আম সম্মেলন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

জাহাঙ্গীর সেলিম

দেশের সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের পরের বছর (২০২২) দেশে প্রথমবারের মতো আম সম্মেলন ২৯-৩০ মার্চ অনুষ্ঠিত হলো উত্তরের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক নিভৃত পল্লি শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাটে। স্থানটি অখ্যাত হলেও এর একটা পরিচিতি রয়েছে। দেশের মোট উৎপাদন ১৫ লাখ টনের ওপর, এর মধ্যে একক জেলা হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের উৎপাদন ৩ লাখ ২৫ হাজার টন। আড়াই থেকে তিন লাখ টন আম বেচাকেনার নির্ভরযোগ্য বাজার হলো কানসাট। ২০১৪ সালে এ বাজারে ছোট বড় সব মিলিয়ে ৬৬২টি আমের আড়ত গণনা করা হয়। জেলার পাঁচটি উপজেলাসহ নওগাঁর কয়েকটি উপজেলার আম পাইকারি বিক্রির জন্য এখানে আনা হয়। মৌসুমে প্রায় চার মাস বিশাল এলাকার পাশাপাশি রাস্তাঘাটে চোখে পড়ে শুধুই আম। ফলে কানসাট হয়ে উঠেছে দেশের মধ্যে বৃহত্তম ও পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম আমের বাজার।

সম্মেলনের স্থান হিসেবে বেছে নেয়া হয় ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গবন্ধু লাইভ ম্যাংগো মিউজিয়াম’। এটি ১০০ বিঘার ওপর আমের বাগান, স্থানীয়ভাবে রাজার বাগান হিসেবে বহুল পরিচিত। এ বাগানটি ২৫০ বছর আগে মুক্তাগাছা বা ময়মনসিংহের মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। কেননা কানসাটেও তাদের এক বড় জমিদারি ছিল এবং বিশাল দ্বিতল ক্ষয়প্রাপ্ত জমিদার বাড়ির অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান।

উল্লেখ্য, ঢাকা হলো সেমিনার, কর্মশালা, সিম্পোজিয়াম, মতবিনিময় সভা, সম্মেলন, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি আয়োজনের প্রধান স্থান। কেননা দেশের যাবতীয় কর্মকা- মূল কেন্দ্র এবং গণমাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণেরও শীর্ষস্থান। ফলে কানসাটের মতো অখ্যাত স্থানে দেশের প্রথম সম্মেলনের তথ্য অবশিষ্ট ৬৩টি জেলার আমজনতার কাছে পৌঁছেনি।

কেননা গণমাধ্যমে আম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে এ খবর কোন মাধ্যমে স্থান লাভ করেনি। বছরব্যাপী দেশে সেমিনার, সম্মেলন, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা অনুষ্ঠিত হলেও এর একটা মৌসুম আছে। সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এসবের জন্য বেশ মোটা অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ রাখে। উন্নয়নের নামে মিটিং সিটিং ইটিং কথাটা বিগত চার দশক থেকে চালু রয়েছে। এসবের জন্য একধরনের পেশাদার ব্যক্তিও গড়ে উঠেছে। প্রায় সব অনুষ্ঠানে তাদের ডাকা হয়। এমনও দেখা গেছে একদিনে কয়েকটি মিটিংয়ে যোগ দিতে হয়। ফলে নির্ধারিত সময়সূচি পরিবর্তন করে তাদের অগ্রাধিকার করে দেয়া হয়। এসবের প্রয়োজন নেই এমন কথা বলছি না, কিন্তু আমরা কাজের চেয়ে কথা বলতে বেশি উৎসাহী। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সভা, সেমিনার, কর্মশালা ইত্যাদিতে পিছিয়ে নেই। কিন্তু আমে ক্ষেত্রে উদাসীনতা কেন?

