এমএলএম কোম্পানি খুলে প্রতারণা, নেপথ্যে ‘উপসচিব’

তিনি উপ-সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা, কাজ করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে। আলোচনায় এসেছেন একটি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানির প্রতারণার কারণে। আর সেই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে আছেন তারই স্ত্রী। অবস্য স্ত্রী চেয়ারম্যান হলেও কোম্পানি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই ছিল।

আর সেই এমএলএম কোম্পানি জি টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ড নামের প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগে মুনাফার লোভ দেখিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ১০ কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বিনিয়োগকারী বলছেন অনুসন্ধান করলে টাকার পরিমাণ আরও বাড়তে।

এই প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মমিনুল ইসলাম গ্রেপ্তার হওয়ার পরে। ক্যাপ্টেন (অব.) মো. সাহাদৎ হোসেন নামের একজন বিনিয়োগ করে লভ্যাংশ না পাওয়ায় মামলা করেন হাতিরঝিল থানায়। এর আগে বিনিয়োগকারীদের কয়েকজন বিষয়টি নিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির কাছে অভিযোগ করেন।

সিআইডি অনুসন্ধান চালিয়ে প্রতারণার অভিযোগে চলতি বছরের গত ২৯ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করে প্রতিষ্ঠানটির এমডি মমিনুল ইসলামকে। তবে সে সময় মামলায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শিরিন রোকাসানা জাহান, তার স্বামী উপ-সচিব এম এম মহিনউদ্দিন কবীর মাহিনসহ আরও কয়েকজন আসামি হলেও তাদের গ্রেপ্তার করেনি সিআইডি। বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। পরে সংবাদ সম্মেলন করে সিআইডি এ প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার খবর জানায়। সেখানে বলা হয় প্রতিষ্ঠানটি ‘সারাদেশে ১৫ হাজার আইডি কার্ড বিক্রি করে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে’।

গ্রাহকদের অভিযোগ, নিজের স্ত্রীকে চেয়ারম্যান পদে দেখালেও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ লেনদেনে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে জি টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন উপ-সচিব এম এম মহিউদ্দিন কবীর মাহিন। সেসময় তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। পরে তিনি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে যোগ দেন।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, রাজধানীর রামপুরা ৪৬৪/এইচ ডিআইডি রোডে ইসলাম টাওয়ারের ৮ তলায় আলিশান অফিস ছিল জি টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ডের প্রধান কার্যালয়। এখানে প্রতি মাসে ৮০ হাজার টাকার ভাড়ার চুক্তিতে অফিসটি নিয়েছিলেন উপ-সচিব মাহিন। নথিপত্রে স্ত্রী শিরিন রোকসানা জাহানকে বানিয়েছেন চেয়ারম্যান। আর পূর্ব পরিচিত মমিনুল ইসলামকে বানিয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আরও ৪ থেকে ৫ জন ছিলেন পরিচালনা বোর্ডের পরিচালক।

প্রতিষ্ঠানটি শুরুতে যে পরিকল্পনা দেখিয়েছিল তাতে বিনিয়োগকারীরা বেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। শুরুতে যারা বিনিয়োগ করেছেন তাদের কিছু কিছু লভ্যাংশ দেয়া হলেও ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীদেও সঙ্গে ‘ছলচাতুরী’ করতে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদ তথা উপ-সচিব মাহিন।

বিনিয়োগকারীদের ভাষ্য : এম এম মহিউদ্দিন কবীর মাহিন নিজেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব হিসেবে পরিচয় দিয়েই জি টুয়েন্টি ওর্য়াল্ড নামের এমএলএম কোম্পানি চালু করেন। রাজধানীর রামপুরায় বিটিভির উল্টোপাশে ইসলাম টাওয়ারে নেয়া হয় আলিশান অফিস। তিন হাজার ৫৬০ টাকা বিনিয়োগের প্যাকেজ ছিল। এর মধ্যে আইডির খরচ নেয়া হতো ২ হাজার ৫৬০ টাকা, আর ১ হাজার টাকা নেয়া হতো প্যাকেজ পণ্য দেয়ার কথা বলে। ওই প্যাকেজে নিত্যপণ্য চাল, ডাল, আটা ইত্যাদি দেয়ার কথা ছিল কমদামে।

