দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরিতে চাঁদাবাজি

দক্ষিণ বঙ্গের ২১ জেলার যাত্রী ও যানবাহন পারাপারের একমাত্র প্রবেশদ্বার হচ্ছে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া নৌপথ। এ ঘাটে দীর্ঘ দিন যাবৎ চাঁদাবাজি, হয়রানি ও যানজট নিত্যদিনের ঘটনা। এর নেপথ্যে রয়েছে নানা কারণ যেমন, ফেরি চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে মহাসড়কে সৃষ্ট দীর্ঘ সিরিয়াল। এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ঘাট সংশ্লিষ্ট চিহ্নিত প্রভাবশালী চক্র ও কর্তৃপক্ষ। ঘাট এলাকায় যানবাহনের সারি বড় হওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে দালাল চক্রের চাঁদার পরিমাণ।

এছাড়া ফেরি থেকে আনলোড হওয়া প্রতিটি যানবাহন থেকে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায় করে বিআইডব্লিউটিসি’র কর্মচারীরা। সংশ্লিষ্টদের হিসাব মতে এভাবে প্রতি মাসে অন্তত ১০ লাখ টাকা আদায় করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘাট সংশ্লিষ্টরা ও ট্রাক চালকরা বলেন, যে সব ট্রাকগুলোর লোড একটু উঁচু থাকে সে সব ট্রাকগুলো ফেরিতে উঠতে গেলে বিআইডব্লিউটিসির টিকেট গ্রহণকারীকে বাড়তি ১শ’ থেকে ২শ’ টাকা দিয়ে ফেরিতে উঠতে হয় আর তা না দিলে ফেরিতে উঠতে সমস্যা সৃষ্টি করে বলে ট্রাক চালকদের অভিযোগ রয়েছে। তারা আরও বলেন যে, আমরা তো প্রতিনিয়ত যাতায়াত করি আমাদের ফেরি স্টাফরা চেনেন তাই নাম এবং গাড়ির নাম্বার জানা বলে আমাদের আরও সমস্যা হবে বলে জানান।

এদিকে ২২ এপ্রিল রোববার রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আসন্ন ঈদ উপলক্ষ্যে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে যাত্রী ও যানবাহন নির্বিঘেœ পারাপারের লক্ষ্যে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের ব্যস্ততম দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে জ্বালানি সাশ্রয় করতে ফেরি ধীর গতিতে চলানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন রাজবাড়ী বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুরাদ হাসান। তিনি আরও বলেন, ফেরি দ্রুত গতিতে চললে ট্রিপ সংখ্যা বাড়বে। মানুষের ভোগান্তিও কমবে। কিন্তু তেল বেশি ফুরাবে এর জন্য ফেরির গতি থাকে অনেক কম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নাব্যতা সংকট, ফেরি সংকটসহ নানা কারণে নাকাল হয়ে পড়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার খ্যাত দৌলতদিয়া ঘাটে ব্যাস্ততম দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট। অব্যহত যানজটে দুই পাড়ে যাত্রী ও পরিবহন চালকরা দিনের পর দিন ভোগান্তি পোহাতে হয় দিনের পর দিন। এ অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা দালাল চক্র, ট্রাফিক পুলিশ, ফেরি বুকিং কাউন্টার স্টাফসহ বিভিন্ন সুযোগ সন্ধানীরা। ঘাটের দিনের বেলার পাশাপাশি রাতে এসব চক্র রীতিমতো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ঈদকালীন সময়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট দালালমুক্ত নির্বিঘেœ যানবাহন পারাপারের জন্য সচেষ্ট থাকলেও ঘাটের প্রতিটি পয়েন্টে দেখা যায় চিহ্নিত দালালদের ব্যাপক প্রভাব। ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ে ও তাদের ছত্রছায়ায় থাকা এ সব দালালমুক্ত পরিবেশে চালকরা আদৌও কোন দিন এ রুট দিয়ে চলাচল করতে পারবে কি-না তা কেউ জানে না।