বাংলাদেশ কৃষি উৎপাদনে অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। ধান গবেষণায় যথেষ্ট উন্নতি লাভ করেছে এবং উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। শাকসবজি উৎপাদনেও উদ্বৃত্ত। বিগত দুদশকে বিস্ময়করভাবে আমের উৎপাদন বেড়েছে এবং উদ্বৃত্ত। কিন্তু আম গবেষণার মান সীমিত অর্থাৎ সেভাবে বাড়েনি। যদিও দেশের প্রায় সবখানে উৎপাদন ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে আমের উৎপাদন ১৫ লাখ টন। যদিও আম উৎপাদনের পরিসংখ্যান নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। বিবিএস ও ডিএই দুই ধরনের তথ্য প্রদান করে। বিগত বছরে হরটেক্স ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রীকে দিয়ে ২৫ লাখ টন উৎপাদনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। মন্ত্রী মহোদয় উৎপাদনের তথ্য জেনে খুশি হলেও তার পাল্টা প্রশ্নে অন্তঃসারশূন্যতার প্রমাণ ধরা পড়ে।

স্ত্রীর জিজ্ঞাসা ছিল ২৫ লাখ টনের মধ্যে কি পরিমাণে রপ্তানি হয়েছে? রপ্তানি ছিল মাত্র ৩০০ মেট্রিক টন। উত্তর শুনে মন্ত্রী নাখোশ হন। কিন্তু উক্ত পরিমাণ আমের উৎপাদন কী সঠিক? যদি সঠিক হয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে প্রশ্ন ৪-৫ বছর আগে দেশে ১০ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনে বিশ্বে ধান উৎপাদনে সপ্তম স্থানে অবস্থান ছিল। ২৫ লাখ টন উৎপাদন হলে তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে উন্নীত হওয়া উচিত। সেই স্থান কী লাভ করেছে? তবে নিঃসন্দেহে আমের উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু সঠিক পরিসংখ্যান কী? চাঁপাইনবাবগঞ্জের কথা জোর দিয়ে বলা যায়, উৎপাদনের সঙ্গে কোন পরিসংখ্যানের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন বিগত বছরের কথা ধরা যাক, বলা হয়েছে তিন লাখ, ১৫ হাজার মেট্রিক টন। বাস্তবে এ জেলায় আড়াই-তিন লাখ টন আম চার মাস ধরে বিভিন্ন আড়তে বিক্রির পাইকারি হিসাব। এর বাইরে প্রায় ১৭ লাখ অধ্যুষিত জনগণের মধ্যে ১০-১২ লাখ কমবেশি প্রতিদিন ২ কেজি আম খাবার সুযোগ হয় এবং তার মধ্যে ৪-৫ লাখ লোক প্রায় চার মাস ধরে গড়ে প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ কেজি পাকা আম খেয়ে থাকে। একমাত্র এ জেলায় শত শত টন আমসপ্ত তৈরি হয় মূলত গাছপড়া পাকা আম থেকে। আমের জন্য কয়েকটি কোম্পানি গাছপড়া ও নিম্নমানের আম সংগ্রহ শুরু করে ম- তৈরি করে। এ বিষয়ে কারও কোন দ্বিমত থাকলে সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা হবে। কৃষি দপ্তর বা পরিসংখ্যানে এসব কথা বিচার-বিবেচনা করা বোধকরি হয় না।

দেশে আম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ছাড়িয়ে উদ্বৃত্ত। দেশের বাজারগুলোতে আমের ছড়াছড়ি। আম ও আম জাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বিদ্যমান। এ বিষয়টি শুধু মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের পরিকল্পনার মধ্যে ঘুরপাক খায়, বাস্তব পদক্ষেপ ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। অথচ ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশের এক সুইডেন প্রবাসী ও ব্যবসায়ীর উদ্যোগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার এক বাগান থেকে সর্বপ্রথম দেশ থেকে মানসম্মত উপায়ে সে দেশে সীমিত আম রপ্তানি করে ২০১৩ সালে। পরবর্তী বছরগুলোতেও রপ্তানি সীমিত ছিল। ২০১৬ সালে ক্ষীরসাপাত, ল্যাংড়া, ফজলি ও আশ্বিনা আম ইউরোপের ৫-৬টি এবং মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৬৫ টন। ২০১৭ সালে রপ্তানি মুখ থুবড়ে পড়ে, আম রপ্তানি সম্ভব হয়নি।

কেন হয়নি সে বিষয়ে একটু নজর দেয়া যাকÑ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর অদূরদর্শিতা, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ এবং কোয়ারেন্টেশন ইত্যাদি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। জানা যায় মেহেরপুরের আম গ্রহণযোগ্যতা লাভে ব্যর্থ হওয়ার পর উক্ত জেলার কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তা ঘোষণা করেন দেশে রপ্তানিযোগ্য আম নেই। অথচ সে বছর সারাদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যে ৮ কোটি আম প্যাকেটিং করা হয়, তার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৬ কোটি। ফলে আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। ২০১৮ সালে তার চেয়েও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। সে বছরের ১৯ মে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত আলোকচিত্র ও প্রতিবেদনে জানা যায় সাতক্ষীরার অপক্ব আম, যার আঁটি শক্ত হয়নি এমন আম কৃত্রিম উপায়ে পাকিয়ে রং করে বাজারজাত শুরু করে এবং একই দিনে অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে। সেই দিনই কৃত্রিম উপায়ে পাকানো আম ইউরোপে রপ্তানি করা হয়। ফল যা হওয়ার তাই হলো, পচে ও কুঁচকে যাওয়া আম ফেরত আসে এবং ইউরোপের বাজারে আম রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। সাতক্ষীরার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষি দপ্তরের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এ কাজ করা সম্ভব হয়েছে। সে দুরবস্থা থেকে সম্ভবত পরিত্রাণ হয়নি, প্রমাণ বিগত বছরে রপ্তানি মাত্র ৩০০ টন। ২০২০ ও ২০২১ সাল করোনা মহামারীর কারণে ব্যবসায় স্থবিরতা ছিল। চলতি বছরে অবস্থা কি দাঁড়ায় বলা মুশকিল। তবে আশার কথা হচ্ছে স্পেন ও রাশিয়া আমাদের আম কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে ইউরোপের বৃহত্তর বাজারে আম রপ্তানির সম্ভাবনা বেড়েছে। কিন্তু সেসব দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার পাশাপাশি অবকাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া কোন উপায় নেই। দুর্বলতা এখানেই ধরা পড়ে।

আম সম্মেলনের কথাই ধরা যাক ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশে এক-দুই বছর আগে থেকে অগ্রিম ঘোষণা দিয়ে আম সম্মেলন অনুষ্ঠানের কথা ইন্টারনেটের সুবাদে জানা যায় এবং গবেষণামূলক প্রবন্ধ আহ্বান করা হয়। সেসব সম্মেলনে আমাদের আমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রবন্ধ প্রেরণ ও অংশগ্রহণের কথা জানা নেই। প্রবন্ধ প্রেরণ বা অংশগ্রহণ না করা হলে দেশের মন ভোলানো আমের প্রচার প্রসার এবং রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণ হবে কী করে?

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বিএআরসি ও বিএআরআই, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্র আম বিষয়ে সেমিনার, সম্মেলন আয়োজনে আগ্রহ নেই। যদিও বিএআরসি ও বিএআরআই বছরে ভুরিভুরি মিটিং করে। অথচ আম চাষ, বিপণন এবং রপ্তানিতে সমস্যার শেষ নেই। এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। উক্ত আলোচনায় বিভিন্ন জেলার আমচাষি, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক, বিশেষজ্ঞ-বিজ্ঞানীসহ কৃষিমন্ত্রীর উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। কেননা এ প্রবন্ধে উল্লেখিত বছর ও অন্যান্য বছরে যে সব সমস্যার উদ্ভব হয়েছে তার সঠিক প্রতিবেদন মন্ত্রিমহোদয়ের কাছে পৌঁছে কি না সন্দেহ রয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে বিএআরআই ও উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের কর্মকর্তারা জনগণের মতামতের ধার ধারে না। যদিও তাদের প্রেরিত প্রতিবেদন বা বক্তব্য মন্ত্রণালয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। আম রপ্তানির জন্য রপ্তানিবান্ধব অবকাঠামো প্রধান প্রধান আম উৎপাদন জেলায় গড়ে তোলা আবশ্যক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দেশে একমাত্র নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুরে এ বিষয়ে একটি অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। স্বাভাবিক প্রশ্ন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের মতো চিরস্থায়ী যানজটের স্থানে এ সুবিধা গড়ে তোলা হলো কেন?

