‘বিদেশি দায়দেনায় অস্বস্তিকর অবস্থানে চলে যেতে পারে বাংলাদেশ’

২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরে বাংলাদেশ বিদেশি দায়দেনায় অস্বস্তিকর অবস্থানে চলে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সরকারের দায়দেনা নিয়ে গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল আলাপচারিতায় তিনি এমন মত দেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের দায়দেনা সবুজ (স্বস্তিকর) অবস্থানে আছে। এটি ধীরে ধীরে হলুদ অবস্থানে (অস্বস্তিকর) যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আপাতস্বস্তি না-ও থাকতে পারে। এখন আমরা বিদেশি দ্বিপক্ষীয় উৎস থেকে বেশি মূল্যে বেশি ঋণ করছি। যেমন চীন, রাশিয়া ও ভারত। এসব দেশের ঋণের রেয়াতি সময় (গ্রেস পিরিয়ড) শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া সরবরাহকারী ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। অথচ পাইপলাইনে ৫০ বিলিয়ন ডলারের মতো সাশ্রয়ী ঋণ ব্যবহার করতে পারছি না।

অবশ্য তিনি মনে করেন, বিদেশি দায়দেনার দেশি উৎসের দায়দেনাও কোন অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার মতে, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। গত তিন বছরে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি দুই উৎস থেকেই ঋণ নেয়া বেড়েছে।

আবার বিগত দুটি জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর, নির্বাচনের বছর ও পরের বছর ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। দেশের দায়দেনা পরিস্থিতি ব্যাখ্যায় নির্বাচনী চক্র সূচক হিসেবে উঠে আসছে। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ার চাপ এবং পাশ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নেপালের আর্থিক সংকট বিবেচনায় দায়দেনা নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ অবস্থায় ঋণের চাপ সামলাতে তিনি সরকারকে তিনটি বার্তা দেন। প্রথমত- কর আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে আর্থিক সংহতিকরণ। দ্বিতীয়ত- বহিস্থ খাতের বর্তমান চাপ মোকাবিলায় সুরক্ষা দেয়া এবং দায়দেনা পরিস্থিতির সামগ্রিক, স্বচ্ছ এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে দায়দেনা নিয়ে শ্রীলঙ্কা বড় সংকটে পড়েছে। এর পরিণতিতে সেখানে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান ও নেপালেও প্রায় একই অবস্থা চলছে। বাংলাদেশকে বিষয়টি সতর্ক পর্যালোচনার মধ্যে রাখতে হবে।

বাংলাদেশে কি শ্রীলঙ্কার মতো সংকট হতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমি তা দেখি না। কোন দেশের সঙ্গে অন্য দেশের তুলনীয় নয়। মূল বিষয় হলো, শ্রীলঙ্কা থেকে কী শিখলাম। একসময় আমাদের দেশেও বন্ড ছাড়ার ধোঁয়া উঠেছিল। সরকার এই বিষয়ে রক্ষণশীল ছিল। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা বন্দর নিয়ে ওই দেশের বিশেষজ্ঞরা এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। তবু দেশটির সরকার তা করেছে।’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য একটি হিসাব করে দেখিয়েছেন, ২০২০-২১ অর্থবছরের সার্বিকভাবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে সরকারি দায়দেনা ৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ। মাথাপিছু সরকারি দায়দেনা ৪৩২ ডলার। তিনি মনে করেন, সরকারি ঋণ পরিশোধসহ সার্বিক দায়দেনায় পূর্ণাঙ্গ হিসাব করতে হলে বিদেশি ঋণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণ, ব্যক্তি খাতের ঋণ, সরকারের সংযুক্ত দায়দেনাও বিবেচনায় আনা উচিত। এসব হিসাবে আনা হলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মূল্যায়ন থেকে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, সরকারি দায়দেনা পরিস্থিতি পাঁচ ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যেমন বিনিময় হারের ঝুঁকি বাড়ছে, অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের হার বাড়ছে, বিদেশি ঋণের সুদের হার বাড়ছে, উচ্চমূল্যে প্রকল্প নেয়া হচ্ছে ও প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা হ্রাস পাওয়া।

অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের সরকারি ঋণের পাশাপাশি বেসরকারি ঋণও গত ১০ বছরে অনেকটা বেড়েছে। বেসরকারি খাতে যারা নমনীয় লাইবর হারে ঋণ নিয়েছেন, তাদের সুদহার বাড়ছে। এই বিষয়টিও মাথায় রাখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। বলেন, এই ঋণখেলাপি হলে দেশের ঋণমানে প্রভাব পড়বে। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীদের পাশাপাশি গবেষকেরাও যুক্ত ছিলেন।

