মানবিক সংবেদনের কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

গৌতম গুহ রায়

“স্পষ্ট আমি বলতে পারি ঐ

অন্তিম শয্যার শাদা আবরণী তুলে ফেলে কেউ

ভিতরে তাকাও যদি, দেখবে কোনো মৃতদেহ নেই।”

১৯৫৯-এ প্রকাশিত হয়েছিলো তাঁর, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের প্রথম কবিতার বই ‘যৌবন বাউল’, এর প্রায় ৬০ বছর পরে অলোকরঞ্জন শূন্য বাংলা কবিতার বিশ্বে দাঁড়িয়ে পাঠক পড়ছি তাঁর ‘একটি শবযাত্রা’র উল্লিখিত লাইনগুলো, যখন তিনি প্রাণশূন্য শবদেহ হয়ে অনেক অনেক দূরদেশে শুয়ে আছেন। আমাদের চোখ, আমাদের মন, আমাদের অভ্যাস কেবলই চায় সাদা চাদরের তলায় মৃতদেহ দেখতে। কিন্তু সেখানে কোনো মৃতদেহ নেই, পরে আছে চির অম্লান বাংলা কবিতার অক্ষয় বিশ্বের এক কবি। যখন একে একে সাংস্কৃতিক বাংলার উজ্জ্বল আলোগুলো নিভে যাচ্ছে তখন তাঁর প্রয়াণের খবরে এক দিগন্তবিস্তৃত শূন্যতা নিয়ে এলো।

আজ থেকে প্রায় বছর কুড়ি আগে কবিতার আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘কবিতাকে আজ আর একচোরা হয়ে ভাবের ঘরে চুরি করা মানায় না। তাকে থেকে থেকেই চিত্রকলা, সঙ্গীত বা ফিল্মের কাছ থেকে আঁজলা ভরে রসদ নিতে হয়।” সত্যি তাই, অলোকরঞ্জন চেতন জগতের সব মাধ্যম থেকেই রসদ আহরণ করে তৈরি করেছিলেন তাঁর পাশুপাত অস্ত্র, কবিতা। মানবিক উচ্চারণে থেকেছেন আপোসহীন, তাই তাঁর কবিতায় দেশ ও বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক ভাষ্য এসেছে, তিনি সচেতনভাবেই তার প্রয়োগ করেছেন, তবে তাঁর স্বতন্ত্র কাব্য দর্শনের সঙ্গে আপোস করে নয়। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতায় মিথ ব্যবহার ও আর্ট-ডিমিথ কবিতাকে অনন্য এক স্বাদ এনে দিয়েছে। তাঁর কথা বলার অতো বাংলা বলার ভঙ্গিটিও অসাধারণ। দীর্ঘদিন প্রবাসী হয়েও মাতৃভাষা কবির হৃদয় অধিকার করে আছে আছে।

১৯৫৯-এ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের প্রথম কবিতার বই ‘যৌবন বাউল’ পাঠকের হাতে আসে। এই প্রথম প্রকাশ্যেই তিনি তাঁর স্বাতন্ত্র্যের চিহ্ন রাখেন। “এই সকালের আড়ালে কি কোনো তামসী রাতের / অন্ধকারের প্রস্তুতি নেই? / নির্জন থেক জন্ম যে-সব সোনালিমায়ার কুহেলিকাদের / এ সকাল মাতে তাদের সঙ্গে প্রদক্ষিণেই! /শ্বেতকরবীর বুক জুড়ে ওই একটি শালিক / বসে আছে যেন ঐন্দ্রজালিক।”... “নিরালা নিখিল, সবকিছু দাও, / মৃত্যুর সুরা, জীয়নের সুধাও, / আর তারপরে দ্বিগুণ অর্ঘ্য অর্চনা নাও।”

এই প্রত্যক্ষ কথন থেকে ক্রমশ কবিতার রহস্যবুননে এক ভিন্ন নির্মাণে চলে যেতে থাকেন এরপর। ১৯৯৯তে, চার দশক পরে তিনি লিখলেন- ‘এখনো নামেনি, বন্ধু, নিউক্লিয়ার শীতের গোধূলি’। উচ্চকিত কথন থেকে সরে এসে এখানে তিনি স্তব্ধভাষী-

এখন আমন ধান বুনে চলি নৈশ বিদ্যালয়ে

কিংবা যেখানেই দেখি মননের থর মরুভূমি

তাকে নাব্য করে দিতে চাই, যেন সে নিজে জানে

সে আসলে কথা বলছে আমার সত্তায় মুখ রেখে;

গুরুর চরণ আমি বাংলাভাষার অভিধানে

এভাবেই ছেয়ে দিয়ে সরে যাই বোবা ও বাচাল

সঙ্গগ্রহ করার কাজে, ওদের মাঝখানে সেতু হয়ে

শুয়ে পড়ি, এইভাবে বলার অজ¯্র কথা এসে

কন্থায় জমেছে, তবু সমারোহে অড়ষ্ট হৃদয়:

কিছু বলতে গেলে আমি আজ শুধু চুপ করে থাকি!