ঘাট সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদের আগে যানবাহনের চাপ পড়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী দালালদের তৎপরতা বেড়ে গেছে। রাতের বেলায় দালালদের তৎপরতা রীতিমতো ভয়াবহ আকারে বেড়ে যায়। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দের ওয়াজেদ চৌধুরী স্কুল অ্যান্ড কলেজের পর থেকে বাংলাদেশ হ্যাচারির পর মহাসড়কের চার লেন সড়কে প্রবেশকালে সিরিয়াল ভঙ্গ করে গাড়ি আগে বের করে দেয়। সরকার দলীয় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রতিনিধির ছত্রছায়ায় তাদের লোকজন আগেভাগে ফেরিতে ওঠার ব্যবস্থার কথা বলে পণ্যবাহী গাড়ি থেকে বাড়তি টাকা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তরমুজবাহী কাভার্ডভ্যান, ট্রাক, মাছের গাড়ি, অন্য ফলের গাড়ি থেকে নির্ধারিত টিকেট মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। এজন্য রাতের বেলায় ওই সমস্ত সরকার দলীয় নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের অন্তত শতাধিক সদস্য সক্রিয় থাকছে। এ চক্রের সদস্যরা রাতে চুক্তিভুক্ত পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে সিরিয়াল ভেঙে সামনে নিয়ে যাওয়ার জন্য অন্যদের চোখ ফাঁকি দিতে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় হেডলাইট বন্ধ করে ডানদিয়ে বেপরোয়া গতিতে এগিয়ে যায়। এ রকম একটি ঘটনায় সম্প্রতি বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ১৮ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

ঘাট সংশ্লিষ্টরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যসহ সরকার দলীয় স্থানীয় কয়েক নেতার লোকজন তরমুজবাহী গাড়িসহ অন্য ফলের গাড়ি থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করে থাকেন। প্রতিটি গাড়ি থেকে নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত ১৫০০ থেকে ২০০০ (পনেরশ’ টাকা থেকে দুই হাজার) টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন। কখনো কখনো টাকার অঙ্ক আরও বেড়ে যায়। এছাড়া মাছবাহী ট্রাক থেকে টাকা আদায় করে স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা। এক কথায় বলা যায়, দৌলতদিয়া ঘাট দিয়ে পারাপার হওয়া প্রায় সব পণ্যবাহী ট্রাকই ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠা দালাল চক্রকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ফেরির নাগাল পেতে হয়। তাদের টাকা না দিয়ে ওই গাড়ি দৌলতদিয়া ঘাট পাড়ি দেয়ার প্রায় অসম্ভব। এই টাকার ভাগ বিভিন্ন সেক্টরে প্রদান করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। 

গত বুধবার বেলা ২টার দিকে দৌলতদিয়া ৫নং ফেরিঘাট পন্টুনে কথা হয় বরগুনা থেকে তরমুজ বোঝাই করে আসা ট্রাকচালক আবু জাহার সঙ্গে। তিনি জানান, এক হাজার ৬০ টাকা মূল্যের ফেরির টিকেট দালালদের মাধ্যমে ২ হাজার টাকায় পেয়েছি। আজ গাড়ির সিরিয়াল অন্যদিনের তুলনায় একটু কম, তাই অপেক্ষাকৃত কম টাকায়ই ফেরির টিকেট পেয়েছি। নিজেরা কেন টিকেট সংগ্রহ করেন না জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিজেরা টিকেট করে বিপদে পরব নাকি? দালালদের মাধ্যমে টিকেট না নিলে ঘাটে অনেক ঝামেলায় পড়তে হয়। তাই আমরা সব সময় দালালদের মাধ্যমে টিকেট নিয়ে থাকি।

এর আগে মহাসড়কের দৌলতদিয়া মডেল হাই স্কুলের সামনে সিরিয়ালে আটকে থাকা ভোমরা স্থলবন্দর থেকে আসা বেদানা বোঝাই ট্রাকচালক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, শাহিন নামের এক ব্যাক্তি তার ফেরির টিকেট সংগ্রহ করে দেয়। বিনিময়ে গাড়ির সিরিয়াল অনুযায়ী টিকেট মূল্যের চেয়ে ৫শ’ থেকে ১ হাজার ৫শ টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়।