প্রধান উৎপাদন এলাকা উত্তরাঞ্চলসহ অন্যান্য জেলার আম সেখানে পৌঁছতে এক-দুই দিন অতিরিক্ত সময় লাগবে। কেননা সে সময়টা পুরো বর্ষাকাল, রাস্তার অবস্থা নাজুক থাকে। মহাসড়কে ধীরগতি, যানচলাচল স্থবির হয়ে পড়ার ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক সময় ৮-১০ ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় লাগে। ঢাকা নগরীতে দিনে ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কারণে রাতের জন্য অপেক্ষা, তার ওপর প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সেখানে একসঙ্গে অনেক ভিড় লেগে যেতে পারে। প্রক্রিয়াজাত শেষে যানজট ঠেলে সময়মতো কার্গো বিমানের শিডিউল রক্ষা দুরূহ ব্যাপার।

কৃষি মন্ত্রণালয় দেশের তিনটি স্থান- চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও সাতক্ষীরায় বিদেশে আম রপ্তানির উদ্দেশ্যে মানসম্মত ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট, কোয়ারেন্টাইন ও প্যাকেজিং সুবিধাসহ অবকাঠামো গড়ে তোলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কয়েক বছর আগে। কিন্তু এখনো সেই সিদ্ধান্ত আঁতুড়ঘরে রয়ে গেছে। উল্টো নারায়ণগঞ্জে উক্ত অবকাঠামো গড়ে তুলে অর্থের অপচয়, সময়ের অপচয়, যানজটের দুর্ভোগ, শিডিউল বিপর্যয় ইত্যাদি কারণে আম বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনায় ব্যবসায়ীদের সর্বনাশের পথে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন জেলার আমচাষি ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের করুণ ফরিয়াদ কৃষিমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে কীভাবে পৌঁছবে?

[লেখক : গবেষক]

বৃহস্পতিবার, ০৭ এপ্রিল ২০২২ , ২৪ চৈত্র ১৪২৮ ০৫ রমাদ্বান ১৪৪৩

আম সম্মেলন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

জাহাঙ্গীর সেলিম

দেশের সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের পরের বছর (২০২২) দেশে প্রথমবারের মতো আম সম্মেলন ২৯-৩০ মার্চ অনুষ্ঠিত হলো উত্তরের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক নিভৃত পল্লি শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাটে। স্থানটি অখ্যাত হলেও এর একটা পরিচিতি রয়েছে। দেশের মোট উৎপাদন ১৫ লাখ টনের ওপর, এর মধ্যে একক জেলা হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের উৎপাদন ৩ লাখ ২৫ হাজার টন। আড়াই থেকে তিন লাখ টন আম বেচাকেনার নির্ভরযোগ্য বাজার হলো কানসাট। ২০১৪ সালে এ বাজারে ছোট বড় সব মিলিয়ে ৬৬২টি আমের আড়ত গণনা করা হয়। জেলার পাঁচটি উপজেলাসহ নওগাঁর কয়েকটি উপজেলার আম পাইকারি বিক্রির জন্য এখানে আনা হয়। মৌসুমে প্রায় চার মাস বিশাল এলাকার পাশাপাশি রাস্তাঘাটে চোখে পড়ে শুধুই আম। ফলে কানসাট হয়ে উঠেছে দেশের মধ্যে বৃহত্তম ও পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম আমের বাজার।

সম্মেলনের স্থান হিসেবে বেছে নেয়া হয় ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গবন্ধু লাইভ ম্যাংগো মিউজিয়াম’। এটি ১০০ বিঘার ওপর আমের বাগান, স্থানীয়ভাবে রাজার বাগান হিসেবে বহুল পরিচিত। এ বাগানটি ২৫০ বছর আগে মুক্তাগাছা বা ময়মনসিংহের মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। কেননা কানসাটেও তাদের এক বড় জমিদারি ছিল এবং বিশাল দ্বিতল ক্ষয়প্রাপ্ত জমিদার বাড়ির অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান।

