অপরাধের শিকার এবং অপরাধী কেন বারবার মুসলমানই?

গৌতম রায়

গত এক দেড় মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গে যেসব হিংসাত্মক রাজনৈতিক কা-কারখানা হচ্ছে, তার প্রতিটির মধ্যেই বৈশিষ্ট্যগত সাদৃশ্য হলো, ঘটনাগুলো হচ্ছে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপরে এবং ঘটনাগুলো যারা ঘটাচ্ছে তারাও মুসলমান। আনিস হত্যাকা- থেকে শুরু করে বগটুই- রামপুরহাট গণহত্যা হয়ে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সর্বত্রই আমরা এই এক ছবি দেখতে পাচ্ছি। আক্রমণ যে কারণেই হোক না কেন, আক্রমণ করা হচ্ছে যাদের ওপর, ধর্মীয় পরিচয়ে তারা মুসলমান। আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যারা আক্রমণ করেছেন বলে অভিযোগ বা আক্রমণের কারণে পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করেছে, তারাও কিন্তু জন্মসূত্রে মুসলমান।

আনিস খান বা তার পরিবার অত্যন্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। কোনো মতে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই তাদের হয়েছে। দেওয়ালে প্লাস্টার পর্যন্ত পড়েনি। সিঁড়ির রেলিং হয়নি। বাঁশ দিয়ে কোনোমতে সাময়িক রেলিং তৈরি করে তাদের বাড়িতে যেতে হয়। ছাদের রেলিং নেই। যে কারণে আনিসকে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলার কাজটা অনেক সহজ হয়েছে।

রামপুরহাট গণহত্যায় যার খুন ঘিরে এই ম্যাসাকার সংগঠিত হয়েছে, সেই ভাদু শেখের শাসক দল করবার দৌলতে আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও, তার হত্যার শোধ নিতে বাগটুই তে যে গণহত্যা চালানো হয়েছে, সেই গণহত্যার বলি মানুষজনেরা সবাইই হতদরিদ্র মুসলমান।

আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে হেনস্তার অভিযোগ যেসব ছাত্রকে ঘিরে উঠছে, তারাও প্রত্যেকে জন্মসূত্রে মুসলমান। উপাচার্যকে অসম্মান করবার ক্ষেত্রে, মারের হুমকি দিতে, অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে যেসব লোকেরা আলিয়ার এই প্রাক্তন ছাত্রদের প্ররোচিত করেছে বলে অভিযোগ, প্রত্যেকেই কিন্তু মুসলমান। গোটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখনও পর্যন্ত পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করেছে, সেই মানুষেরাও মুসলমান।

প্রশ্ন হলো, গত এক মাসে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিম-লে সাড়া-জাগানো প্রায় প্রতিটি ঘটনায় হয় আক্রান্ত, নয় আক্রমণকারী মুসলমান। কেন এমনটি ঘটছে? দুটি ক্ষেত্রেই মুসলমানের থাকার বিষয়টি কী নিছকই কাকতালীয়? নাকি, ভারতের সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক শক্তি, সংখ্যালঘু মুসলমানদের অপরাধপ্রবণ দেখাবার যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে, গোটা প্রবণতাটি তারই একটা করুণ পরিণতি? পাশাপাশি প্রশ্ন ওঠে, সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিগত ১০-১২ বছর ধরে যে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি দাবার গুটি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহার করে চলেছে, গত এক মাস ধরে পরপর ঘটে যাওয়া ঘটনার নিরিখে বুঝতে পারা যাচ্ছে যে, সেই ব্যবহারের বিষময় ফল এখন সমাজজীবনে কি গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। আর সেই ক্ষতের সুযোগ নিয়ে সংখ্যাগুরু হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি নিজেদের রাজনৈতিক অভিপ্রায় সিদ্ধির কাজে কতখানি এগিয়ে যেতে পারছে।

