বিদেশ সফর, কম জরুরি প্রকল্পে লাগাম

অপ্রয়োজনীয় আমদানি আরও কঠোর করা হয়েছে ব্যয় সাশ্রয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে এই সিদ্ধান্ত

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এবার সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে লাগাম টানতে যাচ্ছে সরকার। গতকাল সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। শুধু তাই নয়, বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে আমদানি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো এখন বন্ধ রেখে পরে শুরু করার জন্য বলা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে অর্থমন্ত্রী গতকাল যেসব উদ্যোগের কথা বলেছেন, সবগুলোই ভালো। এতে অর্থনীতি দীর্ঘ মেয়াদে শক্তিশালী হবে।

অহেতুক ব্যয় কমাতে উদ্যোগ নেয়া হলেও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বেড়ে গেছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘যে সফরগুলো আগে অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেগুলোই যাচ্ছে। নতুন বিদেশ সফর অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন, যদি কোন প্রয়োজন না থাকে, তাহলে বিদেশ সফর আর নয়। যদি কোন বিশেষ প্রয়োজন হয় তাহলে তারা যাবেন, অন্যথায় কেউ যাবেন না।’

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের প্রভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের যে সার্বিক অবস্থা সেটি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। সুসময়ের জন্য, এক্সটারনাল ভার্নাবিলিটিগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।’

এছাড়া ডলারের ওপর চাপ কমাতে সম্প্রতি আমদানি নিরুৎসাহিত করতে পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিলাসী পণ্যে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম অর্থ জমা রাখতে হবে। আমদানি নিরুৎসাহিত করতে এর আগে গত ১১ এপ্রিল ব্যাংকগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন ভোগ্যপণ্যের জন্য ঋণপত্র মার্জিন বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এতেও সুফল আসেনি। উল্টো আমদানি আরও বেড়ে যায়।

আমদানি বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দেয়। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুন-মার্চ) চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪০৭ কোটি ডলার। ঘাটতির এই পরিমাণ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ গুণ বেশি। গত অর্থবছর ৯ মাসে ঘাটতি ছিল ৫৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আর গত ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৪৫৮ কোটি ডলার। তার আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৫৪৪ কোটি ডলার।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তিনি সংবাদকে বলেন, ‘আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি, সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ সাধন, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ব্যয় কমানো, নতুন প্রকল্প হাতে নেয়ার আগে পুরোনো প্রকল্পগুলো শেষ করা উচিত। সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা খুবই ভালো।’

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর

চাপ বাড়লো কেন?

বেশ কয়েক বছর ধরে রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। একের পর এক রেকর্ড হয়। মহামারী করোনাকালে আমদানিতে ধীরগতি আর রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে গত বছরের ২৪ আগস্ট রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি।

সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আকুর জুলাই-আগস্ট মেয়াদের আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৪৭ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। আমদানি বাড়ায় রিজার্ভ থেকে প্রয়োজনীয় ডলার চলে যাওয়ায় অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে তা ৪৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। রপ্তানি বাড়ায় নভেম্বরের প্রথম দিকে রিজার্ভ খানিকটা বেড়ে ৪৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। ৭ নভেম্বর আকুর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের দেনা পরিশোধের পর রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে।

এরপর চলতি বছরের মার্চে রিজার্ভ আরও ৪৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এরপর গত দুই মাসে তা কিছুটা বেড়ে ৪৪ থেকে ৪৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে উঠানামা করে। গত ৫ মে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মার্চ-এপ্রিল ২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার বিল শোধ করে তা সমন্বয় করলে তা ৪২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসবে বলে ধারণা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের। এক বছর পর রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নামল। গত বছরের মার্চে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।

রিজার্ভের ওপর আগের তুলনায় বর্তমান চাপের বিষয়ে উল্লেখ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গত কয়েক মাসে রিজার্ভ এতটাই চাপে পড়েছে যে, আগে যেখানে ৯ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর অর্থ রিজার্ভ থাকত, সেখানে বর্তমানে সেটি পাঁচ মাসে নেমে এসেছে। এটিও মাথায় রাখতে হবে।’

রেমিট্যান্সের কি অবস্থা?

২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর রেমিট্যান্সপ্রবাহেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ওই বছরের এপ্রিলে মাত্র ১০৯ কোটি ২৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা। এরপর থেকে অবশ্য মহামারীর মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরের পুরোটা সময়ে (২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন) রেমিট্যান্সের উল্লম্ফন দেখা যায়। ওই অর্থবছরে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।

কিন্তু চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা দেখা যায়। প্রথম মাস জুলাইয়ে আসে ১৮৭ কোটি ১৫ লাখ ডলার। আগস্টে আসে ১৮১ কোটি ডলার। সেপ্টেম্বরে আসে ১৭২ কোটি ৬২ লাখ ডলার। অক্টোবরে আসে ১৬৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার। নভেম্বরে আসে আরও কম, ১৫৫ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। এরপর টানা পাঁচ মাস কমার পর ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বেড়েছিল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে ফের হোঁচট খায়। তবে ঈদকে সামনে রেখে গত এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্স বাড়ে। তবে এর আগে যেহেতু পরপর কয়েক মাস রেমিট্যান্স কমছিল, তাই সেই ধাক্কা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর পড়ে।

আমদানির তুলনায় রপ্তানি বাড়ছে কি?

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মহামারী করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পর থেকেই দেশে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার আগে মাসে আমদানি খাতে গড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ হতো। করোনার মধ্যে তা কমে গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। কিন্তু চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরু থেকেই আমদানিতে উল্লম্ফন লক্ষ্য করা যায়। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়। আগস্টে তা বেড়ে ৬ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। এভাবে সবশেষ ফেব্রুয়ারি মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে রপ্তানি প্রবণতার দিকে তাকালে দেখা যায়, গত কয়েক মাস ধরে এই সূচকটিও বাড়ছে। তবে রপ্তানি যে হারে বাড়ছে, তার চেয়ে বেশি বাড়ছে আমদানির পরিমাণ।

গত এপ্রিলে দেশে রপ্তানি আয় ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে, জুলাই থেকে এপ্রিল, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আয় ৩৫ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ৪৩ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্প কার্যক্রমে গতি আনতে আমদানি বাড়ানো ভালো। তবে এমন পরিমাণ আমদানি বাড়ানো ভালো নয় যাতে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে টালমাটাল অবস্থা হয়।

আমদানি নিরুৎসাহিত করে ডলারের ওপর চাপ কমানো কতটা যৌক্তিক?

ডলারের ওপর চাপ কমাতে সম্প্রতি আমদানি নিরুৎসাহিত করতে পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কিছু জরুরি পণ্য ছাড়া বাকি সব পণ্য আমদানি করতে আগের থেকে বেশি টাকা অগ্রিম জমা রাখতে হবে। অর্থাৎ এলসি খুলতে মার্জিন অর্থের পরিমাণ বাড়বে। এই উদ্যোগ নেয়ার কারণ হলো, যখন অগ্রিম অর্থ বেশি জমা রাখতে হবে তখন মানুষ কম পণ্য আমদানি করবে।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে, কিছু বিলাসী পণ্যে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম অর্থ জমা রাখতে হবে। আমদানি নিরুৎসাহিত করতে এর আগে গত ১১ এপ্রিল ব্যাংকগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন ভোগ্যপণ্যের জন্য ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ অগ্রিম অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ আমদানি বৃদ্ধি রোধ করতে ব্যর্থ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মঙ্গলবার ঋণপত্রের জন্য উচ্চ মার্জিন আরোপ করে আমদানি নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ডলারের ওপর চাম কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। গতকাল তিনি সংবাদকে বলেন, ‘এমন কিছু পণ্য আছে যেগুলো মানুষ নিত্যদিন ব্যবহার করে না সেগুলো আমদানি করে সংকটের সময় ডলার খচর করে তো লাভ নেই। তাই এই সময় এমন উদ্যোগ খুবই কাজের।’

বর্তমানে দেশে অনেকগুলো মেগা প্রকল্প একই সঙ্গে চালু আছে। এতে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হচ্ছে। এতে রিজার্ভে থাকা ডলারে টান পড়ছে। তাই যদি বেছে বেছে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখা যায় তাহলে এই মুহূর্তের ডলার সংকট সমাধান করা সম্ভব।

গতকাল অর্থমন্ত্রীও এসব প্রকল্পের আমদানি বন্ধ করার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ‘যেসব প্রকল্প এখন না করে ছয় মাস পর করলে কোন সমস্যা বা ক্ষতি হবে না, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, জিডিপিতে ক্ষতি হবে না- আমরা সেগুলো বাতিল না করে সময় পিছিয়েছি।’

মোস্তাফিজুর রহমানও এসব প্রকল্প পেছানোর পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, ‘প্রকল্প হাতে নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে সচেতন হতে হবে। যেসব প্রকল্প কম গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো শুরু না করাই ভালো। আর প্রকল্প হাতে নেয়ার সময়ই ভালোমতো যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন যে, সেই প্রকল্প সার্বিক অর্থনীতিতে কতটা ভূমিকা রাখবে’

বৃহস্পতিবার, ১২ মে ২০২২ , ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ ০৯ শাওয়াল ১৪৪৩

বিদেশ সফর, কম জরুরি প্রকল্পে লাগাম

অপ্রয়োজনীয় আমদানি আরও কঠোর করা হয়েছে ব্যয় সাশ্রয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে এই সিদ্ধান্ত

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এবার সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে লাগাম টানতে যাচ্ছে সরকার। গতকাল সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। শুধু তাই নয়, বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে আমদানি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো এখন বন্ধ রেখে পরে শুরু করার জন্য বলা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে অর্থমন্ত্রী গতকাল যেসব উদ্যোগের কথা বলেছেন, সবগুলোই ভালো। এতে অর্থনীতি দীর্ঘ মেয়াদে শক্তিশালী হবে।

অহেতুক ব্যয় কমাতে উদ্যোগ নেয়া হলেও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বেড়ে গেছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘যে সফরগুলো আগে অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেগুলোই যাচ্ছে। নতুন বিদেশ সফর অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন, যদি কোন প্রয়োজন না থাকে, তাহলে বিদেশ সফর আর নয়। যদি কোন বিশেষ প্রয়োজন হয় তাহলে তারা যাবেন, অন্যথায় কেউ যাবেন না।’

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের প্রভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের যে সার্বিক অবস্থা সেটি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। সুসময়ের জন্য, এক্সটারনাল ভার্নাবিলিটিগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।’

এছাড়া ডলারের ওপর চাপ কমাতে সম্প্রতি আমদানি নিরুৎসাহিত করতে পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিলাসী পণ্যে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম অর্থ জমা রাখতে হবে। আমদানি নিরুৎসাহিত করতে এর আগে গত ১১ এপ্রিল ব্যাংকগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন ভোগ্যপণ্যের জন্য ঋণপত্র মার্জিন বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এতেও সুফল আসেনি। উল্টো আমদানি আরও বেড়ে যায়।

আমদানি বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দেয়। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুন-মার্চ) চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪০৭ কোটি ডলার। ঘাটতির এই পরিমাণ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ গুণ বেশি। গত অর্থবছর ৯ মাসে ঘাটতি ছিল ৫৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আর গত ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৪৫৮ কোটি ডলার। তার আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৫৪৪ কোটি ডলার।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তিনি সংবাদকে বলেন, ‘আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি, সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ সাধন, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ব্যয় কমানো, নতুন প্রকল্প হাতে নেয়ার আগে পুরোনো প্রকল্পগুলো শেষ করা উচিত। সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা খুবই ভালো।’

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর

চাপ বাড়লো কেন?

বেশ কয়েক বছর ধরে রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। একের পর এক রেকর্ড হয়। মহামারী করোনাকালে আমদানিতে ধীরগতি আর রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে গত বছরের ২৪ আগস্ট রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি।

সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আকুর জুলাই-আগস্ট মেয়াদের আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৪৭ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। আমদানি বাড়ায় রিজার্ভ থেকে প্রয়োজনীয় ডলার চলে যাওয়ায় অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে তা ৪৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। রপ্তানি বাড়ায় নভেম্বরের প্রথম দিকে রিজার্ভ খানিকটা বেড়ে ৪৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। ৭ নভেম্বর আকুর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের দেনা পরিশোধের পর রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে।

এরপর চলতি বছরের মার্চে রিজার্ভ আরও ৪৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এরপর গত দুই মাসে তা কিছুটা বেড়ে ৪৪ থেকে ৪৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে উঠানামা করে। গত ৫ মে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মার্চ-এপ্রিল ২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার বিল শোধ করে তা সমন্বয় করলে তা ৪২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসবে বলে ধারণা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের। এক বছর পর রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নামল। গত বছরের মার্চে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।

রিজার্ভের ওপর আগের তুলনায় বর্তমান চাপের বিষয়ে উল্লেখ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গত কয়েক মাসে রিজার্ভ এতটাই চাপে পড়েছে যে, আগে যেখানে ৯ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর অর্থ রিজার্ভ থাকত, সেখানে বর্তমানে সেটি পাঁচ মাসে নেমে এসেছে। এটিও মাথায় রাখতে হবে।’

রেমিট্যান্সের কি অবস্থা?

২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর রেমিট্যান্সপ্রবাহেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ওই বছরের এপ্রিলে মাত্র ১০৯ কোটি ২৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা। এরপর থেকে অবশ্য মহামারীর মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরের পুরোটা সময়ে (২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন) রেমিট্যান্সের উল্লম্ফন দেখা যায়। ওই অর্থবছরে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।

কিন্তু চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা দেখা যায়। প্রথম মাস জুলাইয়ে আসে ১৮৭ কোটি ১৫ লাখ ডলার। আগস্টে আসে ১৮১ কোটি ডলার। সেপ্টেম্বরে আসে ১৭২ কোটি ৬২ লাখ ডলার। অক্টোবরে আসে ১৬৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার। নভেম্বরে আসে আরও কম, ১৫৫ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। এরপর টানা পাঁচ মাস কমার পর ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বেড়েছিল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে ফের হোঁচট খায়। তবে ঈদকে সামনে রেখে গত এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্স বাড়ে। তবে এর আগে যেহেতু পরপর কয়েক মাস রেমিট্যান্স কমছিল, তাই সেই ধাক্কা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর পড়ে।

আমদানির তুলনায় রপ্তানি বাড়ছে কি?

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মহামারী করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পর থেকেই দেশে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার আগে মাসে আমদানি খাতে গড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ হতো। করোনার মধ্যে তা কমে গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। কিন্তু চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের শুরু থেকেই আমদানিতে উল্লম্ফন লক্ষ্য করা যায়। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়। আগস্টে তা বেড়ে ৬ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। এভাবে সবশেষ ফেব্রুয়ারি মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে রপ্তানি প্রবণতার দিকে তাকালে দেখা যায়, গত কয়েক মাস ধরে এই সূচকটিও বাড়ছে। তবে রপ্তানি যে হারে বাড়ছে, তার চেয়ে বেশি বাড়ছে আমদানির পরিমাণ।

গত এপ্রিলে দেশে রপ্তানি আয় ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে, জুলাই থেকে এপ্রিল, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আয় ৩৫ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ৪৩ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্প কার্যক্রমে গতি আনতে আমদানি বাড়ানো ভালো। তবে এমন পরিমাণ আমদানি বাড়ানো ভালো নয় যাতে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে টালমাটাল অবস্থা হয়।

আমদানি নিরুৎসাহিত করে ডলারের ওপর চাপ কমানো কতটা যৌক্তিক?

ডলারের ওপর চাপ কমাতে সম্প্রতি আমদানি নিরুৎসাহিত করতে পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কিছু জরুরি পণ্য ছাড়া বাকি সব পণ্য আমদানি করতে আগের থেকে বেশি টাকা অগ্রিম জমা রাখতে হবে। অর্থাৎ এলসি খুলতে মার্জিন অর্থের পরিমাণ বাড়বে। এই উদ্যোগ নেয়ার কারণ হলো, যখন অগ্রিম অর্থ বেশি জমা রাখতে হবে তখন মানুষ কম পণ্য আমদানি করবে।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে, কিছু বিলাসী পণ্যে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম অর্থ জমা রাখতে হবে। আমদানি নিরুৎসাহিত করতে এর আগে গত ১১ এপ্রিল ব্যাংকগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন ভোগ্যপণ্যের জন্য ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ অগ্রিম অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ আমদানি বৃদ্ধি রোধ করতে ব্যর্থ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মঙ্গলবার ঋণপত্রের জন্য উচ্চ মার্জিন আরোপ করে আমদানি নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ডলারের ওপর চাম কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। গতকাল তিনি সংবাদকে বলেন, ‘এমন কিছু পণ্য আছে যেগুলো মানুষ নিত্যদিন ব্যবহার করে না সেগুলো আমদানি করে সংকটের সময় ডলার খচর করে তো লাভ নেই। তাই এই সময় এমন উদ্যোগ খুবই কাজের।’

বর্তমানে দেশে অনেকগুলো মেগা প্রকল্প একই সঙ্গে চালু আছে। এতে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হচ্ছে। এতে রিজার্ভে থাকা ডলারে টান পড়ছে। তাই যদি বেছে বেছে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখা যায় তাহলে এই মুহূর্তের ডলার সংকট সমাধান করা সম্ভব।

গতকাল অর্থমন্ত্রীও এসব প্রকল্পের আমদানি বন্ধ করার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ‘যেসব প্রকল্প এখন না করে ছয় মাস পর করলে কোন সমস্যা বা ক্ষতি হবে না, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, জিডিপিতে ক্ষতি হবে না- আমরা সেগুলো বাতিল না করে সময় পিছিয়েছি।’

মোস্তাফিজুর রহমানও এসব প্রকল্প পেছানোর পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, ‘প্রকল্প হাতে নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে সচেতন হতে হবে। যেসব প্রকল্প কম গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো শুরু না করাই ভালো। আর প্রকল্প হাতে নেয়ার সময়ই ভালোমতো যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন যে, সেই প্রকল্প সার্বিক অর্থনীতিতে কতটা ভূমিকা রাখবে’