শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার ষষ্ঠবর্ষে শহীদদের স্মরণ

শোলাকিয়া ঈদগায় ২০১৬ সালে ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের জামাতের আগ মুহূর্তে ঈদগার অদূরে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ষষ্ঠবর্ষ ছিল গতকাল। সেদিন জঙ্গিদের হামলায় দুইজন পুলিশ সদস্য ও এক গৃহবধূর নির্মম মৃত্যু ঘটেছিল। তাদের স্মরণে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গতকাল সকালে ওই এলাকায় স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভে সেদিনের শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়েছে। এ সময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম, পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার), জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জেলা পরিষদ প্রশাসক অ্যাড. জিল্লুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. এমএ আফজল, পৌর মেয়র মাহমুদ পারভেজ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মোস্তাক সরকার, নূরে আলম, মো. আল আমিন এবং অনির্বাণ চৌধুরী এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. গোলাম মোস্তফা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ওই বছর ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে নারকীয় জঙ্গি হামলার কারণে শোলাকিয়ার ঈদুল ফিতর জামাতকে কেন্দ্র করে নেয়া হয়েছিল বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সেদিন জামাত শুরু হওয়ার কথা ছিল সকাল ১০টায়। এর আগেই লাখ লাখ মুসল্লিতে ঈদগা পূর্ণ হয়ে আশপাশের এলাকায় বিস্তৃতি লাভ করে। আর পৌনে ৯টার সময়ই ঘটে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা। ঈদগার দুইশ’ গজ উত্তর-পশ্চিম কোণে আজিমুদ্দিন হাইস্কুলের পাশে বসানো পুলিশের চেকপোস্টে দুই তরুণের ব্যাগ তল্লাশির সময় তারা গ্র্যানেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চোখের পলকে চাপতি নিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ চালায়।

এতে অন্তত ১২ পুলিশ সদস্য আহত হন। এদের মধ্যে মুমূর্ষু অবস্থায় কনস্টেবল আনছারুল হক ও জহিরুল ইসলামকে হাপতালে নেয়ার পথে তাদের মৃত্যু হয়। জঙ্গি হামলার পর অন্য পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দুই পক্ষের বন্দুকযুদ্ধে ঘটনাস্থলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জঙ্গি আবির রহমান (২৩) মারা যান। এ সময় মাথায় গুলি লেগে নিজ বাসার ভেতর মারা যান গৃহবধূ ঝর্ণা রাণী ভৌমিক (৪৩)। আর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক হন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট এলাকার অন্য জঙ্গি শফিউল ইসলাম ডন (২২)। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ শহরের জাহিদুল হক তানিম (৩০) নামে এক সন্দেহভাজন যুবককেও আটক করে। উদ্ধার হয় দুটি পিস্তল, একটি তাজা গ্রেনেড, চাপাতি ও চাইনিজ কুড়াল। অবশ্য শফিউল ইসলাম ডনকে ওই বছর ৪ আগস্ট মধ্যরাতে চিকিৎসাশেষে ময়মনসিংহ থেকে র‌্যাবের পাহারায় কিশোরগঞ্জে নিয়ে আসার পথে নান্দাইলে অন্য জঙ্গিরা হামলা চালালে বন্দুকযুদ্ধে শফিউলসহ অজ্ঞাত এক জঙ্গি মারা যান।

হামলার ঘটনায় পুলিশ পরিদর্শক মো. সামছুদ্দীন বাদী হয়ে শফিউল ও তানিমসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে সন্ত্রাস বিরোধী আইন-২০০৯ (সংশোধনী) ৬(২)/৮/৯/১০/১২/১৩ ধারায় কিশোরগঞ্জ সদর থানায় ১০ জুলাই মামলা (নং-১৪) দায়ের করেছিলেন। এদিকে জঙ্গি হামলায় নিহত দুই পুলিশ সদস্য আনছারুল হক ও জহিরুল ইসলাম এবং গৃহবধূ ঝর্ণা রাণী ভৌমিকের নামে পৌর কর্তৃপক্ষ শোলাকিয়া এলাকায় তিনটি রাস্তার নামকরণ করেছে। ঢাকা রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি মাহফুজুল হক নূরুজ্জামান পরের বছর ১০ জানুয়ারি এসে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব রাস্তার নামফলক উন্মোচন করেছিলেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আরিফুর রহমান পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদের তত্ত্বাবধানে ২০১৮ সালের ২৬ জুলাই সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলার অভিযোগপত্র (অভিযোগপত্র নং ৩৫৭) দাখিল করেছেন। তাতে মোট ২৩ জনকে আসামি দেখানো হয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র ৫ জন জীবিত, তারা কারাগারে রয়েছেন।

এরা হলেনÑ গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার নেপথ্য কারিগর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার হাজারদীঘা গ্রামের মৃত হোসেন আলীর ছেলে বড় মিজান (৬৫), গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম রাঘবপুর গ্রামের ওমর গণি ম-লের ছেলে রাজিব গান্ধী (৩৭), কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার সাদীপুর (কাবলিপাড়া) গ্রামের রেজাউল করিমের ছেলে সোহেল মাহফুজ (৩৮), জঙ্গিদের আশ্রয়দাতা গাইবান্ধা এলাকার আনোয়ার হোসেন (৫১) ও কিশোরগঞ্জ শহরের জাহিদুল হক তানিম (৩০)। অন্য আসামিদের মধ্যে নব্য জেএমবির অন্যতম কুশিলব তামিম চৌধুরী ও মারজানসহ ১৯ জনই ইতোমধ্যে এনকাউন্টার, আত্মঘাতি বা অন্য কোনভাবে মারা গেছেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে রাজধানীসহ অন্য জেলায় বেশ কিছু মামলা থাকায় তাদের একসঙ্গে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না বলে এখন পর্যন্ত কোন সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

আরও খবর
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় বিশ্বের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে
এক জেলা থেকে অন্য জেলায় মোটরসাইকেল চলবে ‘অতি জরুরি’ ক্ষেত্রে, তবে আগে অনুমতি নিতে হবে
সচিবালয়ে শেষ মুহূর্তের কর্মব্যস্ততা, দুপুরের আগেই ফাঁকা
রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা পরিবর্তন ও যাত্রী হয়রানির প্রতিবাদে ঢাবি শিক্ষার্থীর অবস্থান
লোডশেডিংয়ের প্রভাবে কল কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত
পদ্মা সেতু দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের স্বস্তির ঈদযাত্রা
নোয়াখালীতে ছাত্রলীগ নেতাকে জবাই করে হত্যা
কুষ্টিয়ায় নিখোঁজের ৫ দিন পর সাংবাদিকের লাশ উদ্ধার
সাভারে তীব্র যানজট, ভোগান্তিতে ঘুরমুখো মানুষ
ডেলিভারি সিস্টেম হ্যাক করে পণ্য হাতিয়ে নিত চক্রটি

শুক্রবার, ০৮ জুলাই ২০২২ , ২৪ আষাড় ১৪২৮ ২৮ জিলহজ ১৪৪৩

শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার ষষ্ঠবর্ষে শহীদদের স্মরণ

জেলা বার্তা পরিবেশক, কিশোরগঞ্জ

শোলাকিয়া ঈদগায় ২০১৬ সালে ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের জামাতের আগ মুহূর্তে ঈদগার অদূরে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ষষ্ঠবর্ষ ছিল গতকাল। সেদিন জঙ্গিদের হামলায় দুইজন পুলিশ সদস্য ও এক গৃহবধূর নির্মম মৃত্যু ঘটেছিল। তাদের স্মরণে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গতকাল সকালে ওই এলাকায় স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভে সেদিনের শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়েছে। এ সময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম, পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার), জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জেলা পরিষদ প্রশাসক অ্যাড. জিল্লুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. এমএ আফজল, পৌর মেয়র মাহমুদ পারভেজ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মোস্তাক সরকার, নূরে আলম, মো. আল আমিন এবং অনির্বাণ চৌধুরী এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. গোলাম মোস্তফা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ওই বছর ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে নারকীয় জঙ্গি হামলার কারণে শোলাকিয়ার ঈদুল ফিতর জামাতকে কেন্দ্র করে নেয়া হয়েছিল বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সেদিন জামাত শুরু হওয়ার কথা ছিল সকাল ১০টায়। এর আগেই লাখ লাখ মুসল্লিতে ঈদগা পূর্ণ হয়ে আশপাশের এলাকায় বিস্তৃতি লাভ করে। আর পৌনে ৯টার সময়ই ঘটে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা। ঈদগার দুইশ’ গজ উত্তর-পশ্চিম কোণে আজিমুদ্দিন হাইস্কুলের পাশে বসানো পুলিশের চেকপোস্টে দুই তরুণের ব্যাগ তল্লাশির সময় তারা গ্র্যানেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চোখের পলকে চাপতি নিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ চালায়।

এতে অন্তত ১২ পুলিশ সদস্য আহত হন। এদের মধ্যে মুমূর্ষু অবস্থায় কনস্টেবল আনছারুল হক ও জহিরুল ইসলামকে হাপতালে নেয়ার পথে তাদের মৃত্যু হয়। জঙ্গি হামলার পর অন্য পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দুই পক্ষের বন্দুকযুদ্ধে ঘটনাস্থলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জঙ্গি আবির রহমান (২৩) মারা যান। এ সময় মাথায় গুলি লেগে নিজ বাসার ভেতর মারা যান গৃহবধূ ঝর্ণা রাণী ভৌমিক (৪৩)। আর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক হন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট এলাকার অন্য জঙ্গি শফিউল ইসলাম ডন (২২)। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ শহরের জাহিদুল হক তানিম (৩০) নামে এক সন্দেহভাজন যুবককেও আটক করে। উদ্ধার হয় দুটি পিস্তল, একটি তাজা গ্রেনেড, চাপাতি ও চাইনিজ কুড়াল। অবশ্য শফিউল ইসলাম ডনকে ওই বছর ৪ আগস্ট মধ্যরাতে চিকিৎসাশেষে ময়মনসিংহ থেকে র‌্যাবের পাহারায় কিশোরগঞ্জে নিয়ে আসার পথে নান্দাইলে অন্য জঙ্গিরা হামলা চালালে বন্দুকযুদ্ধে শফিউলসহ অজ্ঞাত এক জঙ্গি মারা যান।

হামলার ঘটনায় পুলিশ পরিদর্শক মো. সামছুদ্দীন বাদী হয়ে শফিউল ও তানিমসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে সন্ত্রাস বিরোধী আইন-২০০৯ (সংশোধনী) ৬(২)/৮/৯/১০/১২/১৩ ধারায় কিশোরগঞ্জ সদর থানায় ১০ জুলাই মামলা (নং-১৪) দায়ের করেছিলেন। এদিকে জঙ্গি হামলায় নিহত দুই পুলিশ সদস্য আনছারুল হক ও জহিরুল ইসলাম এবং গৃহবধূ ঝর্ণা রাণী ভৌমিকের নামে পৌর কর্তৃপক্ষ শোলাকিয়া এলাকায় তিনটি রাস্তার নামকরণ করেছে। ঢাকা রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি মাহফুজুল হক নূরুজ্জামান পরের বছর ১০ জানুয়ারি এসে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব রাস্তার নামফলক উন্মোচন করেছিলেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আরিফুর রহমান পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদের তত্ত্বাবধানে ২০১৮ সালের ২৬ জুলাই সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলার অভিযোগপত্র (অভিযোগপত্র নং ৩৫৭) দাখিল করেছেন। তাতে মোট ২৩ জনকে আসামি দেখানো হয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র ৫ জন জীবিত, তারা কারাগারে রয়েছেন।

এরা হলেনÑ গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার নেপথ্য কারিগর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার হাজারদীঘা গ্রামের মৃত হোসেন আলীর ছেলে বড় মিজান (৬৫), গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম রাঘবপুর গ্রামের ওমর গণি ম-লের ছেলে রাজিব গান্ধী (৩৭), কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার সাদীপুর (কাবলিপাড়া) গ্রামের রেজাউল করিমের ছেলে সোহেল মাহফুজ (৩৮), জঙ্গিদের আশ্রয়দাতা গাইবান্ধা এলাকার আনোয়ার হোসেন (৫১) ও কিশোরগঞ্জ শহরের জাহিদুল হক তানিম (৩০)। অন্য আসামিদের মধ্যে নব্য জেএমবির অন্যতম কুশিলব তামিম চৌধুরী ও মারজানসহ ১৯ জনই ইতোমধ্যে এনকাউন্টার, আত্মঘাতি বা অন্য কোনভাবে মারা গেছেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে রাজধানীসহ অন্য জেলায় বেশ কিছু মামলা থাকায় তাদের একসঙ্গে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না বলে এখন পর্যন্ত কোন সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।