ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যম

মোস্তাফা জব্বার

তিন॥

কম্পিউটার ও মাল্টিমিডিয়া : মাল্টিমিডিয়া বিষয়ের গভীরে যাবার আগে আমাদের বোঝা দরকার মাল্টিমিডিয়া বলতে কি বোঝায়।

যদি আমরা কম্পিউটারের ভাষায় ব্যাখ্যা করি তবে কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকাতে হবে। আমরা সবাই জানি কম্পিউটারের পর্দায় প্রদর্শিত সব বিষয়কেই পিক্সেল বলা হয়। পিক্সেল প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে। ক. টেক্সট ও খ. গ্রাফিক্স। কম্পিউটারের সিস্টেমে বিদ্যমান ফন্টসমূহকে কোড হিসেবে ব্যবহার করে যেসব বর্ণ (ঞবীঃ) প্রদর্শন করা হয় তার সঙ্গে ‘ফন্টের নির্দিষ্ট নামের’ সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কোন কোন এপ্লিকেশনে এসব ফন্ট সম্পাদনা করা গেলেও (যেমন ইলাস্ট্রেটর) বেশির ভাগ এপ্লিকেশন কম্পিউটারের পর্দায় তাই প্রদর্শন করে, যা ফন্টে ডিজাইন করা হয়ে থাকে। আবার এটিও সত্য যে অপারেটিং সিস্টেমে ফন্ট যুক্ত না থাকলে বা অপারেটিং সিস্টেমে ফন্ট যুক্ত করার ব্যবস্থা না থাকলে যে কোন ফন্ট ব্যবহার করা যায় না। ইন্টারনেটের প্রয়োগ কর্মসূচিগুলোতে ফন্টের ব্যবহার সীমিত থাকে। শুধু ওয়েবসাইটে ফন্ট এমবেড করা থাকে। ব্রাউজার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপারেটিং সিস্টেমেরে নির্দিষ্ট করা ফন্টই ব্যবহার করতে হয়।

প্রকৃতার্থে প্রত্যেকটি বর্ণই একটি ‘গ্রাফিক্স’ অবজেক্ট হলেও কম্পিউটারের ভাষায় একে গ্রাফিক্স বলা হয় না। বলা হয় টেক্সট। একসময়ে এসব টেক্সট এতোই বৈচিত্রহীন ছিল যে সব প্রকারের ডকুমেন্টে শুধু এক ধরনের ফন্টই ব্যবহার করা হতো। এমনকি সাইজ বা স্টাইলও ছিল না সেসব ফন্টে। বস্তুত কম্পিউটারে গ্রাফিক্স মানে হচ্ছে ‘ছবি’। ‘ছবি’ বলতে আমরা কম্পিউটারে তৈরি করা বা জেনারেটেড চিত্র, অংকন, ডিজাইন বা ইলাসট্রেশন করা ছবি, টুডি- থ্রিডি ডিজাইন, এফেক্টস ইত্যাদি ছাড়াও কম্পিউটারে বাইরে থেকে ইনপুট দেয়া ছবি এবং উপরোক্ত বিষয়সমূহকে বোঝায়। একসময়ে গ্রাফিক্সের সংজ্ঞা ছিল কম্পিউটারের ফন্ট ছাড়া যা ব্যবহার করা হয় তার নামই গ্রাফিক্স।

আশির দশকে প্রচলিত আইবিএম পিসি প্রধানত টেক্সটবেজড কম্পিউটার সিস্টেম ছিল। যেহেতু কম্পিউটার গণনা যন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল সেহেতু প্রথম মাত্র ১০টি সংখ্যা ও পরে রোমান ৫২টি বর্ণ এবং চিহ্নসমূহ প্রদর্শন করাই কম্পিউটারের প্রধান লক্ষ্য ছিল। কিন্তু কালক্রমে পিসি ব্যবহারকারীদের চাহিদা বাড়তে থাকে। আবার শুধু ফন্ট নয়Ñ এর সঙ্গে গ্রাফিক্স ব্যবহার করতে চাইতে থাকে। কালক্রমে এখন অডিও-ভিডিও ব্যবহার করার জন্য পিসি ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে।

