অনশনেও মেলেনি ৩ মাসের বকেয়া ঈদের খুশি বঞ্চিত হাজার শ্রমিক

সারাদেশে যখন ঈদের আনন্দে মেতেছেন সবাই। তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদছেন নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা বেকা গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেডের কয়েকশ’ শ্রমিক। গত তিন মাসের বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ না করেই পালিয়েছেন মালিক। গত কয়েকদিন ইপিজেড, শিল্প পুলিশ, বিকেএমইএ’র কাছে ধরণা দিয়েও সমাধান না পেয়ে ঈদের দিন সড়কে অনশনে বসেছেন শ্রমিকরা। ঈদের আনন্দ ছুঁতে পারেনি তাদের।

গত মঙ্গলবার (৩ মে) বেলা সাড়ে ১১টায় নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে যখন শ্রমিকরা অনশনে বসেন তখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। পাওনাদি পরিশোধের আকুতি জানিয়ে বক্তব্য দেয়ার সময় নারী শ্রমিক নূর জাহানের চোখের আর বৃষ্টির পানি আলাদা করা যাচ্ছিল না।

স্কুলপড়–য়া দুই কিশোরী কন্যার সঙ্গে বরিশালের ঝালকাঠির গ্রামের বাড়িতে ঈদের ছুটি কাটানোর কথা ছিল নূর জাহানের। নতুন পোশাক নিয়ে মা আসবেন এই অপেক্ষায় ছিল কন্যারাও। তা আর হয়নি। অসহায়ের মতো নূরজাহান এখন সুদূর নারায়ণগঞ্জ শহরের সড়কে দাঁড়িয়ে আকুতি জানাচ্ছেন প্রাপ্য শ্রমের মজুরির। ন্যায্য পাওনা বঞ্চিত এই নারী শ্রমিক আক্ষেপ করে বলেন, ‘গত নয় বছর যাবৎ এই কারখানায় অমানুষিক পরিশ্রম করেছি। নিজের শ্রমের মজুরি পাইলাম না। বছরে উৎসবের একটা দিন মেয়েদের সঙ্গে থাকতে পারলাম না। বারবার ফোন দিছে, কেটে দিচ্ছি। মেয়েদের কী বলবো, কথা বলার ভাষা আমার কাছে নেই। বাবাহারা মেয়েগুলান! আমি মা হয়ে ঈদে তাদের কিছু দিতে পারছি না। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছি।’

নূর জাহানের স্বামী সাইদুল ইসলামও সাত বছর কাজ করেছেন বেকা গার্মেন্টসে। গত জুলাইতে চাকুরিরত অবস্থাতে মৃত্যু হয় তার। স্বামীর ন্যায্য পাওনাদি আজও বুঝে পাননি বলে জানান নূর জাহান। সরকারের প্রতি প্রশ্ন রেখে নূর জাহান বলেন, ‘কেন আমি আমার প্রাপ্য টাকা পাবো না? স্বামীর পাওনা টাকাও পাইনি। মেয়েদের সঙ্গে ঈদ করার কথা ছিল। আর আমি এই ঢাকা শহরে এত দূরে রাজপথে আন্দোলনে।’ এই বলে গলা জড়িয়ে আসে তার। আর কথা বলতে পারেন না। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে চোখের পানি।

অনশনে অংশ নেয়া বেকা গার্মেন্টস শ্রমিকদের অন্তত দশজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানান, রপ্তানিমুখী এই পোশাক কারখানাটিতে প্রায় এক হাজার শ্রমিক ও কর্মচারী কর্মরত। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সকলের বেতন বন্ধ। গত ২ এপ্রিল কারখানাও বন্ধ করে দেয় মালিকপক্ষ। প্রতিবাদে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী-শিমরাইল সড়ক অবরোধ করে শ্রমিকরা। পরে মালিকপক্ষ বেতন পরিশোধের আশ্বাস দিলে আন্দোলন থেকে সরে আসেন তারা। এরপর চারবার তারিখ দিয়েও বেতন ও আসন্ন ঈদ উপলক্ষে বোনাস পরিশোধ করেনি মালিকপক্ষ। গত ২০ এপ্রিল বেতন পরিশোধের সর্বশেষ তারিখ ছিল। ওইদিনও কারখানায় গিয়ে বেতন ও বোনাস পাননি শ্রমিকরা। এদিকে শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে না দিয়েই মালিক পালিয়ে যান। বকেয়া বেতন ও বোনাসের দাবিতে টানা বিক্ষোভ কর্মসূচি, ইপিজেড, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, শিল্প পুলিশ, বিকেএমইএ’র কাছে ধরনা দিয়েও কোন সমাধান পাননি শ্রমিকরা।

বেতন না পাওয়ায় টাকার অভাবে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলের পড়াশোনা বন্ধের পথে বেকা গার্মেন্টসের স্যাম্পল বিভাগের শ্রমিক মো. মুজাহিদের। ৩ হাজার টাকা ধার করে গত ২৪ এপ্রিল শেষ তারিখে ছেলের ফরম পূরণের টাকা পরিশোধ করেছেন তিনি। তবে পাওনাদারের টাকা এখন পর্যন্ত পরিশোধ করতে পারেননি।

কারখানা মালিকের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে মুজাহিদ বলেন, ‘বলা নেই, কওয়া নেই নোটিশ ঝুলিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেয়। চাইরবার কথা দিয়েও বেতন দেয়নি। ২০ তারিখ গেলাম, পে স্লিপ দিয়ে বললো লাঞ্চের পরে বেতন দেয়া হবে। কিন্তু কোন বেতন নাই। পরে দেখলাম বেপজার সিকিউরিটি ও শিল্প পুলিশ সেখানে উপস্থিত। বললো, বেকা গার্মেন্টস মালিক পালিয়েছে। পোলাডার এসএসসি পরীক্ষার শেষ তারিখ ছিল ২৪ এপ্রিল। ধার করে টাকা দিছি। হেই টাকা এখনও দিতে পারি নাই। কোথায় আজ প্রধানমন্ত্রী আর রাষ্ট্রের সেনাপতিরা। আমাগো কী কেউ দেখবো না?’

অনশন কর্মসূচিতে শ্রমিকদের পাশে ছিলেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) যুগ্ম সমন্বয়কারী আহসান হাবীব বুলবুল বলেন, ‘ইপিজেডে শ্রমিকদের আলাদাভাবে সুরক্ষা দেয়ার কথা রয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। সেই ইপিজেডের শ্রমিকরাই যদি অধিকারবঞ্চিত হয় তাহলে বাকি শ্রমিকদের যে কী অবস্থা তা বলাই বাহুল্য। বেকা গার্মেন্টস শ্রমিকদের এই দুর্দশার দায় সরকার কখনও এড়াতে পারে না। ’

শ্রমিকদের পাওনাদির বিষয়ে বেকা গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেডের মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেয়া কারখানার পরিচালক ববি এন ডিয়াজ ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাজ শেখরের দেয়া মুঠোফোনের নম্বর দু’টোর সংযোগ পাওয়া যায়নি। এদিকে একাধিকবার আদমজী ইপিজেডের ব্যবস্থাপক এহসান কবিরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি তাতে সাড়া দেননি। তবে বেকার ওয়েবসাইটে কারখানার উপদেষ্টা ও গ্রুপ অপারেশন প্রধান হিসেবে বেপজা’র সাবেক চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমেদ খানের নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগের কোন তথ্যাদি সেখানে উল্লেখ ছিল না।

শনিবার, ০৭ মে ২০২২ , ২৩ বৈশাখ ১৪২৮ ০৪ শাওয়াল ১৪৪৩

অনশনেও মেলেনি ৩ মাসের বকেয়া ঈদের খুশি বঞ্চিত হাজার শ্রমিক

প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ

সারাদেশে যখন ঈদের আনন্দে মেতেছেন সবাই। তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদছেন নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা বেকা গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেডের কয়েকশ’ শ্রমিক। গত তিন মাসের বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ না করেই পালিয়েছেন মালিক। গত কয়েকদিন ইপিজেড, শিল্প পুলিশ, বিকেএমইএ’র কাছে ধরণা দিয়েও সমাধান না পেয়ে ঈদের দিন সড়কে অনশনে বসেছেন শ্রমিকরা। ঈদের আনন্দ ছুঁতে পারেনি তাদের।

গত মঙ্গলবার (৩ মে) বেলা সাড়ে ১১টায় নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে যখন শ্রমিকরা অনশনে বসেন তখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। পাওনাদি পরিশোধের আকুতি জানিয়ে বক্তব্য দেয়ার সময় নারী শ্রমিক নূর জাহানের চোখের আর বৃষ্টির পানি আলাদা করা যাচ্ছিল না।

স্কুলপড়–য়া দুই কিশোরী কন্যার সঙ্গে বরিশালের ঝালকাঠির গ্রামের বাড়িতে ঈদের ছুটি কাটানোর কথা ছিল নূর জাহানের। নতুন পোশাক নিয়ে মা আসবেন এই অপেক্ষায় ছিল কন্যারাও। তা আর হয়নি। অসহায়ের মতো নূরজাহান এখন সুদূর নারায়ণগঞ্জ শহরের সড়কে দাঁড়িয়ে আকুতি জানাচ্ছেন প্রাপ্য শ্রমের মজুরির। ন্যায্য পাওনা বঞ্চিত এই নারী শ্রমিক আক্ষেপ করে বলেন, ‘গত নয় বছর যাবৎ এই কারখানায় অমানুষিক পরিশ্রম করেছি। নিজের শ্রমের মজুরি পাইলাম না। বছরে উৎসবের একটা দিন মেয়েদের সঙ্গে থাকতে পারলাম না। বারবার ফোন দিছে, কেটে দিচ্ছি। মেয়েদের কী বলবো, কথা বলার ভাষা আমার কাছে নেই। বাবাহারা মেয়েগুলান! আমি মা হয়ে ঈদে তাদের কিছু দিতে পারছি না। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছি।’

নূর জাহানের স্বামী সাইদুল ইসলামও সাত বছর কাজ করেছেন বেকা গার্মেন্টসে। গত জুলাইতে চাকুরিরত অবস্থাতে মৃত্যু হয় তার। স্বামীর ন্যায্য পাওনাদি আজও বুঝে পাননি বলে জানান নূর জাহান। সরকারের প্রতি প্রশ্ন রেখে নূর জাহান বলেন, ‘কেন আমি আমার প্রাপ্য টাকা পাবো না? স্বামীর পাওনা টাকাও পাইনি। মেয়েদের সঙ্গে ঈদ করার কথা ছিল। আর আমি এই ঢাকা শহরে এত দূরে রাজপথে আন্দোলনে।’ এই বলে গলা জড়িয়ে আসে তার। আর কথা বলতে পারেন না। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে চোখের পানি।

অনশনে অংশ নেয়া বেকা গার্মেন্টস শ্রমিকদের অন্তত দশজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানান, রপ্তানিমুখী এই পোশাক কারখানাটিতে প্রায় এক হাজার শ্রমিক ও কর্মচারী কর্মরত। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সকলের বেতন বন্ধ। গত ২ এপ্রিল কারখানাও বন্ধ করে দেয় মালিকপক্ষ। প্রতিবাদে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী-শিমরাইল সড়ক অবরোধ করে শ্রমিকরা। পরে মালিকপক্ষ বেতন পরিশোধের আশ্বাস দিলে আন্দোলন থেকে সরে আসেন তারা। এরপর চারবার তারিখ দিয়েও বেতন ও আসন্ন ঈদ উপলক্ষে বোনাস পরিশোধ করেনি মালিকপক্ষ। গত ২০ এপ্রিল বেতন পরিশোধের সর্বশেষ তারিখ ছিল। ওইদিনও কারখানায় গিয়ে বেতন ও বোনাস পাননি শ্রমিকরা। এদিকে শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে না দিয়েই মালিক পালিয়ে যান। বকেয়া বেতন ও বোনাসের দাবিতে টানা বিক্ষোভ কর্মসূচি, ইপিজেড, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, শিল্প পুলিশ, বিকেএমইএ’র কাছে ধরনা দিয়েও কোন সমাধান পাননি শ্রমিকরা।

বেতন না পাওয়ায় টাকার অভাবে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলের পড়াশোনা বন্ধের পথে বেকা গার্মেন্টসের স্যাম্পল বিভাগের শ্রমিক মো. মুজাহিদের। ৩ হাজার টাকা ধার করে গত ২৪ এপ্রিল শেষ তারিখে ছেলের ফরম পূরণের টাকা পরিশোধ করেছেন তিনি। তবে পাওনাদারের টাকা এখন পর্যন্ত পরিশোধ করতে পারেননি।

কারখানা মালিকের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে মুজাহিদ বলেন, ‘বলা নেই, কওয়া নেই নোটিশ ঝুলিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেয়। চাইরবার কথা দিয়েও বেতন দেয়নি। ২০ তারিখ গেলাম, পে স্লিপ দিয়ে বললো লাঞ্চের পরে বেতন দেয়া হবে। কিন্তু কোন বেতন নাই। পরে দেখলাম বেপজার সিকিউরিটি ও শিল্প পুলিশ সেখানে উপস্থিত। বললো, বেকা গার্মেন্টস মালিক পালিয়েছে। পোলাডার এসএসসি পরীক্ষার শেষ তারিখ ছিল ২৪ এপ্রিল। ধার করে টাকা দিছি। হেই টাকা এখনও দিতে পারি নাই। কোথায় আজ প্রধানমন্ত্রী আর রাষ্ট্রের সেনাপতিরা। আমাগো কী কেউ দেখবো না?’

অনশন কর্মসূচিতে শ্রমিকদের পাশে ছিলেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) যুগ্ম সমন্বয়কারী আহসান হাবীব বুলবুল বলেন, ‘ইপিজেডে শ্রমিকদের আলাদাভাবে সুরক্ষা দেয়ার কথা রয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। সেই ইপিজেডের শ্রমিকরাই যদি অধিকারবঞ্চিত হয় তাহলে বাকি শ্রমিকদের যে কী অবস্থা তা বলাই বাহুল্য। বেকা গার্মেন্টস শ্রমিকদের এই দুর্দশার দায় সরকার কখনও এড়াতে পারে না। ’

শ্রমিকদের পাওনাদির বিষয়ে বেকা গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেডের মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেয়া কারখানার পরিচালক ববি এন ডিয়াজ ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাজ শেখরের দেয়া মুঠোফোনের নম্বর দু’টোর সংযোগ পাওয়া যায়নি। এদিকে একাধিকবার আদমজী ইপিজেডের ব্যবস্থাপক এহসান কবিরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি তাতে সাড়া দেননি। তবে বেকার ওয়েবসাইটে কারখানার উপদেষ্টা ও গ্রুপ অপারেশন প্রধান হিসেবে বেপজা’র সাবেক চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমেদ খানের নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগের কোন তথ্যাদি সেখানে উল্লেখ ছিল না।