এই ‘চুপ করে থাকা’টাই কবিতার কাছে যাওয়ার পথ বলে যিনি ভাবতেন তিনি একদিন ‘মেধাবী বেদনা’য় লিখেছিলেন, ‘মনন এবং মনের বিচ্ছেদ আজ আমাদের কাছে একটি স্বস্তিকর অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে’। দীর্ঘ কবিজীবনে বারংবার কবিতার ডিকশন পাল্টেছে তাঁর। পৃথিবীর ঘটনাসমূহের প্রভাবকে তিনি আত্মসাৎ করেছেন, এর পর তা তাঁর নির্মাণে এসেছে। কবিতা সংগ্রহের তৃতীয় খণ্ডের সূচনায় লিখলেন, ‘মার্কিন আগ্রাসনের দাপটে ঘনিয়ে এল গালফ যুদ্ধ, আমার জন্য রেখে গেল পূর্বধার্য কাব্যমীমাংসার বদলে চ্যালেঞ্জ সঞ্চারী কাব্যজিজ্ঞাসা।” এই চ্যালেঞ্জ সঞ্চারী কাব্যজিজ্ঞাসাই তাঁর কবিতা সাধনার প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিলো ক্রমশ। তাঁর কবিতাসমগ্রের মুখবন্ধের কবিতায় সেই প্রত্যয় আভাসিত:

পটভূমিকা অন্ধকার আপন স্বত্ব অধিকার

রাখুক, আমি শরীর নোয়াবো না,

একটি মাত্র রাখাল যাক, এ মাঠ একলা পড়ে থাক

নীরিবে, আমি এ মাথ ছাড়বো না।

মরণমদমাতাল ডোম সবি করুক উপশম

শ্মাশানে, আমি জীবন ছাড়বো না।

জীবনানন্দ দাশ প্রসঙ্গে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত লিখেছিলেন যে, “কোনো কবিকেই কেউ কখনোই সমগ্রভাবে ছুঁতে পারে না”। তিনি নিজে ছিলেন আত্মগত, প্রায় নীরব এক শব্দ করিগর। স্বগতোক্তির মতো তাঁর কবিতা নীরবে পাঠকের মনের ভেতর ‘বসত করা’র জমি অধিকার করে নেয়। বিষয় বিচিত্র ও সুসংস্কৃত ভাষা অলোকরঞ্জনের কবিতার স্থায়িত্বের শক্তি। কবিতার নির্মাণে মিথের ব্যবহার তাঁকে এক আলাদা উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। পৌরাণিক প্রতীক ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত কবি তাই অনয়াসে লিখে ফেলেন,

“মহেশ্বর জাগি আমি, অতন্দ্রিত পদ্মবীজ মালা

এখনো গৌরীর হাতে, আমি তার বিষণœ নিরালা

দুই হাতে অঞ্জলি ক’রে আমারি আকাশে দিই, তুমি যার উদ্ভাসিত ঊষা;

তামসী আমার গৌরী, তাকে দাও আলোর শুশ্রƒষা।”

শুধু মিথের উচ্চারণে নয় বিষয় ও উপাদাঙ্কে অতিক্রম করে যাওয়ার অসাধারণ মুন্সিয়ানা ছিলো তাঁর। অলোকরঞ্জন ধ্রুপদী কবি, তাঁর কবিতার পরিসর মানবের স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছাপূরণের নক্সিকাথা। “দুই পাহাড়ের মধ্যে একটি আকাশ / বুকে নিয়ে আমি আর নীলকণ্ঠ পুর / দুই পাহাড়ের খাদে সূর্য মৃত্যুগামী।” (পান্থশালা/নীলকণ্ঠ পুর)

‘যৌবন বাউল’, ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’ আর ‘রক্তাক্ত ঝরোখা’ এই তিনটি কবিতার বই তাঁর বহুমাত্রিক কাব্যভাবনার পরিচায়ক হয়ে উঠেছিলো পাঠকের কাছে। এর মাঝে ‘প্রতিদিন সূর্যের পার্বণ’ যেন কিছুটা ভিন্ন স্বরের কবিতা। উল্লিখিত তিনটি বই-এ আমরা শান্তিনিকেতন থেকে সাওতাল পরগনার মাটির গন্ধ লাগা মানুষদের এক সংবেদনী সাথীকে দেখতে পাই। এই স্বদেশাত্মার পাণ্ডুলিপি কিছুটা পালটে যায় যখন ‘ছোউ-কাবুকির মুখোশ’ পড়ি। ১৯৭৩-এ প্রকাশিত হয় এই ‘ছৌ কাবুকির মুখোশ’, ১৯৫৯ থেকে ১৯৭৩, মাঝের ১৪ বছরে তিনি ভারত থেকে জার্মানিতে অভিবাসী, তাঁর অনুভূতি ধারণ করছে ইউরোপের সমকাল ও অতীতের অভিঘাতকে। কিন্তু কবিকে বারংবার ফিরে আসতে হয় তাঁর শেকড়ের কাছেই, অলোকরঞ্জনও তার ব্যতিক্রম হননি। ‘প্রবাসের নির্জন রাত্রি’র মাঝে খুঁজে নিতে চেয়েছেন আপন ভিটার গন্ধ। ‘ছৌ কাবুকির নক্সা’র সূচনা কবিতায় সেই স্বর দেখা যায়: ‘তুমি এসো বার্লিনের দুই দিক থেকে / অবিভক্ত সাদা-কালো খঞ্জন আমার / ছৌ-কাবুকি ছদ্মবেশে / চূর্ণ করে দাও যত অলীক সীমান্ত / আমি যদি কৃত্রিম প্রাচীর গড়ি / মৃদু পক্ষপাতে ভেঙে দিয়ো / ডানার অটুট রাখা ভাঙে যদি আমাদের প্রেম ॥’ আলোচনা প্রসঙ্গে অলোকরঞ্জন লিখেছিলেন যে বিষ্ণু দে-কে তিনি আচমকা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাঁর এপিক প্রতিম ‘জল দাও’ কবিতার অন্তিম মন্ত্র ‘জলদাও আমার শিকড়ে’ হপকিন্সের ‘send my roots rain’-এর সহধ্বনি কিনা। এর উত্তরে, অনুমতির সমর্থনে তিনি অলোকরঞ্জনকে লেখেন যে, ‘কবিতার এবং মনের মিলিত যন্ত্রণার ঘোরেই কবিতাটি লিখিত হয়।’ এটি শুধুমাত্র বিষ্ণু দে’র কথা ছিলো না, এ যেন অলোকরঞ্জনের স্বগতোক্তিও ছিলো। এই কবিতাটির আলোচনা অন্তে তিনি তাই লিখেছিলেন, রোমান্টিক অলংকারশাস্ত্রের স্বাভাবিমানী লালিত্যমসৃণ ‘সমাহৃত আবেগের সমাহিত অভিব্যক্তি’ শীর্ষক কাব্যমীমাংসা নয়। আমি এরকম কোনো উদ্ভট থিসিস উত্থাপন করতে চাইনে যে, রোমান্টিক নন্দনতত্ত্ব আধুনিক প্রবণতার কাছে খারিজ হবার যোগ্য। পক্ষান্তরে, অনপব্যয়ী রোমান্টিকতা আজকের মানসের পক্ষে অনিবার্য একটি আশ্রয় ভূমিকা, সেকথা জোর গলায় বলতে দ্বিধা নেই। কিন্তু সেটাই সম্ভবত আমাদের এষণার একমাত্র বিষয় নয়, আমাদের আরাধ্য হওয়া উচিত প্রথাগত কাব্যমীমাংসা ভেঙ্গে একটি অজ¯্রমুখী কাব্যজিজ্ঞাসার নির্মিতি।” এই অজ¯্রমুখী কাব্যজিজ্ঞাসাই তাঁর কবিতার ‘বেসিক ইন্সটিংট’ হয়ে কাজ করেছে। তাই বারংবার দিকবদলেও তিনি অব্যাহত অবিচল ও একই রকম প্রাণপ্রাচুর্যে সম্পদশালী থেকেছেন কবিতায়। কবিতা ও গদ্য উভয় ক্ষেত্রেই তিনি সমানভাবেই শব্দ নির্মাণের ঝলকানি দেখা যায়। প্রতিটি শব্দ ও মুদ্রা নির্মাণে তিনি অমোঘ থাকতে চান।

সমালোচক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় এই তাঁকে নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেছেন যে শব্দ নির্মাণের মুদ্রাটি ছাড়াও আরও একটি মুদ্রাকে অলোকরঞ্জন তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষার অঙ্গ করে নিয়েছিলেন- কবিতার জন্মমুহূর্তের দ্যোতনাকে তিনি প্রায়ই স্থাপন করেন এক পটচিত্রকথার বয়ানে, যাতে স্মৃতি থেকে উঠে আসে ইতিহাস-পুরাণ-বর্তমানের নানা চরিত্র, কখনো চেনাজানা সমকালীন মানুষও, কল্পভূমিকায়, কল্পভাষে; কখনওবা সরাসরি ব্যক্তিস্মৃতির বাস্তবতায়; অনুষঙ্গ রূপকের এক বিচিত্র মাত্রায়। কবিস্বভাবের রূপান্তরকে কাব্যজিজ্ঞাসার মূল ঝোঁক বলে মনে করতেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। কবিতা প্রসঙ্গে তাঁর ‘মেধাবী বেদনা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেন, “কবি, জায়মান কবিতার চাহিদায়, নিজেকে ভেঙ্গে নতুন করে গড়ে তুলবেন, এবং নিজের মানসিকতাকে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখতে থাকবেন যতক্ষণ না ঐ আত্ম-অতিক্রান্তি সাধিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় কবি তাঁর বিপরীত মেরুর সতীর্থের কাছেও অধমর্ণ হতে পারেন, ভক্তি-কবি হপকিন্সের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা ধ্রুপদের পুনর্প্রয়োগে অতি প্রগতিবান কবি বিষ্ণু দে’র চিত্তে কোনো সংকোচ পোষণের কারণ ঘটেনি”। এই জায়গাটাকেই তিনি সমোপকালীন বাংলা কবিতার গহনগ্রন্থী বলে উল্লেখ করেছেন। পঞ্চাশের কবিদের কবিতার প্রকাশ্য সত্তার স্বাধীনতাকে তিনি সমর্থন করেছিলেন, সেই সময়ের কবিতার আবেগকে তিনি “অভিজ্ঞতার নিকটে সংগৃহীত মেধা ও বেদনা ছিল পরস্পরস্পর্শী” বলে উল্লেখ করেছেন। যে আবেগ অলোকরঞ্জনের মধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবাদী উচ্চারণে পরিবর্তিত হয়েছিল। এই প্রতিবাদী উচ্চারণে দলীয় সীমাবদ্ধতা থাকে না, থাকে মানবিক আর্তি ও কবির একান্ত নিজস্ব মানবিক দর্শন। এই কাব্যদর্শন থেকেই তিনি লেখেন, “আমি তোমাদের এখন যা কিছু বলছি সে সমস্তই পাথরের অবরুদ্ধ চিৎকার। তোমরা ডিনামাইট দিয়ে আমাকে বিস্ফারিত করলেই আমার প্রতিবাদের ভাষা বুঝতে পারবে। উদয়াস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখে ফেনা তুলে কথা বলে চলেছিলাম। তাতে কোনোই ফল হয়নি। এখন স্নায়ুশিরার ভাঁজে ভাঁজে জমিয়ে রাখি যাবতীয় বিক্ষোভ।”

ভারতীয় দর্শনের নির্লিপ্ততা রয়েছে অলোকরঞ্জনের মনন ক্ষেত্রের কেন্দ্রে, যাকে ঘিরেই তাঁর কবিতাও আবর্তিত হয়। নিজস্ব চেতন প্রজ্ঞা থেকে তিনি জীবনের অন্তহীন অস্তিত্বককে মানুষের অস্তিত্বের অনুষঙ্গ হিসাবে দেখে কবিতাকে এক স্বতন্ত্র পথ। বাংলার সামাজিক ভিতে জন্ম, বাংলা ভাষার কবি, কিন্তু প্রবাসী থাকার কারণে ইউরোপীয় ঘরনার সঙ্গে তাঁর গড়েওঠা নিবিড় নৈকট্য। জার্মানসহ নানা ইউরোপীয় ভাষার সাহিত্যকে মর্মে ধারণ করেছেন। এই আন্তর্জাতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মিশেছে ভারতের ধর্মীয় ঈশ্বর চেতনা, এই সনাতনী বোধের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত তাগিদে ভাবীকালের সত্যের বীজ রোপণ করে যেতে চান কবি। “এ জন্মে জানি না, তবু আর জন্মে আনন্দ ছিলাম”। অলোকরঞ্জনের ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’ সেই ব্যক্তিদর্শনের এক অতুলনীয় চিহ্ন বহন করছে। এখানে তিনি জন্মমৃত্যু জিজ্ঞাসাকে নিজের মতো করে পাঠকের চেতনার ক্যানভাসে এঁকেছেন। “এই মুহূর্তে যে মানুষটি চলে যাচ্ছে আমি তাকে মন্ত্রের ভিতরে তুলে নিলাম / ছন্নছাড়া- দেবো ওর চলন-বলনে ছন্দ যা থেকে কখনো কেউ ফিরতে পারে না, মৃত্যু সমতলে ক্ষমা তা-ও দেবো,... যেহেতু কখনো ক্ষমা পায়নি বুদ্ধের মতই প্রবুদ্ধ, সম্যক চেতনায় প্রবাহিত যন্ত্রণা মুক্তিই যেন কাম্য কবির কাছে।”

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত দর্শন ভারাক্রান্ত কবিতা যেমন লেখেননি তেমনি নিছক নিসর্গের ‘কবিতার জন্য কবিতা’ লেখেননি তিনি। নিসর্গেও তিনি মায়াময় আবেদনযুক্ত করে তাকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রকৃতি ও পরাবাস্তব জগতের মধ্যে কবিতার সেতুবন্ধন রচনা করেছেন তিনি। “এইভাবে প্রতিদিন বুধুয়ার ডাকে / কানায় কানায় / আলো পথের কলসে ভরা থাকে / ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসে, কেউ তার দিদি, কেউ মাসি / রূপোলি ডানায় যারা নিয়ে যায় বুধুয়ার হাসি”। মানব সংসারের সম্পর্কের আত্মীয়তায় পাখিরা ঢুকে পড়েছে মানবাত্মার গভীরে। এমনই উল্লেখ করা যায় তাঁর ‘মায়ের জন্মদিনে’ কবিতাটি, “আমার চেতনা তাই বেদনারই এক নামান্তর / আমারি জীয়নমন্ত্রে জীবন মৃত এই যে প্রান্তর / সুজনা-সুফলা-শস্য- শ্যামলা ফুল্ল সুষমায় কাল যদি ভরে ওঠে, তবে নিহিত ভাস্বর / যে অমৃত সে তো তুমি আজো যার অপার ক্ষমায় পৃথিবীকে বুকে টানি”। কবিতায় এক বুদ্ধ পূর্ণিমার রাতে সুজাতা সন্ধান পায় তাঁর আরাধ্যকে, এই বুদ্ধচেতনার সুরে কবি লিখে ফেলেন আত্মকথন, ‘মনে হলো এখানে আবার / তোমার সময় থেকে বহুদূর শতাব্দীর তীরে / জয়শড়ী জীবন পাবো ফিরে / ফিরে পাবো পরশ”।

কবি চিরকালীন স্থায়িত্ব চায় কবিতায়, অলোকরঞ্জনের কবিতাও সেই চিরকালীন স্থায়িত্ব পাবে বাংলা ভাষার কবিতা বিশ্বে।

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন ২০২২ , ৯ আষাড় ১৪২৮ ২৩ জিলকদ ১৪৪৩