পিসিতে অপারেটিং সিস্টেম লেভেলে ‘গ্রাফিক্স’ বা ননটেক্সট ইমেজ প্রদর্শনের অনন্য সুযোগ আসে ‘লিজা’ অপারেটিং সিস্টেম থেকে। যদিও প্রো-ডস, ডস, সিপিএম ইত্যাদি প্রথম প্রজন্মের পিসি অপারেটিং সিস্টেমে গ্রাফিক্স ব্যবহারের সুযোগ ছিল, তথাপি সেসব অপারেটিং সিস্টেমে ছিল প্রচুর সীমাবদ্ধতা। তবে ‘মেকিন্টোশ’ বা ‘ম্যাক ও. এস’- এ এসে সেই সুযোগ আরো সম্প্রসারিত হয়। বস্তুত লিজা এবং মেকিন্টোশ-এ প্রদর্শিত ফন্টসমূহও ‘গ্রাফিক্স’। আধুনিককালে পিসি’র উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে ম্যাক ও. এস- এর সেসব ধারণাকে বাস্তবায়িত করা হয়েছে।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, সত্তর দশকে যখন পার্সোনাল কম্পিউটার বা পিসি’ র সূচনা হয় তখনো কম্পিউটারে গ্রাফিক্স উপেক্ষিত ছিল না। বিশেষতঃ সে সময় ‘হোম’ ও ‘স্কুলে’ ব্যবহৃত কম্পিউটারে গ্রাফিক্স এমনকি ‘অডিও- ভিডিওর’ ব্যাপারটিও মাথায় রাখা হয়েছে। তবে সে সময়ে গ্রাফিক্স ব্যবহার করার জন্য একজন প্রোগ্রামারকে কম্পিউটারের প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করতে হতো।

মেকিন্টোশের জন্মের আগে যেসব পিসি স্কুলে বা হোমে ব্যবহৃত হয়েছে তাতেও গ্রাফিক্স ও মাল্টিমিডিয়ার বিষয়টি ছিল। সে সময়েই কিছু কিছু এডুকেশনাল সফটওয়্যার মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। মাল্টিমিডিয়াকে কম্পিউটার চিহ্নিত করেছে টেক্সট ও গ্রাফিক্সের সঙ্গে অডিও-ভিডিওকে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে। তবে নতুন শতকে আমরা যে মাল্টিমিডিয়ার কথা বলছি তার পরিধি অনেক বিস্তৃত। বিশ শতকের সমাপ্তি হয়েছে ‘ডিজিটাল’ শব্দটি দিয়ে। একুশ শতক আমাদের চারপাশের সবকিছুকেই ডিজিটালে রূপান্তরিত করছে।

শেষ কথা হলো গ্রাফিক্স ও মাল্টিমিডিয়ার পৃথক পৃথক দুনিয়া অবশিষ্ট থাকলেও কম্পিউটারকে সামনে রেখে যখন আমরা এই দুটি প্রযুক্তির কথা বলব তখন বুঝতে হবে এর পুরাটাই ডিজিটাল।

মাল্টিমিডিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয়ে আমরা নিশ্চিত করেই বলতে পারি যে, এটির সর্বব্যাপী বিস্তারের জন্য এর প্রয়োগ ক্ষেত্রের পরিধিও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে এই কথাটিও বলা দরকার যে মাল্টিমিডিয়া প্রোগ্রামিং দিনে দিনে একটি আকর্ষণীয় পেশায় পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে উপস্থাপনা, শিক্ষা-বিনোদনমূলক সফটওয়্যার বা ওয়েবপেজে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আমাদের এই খাতে দক্ষ মানুষের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

মাল্টিমিডিয়ার বর্তমান প্রয়োগ : সারা পৃথিবীতে এখন সর্বপ্রথম যে প্রবণতাটি স্পর্শ করছে সেটি হচ্ছে প্রচলিত ধারণা ও প্রচলিত যন্ত্রপাতিকে কম্পিউটার দিয়ে স্থলাভিষিক্ত করা। আসুন দেখা যাক গ্রাফিক্স- মাল্টিমিডিয়ার অবস্থাটি কি?

