স্কুলছাত্র ইসরাফিল হত্যা : তিন বছর পর রহস্য উদ্ঘাটন

তিন আসামি অভিযুুক্ত, শীঘ্রই চার্জশিট

তিন বছর পর দশম শ্রেণীর ছাত্র ইসরাফিল হাওলাদার নয়ন হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। তিন আসামিকে অভিযুক্ত করে শীঘ্রই এ মামলার চার্জশিট দেয়া হবে। খুনিরা স্কুলছাত্রের পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল।

পরিবার সন্তানকে বাঁচাতে ধারকর্জ করে ১০ লাখ টাকা দিতে চেয়েও ছেলেকে ফেরত পায়নি। খুনিরা ওই ছাত্রের লাশ বস্তায় ঢুকিয়ে রশি দিয়ে বেঁধে বরিশালের বাবুগঞ্জে সন্ধ্যা নদীতে ফেলে দেয়।

দীর্ঘ তিন বছর ধরে টানা তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হত্যাকা-ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। মুক্তিপণ ছাড়াও খুনিদের নেশা করার সময় ওই স্কুলছাত্র দেখে ফেলে তাদের বাবার কাছে অভিযোগ করায় ওই ছাত্রকে ডেকে নিয়ে জিম্মি করে প্রথমে মুক্তিপণ ও পরে হত্যা করার কথা স্বীকার করেছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের বরিশাল জেলার সাব-ইন্সপেক্টর মো. গোলাম কাওসার জানান, মামলাটির তদন্ত শেষ। তিন আসামিকে অভিযুক্ত করে শীঘ্রই আদালতে চার্জশিট দেয়া হবে। এ লক্ষ্যে প্রস্তুতি চলছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাওয়ার পর চার্জশিট দেয়া হবে বলে তিনি সংবাদকে নিশ্চিত করেছেন।

পিবিআই প্রধান কার্যালয় ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৯ সালে ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে স্কুল ছাত্র ইসরাফিল হাওলাদার নয়ন বরিশালের বাবুগঞ্জে দক্ষিণ রমজানকাঠি এলাকায় তার দাদা দাদি ও ছোট বোনের সঙ্গে সবজি খেত থেকে লাল শাক তুলতে যায়। ওই সময় নয়নকে দূর থেকে এক ছেলে ডেকে নিয়ে যায়। রাত ৯টা পর্যন্ত সে আর বাড়ি ফেরেনি। এরপর পরিবারের সদস্যরা তাকে নানাভাবে খোঁজেও পায়নি। রাত ১০টার দিকে নয়নের কাছে থাকা মোবাইল ফোন থেকে পরিবারকে জানানো হয়, তোমার ছেলে আমাদের কাছে আছে। ২০ লাখ টাকা দিলে ছেলেকে ফেরত দেয়া হবে। বাদী ধারকর্জ করে ১০ লাখ টাকা দিতে রাজি হয়েছে। টাকা নিয়ে বরিশালে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়। কিন্তু ২৮ এপ্রিল সকাল ৭টার দিকে পরিবারের স্বজনরা জানতে পারে তাদের সন্তান নয়নকে

কে বা কারা খুন করেছে। নয়নের লাশ সন্ধ্যা নদীর উত্তর পাড়ে দেখা গেছে।

এরপর বাবুগঞ্জ থানা পুলিশ গিয়ে নদী থেকে লাশ উদ্ধার করেছে। লাশের কোমরের ওপরের অংশে পাটের বস্তার মধ্যে ছিল। ভিতরে কয়েকটি ইট ছিল। আর বস্তাটি রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। তার শরীরের ধারালো ও ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল।

এ নিয়ে বরিশাল বাবুগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তদন্ত করে ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে প্রধান অভিযুক্ত আশিক আবদুল্লাহ, আমিনুল ইসলাম ও এমদাদুল হক মুমিনকে গ্রেপ্তার করেছে।

মামলার গোপন ও প্রকাশ্যে তদন্ত, গুপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও আসামিদের স্বীকারোক্তি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত আসামি আশিক বিল্লাহ, এমদাদুল হক মুমিন, ও আমিনুল ইসলাম ওরফে আমিন একত্রে এলাকায় নেশা করত। অভিযুক্ত আশিক আবদুল্লাকে ড্যান্ডি গামের নেশা (টলুইন মিশ্রিত বিষাক্ত নেশা) করতে দেখে ফেলে স্কুলছাত্র নয়ন। সে নেশা করার বিষয়টি আশিক আবদুল্লাহর বাবার কাছে বলে দেয়। তখন আবদুল্লাহকে তার বাবা মারধর করে। এরপর আবদুল্লাহ ক্ষিপ্ত হয়ে নয়নকে উচিত শিক্ষা দেয়ার পরিকল্পনা করে।

পরিকল্পনার পর তার সঙ্গে আরও দুজনকে (শিশু) সঙ্গে নিয়ে নয়নকে ডেকে নেয়। এরপর কোমল পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেয়। ওই ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত কোমল পানীয় খেয়ে নয়ন অচেতন হয়ে পড়লে তাকে একটি পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে তিন অভিযুক্ত মিলে নয়নের হাত-পা ও মুখ বেঁধে একটি ডোবায় ফেলে দেয়। রাতে আবার তাকে ডোবা থেকে তুলে নেয়। তার জ্ঞান ফিরলে তাকে রাতে এলাকার সন্ধ্যা নদীর কাছে একটি পাটখেতে নিয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে অভিযুক্ত আশিক তার কাছে থাকা হাতুড়ে দিয়ে নয়নের মাথায় আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আশিক। এরপর অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম আমিন তার কাছে থাকা ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি নয়নের গলায় ও মাথায় আঘাত করে। এক পর্যায়ে তারা নয়নের হাত-পা ও বুক চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করে।

হত্যাকা-ের পর আশিকের হাতে থাকা ছুরিটি সন্ধ্যা নদীতে ফেলে দেয়। এরপর বস্তা ও রশি সংগ্রহ করে নয়নের লাশ বস্তায় ভরে নদীর পাড়ে ফেলে দেয়। সেদিন নদীতে ভাটা থাকার কারণে নয়নের লাশ ভোর বেলায় সন্ধ্যা নদীর পাড়ে পাওয়া যায়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তারকৃত আসামি আশিক আবদুল্লাহ, আমিনুল ইসলাম আমিন (১৭), এমদাদুল হক মুমিন (১৭) পরস্পর পরিকল্পিতভাবে স্কুলছাত্র নয়নকে হত্যার উদ্দেশে ডেকে নিয়ে মাথায় আঘাত, গলায় ধারালো ও ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করে। অভিযুক্ত তিনজনের বিরুদ্ধে অপরাধ করার প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা গোলাম কাওসার জানান, গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা স্কুলছাত্র নয়নকে হত্যা ও লাশ গুম করার উদ্দেশে নদীতে ফেলে দিয়েছে। গত তিন বছর ধরে মামলাটি একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করেছে। সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা গোলাম কাওসার অনুসন্ধান চালিয়ে রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। তদন্ত তদারকি করেছেন, বরিশাল জেলার পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির।

বুধবার, ১১ মে ২০২২ , ২৮ বৈশাখ ১৪২৮ ০৮ শাওয়াল ১৪৪৩

স্কুলছাত্র ইসরাফিল হত্যা : তিন বছর পর রহস্য উদ্ঘাটন

তিন আসামি অভিযুুক্ত, শীঘ্রই চার্জশিট

তিন বছর পর দশম শ্রেণীর ছাত্র ইসরাফিল হাওলাদার নয়ন হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। তিন আসামিকে অভিযুক্ত করে শীঘ্রই এ মামলার চার্জশিট দেয়া হবে। খুনিরা স্কুলছাত্রের পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল।

পরিবার সন্তানকে বাঁচাতে ধারকর্জ করে ১০ লাখ টাকা দিতে চেয়েও ছেলেকে ফেরত পায়নি। খুনিরা ওই ছাত্রের লাশ বস্তায় ঢুকিয়ে রশি দিয়ে বেঁধে বরিশালের বাবুগঞ্জে সন্ধ্যা নদীতে ফেলে দেয়।

দীর্ঘ তিন বছর ধরে টানা তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হত্যাকা-ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। মুক্তিপণ ছাড়াও খুনিদের নেশা করার সময় ওই স্কুলছাত্র দেখে ফেলে তাদের বাবার কাছে অভিযোগ করায় ওই ছাত্রকে ডেকে নিয়ে জিম্মি করে প্রথমে মুক্তিপণ ও পরে হত্যা করার কথা স্বীকার করেছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের বরিশাল জেলার সাব-ইন্সপেক্টর মো. গোলাম কাওসার জানান, মামলাটির তদন্ত শেষ। তিন আসামিকে অভিযুক্ত করে শীঘ্রই আদালতে চার্জশিট দেয়া হবে। এ লক্ষ্যে প্রস্তুতি চলছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাওয়ার পর চার্জশিট দেয়া হবে বলে তিনি সংবাদকে নিশ্চিত করেছেন।

পিবিআই প্রধান কার্যালয় ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৯ সালে ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে স্কুল ছাত্র ইসরাফিল হাওলাদার নয়ন বরিশালের বাবুগঞ্জে দক্ষিণ রমজানকাঠি এলাকায় তার দাদা দাদি ও ছোট বোনের সঙ্গে সবজি খেত থেকে লাল শাক তুলতে যায়। ওই সময় নয়নকে দূর থেকে এক ছেলে ডেকে নিয়ে যায়। রাত ৯টা পর্যন্ত সে আর বাড়ি ফেরেনি। এরপর পরিবারের সদস্যরা তাকে নানাভাবে খোঁজেও পায়নি। রাত ১০টার দিকে নয়নের কাছে থাকা মোবাইল ফোন থেকে পরিবারকে জানানো হয়, তোমার ছেলে আমাদের কাছে আছে। ২০ লাখ টাকা দিলে ছেলেকে ফেরত দেয়া হবে। বাদী ধারকর্জ করে ১০ লাখ টাকা দিতে রাজি হয়েছে। টাকা নিয়ে বরিশালে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়। কিন্তু ২৮ এপ্রিল সকাল ৭টার দিকে পরিবারের স্বজনরা জানতে পারে তাদের সন্তান নয়নকে

কে বা কারা খুন করেছে। নয়নের লাশ সন্ধ্যা নদীর উত্তর পাড়ে দেখা গেছে।

এরপর বাবুগঞ্জ থানা পুলিশ গিয়ে নদী থেকে লাশ উদ্ধার করেছে। লাশের কোমরের ওপরের অংশে পাটের বস্তার মধ্যে ছিল। ভিতরে কয়েকটি ইট ছিল। আর বস্তাটি রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। তার শরীরের ধারালো ও ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল।

এ নিয়ে বরিশাল বাবুগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তদন্ত করে ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে প্রধান অভিযুক্ত আশিক আবদুল্লাহ, আমিনুল ইসলাম ও এমদাদুল হক মুমিনকে গ্রেপ্তার করেছে।

মামলার গোপন ও প্রকাশ্যে তদন্ত, গুপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও আসামিদের স্বীকারোক্তি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত আসামি আশিক বিল্লাহ, এমদাদুল হক মুমিন, ও আমিনুল ইসলাম ওরফে আমিন একত্রে এলাকায় নেশা করত। অভিযুক্ত আশিক আবদুল্লাকে ড্যান্ডি গামের নেশা (টলুইন মিশ্রিত বিষাক্ত নেশা) করতে দেখে ফেলে স্কুলছাত্র নয়ন। সে নেশা করার বিষয়টি আশিক আবদুল্লাহর বাবার কাছে বলে দেয়। তখন আবদুল্লাহকে তার বাবা মারধর করে। এরপর আবদুল্লাহ ক্ষিপ্ত হয়ে নয়নকে উচিত শিক্ষা দেয়ার পরিকল্পনা করে।

পরিকল্পনার পর তার সঙ্গে আরও দুজনকে (শিশু) সঙ্গে নিয়ে নয়নকে ডেকে নেয়। এরপর কোমল পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেয়। ওই ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত কোমল পানীয় খেয়ে নয়ন অচেতন হয়ে পড়লে তাকে একটি পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে তিন অভিযুক্ত মিলে নয়নের হাত-পা ও মুখ বেঁধে একটি ডোবায় ফেলে দেয়। রাতে আবার তাকে ডোবা থেকে তুলে নেয়। তার জ্ঞান ফিরলে তাকে রাতে এলাকার সন্ধ্যা নদীর কাছে একটি পাটখেতে নিয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে অভিযুক্ত আশিক তার কাছে থাকা হাতুড়ে দিয়ে নয়নের মাথায় আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আশিক। এরপর অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম আমিন তার কাছে থাকা ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি নয়নের গলায় ও মাথায় আঘাত করে। এক পর্যায়ে তারা নয়নের হাত-পা ও বুক চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করে।

হত্যাকা-ের পর আশিকের হাতে থাকা ছুরিটি সন্ধ্যা নদীতে ফেলে দেয়। এরপর বস্তা ও রশি সংগ্রহ করে নয়নের লাশ বস্তায় ভরে নদীর পাড়ে ফেলে দেয়। সেদিন নদীতে ভাটা থাকার কারণে নয়নের লাশ ভোর বেলায় সন্ধ্যা নদীর পাড়ে পাওয়া যায়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তারকৃত আসামি আশিক আবদুল্লাহ, আমিনুল ইসলাম আমিন (১৭), এমদাদুল হক মুমিন (১৭) পরস্পর পরিকল্পিতভাবে স্কুলছাত্র নয়নকে হত্যার উদ্দেশে ডেকে নিয়ে মাথায় আঘাত, গলায় ধারালো ও ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করে। অভিযুক্ত তিনজনের বিরুদ্ধে অপরাধ করার প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা গোলাম কাওসার জানান, গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা স্কুলছাত্র নয়নকে হত্যা ও লাশ গুম করার উদ্দেশে নদীতে ফেলে দিয়েছে। গত তিন বছর ধরে মামলাটি একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করেছে। সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা গোলাম কাওসার অনুসন্ধান চালিয়ে রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। তদন্ত তদারকি করেছেন, বরিশাল জেলার পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির।