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে। একাত্তরের ৭ এপ্রিল প্রথম পাকিস্তানে দায়িত্ব পালনরত বাঙালি কূটনীতিকরা পাকিস্তানকে পরিত্যাগ করে বাংলাদেশে পক্ষে আনুগত্য ঘোষণা করতে শুরু করে। সেদিন ভারতের নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান দূতাবাসের দু’জন বাঙালি কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিন আহমদ ও আমজাদুল হক পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে বাংলাদেশের প্রতি প্রথম আনুগত্য ঘোষণা করেন। তারাই বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণাকারী প্রথম কূটনীতিক।

এদিন সমগ্র সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। পাকিস্তানি বাহিনী সিলেট বিমানবন্দর ও লাক্কাতুরা চা-বাগানের আশপাশে সমবেত হয়। বিকেলে পাকিস্তানি বাহিনী নড়াইল-যশোর রোডে দাইতলা নামক স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের প্রচ- আক্রমণ চালায়। মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী টিকে থাকতে না পেরে পেছনে ফিরে চলে যায়। এ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর আনুমানিক ৩০ জন নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ হতাহত হয়নি।

এদিনে পার্বতীপুরের বিহারিরা নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে ব্যাপকলুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে এবং নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে। নায়েব সুবেদার সিদ্দিকের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর দখলকৃত খুলনা বেতার কেন্দ্রের ওপর আক্রমণ চালায়। এ যুদ্ধে ২০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের এ আক্রমণ ব্যর্থ হয়ে যায়। এখানে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এদিকে পাকিস্তানি বাহিনী দৌলতপুরের রঘুনাথপুর গ্রামে হামলা চালায় এবং সেখানে বহু লোককে হত্যা করে।

এদিন যশোর সদরের লেবুতলা গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল গুলিবিনিময় হয়। কয়েক ঘণ্টার এ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ৫০ জন নিহত হয় এবং তারা প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে যশোর সেনানিবাসে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

এদিকে বিএসএফের লে. কর্নেল মেঘ সিং দুটি কোম্পানি নিয়ে ঝিকরগাছা লাওজান গেটের কাছে প্রতিরক্ষাবাহিনী গড়ে তোলে। এদিন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি প্লাটুন কুলারঘাট থেকে লালমনিহারহাট পর্যন্ত এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সশস্ত্র অবাঙালিদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে ২১ জনকে হত্যা করে। মেজর নিজামের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পার্বতীপুরের পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের ওপর আত্মঘাতী হামলা চালায়।

সেখানে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং পার্বতীপুর পাকিস্তানীদের দখলে চলে যায়। এখানকার বেঁচে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধারা সরে এসে হাবড়ায় অবস্থান গ্রহণ করে।

এদিন মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর ঢাকায় জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পাকিস্তানি বাহিনীকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এদিকে জামায়াতের প্রাদেশিক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম, গোলাম সারওয়ার ও মওলানা নূরুজ্জামান ঢাকায় এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ভারতকে ছিনিমিনি খেলতে দেবে না। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সশস্ত্র অনুপ্রেবশকারীদের [মুক্তিযোদ্ধাদের] কোন স্থানে দেখামাত্র খতম করে দেবে।

মুসলিম লীগ নেতা এ. সবুর খান ঢাকায় সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। জামায়েত ইসলামীর প্রাদেশিক আমীর গোলাম আজম, গোলাম সারোয়ার ও মওলানা নূরুজ্জামান ঢাকায় এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি পূর্ব পাকিস্তানের দেশপ্রেমিক জনসাধারণ ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) যেখানেই দেখবে সেখানেই তাদের ধ্বংস সাধন করবে। দুষ্কৃতকারীদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) দমনে নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীকে এ ব্যাপারে সহযোগিতার জন্য আমরা সবার প্রতি অনুরোধ জানাই।’

