কেমন আছে দেশের মানুষ

শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ

দেশে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। এতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি অরাজক অবস্থা ভোজ্যতেল নিয়ে। বিশ্ববাজারে বাড়তি দামের ভোজ্যতেল ও চিনি বাংলাদেশে আমদানি না করেই অসাধু ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে চলমান মূল্য ধরে দেশের বাজারে পণ্য বিক্রি করেছেন। অথচ এসব পণ্য আগেই কম দামে আমদানি করা। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে এর প্রমাণ রয়েছে।

সয়াবিন তেল উৎপাদনের কাঁচামাল সয়াবীজও ৩৯ হাজার টন বেশি আমদানি করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও স্বল্পতার দোহাই দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির পরিবেশকরা তেল নিয়মিত সরবরাহ করছেন না। ফলে খোলা সয়াবিন তেল ও পাম সুপার তেল বাজারে যাও-বা পাওয়া যাচ্ছে তা বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে।

টিসিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১০ সালের ৯ মার্চ রাজধানীর বাজারে এক কেজি মোটা চাল ২৬ টাকা, ডাল ৭৫ টাকা, খোলা আটা ২১ টাকা ও চিনি ৪৮ টাকা; এক লিটার খোলা পাম তেল ৬৫ টাকা ও ডিমের ডজন ৭২ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তখন রাজধানীতে তিনজনের একটি সংসার চালাতে মাসে ৩০ কেজি চাল, তিন কেজি ডাল, দুই লিটার তেল, তিন কেজি আটা, এক কেজি চিনি, দুই কেজি পেঁয়াজ ও আড়াই ডজন ডিম কিনতে খরচ করতে হতো এক হাজার ৪৬২ টাকা। ওই সাতটি নিত্যপণ্য কিনতে এখন খরচ হয় দুই হাজার ৪৭৩ টাকা। অর্থাৎ এক যুগে খরচ বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি। এ সময়ে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৭৭ শতাংশ।

এত গেল নিত্যপণ্যের দাম। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন, এ নিয়ে এখন আর কেউ প্রশ্ন তোলেন না। এখন চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই মামুলি ব্যাপার। এগুলো যেন গা সওয়া হয়ে ধাতস্থ হয়ে উঠেছেন সবাই। এর সঙ্গে হত্যাও নিয়মিত বিরতিতে চলতে পারে, এমন মনোভাব সামষ্টিক জীবনে জেঁকে বসেছে। এ যে অপরাধ নিয়ে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাওয়া, এটি কিন্তু বিপজ্জনক। অনিয়ম-দুর্নীতি ও বেআইনি কর্মকা- এতটাই বেড়েছে, কিছুতেই যেন কিছু এসে যায় না। শুধু ভুক্তভোগীরাই বিপদগ্রস্ত হচ্ছেন।

এ লেখা লিখছি তখন ভয়ে আছি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার নিয়ে। অভিযোগ আছে এ আইনকে হাতিয়ার করে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করার। সাংবাদিক ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিশানা করা হচ্ছে।

রমজানে দুটি চ্যালেঞ্জ হাজির হয়েছে সরকারের সামনে। প্রথমত, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা। রোজার কয়েক মাস আগে থেকে নিত্যপণ্যের দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে যাওয়ার অপপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ইতোমধ্যে দাম যতটা বেড়েছে তা ভোক্তাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। আরও বাড়লে তা শুধু ভোক্তা নয়, সুবিধাভোগীদের জন্যও বিপর্যয় ডেকে আনবে। নিত্যপণ্যের দাম মাত্রা ছাড়ালে কী বিপর্যয় দেখা দেয় শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি তার সাক্ষী।

বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটেছে পাল্লা দিয়ে। সন্ত্রাসী হামলা, খুন, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাগুলো যেন হঠাৎ বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তবে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমছে না। রাজধানীর শাহজাহানপুরে ২৪ মার্চ রাতে দুর্বৃত্তরা ফিল্মি স্টাইলে খুন করে রাজনৈতিক নেতা নামধারী জাহিদুল ইসলাম টিপুুকে। এ সময় সামিয়া আফনান প্রীতি নামের এক নিরীহ কলেজছাত্রীর নির্মম মৃত্যু হয়। সবশেষ ২৭ মার্চ ভোরে দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন দন্তচিকিৎসক ডা. আহমেদ মাহি বুলবুল।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার বরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত এক ইউপি সদস্য নিখোঁজের পর প্রতিবেশীর ধানক্ষেতে তার লাশ পাওয়া গেছে। আরেক ঘটনায় রাজধানীর বংশাল থানার গেটে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে এক উপ-পরিদর্শকসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। ঘটনাটি সাদা চোখে দেখার কারণ নেই। এ ধরনের ঘটনা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। প্রশ্ন হলো, একজন ছিনতাইকারী কিভাবে ছয়জন পুলিশের ওপর চড়াও হতে পারে। কয়েক বছর ধরে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর অপরাধীদের আক্রমণের ঘটনা বেড়েছে। এতে অনেকে আশঙ্কা করছেন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ, যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে। যারা অপরাধ দমন করবেন তারাই যদি আক্রান্ত হন, তাহলে সাধারণ মানুষ খুনিদের হাত থেকে রেহাই পাবেন কিভাবে। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হচ্ছে।

সারা দেশে খুনোখুনির বহু ঘটনা ঘটছে। দুশ্চিন্তার বিষয়, এসব ঘটনার প্রতিকার মিলছে না। একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর কঠোর আইনি পদক্ষেপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেই। তবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও পরিস্থিতির আরও অবনতিশীল করে তোলার জন্য কম দায়ী নয়। অপরাধ সংঘটনের পর মানুষ আর আগের মতো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। এ চেতনাহীন অবস্থার পরিবর্তনে সম্মিলিতভাবে জেগে উঠতে হবে। সজাগ হতে হবে। তবেই আমরা জাতিগতভাবে এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিজেদের স্বার্থেই সরকারকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে। চাঁদাবাজি রোধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। পেশাগত চাঁদাবাজ যেমন রাজনৈতিক টাউট, তথাকথিত পরিবহন শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের অপতৎপরতা চলছে বছরের পর বছর। তার চেয়েও ভয়ংকর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামে পরিচালিত চাঁদাবাজি। পণ্যের মূল্য বাড়ার অন্যতম কারণ এসব বেপরোয়া চাঁদাবাজি। ঈদ সামনে রেখে চাঁদাবাজরা যাতে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

রমজানের প্রথম দিনই চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন রাজধানীবাসী। সকাল থেকে গ্যাস না থাকায় চুলা জ্বলেনি নগরীর বেশিরভাগ এলাকায়। কোথাও কোথাও চাপ এত কম ছিল যে, চুলাই জ্বলেনি। অনেক জায়গায় গ্যাসের চাপ এত কম ছিল যে, পানিও গরম করা যাচ্ছিল না। ইফতারের জন্য কোনো রান্নাবান্না করতে পারেননি গৃহিণীরা। অনেকে বাড়তি টাকা খরচ করে বাইরে থেকে কিনে এনে ইফতার করেছেন।

রোজার দিনে এমন দায়িত্বহীনতা অনাকাক্সিক্ষত। অথচ দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের কোনো তর সয় না। রোজার প্রথম দিনেই এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয় প্রতি ঘনলিটারে চার টাকা ছয় পয়সা। প্রতি কেজি ১১৯ টাকা ৯৪ পয়সা দরে এ মাসে সিলিন্ডার বিক্রি হবে। এতে একটি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম পড়বে এক হাজার ৪৩৯ টাকা। অথচ মাত্র এক মাস আগেই এক দফায় গ্যাসের দাম অনেকটা বাড়ানো হয়েছে। গত মাসে এলপিজির বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল। ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম একবারে ১৫১ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৩৯১ টাকা করা হয়েছিল। এবারে এলজিপির পাশাপাশি গাড়িতে ব্যবহৃত অটো গ্যাসের দামও লিটারে দুই টাকা ২৪ পয়সা বাড়ানো হলো। ফলে এর দাম দাঁড়াল ৬৭ টাকা দুই পয়সা। এ বাড়তি দাম কার্যকর হয় ঘোষণার দিন সন্ধ্যা থেকেই। দাম বাড়ানোর এ প্রবণতা মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এমনিতেই রোজায় সব জিনিসের দাম বেড়ে যায়। বাজারের দুর্মূল্য এবং রোজার প্রভাব মিলে সাধারণ মানুষ টানাপড়েনের মধ্যে আছে। তার ওপর গ্যাসের দাম বাড়ানো ‘বোঝার উপর শাকের আঁটি’র চেয়েও বেশি কিছু। এ বাড়তি চাপের সঙ্গে যোগ হয়েছে চুলায় গ্যাসের সরবরাহ না থাকা। টাকা খরচ করে বাইরে থেকে ইফতার কিনে আনতে বাধ্য হওয়ায় মানুষের বিরক্তি চরমে পৌঁছানোর উপক্রম হয়েছে।

গণমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে, চলতি রমজান মাসে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি নিয়ে দেশবাসীকে ভালোভাবেই ভুগতে হবে। ইফতার, তারাবিহ এবং সাহরির সময় নগরবাসী একসঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন না। আবার ইফতার, তারাবিহ ও সাহরির সময় ঢাকায় সরবরাহ ঠিক রাখতে গ্রামে লোডশেডিং করতে হবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। একই অবস্থা পানি ও গ্যাস-সুবিধা নিয়ে। রোজায় গ্যাস সংকট থাকবে শিল্প-কলকারখানায়ও। এ দিকে রোজার শুরুতেই রাজধানীর অনেক এলাকায় তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে।

বিতরণ কোম্পানিগুলো সূত্রে খবরে বলা হয়, রোজার মাঝামাঝি থেকে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হবে। পানির ঘাটতি হবে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ কোটি লিটার। ফলে নগরবাসীকে দুর্ভোগ মাথায় নিয়েই পার করতে হবে রমজান মাস। শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা অর্ধেকের বেশি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে রোজার মাসে গ্রামবাসীকেও বিদ্যুতের কষ্টে ভুগতে হবে। জনগণের স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব; কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তা পেরে উঠছে বলে মনে হয় না।

[লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিমকোর্ট ]

বৃহস্পতিবার, ০৭ এপ্রিল ২০২২ , ২৪ চৈত্র ১৪২৮ ০৫ রমাদ্বান ১৪৪৩

কেমন আছে দেশের মানুষ

শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ

দেশে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। এতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি অরাজক অবস্থা ভোজ্যতেল নিয়ে। বিশ্ববাজারে বাড়তি দামের ভোজ্যতেল ও চিনি বাংলাদেশে আমদানি না করেই অসাধু ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে চলমান মূল্য ধরে দেশের বাজারে পণ্য বিক্রি করেছেন। অথচ এসব পণ্য আগেই কম দামে আমদানি করা। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে এর প্রমাণ রয়েছে।

সয়াবিন তেল উৎপাদনের কাঁচামাল সয়াবীজও ৩৯ হাজার টন বেশি আমদানি করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও স্বল্পতার দোহাই দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির পরিবেশকরা তেল নিয়মিত সরবরাহ করছেন না। ফলে খোলা সয়াবিন তেল ও পাম সুপার তেল বাজারে যাও-বা পাওয়া যাচ্ছে তা বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে।

টিসিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১০ সালের ৯ মার্চ রাজধানীর বাজারে এক কেজি মোটা চাল ২৬ টাকা, ডাল ৭৫ টাকা, খোলা আটা ২১ টাকা ও চিনি ৪৮ টাকা; এক লিটার খোলা পাম তেল ৬৫ টাকা ও ডিমের ডজন ৭২ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তখন রাজধানীতে তিনজনের একটি সংসার চালাতে মাসে ৩০ কেজি চাল, তিন কেজি ডাল, দুই লিটার তেল, তিন কেজি আটা, এক কেজি চিনি, দুই কেজি পেঁয়াজ ও আড়াই ডজন ডিম কিনতে খরচ করতে হতো এক হাজার ৪৬২ টাকা। ওই সাতটি নিত্যপণ্য কিনতে এখন খরচ হয় দুই হাজার ৪৭৩ টাকা। অর্থাৎ এক যুগে খরচ বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি। এ সময়ে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৭৭ শতাংশ।

এত গেল নিত্যপণ্যের দাম। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন, এ নিয়ে এখন আর কেউ প্রশ্ন তোলেন না। এখন চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই মামুলি ব্যাপার। এগুলো যেন গা সওয়া হয়ে ধাতস্থ হয়ে উঠেছেন সবাই। এর সঙ্গে হত্যাও নিয়মিত বিরতিতে চলতে পারে, এমন মনোভাব সামষ্টিক জীবনে জেঁকে বসেছে। এ যে অপরাধ নিয়ে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাওয়া, এটি কিন্তু বিপজ্জনক। অনিয়ম-দুর্নীতি ও বেআইনি কর্মকা- এতটাই বেড়েছে, কিছুতেই যেন কিছু এসে যায় না। শুধু ভুক্তভোগীরাই বিপদগ্রস্ত হচ্ছেন।

এ লেখা লিখছি তখন ভয়ে আছি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার নিয়ে। অভিযোগ আছে এ আইনকে হাতিয়ার করে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করার। সাংবাদিক ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিশানা করা হচ্ছে।

রমজানে দুটি চ্যালেঞ্জ হাজির হয়েছে সরকারের সামনে। প্রথমত, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা। রোজার কয়েক মাস আগে থেকে নিত্যপণ্যের দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে যাওয়ার অপপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ইতোমধ্যে দাম যতটা বেড়েছে তা ভোক্তাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। আরও বাড়লে তা শুধু ভোক্তা নয়, সুবিধাভোগীদের জন্যও বিপর্যয় ডেকে আনবে। নিত্যপণ্যের দাম মাত্রা ছাড়ালে কী বিপর্যয় দেখা দেয় শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি তার সাক্ষী।

বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটেছে পাল্লা দিয়ে। সন্ত্রাসী হামলা, খুন, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাগুলো যেন হঠাৎ বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তবে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমছে না। রাজধানীর শাহজাহানপুরে ২৪ মার্চ রাতে দুর্বৃত্তরা ফিল্মি স্টাইলে খুন করে রাজনৈতিক নেতা নামধারী জাহিদুল ইসলাম টিপুুকে। এ সময় সামিয়া আফনান প্রীতি নামের এক নিরীহ কলেজছাত্রীর নির্মম মৃত্যু হয়। সবশেষ ২৭ মার্চ ভোরে দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন দন্তচিকিৎসক ডা. আহমেদ মাহি বুলবুল।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার বরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত এক ইউপি সদস্য নিখোঁজের পর প্রতিবেশীর ধানক্ষেতে তার লাশ পাওয়া গেছে। আরেক ঘটনায় রাজধানীর বংশাল থানার গেটে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে এক উপ-পরিদর্শকসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। ঘটনাটি সাদা চোখে দেখার কারণ নেই। এ ধরনের ঘটনা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। প্রশ্ন হলো, একজন ছিনতাইকারী কিভাবে ছয়জন পুলিশের ওপর চড়াও হতে পারে। কয়েক বছর ধরে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর অপরাধীদের আক্রমণের ঘটনা বেড়েছে। এতে অনেকে আশঙ্কা করছেন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ, যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে। যারা অপরাধ দমন করবেন তারাই যদি আক্রান্ত হন, তাহলে সাধারণ মানুষ খুনিদের হাত থেকে রেহাই পাবেন কিভাবে। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হচ্ছে।

সারা দেশে খুনোখুনির বহু ঘটনা ঘটছে। দুশ্চিন্তার বিষয়, এসব ঘটনার প্রতিকার মিলছে না। একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর কঠোর আইনি পদক্ষেপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেই। তবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও পরিস্থিতির আরও অবনতিশীল করে তোলার জন্য কম দায়ী নয়। অপরাধ সংঘটনের পর মানুষ আর আগের মতো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। এ চেতনাহীন অবস্থার পরিবর্তনে সম্মিলিতভাবে জেগে উঠতে হবে। সজাগ হতে হবে। তবেই আমরা জাতিগতভাবে এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিজেদের স্বার্থেই সরকারকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে। চাঁদাবাজি রোধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। পেশাগত চাঁদাবাজ যেমন রাজনৈতিক টাউট, তথাকথিত পরিবহন শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের অপতৎপরতা চলছে বছরের পর বছর। তার চেয়েও ভয়ংকর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামে পরিচালিত চাঁদাবাজি। পণ্যের মূল্য বাড়ার অন্যতম কারণ এসব বেপরোয়া চাঁদাবাজি। ঈদ সামনে রেখে চাঁদাবাজরা যাতে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