বর্ণ বা টেক্সট : সারা দুনিয়াতেই টেক্সটের যাবতীয় কাজ এখন কম্পিউটারে হয়ে থাকে। একসময়ে টাইপরাইটার ও ফটোটাইপসেটার দিয়ে যেসব কাজ করা হতো অফিস-আদালত থেকে পেশাদারি মুদ্রণ পর্যন্ত সর্বত্রই এখন কম্পিউটার পৌঁছেছে।

আমাদের দেশেও এ অবস্থাটি প্রায় বিশ্ব পর্যায়ের। মুদ্রণ ও প্রকাশনায় কম্পিউটারের ব্যবহার নিরঙ্কুশ। অফিস আদালতেও এখন কম্পিউটার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

চিত্র বা গ্রাফিক্স : দুনিয়ার সর্বত্রই গ্রাফিক্স তৈরি, সম্পাদনা ইত্যাদি যাবতীয় কাজে কম্পিউটারের ব্যবহার নিরঙ্কুশ।

আমাদের দেশে গ্রাফিক্স ডিজাইন, পেইন্টিং, ড্রইং বা কমার্শিয়াল গ্রাফিক্স নামক চারুকলার যে অংশটি রয়েছে তাতে কম্পিউটারের ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। আমাদের চারুকলার একাডেমিশিয়ানরা এখনো সনাতন পদ্ধতিতেই অভ্যস্ত।

তবে একটি ব্যতিক্রমী এলাকা হচ্ছে মুদ্রণ ও প্রকাশনা। মুদ্রণ প্রকাশনায় গ্রাফিক্স ডিজাইনের ক্ষেত্রে কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু হয় নব্বই দশকে। প্রথমে ফটোশপ দিয়ে স্ক্যান করা ছবি সম্পাদনা দিয়ে এর সূচনা হয়। ক্রমশ ডিজাইন এবং গ্রাফিক্সে কম্পিউটার জায়গা করে নিতে থাকে। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞাপন, সাইনবোর্ড, অ্যানিমেশন, স্থাপত্য ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই কম্পিউটার ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্প্রচার বা ভিডিও অডিওর সঙ্গেও গ্রাফিক্সের ব্যবহার হচ্ছে। ইন্টারএ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার প্রস্তুত হওয়ায় সেখানেও গ্রাফিক্স তার নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করছে।

ইন্টারনেটের ব্যবহার আমাদের দেশে বিস্তৃত হচ্ছে। এটি ক্রমশ এখন শহুরে বিলাসিতা থেকে গ্রামের মানুষেরও প্রয়োজনের বস্তু হয়ে উঠেছে। ওয়েব পেজেও গ্রাফিক্সের ব্যবহার হচ্ছে।

ভিডিও-টিভি : ভিডিও কার্যত এক ধরনের গ্রাফিক্স। একে চলমান গ্রাফিক্স বললে ভালো হয়। বিশ্বজুড়ে ভিডিও একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মিডিয়া। টিভি, হোম ভিডিও, মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার, ওয়েব ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই ভিডিওর ব্যবহার ব্যাপক। বিশ্বজুড়ে ভিডিও এখন এনালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরিত হচ্ছে। ভিডিও চ্যাপ্টারে ডিভি প্রযুক্তির উদ্ভব একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এখন কার্যত এনালগ পর্যায়ে ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা ও সংরক্ষণ করার কোন উপায়ই নেই। এমনকি ভিডিও সম্প্রচারও এনালগ থেকে ডিজিটাল হয়ে যাচ্ছে।

অ্যানিমেশন : অ্যানিমেশনও এক ধরনের গ্রাফিক্স বা চিত্র। তবে সেটি চলমান বা স্থির হতে পারে। এটি দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক হতে পারে। আমাদের দেশে অ্যানিমেশন- এর ব্যবহারও ক্রমশ ব্যাপক হচ্ছে। বিশেষতঃ বিজ্ঞাপন চিত্রে অ্যানিমেশন একটি প্রিয় বিষয়। তবে অ্যানিমেশনে কাজ করার লোকের অভাব রয়েছে। অ্যানিমেশন বিষয়ে বিভ্রান্তিও রয়েছে অনেক। প্রায় সবাই মনে করেন যে থ্রিডি ম্যাক্স জানলেই বুঝি অ্যানিমেশন শেখা হয়ে গেল। আমি এমন অনেকজনকে জানি যারা মনে করেন অ্যানিমেশন নিজেই একক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রযুক্তি। আসলে অ্যানিমেশন কখনোই শুধু একক মিডিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। এর সঙ্গে অডিও, ভিডিও, টেক্সট গ্রাফিক্স ইত্যাদির সম্পর্ক রয়েছে।

সিনেমা : সিনেমা গ্রাফিক্সের আরও একটি রূপ। এর ব্যবহার এখনো ব্যাপক। তবে ভিডিও এবং সিনেমা এর মধ্যে প্রযুক্তিগত পার্থক্য দিনে দিনে কমে আসছে।

শব্দ বা অডিও : শব্দ (Audio/ Sound) বা অডিও রেকর্ড, সম্পাদনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সারা দুনিয়া এখন কম্পিউটারের ওপর নির্ভর করে। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর এনালগ পদ্ধতি এখন বস্তুত সম্পূর্ণ অচল হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে আমার জানামতে ৯৯ পর্যন্ত শুধু একটি ডিজিটাল অডিও স্টুডিও ছিল। মিডিয়া সেন্টার নামের সেই প্রতিষ্ঠানটিতে মেকিন্টোশভিত্তিক প্রোটুলস সফটওয়্যার এবং এর আনুসঙ্গিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং- এর সর্বোৎকৃষ্ট কাজকর্ম করা হচ্ছিল। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা গণ-সাহায্য সংস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এটিও বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন যদি আমরা অডিও স্টুডিওর কথা ভাবি তবে সম্ভবত একটি অ্যানালগ স্টুডিও পাবনা। একটি ছোট পিসি এবং একটি অডিশন সফটওয়্যার দিয়ে সেই স্টুডিও গড়ে তোলা যাচ্ছে। এনালগ স্টুডিও ব্যাপারটা কাগজের শীশার হরফ, ক্যামেরার ফিল্ম বা ট্যাপের মতোই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার : বাংলাদেশে মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার প্রস্তুত হওয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ- ৭১. অবসর, বিশ্বকোষ, নামাজ শিক্ষা ইত্যাদি সফটওয়্যার তৈরির পাশাপাশি একসময়ে কিছু পত্রিকা মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রকাশিত হতো। একসময়ে ঢাকা রেসিং নামে একটি গেমও তৈরি হয়েছিল। তবে ইন্টারঅ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়ার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে। বিজয় শিশু শিক্ষা ও বিজয় প্রাথমিক শিক্ষা। যেহেতু এই কাজটি আমাদের করা সেহেতু একে দৃষ্টান্ত হিসেবে রেখে আমরা এমন কাজ করার ধাপগুলো আলোচনা করতে পারব।

ডিজিটাল প্রকাশনা : আমাদের প্রকাশনা এখনো কাগজ নির্ভর। তবে পুস্তকগুলোর ডিজিটাল সংস্করণ প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে অনেক ডিজিটাল বই এবং বইয়ের অ্যাপ প্রকাশিত হয়েছে। এসব বইয়ের ধারাটি ইন্টারঅ্যাকটিভ বা প্রকৃত মাল্টিমিডিয়া না হলেও এর প্রবণতাটি ইন্টারঅ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়ার দিকে।

[লেখক : ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী]

মঙ্গলবার, ১০ মে ২০২২ , ২৭ বৈশাখ ১৪২৮ ০৭ শাওয়াল ১৪৪৩

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যম

মোস্তাফা জব্বার

তিন॥

কম্পিউটার ও মাল্টিমিডিয়া : মাল্টিমিডিয়া বিষয়ের গভীরে যাবার আগে আমাদের বোঝা দরকার মাল্টিমিডিয়া বলতে কি বোঝায়।

যদি আমরা কম্পিউটারের ভাষায় ব্যাখ্যা করি তবে কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকাতে হবে। আমরা সবাই জানি কম্পিউটারের পর্দায় প্রদর্শিত সব বিষয়কেই পিক্সেল বলা হয়। পিক্সেল প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে। ক. টেক্সট ও খ. গ্রাফিক্স। কম্পিউটারের সিস্টেমে বিদ্যমান ফন্টসমূহকে কোড হিসেবে ব্যবহার করে যেসব বর্ণ (ঞবীঃ) প্রদর্শন করা হয় তার সঙ্গে ‘ফন্টের নির্দিষ্ট নামের’ সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কোন কোন এপ্লিকেশনে এসব ফন্ট সম্পাদনা করা গেলেও (যেমন ইলাস্ট্রেটর) বেশির ভাগ এপ্লিকেশন কম্পিউটারের পর্দায় তাই প্রদর্শন করে, যা ফন্টে ডিজাইন করা হয়ে থাকে। আবার এটিও সত্য যে অপারেটিং সিস্টেমে ফন্ট যুক্ত না থাকলে বা অপারেটিং সিস্টেমে ফন্ট যুক্ত করার ব্যবস্থা না থাকলে যে কোন ফন্ট ব্যবহার করা যায় না। ইন্টারনেটের প্রয়োগ কর্মসূচিগুলোতে ফন্টের ব্যবহার সীমিত থাকে। শুধু ওয়েবসাইটে ফন্ট এমবেড করা থাকে। ব্রাউজার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপারেটিং সিস্টেমেরে নির্দিষ্ট করা ফন্টই ব্যবহার করতে হয়।

প্রকৃতার্থে প্রত্যেকটি বর্ণই একটি ‘গ্রাফিক্স’ অবজেক্ট হলেও কম্পিউটারের ভাষায় একে গ্রাফিক্স বলা হয় না। বলা হয় টেক্সট। একসময়ে এসব টেক্সট এতোই বৈচিত্রহীন ছিল যে সব প্রকারের ডকুমেন্টে শুধু এক ধরনের ফন্টই ব্যবহার করা হতো। এমনকি সাইজ বা স্টাইলও ছিল না সেসব ফন্টে। বস্তুত কম্পিউটারে গ্রাফিক্স মানে হচ্ছে ‘ছবি’। ‘ছবি’ বলতে আমরা কম্পিউটারে তৈরি করা বা জেনারেটেড চিত্র, অংকন, ডিজাইন বা ইলাসট্রেশন করা ছবি, টুডি- থ্রিডি ডিজাইন, এফেক্টস ইত্যাদি ছাড়াও কম্পিউটারে বাইরে থেকে ইনপুট দেয়া ছবি এবং উপরোক্ত বিষয়সমূহকে বোঝায়। একসময়ে গ্রাফিক্সের সংজ্ঞা ছিল কম্পিউটারের ফন্ট ছাড়া যা ব্যবহার করা হয় তার নামই গ্রাফিক্স।

আশির দশকে প্রচলিত আইবিএম পিসি প্রধানত টেক্সটবেজড কম্পিউটার সিস্টেম ছিল। যেহেতু কম্পিউটার গণনা যন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল সেহেতু প্রথম মাত্র ১০টি সংখ্যা ও পরে রোমান ৫২টি বর্ণ এবং চিহ্নসমূহ প্রদর্শন করাই কম্পিউটারের প্রধান লক্ষ্য ছিল। কিন্তু কালক্রমে পিসি ব্যবহারকারীদের চাহিদা বাড়তে থাকে। আবার শুধু ফন্ট নয়Ñ এর সঙ্গে গ্রাফিক্স ব্যবহার করতে চাইতে থাকে। কালক্রমে এখন অডিও-ভিডিও ব্যবহার করার জন্য পিসি ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে।