সাতক্ষীরা থেকে ছেড়ে আসা ব্যাটারি বোঝাই কভার্ড ভ্যানচালক মো. রেজাউল জানান, শামীম নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি তার গাড়ির ফেরির টিকেট সংগ্রহ করে দেয়। এর বিনিময়ে তাকে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। তারপরও শামীমকে দিয়ে তার অনেক উপকার হয়। সিরিয়াল ভেঙে আগে ফেরিঘাটে যেতে তিনি সহযোগিতা করেন। অনেক সময় ট্রাফিক পুলিশের কাছে তদবির করে সিরিয়াল ভেঙে ফেরিতে উঠতে সহযোগিতা করেন।

জানা যায়, দৌলতদিয়া ঘাটের অবৈধ আয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক গ্রুপ বিভিন্ন সময় মারমুখী হয়ে ওঠে। এ নিয়ে একাধিকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

এদিকে ফেরি থেকে নামার সময় বিআইডব্লিউটিসি’র কর্মচারীরা প্রতিটি যানবাহন থেকে প্রকাশ্যে দশ টাকা করে আদায় করে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম চলে আসায় প্রতিটি যানবাহনের চালক বিনা বাক্যে ১০ টাকা দিয়ে থাকে এছাড়া মোটরসাইকেল প্রতি ৫০ টাকা নিয়ে থাকে টিকেট না দিয়ে বিআইডব্লিউটিসি’র ফেরি কর্মচারীরা। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট দিয়ে প্রতিদিন সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার যানবাহন পারাপার হয়ে থাকে। এভাবে প্রতিটি যানবাহন থেকে ১০ টাকা করে আদায় করে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা অবৈধভাবে আদায় করে থাকে।

সরেজমিন বুধবার দৌলতদিয়া ঘাটের ৫নং পন্টুনে গিয়ে দেখা যায়, গাড়ি ফেরি থেকে নামার সময় প্রতিটি গাড়ির সামনে বিআইডব্লিউটিসি’র ফেরি একজন কর্মচারী গিয়ে দাঁড়িয়ে চালকের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন। ওই কর্মচারীকে কিসের টাকা আদায় করছেন? জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘বকশিশ’। নাম জিজ্ঞেসা করতেই তিনি রেগে বললেন, নাম দিয়ে কি করবেন, ছবি তুলবেন না।

গত বুধবার দুপুরে সরেজমিন দৌলতদিয়া ঘাট ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে বাংলাদেশ হ্যাচারিজ পর্যন্ত যানবাহনের লম্বা লাইন রয়েছে। প্রায় ৩ কিলোমিটার লম্বা লাইনে যাত্রীবাহী দূরপাল্লার পরিবহন, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি রয়েছে। ঈদের পাঁচ দিন আগ থেকে এবং ঈদের পাঁচ দিন পর পর্যন্ত পণ্যবাহী গাড়ি বন্ধ থাকবে মর্মে কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্ত জানার পর গত বুধবার পণ্যবাহী গাড়ির বাড়তি চাপ কমেছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক প্রফুল্ল চৌহানের কাছে সরাসরি যানবাহনের চালক বা হেলাপারের কাছে ফেরির টিকেট না দিয়ে কেন দালালদের কাছে বিক্রি করা হয়, জানতে চাইলে তিনি সংবাদকে বলেন, কে যানবাহনের চালক, কে হেলপার, আর কে দালাল তা আমাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না। কারণ আমার লোকজন থাকে ৪ দেয়ালের মধ্যে, বাইরের সব বিষয় তাদের খেয়াল করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাছাড়া আমরা কেউ এখানকার স্থানীয় না বিভিন্ন জাইগা থেকে চাকরি করি, যে সবাইকে চিনব। তিনি আরও জানান, ফেরি থেকে যানবাহন আনলোড করার সময় কেউ কোন টাকা আদায় করে কি-না আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। বর্তমানে এ নৌরুটের ফেরিবহরে ২১টি ফেরি রয়েছে। এরমধ্যে এর মধ্যে আরিচায় চাপ থাকায় একটি ফেরি আরিচা নৌরুটে দেয়া হচ্ছে বর্তমানে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ২০টি ফেরি চলাচল করছে বলেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আজিজুল হক খান মামুন সাংবাদিকদের বলেন, দৌলতদিয়া ঘাট এলাকা দালালমুক্ত রাখতে স্থানীয় প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য ঘাট এলাকায় প্রতিনিয়ত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ফেরির টিকেট বিক্রিকে কেন্দ্র করে মূলত দালাল চক্র সক্রিয় থাকে। ফেরির ই-টিকেটিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে দীর্ঘদিনের এ চক্র নির্মূল করা সম্ভব হবে। ই-টিকেটিংয়ের ব্যবস্থা থাকলে দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে যে কেউ টিকেট সংগ্রহ করতে পারবে। এতে স্থানীয় লোকজন এই অবৈধ সুবিধা নিতে পারবে না। এ লক্ষ্যে একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

image

ফেরি থেকে আনলোড হওয়া প্রতিটি যানবাহন থেকে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায় করে বিআইডব্লিউটিসির কর্মচারীরা। সংশ্লিষ্টদের হিসাব মতে এভাবে প্রতিমাসে অন্তত ১০ লাখ টাকা আদায় করা হয়। ছবিটি দৌলতদিয়া ৫নং ফেরিঘাট থেকে তোলা -সংবাদ

আরও খবর
তেঁতুলতলার মাঠে থানা হচ্ছে না
‘আই লাভ ইউ বুবু’
খাস জমি আত্মসাৎ, শিক্ষামন্ত্রীর ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা
নাহিদ হত্যা, ৫ জন গ্রেপ্তার
রাঙামাটিতে নির্মাণাধীন সেতু ধসে শ্রমিক নিহত, আহত ১৭
ঘুষের মামলায় জামিন পাননি দুদকের বরখাস্ত পরিচালক বাছির
মন্দিরে কোরআন রাখতে গিয়ে মুসলিম যুবক আটক
গ্রেপ্তারের ২০ ঘণ্টা পর মুক্ত ছাত্রলীগ নেতা

শুক্রবার, ২৯ এপ্রিল ২০২২ , ১৬ বৈশাখ ১৪২৮ ২৭ রমাদ্বান ১৪৪৩

দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরিতে চাঁদাবাজি

শেখ রাজীব, প্রতিনিধি, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)

image

ফেরি থেকে আনলোড হওয়া প্রতিটি যানবাহন থেকে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায় করে বিআইডব্লিউটিসির কর্মচারীরা। সংশ্লিষ্টদের হিসাব মতে এভাবে প্রতিমাসে অন্তত ১০ লাখ টাকা আদায় করা হয়। ছবিটি দৌলতদিয়া ৫নং ফেরিঘাট থেকে তোলা -সংবাদ

দক্ষিণ বঙ্গের ২১ জেলার যাত্রী ও যানবাহন পারাপারের একমাত্র প্রবেশদ্বার হচ্ছে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া নৌপথ। এ ঘাটে দীর্ঘ দিন যাবৎ চাঁদাবাজি, হয়রানি ও যানজট নিত্যদিনের ঘটনা। এর নেপথ্যে রয়েছে নানা কারণ যেমন, ফেরি চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে মহাসড়কে সৃষ্ট দীর্ঘ সিরিয়াল। এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ঘাট সংশ্লিষ্ট চিহ্নিত প্রভাবশালী চক্র ও কর্তৃপক্ষ। ঘাট এলাকায় যানবাহনের সারি বড় হওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে দালাল চক্রের চাঁদার পরিমাণ।

এছাড়া ফেরি থেকে আনলোড হওয়া প্রতিটি যানবাহন থেকে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায় করে বিআইডব্লিউটিসি’র কর্মচারীরা। সংশ্লিষ্টদের হিসাব মতে এভাবে প্রতি মাসে অন্তত ১০ লাখ টাকা আদায় করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘাট সংশ্লিষ্টরা ও ট্রাক চালকরা বলেন, যে সব ট্রাকগুলোর লোড একটু উঁচু থাকে সে সব ট্রাকগুলো ফেরিতে উঠতে গেলে বিআইডব্লিউটিসির টিকেট গ্রহণকারীকে বাড়তি ১শ’ থেকে ২শ’ টাকা দিয়ে ফেরিতে উঠতে হয় আর তা না দিলে ফেরিতে উঠতে সমস্যা সৃষ্টি করে বলে ট্রাক চালকদের অভিযোগ রয়েছে। তারা আরও বলেন যে, আমরা তো প্রতিনিয়ত যাতায়াত করি আমাদের ফেরি স্টাফরা চেনেন তাই নাম এবং গাড়ির নাম্বার জানা বলে আমাদের আরও সমস্যা হবে বলে জানান।

এদিকে ২২ এপ্রিল রোববার রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আসন্ন ঈদ উপলক্ষ্যে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে যাত্রী ও যানবাহন নির্বিঘেœ পারাপারের লক্ষ্যে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের ব্যস্ততম দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে জ্বালানি সাশ্রয় করতে ফেরি ধীর গতিতে চলানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন রাজবাড়ী বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুরাদ হাসান। তিনি আরও বলেন, ফেরি দ্রুত গতিতে চললে ট্রিপ সংখ্যা বাড়বে। মানুষের ভোগান্তিও কমবে। কিন্তু তেল বেশি ফুরাবে এর জন্য ফেরির গতি থাকে অনেক কম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নাব্যতা সংকট, ফেরি সংকটসহ নানা কারণে নাকাল হয়ে পড়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার খ্যাত দৌলতদিয়া ঘাটে ব্যাস্ততম দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট। অব্যহত যানজটে দুই পাড়ে যাত্রী ও পরিবহন চালকরা দিনের পর দিন ভোগান্তি পোহাতে হয় দিনের পর দিন। এ অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা দালাল চক্র, ট্রাফিক পুলিশ, ফেরি বুকিং কাউন্টার স্টাফসহ বিভিন্ন সুযোগ সন্ধানীরা। ঘাটের দিনের বেলার পাশাপাশি রাতে এসব চক্র রীতিমতো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ঈদকালীন সময়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট দালালমুক্ত নির্বিঘেœ যানবাহন পারাপারের জন্য সচেষ্ট থাকলেও ঘাটের প্রতিটি পয়েন্টে দেখা যায় চিহ্নিত দালালদের ব্যাপক প্রভাব। ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ে ও তাদের ছত্রছায়ায় থাকা এ সব দালালমুক্ত পরিবেশে চালকরা আদৌও কোন দিন এ রুট দিয়ে চলাচল করতে পারবে কি-না তা কেউ জানে না।

ঘাট সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদের আগে যানবাহনের চাপ পড়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী দালালদের তৎপরতা বেড়ে গেছে। রাতের বেলায় দালালদের তৎপরতা রীতিমতো ভয়াবহ আকারে বেড়ে যায়। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দের ওয়াজেদ চৌধুরী স্কুল অ্যান্ড কলেজের পর থেকে বাংলাদেশ হ্যাচারির পর মহাসড়কের চার লেন সড়কে প্রবেশকালে সিরিয়াল ভঙ্গ করে গাড়ি আগে বের করে দেয়। সরকার দলীয় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রতিনিধির ছত্রছায়ায় তাদের লোকজন আগেভাগে ফেরিতে ওঠার ব্যবস্থার কথা বলে পণ্যবাহী গাড়ি থেকে বাড়তি টাকা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তরমুজবাহী কাভার্ডভ্যান, ট্রাক, মাছের গাড়ি, অন্য ফলের গাড়ি থেকে নির্ধারিত টিকেট মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। এজন্য রাতের বেলায় ওই সমস্ত সরকার দলীয় নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের অন্তত শতাধিক সদস্য সক্রিয় থাকছে। এ চক্রের সদস্যরা রাতে চুক্তিভুক্ত পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে সিরিয়াল ভেঙে সামনে নিয়ে যাওয়ার জন্য অন্যদের চোখ ফাঁকি দিতে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় হেডলাইট বন্ধ করে ডানদিয়ে বেপরোয়া গতিতে এগিয়ে যায়। এ রকম একটি ঘটনায় সম্প্রতি বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ১৮ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

ঘাট সংশ্লিষ্টরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যসহ সরকার দলীয় স্থানীয় কয়েক নেতার লোকজন তরমুজবাহী গাড়িসহ অন্য ফলের গাড়ি থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করে থাকেন। প্রতিটি গাড়ি থেকে নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত ১৫০০ থেকে ২০০০ (পনেরশ’ টাকা থেকে দুই হাজার) টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন। কখনো কখনো টাকার অঙ্ক আরও বেড়ে যায়। এছাড়া মাছবাহী ট্রাক থেকে টাকা আদায় করে স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা। এক কথায় বলা যায়, দৌলতদিয়া ঘাট দিয়ে পারাপার হওয়া প্রায় সব পণ্যবাহী ট্রাকই ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠা দালাল চক্রকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ফেরির নাগাল পেতে হয়। তাদের টাকা না দিয়ে ওই গাড়ি দৌলতদিয়া ঘাট পাড়ি দেয়ার প্রায় অসম্ভব। এই টাকার ভাগ বিভিন্ন সেক্টরে প্রদান করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। 

গত বুধবার বেলা ২টার দিকে দৌলতদিয়া ৫নং ফেরিঘাট পন্টুনে কথা হয় বরগুনা থেকে তরমুজ বোঝাই করে আসা ট্রাকচালক আবু জাহার সঙ্গে। তিনি জানান, এক হাজার ৬০ টাকা মূল্যের ফেরির টিকেট দালালদের মাধ্যমে ২ হাজার টাকায় পেয়েছি। আজ গাড়ির সিরিয়াল অন্যদিনের তুলনায় একটু কম, তাই অপেক্ষাকৃত কম টাকায়ই ফেরির টিকেট পেয়েছি। নিজেরা কেন টিকেট সংগ্রহ করেন না জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিজেরা টিকেট করে বিপদে পরব নাকি? দালালদের মাধ্যমে টিকেট না নিলে ঘাটে অনেক ঝামেলায় পড়তে হয়। তাই আমরা সব সময় দালালদের মাধ্যমে টিকেট নিয়ে থাকি।

এর আগে মহাসড়কের দৌলতদিয়া মডেল হাই স্কুলের সামনে সিরিয়ালে আটকে থাকা ভোমরা স্থলবন্দর থেকে আসা বেদানা বোঝাই ট্রাকচালক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, শাহিন নামের এক ব্যাক্তি তার ফেরির টিকেট সংগ্রহ করে দেয়। বিনিময়ে গাড়ির সিরিয়াল অনুযায়ী টিকেট মূল্যের চেয়ে ৫শ’ থেকে ১ হাজার ৫শ টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়।

সাতক্ষীরা থেকে ছেড়ে আসা ব্যাটারি বোঝাই কভার্ড ভ্যানচালক মো. রেজাউল জানান, শামীম নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি তার গাড়ির ফেরির টিকেট সংগ্রহ করে দেয়। এর বিনিময়ে তাকে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। তারপরও শামীমকে দিয়ে তার অনেক উপকার হয়। সিরিয়াল ভেঙে আগে ফেরিঘাটে যেতে তিনি সহযোগিতা করেন। অনেক সময় ট্রাফিক পুলিশের কাছে তদবির করে সিরিয়াল ভেঙে ফেরিতে উঠতে সহযোগিতা করেন।

জানা যায়, দৌলতদিয়া ঘাটের অবৈধ আয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক গ্রুপ বিভিন্ন সময় মারমুখী হয়ে ওঠে। এ নিয়ে একাধিকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