উল্লেখ্য, ঢাকা হলো সেমিনার, কর্মশালা, সিম্পোজিয়াম, মতবিনিময় সভা, সম্মেলন, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি আয়োজনের প্রধান স্থান। কেননা দেশের যাবতীয় কর্মকা- মূল কেন্দ্র এবং গণমাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণেরও শীর্ষস্থান। ফলে কানসাটের মতো অখ্যাত স্থানে দেশের প্রথম সম্মেলনের তথ্য অবশিষ্ট ৬৩টি জেলার আমজনতার কাছে পৌঁছেনি।

কেননা গণমাধ্যমে আম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে এ খবর কোন মাধ্যমে স্থান লাভ করেনি। বছরব্যাপী দেশে সেমিনার, সম্মেলন, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা অনুষ্ঠিত হলেও এর একটা মৌসুম আছে। সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এসবের জন্য বেশ মোটা অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ রাখে। উন্নয়নের নামে মিটিং সিটিং ইটিং কথাটা বিগত চার দশক থেকে চালু রয়েছে। এসবের জন্য একধরনের পেশাদার ব্যক্তিও গড়ে উঠেছে। প্রায় সব অনুষ্ঠানে তাদের ডাকা হয়। এমনও দেখা গেছে একদিনে কয়েকটি মিটিংয়ে যোগ দিতে হয়। ফলে নির্ধারিত সময়সূচি পরিবর্তন করে তাদের অগ্রাধিকার করে দেয়া হয়। এসবের প্রয়োজন নেই এমন কথা বলছি না, কিন্তু আমরা কাজের চেয়ে কথা বলতে বেশি উৎসাহী। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সভা, সেমিনার, কর্মশালা ইত্যাদিতে পিছিয়ে নেই। কিন্তু আমে ক্ষেত্রে উদাসীনতা কেন?

বাংলাদেশ কৃষি উৎপাদনে অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। ধান গবেষণায় যথেষ্ট উন্নতি লাভ করেছে এবং উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। শাকসবজি উৎপাদনেও উদ্বৃত্ত। বিগত দুদশকে বিস্ময়করভাবে আমের উৎপাদন বেড়েছে এবং উদ্বৃত্ত। কিন্তু আম গবেষণার মান সীমিত অর্থাৎ সেভাবে বাড়েনি। যদিও দেশের প্রায় সবখানে উৎপাদন ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে আমের উৎপাদন ১৫ লাখ টন। যদিও আম উৎপাদনের পরিসংখ্যান নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। বিবিএস ও ডিএই দুই ধরনের তথ্য প্রদান করে। বিগত বছরে হরটেক্স ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রীকে দিয়ে ২৫ লাখ টন উৎপাদনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। মন্ত্রী মহোদয় উৎপাদনের তথ্য জেনে খুশি হলেও তার পাল্টা প্রশ্নে অন্তঃসারশূন্যতার প্রমাণ ধরা পড়ে।

স্ত্রীর জিজ্ঞাসা ছিল ২৫ লাখ টনের মধ্যে কি পরিমাণে রপ্তানি হয়েছে? রপ্তানি ছিল মাত্র ৩০০ মেট্রিক টন। উত্তর শুনে মন্ত্রী নাখোশ হন। কিন্তু উক্ত পরিমাণ আমের উৎপাদন কী সঠিক? যদি সঠিক হয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে প্রশ্ন ৪-৫ বছর আগে দেশে ১০ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনে বিশ্বে ধান উৎপাদনে সপ্তম স্থানে অবস্থান ছিল। ২৫ লাখ টন উৎপাদন হলে তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে উন্নীত হওয়া উচিত। সেই স্থান কী লাভ করেছে? তবে নিঃসন্দেহে আমের উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু সঠিক পরিসংখ্যান কী? চাঁপাইনবাবগঞ্জের কথা জোর দিয়ে বলা যায়, উৎপাদনের সঙ্গে কোন পরিসংখ্যানের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন বিগত বছরের কথা ধরা যাক, বলা হয়েছে তিন লাখ, ১৫ হাজার মেট্রিক টন। বাস্তবে এ জেলায় আড়াই-তিন লাখ টন আম চার মাস ধরে বিভিন্ন আড়তে বিক্রির পাইকারি হিসাব। এর বাইরে প্রায় ১৭ লাখ অধ্যুষিত জনগণের মধ্যে ১০-১২ লাখ কমবেশি প্রতিদিন ২ কেজি আম খাবার সুযোগ হয় এবং তার মধ্যে ৪-৫ লাখ লোক প্রায় চার মাস ধরে গড়ে প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ কেজি পাকা আম খেয়ে থাকে। একমাত্র এ জেলায় শত শত টন আমসপ্ত তৈরি হয় মূলত গাছপড়া পাকা আম থেকে। আমের জন্য কয়েকটি কোম্পানি গাছপড়া ও নিম্নমানের আম সংগ্রহ শুরু করে ম- তৈরি করে। এ বিষয়ে কারও কোন দ্বিমত থাকলে সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা হবে। কৃষি দপ্তর বা পরিসংখ্যানে এসব কথা বিচার-বিবেচনা করা বোধকরি হয় না।

