লোকসংগীত গম্ভীরার সেকাল-একাল

জাহাঙ্গীর সেলিম

সমাজ বিনির্মাণে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। সাংস্কৃতিক চেতনা ও কর্মকাণ্ড জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনগণকে হার্দিক বন্ধনে আবদ্ধ করে, মহামিলনের পথ সুগম করে। সম্প্রতিককালে সাংস্কৃতিক আন্দোলন একমুখী অর্থাৎ দেশের প্রাণকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কিন্তু বাংলার অফুরন্ত সংস্কৃতির উপাদান ও উপকরণ গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এর কিছু অপমৃত্যু ঘটেছে, বাকিগুলোর অবস্থা শোচনীয়- এ কথা নিঃসন্দেহে বলা চলে।

সংস্কৃতি সব সময় প্রবহমান। তবে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তাকে চলতে হয় ও বিকশিত হয়। আবার চলার পথ থেমেও যায়। কবিগুরুর কথায় “যে নদী মরুপথে হারাল ধারা”। আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সেই ধারা অর্থাৎ হারিয়ে যাওয়া ধারার অনেক প্রমাণ রয়েছে। সংস্কৃতির এক বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে বিনোদন। বিনোদন ছাড়া জীবন চলে না, বিনোদন চলমান জীবনকে সজীব-সতেজ রাখে, জীবনকে আনন্দময় করে তোলে। এই তো কয়েক দশক আগেও আলকাপ ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিনোদনের প্রধান উপজীব্য। তাই তো উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে পরের দিন কাজে যেতে হবে জেনেও রাতে আলকাপ গানের আসরে উপস্থিত হয়নি এমন কিষাণ-মজুর খুব কম আছে। বিনোদনের খোরাক কি শুধু আলকাপে সীমাবদ্ধ ছিল? না, আরো অনেক উপকরণ ছিল। কিন্তু আকাশচুম্বি সেই জনপ্রিয় আলকাপ এখন একেবারে মুমূর্ষু , থেমেও যেতে পারে পথ চলা। একইভাবে আমরা গৌড়ীয় সংস্কৃতির বিনোদনসহ সত্যপীরের গান, সারি গান, জারি গান, মেয়েলী গীত, কবি গান, ঝাণ্ডি গান, কাহানির আসর হারিয়ে ফেলেছি। হারিয়ে ফেলেছি বা ভুলে গেছি গৌড়ীয় সঙ্গীত ও নৃত্যকলা, তবে আশার আলো হলো আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেলেও এর চর্চা পুনর্জীবিত করা হয়েছে। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের (কলকাতা) সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক / স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়ানো ও শেখানো হচ্ছে। এসব পুরনো গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তো ভুলে যাবার নয়? প্রায় দেড় হাজার বছরের আদি পর্ব থেকে পালা/আধুনিক গম্ভীরা গানের পরবর্তি সংস্করণকে নতুন কাসুন্দি বলা কি অযৌক্তিক হবে?

­ তাদের কাছ থেকে যা পাওয়া যাচ্ছে বর্তমান প্রজন্মকে সে সব গ্রহণ করতে হচ্ছে। মোদ্দা কথায় গুণকীর্তনের গম্ভীরা এখন মুখরিত, গ্রহণযোগ্য উপাদান থাক বা না থাক। ফলে দুই/তিন দশক আগের গম্ভীরার সাথে বর্তমান গম্ভীরার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ দৃশ্যমান। সে কারণে গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের সম্মুখীন।

কালের আবর্তে অতীতেও যুগের পরিবর্তন হয়েছে, তবে খুব ধীরে। সে পরিবর্তনের সাথে আপামর জনগণ খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে। যুগের পরিবর্তনের সাথে সমাজের পরিবর্তন দেখা যায়। কিন্তু বিগত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে কৃষি অর্থনীতির পরিবর্তে সা¤্রাজ্যবাদী লুটেরা গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া ভোগবাদী অর্থনীতির থাবায় রাতারাতি পরিবর্তনে জনগণ বেসামাল। কেননা সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং মূল্যবোধে আঘাত হানে। তাদের চাপিয়ে দেয়ার ধারাবাহিকতায় আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে হাজার বছর ধরে চলমান বাংলার লোকসংস্কৃতির অস্তিত্ব সংকটে উপনীত। লুটেরাদের আকাশ সংস্কৃতির সাথে যোগ হয়েছে ভুঁইফোড়ের মতো গজিয়ে ওঠা দেশীয় মালিকানাধীন আকাশ সংস্কৃতির রমরমা উপস্থিতি (কেবল টিভি)। যাদের মুখ্য উদ্দেশ্য শুধুই মুনাফা। সংস্কৃতির চরম অবক্ষয় তাদের বিবেচ্য নয়।

আমরা লক্ষ্য করেছি কেবল টিভি অনুঘটকের ভূমিকায় বাণিজ্যের প্রসার বাড়ানোর লক্ষ্যে ছলে বলে কৌশলে প্রচলিত বিশ্বাসে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে অসত্যকে সত্য বলে প্রচার করতে। ঠিক গোয়েবলসীয় তত্ত্বের প্রোয়োগ। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো অপপ্রয়োগ কোন মাত্রায় পৌঁছেছে তা বোঝা যায় যখন দেখি তামাক জাতীয় পণ্যের ব্যবহার ও প্রসার বাড়াতে গুণকীর্তন করা হচ্ছে গম্ভীরা গানে। এরকম উদাহরণ আরো উল্লেখ করা যায়। এ সব চটকদারি ও ফরমায়েশি গম্ভীরায় যে পরিমাণে অবক্ষয়ের সৃষ্টি করছে, সে সব কি চলতে থাকবে? জনগণ কি সে সব গ্রহণ করেছে? রকিব উদ্দিন ও কুতুবুল আলম জামানার অব্যাবহতির পর গম্ভীরা উৎকর্ষের পরিবর্তে আদি ভাবগাম্ভীর্য ভাঙ্গার যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তা রোধের উপায় কী? উত্তর খোঁজার জন্য একবার অতীতের দিকে ফিরে দেখা যাক।

গম্ভীরার জন্ম হয়েছে প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে। দেড় হাজার বছর পূর্বে জন্মলাভের পর মানবরূপী নির্বাক শিবকে বছরের সালতামামি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, হাসি, মস্করা ইত্যাদির মাধ্যমে নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করে মনে প্রশান্তি লাভের চেষ্টা করা হয়েছে। রাজা-বাদশাদের যুগ মাড়িয়ে ব্রিটিশ শাসনেও গম্ভীরা একইভাবে প্রতিবাদী ও মুখর ভূমিকা পালন করেছে। পরিণামে খড়্গ নেমে আসে। ব্রিটিশ শাসনের পর বহুরূপী পাকিস্তানি শাসনেও গম্ভীরা আলোর মুখ দেখেনি। ভয় ভীতি উপেক্ষা করে স্কুল-কলেজে সীমিত চর্চা অব্যাহত ছিল। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭১ সালে রক্তস্নাত বাংলাদেশে রকিব-কুতুবের হাত ধরে গম্ভীরার পুনর্জাগরণ শুরু হয়। শুরু থেকেই ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে নির্ভীক চিত্তে গম্ভীরার যাত্রা শুরু। স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর সামনে সোঁদামাটি গায়ে মেখে তাঁর সরকারের সফলতা ও ব্যর্থতার সালতামামি হাসি, কৌতুক ও রসাত্মক কথাবার্তা সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সেই থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশে গম্ভীরার পথচলা শুরু। তবে সে ধারা ধরে রাখা যায়নি। বাঁক খেয়ে স্বরূপ বদলে গুণ কীর্তনের গম্ভীরা ধারার