এদিকে ফেরি থেকে নামার সময় বিআইডব্লিউটিসি’র কর্মচারীরা প্রতিটি যানবাহন থেকে প্রকাশ্যে দশ টাকা করে আদায় করে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম চলে আসায় প্রতিটি যানবাহনের চালক বিনা বাক্যে ১০ টাকা দিয়ে থাকে এছাড়া মোটরসাইকেল প্রতি ৫০ টাকা নিয়ে থাকে টিকেট না দিয়ে বিআইডব্লিউটিসি’র ফেরি কর্মচারীরা। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট দিয়ে প্রতিদিন সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার যানবাহন পারাপার হয়ে থাকে। এভাবে প্রতিটি যানবাহন থেকে ১০ টাকা করে আদায় করে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা অবৈধভাবে আদায় করে থাকে।

সরেজমিন বুধবার দৌলতদিয়া ঘাটের ৫নং পন্টুনে গিয়ে দেখা যায়, গাড়ি ফেরি থেকে নামার সময় প্রতিটি গাড়ির সামনে বিআইডব্লিউটিসি’র ফেরি একজন কর্মচারী গিয়ে দাঁড়িয়ে চালকের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন। ওই কর্মচারীকে কিসের টাকা আদায় করছেন? জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘বকশিশ’। নাম জিজ্ঞেসা করতেই তিনি রেগে বললেন, নাম দিয়ে কি করবেন, ছবি তুলবেন না।

গত বুধবার দুপুরে সরেজমিন দৌলতদিয়া ঘাট ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে বাংলাদেশ হ্যাচারিজ পর্যন্ত যানবাহনের লম্বা লাইন রয়েছে। প্রায় ৩ কিলোমিটার লম্বা লাইনে যাত্রীবাহী দূরপাল্লার পরিবহন, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি রয়েছে। ঈদের পাঁচ দিন আগ থেকে এবং ঈদের পাঁচ দিন পর পর্যন্ত পণ্যবাহী গাড়ি বন্ধ থাকবে মর্মে কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্ত জানার পর গত বুধবার পণ্যবাহী গাড়ির বাড়তি চাপ কমেছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক প্রফুল্ল চৌহানের কাছে সরাসরি যানবাহনের চালক বা হেলাপারের কাছে ফেরির টিকেট না দিয়ে কেন দালালদের কাছে বিক্রি করা হয়, জানতে চাইলে তিনি সংবাদকে বলেন, কে যানবাহনের চালক, কে হেলপার, আর কে দালাল তা আমাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না। কারণ আমার লোকজন থাকে ৪ দেয়ালের মধ্যে, বাইরের সব বিষয় তাদের খেয়াল করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাছাড়া আমরা কেউ এখানকার স্থানীয় না বিভিন্ন জাইগা থেকে চাকরি করি, যে সবাইকে চিনব। তিনি আরও জানান, ফেরি থেকে যানবাহন আনলোড করার সময় কেউ কোন টাকা আদায় করে কি-না আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। বর্তমানে এ নৌরুটের ফেরিবহরে ২১টি ফেরি রয়েছে। এরমধ্যে এর মধ্যে আরিচায় চাপ থাকায় একটি ফেরি আরিচা নৌরুটে দেয়া হচ্ছে বর্তমানে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ২০টি ফেরি চলাচল করছে বলেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আজিজুল হক খান মামুন সাংবাদিকদের বলেন, দৌলতদিয়া ঘাট এলাকা দালালমুক্ত রাখতে স্থানীয় প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য ঘাট এলাকায় প্রতিনিয়ত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ফেরির টিকেট বিক্রিকে কেন্দ্র করে মূলত দালাল চক্র সক্রিয় থাকে। ফেরির ই-টিকেটিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে দীর্ঘদিনের এ চক্র নির্মূল করা সম্ভব হবে। ই-টিকেটিংয়ের ব্যবস্থা থাকলে দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে যে কেউ টিকেট সংগ্রহ করতে পারবে। এতে স্থানীয় লোকজন এই অবৈধ সুবিধা নিতে পারবে না। এ লক্ষ্যে একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।