কিন্তু শুরু থেকে টাকা নিয়ে কাউকে কোন পণ্য দেয়া হয়নি। তবে অফিসে বিভিন্ন পণ্য সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। কোন বিনিয়োগকারীই পুরো টাকা দিয়েও পণ্য পায়নি। আবার অনেকের কাছ থেকে ডিলারশিপ বিক্রি করেও টাকা নিয়েছে, কিন্তু ডিলারশিপ দেয়া হয়নি। এভাবে তারা সারাদেশ থেকে ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ধারণা করা হলেও হয়ত টাকার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

সংবাদের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান করে মহিউদ্দিন কবীর মাহিনের পরিচয় মিলেছে। মহিউদ্দিন কবীর মাহিনের পুরো নাম এম এম মহিউদ্দিন কবীর মাহিন। তিনি নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীনন্ত জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের উপ-প্রধান (মরফোলজিস্ট) হিসেবে কর্মরত। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের ওয়েবসাইটে কর্মকর্তাদের তালিকায় যাদের নাম রয়েছে সেখানে তার অবস্থান ৯ নম্বর তালিকায় রয়েছে।

মঙ্গলবার পর্যন্ত তার দুটি ফোন নাম্বারের একটি খোলা থাকলেও গতকাল সেটিও বন্ধ পাওয়া গেছে। অভিযোগের বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ভুক্তভোগীদের যত অভিযোগ

বিনিয়োগকারী মো. ফরিদ তালুকদার জানান, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে জি টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ড নামের ওই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। তিনি শুরুর দিকের বিনিয়োগকারী। ২ লাখ টাকা খরচ করে একাধিক আইডি খুলেছেন। তার মাধ্যমে একজন ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এরকম প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর একাধিক আইডি রয়েছে। আবার প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর মাধ্যমে বহু ব্যক্তি এসে বিনিয়োগ করেছেন।

বিনিয়োগকারীদের টাকা ‘উপ-সচিব’ মাহিমউদ্দিন কবীর মাহিন গ্রহণ করতেন বলেই দাবি ভুক্তভোগীদের। তিনি নিয়মিত অফিসে থাকতেন। প্রতিষ্ঠানটির আরও একাধিক পরিচালক থাকলেও তাদের অনেকেই আড়ালে ছিলেন। তারা মূলত উপ-সচিব মাহিন এবং প্রতিষ্ঠানটির এমডি মমিনুল ইসলামকেই চিনতেন।

ফরিদ তালুকদার বলেন, ২০২০ এবং ২০২১ সাল করোনার মধ্যেই অনেকেই মুনাফার আশায় এখানে বিনিয়োগ করেছেন। ‘প্রতারণার’ বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনিসহ বিনিয়োগকারীদের কয়েকজন সিআইডিতে অভিযোগ করেন। তারা ভেবেছিলেন মমিনুল গ্রেপ্তার হলে উপ-সচিব মাহিন তাদের টাকা পয়সা ফেরত দিবেন। কিন্তু তা আর হয়নি। এখন তারা টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

বিনিয়োগকারী মো. ইসমাইল কলিম জানান, ‘এ প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা মহিউদ্দিন কবীর মাহিন। যাকে সবাই উপ-সচিব হিসেবে জানতো। আমরা জানতে পেরেছি তিনি এক সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন। পরে নদীরক্ষা কমিশনে বদলি হয়ে আসেন। বর্তমানে তিনি নদীরক্ষা কমিশনে আছেন। তিনি (উপ-সচিব মাহিন) মূলত আমাদের বিনিয়োগ করতে আগ্রহী করে তুলেছেন, অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কিন্তু পরে দেখলাম পুরোটাই ধাপ্পাবাজি।’

ইসমাইল কলিম বলেন তাদের ৫ জনের একটি গ্রুপ রয়েছে। এ ৫ জনের মাধ্যমে সারাদেশ থেকে দেড় কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ হয়েছে। তারা কেউই লভ্যাংশ তো দূরের কথা মূল টাকাও ফেরত পাননি।

মামলার বাদী মো. সাহাদৎ হোসেন জানান, তিনি ১৩৫টি আইডির বিপরীতে সাড়ে ৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তার মাধ্যমে যেসব ব্যক্তিরা এখানে বিনিয়োগ করেছেন কেউই কোন টাকা পায়নি। পরে কোম্পানির চেয়ারম্যান উপ-সচিব মহিউদ্দিন কবীর মাহিন তাকে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে বলেন। ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে তাকে প্রতিমাসে ২ লাখ করে লভ্যাংশ দেয়া হবে বলেও জানান মহিউদ্দিন কবির মাহিন। তার কথায় তিনি আশ্বাস্ত হলে সেখানে একটি চুক্তি হয়। কিন্তু তিনি কোন টাকা পাননি। পরে তিনি মামলা করেন।

তিনি জানান, গত ২ মার্চ গ্রেপ্তার আসামি প্রতিষ্ঠানটির এমডি মমিনুল ইসলাম তার (বাদীর) জিম্মায় জামিন নিয়েছেন সমুদয় টাকা ফেরত দেয়ার শর্তে। এ বিষয়ে গত মার্চ মাসের ১৬ তারিখে একটি শুনানিও ছিল। কিন্তু আসামি পক্ষ কৌশলে শুনানির দিন পিছিয়েছে। এখন প্রধান আসামি উপ-সচিব মহিউদ্দিন মাহিন লোকজন দিয়ে তাকে হুমকি দিচ্ছে। বলছেন, বিষয়টি নিয়ে ঝামেলা না করার জন্য।

বাদী সাহাদত জানিয়েছেন, এমডি মমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। প্রধান আসামি উপ-সচিব মহিউদ্দিন মাহিন, তার স্ত্রী কোম্পানির চেয়ারম্যান রোকসানা জামানকে কেন গ্রেপ্তার করছে না সিআইডি তা আমাদের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রধান আসামি উপ-সচিব মাহিন ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করার দাবি জানাচ্ছি। তাদের গ্রেপ্তার না করলে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না। সাহাদত হোসেন বলেন, ‘আমরা একটি তালিকা পেয়েছি। সেখানে বিনিয়োগকারীদের নাম, ঠিকানা ও সংখ্যা রয়েছে। কে কত টাকা বিনিয়োগ করেছে তাও আছে।’

জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মহানগর উত্তরের ইন্সপেক্টর মহসিন উদ্দিন বলেন, ‘মামলার তদন্ত চলছে। তদন্তাধীন বিষয়ে কোন তথ্য দেয়ার আইনি ভিত্তি নেই। তাই এ মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে কোন কথা বলতে চাই না।’ প্রতারণায় অন্যদের সংশ্লিষ্টার বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি হননি তিনি।

তবে সিআইডির ঢাকা মহানগর উত্তরের পুলিশ সুপার খালিদুল হক হাওলাদার জানান প্রাথমিকভাবে তারা জি টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে সারাদেশে ১৫ হাজার আইডি বিক্রি করে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য পেয়েছেন। এ প্রতারণার সঙ্গে উপ-সচিব মাহিন তার স্ত্রী শিরিন রোকসানা জাহান, এমডি মমিনুল ইসলামসহ কয়েকজনের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন। তারা এমডি মমিনুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছেন। এখন তারা তদন্ত করে দেখছেন মূলত কয়জন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে কী পরিমাণ টাকা প্রতিষ্ঠানটি নিয়েছে, এতে কার কী ধরনের স্বার্থ জড়িত। মূল হোতা উপ-সচিব মাহিনকে তারা সব প্রমাণাদিসহ গ্রেপ্তার করতে চান।

জানতে চাইলে সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পুলিশ সুপার খালিদুল হক হাওলাদার জানান, জি টু ওয়াল্ড প্রতারণা করে গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমরা এমডিকে গ্রেপ্তার করেছি। মামলার তদন্ত করতে গিয়ে উপ-সচিব মহিউদ্দিন মাহিন ও তার স্ত্রী এ প্রতারণার মূল হোতা বলে বেরিয়ে আসে। যেহেতু উপ-সচিব মাহিন একজন সরকারি কর্মকর্তা তাই সব তথ্য প্রমাণ যাচাই-বাছাই শেষে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপ-সচিব মহিউদ্দিন মাহিনের নাম্বারে একাধিক যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাই অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সোমবার, ০৯ মে ২০২২ , ২৬ বৈশাখ ১৪২৮ ০৬ শাওয়াল ১৪৪৩

এমএলএম কোম্পানি খুলে প্রতারণা, নেপথ্যে ‘উপসচিব’

তিনি উপ-সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা, কাজ করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে। আলোচনায় এসেছেন একটি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানির প্রতারণার কারণে। আর সেই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে আছেন তারই স্ত্রী। অবস্য স্ত্রী চেয়ারম্যান হলেও কোম্পানি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই ছিল।

আর সেই এমএলএম কোম্পানি জি টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ড নামের প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগে মুনাফার লোভ দেখিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ১০ কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বিনিয়োগকারী বলছেন অনুসন্ধান করলে টাকার পরিমাণ আরও বাড়তে।

এই প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মমিনুল ইসলাম গ্রেপ্তার হওয়ার পরে। ক্যাপ্টেন (অব.) মো. সাহাদৎ হোসেন নামের একজন বিনিয়োগ করে লভ্যাংশ না পাওয়ায় মামলা করেন হাতিরঝিল থানায়। এর আগে বিনিয়োগকারীদের কয়েকজন বিষয়টি নিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির কাছে অভিযোগ করেন।

সিআইডি অনুসন্ধান চালিয়ে প্রতারণার অভিযোগে চলতি বছরের গত ২৯ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করে প্রতিষ্ঠানটির এমডি মমিনুল ইসলামকে। তবে সে সময় মামলায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শিরিন রোকাসানা জাহান, তার স্বামী উপ-সচিব এম এম মহিনউদ্দিন কবীর মাহিনসহ আরও কয়েকজন আসামি হলেও তাদের গ্রেপ্তার করেনি সিআইডি। বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। পরে সংবাদ সম্মেলন করে সিআইডি এ প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার খবর জানায়। সেখানে বলা হয় প্রতিষ্ঠানটি ‘সারাদেশে ১৫ হাজার আইডি কার্ড বিক্রি করে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে’।

গ্রাহকদের অভিযোগ, নিজের স্ত্রীকে চেয়ারম্যান পদে দেখালেও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ লেনদেনে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে জি টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন উপ-সচিব এম এম মহিউদ্দিন কবীর মাহিন। সেসময় তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। পরে তিনি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে যোগ দেন।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, রাজধানীর রামপুরা ৪৬৪/এইচ ডিআইডি রোডে ইসলাম টাওয়ারের ৮ তলায় আলিশান অফিস ছিল জি টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ডের প্রধান কার্যালয়। এখানে প্রতি মাসে ৮০ হাজার টাকার ভাড়ার চুক্তিতে অফিসটি নিয়েছিলেন উপ-সচিব মাহিন। নথিপত্রে স্ত্রী শিরিন রোকসানা জাহানকে বানিয়েছেন চেয়ারম্যান। আর পূর্ব পরিচিত মমিনুল ইসলামকে বানিয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আরও ৪ থেকে ৫ জন ছিলেন পরিচালনা বোর্ডের পরিচালক।

প্রতিষ্ঠানটি শুরুতে যে পরিকল্পনা দেখিয়েছিল তাতে বিনিয়োগকারীরা বেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। শুরুতে যারা বিনিয়োগ করেছেন তাদের কিছু কিছু লভ্যাংশ দেয়া হলেও ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীদেও সঙ্গে ‘ছলচাতুরী’ করতে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদ তথা উপ-সচিব মাহিন।

বিনিয়োগকারীদের ভাষ্য : এম এম মহিউদ্দিন কবীর মাহিন নিজেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব হিসেবে পরিচয় দিয়েই জি টুয়েন্টি ওর্য়াল্ড নামের এমএলএম কোম্পানি চালু করেন। রাজধানীর রামপুরায় বিটিভির উল্টোপাশে ইসলাম টাওয়ারে নেয়া হয় আলিশান অফিস। তিন হাজার ৫৬০ টাকা বিনিয়োগের প্যাকেজ ছিল। এর মধ্যে আইডির খরচ নেয়া হতো ২ হাজার ৫৬০ টাকা, আর ১ হাজার টাকা নেয়া হতো প্যাকেজ পণ্য দেয়ার কথা বলে। ওই প্যাকেজে নিত্যপণ্য চাল, ডাল, আটা ইত্যাদি দেয়ার কথা ছিল কমদামে।

কিন্তু শুরু থেকে টাকা নিয়ে কাউকে কোন পণ্য দেয়া হয়নি। তবে অফিসে বিভিন্ন পণ্য সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। কোন বিনিয়োগকারীই পুরো টাকা দিয়েও পণ্য পায়নি। আবার অনেকের কাছ থেকে ডিলারশিপ বিক্রি করেও টাকা নিয়েছে, কিন্তু ডিলারশিপ দেয়া হয়নি। এভাবে তারা সারাদেশ থেকে ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ধারণা করা হলেও হয়ত টাকার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

সংবাদের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান করে মহিউদ্দিন কবীর মাহিনের পরিচয় মিলেছে। মহিউদ্দিন কবীর মাহিনের পুরো নাম এম এম মহিউদ্দিন কবীর মাহিন। তিনি নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীনন্ত জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের উপ-প্রধান (মরফোলজিস্ট) হিসেবে কর্মরত। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের ওয়েবসাইটে কর্মকর্তাদের তালিকায় যাদের নাম রয়েছে সেখানে তার অবস্থান ৯ নম্বর তালিকায় রয়েছে।

মঙ্গলবার পর্যন্ত তার দুটি ফোন নাম্বারের একটি খোলা থাকলেও গতকাল সেটিও বন্ধ পাওয়া গেছে। অভিযোগের বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ভুক্তভোগীদের যত অভিযোগ

বিনিয়োগকারী মো. ফরিদ তালুকদার জানান, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে জি টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ড নামের ওই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। তিনি শুরুর দিকের বিনিয়োগকারী। ২ লাখ টাকা খরচ করে একাধিক আইডি খুলেছেন। তার মাধ্যমে একজন ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এরকম প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর একাধিক আইডি রয়েছে। আবার প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর মাধ্যমে বহু ব্যক্তি এসে বিনিয়োগ করেছেন।

বিনিয়োগকারীদের টাকা ‘উপ-সচিব’ মাহিমউদ্দিন কবীর মাহিন গ্রহণ করতেন বলেই দাবি ভুক্তভোগীদের। তিনি নিয়মিত অফিসে থাকতেন। প্রতিষ্ঠানটির আরও একাধিক পরিচালক থাকলেও তাদের অনেকেই আড়ালে ছিলেন। তারা মূলত উপ-সচিব মাহিন এবং প্রতিষ্ঠানটির এমডি মমিনুল ইসলামকেই চিনতেন।

ফরিদ তালুকদার বলেন, ২০২০ এবং ২০২১ সাল করোনার মধ্যেই অনেকেই মুনাফার আশায় এখানে বিনিয়োগ করেছেন। ‘প্রতারণার’ বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনিসহ বিনিয়োগকারীদের কয়েকজন সিআইডিতে অভিযোগ করেন। তারা ভেবেছিলেন মমিনুল গ্রেপ্তার হলে উপ-সচিব মাহিন তাদের টাকা পয়সা ফেরত দিবেন। কিন্তু তা আর হয়নি। এখন তারা টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

বিনিয়োগকারী মো. ইসমাইল কলিম জানান, ‘এ প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা মহিউদ্দিন কবীর মাহিন। যাকে সবাই উপ-সচিব হিসেবে জানতো। আমরা জানতে পেরেছি তিনি এক সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন। পরে নদীরক্ষা কমিশনে বদলি হয়ে আসেন। বর্তমানে তিনি নদীরক্ষা কমিশনে আছেন। তিনি (উপ-সচিব মাহিন) মূলত আমাদের বিনিয়োগ করতে আগ্রহী করে তুলেছেন, অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কিন্তু পরে দেখলাম পুরোটাই ধাপ্পাবাজি।’

ইসমাইল কলিম বলেন তাদের ৫ জনের একটি গ্রুপ রয়েছে। এ ৫ জনের মাধ্যমে সারাদেশ থেকে দেড় কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ হয়েছে। তারা কেউই লভ্যাংশ তো দূরের কথা মূল টাকাও ফেরত পাননি।

