বিএনপিতে শৃঙ্খলার ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ পদক্ষেপ, দলে অসন্তোষ

নানা কারণে বিএনপি নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। নিজেদের মধ্যে বাড়ছে দূরত্বও। যার ফলে দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে তৈরি হয়েছে বিশৃঙ্খল পরিবেশ। এসব পরিস্থিতিতে নেতাদের সতর্কের পাশাপাশি শোকজ ও বহিষ্কারের পথ বেছে নিয়েছে বিএনপি। দলটি এর মধ্যে অনেক নেতাকে শোকজ ও বহিষ্কারও করেছে।

তবে এসব বহিষ্কারাদেশ, শোকজ নোটিশ, দলীয় পদ-পদবি কেড়ে নেয়া, পদাবনতি দেয়া, আবার তা প্রত্যাহার করার বিষয়গুলো নিয়ে দলটির ভেতরেই দেখা দিয়েছে প্রশ্ন । অনেকে এসব কার্যক্রমকে দলটির ভেতরের ‘একটা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার্থে’ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করছেন।

কিন্তু সামনে দলটির উচ্চপর্যায়ের আরও নেতা শোকজ ও বহিষ্কারের পাল্লায় পড়তে যাচ্ছেন বলেই দলটির সূত্রে জানা গেছে।

দলটির নীতি-নির্ধারণী মহল থেকে বলা হচ্ছে, দলের ‘শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই’ এই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

বিএনপির উঁচ্চপর্যায়ের সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে সারা দেশে মূল দল এবং তার সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে বহিষ্কারসহ নানা কারণে শোকজ নোটিশ দিয়েছে বিএনপি। বহিষ্কৃতদের অধিকাংশই দলীয় ‘শৃঙ্খলার পরিপন্থী’ কাজে জড়িত থাকার দায়ে দলটির গঠনতন্ত্রের ৫(গ) ধারা মোতাবেক প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার হন বলে বিএনপির দপ্তর থেকে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি এ রকম চিঠি পেয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ। কারণ গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তার নেতৃত্বে ‘পেশাজীবী’ সমাবেশ ও সেখানে তার বক্তব্য। শওকত মাহমুদ সেই সমাবেশে ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির’ দাবিতে সরকার পতনের ডাক দেন। সেখানে বক্তব্যের এক পর্যায়ে শওকত মাহমুদ বলেন, রাজনীতিবিদেরা যদি ‘ব্যর্থ হন, তাহলে পেশাজীবীরা গণ-অভ্যুত্থানের’ দায়িত্ব নেবেন।

শওকত মাহমুদের ‘সরকার পতনের ডাক’ এবং ‘ওই বক্তব্যে’ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণ হিসেবে মনে করে বিএনপি। তাই তার (শওকত) কাছে দলটি ব্যাখ্যা চেয়েছে। গত ৬ এপ্রিল তার কাছে এ ব্যাখা চেয়েছে বিএনপি। দুই বছর আগেও একই ধরনের ঘটনায় দলীয় ‘শৃঙ্খলাবিরোধী’ কর্মকা-ের অভিযোগে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছিল বলে বিএনপি জানিয়েছে।

একই দিন নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি আশরাফউদ্দিন খান, চাঁদপুরের ইঞ্জিনিয়ার মোমিনুল ইসলামসহ আরও কয়েকজনকে কারণ দর্শানোর চিঠি দিয়েছে বিএনপি।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক থেকে সরিয়ে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য করেছে বিএনপি। অর্থাৎ এহছানুল হক মিলনের পদাবনতি হয়েছে। দলীয় এক সূত্রের দাবি, এহসানুল হক মিলন দীর্ঘদিন ধরে দলের কার্যক্রমে ‘নিষ্ক্রিয়’। তাই বিএনপি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-১ আসন থেকে এহসানুল হক মিলন মনোনয়ন পাননি। এরপর থেকেই দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয় বলে সূত্র জানায়।

শওকত মাহমুদ সংবাদকে জানান, তিনি সেই নোটিশের জবাব দিয়েছেন। কী জবাব দিয়েছেন, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিএনপি আমার জবাবে কি সিদ্ধান্ত জানাবে, সেই পরিপেক্ষিতে পরে কথা বলব। এই মুহূর্তে শোকজের জবাব গণমাধ্যমে বলতে চাই না।’

বিএনপি সরকার পতনের ডাকে কঠোর আন্দোলনে মাঠে নামতে চায়, কিন্তু দলীয় নেতাদের সে বিষয়ে বক্তব্যে দলটির বাধা কেন এমন প্রশ্নে শওকত মাহমুদ বলেন, ‘দলের (বিএনপি) মহাসচিব বলতে পারবেন কী কারণে বাধা; বিষয়টি একমাত্র তিনিই জানেন।’

এহসানুল হক মিলনকে অসংখ্যবার ফোন করেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নেতাদের ‘শৃঙ্খলায় আনতে কঠোর অবস্থান’ নিয়েছেন। তিনি (তারেক) বিদেশ থেকেই চাচ্ছেন দলের ‘শৃঙ্খলা দৃঢ়তার সঙ্গে ধরে’ রাখতে। সে লক্ষ্যে তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ‘অতিরিক্ত ক্ষমাসুলভ আচরণে লাগাম টানার’ কৌশল নিয়েছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সংবাদকে বলেন, ‘যেকোন সময়, যেকোন নেতা শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করলে দল তার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। আমাদের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যেকোন মূল্যে দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চান।’

আর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিএনপির সেøাগান হচ্ছে, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। এখানে ব্যক্তি কোন ফ্যাক্টর নয়। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রাধান্য দিচ্ছেন দলের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায়। দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে সে যত বড় নেতাই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

মঙ্গলবার, ১০ মে ২০২২ , ২৭ বৈশাখ ১৪২৮ ০৭ শাওয়াল ১৪৪৩

বিএনপিতে শৃঙ্খলার ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ পদক্ষেপ, দলে অসন্তোষ

নানা কারণে বিএনপি নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। নিজেদের মধ্যে বাড়ছে দূরত্বও। যার ফলে দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে তৈরি হয়েছে বিশৃঙ্খল পরিবেশ। এসব পরিস্থিতিতে নেতাদের সতর্কের পাশাপাশি শোকজ ও বহিষ্কারের পথ বেছে নিয়েছে বিএনপি। দলটি এর মধ্যে অনেক নেতাকে শোকজ ও বহিষ্কারও করেছে।

তবে এসব বহিষ্কারাদেশ, শোকজ নোটিশ, দলীয় পদ-পদবি কেড়ে নেয়া, পদাবনতি দেয়া, আবার তা প্রত্যাহার করার বিষয়গুলো নিয়ে দলটির ভেতরেই দেখা দিয়েছে প্রশ্ন । অনেকে এসব কার্যক্রমকে দলটির ভেতরের ‘একটা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার্থে’ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করছেন।

কিন্তু সামনে দলটির উচ্চপর্যায়ের আরও নেতা শোকজ ও বহিষ্কারের পাল্লায় পড়তে যাচ্ছেন বলেই দলটির সূত্রে জানা গেছে।

দলটির নীতি-নির্ধারণী মহল থেকে বলা হচ্ছে, দলের ‘শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই’ এই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

বিএনপির উঁচ্চপর্যায়ের সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে সারা দেশে মূল দল এবং তার সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে বহিষ্কারসহ নানা কারণে শোকজ নোটিশ দিয়েছে বিএনপি। বহিষ্কৃতদের অধিকাংশই দলীয় ‘শৃঙ্খলার পরিপন্থী’ কাজে জড়িত থাকার দায়ে দলটির গঠনতন্ত্রের ৫(গ) ধারা মোতাবেক প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার হন বলে বিএনপির দপ্তর থেকে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি এ রকম চিঠি পেয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ। কারণ গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তার নেতৃত্বে ‘পেশাজীবী’ সমাবেশ ও সেখানে তার বক্তব্য। শওকত মাহমুদ সেই সমাবেশে ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির’ দাবিতে সরকার পতনের ডাক দেন। সেখানে বক্তব্যের এক পর্যায়ে শওকত মাহমুদ বলেন, রাজনীতিবিদেরা যদি ‘ব্যর্থ হন, তাহলে পেশাজীবীরা গণ-অভ্যুত্থানের’ দায়িত্ব নেবেন।

শওকত মাহমুদের ‘সরকার পতনের ডাক’ এবং ‘ওই বক্তব্যে’ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণ হিসেবে মনে করে বিএনপি। তাই তার (শওকত) কাছে দলটি ব্যাখ্যা চেয়েছে। গত ৬ এপ্রিল তার কাছে এ ব্যাখা চেয়েছে বিএনপি। দুই বছর আগেও একই ধরনের ঘটনায় দলীয় ‘শৃঙ্খলাবিরোধী’ কর্মকা-ের অভিযোগে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছিল বলে বিএনপি জানিয়েছে।

একই দিন নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি আশরাফউদ্দিন খান, চাঁদপুরের ইঞ্জিনিয়ার মোমিনুল ইসলামসহ আরও কয়েকজনকে কারণ দর্শানোর চিঠি দিয়েছে বিএনপি।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক থেকে সরিয়ে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য করেছে বিএনপি। অর্থাৎ এহছানুল হক মিলনের পদাবনতি হয়েছে। দলীয় এক সূত্রের দাবি, এহসানুল হক মিলন দীর্ঘদিন ধরে দলের কার্যক্রমে ‘নিষ্ক্রিয়’। তাই বিএনপি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-১ আসন থেকে এহসানুল হক মিলন মনোনয়ন পাননি। এরপর থেকেই দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয় বলে সূত্র জানায়।

শওকত মাহমুদ সংবাদকে জানান, তিনি সেই নোটিশের জবাব দিয়েছেন। কী জবাব দিয়েছেন, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিএনপি আমার জবাবে কি সিদ্ধান্ত জানাবে, সেই পরিপেক্ষিতে পরে কথা বলব। এই মুহূর্তে শোকজের জবাব গণমাধ্যমে বলতে চাই না।’

বিএনপি সরকার পতনের ডাকে কঠোর আন্দোলনে মাঠে নামতে চায়, কিন্তু দলীয় নেতাদের সে বিষয়ে বক্তব্যে দলটির বাধা কেন এমন প্রশ্নে শওকত মাহমুদ বলেন, ‘দলের (বিএনপি) মহাসচিব বলতে পারবেন কী কারণে বাধা; বিষয়টি একমাত্র তিনিই জানেন।’

এহসানুল হক মিলনকে অসংখ্যবার ফোন করেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নেতাদের ‘শৃঙ্খলায় আনতে কঠোর অবস্থান’ নিয়েছেন। তিনি (তারেক) বিদেশ থেকেই চাচ্ছেন দলের ‘শৃঙ্খলা দৃঢ়তার সঙ্গে ধরে’ রাখতে। সে লক্ষ্যে তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ‘অতিরিক্ত ক্ষমাসুলভ আচরণে লাগাম টানার’ কৌশল নিয়েছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সংবাদকে বলেন, ‘যেকোন সময়, যেকোন নেতা শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করলে দল তার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। আমাদের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যেকোন মূল্যে দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চান।’

আর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিএনপির সেøাগান হচ্ছে, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। এখানে ব্যক্তি কোন ফ্যাক্টর নয়। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রাধান্য দিচ্ছেন দলের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায়। দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে সে যত বড় নেতাই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’