প্রচলন অব্যাহত রয়েছে, সে আলোচনা পরে।

সে সময়েও বিষয় ভিত্তিক ও ফরমায়েশি গম্ভীরা পরিবেশনা দেখা গেলেও চরিত্র বদলায়নি, স্বকীয়তা বজায় ছিল। এ রকম উদাহরণ বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ ফরমায়েশি পরিবেশনা হলেও গম্ভীরা তার সত্তা হারায়নি। ঘুণে ধরা সমাজে বিরাজমান অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, লুণ্ঠন, দুর্বৃত্তায়ন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, স্বেচ্ছাচারিতা, শাসন-শোষণ, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, সহিংসতা এখন বাস্তব সত্য। এসবের প্রতিবাদ এখন গণমাধ্যমে সীমিত হয়ে পড়েছে। সামগ্রিকভাবে এ সব মানবতাবিরোধী ও নির্মমতার বিরুদ্ধে গম্ভীরায় বেশি করে প্রতিবাদী ভূমিকা পালনের সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি। ছিটেফোঁটা দুর্বল প্রতিবাদ ছাড়া মানবতার জয়গান প্রচারে সোচ্চার হতে দেখা যায় নি। তবে ভবিষ্যতে সব ধরনের অন্যায়ের প্রতিবাদে গম্ভীরা সোচ্চার হয়ে উঠবে এ আশা নিশ্চয় করা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ের গম্ভীরা হলো গুণকীর্তনের গম্ভীরা। ফলে মূল ধারার গম্ভীরার কি অপমৃত্যু হয়ে গেছে। উন্নত টেকনোলজির কারণে বর্তমানে বাছবিচার ছাড়া সব গম্ভীরা ভিডিও রেকর্ডিং করে সহজেই স্থায়ী সংরক্ষণের সুবিধা বিরাজমান। ফলে সংরক্ষণ পদ্ধতি সহজ এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন আকাশ সংস্কৃতি ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার মূল ধারা থেকে বিচ্যুত এ সব ভিডিও স্থায়ী সংরক্ষণ এবং বিতরণে বিরূপ প্রভাবের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। যেহেতু মূল ধারার গম্ভীরার রেকর্ড সংরক্ষণ নেই এবং একই সাথে সে আঙ্গিকে পরিবেশনাও নেই। এ থেকেই অশনি সঙ্কেত আঁচ করা যায়। ফলে কোন গম্ভীরা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ প্রয়োজন এবং কোন গম্ভীরা টিকিয়ে রাখা আবশ্যক।

তবে পুনর্জাগরিত গম্ভীরা (১৯৭২) থেকে কিছু অসঙ্গতি গবেষক ও ক্রিটিকদের মাঝে দৃশ্যমান হয়। এসব অবসানের পরিবর্তে সে সব বর্তমানে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। দু’একটা উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে-

ক. গানের পাণ্ডুলিপি সামনে ধরে সুর করে গাওয়া। এটি দৃষ্টিকটু ও অনভিপ্রেত, গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন। সামগ্রিক পরিবেশনাকে অনেকটা ম্লান করে দেয়। নানা নাতির রসাত্মক পরিবেশনায় স্থবিরতার সৃষ্টি করে। তাদের শারীরিক অঙ্গভঙ্গি (বডি ল্যাঙ্গুয়েজ), চোখ মুখের ভাষা হঠাৎ করে থেমে যায়। দর্শকদের কাছে বার বার মনে মনে বিরক্তের উদ্রেক করে।

খ. বর্তমান প্রজন্মের সব কুশীলবও একই পথ ধরে গম্ভীরা মঞ্চায়ন করে চলেছেন। বিষয়টি প্রবন্ধকারের কাছে প্রথম থেকে দৃষ্টিকটু লাগে এবং প্রবন্ধকার রকিবউদ্দীনের সাথে খোলামেলা আলোচনা করে তাঁদের পরিহারের জন্য দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে। তিনিও তিনি বিষয়টি অনুধাবন করতেন, কিন্তু পরিহার করা সম্ভব হয়নি। কারণ হিসেবে জানা যায় বয়সজনিত কারণে গানের সংলাপ মুখস্থ করা সম্ভব ছিল না।

গ. রকিব-তুতুবের উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমান প্রজন্মের কুশীলবরা আদর্শ হিসেবে তাঁদের অনুসরণ করে চলেন। যদিও এ প্রজন্মের অধিকাংশ নানা নাতি বয়সের তুলনায় অনেক কম। তাছাড়া এ প্রজন্মকে এসব দৃষ্টিকটু বিষয়গুলি পরিহার করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে কিনা সেটিও ভেবে দেখার সময় উপস্থিত। প্রবন্ধকার কোন কোন দলনেতার সাথে আলাপ করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও ভর্ৎসনা শুনেছে।

ঘ. আসরের শুরুতে বাংলা সিনেমার চটকদারি গান বা খেমটা সুর (কনসার্ট) বাজানোর পর গম্ভীরা শুরু করা অনভিপ্রেত ও অগ্রহণযোগ্য। গম্ভীরা আপন মহিমায় চিরভাস্বর। এর একটা নিজস্ব সুর আছে, অন্য গানের সুর ধার করার প্রয়োজন পড়ে না। গম্ভীরার সুর দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হওয়া বাঞ্ছনীয়।

ঙ. গম্ভীরা পরিবেশনার একেবারে শেষ অংশে হিন্দি বা অন্য গানের সুর দিয়ে যবনিকা টানা একইভাবে অগ্রহণযোগ্য।

চ. অনেক সময় দেখা যায় আসরের শুরুতে উচ্চমার্গের উচ্চাঙ্গসংগীত-কে কটাক্ষ করা হচ্ছে। বিষয়টি দেশে ও বিদেশে এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। কোন সংগীতকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। যার যেখানে অবস্থান, সেটি বুঝতে হবে। কোনটা শাস্ত্রীয় এবং কোন লোকজ কুশীলবদের জানা থাকা আবশ্যক।

ছ. রসাত্মক কথাবার্তা, হাসি, মস্করা, টুটকি পরিবেশনায় পেশাদারিত্বের অভাব। ধারকরা সে সব চুটকি ব্যবহারের অর্থ হলো মনন ও নৈতিকতার প্রবল ঘাটতি।

জ. গম্ভীরা লুটেরা ব্যবসায়ী ও বহুজাতিক কোম্পানির মুখপাত্র হতে পারে না এবং উচিত নয়। এর পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে অর্থাৎ অপমৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার শামিল।

ঝ. সমালোচনার কৌশলে দক্ষতার ছাপ পাওয়া যায় না। চাঁছাছোলা সমালোচনা গম্ভীরার মুখ্য উপজীব্য। বিষয়ভিত্তিক সমালোচনার জন্য পারদর্শিতা অর্জন করতে হয়। প্রচুর লেখাপড়ার প্রয়োজন, আর এটা তো সবার জানা সমালোচনার উর্ধ্বে কেউ নয়।

ভুলে গেলে চলবে না, গম্ভীরা গান সহজেই জনগণকে আকৃষ্ট করে মনের খোরাক যোগায়। চলমান ঘটনা প্রবাহের সাথে নিজস্ব চিন্তাচেতনার যোগসূত্র আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা থাকে। এ যোগসূত্রের কারণেই গম্ভীরার গ্রহণযোগ্যতা অনেক গুণ বেশি।

শিল্পী ও কুশীলবদের ভালো করে উপলব্ধি করা উচিত যে, আজকে যেভাবে তারা গান পরিবেশন করছেন টেকনোলজির কল্যাণে স্থায়ীত্ব লাভ করতে পারে। রকিব-কুতুবের যুগ দু’দশকেরও আগে যবনিকা ঘটেছে, তাদের পরিবেশিত গম্ভীরার ভিডিও চিত্র এখন মহার্ঘ। এই যুগ সন্ধিক্ষণে বর্তমান ও ভবিষ্যতের কুশীলবদের বিশেষভাবে সতর্ক, সঠিক দিকনির্দেশনার উৎস চিহ্নিত এবং যাবতীয় উপাদান ও উপকরণ আত্মস্থ করে পরিবেশনায় নামতে হবে। ফলশ্রুতিতে পরিবেশনায় সংযোজনের ধারাবাহিকতা এবং ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে গম্ভীরার আদিসত্তা বেঁচে থাকবে।

গম্ভীরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সম্পদ। ফলে এর লালন পালন ও মূল ধারাকে বাঁচিয়ে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের কুশীলবদের ওপর বর্তায়। দায়িত্ব রক্ষার বড় কারণ হিসেবে বিবেচনায় চলে আসে যে, সম্প্রতিককালে গম্ভীরার প্রচলন দেশব্যাপী শুরু হয়ে গেছে। আমাদের সঠিক পরিবেশনায় তারা অনুপ্রাণিত হবে এবং অনুসরণের পথ খুঁজে পাবে। পাশাপাশি আমরাও উচ্চমার্গের গম্ভীরা পরিবেশনার নিশানায় পৌঁছে যাব। গম্ভীরা কুশীলবদের কাছ থেকে আমরা সেই দিনের প্রত্যাশায় রইলাম।

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন ২০২২ , ৯ আষাড় ১৪২৮ ২৩ জিলকদ ১৪৪৩