দেশে আম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ছাড়িয়ে উদ্বৃত্ত। দেশের বাজারগুলোতে আমের ছড়াছড়ি। আম ও আম জাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বিদ্যমান। এ বিষয়টি শুধু মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের পরিকল্পনার মধ্যে ঘুরপাক খায়, বাস্তব পদক্ষেপ ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। অথচ ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশের এক সুইডেন প্রবাসী ও ব্যবসায়ীর উদ্যোগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার এক বাগান থেকে সর্বপ্রথম দেশ থেকে মানসম্মত উপায়ে সে দেশে সীমিত আম রপ্তানি করে ২০১৩ সালে। পরবর্তী বছরগুলোতেও রপ্তানি সীমিত ছিল। ২০১৬ সালে ক্ষীরসাপাত, ল্যাংড়া, ফজলি ও আশ্বিনা আম ইউরোপের ৫-৬টি এবং মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৬৫ টন। ২০১৭ সালে রপ্তানি মুখ থুবড়ে পড়ে, আম রপ্তানি সম্ভব হয়নি।

কেন হয়নি সে বিষয়ে একটু নজর দেয়া যাকÑ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর অদূরদর্শিতা, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ এবং কোয়ারেন্টেশন ইত্যাদি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। জানা যায় মেহেরপুরের আম গ্রহণযোগ্যতা লাভে ব্যর্থ হওয়ার পর উক্ত জেলার কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তা ঘোষণা করেন দেশে রপ্তানিযোগ্য আম নেই। অথচ সে বছর সারাদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যে ৮ কোটি আম প্যাকেটিং করা হয়, তার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৬ কোটি। ফলে আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। ২০১৮ সালে তার চেয়েও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। সে বছরের ১৯ মে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত আলোকচিত্র ও প্রতিবেদনে জানা যায় সাতক্ষীরার অপক্ব আম, যার আঁটি শক্ত হয়নি এমন আম কৃত্রিম উপায়ে পাকিয়ে রং করে বাজারজাত শুরু করে এবং একই দিনে অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে। সেই দিনই কৃত্রিম উপায়ে পাকানো আম ইউরোপে রপ্তানি করা হয়। ফল যা হওয়ার তাই হলো, পচে ও কুঁচকে যাওয়া আম ফেরত আসে এবং ইউরোপের বাজারে আম রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। সাতক্ষীরার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষি দপ্তরের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এ কাজ করা সম্ভব হয়েছে। সে দুরবস্থা থেকে সম্ভবত পরিত্রাণ হয়নি, প্রমাণ বিগত বছরে রপ্তানি মাত্র ৩০০ টন। ২০২০ ও ২০২১ সাল করোনা মহামারীর কারণে ব্যবসায় স্থবিরতা ছিল। চলতি বছরে অবস্থা কি দাঁড়ায় বলা মুশকিল। তবে আশার কথা হচ্ছে স্পেন ও রাশিয়া আমাদের আম কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে ইউরোপের বৃহত্তর বাজারে আম রপ্তানির সম্ভাবনা বেড়েছে। কিন্তু সেসব দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার পাশাপাশি অবকাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া কোন উপায় নেই। দুর্বলতা এখানেই ধরা পড়ে।