মানবিক সংবেদনের কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

গৌতম গুহ রায়

image

“স্পষ্ট আমি বলতে পারি ঐ

অন্তিম শয্যার শাদা আবরণী তুলে ফেলে কেউ

ভিতরে তাকাও যদি, দেখবে কোনো মৃতদেহ নেই।”

১৯৫৯-এ প্রকাশিত হয়েছিলো তাঁর, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের প্রথম কবিতার বই ‘যৌবন বাউল’, এর প্রায় ৬০ বছর পরে অলোকরঞ্জন শূন্য বাংলা কবিতার বিশ্বে দাঁড়িয়ে পাঠক পড়ছি তাঁর ‘একটি শবযাত্রা’র উল্লিখিত লাইনগুলো, যখন তিনি প্রাণশূন্য শবদেহ হয়ে অনেক অনেক দূরদেশে শুয়ে আছেন। আমাদের চোখ, আমাদের মন, আমাদের অভ্যাস কেবলই চায় সাদা চাদরের তলায় মৃতদেহ দেখতে। কিন্তু সেখানে কোনো মৃতদেহ নেই, পরে আছে চির অম্লান বাংলা কবিতার অক্ষয় বিশ্বের এক কবি। যখন একে একে সাংস্কৃতিক বাংলার উজ্জ্বল আলোগুলো নিভে যাচ্ছে তখন তাঁর প্রয়াণের খবরে এক দিগন্তবিস্তৃত শূন্যতা নিয়ে এলো।

আজ থেকে প্রায় বছর কুড়ি আগে কবিতার আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘কবিতাকে আজ আর একচোরা হয়ে ভাবের ঘরে চুরি করা মানায় না। তাকে থেকে থেকেই চিত্রকলা, সঙ্গীত বা ফিল্মের কাছ থেকে আঁজলা ভরে রসদ নিতে হয়।” সত্যি তাই, অলোকরঞ্জন চেতন জগতের সব মাধ্যম থেকেই রসদ আহরণ করে তৈরি করেছিলেন তাঁর পাশুপাত অস্ত্র, কবিতা। মানবিক উচ্চারণে থেকেছেন আপোসহীন, তাই তাঁর কবিতায় দেশ ও বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক ভাষ্য এসেছে, তিনি সচেতনভাবেই তার প্রয়োগ করেছেন, তবে তাঁর স্বতন্ত্র কাব্য দর্শনের সঙ্গে আপোস করে নয়। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতায় মিথ ব্যবহার ও আর্ট-ডিমিথ কবিতাকে অনন্য এক স্বাদ এনে দিয়েছে। তাঁর কথা বলার অতো বাংলা বলার ভঙ্গিটিও অসাধারণ। দীর্ঘদিন প্রবাসী হয়েও মাতৃভাষা কবির হৃদয় অধিকার করে আছে আছে।

১৯৫৯-এ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের প্রথম কবিতার বই ‘যৌবন বাউল’ পাঠকের হাতে আসে। এই প্রথম প্রকাশ্যেই তিনি তাঁর স্বাতন্ত্র্যের চিহ্ন রাখেন। “এই সকালের আড়ালে কি কোনো তামসী রাতের / অন্ধকারের প্রস্তুতি নেই? / নির্জন থেক জন্ম যে-সব সোনালিমায়ার কুহেলিকাদের / এ সকাল মাতে তাদের সঙ্গে প্রদক্ষিণেই! /শ্বেতকরবীর বুক জুড়ে ওই একটি শালিক / বসে আছে যেন ঐন্দ্রজালিক।”... “নিরালা নিখিল, সবকিছু দাও, / মৃত্যুর সুরা, জীয়নের সুধাও, / আর তারপরে দ্বিগুণ অর্ঘ্য অর্চনা নাও।”

এই প্রত্যক্ষ কথন থেকে ক্রমশ কবিতার রহস্যবুননে এক ভিন্ন নির্মাণে চলে যেতে থাকেন এরপর। ১৯৯৯তে, চার দশক পরে তিনি লিখলেন- ‘এখনো নামেনি, বন্ধু, নিউক্লিয়ার শীতের গোধূলি’। উচ্চকিত কথন থেকে সরে এসে এখানে তিনি স্তব্ধভাষী-

এখন আমন ধান বুনে চলি নৈশ বিদ্যালয়ে

কিংবা যেখানেই দেখি মননের থর মরুভূমি

তাকে নাব্য করে দিতে চাই, যেন সে নিজে জানে

সে আসলে কথা বলছে আমার সত্তায় মুখ রেখে;

গুরুর চরণ আমি বাংলাভাষার অভিধানে

এভাবেই ছেয়ে দিয়ে সরে যাই বোবা ও বাচাল

সঙ্গগ্রহ করার কাজে, ওদের মাঝখানে সেতু হয়ে

শুয়ে পড়ি, এইভাবে বলার অজ¯্র কথা এসে

কন্থায় জমেছে, তবু সমারোহে অড়ষ্ট হৃদয়:

কিছু বলতে গেলে আমি আজ শুধু চুপ করে থাকি!

এই ‘চুপ করে থাকা’টাই কবিতার কাছে যাওয়ার পথ বলে যিনি ভাবতেন তিনি একদিন ‘মেধাবী বেদনা’য় লিখেছিলেন, ‘মনন এবং মনের বিচ্ছেদ আজ আমাদের কাছে একটি স্বস্তিকর অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে’। দীর্ঘ কবিজীবনে বারংবার কবিতার ডিকশন পাল্টেছে তাঁর। পৃথিবীর ঘটনাসমূহের প্রভাবকে তিনি আত্মসাৎ করেছেন, এর পর তা তাঁর নির্মাণে এসেছে। কবিতা সংগ্রহের তৃতীয় খণ্ডের সূচনায় লিখলেন, ‘মার্কিন আগ্রাসনের দাপটে ঘনিয়ে এল গালফ যুদ্ধ, আমার জন্য রেখে গেল পূর্বধার্য কাব্যমীমাংসার বদলে চ্যালেঞ্জ সঞ্চারী কাব্যজিজ্ঞাসা।” এই চ্যালেঞ্জ সঞ্চারী কাব্যজিজ্ঞাসাই তাঁর কবিতা সাধনার প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিলো ক্রমশ। তাঁর কবিতাসমগ্রের মুখবন্ধের কবিতায় সেই প্রত্যয় আভাসিত:

পটভূমিকা অন্ধকার আপন স্বত্ব অধিকার

রাখুক, আমি শরীর নোয়াবো না,

একটি মাত্র রাখাল যাক, এ মাঠ একলা পড়ে থাক

নীরিবে, আমি এ মাথ ছাড়বো না।

মরণমদমাতাল ডোম সবি করুক উপশম

শ্মাশানে, আমি জীবন ছাড়বো না।

জীবনানন্দ দাশ প্রসঙ্গে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত লিখেছিলেন যে, “কোনো কবিকেই কেউ কখনোই সমগ্রভাবে ছুঁতে পারে না”। তিনি নিজে ছিলেন আত্মগত, প্রায় নীরব এক শব্দ করিগর। স্বগতোক্তির মতো তাঁর কবিতা নীরবে পাঠকের মনের ভেতর ‘বসত করা’র জমি অধিকার করে নেয়। বিষয় বিচিত্র ও সুসংস্কৃত ভাষা অলোকরঞ্জনের কবিতার স্থায়িত্বের শক্তি। কবিতার নির্মাণে মিথের ব্যবহার তাঁকে এক আলাদা উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। পৌরাণিক প্রতীক ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত কবি তাই অনয়াসে লিখে ফেলেন,

“মহেশ্বর জাগি আমি, অতন্দ্রিত পদ্মবীজ মালা

এখনো গৌরীর হাতে, আমি তার বিষণœ নিরালা

দুই হাতে অঞ্জলি ক’রে আমারি আকাশে দিই, তুমি যার উদ্ভাসিত ঊষা;

তামসী আমার গৌরী, তাকে দাও আলোর শুশ্রƒষা।”

শুধু মিথের উচ্চারণে নয় বিষয় ও উপাদাঙ্কে অতিক্রম করে যাওয়ার অসাধারণ মুন্সিয়ানা ছিলো তাঁর। অলোকরঞ্জন ধ্রুপদী কবি, তাঁর কবিতার পরিসর মানবের স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছাপূরণের নক্সিকাথা। “দুই পাহাড়ের মধ্যে একটি আকাশ / বুকে নিয়ে আমি আর নীলকণ্ঠ পুর / দুই পাহাড়ের খাদে সূর্য মৃত্যুগামী।” (পান্থশালা/নীলকণ্ঠ পুর)