আরএসএস তাদের জন্মলগ্ন থেকে মুসলমান সমাজকে ‘অপরাধপ্রবণ’ বলে প্রচার করে। ভারতে তথা বিশ্বে যত অপরাধ সংগঠিত হয়, তার সিংহভাগই করে মুসলমানেরা, বিগত ১৯২৫ সালে জন্মলগ্ন থেকে আরএসএসএই অপপ্রচার করে চলে। হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ, বিজেপিÑ নানা সময়ে আরএসএসের বিবর্তিত রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ‘অপরাধ এবং মুসলমান’কে এক পঙ্তিতে ফেলার জন্য সব সময় সচেষ্ট। সংঘের বিভিন্ন শাখা সংগঠনগুলো মুসলমানদের ঘিরে এ অপপ্রচার সমাজের বিভিন্ন স্তরে ধারাবাহিকভাবে ছড়িয়ে চলেছে। আজ যে ঘৃণার রাজনীতিকে গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির প্রথাগত রাজনীতির একটা অঙ্গ করে তুলেছে, সেই মানসিকতা প্রসারের ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদীদের মুসলমান সমাজকে অপরাধপ্রবণ হিসেবে দেখানোর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। আর সেই ভূমিকাটিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতেই মমতা এবং তার দল তৃণমূল কংগ্রেস গত ১১ বছরে এ রাজ্যে মুসলমান সমাজের আর্থসামাজিক উন্নতির লক্ষ্যে একটা কাজ ও করেনি। যে আলঙ্কারিক উন্নয়নের ঢক্কানিনাদ মমতা এবং তার দল তৃণমূল কংগ্রেস মুসলমান সমাজকে ঘিরে প্রচার করে এসেছে, তার জেরে শাসকদলের যে দুর্নীতি, সিন্ডিকেটরাজ, ক্ষমতার সিন্ডিকেট- এসব বৃত্তের ভেতরেই মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অংশের একটা বিরাটসংখ্যক মানুষ ক্রমশ নিমজ্জিত হয়েছে। তার ফলশ্রুতিতেই আনিস থেকে বগটুই হয়ে আলিয়া, সর্বত্রই আক্রান্ত হচ্ছে মুসলমান এবং আক্রমণকারীও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মুসলমান।

আনিস থেকে আলিয়া- যে পরম্পরায় উঠে আসছে, তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের, আরএসএস-বিজেপির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রথমে অপরাধকে যুক্ত করে, অপরাধী মাত্রেই মুসলমানÑএই যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সরলীকরণ, তাকে সফল করে তোলার জন্যই কী আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি- কারিগরি বিদ্যার চর্চা, মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা, গোটা মুসলমান সমাজের আর্থিক মেরুদ- শক্ত করার তাগিদে কর্মসংস্থান- এই প্রত্যেক বিষয় অত্যন্ত সুকৌশলে, রাজনৈতিক অভিষ্পা নিয়েই এড়িয়ে গিয়েছেন মমতা এবং তার দল?

যে আলঙ্কারিক উন্নয়নের প্রচারকাজ মুসলমান সমাজকে ঘিরে মমতা গত ১১ বছর ধরে করে চলেছেন, সেই কর্মকা-ে মুসলমান সমাজের আর্থসামাজিক উন্নতি কতখানি হয়েছে? যে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিগ্রহ এখন খবরের শিরোনামে, সেই বিশ্ববিদ্যালয় কি বিগত ১১ বছরে রাজ্য সরকারের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য টাকা নিয়মিতভাবে পেয়েছেন? রাজ্যের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইউজিসিসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় সংস্থা থেকে যে হারে এবং ক্রম-অনুসারে আর্থিক সাহায্য পান, বিগত ১১ বছরে সেই ক্রমের ধারাবাহিকতা এবং অর্থ সাহায্যের নিয়মিত ধারা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অব্যাহত থেকেছে? আনিস খানেরা এই আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি রাজ্য সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণের প্রতিবাদে আন্দোলন করেছিলেন। দলমত নির্বিশেষে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র-শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন নিয়মিত রাখতে রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন দীর্ঘদিন। কোন কিছুতেই কী রাজ্য সরকারের কোন হেলদোল ঘটেছে?

যে ছাত্রদের আলিয়ার উপাচার্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই ছাত্রদের প্ররোচিত করেছে কারা? জিম নাওয়াজ বলে এক ব্যক্তি সম্পর্কে সংবাদ মাধ্যমে অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। ব্যক্তিটি বিগত তিন চার বছর ধরে সামাজিক গণমাধ্যমে একটা আপাত দল নিরপেক্ষতার ইমেজ বজায় রেখে মুসলমান সমাজের ওপর নানা বঞ্চনা ঘিরে সোচ্চার ছিলেন। দেখা গেল, সেই ব্যক্তিটিই গত ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে রাজ্যের শাসক তৃণমূলের পক্ষ অবলম্বন করে একটা অদ্ভুত সাম্প্রদায়িক অবস্থান গ্রহণ করলেন। বিগত লোকসভার ভোটে রায়গঞ্জ কেন্দ্রে বামফ্রন্টের সিপিআই (এম) প্রার্থী মহ. সেলিমের বিরুদ্ধে তিনি কার্যত একটা সাম্প্রদায়িক অবস্থান গ্রহণ করলেন। মুসলমান সমাজের উন্নতির নাম করে লোকটি প্রত্যক্ষভাবে মহ. সেলিমকে ভোটে হারাতে আত্মনিয়োগ করলেন।

জিম নাওয়াজের মতো ব্যক্তিদের ঘিরে অনেক সমাজবিজ্ঞানীর মনেই এ প্রশ্ন আছে যে, ব্যক্তিটি কি আরএসএসের শাখা সংগঠন, ‘মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চে’র সক্রিয় কর্মী? নানা রাজনৈতিক সংঘর্ষ, চাপান উতোর, তা সে বর্ধমানের খাগড়াগড়ই হোক বা বাগটুই গণহত্যাই হোক কিংবা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নির্যাতনÑ প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে মুসলমান সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করে যে ঘটনাক্রম ধারাবাহিকভাবে চলছে, তাতে এটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি, মুসলমান সমাজকে ‘অপরাধ প্রবণ’ দেখিয়ে বিদ্বেষের রাজনীতি, বিভাজনের রাজনীতিকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলে সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদকে ব্যবহার করে যে নাগপুরীয় ‘হিন্দুরাষ্ট্রে’র দিকে ভারতকে ঠেলে দিচ্ছেন, সে পথে মসৃণ করার কাজেই এখন আত্মনিয়োগ করেছেন মমতা। আর সেই কারণেই আশঙ্কা হচ্ছে, মুসলমান সমাজকে বিভ্রান্ত করতে আরএসএস, ‘মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চ’ নামক যে সংগঠনটি তৈরি করেছিল, সেই সংগঠনটি এখন অত্যন্ত শক্তিশালী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের ও ভেতরে। বালি খাদান, পাথর খাদানের দুর্নীতি থেকে শুরু করে নকল টোল প্লাজা সব কিছুর সঙ্গেই মুসলমান সমাজকে যুক্ত করে দিয়ে, মুসলমানদেরই মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে, নিজেদের মধ্যে বিবাদ-বিসংবাদ তৈরি করে, খুন জখম করে, মুসলমানদের ‘অপরাধ প্রবণ’ দেখিয়ে, তাদের সম্পর্কে গণহিস্টিরিয়া তৈরির যে আরএসএসের কৌশল, তাকে সফল করতে এখন আরএসএসের গোপন অথচ বিশ্বস্ত বন্ধু মমতা আত্মনিবেদিত।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

শনিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২২ , ২৬ চৈত্র ১৪২৮ ০৭ রমাদ্বান ১৪৪৩

অপরাধের শিকার এবং অপরাধী কেন বারবার মুসলমানই?

