কর্মস্থলমুখী মানুষের চাপ, বিপর্যস্ত নৌবন্দর-ফেরিঘাট

করোনা অতিমারী সংকটের দু’বছর পরে নিকটজনের সঙ্গে ঈদ করতে এবার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ যতটা দুর্ভোগ পোহাতে হবে ভেবেছিলেন, তারচেয়ে কম দুর্ভোগে স্বজনদের সঙ্গে বাড়িতে ঈদ উদযাপন করতে পারলেও এখন কর্মস্থলমুখী জনস্রোতের চাপে বরিশাল নৌবন্দরসহ ফেরিঘাটগুলো বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণÑপশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে রাজধানীসহ পদ্মার পূর্ব তীরের জেলার সড়ক যোগাযোগ রক্ষাকারী ফেরি সেক্টরগুলোতে ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড সংখ্যক ২১ হাজার ২৭৬টি যানবাহন পারপারের পরেও গতকাল সকালে সাড়ে ১২শ’র বেশি অপেক্ষমান ছিল।

ঈদের ছুটি শেষে শুক্রবার থেকেই ঢাকা এবং চাঁদপুর হয়ে কুমিল্লা, সিলেট ও চট্টগ্রামমুখী যাত্রীদের ভিড়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বরিশাল নদীবন্দরে তিল ধরার ঠাঁই ছিল না। শুক্র ও শনিবার প্রায় ২০টি করে নৌযানে প্রায় দুই লাখ মানুষ বরিশাল বন্দর ত্যাগ করে। পটুয়াখালী ও ভোলা নদীবন্দরসহ দক্ষিণাঞ্চলের আরও ৩০টি স্টেশন থেকেও অর্ধ শতাধিক নৌযান ঢাকা ও চাঁদপুরের লক্ষাধিক যাত্রী পরিবহনের পরও গতকালের অবস্থা ছিল অবর্ণনীয়। যেকোন একটি লঞ্চের এক কোণে আশ্রয় পাওয়ার আশায় দুপুর থেকেই নৌবন্দর ছিল কানায় কানায় পূর্ণ।

গতকাল বরিশাল বন্দর থেকে দুটি ক্যাটামেরনসহ প্রায় ২০টি নৌযানে আরও প্রায় এক লাখ যাত্রী ঢাকা এবং চাঁদপুর হয়ে সন্নিহিত বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে। জনস্রোতের চাপে ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি যাত্রী নিয়ে নৌযানগুলো বন্দর ত্যাগ করলেও বিআইডব্লিউটি এবং প্রশাসনের কিছু করার ছিল না। এমনকি গত দুই দিন বরিশাল নৌবন্দরের টার্মিনালে তিল ধরার ঠাঁই ছিল না। একটি কেবিন টিকেটের জন্য গত ১৫ দিন ধরে মানুষ লঞ্চের এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ধরনা দিলেও স্বাভাবিক সময়ের বেশি দামেও তা মেলেনি।

তবে কর্মস্থলমুখী এই জনস্রোত সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় নৌ-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিসির তেমন কোন তৎপড়তা ছিল না। শুধুমাত্র ঈদের পরের ৩ দিন বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ থেকে বরিশাল-চাঁদপুর হয়ে ঢাকামুখী ৩ দিন ১টি করে স্টিমার সার্ভিস পরিচালনের পর সব দায়িত্ব শেষ করেছে সংস্থাটি। অথচ বেসরকারি লঞ্চের মালিকেরা শুক্র ও শনিবারের গুরুত্ব বুঝে আগ থেকেই ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছিল।

এদিকে ঈদের আগের দুই দিনের মতো পরের দুই দিনও এবার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলমুখী দেশের প্রধান ফেরি সেক্টরগুলোতে গাড়ির জন্য ঘাটে ঘাটে ফেরি অপেক্ষা করলেও শুক্রবার দুপুরের আগে থেকেই পদ্মার পশ্চিম তীরে যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। ফলে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত দেশের প্রধান ফেরি সেক্টরগুলোতে এযাবতকালের সর্বাধিক ২১ হাজার ২৭৬টি যানবাহন পারাপারের পরেও অপেক্ষমান ছিল এক হাজার ২৬৭টি। এর মধ্যে পাটুরিয়া সেক্টরে ২৪টি ফেরির সাহায্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১৩ হাজার ৭৮৩টি যানবাহন পারাপারের পরে অপেক্ষমান ছিল মাত্র ৩শ’টি গাড়ি। অবশ্য এই গাড়ি পারাপারের আগেই নতুন করে গাড়ি এসে লাইন দিচ্ছিল। রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চরের ২১টি জেলার সংক্ষিপ্ত সড়কপথের মাওয়া সেক্টরেও ১০টি ফেরির সাহায্যে ২৪ ঘণ্টায় ৫ সহ¯্রাধিক যানবাহন পারাপারের পরে অপক্ষেমান ছিল ৬শ’।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের সংক্ষিপ্ত সড়কপথের চাঁদপুর-শরিয়তপুর সেক্টরে ১টি কে-টাইপ ফেরি বিকল থাকার পরেও ৬টি ফেরির সাহায্যে ২৪ ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে ১৩শ’ যানবাহন পারাপার করা হয়েছে। এখানে অপক্ষেমান ছিল ২শ’র মতো গাড়ি। উপকূলীয় ৩টি বিভাগ চট্টগ্রামÑবরিশালÑখুলনা মহাসড়কের ভোলা ও লক্ষ্মীপুরের মধ্যবর্তী ফেরি সেক্টরেও ৪টির মধ্যে ১টি ফেরি বিকল থাকায় ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ফেরি সেক্টরে ২৪ ঘণ্টায় ৫১৭টি যানবাহন পারাপারের পরেও ৭৭টি অপেক্ষমান ছিল। একই মহাসড়কের ভোলা ও বরিশালের মধ্যবর্তী লাহারহাটÑভেদুরিয়া সেক্টরেও এ সময়ে সোয়া ৫শ’ যানবাহন পারাপার হলেও অপেক্ষমান ছিল ৯০টি।

বিআইডব্লিউটিসি ২৬ এপ্রিল থেকে গত ১২ দিনে বহরের ৫৪টি মধ্যে ৪৯টি ফেরির সাহায্যে দেশের প্রধান ফেরি সেক্টরগুলোতে প্রায় পৌনে ২ লাখ যানবাহন পারাপার করেছে বলে জানা গেছে। এ সময় উর্ধ্বে ২ হাজার থেকে সোমবার সকালে সর্বনিম্ন ৫৬২টি যানবাহন অপক্ষেমান থাকলেও শুক্রবার দুপুরের পর থেকে সব ঘাটগুলোতেই যানবাহনই চাপ বাড়তে শুরু করে শনিবার গাড়ির ¯্রােত ফেরিঘাটগুলোতে আসতে থাকে।

পদ্মা সেতু চালুর আগে সম্ভবত শেষ ঈদের ভিড় সামাল দিতে বিআইডব্লিউটিসির কারিগরি, বাণিজ্য ও মেরিন বিভাগের কর্মকর্তাÑকর্মচারীরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সর্বকালের রেকর্ড সংখ্যক যানবাহন পারাপার করে পরিস্থিতি অনেকটাই সামাল দিতে পেরেছে। তবে প্রয়োজনীয় নৌযান মজুদ থাকার পরেও যাত্রী পরিবহনে সংস্থার বাণিজ্য পরিদপ্তরের সীমাহীন উদাসীনতাকে ‘রহস্যজনক’ মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল। বিষয়টি নিয়ে সংস্থার পরিচালকের (বাণিজ্য) সঙ্গে আলাপ করা হলে তিনি প্যাডেল জাহাজগুলো পুরনো এবং স্ক্রু-হুইল নতুন নৌযানে বিপুল পরিচালন ব্যায়ের কথা তুলে ধরে লোকসানের বিষয়টি জানিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানান।

অন্যদিকে আকাশপথে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ফ্লাইটই স্বাভাবিক সময়ের তিনগুণ ভাড়ায় ঈদের আগে এবং পরে ফুল লোড নিয়ে ঢাকাÑবরিশালÑঢাকা আকাশপথে যাত্রী পরিবহন করছে। এমনকি বিমান ও নভো এয়ারের বিশেষ ফ্লাইটে দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়াতেও এখন টিকেট মিলছে না।

অতিরিক্ত যাত্রী তোলায় তিনটি লঞ্চকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, বরিশাল

ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত ঢাকামুখী যাত্রী তোলায় গত শুক্রবার রাতে বরিশাল জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত তিনটি বেসরকারি লঞ্চকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছে। জরিমানার টাকা আদায় শেষে লঞ্চ তিনটি বরিশাল ঘাট ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।

নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ জানান, কর্মস্থলমুখী মানুষ বিকেল থেকেই নৌবন্দরে আসতে শুরু করেন। বিকেল ৫টার পর বরিশাল ঘাটে নোঙর করা সবগুলো লঞ্চই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এদিকে কোন লঞ্চ যাতে অতিরিক্ত যাত্রী না নেয় সেজন্য বিকেল থেকেই বরিশাল জেলা প্রশাসনের দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নৌবন্দরের তদারকিতে ছিলেন। কিন্তু নিষেধ অগ্রাহ্য করে পারাবত ১০ ও ১৮ এবং সুরুভি লঞ্চগুলো ছাদেও যাত্রী তোলায় প্রতিটি লঞ্চকে ১০ হাজার টাকা করে মোট ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করে লঞ্চ তিনটিকে বরিশাল নৌবন্দর ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

বরিশাল নৌবন্দর কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর বরিশাল নৌবন্দর থেকে ভায়া ও সরাসরি মোট ১৩টি লঞ্চে কয়েক হাজার যাত্রী বরিশাল ত্যাগ করেছে। রাতে রাজারহাট-বি নামের একটি লঞ্চ নৌবন্দরে অপেক্ষমান বহুসংখ্যক যাত্রী নিয়ে বিশেষ ট্রিপ হিসেবে বরিশাল ঘাট ত্যাগ করেছে।

ডেকের যাত্রীদেরও টিকেটের সঙ্গে জায়গা কিনতে হচ্ছে

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, বরিশাল

বরিশাল-ঢাকা রুটের বেসরকারি লঞ্চের মালিক থেকে সারেং, সুকনি সবাই এখন যাত্রীদের জিম্মি করে লাভবান হচ্ছেন। আর সেই প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়েছে লঞ্চের নিম্নশ্রেণীর কর্মচারীরাও। তারা ডেকের যাত্রীদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করছে।

লঞ্চের যাত্রীরা বরিশাল নৌবন্দরে নেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে এসব কর্মচারীরা লঞ্চ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার আগে কোন যাত্রীকে লঞ্চে উঠতে দেয় না। আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার পরপরই শুরু হয় নিজেদের তোশক, চাদর, লেপ দিয়ে সম্পূর্ণ ডেক দখল করা। পরে যাত্রীরা ডেকে উঠতে চাইলে শুরু হয় এক একটি আসন পাবার জন্য দরাদরি। টিকেটের দামের থেকে দ্বিগুণ তিনগুণ টাকা দিয়ে ডেকের স্থান কিনে নিতে হয়। দরদাম শেষ করে কর্মচারীরা তাদের পেতে রাখা চাদর, তোশক, লেপ তুলে নেবার পর যাত্রী তার নিজের চাদর পাতার সুযোগ পায়। অবশ্য লঞ্চ কর্র্তৃপক্ষ কর্মচারীদের এই ব্যবসা অক্ষুণœ রাখার জন্য বলেন যাত্রীদের চাহিদার কারণে এসব বিছানা সামগ্রী বিছিয়ে দিতে হয়। কিন্ত অন্য সময়ে যে এটা থাকে না তার কারণ জানতে চাইলে তারা নিশ্চুপ থাকেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুরভি লঞ্চের এক কর্মচারী জানান, সব ডেকে, কেবিনের সামনে, করিডোরে, দোতালার একটি কক্ষে প্রায় ২০ জন যাত্রীর কাছে বিক্রি করার মতো স্থানে তোশক, চাদর বিছানো আছে। সন্ধ্যার পর এসব আসনের দাম ক্রমশ বাড়তে থাকবে। তিনি আরও জানান নিচ তলার ডেকের প্রতিটি আসন কিনতে দুই শ’ থেকে চার শ’ টাকা লাগবে। দোতালার একটি আসন কিনতে ৫শ’ টাকা এবং নামাজের স্থান ও সেলুনের প্রতিটি আসন কম হলেও এক হাজার টাকা লাগবে। এরপরেও কিন্তু যাত্রীকে ডেকের টিকেট কিনতে হবে।

রবিবার, ০৮ মে ২০২২ , ২৪ বৈশাখ ১৪২৮ ০৫ শাওয়াল ১৪৪৩

কর্মস্থলমুখী মানুষের চাপ, বিপর্যস্ত নৌবন্দর-ফেরিঘাট

image

বরিশাল : দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার কর্মস্থলমুখী মানুষের স্রোত, ঘাটে দুর্ভোগ চরমে -সংবাদ

করোনা অতিমারী সংকটের দু’বছর পরে নিকটজনের সঙ্গে ঈদ করতে এবার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ যতটা দুর্ভোগ পোহাতে হবে ভেবেছিলেন, তারচেয়ে কম দুর্ভোগে স্বজনদের সঙ্গে বাড়িতে ঈদ উদযাপন করতে পারলেও এখন কর্মস্থলমুখী জনস্রোতের চাপে বরিশাল নৌবন্দরসহ ফেরিঘাটগুলো বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণÑপশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে রাজধানীসহ পদ্মার পূর্ব তীরের জেলার সড়ক যোগাযোগ রক্ষাকারী ফেরি সেক্টরগুলোতে ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড সংখ্যক ২১ হাজার ২৭৬টি যানবাহন পারপারের পরেও গতকাল সকালে সাড়ে ১২শ’র বেশি অপেক্ষমান ছিল।

ঈদের ছুটি শেষে শুক্রবার থেকেই ঢাকা এবং চাঁদপুর হয়ে কুমিল্লা, সিলেট ও চট্টগ্রামমুখী যাত্রীদের ভিড়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বরিশাল নদীবন্দরে তিল ধরার ঠাঁই ছিল না। শুক্র ও শনিবার প্রায় ২০টি করে নৌযানে প্রায় দুই লাখ মানুষ বরিশাল বন্দর ত্যাগ করে। পটুয়াখালী ও ভোলা নদীবন্দরসহ দক্ষিণাঞ্চলের আরও ৩০টি স্টেশন থেকেও অর্ধ শতাধিক নৌযান ঢাকা ও চাঁদপুরের লক্ষাধিক যাত্রী পরিবহনের পরও গতকালের অবস্থা ছিল অবর্ণনীয়। যেকোন একটি লঞ্চের এক কোণে আশ্রয় পাওয়ার আশায় দুপুর থেকেই নৌবন্দর ছিল কানায় কানায় পূর্ণ।

গতকাল বরিশাল বন্দর থেকে দুটি ক্যাটামেরনসহ প্রায় ২০টি নৌযানে আরও প্রায় এক লাখ যাত্রী ঢাকা এবং চাঁদপুর হয়ে সন্নিহিত বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে। জনস্রোতের চাপে ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি যাত্রী নিয়ে নৌযানগুলো বন্দর ত্যাগ করলেও বিআইডব্লিউটি এবং প্রশাসনের কিছু করার ছিল না। এমনকি গত দুই দিন বরিশাল নৌবন্দরের টার্মিনালে তিল ধরার ঠাঁই ছিল না। একটি কেবিন টিকেটের জন্য গত ১৫ দিন ধরে মানুষ লঞ্চের এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ধরনা দিলেও স্বাভাবিক সময়ের বেশি দামেও তা মেলেনি।

তবে কর্মস্থলমুখী এই জনস্রোত সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় নৌ-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিসির তেমন কোন তৎপড়তা ছিল না। শুধুমাত্র ঈদের পরের ৩ দিন বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ থেকে বরিশাল-চাঁদপুর হয়ে ঢাকামুখী ৩ দিন ১টি করে স্টিমার সার্ভিস পরিচালনের পর সব দায়িত্ব শেষ করেছে সংস্থাটি। অথচ বেসরকারি লঞ্চের মালিকেরা শুক্র ও শনিবারের গুরুত্ব বুঝে আগ থেকেই ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছিল।

এদিকে ঈদের আগের দুই দিনের মতো পরের দুই দিনও এবার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলমুখী দেশের প্রধান ফেরি সেক্টরগুলোতে গাড়ির জন্য ঘাটে ঘাটে ফেরি অপেক্ষা করলেও শুক্রবার দুপুরের আগে থেকেই পদ্মার পশ্চিম তীরে যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। ফলে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত দেশের প্রধান ফেরি সেক্টরগুলোতে এযাবতকালের সর্বাধিক ২১ হাজার ২৭৬টি যানবাহন পারাপারের পরেও অপেক্ষমান ছিল এক হাজার ২৬৭টি। এর মধ্যে পাটুরিয়া সেক্টরে ২৪টি ফেরির সাহায্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১৩ হাজার ৭৮৩টি যানবাহন পারাপারের পরে অপেক্ষমান ছিল মাত্র ৩শ’টি গাড়ি। অবশ্য এই গাড়ি পারাপারের আগেই নতুন করে গাড়ি এসে লাইন দিচ্ছিল। রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চরের ২১টি জেলার সংক্ষিপ্ত সড়কপথের মাওয়া সেক্টরেও ১০টি ফেরির সাহায্যে ২৪ ঘণ্টায় ৫ সহ¯্রাধিক যানবাহন পারাপারের পরে অপক্ষেমান ছিল ৬শ’।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের সংক্ষিপ্ত সড়কপথের চাঁদপুর-শরিয়তপুর সেক্টরে ১টি কে-টাইপ ফেরি বিকল থাকার পরেও ৬টি ফেরির সাহায্যে ২৪ ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে ১৩শ’ যানবাহন পারাপার করা হয়েছে। এখানে অপক্ষেমান ছিল ২শ’র মতো গাড়ি। উপকূলীয় ৩টি বিভাগ চট্টগ্রামÑবরিশালÑখুলনা মহাসড়কের ভোলা ও লক্ষ্মীপুরের মধ্যবর্তী ফেরি সেক্টরেও ৪টির মধ্যে ১টি ফেরি বিকল থাকায় ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ফেরি সেক্টরে ২৪ ঘণ্টায় ৫১৭টি যানবাহন পারাপারের পরেও ৭৭টি অপেক্ষমান ছিল। একই মহাসড়কের ভোলা ও বরিশালের মধ্যবর্তী লাহারহাটÑভেদুরিয়া সেক্টরেও এ সময়ে সোয়া ৫শ’ যানবাহন পারাপার হলেও অপেক্ষমান ছিল ৯০টি।

বিআইডব্লিউটিসি ২৬ এপ্রিল থেকে গত ১২ দিনে বহরের ৫৪টি মধ্যে ৪৯টি ফেরির সাহায্যে দেশের প্রধান ফেরি সেক্টরগুলোতে প্রায় পৌনে ২ লাখ যানবাহন পারাপার করেছে বলে জানা গেছে। এ সময় উর্ধ্বে ২ হাজার থেকে সোমবার সকালে সর্বনিম্ন ৫৬২টি যানবাহন অপক্ষেমান থাকলেও শুক্রবার দুপুরের পর থেকে সব ঘাটগুলোতেই যানবাহনই চাপ বাড়তে শুরু করে শনিবার গাড়ির ¯্রােত ফেরিঘাটগুলোতে আসতে থাকে।

পদ্মা সেতু চালুর আগে সম্ভবত শেষ ঈদের ভিড় সামাল দিতে বিআইডব্লিউটিসির কারিগরি, বাণিজ্য ও মেরিন বিভাগের কর্মকর্তাÑকর্মচারীরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সর্বকালের রেকর্ড সংখ্যক যানবাহন পারাপার করে পরিস্থিতি অনেকটাই সামাল দিতে পেরেছে। তবে প্রয়োজনীয় নৌযান মজুদ থাকার পরেও যাত্রী পরিবহনে সংস্থার বাণিজ্য পরিদপ্তরের সীমাহীন উদাসীনতাকে ‘রহস্যজনক’ মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল। বিষয়টি নিয়ে সংস্থার পরিচালকের (বাণিজ্য) সঙ্গে আলাপ করা হলে তিনি প্যাডেল জাহাজগুলো পুরনো এবং স্ক্রু-হুইল নতুন নৌযানে বিপুল পরিচালন ব্যায়ের কথা তুলে ধরে লোকসানের বিষয়টি জানিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানান।

অন্যদিকে আকাশপথে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ফ্লাইটই স্বাভাবিক সময়ের তিনগুণ ভাড়ায় ঈদের আগে এবং পরে ফুল লোড নিয়ে ঢাকাÑবরিশালÑঢাকা আকাশপথে যাত্রী পরিবহন করছে। এমনকি বিমান ও নভো এয়ারের বিশেষ ফ্লাইটে দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়াতেও এখন টিকেট মিলছে না।

অতিরিক্ত যাত্রী তোলায় তিনটি লঞ্চকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, বরিশাল

ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত ঢাকামুখী যাত্রী তোলায় গত শুক্রবার রাতে বরিশাল জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত তিনটি বেসরকারি লঞ্চকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছে। জরিমানার টাকা আদায় শেষে লঞ্চ তিনটি বরিশাল ঘাট ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।

নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ জানান, কর্মস্থলমুখী মানুষ বিকেল থেকেই নৌবন্দরে আসতে শুরু করেন। বিকেল ৫টার পর বরিশাল ঘাটে নোঙর করা সবগুলো লঞ্চই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এদিকে কোন লঞ্চ যাতে অতিরিক্ত যাত্রী না নেয় সেজন্য বিকেল থেকেই বরিশাল জেলা প্রশাসনের দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নৌবন্দরের তদারকিতে ছিলেন। কিন্তু নিষেধ অগ্রাহ্য করে পারাবত ১০ ও ১৮ এবং সুরুভি লঞ্চগুলো ছাদেও যাত্রী তোলায় প্রতিটি লঞ্চকে ১০ হাজার টাকা করে মোট ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করে লঞ্চ তিনটিকে বরিশাল নৌবন্দর ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

বরিশাল নৌবন্দর কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর বরিশাল নৌবন্দর থেকে ভায়া ও সরাসরি মোট ১৩টি লঞ্চে কয়েক হাজার যাত্রী বরিশাল ত্যাগ করেছে। রাতে রাজারহাট-বি নামের একটি লঞ্চ নৌবন্দরে অপেক্ষমান বহুসংখ্যক যাত্রী নিয়ে বিশেষ ট্রিপ হিসেবে বরিশাল ঘাট ত্যাগ করেছে।

ডেকের যাত্রীদেরও টিকেটের সঙ্গে জায়গা কিনতে হচ্ছে

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, বরিশাল

বরিশাল-ঢাকা রুটের বেসরকারি লঞ্চের মালিক থেকে সারেং, সুকনি সবাই এখন যাত্রীদের জিম্মি করে লাভবান হচ্ছেন। আর সেই প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়েছে লঞ্চের নিম্নশ্রেণীর কর্মচারীরাও। তারা ডেকের যাত্রীদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করছে।

লঞ্চের যাত্রীরা বরিশাল নৌবন্দরে নেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে এসব কর্মচারীরা লঞ্চ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার আগে কোন যাত্রীকে লঞ্চে উঠতে দেয় না। আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার পরপরই শুরু হয় নিজেদের তোশক, চাদর, লেপ দিয়ে সম্পূর্ণ ডেক দখল করা। পরে যাত্রীরা ডেকে উঠতে চাইলে শুরু হয় এক একটি আসন পাবার জন্য দরাদরি। টিকেটের দামের থেকে দ্বিগুণ তিনগুণ টাকা দিয়ে ডেকের স্থান কিনে নিতে হয়। দরদাম শেষ করে কর্মচারীরা তাদের পেতে রাখা চাদর, তোশক, লেপ তুলে নেবার পর যাত্রী তার নিজের চাদর পাতার সুযোগ পায়। অবশ্য লঞ্চ কর্র্তৃপক্ষ কর্মচারীদের এই ব্যবসা অক্ষুণœ রাখার জন্য বলেন যাত্রীদের চাহিদার কারণে এসব বিছানা সামগ্রী বিছিয়ে দিতে হয়। কিন্ত অন্য সময়ে যে এটা থাকে না তার কারণ জানতে চাইলে তারা নিশ্চুপ থাকেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুরভি লঞ্চের এক কর্মচারী জানান, সব ডেকে, কেবিনের সামনে, করিডোরে, দোতালার একটি কক্ষে প্রায় ২০ জন যাত্রীর কাছে বিক্রি করার মতো স্থানে তোশক, চাদর বিছানো আছে। সন্ধ্যার পর এসব আসনের দাম ক্রমশ বাড়তে থাকবে। তিনি আরও জানান নিচ তলার ডেকের প্রতিটি আসন কিনতে দুই শ’ থেকে চার শ’ টাকা লাগবে। দোতালার একটি আসন কিনতে ৫শ’ টাকা এবং নামাজের স্থান ও সেলুনের প্রতিটি আসন কম হলেও এক হাজার টাকা লাগবে। এরপরেও কিন্তু যাত্রীকে ডেকের টিকেট কিনতে হবে।