‘যৌবন বাউল’, ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’ আর ‘রক্তাক্ত ঝরোখা’ এই তিনটি কবিতার বই তাঁর বহুমাত্রিক কাব্যভাবনার পরিচায়ক হয়ে উঠেছিলো পাঠকের কাছে। এর মাঝে ‘প্রতিদিন সূর্যের পার্বণ’ যেন কিছুটা ভিন্ন স্বরের কবিতা। উল্লিখিত তিনটি বই-এ আমরা শান্তিনিকেতন থেকে সাওতাল পরগনার মাটির গন্ধ লাগা মানুষদের এক সংবেদনী সাথীকে দেখতে পাই। এই স্বদেশাত্মার পাণ্ডুলিপি কিছুটা পালটে যায় যখন ‘ছোউ-কাবুকির মুখোশ’ পড়ি। ১৯৭৩-এ প্রকাশিত হয় এই ‘ছৌ কাবুকির মুখোশ’, ১৯৫৯ থেকে ১৯৭৩, মাঝের ১৪ বছরে তিনি ভারত থেকে জার্মানিতে অভিবাসী, তাঁর অনুভূতি ধারণ করছে ইউরোপের সমকাল ও অতীতের অভিঘাতকে। কিন্তু কবিকে বারংবার ফিরে আসতে হয় তাঁর শেকড়ের কাছেই, অলোকরঞ্জনও তার ব্যতিক্রম হননি। ‘প্রবাসের নির্জন রাত্রি’র মাঝে খুঁজে নিতে চেয়েছেন আপন ভিটার গন্ধ। ‘ছৌ কাবুকির নক্সা’র সূচনা কবিতায় সেই স্বর দেখা যায়: ‘তুমি এসো বার্লিনের দুই দিক থেকে / অবিভক্ত সাদা-কালো খঞ্জন আমার / ছৌ-কাবুকি ছদ্মবেশে / চূর্ণ করে দাও যত অলীক সীমান্ত / আমি যদি কৃত্রিম প্রাচীর গড়ি / মৃদু পক্ষপাতে ভেঙে দিয়ো / ডানার অটুট রাখা ভাঙে যদি আমাদের প্রেম ॥’ আলোচনা প্রসঙ্গে অলোকরঞ্জন লিখেছিলেন যে বিষ্ণু দে-কে তিনি আচমকা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাঁর এপিক প্রতিম ‘জল দাও’ কবিতার অন্তিম মন্ত্র ‘জলদাও আমার শিকড়ে’ হপকিন্সের ‘send my roots rain’-এর সহধ্বনি কিনা। এর উত্তরে, অনুমতির সমর্থনে তিনি অলোকরঞ্জনকে লেখেন যে, ‘কবিতার এবং মনের মিলিত যন্ত্রণার ঘোরেই কবিতাটি লিখিত হয়।’ এটি শুধুমাত্র বিষ্ণু দে’র কথা ছিলো না, এ যেন অলোকরঞ্জনের স্বগতোক্তিও ছিলো। এই কবিতাটির আলোচনা অন্তে তিনি তাই লিখেছিলেন, রোমান্টিক অলংকারশাস্ত্রের স্বাভাবিমানী লালিত্যমসৃণ ‘সমাহৃত আবেগের সমাহিত অভিব্যক্তি’ শীর্ষক কাব্যমীমাংসা নয়। আমি এরকম কোনো উদ্ভট থিসিস উত্থাপন করতে চাইনে যে, রোমান্টিক নন্দনতত্ত্ব আধুনিক প্রবণতার কাছে খারিজ হবার যোগ্য। পক্ষান্তরে, অনপব্যয়ী রোমান্টিকতা আজকের মানসের পক্ষে অনিবার্য একটি আশ্রয় ভূমিকা, সেকথা জোর গলায় বলতে দ্বিধা নেই। কিন্তু সেটাই সম্ভবত আমাদের এষণার একমাত্র বিষয় নয়, আমাদের আরাধ্য হওয়া উচিত প্রথাগত কাব্যমীমাংসা ভেঙ্গে একটি অজ¯্রমুখী কাব্যজিজ্ঞাসার নির্মিতি।” এই অজ¯্রমুখী কাব্যজিজ্ঞাসাই তাঁর কবিতার ‘বেসিক ইন্সটিংট’ হয়ে কাজ করেছে। তাই বারংবার দিকবদলেও তিনি অব্যাহত অবিচল ও একই রকম প্রাণপ্রাচুর্যে সম্পদশালী থেকেছেন কবিতায়। কবিতা ও গদ্য উভয় ক্ষেত্রেই তিনি সমানভাবেই শব্দ নির্মাণের ঝলকানি দেখা যায়। প্রতিটি শব্দ ও মুদ্রা নির্মাণে তিনি অমোঘ থাকতে চান।

সমালোচক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় এই তাঁকে নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেছেন যে শব্দ নির্মাণের মুদ্রাটি ছাড়াও আরও একটি মুদ্রাকে অলোকরঞ্জন তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষার অঙ্গ করে নিয়েছিলেন- কবিতার জন্মমুহূর্তের দ্যোতনাকে তিনি প্রায়ই স্থাপন করেন এক পটচিত্রকথার বয়ানে, যাতে স্মৃতি থেকে উঠে আসে ইতিহাস-পুরাণ-বর্তমানের নানা চরিত্র, কখনো চেনাজানা সমকালীন মানুষও, কল্পভূমিকায়, কল্পভাষে; কখনওবা সরাসরি ব্যক্তিস্মৃতির বাস্তবতায়; অনুষঙ্গ রূপকের এক বিচিত্র মাত্রায়। কবিস্বভাবের রূপান্তরকে কাব্যজিজ্ঞাসার মূল ঝোঁক বলে মনে করতেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। কবিতা প্রসঙ্গে তাঁর ‘মেধাবী বেদনা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেন, “কবি, জায়মান কবিতার চাহিদায়, নিজেকে ভেঙ্গে নতুন করে গড়ে তুলবেন, এবং নিজের মানসিকতাকে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখতে থাকবেন যতক্ষণ না ঐ আত্ম-অতিক্রান্তি সাধিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় কবি তাঁর বিপরীত মেরুর সতীর্থের কাছেও অধমর্ণ হতে পারেন, ভক্তি-কবি হপকিন্সের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা ধ্রুপদের পুনর্প্রয়োগে অতি প্রগতিবান কবি বিষ্ণু দে’র চিত্তে কোনো সংকোচ পোষণের কারণ ঘটেনি”। এই জায়গাটাকেই তিনি সমোপকালীন বাংলা কবিতার গহনগ্রন্থী বলে উল্লেখ করেছেন। পঞ্চাশের কবিদের কবিতার প্রকাশ্য সত্তার স্বাধীনতাকে তিনি সমর্থন করেছিলেন, সেই সময়ের কবিতার আবেগকে তিনি “অভিজ্ঞতার নিকটে সংগৃহীত মেধা ও বেদনা ছিল পরস্পরস্পর্শী” বলে উল্লেখ করেছেন। যে আবেগ অলোকরঞ্জনের মধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবাদী উচ্চারণে পরিবর্তিত হয়েছিল। এই প্রতিবাদী উচ্চারণে দলীয় সীমাবদ্ধতা থাকে না, থাকে মানবিক আর্তি ও কবির একান্ত নিজস্ব মানবিক দর্শন। এই কাব্যদর্শন থেকেই তিনি লেখেন, “আমি তোমাদের এখন যা কিছু বলছি সে সমস্তই পাথরের অবরুদ্ধ চিৎকার। তোমরা ডিনামাইট দিয়ে আমাকে বিস্ফারিত করলেই আমার প্রতিবাদের ভাষা বুঝতে পারবে। উদয়াস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখে ফেনা তুলে কথা বলে চলেছিলাম। তাতে কোনোই ফল হয়নি। এখন স্নায়ুশিরার ভাঁজে ভাঁজে জমিয়ে রাখি যাবতীয় বিক্ষোভ।”

ভারতীয় দর্শনের নির্লিপ্ততা রয়েছে অলোকরঞ্জনের মনন ক্ষেত্রের কেন্দ্রে, যাকে ঘিরেই তাঁর কবিতাও আবর্তিত হয়। নিজস্ব চেতন প্রজ্ঞা থেকে তিনি জীবনের অন্তহীন অস্তিত্বককে মানুষের অস্তিত্বের অনুষঙ্গ হিসাবে দেখে কবিতাকে এক স্বতন্ত্র পথ। বাংলার সামাজিক ভিতে জন্ম, বাংলা ভাষার কবি, কিন্তু প্রবাসী থাকার কারণে ইউরোপীয় ঘরনার সঙ্গে তাঁর গড়েওঠা নিবিড় নৈকট্য। জার্মানসহ নানা ইউরোপীয় ভাষার সাহিত্যকে মর্মে ধারণ করেছেন। এই আন্তর্জাতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মিশেছে ভারতের ধর্মীয় ঈশ্বর চেতনা, এই সনাতনী বোধের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত তাগিদে ভাবীকালের সত্যের বীজ রোপণ করে যেতে চান কবি। “এ জন্মে জানি না, তবু আর জন্মে আনন্দ ছিলাম”। অলোকরঞ্জনের ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’ সেই ব্যক্তিদর্শনের এক অতুলনীয় চিহ্ন বহন করছে। এখানে তিনি জন্মমৃত্যু জিজ্ঞাসাকে নিজের মতো করে পাঠকের চেতনার ক্যানভাসে এঁকেছেন। “এই মুহূর্তে যে মানুষটি চলে যাচ্ছে আমি তাকে মন্ত্রের ভিতরে তুলে নিলাম / ছন্নছাড়া- দেবো ওর চলন-বলনে ছন্দ যা থেকে কখনো কেউ ফিরতে পারে না, মৃত্যু সমতলে ক্ষমা তা-ও দেবো,... যেহেতু কখনো ক্ষমা পায়নি বুদ্ধের মতই প্রবুদ্ধ, সম্যক চেতনায় প্রবাহিত যন্ত্রণা মুক্তিই যেন কাম্য কবির কাছে।”

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত দর্শন ভারাক্রান্ত কবিতা যেমন লেখেননি তেমনি নিছক নিসর্গের ‘কবিতার জন্য কবিতা’ লেখেননি তিনি। নিসর্গেও তিনি মায়াময় আবেদনযুক্ত করে তাকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রকৃতি ও পরাবাস্তব জগতের মধ্যে কবিতার সেতুবন্ধন রচনা করেছেন তিনি। “এইভাবে প্রতিদিন বুধুয়ার ডাকে / কানায় কানায় / আলো পথের কলসে ভরা থাকে / ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসে, কেউ তার দিদি, কেউ মাসি / রূপোলি ডানায় যারা নিয়ে যায় বুধুয়ার হাসি”। মানব সংসারের সম্পর্কের আত্মীয়তায় পাখিরা ঢুকে পড়েছে মানবাত্মার গভীরে। এমনই উল্লেখ করা যায় তাঁর ‘মায়ের জন্মদিনে’ কবিতাটি, “আমার চেতনা তাই বেদনারই এক নামান্তর / আমারি জীয়নমন্ত্রে জীবন মৃত এই যে প্রান্তর / সুজনা-সুফলা-শস্য- শ্যামলা ফুল্ল সুষমায় কাল যদি ভরে ওঠে, তবে নিহিত ভাস্বর / যে অমৃত সে তো তুমি আজো যার অপার ক্ষমায় পৃথিবীকে বুকে টানি”। কবিতায় এক বুদ্ধ পূর্ণিমার রাতে সুজাতা সন্ধান পায় তাঁর আরাধ্যকে, এই বুদ্ধচেতনার সুরে কবি লিখে ফেলেন আত্মকথন, ‘মনে হলো এখানে আবার / তোমার সময় থেকে বহুদূর শতাব্দীর তীরে / জয়শড়ী জীবন পাবো ফিরে / ফিরে পাবো পরশ”।

কবি চিরকালীন স্থায়িত্ব চায় কবিতায়, অলোকরঞ্জনের কবিতাও সেই চিরকালীন স্থায়িত্ব পাবে বাংলা ভাষার কবিতা বিশ্বে।