মামলার বাদী মো. সাহাদৎ হোসেন জানান, তিনি ১৩৫টি আইডির বিপরীতে সাড়ে ৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তার মাধ্যমে যেসব ব্যক্তিরা এখানে বিনিয়োগ করেছেন কেউই কোন টাকা পায়নি। পরে কোম্পানির চেয়ারম্যান উপ-সচিব মহিউদ্দিন কবীর মাহিন তাকে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে বলেন। ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে তাকে প্রতিমাসে ২ লাখ করে লভ্যাংশ দেয়া হবে বলেও জানান মহিউদ্দিন কবির মাহিন। তার কথায় তিনি আশ্বাস্ত হলে সেখানে একটি চুক্তি হয়। কিন্তু তিনি কোন টাকা পাননি। পরে তিনি মামলা করেন।

তিনি জানান, গত ২ মার্চ গ্রেপ্তার আসামি প্রতিষ্ঠানটির এমডি মমিনুল ইসলাম তার (বাদীর) জিম্মায় জামিন নিয়েছেন সমুদয় টাকা ফেরত দেয়ার শর্তে। এ বিষয়ে গত মার্চ মাসের ১৬ তারিখে একটি শুনানিও ছিল। কিন্তু আসামি পক্ষ কৌশলে শুনানির দিন পিছিয়েছে। এখন প্রধান আসামি উপ-সচিব মহিউদ্দিন মাহিন লোকজন দিয়ে তাকে হুমকি দিচ্ছে। বলছেন, বিষয়টি নিয়ে ঝামেলা না করার জন্য।

বাদী সাহাদত জানিয়েছেন, এমডি মমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। প্রধান আসামি উপ-সচিব মহিউদ্দিন মাহিন, তার স্ত্রী কোম্পানির চেয়ারম্যান রোকসানা জামানকে কেন গ্রেপ্তার করছে না সিআইডি তা আমাদের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রধান আসামি উপ-সচিব মাহিন ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করার দাবি জানাচ্ছি। তাদের গ্রেপ্তার না করলে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না। সাহাদত হোসেন বলেন, ‘আমরা একটি তালিকা পেয়েছি। সেখানে বিনিয়োগকারীদের নাম, ঠিকানা ও সংখ্যা রয়েছে। কে কত টাকা বিনিয়োগ করেছে তাও আছে।’

জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মহানগর উত্তরের ইন্সপেক্টর মহসিন উদ্দিন বলেন, ‘মামলার তদন্ত চলছে। তদন্তাধীন বিষয়ে কোন তথ্য দেয়ার আইনি ভিত্তি নেই। তাই এ মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে কোন কথা বলতে চাই না।’ প্রতারণায় অন্যদের সংশ্লিষ্টার বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি হননি তিনি।

তবে সিআইডির ঢাকা মহানগর উত্তরের পুলিশ সুপার খালিদুল হক হাওলাদার জানান প্রাথমিকভাবে তারা জি টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে সারাদেশে ১৫ হাজার আইডি বিক্রি করে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য পেয়েছেন। এ প্রতারণার সঙ্গে উপ-সচিব মাহিন তার স্ত্রী শিরিন রোকসানা জাহান, এমডি মমিনুল ইসলামসহ কয়েকজনের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন। তারা এমডি মমিনুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছেন। এখন তারা তদন্ত করে দেখছেন মূলত কয়জন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে কী পরিমাণ টাকা প্রতিষ্ঠানটি নিয়েছে, এতে কার কী ধরনের স্বার্থ জড়িত। মূল হোতা উপ-সচিব মাহিনকে তারা সব প্রমাণাদিসহ গ্রেপ্তার করতে চান।

জানতে চাইলে সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পুলিশ সুপার খালিদুল হক হাওলাদার জানান, জি টু ওয়াল্ড প্রতারণা করে গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমরা এমডিকে গ্রেপ্তার করেছি। মামলার তদন্ত করতে গিয়ে উপ-সচিব মহিউদ্দিন মাহিন ও তার স্ত্রী এ প্রতারণার মূল হোতা বলে বেরিয়ে আসে। যেহেতু উপ-সচিব মাহিন একজন সরকারি কর্মকর্তা তাই সব তথ্য প্রমাণ যাচাই-বাছাই শেষে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপ-সচিব মহিউদ্দিন মাহিনের নাম্বারে একাধিক যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাই অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।