গ্যাসের হিসাবের ‘তেলেসমাতি’ : তিতাস এখন মিলাবে কিভাবে?

মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকের দ্বিমুখী চুলায় (ডাবল বার্নার) মাসে ৭৮ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহারের হিসাব দেখাতো তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (তিতাস)। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হিসাবে মিটারবিহীন দ্বিমুখী চুলায় মাসে গড়ে ৬০ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার হয়। আর প্রিইপেইড মিটার আছে এমন আবাসিক গ্রাহকদের অনেকেরই মাসে গড়ে ৪০ ঘনমিটার গ্যাস রান্নায় ব্যবহৃত হয়।

গ্যাস বিতরণে রাষ্ট্রীয় সবচেয়ে বড় কোম্পানি তিতাসের মিটারবিহীন আবাসিক সংযোগ প্রায় ২৪ লাখ। বিইআরসি যে হিসাব দিচ্ছে তাতে মাসে ৪ কোটি ৩২ লাখ ঘনমিটার, বছরে ৫১ কোটি ৮৪ লাখ ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ না করেই হিসাবের খাতায় তুলে রাখতো তিতাস।

সম্প্রতি এই গোঁজামিলের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে বিইআরসির কারণে। এই বিশাল পরিমাণ গ্যাস কী করতো তিতাস? সংশ্লিষ্টদের মতে এর একটা বড় অংশ ‘চুরি করে বিক্রি’ করা হতো। আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস কম দিয়ে এতদিন ‘চুরির হিসাব’ মিলাতো তিতাস। বড় বড় কল-কারখানায় মিটার টেম্পারিং করে বিল কমানোর খবর নতুন নয়। লাখ লাখ টাকার গ্যাস বিল চুরি হচ্ছে এভাবে। অথচ তিতাসের সিস্টেমলস নিয়ন্ত্রণে।

ঢাকার আশপাশে অসংখ্য অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রচুর গ্যাস চুরি হচ্ছে। এত চুরির পরও তিতাসের লোকসান হচ্ছে না। লাভে আছে কোম্পানিটি।

বিইআরসির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, এতদিন আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস ব্যবহারের বাড়তি হিসাব তিতাস গ্যাসকে সুবিধা করে দিয়েছে। মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকরা ছিল তিতাসের জন্য ‘সোনার ডিমপাড়া হাঁস’। এখন সেই হাঁস কেটে (জবাই করা) ফেলা হয়েছে। এখন তিতাস হিসাব মিলাবে কীভাবেÑ প্রশ্ন সেই কর্মকর্তার।

প্রায় এক যুগ আগে বিষয়টি সামনে আসে, ২০১১ সালে যখন পরীক্ষামূলক প্রিপেইড মিটার বসানোর কাজ শুরু করে তিতাস। সে সময় অল্প কিছু মিটার বসানো হয়েছিল। ২০১৭ সালে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে প্রিপেইড মিটার বসানোর কাজ শুরু হয়। ২০১৯ সালে বিইআরসি সব গ্রাহকদের প্রিপেইড মিটার বসানোর নির্দেশনা দেয়।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তিতাস এ পর্যন্ত তিন লাখ ত্রিশ হাজার প্রিপেইড মিটার স্থাপন করেছে। এখনও ২৪ লাখের বেশি মিটারবিহীন গ্রাহক আছে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর (ক্যাব) সহ-সভাপতি ড. এম শামসুল আলম সংবাদকে বলেন, ‘তিতাস মিটার বসানোর ক্ষেত্রে গড়িমসি করছে। কারণ প্রিপেইড হলেই সব চুরি বন্ধ হয়ে যাবে।’ তবে তিতাস বলছে, ২০২৪ সালের মধ্যে সব আবাসিক গ্রাহককে প্রিপেইড সিস্টেমের আওতায় আনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরও ১২ লাখ প্রিপেইড মিটার বসানোর জন্য ২টি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২ , ২২ আষাড় ১৪২৮ ২৬ জিলহজ ১৪৪৩

গ্যাসের হিসাবের ‘তেলেসমাতি’ : তিতাস এখন মিলাবে কিভাবে?

ফয়েজ আহমেদ তুষার

মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকের দ্বিমুখী চুলায় (ডাবল বার্নার) মাসে ৭৮ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহারের হিসাব দেখাতো তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (তিতাস)। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হিসাবে মিটারবিহীন দ্বিমুখী চুলায় মাসে গড়ে ৬০ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার হয়। আর প্রিইপেইড মিটার আছে এমন আবাসিক গ্রাহকদের অনেকেরই মাসে গড়ে ৪০ ঘনমিটার গ্যাস রান্নায় ব্যবহৃত হয়।

গ্যাস বিতরণে রাষ্ট্রীয় সবচেয়ে বড় কোম্পানি তিতাসের মিটারবিহীন আবাসিক সংযোগ প্রায় ২৪ লাখ। বিইআরসি যে হিসাব দিচ্ছে তাতে মাসে ৪ কোটি ৩২ লাখ ঘনমিটার, বছরে ৫১ কোটি ৮৪ লাখ ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ না করেই হিসাবের খাতায় তুলে রাখতো তিতাস।

সম্প্রতি এই গোঁজামিলের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে বিইআরসির কারণে। এই বিশাল পরিমাণ গ্যাস কী করতো তিতাস? সংশ্লিষ্টদের মতে এর একটা বড় অংশ ‘চুরি করে বিক্রি’ করা হতো। আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস কম দিয়ে এতদিন ‘চুরির হিসাব’ মিলাতো তিতাস। বড় বড় কল-কারখানায় মিটার টেম্পারিং করে বিল কমানোর খবর নতুন নয়। লাখ লাখ টাকার গ্যাস বিল চুরি হচ্ছে এভাবে। অথচ তিতাসের সিস্টেমলস নিয়ন্ত্রণে।

ঢাকার আশপাশে অসংখ্য অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রচুর গ্যাস চুরি হচ্ছে। এত চুরির পরও তিতাসের লোকসান হচ্ছে না। লাভে আছে কোম্পানিটি।

বিইআরসির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, এতদিন আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস ব্যবহারের বাড়তি হিসাব তিতাস গ্যাসকে সুবিধা করে দিয়েছে। মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকরা ছিল তিতাসের জন্য ‘সোনার ডিমপাড়া হাঁস’। এখন সেই হাঁস কেটে (জবাই করা) ফেলা হয়েছে। এখন তিতাস হিসাব মিলাবে কীভাবেÑ প্রশ্ন সেই কর্মকর্তার।

প্রায় এক যুগ আগে বিষয়টি সামনে আসে, ২০১১ সালে যখন পরীক্ষামূলক প্রিপেইড মিটার বসানোর কাজ শুরু করে তিতাস। সে সময় অল্প কিছু মিটার বসানো হয়েছিল। ২০১৭ সালে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে প্রিপেইড মিটার বসানোর কাজ শুরু হয়। ২০১৯ সালে বিইআরসি সব গ্রাহকদের প্রিপেইড মিটার বসানোর নির্দেশনা দেয়।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তিতাস এ পর্যন্ত তিন লাখ ত্রিশ হাজার প্রিপেইড মিটার স্থাপন করেছে। এখনও ২৪ লাখের বেশি মিটারবিহীন গ্রাহক আছে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর (ক্যাব) সহ-সভাপতি ড. এম শামসুল আলম সংবাদকে বলেন, ‘তিতাস মিটার বসানোর ক্ষেত্রে গড়িমসি করছে। কারণ প্রিপেইড হলেই সব চুরি বন্ধ হয়ে যাবে।’ তবে তিতাস বলছে, ২০২৪ সালের মধ্যে সব আবাসিক গ্রাহককে প্রিপেইড সিস্টেমের আওতায় আনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরও ১২ লাখ প্রিপেইড মিটার বসানোর জন্য ২টি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।