আম সম্মেলনের কথাই ধরা যাক ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশে এক-দুই বছর আগে থেকে অগ্রিম ঘোষণা দিয়ে আম সম্মেলন অনুষ্ঠানের কথা ইন্টারনেটের সুবাদে জানা যায় এবং গবেষণামূলক প্রবন্ধ আহ্বান করা হয়। সেসব সম্মেলনে আমাদের আমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রবন্ধ প্রেরণ ও অংশগ্রহণের কথা জানা নেই। প্রবন্ধ প্রেরণ বা অংশগ্রহণ না করা হলে দেশের মন ভোলানো আমের প্রচার প্রসার এবং রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণ হবে কী করে?

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বিএআরসি ও বিএআরআই, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্র আম বিষয়ে সেমিনার, সম্মেলন আয়োজনে আগ্রহ নেই। যদিও বিএআরসি ও বিএআরআই বছরে ভুরিভুরি মিটিং করে। অথচ আম চাষ, বিপণন এবং রপ্তানিতে সমস্যার শেষ নেই। এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। উক্ত আলোচনায় বিভিন্ন জেলার আমচাষি, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক, বিশেষজ্ঞ-বিজ্ঞানীসহ কৃষিমন্ত্রীর উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। কেননা এ প্রবন্ধে উল্লেখিত বছর ও অন্যান্য বছরে যে সব সমস্যার উদ্ভব হয়েছে তার সঠিক প্রতিবেদন মন্ত্রিমহোদয়ের কাছে পৌঁছে কি না সন্দেহ রয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে বিএআরআই ও উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের কর্মকর্তারা জনগণের মতামতের ধার ধারে না। যদিও তাদের প্রেরিত প্রতিবেদন বা বক্তব্য মন্ত্রণালয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। আম রপ্তানির জন্য রপ্তানিবান্ধব অবকাঠামো প্রধান প্রধান আম উৎপাদন জেলায় গড়ে তোলা আবশ্যক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দেশে একমাত্র নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুরে এ বিষয়ে একটি অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। স্বাভাবিক প্রশ্ন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের মতো চিরস্থায়ী যানজটের স্থানে এ সুবিধা গড়ে তোলা হলো কেন?

প্রধান উৎপাদন এলাকা উত্তরাঞ্চলসহ অন্যান্য জেলার আম সেখানে পৌঁছতে এক-দুই দিন অতিরিক্ত সময় লাগবে। কেননা সে সময়টা পুরো বর্ষাকাল, রাস্তার অবস্থা নাজুক থাকে। মহাসড়কে ধীরগতি, যানচলাচল স্থবির হয়ে পড়ার ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক সময় ৮-১০ ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় লাগে। ঢাকা নগরীতে দিনে ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কারণে রাতের জন্য অপেক্ষা, তার ওপর প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সেখানে একসঙ্গে অনেক ভিড় লেগে যেতে পারে। প্রক্রিয়াজাত শেষে যানজট ঠেলে সময়মতো কার্গো বিমানের শিডিউল রক্ষা দুরূহ ব্যাপার।

কৃষি মন্ত্রণালয় দেশের তিনটি স্থান- চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও সাতক্ষীরায় বিদেশে আম রপ্তানির উদ্দেশ্যে মানসম্মত ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট, কোয়ারেন্টাইন ও প্যাকেজিং সুবিধাসহ অবকাঠামো গড়ে তোলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কয়েক বছর আগে। কিন্তু এখনো সেই সিদ্ধান্ত আঁতুড়ঘরে রয়ে গেছে। উল্টো নারায়ণগঞ্জে উক্ত অবকাঠামো গড়ে তুলে অর্থের অপচয়, সময়ের অপচয়, যানজটের দুর্ভোগ, শিডিউল বিপর্যয় ইত্যাদি কারণে আম বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনায় ব্যবসায়ীদের সর্বনাশের পথে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন জেলার আমচাষি ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের করুণ ফরিয়াদ কৃষিমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে কীভাবে পৌঁছবে?

[লেখক : গবেষক]