বৃহস্পতিবার, ০৭ এপ্রিল ২০২২ , ২৪ চৈত্র ১৪২৮ ০৫ রমাদ্বান ১৪৪৩

৭ এপ্রিল ১৯৭১

বাঙালি কূটনীতিকরা বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য জানায়

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

বাংলাদেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ যেমন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে তেমনি পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে গণহত্যার বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে। একাত্তরের ৭ এপ্রিল প্রথম পাকিস্তানে দায়িত্ব পালনরত বাঙালি কূটনীতিকরা পাকিস্তানকে পরিত্যাগ করে বাংলাদেশে পক্ষে আনুগত্য ঘোষণা করতে শুরু করে। সেদিন ভারতের নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান দূতাবাসের দু’জন বাঙালি কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিন আহমদ ও আমজাদুল হক পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে বাংলাদেশের প্রতি প্রথম আনুগত্য ঘোষণা করেন। তারাই বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণাকারী প্রথম কূটনীতিক।

এদিন সমগ্র সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। পাকিস্তানি বাহিনী সিলেট বিমানবন্দর ও লাক্কাতুরা চা-বাগানের আশপাশে সমবেত হয়। বিকেলে পাকিস্তানি বাহিনী নড়াইল-যশোর রোডে দাইতলা নামক স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের প্রচ- আক্রমণ চালায়। মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী টিকে থাকতে না পেরে পেছনে ফিরে চলে যায়। এ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর আনুমানিক ৩০ জন নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ হতাহত হয়নি।

এদিনে পার্বতীপুরের বিহারিরা নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে ব্যাপকলুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে এবং নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে। নায়েব সুবেদার সিদ্দিকের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর দখলকৃত খুলনা বেতার কেন্দ্রের ওপর আক্রমণ চালায়। এ যুদ্ধে ২০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের এ আক্রমণ ব্যর্থ হয়ে যায়। এখানে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এদিকে পাকিস্তানি বাহিনী দৌলতপুরের রঘুনাথপুর গ্রামে হামলা চালায় এবং সেখানে বহু লোককে হত্যা করে।

এদিন যশোর সদরের লেবুতলা গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল গুলিবিনিময় হয়। কয়েক ঘণ্টার এ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ৫০ জন নিহত হয় এবং তারা প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে যশোর সেনানিবাসে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

এদিকে বিএসএফের লে. কর্নেল মেঘ সিং দুটি কোম্পানি নিয়ে ঝিকরগাছা লাওজান গেটের কাছে প্রতিরক্ষাবাহিনী গড়ে তোলে। এদিন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি প্লাটুন কুলারঘাট থেকে লালমনিহারহাট পর্যন্ত এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সশস্ত্র অবাঙালিদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে ২১ জনকে হত্যা করে। মেজর নিজামের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পার্বতীপুরের পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের ওপর আত্মঘাতী হামলা চালায়।

সেখানে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং পার্বতীপুর পাকিস্তানীদের দখলে চলে যায়। এখানকার বেঁচে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধারা সরে এসে হাবড়ায় অবস্থান গ্রহণ করে।

এদিন মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর ঢাকায় জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পাকিস্তানি বাহিনীকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এদিকে জামায়াতের প্রাদেশিক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম, গোলাম সারওয়ার ও মওলানা নূরুজ্জামান ঢাকায় এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ভারতকে ছিনিমিনি খেলতে দেবে না। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সশস্ত্র অনুপ্রেবশকারীদের [মুক্তিযোদ্ধাদের] কোন স্থানে দেখামাত্র খতম করে দেবে।

মুসলিম লীগ নেতা এ. সবুর খান ঢাকায় সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। জামায়েত ইসলামীর প্রাদেশিক আমীর গোলাম আজম, গোলাম সারোয়ার ও মওলানা নূরুজ্জামান ঢাকায় এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি পূর্ব পাকিস্তানের দেশপ্রেমিক জনসাধারণ ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) যেখানেই দেখবে সেখানেই তাদের ধ্বংস সাধন করবে। দুষ্কৃতকারীদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) দমনে নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীকে এ ব্যাপারে সহযোগিতার জন্য আমরা সবার প্রতি অনুরোধ জানাই।’