মঙ্গলবার, ১০ মে ২০২২ , ২৭ বৈশাখ ১৪২৮ ০৭ শাওয়াল ১৪৪৩

‘বিদেশি দায়দেনায় অস্বস্তিকর অবস্থানে চলে যেতে পারে বাংলাদেশ’

২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরে বাংলাদেশ বিদেশি দায়দেনায় অস্বস্তিকর অবস্থানে চলে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সরকারের দায়দেনা নিয়ে গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল আলাপচারিতায় তিনি এমন মত দেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের দায়দেনা সবুজ (স্বস্তিকর) অবস্থানে আছে। এটি ধীরে ধীরে হলুদ অবস্থানে (অস্বস্তিকর) যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আপাতস্বস্তি না-ও থাকতে পারে। এখন আমরা বিদেশি দ্বিপক্ষীয় উৎস থেকে বেশি মূল্যে বেশি ঋণ করছি। যেমন চীন, রাশিয়া ও ভারত। এসব দেশের ঋণের রেয়াতি সময় (গ্রেস পিরিয়ড) শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া সরবরাহকারী ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। অথচ পাইপলাইনে ৫০ বিলিয়ন ডলারের মতো সাশ্রয়ী ঋণ ব্যবহার করতে পারছি না।

অবশ্য তিনি মনে করেন, বিদেশি দায়দেনার দেশি উৎসের দায়দেনাও কোন অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার মতে, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। গত তিন বছরে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি দুই উৎস থেকেই ঋণ নেয়া বেড়েছে।

আবার বিগত দুটি জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর, নির্বাচনের বছর ও পরের বছর ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। দেশের দায়দেনা পরিস্থিতি ব্যাখ্যায় নির্বাচনী চক্র সূচক হিসেবে উঠে আসছে। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ার চাপ এবং পাশ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নেপালের আর্থিক সংকট বিবেচনায় দায়দেনা নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ অবস্থায় ঋণের চাপ সামলাতে তিনি সরকারকে তিনটি বার্তা দেন। প্রথমত- কর আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে আর্থিক সংহতিকরণ। দ্বিতীয়ত- বহিস্থ খাতের বর্তমান চাপ মোকাবিলায় সুরক্ষা দেয়া এবং দায়দেনা পরিস্থিতির সামগ্রিক, স্বচ্ছ এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে দায়দেনা নিয়ে শ্রীলঙ্কা বড় সংকটে পড়েছে। এর পরিণতিতে সেখানে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান ও নেপালেও প্রায় একই অবস্থা চলছে। বাংলাদেশকে বিষয়টি সতর্ক পর্যালোচনার মধ্যে রাখতে হবে।

বাংলাদেশে কি শ্রীলঙ্কার মতো সংকট হতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমি তা দেখি না। কোন দেশের সঙ্গে অন্য দেশের তুলনীয় নয়। মূল বিষয় হলো, শ্রীলঙ্কা থেকে কী শিখলাম। একসময় আমাদের দেশেও বন্ড ছাড়ার ধোঁয়া উঠেছিল। সরকার এই বিষয়ে রক্ষণশীল ছিল। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা বন্দর নিয়ে ওই দেশের বিশেষজ্ঞরা এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। তবু দেশটির সরকার তা করেছে।’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য একটি হিসাব করে দেখিয়েছেন, ২০২০-২১ অর্থবছরের সার্বিকভাবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে সরকারি দায়দেনা ৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ। মাথাপিছু সরকারি দায়দেনা ৪৩২ ডলার। তিনি মনে করেন, সরকারি ঋণ পরিশোধসহ সার্বিক দায়দেনায় পূর্ণাঙ্গ হিসাব করতে হলে বিদেশি ঋণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণ, ব্যক্তি খাতের ঋণ, সরকারের সংযুক্ত দায়দেনাও বিবেচনায় আনা উচিত। এসব হিসাবে আনা হলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মূল্যায়ন থেকে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, সরকারি দায়দেনা পরিস্থিতি পাঁচ ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যেমন বিনিময় হারের ঝুঁকি বাড়ছে, অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের হার বাড়ছে, বিদেশি ঋণের সুদের হার বাড়ছে, উচ্চমূল্যে প্রকল্প নেয়া হচ্ছে ও প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা হ্রাস পাওয়া।

অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের সরকারি ঋণের পাশাপাশি বেসরকারি ঋণও গত ১০ বছরে অনেকটা বেড়েছে। বেসরকারি খাতে যারা নমনীয় লাইবর হারে ঋণ নিয়েছেন, তাদের সুদহার বাড়ছে। এই বিষয়টিও মাথায় রাখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। বলেন, এই ঋণখেলাপি হলে দেশের ঋণমানে প্রভাব পড়বে। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীদের পাশাপাশি গবেষকেরাও যুক্ত ছিলেন।