লোকসংগীত গম্ভীরার সেকাল-একাল

জাহাঙ্গীর সেলিম

image

গম্ভীরা গানের আসর

সমাজ বিনির্মাণে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। সাংস্কৃতিক চেতনা ও কর্মকাণ্ড জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনগণকে হার্দিক বন্ধনে আবদ্ধ করে, মহামিলনের পথ সুগম করে। সম্প্রতিককালে সাংস্কৃতিক আন্দোলন একমুখী অর্থাৎ দেশের প্রাণকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কিন্তু বাংলার অফুরন্ত সংস্কৃতির উপাদান ও উপকরণ গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এর কিছু অপমৃত্যু ঘটেছে, বাকিগুলোর অবস্থা শোচনীয়- এ কথা নিঃসন্দেহে বলা চলে।

সংস্কৃতি সব সময় প্রবহমান। তবে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তাকে চলতে হয় ও বিকশিত হয়। আবার চলার পথ থেমেও যায়। কবিগুরুর কথায় “যে নদী মরুপথে হারাল ধারা”। আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সেই ধারা অর্থাৎ হারিয়ে যাওয়া ধারার অনেক প্রমাণ রয়েছে। সংস্কৃতির এক বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে বিনোদন। বিনোদন ছাড়া জীবন চলে না, বিনোদন চলমান জীবনকে সজীব-সতেজ রাখে, জীবনকে আনন্দময় করে তোলে। এই তো কয়েক দশক আগেও আলকাপ ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিনোদনের প্রধান উপজীব্য। তাই তো উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে পরের দিন কাজে যেতে হবে জেনেও রাতে আলকাপ গানের আসরে উপস্থিত হয়নি এমন কিষাণ-মজুর খুব কম আছে। বিনোদনের খোরাক কি শুধু আলকাপে সীমাবদ্ধ ছিল? না, আরো অনেক উপকরণ ছিল। কিন্তু আকাশচুম্বি সেই জনপ্রিয় আলকাপ এখন একেবারে মুমূর্ষু , থেমেও যেতে পারে পথ চলা। একইভাবে আমরা গৌড়ীয় সংস্কৃতির বিনোদনসহ সত্যপীরের গান, সারি গান, জারি গান, মেয়েলী গীত, কবি গান, ঝাণ্ডি গান, কাহানির আসর হারিয়ে ফেলেছি। হারিয়ে ফেলেছি বা ভুলে গেছি গৌড়ীয় সঙ্গীত ও নৃত্যকলা, তবে আশার আলো হলো আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেলেও এর চর্চা পুনর্জীবিত করা হয়েছে। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের (কলকাতা) সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক / স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়ানো ও শেখানো হচ্ছে। এসব পুরনো গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তো ভুলে যাবার নয়? প্রায় দেড় হাজার বছরের আদি পর্ব থেকে পালা/আধুনিক গম্ভীরা গানের পরবর্তি সংস্করণকে নতুন কাসুন্দি বলা কি অযৌক্তিক হবে?

­ তাদের কাছ থেকে যা পাওয়া যাচ্ছে বর্তমান প্রজন্মকে সে সব গ্রহণ করতে হচ্ছে। মোদ্দা কথায় গুণকীর্তনের গম্ভীরা এখন মুখরিত, গ্রহণযোগ্য উপাদান থাক বা না থাক। ফলে দুই/তিন দশক আগের গম্ভীরার সাথে বর্তমান গম্ভীরার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ দৃশ্যমান। সে কারণে গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের সম্মুখীন।

কালের আবর্তে অতীতেও যুগের পরিবর্তন হয়েছে, তবে খুব ধীরে। সে পরিবর্তনের সাথে আপামর জনগণ খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে। যুগের পরিবর্তনের সাথে সমাজের পরিবর্তন দেখা যায়। কিন্তু বিগত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে কৃষি অর্থনীতির পরিবর্তে সা¤্রাজ্যবাদী লুটেরা গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া ভোগবাদী অর্থনীতির থাবায় রাতারাতি পরিবর্তনে জনগণ বেসামাল। কেননা সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং মূল্যবোধে আঘাত হানে। তাদের চাপিয়ে দেয়ার ধারাবাহিকতায় আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে হাজার বছর ধরে চলমান বাংলার লোকসংস্কৃতির অস্তিত্ব সংকটে উপনীত। লুটেরাদের আকাশ সংস্কৃতির সাথে যোগ হয়েছে ভুঁইফোড়ের মতো গজিয়ে ওঠা দেশীয় মালিকানাধীন আকাশ সংস্কৃতির রমরমা উপস্থিতি (কেবল টিভি)। যাদের মুখ্য উদ্দেশ্য শুধুই মুনাফা। সংস্কৃতির চরম অবক্ষয় তাদের বিবেচ্য নয়।

আমরা লক্ষ্য করেছি কেবল টিভি অনুঘটকের ভূমিকায় বাণিজ্যের প্রসার বাড়ানোর লক্ষ্যে ছলে বলে কৌশলে প্রচলিত বিশ্বাসে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে অসত্যকে সত্য বলে প্রচার করতে। ঠিক গোয়েবলসীয় তত্ত্বের প্রোয়োগ। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো অপপ্রয়োগ কোন মাত্রায় পৌঁছেছে তা বোঝা যায় যখন দেখি তামাক জাতীয় পণ্যের ব্যবহার ও প্রসার বাড়াতে গুণকীর্তন করা হচ্ছে গম্ভীরা গানে। এরকম উদাহরণ আরো উল্লেখ করা যায়। এ সব চটকদারি ও ফরমায়েশি গম্ভীরায় যে পরিমাণে অবক্ষয়ের সৃষ্টি করছে, সে সব কি চলতে থাকবে? জনগণ কি সে সব গ্রহণ করেছে? রকিব উদ্দিন ও কুতুবুল আলম জামানার অব্যাবহতির পর গম্ভীরা উৎকর্ষের পরিবর্তে আদি ভাবগাম্ভীর্য ভাঙ্গার যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তা রোধের উপায় কী? উত্তর খোঁজার জন্য একবার অতীতের দিকে ফিরে দেখা যাক।

গম্ভীরার জন্ম হয়েছে প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে। দেড় হাজার বছর পূর্বে জন্মলাভের পর মানবরূপী নির্বাক শিবকে বছরের সালতামামি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, হাসি, মস্করা ইত্যাদির মাধ্যমে নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করে মনে প্রশান্তি লাভের চেষ্টা করা হয়েছে। রাজা-বাদশাদের যুগ মাড়িয়ে ব্রিটিশ শাসনেও গম্ভীরা একইভাবে প্রতিবাদী ও মুখর ভূমিকা পালন করেছে। পরিণামে খড়্গ নেমে আসে। ব্রিটিশ শাসনের পর বহুরূপী পাকিস্তানি শাসনেও গম্ভীরা আলোর মুখ দেখেনি। ভয় ভীতি উপেক্ষা করে স্কুল-কলেজে সীমিত চর্চা অব্যাহত ছিল। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭১ সালে রক্তস্নাত বাংলাদেশে রকিব-কুতুবের হাত ধরে গম্ভীরার পুনর্জাগরণ শুরু হয়। শুরু থেকেই ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে নির্ভীক চিত্তে গম্ভীরার যাত্রা শুরু। স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর সামনে সোঁদামাটি গায়ে মেখে তাঁর সরকারের সফলতা ও ব্যর্থতার সালতামামি হাসি, কৌতুক ও রসাত্মক কথাবার্তা সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সেই থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশে গম্ভীরার পথচলা শুরু। তবে সে ধারা ধরে রাখা যায়নি। বাঁক খেয়ে স্বরূপ বদলে গুণ কীর্তনের গম্ভীরা ধারার

প্রচলন অব্যাহত রয়েছে, সে আলোচনা পরে।

সে সময়েও বিষয় ভিত্তিক ও ফরমায়েশি গম্ভীরা পরিবেশনা দেখা গেলেও চরিত্র বদলায়নি, স্বকীয়তা বজায় ছিল। এ রকম উদাহরণ বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ ফরমায়েশি পরিবেশনা হলেও গম্ভীরা তার সত্তা হারায়নি। ঘুণে ধরা সমাজে বিরাজমান অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, লুণ্ঠন, দুর্বৃত্তায়ন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, স্বেচ্ছাচারিতা, শাসন-শোষণ, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, সহিংসতা এখন বাস্তব সত্য। এসবের প্রতিবাদ এখন গণমাধ্যমে সীমিত হয়ে পড়েছে। সামগ্রিকভাবে এ সব মানবতাবিরোধী ও নির্মমতার বিরুদ্ধে গম্ভীরায় বেশি করে প্রতিবাদী ভূমিকা পালনের সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি। ছিটেফোঁটা দুর্বল প্রতিবাদ ছাড়া মানবতার জয়গান প্রচারে সোচ্চার হতে দেখা যায় নি। তবে ভবিষ্যতে সব ধরনের অন্যায়ের প্রতিবাদে গম্ভীরা সোচ্চার হয়ে উঠবে এ আশা নিশ্চয় করা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ের গম্ভীরা হলো গুণকীর্তনের গম্ভীরা। ফলে মূল ধারার গম্ভীরার কি অপমৃত্যু হয়ে গেছে। উন্নত টেকনোলজির কারণে বর্তমানে বাছবিচার ছাড়া সব গম্ভীরা ভিডিও রেকর্ডিং করে সহজেই স্থায়ী সংরক্ষণের সুবিধা বিরাজমান। ফলে সংরক্ষণ পদ্ধতি সহজ এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন আকাশ সংস্কৃতি ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার মূল ধারা থেকে বিচ্যুত এ সব ভিডিও স্থায়ী সংরক্ষণ এবং বিতরণে বিরূপ প্রভাবের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। যেহেতু মূল ধারার গম্ভীরার রেকর্ড সংরক্ষণ নেই এবং একই সাথে সে আঙ্গিকে পরিবেশনাও নেই। এ থেকেই অশনি সঙ্কেত আঁচ করা যায়। ফলে কোন গম্ভীরা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ প্রয়োজন এবং কোন গম্ভীরা টিকিয়ে রাখা আবশ্যক।

তবে পুনর্জাগরিত গম্ভীরা (১৯৭২) থেকে কিছু অসঙ্গতি গবেষক ও ক্রিটিকদের মাঝে দৃশ্যমান হয়। এসব অবসানের পরিবর্তে সে সব বর্তমানে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। দু’একটা উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে-

ক. গানের পাণ্ডুলিপি সামনে ধরে সুর করে গাওয়া। এটি দৃষ্টিকটু ও অনভিপ্রেত, গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন। সামগ্রিক পরিবেশনাকে অনেকটা ম্লান করে দেয়। নানা নাতির রসাত্মক পরিবেশনায় স্থবিরতার সৃষ্টি করে। তাদের শারীরিক অঙ্গভঙ্গি (বডি ল্যাঙ্গুয়েজ), চোখ মুখের ভাষা হঠাৎ করে থেমে যায়। দর্শকদের কাছে বার বার মনে মনে বিরক্তের উদ্রেক করে।

খ. বর্তমান প্রজন্মের সব কুশীলবও একই পথ ধরে গম্ভীরা মঞ্চায়ন করে চলেছেন। বিষয়টি প্রবন্ধকারের কাছে প্রথম থেকে দৃষ্টিকটু লাগে এবং প্রবন্ধকার রকিবউদ্দীনের সাথে খোলামেলা আলোচনা করে তাঁদের পরিহারের জন্য দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে। তিনিও তিনি বিষয়টি অনুধাবন করতেন, কিন্তু পরিহার করা সম্ভব হয়নি। কারণ হিসেবে জানা যায় বয়সজনিত কারণে গানের সংলাপ মুখস্থ করা সম্ভব ছিল না।

গ. রকিব-তুতুবের উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমান প্রজন্মের কুশীলবরা আদর্শ হিসেবে তাঁদের অনুসরণ করে চলেন। যদিও এ প্রজন্মের অধিকাংশ নানা নাতি বয়সের তুলনায় অনেক কম। তাছাড়া এ প্রজন্মকে এসব দৃষ্টিকটু বিষয়গুলি পরিহার করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে কিনা সেটিও ভেবে দেখার সময় উপস্থিত। প্রবন্ধকার কোন কোন দলনেতার সাথে আলাপ করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও ভর্ৎসনা শুনেছে।

ঘ. আসরের শুরুতে বাংলা সিনেমার চটকদারি গান বা খেমটা সুর (কনসার্ট) বাজানোর পর গম্ভীরা শুরু করা অনভিপ্রেত ও অগ্রহণযোগ্য। গম্ভীরা আপন মহিমায় চিরভাস্বর। এর একটা নিজস্ব সুর আছে, অন্য গানের সুর ধার করার প্রয়োজন পড়ে না। গম্ভীরার সুর দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হওয়া বাঞ্ছনীয়।

ঙ. গম্ভীরা পরিবেশনার একেবারে শেষ অংশে হিন্দি বা অন্য গানের সুর দিয়ে যবনিকা টানা একইভাবে অগ্রহণযোগ্য।

চ. অনেক সময় দেখা যায় আসরের শুরুতে উচ্চমার্গের উচ্চাঙ্গসংগীত-কে কটাক্ষ করা হচ্ছে। বিষয়টি দেশে ও বিদেশে এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। কোন সংগীতকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। যার যেখানে অবস্থান, সেটি বুঝতে হবে। কোনটা শাস্ত্রীয় এবং কোন লোকজ কুশীলবদের জানা থাকা আবশ্যক।

ছ. রসাত্মক কথাবার্তা, হাসি, মস্করা, টুটকি পরিবেশনায় পেশাদারিত্বের অভাব। ধারকরা সে সব চুটকি ব্যবহারের অর্থ হলো মনন ও নৈতিকতার প্রবল ঘাটতি।

জ. গম্ভীরা লুটেরা ব্যবসায়ী ও বহুজাতিক কোম্পানির মুখপাত্র হতে পারে না এবং উচিত নয়। এর পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে অর্থাৎ অপমৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার শামিল।

ঝ. সমালোচনার কৌশলে দক্ষতার ছাপ পাওয়া যায় না। চাঁছাছোলা সমালোচনা গম্ভীরার মুখ্য উপজীব্য। বিষয়ভিত্তিক সমালোচনার জন্য পারদর্শিতা অর্জন করতে হয়। প্রচুর লেখাপড়ার প্রয়োজন, আর এটা তো সবার জানা সমালোচনার উর্ধ্বে কেউ নয়।

ভুলে গেলে চলবে না, গম্ভীরা গান সহজেই জনগণকে আকৃষ্ট করে মনের খোরাক যোগায়। চলমান ঘটনা প্রবাহের সাথে নিজস্ব চিন্তাচেতনার যোগসূত্র আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা থাকে। এ যোগসূত্রের কারণেই গম্ভীরার গ্রহণযোগ্যতা অনেক গুণ বেশি।

শিল্পী ও কুশীলবদের ভালো করে উপলব্ধি করা উচিত যে, আজকে যেভাবে তারা গান পরিবেশন করছেন টেকনোলজির কল্যাণে স্থায়ীত্ব লাভ করতে পারে। রকিব-কুতুবের যুগ দু’দশকেরও আগে যবনিকা ঘটেছে, তাদের পরিবেশিত গম্ভীরার ভিডিও চিত্র এখন মহার্ঘ। এই যুগ সন্ধিক্ষণে বর্তমান ও ভবিষ্যতের কুশীলবদের বিশেষভাবে সতর্ক, সঠিক দিকনির্দেশনার উৎস চিহ্নিত এবং যাবতীয় উপাদান ও উপকরণ আত্মস্থ করে পরিবেশনায় নামতে হবে। ফলশ্রুতিতে পরিবেশনায় সংযোজনের ধারাবাহিকতা এবং ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে গম্ভীরার আদিসত্তা বেঁচে থাকবে।

গম্ভীরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সম্পদ। ফলে এর লালন পালন ও মূল ধারাকে বাঁচিয়ে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের কুশীলবদের ওপর বর্তায়। দায়িত্ব রক্ষার বড় কারণ হিসেবে বিবেচনায় চলে আসে যে, সম্প্রতিককালে গম্ভীরার প্রচলন দেশব্যাপী শুরু হয়ে গেছে। আমাদের সঠিক পরিবেশনায় তারা অনুপ্রাণিত হবে এবং অনুসরণের পথ খুঁজে পাবে। পাশাপাশি আমরাও উচ্চমার্গের গম্ভীরা পরিবেশনার নিশানায় পৌঁছে যাব। গম্ভীরা কুশীলবদের কাছ থেকে আমরা সেই দিনের প্রত্যাশায় রইলাম।