গৌতম রায়

গত এক দেড় মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গে যেসব হিংসাত্মক রাজনৈতিক কা-কারখানা হচ্ছে, তার প্রতিটির মধ্যেই বৈশিষ্ট্যগত সাদৃশ্য হলো, ঘটনাগুলো হচ্ছে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপরে এবং ঘটনাগুলো যারা ঘটাচ্ছে তারাও মুসলমান। আনিস হত্যাকা- থেকে শুরু করে বগটুই- রামপুরহাট গণহত্যা হয়ে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সর্বত্রই আমরা এই এক ছবি দেখতে পাচ্ছি। আক্রমণ যে কারণেই হোক না কেন, আক্রমণ করা হচ্ছে যাদের ওপর, ধর্মীয় পরিচয়ে তারা মুসলমান। আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যারা আক্রমণ করেছেন বলে অভিযোগ বা আক্রমণের কারণে পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করেছে, তারাও কিন্তু জন্মসূত্রে মুসলমান।

আনিস খান বা তার পরিবার অত্যন্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। কোনো মতে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই তাদের হয়েছে। দেওয়ালে প্লাস্টার পর্যন্ত পড়েনি। সিঁড়ির রেলিং হয়নি। বাঁশ দিয়ে কোনোমতে সাময়িক রেলিং তৈরি করে তাদের বাড়িতে যেতে হয়। ছাদের রেলিং নেই। যে কারণে আনিসকে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলার কাজটা অনেক সহজ হয়েছে।

রামপুরহাট গণহত্যায় যার খুন ঘিরে এই ম্যাসাকার সংগঠিত হয়েছে, সেই ভাদু শেখের শাসক দল করবার দৌলতে আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও, তার হত্যার শোধ নিতে বাগটুই তে যে গণহত্যা চালানো হয়েছে, সেই গণহত্যার বলি মানুষজনেরা সবাইই হতদরিদ্র মুসলমান।

আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে হেনস্তার অভিযোগ যেসব ছাত্রকে ঘিরে উঠছে, তারাও প্রত্যেকে জন্মসূত্রে মুসলমান। উপাচার্যকে অসম্মান করবার ক্ষেত্রে, মারের হুমকি দিতে, অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে যেসব লোকেরা আলিয়ার এই প্রাক্তন ছাত্রদের প্ররোচিত করেছে বলে অভিযোগ, প্রত্যেকেই কিন্তু মুসলমান। গোটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখনও পর্যন্ত পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করেছে, সেই মানুষেরাও মুসলমান।

প্রশ্ন হলো, গত এক মাসে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিম-লে সাড়া-জাগানো প্রায় প্রতিটি ঘটনায় হয় আক্রান্ত, নয় আক্রমণকারী মুসলমান। কেন এমনটি ঘটছে? দুটি ক্ষেত্রেই মুসলমানের থাকার বিষয়টি কী নিছকই কাকতালীয়? নাকি, ভারতের সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক শক্তি, সংখ্যালঘু মুসলমানদের অপরাধপ্রবণ দেখাবার যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে, গোটা প্রবণতাটি তারই একটা করুণ পরিণতি? পাশাপাশি প্রশ্ন ওঠে, সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিগত ১০-১২ বছর ধরে যে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি দাবার গুটি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহার করে চলেছে, গত এক মাস ধরে পরপর ঘটে যাওয়া ঘটনার নিরিখে বুঝতে পারা যাচ্ছে যে, সেই ব্যবহারের বিষময় ফল এখন সমাজজীবনে কি গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। আর সেই ক্ষতের সুযোগ নিয়ে সংখ্যাগুরু হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি নিজেদের রাজনৈতিক অভিপ্রায় সিদ্ধির কাজে কতখানি এগিয়ে যেতে পারছে।

আরএসএস তাদের জন্মলগ্ন থেকে মুসলমান সমাজকে ‘অপরাধপ্রবণ’ বলে প্রচার করে। ভারতে তথা বিশ্বে যত অপরাধ সংগঠিত হয়, তার সিংহভাগই করে মুসলমানেরা, বিগত ১৯২৫ সালে জন্মলগ্ন থেকে আরএসএসএই অপপ্রচার করে চলে। হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ, বিজেপিÑ নানা সময়ে আরএসএসের বিবর্তিত রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ‘অপরাধ এবং মুসলমান’কে এক পঙ্তিতে ফেলার জন্য সব সময় সচেষ্ট। সংঘের বিভিন্ন শাখা সংগঠনগুলো মুসলমানদের ঘিরে এ অপপ্রচার সমাজের বিভিন্ন স্তরে ধারাবাহিকভাবে ছড়িয়ে চলেছে। আজ যে ঘৃণার রাজনীতিকে গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির প্রথাগত রাজনীতির একটা অঙ্গ করে তুলেছে, সেই মানসিকতা প্রসারের ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদীদের মুসলমান সমাজকে অপরাধপ্রবণ হিসেবে দেখানোর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। আর সেই ভূমিকাটিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতেই মমতা এবং তার দল তৃণমূল কংগ্রেস গত ১১ বছরে এ রাজ্যে মুসলমান সমাজের আর্থসামাজিক উন্নতির লক্ষ্যে একটা কাজ ও করেনি। যে আলঙ্কারিক উন্নয়নের ঢক্কানিনাদ মমতা এবং তার দল তৃণমূল কংগ্রেস মুসলমান সমাজকে ঘিরে প্রচার করে এসেছে, তার জেরে শাসকদলের যে দুর্নীতি, সিন্ডিকেটরাজ, ক্ষমতার সিন্ডিকেট- এসব বৃত্তের ভেতরেই মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অংশের একটা বিরাটসংখ্যক মানুষ ক্রমশ নিমজ্জিত হয়েছে। তার ফলশ্রুতিতেই আনিস থেকে বগটুই হয়ে আলিয়া, সর্বত্রই আক্রান্ত হচ্ছে মুসলমান এবং আক্রমণকারীও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মুসলমান।

আনিস থেকে আলিয়া- যে পরম্পরায় উঠে আসছে, তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের, আরএসএস-বিজেপির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রথমে অপরাধকে যুক্ত করে, অপরাধী মাত্রেই মুসলমানÑএই যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সরলীকরণ, তাকে সফল করে তোলার জন্যই কী আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি- কারিগরি বিদ্যার চর্চা, মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা, গোটা মুসলমান সমাজের আর্থিক মেরুদ- শক্ত করার তাগিদে কর্মসংস্থান- এই প্রত্যেক বিষয় অত্যন্ত সুকৌশলে, রাজনৈতিক অভিষ্পা নিয়েই এড়িয়ে গিয়েছেন মমতা এবং তার দল?

যে আলঙ্কারিক উন্নয়নের প্রচারকাজ মুসলমান সমাজকে ঘিরে মমতা গত ১১ বছর ধরে করে চলেছেন, সেই কর্মকা-ে মুসলমান সমাজের আর্থসামাজিক উন্নতি কতখানি হয়েছে? যে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিগ্রহ এখন খবরের শিরোনামে, সেই বিশ্ববিদ্যালয় কি বিগত ১১ বছরে রাজ্য সরকারের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য টাকা নিয়মিতভাবে পেয়েছেন? রাজ্যের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইউজিসিসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় সংস্থা থেকে যে হারে এবং ক্রম-অনুসারে আর্থিক সাহায্য পান, বিগত ১১ বছরে সেই ক্রমের ধারাবাহিকতা এবং অর্থ সাহায্যের নিয়মিত ধারা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অব্যাহত থেকেছে? আনিস খানেরা এই আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি রাজ্য সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণের প্রতিবাদে আন্দোলন করেছিলেন। দলমত নির্বিশেষে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র-শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন নিয়মিত রাখতে রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন দীর্ঘদিন। কোন কিছুতেই কী রাজ্য সরকারের কোন হেলদোল ঘটেছে?

