খুলনা মহানগরে অবৈধ ইজিবাইকে দুর্বিষহ জীবন

খুলনা নগরীতে দীর্ঘদিন নগর পরিবহন না থাকায় মাহেন্দ্র-সিএনজি চালক সিন্ডিকেটের দাপট চলছে। তাদের অদক্ষতা ও অসতর্কতার কারণে ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। কিছুদূর পরপরই গড়ে উঠেছে ইজিবাইক ও অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড। ফলে নগরীর অধিকাংশ সড়কেই দেখা দিচ্ছে তীব্র যানজট।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর খুলনা নগরীতে ফুলতলা থেকে রূপসা পর্যন্ত প্রায় ৫৫টি নগর পরিবহন সার্ভিস ছিল। প্রতি ঘণ্টায় ৪-৫টা বাস নগরীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যেত। পাঁচ শতাধিক কর্মী সেখানে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর নগর পরিবহন সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়।

২০১৬ সালে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে বিআরটিসির পাঁচটি দ্বিতল বাস সার্ভিস শুরু হলেও বেশিদিন তা টেকেনি। এরপর ২০১৯ সালে খুলনা মোটর বাস মালিক সমিতির উদ্যোগে চারটি নগর পরিবহন চালু হয়। কিন্তু মাহেন্দ্র ও সিএনজির সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রভাবশালীদের কারণে একপ্রকার জিম্মি হয়ে করোনার আগেই সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

সরকারি বিএল কলেজের শিক্ষার্থী রিয়াদ হোসেন জানান, ফুলতলা থেকে দৌলতপুরে ৩০-৪০ টাকা মাহেন্দ্র ও সিএনজি ভাড়া। কিন্তু নগর পরিবহণে ১০ টাকায় আসা যেত। নগর পরিবহন না থাকায় জিম্মি হয়ে পড়েছি আমরা।

ব্যাংক কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, মাহেন্দ্র ও সিএনজির ভাড়ার যে ঊর্ধ্বগতি তাতে সাধারণ মানুষের খুবই ভোগান্তি হচ্ছে। একটু বৃষ্টি এবং রাত বেশি হলে ভাড়া বাড়িয়ে দেয়া হয়। নগর পরিবহন চালু থাকলে এ সমস্যা থাকত না।

খুলনা মোটর বাস মালিক সমিতির সভাপতি শিবলী বিশ্বাস জানান, মাহেন্দ্র ও সিএনজির কারণে নগর পরিবহণ চালানো সম্ভব নয়। এর পেছনে অনেক রাজনৈতিক বিষয়ও আছে। যা গণমাধ্যমে বলা সম্ভব নয়। জাতীয় সংসদ ও মেয়র নির্বাচনের সময় অনেকে নগর পরিবহণ সার্ভিস চালানোর আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তা রক্ষা করা হয়নি।

শিবলী আরও বলেন, ২০১৯ সালে আমরা কয়েকজন মালিক চারটি নগর পরিবহণ সার্ভিস নগরীতে নামিয়েছিলাম। কিন্তু নানা কারণে সেটা চালানো সম্ভব হয়নি। তবে মেয়র ও সংসদ সদসদের সহযোগিতা পেলে বাস মালিক সমিতি আবার নগর পরিবহণ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেবে। বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন নগরে গণপরিবহণ চলছে। খুলনা নগরীতেও এটি চালু ছিল। কিন্তু নানা কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। মাহেন্দ্র ও সিএনজির ভাড়া অনেক বেশি। যা সবার কাছে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

আশরাফ উজ জামান আরও বলেন, খুলনায় ছোট পরিসরে ২০-২৫টি নগর পরিবহন চালু করা প্রয়োজন। এগুলো রূপসা থেকে দৌলতপুর হয়ে ফুলতলা, রূপসা থেকে বিআইডিসি রোড হয়ে ফুলতলা এবং রূপসা সেতু থেকে বাইপাস সড়ক হয়ে ফুলতলা চলাচল করতে পারে। এগুলো সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে নগরবাসীর ভোগান্তি লাঘব হবে। জনউদ্যোগ খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা জানান, নগর পরিবহণ না থাকায় নাগরিকরা পরিবহন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নগর পরিবহন সার্ভিস থাকলে নিম্নœ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা কম খরচে গন্তব্যে যেতে পারত। বিষয়টি খুলনা সিটি মেয়রকে একাধিকবার বলা হয়েছে।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, আপাতত নগরীর রাস্তা সংস্কার করা জরুরী। এখনই নগর পরিবহণ সার্ভিস চালু করার সম্ভাবনা নেই। এ ব্যাপারে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এদিকে নাগরিক নেতারা বলছেন, নগর জীবন সহজ করার জন্য খুলনা নগরে ইজিবাইক নামানো হলেও এখন দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে নগরীতে বৈধ ইজিবাইকের তুলনায় অবৈধই বেশি। এতে প্রতিনিয়ত যানজটে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন নগরবাসী। অদক্ষ চালকের কারণে মাঝে মধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা।

