মাদারীপুরে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে প্রভাবশালী মানব পাচার চক্র

চার বছরে মৃত্যু ৩০ জন, বাড়ছে মামলার সংখ্যা, মীমাংসায় বেঁচে যায় দালালরা

অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রায় গত চার বছরে মাদারীপুরের ৩০ জনের বেশি তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন এই জেলার দুই শতাধিক অভিবাসন প্রত্যাশী। মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যার সঙ্গে বেড়েছে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলার সংখ্যাও। তবে ভুক্তভোগীদের পরিবার ও প্রভাবশালী দালাল চক্রের মধ্যে মীমাংসা হয়ে যাওয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

মামলার সংখ্যা বাড়ছে

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মাদারীপুর জেলার ৩২ জন অভিবাসন প্রত্যাশী লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে মারা যান। এছাড়া এই পথে ইউরোপে যাত্রা করা দুই শতাধিক তরুণ নিখোঁজ রয়েছেন।

মাদারীপুর জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত জেলায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে কোন মামলা হয়নি। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৬টি। ২০২০ সালে মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১টিতে। আর ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জেলার থানাগুলোয় মামলা হয়েছে ৫৬টি। সর্বশেষ ৫৬টি মামলায় অভিযুক্ত ৪৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া ২০১৯ সালে ৩ জন এবং ২০২০ সালে ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মীমাংসায় বেঁচে যায় দালাল : ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ১০ লাখ টাকা চুক্তিতে ইতালির উদ্দেশে লিবিয়া যান রাজৈরের মজুমদারকান্দি এলাকার তরুণ আশরাফুল ঘরামী। যাওয়ার পর থেকে পরিবারের সঙ্গে আশরাফুলের আর কোন কথা হয়নি। এ ঘটনায় মজুমদারকান্দি এলাকার খাদিজা বেগম ও তার স্বামী আজিজুল মজুমদারসহ তিনজনকে আসামি করে গত ৩ জানুয়ারি মানব পাচার আইনে মামলা করেন আশরাফুলের ভগ্নিপতি উজ্জ্বল শেখ। তবে মাস না ঘুরতেই স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী দালালচক্র ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে মীমাংসা করে নিয়েছে।

ওই মামলার বাদী উজ্জ্বল শেখ বলেন, ‘মামলা করার পর বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে। আমরা যদি ওদের বিরুদ্ধে মামলা না করতাম। তাহলে ওরা কোনদিনও আমাদের নিয়ে মীমাংসায় বসতো না। আমাদের কোন খোঁজখবরও নিত না। তাই বাধ্য হয়েই মামলা দিয়েছিলাম।’

যদিও তার শ্যালকের কোন সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি লিবিয়া থেকে অবৈধ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে ঠা-ায় মারা যান মাদারীপুরের চার তরুণ। তবে এ ঘটনায় দালালপক্ষ তাদের পরিবারের সঙ্গে মীমাংসা করায় আর মামলা হয়নি। এই প্রসঙ্গে মৃত এক তরুণের স্বজন বলেন, ‘কিছু ক্ষতিপূরণ দালাল দিয়েছে। তাই আর আমরা মামলায় যাইনি।’

মামলায় ৪৪ জনের নাম

রাজৈরের রবি দাড়িয়া ও তার ভাই রাজা দাড়িয়া। ইতালি নেয়ার কথা বলে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে তিন ধাপে ৮৫ জন তরুণকে লিবিয়ায় নেন তারা। এর মধ্যে সেলিম মোল্লা নামে এক তরুণ লিবিয়ায় মারা যান। বাকি ৮৪ জনের কোন হদিস নেই।

এই ঘটনায় নিখোঁজ তরুণ এলাহি মোল্লার বাবা মেরজন মোল্লা গত ১ ফেব্রুয়ারি মাদারীপুর আদালতে মামলা করেন। মামলায় রাজৈরের খালিয়া ইউনিয়নের নূরপুর এলাকার রবি দাড়িয়া, রাজা দাড়িয়া, রবি দাড়িয়ার লিবিয়া প্রবাসী ছেলে সজীব দাড়িয়া ও মেয়ে মুন্নি বেগম, সজীবের মা সুমি বেগমকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার পর থেকেই পুরো পরিবার লাপাত্তা। এখনও তাদের সঙ্গে কোন যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

জেলার চারটি থানা ও আদালতে মানব পাচার আইনে হওয়া মামলার এজাহার থেকে রবি দাড়িয়াসহ তার পরিবারের ৫ জন ছাড়া আরও ৩৯ জনের নাম পাওয়া গেছে।

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) চাইলাউ মারমা বলেন, ‘মানব পাচারের বিষয়ে আমরা কোন ছাড় দিচ্ছি না। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই মামলা নেয়া হচ্ছে। অভিযুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। তবে সমস্যা হচ্ছে, আদালতে জামিনের সময় আসামির বিপক্ষে বাদী শক্ত অবস্থান নেয় না। তাই দালালেরা দ্রুত জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে যান। পরে দালালেরা বাদীপক্ষের সঙ্গে আপোষ মীমাংসা করে নেন। ফলে বাদীপক্ষ আর এই বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেন না।’

বৃহস্পতিবার, ১২ মে ২০২২ , ২৯ বৈশাখ ১৪২৮ ০৯ শাওয়াল ১৪৪৩

মাদারীপুরে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে প্রভাবশালী মানব পাচার চক্র

চার বছরে মৃত্যু ৩০ জন, বাড়ছে মামলার সংখ্যা, মীমাংসায় বেঁচে যায় দালালরা

অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রায় গত চার বছরে মাদারীপুরের ৩০ জনের বেশি তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন এই জেলার দুই শতাধিক অভিবাসন প্রত্যাশী। মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যার সঙ্গে বেড়েছে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলার সংখ্যাও। তবে ভুক্তভোগীদের পরিবার ও প্রভাবশালী দালাল চক্রের মধ্যে মীমাংসা হয়ে যাওয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

মামলার সংখ্যা বাড়ছে

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মাদারীপুর জেলার ৩২ জন অভিবাসন প্রত্যাশী লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে মারা যান। এছাড়া এই পথে ইউরোপে যাত্রা করা দুই শতাধিক তরুণ নিখোঁজ রয়েছেন।

মাদারীপুর জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত জেলায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে কোন মামলা হয়নি। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৬টি। ২০২০ সালে মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১টিতে। আর ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জেলার থানাগুলোয় মামলা হয়েছে ৫৬টি। সর্বশেষ ৫৬টি মামলায় অভিযুক্ত ৪৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া ২০১৯ সালে ৩ জন এবং ২০২০ সালে ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মীমাংসায় বেঁচে যায় দালাল : ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ১০ লাখ টাকা চুক্তিতে ইতালির উদ্দেশে লিবিয়া যান রাজৈরের মজুমদারকান্দি এলাকার তরুণ আশরাফুল ঘরামী। যাওয়ার পর থেকে পরিবারের সঙ্গে আশরাফুলের আর কোন কথা হয়নি। এ ঘটনায় মজুমদারকান্দি এলাকার খাদিজা বেগম ও তার স্বামী আজিজুল মজুমদারসহ তিনজনকে আসামি করে গত ৩ জানুয়ারি মানব পাচার আইনে মামলা করেন আশরাফুলের ভগ্নিপতি উজ্জ্বল শেখ। তবে মাস না ঘুরতেই স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী দালালচক্র ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে মীমাংসা করে নিয়েছে।

ওই মামলার বাদী উজ্জ্বল শেখ বলেন, ‘মামলা করার পর বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে। আমরা যদি ওদের বিরুদ্ধে মামলা না করতাম। তাহলে ওরা কোনদিনও আমাদের নিয়ে মীমাংসায় বসতো না। আমাদের কোন খোঁজখবরও নিত না। তাই বাধ্য হয়েই মামলা দিয়েছিলাম।’

যদিও তার শ্যালকের কোন সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি লিবিয়া থেকে অবৈধ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে ঠা-ায় মারা যান মাদারীপুরের চার তরুণ। তবে এ ঘটনায় দালালপক্ষ তাদের পরিবারের সঙ্গে মীমাংসা করায় আর মামলা হয়নি। এই প্রসঙ্গে মৃত এক তরুণের স্বজন বলেন, ‘কিছু ক্ষতিপূরণ দালাল দিয়েছে। তাই আর আমরা মামলায় যাইনি।’

মামলায় ৪৪ জনের নাম

রাজৈরের রবি দাড়িয়া ও তার ভাই রাজা দাড়িয়া। ইতালি নেয়ার কথা বলে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে তিন ধাপে ৮৫ জন তরুণকে লিবিয়ায় নেন তারা। এর মধ্যে সেলিম মোল্লা নামে এক তরুণ লিবিয়ায় মারা যান। বাকি ৮৪ জনের কোন হদিস নেই।

এই ঘটনায় নিখোঁজ তরুণ এলাহি মোল্লার বাবা মেরজন মোল্লা গত ১ ফেব্রুয়ারি মাদারীপুর আদালতে মামলা করেন। মামলায় রাজৈরের খালিয়া ইউনিয়নের নূরপুর এলাকার রবি দাড়িয়া, রাজা দাড়িয়া, রবি দাড়িয়ার লিবিয়া প্রবাসী ছেলে সজীব দাড়িয়া ও মেয়ে মুন্নি বেগম, সজীবের মা সুমি বেগমকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার পর থেকেই পুরো পরিবার লাপাত্তা। এখনও তাদের সঙ্গে কোন যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

জেলার চারটি থানা ও আদালতে মানব পাচার আইনে হওয়া মামলার এজাহার থেকে রবি দাড়িয়াসহ তার পরিবারের ৫ জন ছাড়া আরও ৩৯ জনের নাম পাওয়া গেছে।

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) চাইলাউ মারমা বলেন, ‘মানব পাচারের বিষয়ে আমরা কোন ছাড় দিচ্ছি না। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই মামলা নেয়া হচ্ছে। অভিযুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। তবে সমস্যা হচ্ছে, আদালতে জামিনের সময় আসামির বিপক্ষে বাদী শক্ত অবস্থান নেয় না। তাই দালালেরা দ্রুত জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে যান। পরে দালালেরা বাদীপক্ষের সঙ্গে আপোষ মীমাংসা করে নেন। ফলে বাদীপক্ষ আর এই বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেন না।’