পিসিতে অপারেটিং সিস্টেম লেভেলে ‘গ্রাফিক্স’ বা ননটেক্সট ইমেজ প্রদর্শনের অনন্য সুযোগ আসে ‘লিজা’ অপারেটিং সিস্টেম থেকে। যদিও প্রো-ডস, ডস, সিপিএম ইত্যাদি প্রথম প্রজন্মের পিসি অপারেটিং সিস্টেমে গ্রাফিক্স ব্যবহারের সুযোগ ছিল, তথাপি সেসব অপারেটিং সিস্টেমে ছিল প্রচুর সীমাবদ্ধতা। তবে ‘মেকিন্টোশ’ বা ‘ম্যাক ও. এস’- এ এসে সেই সুযোগ আরো সম্প্রসারিত হয়। বস্তুত লিজা এবং মেকিন্টোশ-এ প্রদর্শিত ফন্টসমূহও ‘গ্রাফিক্স’। আধুনিককালে পিসি’র উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে ম্যাক ও. এস- এর সেসব ধারণাকে বাস্তবায়িত করা হয়েছে।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, সত্তর দশকে যখন পার্সোনাল কম্পিউটার বা পিসি’ র সূচনা হয় তখনো কম্পিউটারে গ্রাফিক্স উপেক্ষিত ছিল না। বিশেষতঃ সে সময় ‘হোম’ ও ‘স্কুলে’ ব্যবহৃত কম্পিউটারে গ্রাফিক্স এমনকি ‘অডিও- ভিডিওর’ ব্যাপারটিও মাথায় রাখা হয়েছে। তবে সে সময়ে গ্রাফিক্স ব্যবহার করার জন্য একজন প্রোগ্রামারকে কম্পিউটারের প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করতে হতো।

মেকিন্টোশের জন্মের আগে যেসব পিসি স্কুলে বা হোমে ব্যবহৃত হয়েছে তাতেও গ্রাফিক্স ও মাল্টিমিডিয়ার বিষয়টি ছিল। সে সময়েই কিছু কিছু এডুকেশনাল সফটওয়্যার মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। মাল্টিমিডিয়াকে কম্পিউটার চিহ্নিত করেছে টেক্সট ও গ্রাফিক্সের সঙ্গে অডিও-ভিডিওকে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে। তবে নতুন শতকে আমরা যে মাল্টিমিডিয়ার কথা বলছি তার পরিধি অনেক বিস্তৃত। বিশ শতকের সমাপ্তি হয়েছে ‘ডিজিটাল’ শব্দটি দিয়ে। একুশ শতক আমাদের চারপাশের সবকিছুকেই ডিজিটালে রূপান্তরিত করছে।

শেষ কথা হলো গ্রাফিক্স ও মাল্টিমিডিয়ার পৃথক পৃথক দুনিয়া অবশিষ্ট থাকলেও কম্পিউটারকে সামনে রেখে যখন আমরা এই দুটি প্রযুক্তির কথা বলব তখন বুঝতে হবে এর পুরাটাই ডিজিটাল।

মাল্টিমিডিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয়ে আমরা নিশ্চিত করেই বলতে পারি যে, এটির সর্বব্যাপী বিস্তারের জন্য এর প্রয়োগ ক্ষেত্রের পরিধিও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে এই কথাটিও বলা দরকার যে মাল্টিমিডিয়া প্রোগ্রামিং দিনে দিনে একটি আকর্ষণীয় পেশায় পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে উপস্থাপনা, শিক্ষা-বিনোদনমূলক সফটওয়্যার বা ওয়েবপেজে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আমাদের এই খাতে দক্ষ মানুষের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

মাল্টিমিডিয়ার বর্তমান প্রয়োগ : সারা পৃথিবীতে এখন সর্বপ্রথম যে প্রবণতাটি স্পর্শ করছে সেটি হচ্ছে প্রচলিত ধারণা ও প্রচলিত যন্ত্রপাতিকে কম্পিউটার দিয়ে স্থলাভিষিক্ত করা। আসুন দেখা যাক গ্রাফিক্স- মাল্টিমিডিয়ার অবস্থাটি কি?

বর্ণ বা টেক্সট : সারা দুনিয়াতেই টেক্সটের যাবতীয় কাজ এখন কম্পিউটারে হয়ে থাকে। একসময়ে টাইপরাইটার ও ফটোটাইপসেটার দিয়ে যেসব কাজ করা হতো অফিস-আদালত থেকে পেশাদারি মুদ্রণ পর্যন্ত সর্বত্রই এখন কম্পিউটার পৌঁছেছে।

আমাদের দেশেও এ অবস্থাটি প্রায় বিশ্ব পর্যায়ের। মুদ্রণ ও প্রকাশনায় কম্পিউটারের ব্যবহার নিরঙ্কুশ। অফিস আদালতেও এখন কম্পিউটার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

চিত্র বা গ্রাফিক্স : দুনিয়ার সর্বত্রই গ্রাফিক্স তৈরি, সম্পাদনা ইত্যাদি যাবতীয় কাজে কম্পিউটারের ব্যবহার নিরঙ্কুশ।

আমাদের দেশে গ্রাফিক্স ডিজাইন, পেইন্টিং, ড্রইং বা কমার্শিয়াল গ্রাফিক্স নামক চারুকলার যে অংশটি রয়েছে তাতে কম্পিউটারের ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। আমাদের চারুকলার একাডেমিশিয়ানরা এখনো সনাতন পদ্ধতিতেই অভ্যস্ত।

তবে একটি ব্যতিক্রমী এলাকা হচ্ছে মুদ্রণ ও প্রকাশনা। মুদ্রণ প্রকাশনায় গ্রাফিক্স ডিজাইনের ক্ষেত্রে কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু হয় নব্বই দশকে। প্রথমে ফটোশপ দিয়ে স্ক্যান করা ছবি সম্পাদনা দিয়ে এর সূচনা হয়। ক্রমশ ডিজাইন এবং গ্রাফিক্সে কম্পিউটার জায়গা করে নিতে থাকে। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞাপন, সাইনবোর্ড, অ্যানিমেশন, স্থাপত্য ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই কম্পিউটার ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্প্রচার বা ভিডিও অডিওর সঙ্গেও গ্রাফিক্সের ব্যবহার হচ্ছে। ইন্টারএ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার প্রস্তুত হওয়ায় সেখানেও গ্রাফিক্স তার নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করছে।

ইন্টারনেটের ব্যবহার আমাদের দেশে বিস্তৃত হচ্ছে। এটি ক্রমশ এখন শহুরে বিলাসিতা থেকে গ্রামের মানুষেরও প্রয়োজনের বস্তু হয়ে উঠেছে। ওয়েব পেজেও গ্রাফিক্সের ব্যবহার হচ্ছে।

ভিডিও-টিভি : ভিডিও কার্যত এক ধরনের গ্রাফিক্স। একে চলমান গ্রাফিক্স বললে ভালো হয়। বিশ্বজুড়ে ভিডিও একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মিডিয়া। টিভি, হোম ভিডিও, মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার, ওয়েব ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই ভিডিওর ব্যবহার ব্যাপক। বিশ্বজুড়ে ভিডিও এখন এনালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরিত হচ্ছে। ভিডিও চ্যাপ্টারে ডিভি প্রযুক্তির উদ্ভব একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এখন কার্যত এনালগ পর্যায়ে ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা ও সংরক্ষণ করার কোন উপায়ই নেই। এমনকি ভিডিও সম্প্রচারও এনালগ থেকে ডিজিটাল হয়ে যাচ্ছে।

অ্যানিমেশন : অ্যানিমেশনও এক ধরনের গ্রাফিক্স বা চিত্র। তবে সেটি চলমান বা স্থির হতে পারে। এটি দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক হতে পারে। আমাদের দেশে অ্যানিমেশন- এর ব্যবহারও ক্রমশ ব্যাপক হচ্ছে। বিশেষতঃ বিজ্ঞাপন চিত্রে অ্যানিমেশন একটি প্রিয় বিষয়। তবে অ্যানিমেশনে কাজ করার লোকের অভাব রয়েছে। অ্যানিমেশন বিষয়ে বিভ্রান্তিও রয়েছে অনেক। প্রায় সবাই মনে করেন যে থ্রিডি ম্যাক্স জানলেই বুঝি অ্যানিমেশন শেখা হয়ে গেল। আমি এমন অনেকজনকে জানি যারা মনে করেন অ্যানিমেশন নিজেই একক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রযুক্তি। আসলে অ্যানিমেশন কখনোই শুধু একক মিডিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। এর সঙ্গে অডিও, ভিডিও, টেক্সট গ্রাফিক্স ইত্যাদির সম্পর্ক রয়েছে।

সিনেমা : সিনেমা গ্রাফিক্সের আরও একটি রূপ। এর ব্যবহার এখনো ব্যাপক। তবে ভিডিও এবং সিনেমা এর মধ্যে প্রযুক্তিগত পার্থক্য দিনে দিনে কমে আসছে।

শব্দ বা অডিও : শব্দ (Audio/ Sound) বা অডিও রেকর্ড, সম্পাদনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সারা দুনিয়া এখন কম্পিউটারের ওপর নির্ভর করে। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর এনালগ পদ্ধতি এখন বস্তুত সম্পূর্ণ অচল হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে আমার জানামতে ৯৯ পর্যন্ত শুধু একটি ডিজিটাল অডিও স্টুডিও ছিল। মিডিয়া সেন্টার নামের সেই প্রতিষ্ঠানটিতে মেকিন্টোশভিত্তিক প্রোটুলস সফটওয়্যার এবং এর আনুসঙ্গিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং- এর সর্বোৎকৃষ্ট কাজকর্ম করা হচ্ছিল। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা গণ-সাহায্য সংস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এটিও বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন যদি আমরা অডিও স্টুডিওর কথা ভাবি তবে সম্ভবত একটি অ্যানালগ স্টুডিও পাবনা। একটি ছোট পিসি এবং একটি অডিশন সফটওয়্যার দিয়ে সেই স্টুডিও গড়ে তোলা যাচ্ছে। এনালগ স্টুডিও ব্যাপারটা কাগজের শীশার হরফ, ক্যামেরার ফিল্ম বা ট্যাপের মতোই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার : বাংলাদেশে মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার প্রস্তুত হওয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ- ৭১. অবসর, বিশ্বকোষ, নামাজ শিক্ষা ইত্যাদি সফটওয়্যার তৈরির পাশাপাশি একসময়ে কিছু পত্রিকা মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রকাশিত হতো। একসময়ে ঢাকা রেসিং নামে একটি গেমও তৈরি হয়েছিল। তবে ইন্টারঅ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়ার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে। বিজয় শিশু শিক্ষা ও বিজয় প্রাথমিক শিক্ষা। যেহেতু এই কাজটি আমাদের করা সেহেতু একে দৃষ্টান্ত হিসেবে রেখে আমরা এমন কাজ করার ধাপগুলো আলোচনা করতে পারব।

ডিজিটাল প্রকাশনা : আমাদের প্রকাশনা এখনো কাগজ নির্ভর। তবে পুস্তকগুলোর ডিজিটাল সংস্করণ প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে অনেক ডিজিটাল বই এবং বইয়ের অ্যাপ প্রকাশিত হয়েছে। এসব বইয়ের ধারাটি ইন্টারঅ্যাকটিভ বা প্রকৃত মাল্টিমিডিয়া না হলেও এর প্রবণতাটি ইন্টারঅ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়ার দিকে।

[লেখক : ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী]