৭ বছরেও ২০ কোটি বকেয়া পায়নি চামড়া ব্যবসায়ীরা

নওগাঁয় বছরের পর বছর ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে পাওনা কোটি কোটি টাকা না পাওয়ায় পথে বসেছেন অনেক চামড়া ব্যবসায়ী। গত ৭ বছরে চামড়া ব্যবসায়ীদের পাওনা প্রায় ২০ কোটি টাকা না পেয়ে অনেকে দেউলিয়া হয়ে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। ট্যানারী মালিকরা স্বল্প সুদে সরকারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তারা অন্য ব্যবসার কাজে লাগান। ব্যবসায়ীদের দাবিÑ কোরবানির ইদে চামড়ার দামের চরম দরপতনে প্রতিবছরই লাভের আশায় চামড়া কিনে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের । মূল্যবান সম্পদ চামড়ার সুদিন ফিরে আনতে ট্যানারী মালিক নয় চামড়া ব্যবসাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে সরাসরি সরকারকে একটি নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কেনার আহ্বান জানিয়েছে নওগাঁর চামড়া ব্যবসায়ীরা। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ও ভারতে চামড়ার দাম বেশি থাকলেও ট্যানারী মালিকদের দু’টি সংগঠন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম নির্ধারণ করে দেওয়া ও বকেয়া টাকা পরিশোধ না করার কারণে দিন দিন চামড়া ব্যবসা থেকে অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অপরদিকে লবনের দাম দ্বিগুন বৃদ্ধি হওয়াসহ শ্রমিক সংকট নতুন করে হতাশায় ফেলেছে চামড়া ব্যবসায়ীদের। এ বারের ঈদে ৫থেকে ৬কোটি টাকার চামড়া বেচা কেনার সম্ভাবনা থাকলেও ট্যানারী মালিকদের কাছ থেকে পাওনা টাকা না পাওয়ায় আসন্ন ঈদে চামড়া কেনা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীরা। প্রতি বছর ঈদুল আজহার দিনে নওগাঁয় কোরবানির পশুর চামড়ার বিশাল বাজার বসে। শহরের বিভিন্ন এলাকা ও গ্রামাঞ্চল থেকে চামড়া কিনে এনে বিক্রির জন্য ভীড় করে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা। কোন ব্যাংক কিংবা ব্যক্তিরাও আর চামড়া ব্যবসায়ীদের টাকা ঋণ দিতে চায়না। আর যদি ট্যানারী মালিকরা বকেয়ার টাকার অর্ধেক টাকাও দিতো তাহলে আবার নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠতো নওগাঁর চামড়া ব্যবসা।

চামড়া ব্যবসায়ী মোস্তফা, রাশেদুল ইসলামসহ অনেকেই বলেন, বর্তমানে লবণসহ সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে। দীর্ঘদিনের ব্যবসা বলে আমরা ঝুঁকি নিয়ে লাভের আশায় প্রতিবছরই চামড়া কিনে ট্যানারী মালিকদের দিই। কিন্তু বকেয়া টাকা দেওয়ার আশ্বাসে ট্যানারী মালিকরা বছরের পর বছর আমাদের টাকা না দেওয়ায় আজ চামড়া ব্যবসা থেকে মুখ ফিরে নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। অথচ সরকারের কাছ থেকে ঠিকই সকল সুবিধা ভোগ করছেন ট্যানারী মালিকরা আর আমরা জলে ভেসে যাচ্ছি।

নওগাঁ চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, এবার সরকারের পক্ষ থেকে চামড়ার দাম কিছুটা বাড়ানো হয়েছে ,এতে ট্যানারি মালিকদের লাভ। আমাদের কোন লাভ নেই। তার কারণ ট্যানারী মালিকরা আমাদেরকে জিম্মি করে চামড়া নেয় আর আমরা একটু লাভের আশায় তাদের হুকুম মেনে চলি। এই চামড়া ব্যবসাকে সরকার যদি একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতো আর সরকার সরাসরি আমাদের কাছ থেকে চামড়া কিনে নিতো তা হলে হয়তোবা চামড়া ব্যবসায় আবার যৌবন ফিরে পেতো। নওগাঁ চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন বলেন, চামড়া জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদটি যেন নষ্ট না হওয় সে জন্য আমরা প্রতি ঈদেই চামড়া কিনে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে রেখে সেগুলো ট্যানারি মালিকদের কাছে হস্তান্তর করি। আর সেই সুযোগে ট্যানারী মালিকরা বছরের পর বছর আমাদের ক্ষতি করেই যাচ্ছে। পাওনা টাকা ফেরতের আশায় একাধিকবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বরাবর আবেদনও করেছি, কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটে পড়ে আজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সকল চামড়া ব্যবসায়ীরা পথে বসতে চলেছে। পাওনা টাকা পরিশোধ না করার কারণে আমরা আমাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছি। তাই চামড়া ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করছি।

জেলা প্রশাসক খালিদ মেহেদী হাসান বলেন, চামড়া একটি জাতীয় সম্পদ। চামড়া অত্যন্ত মূল্যবান একটি পণ্য। চামড়ার দাম না থাকায় প্রতিবছরই আমরা দেখেছি চামড়া নষ্ট হয়ে যেতে।

কিন্তু আসন্ন কোরবানীর ইদে নওগাঁয় জবাই করা পশুর চামড়া যেন নষ্ট না হয় সে জন্য চমড়ায় দ্রুত লবণ মাখিয়ে সংরক্ষণ করার প্রচার-প্রচারনা চলানোর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও জেলার ১১টি উপজেলা প্রশাসনকে চমড়া সংরক্ষণ করার বিষয়টি সাধারন মানুষদের সচেতন করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

শনিবার, ০৯ জুলাই ২০২২ , ২৫ আষাড় ১৪২৮ ২৯ জিলহজ ১৪৪৩

নতুন সংকট লবণের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিক স্বল্পতা

৭ বছরেও ২০ কোটি বকেয়া পায়নি চামড়া ব্যবসায়ীরা

প্রতিনিধি, নওগাঁ

নওগাঁয় বছরের পর বছর ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে পাওনা কোটি কোটি টাকা না পাওয়ায় পথে বসেছেন অনেক চামড়া ব্যবসায়ী। গত ৭ বছরে চামড়া ব্যবসায়ীদের পাওনা প্রায় ২০ কোটি টাকা না পেয়ে অনেকে দেউলিয়া হয়ে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। ট্যানারী মালিকরা স্বল্প সুদে সরকারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তারা অন্য ব্যবসার কাজে লাগান। ব্যবসায়ীদের দাবিÑ কোরবানির ইদে চামড়ার দামের চরম দরপতনে প্রতিবছরই লাভের আশায় চামড়া কিনে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের । মূল্যবান সম্পদ চামড়ার সুদিন ফিরে আনতে ট্যানারী মালিক নয় চামড়া ব্যবসাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে সরাসরি সরকারকে একটি নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কেনার আহ্বান জানিয়েছে নওগাঁর চামড়া ব্যবসায়ীরা। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ও ভারতে চামড়ার দাম বেশি থাকলেও ট্যানারী মালিকদের দু’টি সংগঠন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম নির্ধারণ করে দেওয়া ও বকেয়া টাকা পরিশোধ না করার কারণে দিন দিন চামড়া ব্যবসা থেকে অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অপরদিকে লবনের দাম দ্বিগুন বৃদ্ধি হওয়াসহ শ্রমিক সংকট নতুন করে হতাশায় ফেলেছে চামড়া ব্যবসায়ীদের। এ বারের ঈদে ৫থেকে ৬কোটি টাকার চামড়া বেচা কেনার সম্ভাবনা থাকলেও ট্যানারী মালিকদের কাছ থেকে পাওনা টাকা না পাওয়ায় আসন্ন ঈদে চামড়া কেনা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীরা। প্রতি বছর ঈদুল আজহার দিনে নওগাঁয় কোরবানির পশুর চামড়ার বিশাল বাজার বসে। শহরের বিভিন্ন এলাকা ও গ্রামাঞ্চল থেকে চামড়া কিনে এনে বিক্রির জন্য ভীড় করে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা। কোন ব্যাংক কিংবা ব্যক্তিরাও আর চামড়া ব্যবসায়ীদের টাকা ঋণ দিতে চায়না। আর যদি ট্যানারী মালিকরা বকেয়ার টাকার অর্ধেক টাকাও দিতো তাহলে আবার নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠতো নওগাঁর চামড়া ব্যবসা।

চামড়া ব্যবসায়ী মোস্তফা, রাশেদুল ইসলামসহ অনেকেই বলেন, বর্তমানে লবণসহ সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে। দীর্ঘদিনের ব্যবসা বলে আমরা ঝুঁকি নিয়ে লাভের আশায় প্রতিবছরই চামড়া কিনে ট্যানারী মালিকদের দিই। কিন্তু বকেয়া টাকা দেওয়ার আশ্বাসে ট্যানারী মালিকরা বছরের পর বছর আমাদের টাকা না দেওয়ায় আজ চামড়া ব্যবসা থেকে মুখ ফিরে নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। অথচ সরকারের কাছ থেকে ঠিকই সকল সুবিধা ভোগ করছেন ট্যানারী মালিকরা আর আমরা জলে ভেসে যাচ্ছি।

নওগাঁ চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, এবার সরকারের পক্ষ থেকে চামড়ার দাম কিছুটা বাড়ানো হয়েছে ,এতে ট্যানারি মালিকদের লাভ। আমাদের কোন লাভ নেই। তার কারণ ট্যানারী মালিকরা আমাদেরকে জিম্মি করে চামড়া নেয় আর আমরা একটু লাভের আশায় তাদের হুকুম মেনে চলি। এই চামড়া ব্যবসাকে সরকার যদি একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতো আর সরকার সরাসরি আমাদের কাছ থেকে চামড়া কিনে নিতো তা হলে হয়তোবা চামড়া ব্যবসায় আবার যৌবন ফিরে পেতো। নওগাঁ চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন বলেন, চামড়া জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদটি যেন নষ্ট না হওয় সে জন্য আমরা প্রতি ঈদেই চামড়া কিনে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে রেখে সেগুলো ট্যানারি মালিকদের কাছে হস্তান্তর করি। আর সেই সুযোগে ট্যানারী মালিকরা বছরের পর বছর আমাদের ক্ষতি করেই যাচ্ছে। পাওনা টাকা ফেরতের আশায় একাধিকবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বরাবর আবেদনও করেছি, কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটে পড়ে আজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সকল চামড়া ব্যবসায়ীরা পথে বসতে চলেছে। পাওনা টাকা পরিশোধ না করার কারণে আমরা আমাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছি। তাই চামড়া ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করছি।

জেলা প্রশাসক খালিদ মেহেদী হাসান বলেন, চামড়া একটি জাতীয় সম্পদ। চামড়া অত্যন্ত মূল্যবান একটি পণ্য। চামড়ার দাম না থাকায় প্রতিবছরই আমরা দেখেছি চামড়া নষ্ট হয়ে যেতে।

কিন্তু আসন্ন কোরবানীর ইদে নওগাঁয় জবাই করা পশুর চামড়া যেন নষ্ট না হয় সে জন্য চমড়ায় দ্রুত লবণ মাখিয়ে সংরক্ষণ করার প্রচার-প্রচারনা চলানোর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও জেলার ১১টি উপজেলা প্রশাসনকে চমড়া সংরক্ষণ করার বিষয়টি সাধারন মানুষদের সচেতন করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।