রমজানের প্রথম দিনই চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন রাজধানীবাসী। সকাল থেকে গ্যাস না থাকায় চুলা জ্বলেনি নগরীর বেশিরভাগ এলাকায়। কোথাও কোথাও চাপ এত কম ছিল যে, চুলাই জ্বলেনি। অনেক জায়গায় গ্যাসের চাপ এত কম ছিল যে, পানিও গরম করা যাচ্ছিল না। ইফতারের জন্য কোনো রান্নাবান্না করতে পারেননি গৃহিণীরা। অনেকে বাড়তি টাকা খরচ করে বাইরে থেকে কিনে এনে ইফতার করেছেন।

রোজার দিনে এমন দায়িত্বহীনতা অনাকাক্সিক্ষত। অথচ দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের কোনো তর সয় না। রোজার প্রথম দিনেই এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয় প্রতি ঘনলিটারে চার টাকা ছয় পয়সা। প্রতি কেজি ১১৯ টাকা ৯৪ পয়সা দরে এ মাসে সিলিন্ডার বিক্রি হবে। এতে একটি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম পড়বে এক হাজার ৪৩৯ টাকা। অথচ মাত্র এক মাস আগেই এক দফায় গ্যাসের দাম অনেকটা বাড়ানো হয়েছে। গত মাসে এলপিজির বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল। ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম একবারে ১৫১ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৩৯১ টাকা করা হয়েছিল। এবারে এলজিপির পাশাপাশি গাড়িতে ব্যবহৃত অটো গ্যাসের দামও লিটারে দুই টাকা ২৪ পয়সা বাড়ানো হলো। ফলে এর দাম দাঁড়াল ৬৭ টাকা দুই পয়সা। এ বাড়তি দাম কার্যকর হয় ঘোষণার দিন সন্ধ্যা থেকেই। দাম বাড়ানোর এ প্রবণতা মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এমনিতেই রোজায় সব জিনিসের দাম বেড়ে যায়। বাজারের দুর্মূল্য এবং রোজার প্রভাব মিলে সাধারণ মানুষ টানাপড়েনের মধ্যে আছে। তার ওপর গ্যাসের দাম বাড়ানো ‘বোঝার উপর শাকের আঁটি’র চেয়েও বেশি কিছু। এ বাড়তি চাপের সঙ্গে যোগ হয়েছে চুলায় গ্যাসের সরবরাহ না থাকা। টাকা খরচ করে বাইরে থেকে ইফতার কিনে আনতে বাধ্য হওয়ায় মানুষের বিরক্তি চরমে পৌঁছানোর উপক্রম হয়েছে।

গণমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে, চলতি রমজান মাসে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি নিয়ে দেশবাসীকে ভালোভাবেই ভুগতে হবে। ইফতার, তারাবিহ এবং সাহরির সময় নগরবাসী একসঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন না। আবার ইফতার, তারাবিহ ও সাহরির সময় ঢাকায় সরবরাহ ঠিক রাখতে গ্রামে লোডশেডিং করতে হবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। একই অবস্থা পানি ও গ্যাস-সুবিধা নিয়ে। রোজায় গ্যাস সংকট থাকবে শিল্প-কলকারখানায়ও। এ দিকে রোজার শুরুতেই রাজধানীর অনেক এলাকায় তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে।

বিতরণ কোম্পানিগুলো সূত্রে খবরে বলা হয়, রোজার মাঝামাঝি থেকে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হবে। পানির ঘাটতি হবে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ কোটি লিটার। ফলে নগরবাসীকে দুর্ভোগ মাথায় নিয়েই পার করতে হবে রমজান মাস। শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা অর্ধেকের বেশি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে রোজার মাসে গ্রামবাসীকেও বিদ্যুতের কষ্টে ভুগতে হবে। জনগণের স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব; কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তা পেরে উঠছে বলে মনে হয় না।

[লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিমকোর্ট ]