যে ছাত্রদের আলিয়ার উপাচার্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই ছাত্রদের প্ররোচিত করেছে কারা? জিম নাওয়াজ বলে এক ব্যক্তি সম্পর্কে সংবাদ মাধ্যমে অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। ব্যক্তিটি বিগত তিন চার বছর ধরে সামাজিক গণমাধ্যমে একটা আপাত দল নিরপেক্ষতার ইমেজ বজায় রেখে মুসলমান সমাজের ওপর নানা বঞ্চনা ঘিরে সোচ্চার ছিলেন। দেখা গেল, সেই ব্যক্তিটিই গত ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে রাজ্যের শাসক তৃণমূলের পক্ষ অবলম্বন করে একটা অদ্ভুত সাম্প্রদায়িক অবস্থান গ্রহণ করলেন। বিগত লোকসভার ভোটে রায়গঞ্জ কেন্দ্রে বামফ্রন্টের সিপিআই (এম) প্রার্থী মহ. সেলিমের বিরুদ্ধে তিনি কার্যত একটা সাম্প্রদায়িক অবস্থান গ্রহণ করলেন। মুসলমান সমাজের উন্নতির নাম করে লোকটি প্রত্যক্ষভাবে মহ. সেলিমকে ভোটে হারাতে আত্মনিয়োগ করলেন।

জিম নাওয়াজের মতো ব্যক্তিদের ঘিরে অনেক সমাজবিজ্ঞানীর মনেই এ প্রশ্ন আছে যে, ব্যক্তিটি কি আরএসএসের শাখা সংগঠন, ‘মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চে’র সক্রিয় কর্মী? নানা রাজনৈতিক সংঘর্ষ, চাপান উতোর, তা সে বর্ধমানের খাগড়াগড়ই হোক বা বাগটুই গণহত্যাই হোক কিংবা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নির্যাতনÑ প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে মুসলমান সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করে যে ঘটনাক্রম ধারাবাহিকভাবে চলছে, তাতে এটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি, মুসলমান সমাজকে ‘অপরাধ প্রবণ’ দেখিয়ে বিদ্বেষের রাজনীতি, বিভাজনের রাজনীতিকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলে সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদকে ব্যবহার করে যে নাগপুরীয় ‘হিন্দুরাষ্ট্রে’র দিকে ভারতকে ঠেলে দিচ্ছেন, সে পথে মসৃণ করার কাজেই এখন আত্মনিয়োগ করেছেন মমতা। আর সেই কারণেই আশঙ্কা হচ্ছে, মুসলমান সমাজকে বিভ্রান্ত করতে আরএসএস, ‘মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চ’ নামক যে সংগঠনটি তৈরি করেছিল, সেই সংগঠনটি এখন অত্যন্ত শক্তিশালী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের ও ভেতরে। বালি খাদান, পাথর খাদানের দুর্নীতি থেকে শুরু করে নকল টোল প্লাজা সব কিছুর সঙ্গেই মুসলমান সমাজকে যুক্ত করে দিয়ে, মুসলমানদেরই মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে, নিজেদের মধ্যে বিবাদ-বিসংবাদ তৈরি করে, খুন জখম করে, মুসলমানদের ‘অপরাধ প্রবণ’ দেখিয়ে, তাদের সম্পর্কে গণহিস্টিরিয়া তৈরির যে আরএসএসের কৌশল, তাকে সফল করতে এখন আরএসএসের গোপন অথচ বিশ্বস্ত বন্ধু মমতা আত্মনিবেদিত।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]