ফেনী পাসপোর্ট অফিসে বছরে ১০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য : দালালের দৌরাত্ম্য

সাইনবোর্ড দেখে বাইরে থেকে মনে হবে স্টুডিও, কম্পিউটার বা ফটোকপির দোকান, কিন্তু ভেতরে ‘ব্যবসা’ ভিন্ন। ফেনীতে সাইনবোর্ডের আড়ালে এভাবেই চলে পাসপোর্ট নিয়ে জাল-জালিয়াতির কারবার। ভুয়া সিল-প্যাড ব্যবহার করে তৈরি হয় যাবতীয় নকল কাগজপত্র। হাত বাড়ালেই মেলে পাসপোর্ট। শহরের প্রায় ৫০টি ট্রাভেল এজেন্ট ও খোদ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনের দোকানঘর ঘিরেই তৎপর পাসপোর্ট দালাল চক্রের সদস্যরা।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। জানা যায়, ফেনীর প্রায় ৫০ জন চিহ্নিত দালাল নিজেদের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের রেজিস্ট্রার্ড এজেন্ট বলে পরিচয় দেয়। বেশির ভাগ পাসপোর্ট প্রত্যাশী ই-পাসপোর্টের ফরম পূরণ করতে গিয়ে এই দালালদের ফাঁদে পড়ছেন। ফরম পূরণ শেষ হলেই দ্রুততম সময়ে পাসপোর্ট করার অফার দেয় তারা। চুক্তি না হলে বিড়ম্বনার শিকার হবেন বলে জানায় দাললরা। পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের জন্য টাকার অংক ভিন্ন। যেমন- সিরিয়াল ছাড়া আবেদন জমা করতে ৫ থেকে ১৫ হাজার, পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়া পাসপোর্ট পেতে ১৫ থেকে ২০ হাজার, নামের বানান সংশোধনে সর্বনিম্নœ ৩০ হাজার এবং জন্মতারিখ সংশোধন ও নামপরিবর্তন বা ভুয়া নাম-ঠিকানায় জাল পাসপোর্ট তৈরি, আঙুলের ছাপ জালিয়াতি (মিস ফিঙ্গারিং) ইত্যাদি কাজ বাবদ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত টাকা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে শুধুমাত্র দালালদের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক দালাল জানায়, অফিসে তাদের লোক আছে। সমস্যা সংক্রান্ত শুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে তারা ফোন দেয়। সবুজ সংকেত পাওয়ার পর তারা কাজ হাতে নেয়। ফেনী পাসপোর্ট অফিসের দালালদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দানের বিষয়ে কথা হয় শহরের একাদিক ট্রাভেল এজেন্টের সাথে। একজন বলেন, অনলাইনে পাসপোর্টের ফরম পূরণ করা হয়। ফর্মের ওপর ৫০টি এজেন্টের সিল দেওয়া হয়। সিল থাকলে তারা বলে দিতে পারে এটি তাদের তালিকার সিল। প্রতিদিন বিকেলে আনসার সদস্য করিম তালিকা ধরে টাকা আদায় করে নিয়ে যায়। করিম টাকা উত্তোলন করে অফিসের দায়িত্বরত হিসাবরক্ষক আবুল মনসুর, অফিস সহকারী মাফতুল হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি কন্টোলার অপারেটর মো. সাইফুল লতিফকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তাদের মাধ্যমে টাকা অফিসের কর্মকর্তাদের যোগ্যতা অনুসারে টাকার হিস্যা অনুপাতে বণ্টন করা হয়।

গত মার্চ মাসে ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে হয়রানির শিকার হয়ে একদল গ্রাহক ফেনী পৌরসভার মেয়র ও ফেনী পৌর আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজীর কাছে অভিযোগ করলে তিনি তাৎক্ষণিক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে অভিযোগের সত্যতা পান। এ সময় ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অপেক্ষাকৃত শত শত গ্রাহক মেয়রকে ঘিরে রেখে তাদের হয়রানির কথা জানান। এ বিষয়ে ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা সাধন সাহা বলেন, দালাল নির্মূলে অফিসের পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য জেলা পুলিশের সহায়তায় মাঝে মধ্যেই ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো হয়। আগের তুলনায় বর্তমানে কিছুটা হলেও দালালদের দৌরাত্ম কমেছে। নামপ্রকাশ না করার শর্তে অফিস সূত্র বলছে, বর্তমানে ফেনীর পুরো সিন্ডিকেট নেটওয়ার্কটির দায়িত্ব পালন করছেন ফেনী অফিসের হিসাবরক্ষক আবুল মনসুর, অফিস সহকারী মাফতুল হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি কন্টোলার অপারেটর মো. সাইফুল লতিফ। কয়েক লাখ মানুষকে অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এই চক্রটি প্রতারিত করে আসছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ফেনী পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক সাধন সাহা ঘুষ বাণিজ্যর কথা অস্বীকার করলেও দালালদের দৌরাত্ম্যের কথা শিকার করে বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেছি। আশা করি শীঘ্রই আমরা এর কার্যকর সমাধানে যেতে পারব।

বুধবার, ১১ মে ২০২২ , ২৮ বৈশাখ ১৪২৮ ০৮ শাওয়াল ১৪৪৩

ফেনী পাসপোর্ট অফিসে বছরে ১০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য : দালালের দৌরাত্ম্য

image

সাইনবোর্ড দেখে বাইরে থেকে মনে হবে স্টুডিও, কম্পিউটার বা ফটোকপির দোকান, কিন্তু ভেতরে ‘ব্যবসা’ ভিন্ন। ফেনীতে সাইনবোর্ডের আড়ালে এভাবেই চলে পাসপোর্ট নিয়ে জাল-জালিয়াতির কারবার। ভুয়া সিল-প্যাড ব্যবহার করে তৈরি হয় যাবতীয় নকল কাগজপত্র। হাত বাড়ালেই মেলে পাসপোর্ট। শহরের প্রায় ৫০টি ট্রাভেল এজেন্ট ও খোদ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনের দোকানঘর ঘিরেই তৎপর পাসপোর্ট দালাল চক্রের সদস্যরা।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। জানা যায়, ফেনীর প্রায় ৫০ জন চিহ্নিত দালাল নিজেদের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের রেজিস্ট্রার্ড এজেন্ট বলে পরিচয় দেয়। বেশির ভাগ পাসপোর্ট প্রত্যাশী ই-পাসপোর্টের ফরম পূরণ করতে গিয়ে এই দালালদের ফাঁদে পড়ছেন। ফরম পূরণ শেষ হলেই দ্রুততম সময়ে পাসপোর্ট করার অফার দেয় তারা। চুক্তি না হলে বিড়ম্বনার শিকার হবেন বলে জানায় দাললরা। পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের জন্য টাকার অংক ভিন্ন। যেমন- সিরিয়াল ছাড়া আবেদন জমা করতে ৫ থেকে ১৫ হাজার, পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়া পাসপোর্ট পেতে ১৫ থেকে ২০ হাজার, নামের বানান সংশোধনে সর্বনিম্নœ ৩০ হাজার এবং জন্মতারিখ সংশোধন ও নামপরিবর্তন বা ভুয়া নাম-ঠিকানায় জাল পাসপোর্ট তৈরি, আঙুলের ছাপ জালিয়াতি (মিস ফিঙ্গারিং) ইত্যাদি কাজ বাবদ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত টাকা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে শুধুমাত্র দালালদের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক দালাল জানায়, অফিসে তাদের লোক আছে। সমস্যা সংক্রান্ত শুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে তারা ফোন দেয়। সবুজ সংকেত পাওয়ার পর তারা কাজ হাতে নেয়। ফেনী পাসপোর্ট অফিসের দালালদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দানের বিষয়ে কথা হয় শহরের একাদিক ট্রাভেল এজেন্টের সাথে। একজন বলেন, অনলাইনে পাসপোর্টের ফরম পূরণ করা হয়। ফর্মের ওপর ৫০টি এজেন্টের সিল দেওয়া হয়। সিল থাকলে তারা বলে দিতে পারে এটি তাদের তালিকার সিল। প্রতিদিন বিকেলে আনসার সদস্য করিম তালিকা ধরে টাকা আদায় করে নিয়ে যায়। করিম টাকা উত্তোলন করে অফিসের দায়িত্বরত হিসাবরক্ষক আবুল মনসুর, অফিস সহকারী মাফতুল হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি কন্টোলার অপারেটর মো. সাইফুল লতিফকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তাদের মাধ্যমে টাকা অফিসের কর্মকর্তাদের যোগ্যতা অনুসারে টাকার হিস্যা অনুপাতে বণ্টন করা হয়।

গত মার্চ মাসে ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে হয়রানির শিকার হয়ে একদল গ্রাহক ফেনী পৌরসভার মেয়র ও ফেনী পৌর আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজীর কাছে অভিযোগ করলে তিনি তাৎক্ষণিক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে অভিযোগের সত্যতা পান। এ সময় ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অপেক্ষাকৃত শত শত গ্রাহক মেয়রকে ঘিরে রেখে তাদের হয়রানির কথা জানান। এ বিষয়ে ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা সাধন সাহা বলেন, দালাল নির্মূলে অফিসের পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য জেলা পুলিশের সহায়তায় মাঝে মধ্যেই ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো হয়। আগের তুলনায় বর্তমানে কিছুটা হলেও দালালদের দৌরাত্ম কমেছে। নামপ্রকাশ না করার শর্তে অফিস সূত্র বলছে, বর্তমানে ফেনীর পুরো সিন্ডিকেট নেটওয়ার্কটির দায়িত্ব পালন করছেন ফেনী অফিসের হিসাবরক্ষক আবুল মনসুর, অফিস সহকারী মাফতুল হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি কন্টোলার অপারেটর মো. সাইফুল লতিফ। কয়েক লাখ মানুষকে অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এই চক্রটি প্রতারিত করে আসছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ফেনী পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক সাধন সাহা ঘুষ বাণিজ্যর কথা অস্বীকার করলেও দালালদের দৌরাত্ম্যের কথা শিকার করে বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেছি। আশা করি শীঘ্রই আমরা এর কার্যকর সমাধানে যেতে পারব।