বুধবার, ১১ মে ২০২২ , ২৮ বৈশাখ ১৪২৮ ০৮ শাওয়াল ১৪৪৩

খুলনা মহানগরে অবৈধ ইজিবাইকে দুর্বিষহ জীবন

image

খুলনা নগরীতে দীর্ঘদিন নগর পরিবহন না থাকায় মাহেন্দ্র-সিএনজি চালক সিন্ডিকেটের দাপট চলছে। তাদের অদক্ষতা ও অসতর্কতার কারণে ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। কিছুদূর পরপরই গড়ে উঠেছে ইজিবাইক ও অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড। ফলে নগরীর অধিকাংশ সড়কেই দেখা দিচ্ছে তীব্র যানজট।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর খুলনা নগরীতে ফুলতলা থেকে রূপসা পর্যন্ত প্রায় ৫৫টি নগর পরিবহন সার্ভিস ছিল। প্রতি ঘণ্টায় ৪-৫টা বাস নগরীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যেত। পাঁচ শতাধিক কর্মী সেখানে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর নগর পরিবহন সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়।

২০১৬ সালে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে বিআরটিসির পাঁচটি দ্বিতল বাস সার্ভিস শুরু হলেও বেশিদিন তা টেকেনি। এরপর ২০১৯ সালে খুলনা মোটর বাস মালিক সমিতির উদ্যোগে চারটি নগর পরিবহন চালু হয়। কিন্তু মাহেন্দ্র ও সিএনজির সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রভাবশালীদের কারণে একপ্রকার জিম্মি হয়ে করোনার আগেই সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

সরকারি বিএল কলেজের শিক্ষার্থী রিয়াদ হোসেন জানান, ফুলতলা থেকে দৌলতপুরে ৩০-৪০ টাকা মাহেন্দ্র ও সিএনজি ভাড়া। কিন্তু নগর পরিবহণে ১০ টাকায় আসা যেত। নগর পরিবহন না থাকায় জিম্মি হয়ে পড়েছি আমরা।

ব্যাংক কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, মাহেন্দ্র ও সিএনজির ভাড়ার যে ঊর্ধ্বগতি তাতে সাধারণ মানুষের খুবই ভোগান্তি হচ্ছে। একটু বৃষ্টি এবং রাত বেশি হলে ভাড়া বাড়িয়ে দেয়া হয়। নগর পরিবহন চালু থাকলে এ সমস্যা থাকত না।

খুলনা মোটর বাস মালিক সমিতির সভাপতি শিবলী বিশ্বাস জানান, মাহেন্দ্র ও সিএনজির কারণে নগর পরিবহণ চালানো সম্ভব নয়। এর পেছনে অনেক রাজনৈতিক বিষয়ও আছে। যা গণমাধ্যমে বলা সম্ভব নয়। জাতীয় সংসদ ও মেয়র নির্বাচনের সময় অনেকে নগর পরিবহণ সার্ভিস চালানোর আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তা রক্ষা করা হয়নি।

শিবলী আরও বলেন, ২০১৯ সালে আমরা কয়েকজন মালিক চারটি নগর পরিবহণ সার্ভিস নগরীতে নামিয়েছিলাম। কিন্তু নানা কারণে সেটা চালানো সম্ভব হয়নি। তবে মেয়র ও সংসদ সদসদের সহযোগিতা পেলে বাস মালিক সমিতি আবার নগর পরিবহণ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেবে। বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন নগরে গণপরিবহণ চলছে। খুলনা নগরীতেও এটি চালু ছিল। কিন্তু নানা কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। মাহেন্দ্র ও সিএনজির ভাড়া অনেক বেশি। যা সবার কাছে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

আশরাফ উজ জামান আরও বলেন, খুলনায় ছোট পরিসরে ২০-২৫টি নগর পরিবহন চালু করা প্রয়োজন। এগুলো রূপসা থেকে দৌলতপুর হয়ে ফুলতলা, রূপসা থেকে বিআইডিসি রোড হয়ে ফুলতলা এবং রূপসা সেতু থেকে বাইপাস সড়ক হয়ে ফুলতলা চলাচল করতে পারে। এগুলো সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে নগরবাসীর ভোগান্তি লাঘব হবে। জনউদ্যোগ খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা জানান, নগর পরিবহণ না থাকায় নাগরিকরা পরিবহন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নগর পরিবহন সার্ভিস থাকলে নিম্নœ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা কম খরচে গন্তব্যে যেতে পারত। বিষয়টি খুলনা সিটি মেয়রকে একাধিকবার বলা হয়েছে।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, আপাতত নগরীর রাস্তা সংস্কার করা জরুরী। এখনই নগর পরিবহণ সার্ভিস চালু করার সম্ভাবনা নেই। এ ব্যাপারে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এদিকে নাগরিক নেতারা বলছেন, নগর জীবন সহজ করার জন্য খুলনা নগরে ইজিবাইক নামানো হলেও এখন দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে নগরীতে বৈধ ইজিবাইকের তুলনায় অবৈধই বেশি। এতে প্রতিনিয়ত যানজটে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন নগরবাসী। অদক্ষ চালকের কারণে মাঝে মধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা।