রংপুরের পীরগঞ্জে কিশোরীকে অপহরণ-ধর্ষণ, আসামি তোজাম্মেলের যাবজ্জীবন

রংপুরের পীরগঞ্জে এক কিশোরীকে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ করে রংপুর, নীলফামারী ও ঢাকার গাজীপুরে ১১ দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আসামি তোজাম্মেল হোসেনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- প্রদান করেছে আদালত। গতকাল দুপুরে রংপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত-৩ এর বিচারক আলী হোসেন এ রায় প্রদান করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিল। পরে তাকে কঠোর পুলিশি পাহারায় আদালতের হাজতখানায় নেয়া হয় এরপর কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার অভিযোগে জানা গেছে ২০২০ সালের ২৯ জুন তারিখে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার পাচগাছি গ্রামের মঞ্জুর হোসেনের কিশোরী কন্যাকে একই গ্রামের তোজাম্মেল হোসেন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ করে প্রথমে রংপুরে নিয়ে আসে। সেখান থেকে নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলায় একটি গ্রামে নিয়ে গিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে ৩ দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করে। এরপর কিশোরী মেয়েটিকে ঢাকার গাজীপুরে নিয়ে গিয়ে আরও ৮ দিন একটি বাসায় আটকে রেখে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে।

ধর্ষণ করার পর কিশোরী কান্নাকাটি শুরু করলে আসামি তোজাম্মেল হোসেন তাকে ঢাকার গাজীপুর থেকে রংপুরে নিয়ে আসে। এরপর তাকে মিঠাপুকুর উপজেলার বৈরাতি এলাকায় নিয়ে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায়। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় ধর্ষিতা মেয়েটি তার বাড়িতে খবর দিলে তার বাবা ও অন্য স্বজনরা সেখানে এসে মেয়েটিকে নিয়ে বাড়ি চলে আসে।

এ ঘটনায় ১৪ জুলাই তারিখে কিশোরী বাবা মঞ্জুর হোসেন বাদী হয়ে পীরগজ্ঞ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করে। মামলাটি তদন্ত শেষে পীরগঞ্জ থানার এসআই আলমগীর আদালতে আসামি তোজাম্মেল হোসেন ও তার সহযোগী হিসেবে জামিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২৮/০৯/২২ইং তারিখে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। মামলায় ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা শেষে আসামি তোজাম্মেল হোসেনকে দোষী সাব্যস্ত করে অপহরণ করার অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ধর্ষণের অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও দুই মাসের কারাদ-ের আদেশ দেন।

বিচারক তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন আসামি তোজাম্মেল হোসেন একজন ১৪ বছরের নাবালিকা কিশোরী মেয়েকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ করে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে তাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করেছে। সে অপহরণ করার বিষয়টি অস্বীকার করেনি সাক্ষীরাও সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে কিশোরীটিকে অপহরণ করা হয়েছিল। সে কারণে অপহরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। আর ধর্ষণের অভিযোগটি ভিকটিম আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে বলেছে আদালতে সাক্ষ্যও দিয়েছে। আর ধর্ষণের ঘটনা কারো সামনে হয় না এটা গোপনেই হয় ফলে এর কোন চাক্ষুস সাক্ষী থাকে না তবে ভিকটিম ও সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষী দিয়ে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে ধর্ষণ করার ঘটনাটি। তাছাড়া রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছে কিশোরী মেয়েটিকে পরীক্ষা করে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। সাক্ষ্য প্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে আসামি তোজাম্মেল হোসেন অপহরণ করে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে ধর্ষণ করেছে সে কারণে তাকে অপহরণ ও ধর্ষণের দুই অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- দেয়া হলো।

তবে দুই অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হলেও আসামিকে একবারই যাবজ্জীবন কারাদ- ভোগ করতে হবে। মামলার অন্য আসামি জামিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন আদালত।

মামলায় সরকার পক্ষের আইনজীবী বিশেষ পিপি তাইজুর রহমান লাইজুর অ্যাডভোকেট রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে ন্যায় বিচার পেয়েছেন বলে জানান। তবে আসামি পক্ষের কোন আইনজীবী রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাদের কোন বক্তব্য জানা যায়নি।

বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২ , ২৩ আষাড় ১৪২৮ ২৭ জিলহজ ১৪৪৩

রংপুরের পীরগঞ্জে কিশোরীকে অপহরণ-ধর্ষণ, আসামি তোজাম্মেলের যাবজ্জীবন

লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর

রংপুরের পীরগঞ্জে এক কিশোরীকে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ করে রংপুর, নীলফামারী ও ঢাকার গাজীপুরে ১১ দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আসামি তোজাম্মেল হোসেনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- প্রদান করেছে আদালত। গতকাল দুপুরে রংপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত-৩ এর বিচারক আলী হোসেন এ রায় প্রদান করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিল। পরে তাকে কঠোর পুলিশি পাহারায় আদালতের হাজতখানায় নেয়া হয় এরপর কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার অভিযোগে জানা গেছে ২০২০ সালের ২৯ জুন তারিখে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার পাচগাছি গ্রামের মঞ্জুর হোসেনের কিশোরী কন্যাকে একই গ্রামের তোজাম্মেল হোসেন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ করে প্রথমে রংপুরে নিয়ে আসে। সেখান থেকে নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলায় একটি গ্রামে নিয়ে গিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে ৩ দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করে। এরপর কিশোরী মেয়েটিকে ঢাকার গাজীপুরে নিয়ে গিয়ে আরও ৮ দিন একটি বাসায় আটকে রেখে উপর্যুপরি ধর্ষণ করে।

ধর্ষণ করার পর কিশোরী কান্নাকাটি শুরু করলে আসামি তোজাম্মেল হোসেন তাকে ঢাকার গাজীপুর থেকে রংপুরে নিয়ে আসে। এরপর তাকে মিঠাপুকুর উপজেলার বৈরাতি এলাকায় নিয়ে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায়। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় ধর্ষিতা মেয়েটি তার বাড়িতে খবর দিলে তার বাবা ও অন্য স্বজনরা সেখানে এসে মেয়েটিকে নিয়ে বাড়ি চলে আসে।

এ ঘটনায় ১৪ জুলাই তারিখে কিশোরী বাবা মঞ্জুর হোসেন বাদী হয়ে পীরগজ্ঞ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করে। মামলাটি তদন্ত শেষে পীরগঞ্জ থানার এসআই আলমগীর আদালতে আসামি তোজাম্মেল হোসেন ও তার সহযোগী হিসেবে জামিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২৮/০৯/২২ইং তারিখে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। মামলায় ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা শেষে আসামি তোজাম্মেল হোসেনকে দোষী সাব্যস্ত করে অপহরণ করার অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ধর্ষণের অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও দুই মাসের কারাদ-ের আদেশ দেন।

বিচারক তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন আসামি তোজাম্মেল হোসেন একজন ১৪ বছরের নাবালিকা কিশোরী মেয়েকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ করে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে তাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করেছে। সে অপহরণ করার বিষয়টি অস্বীকার করেনি সাক্ষীরাও সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে কিশোরীটিকে অপহরণ করা হয়েছিল। সে কারণে অপহরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। আর ধর্ষণের অভিযোগটি ভিকটিম আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে বলেছে আদালতে সাক্ষ্যও দিয়েছে। আর ধর্ষণের ঘটনা কারো সামনে হয় না এটা গোপনেই হয় ফলে এর কোন চাক্ষুস সাক্ষী থাকে না তবে ভিকটিম ও সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষী দিয়ে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে ধর্ষণ করার ঘটনাটি। তাছাড়া রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছে কিশোরী মেয়েটিকে পরীক্ষা করে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। সাক্ষ্য প্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে আসামি তোজাম্মেল হোসেন অপহরণ করে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে ধর্ষণ করেছে সে কারণে তাকে অপহরণ ও ধর্ষণের দুই অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- দেয়া হলো।

তবে দুই অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হলেও আসামিকে একবারই যাবজ্জীবন কারাদ- ভোগ করতে হবে। মামলার অন্য আসামি জামিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন আদালত।

মামলায় সরকার পক্ষের আইনজীবী বিশেষ পিপি তাইজুর রহমান লাইজুর অ্যাডভোকেট রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে ন্যায় বিচার পেয়েছেন বলে জানান। তবে আসামি পক্ষের কোন আইনজীবী রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাদের কোন বক্তব্য জানা যায়নি।