বাঁচানো গেল না জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে

রয়েছে রাজনৈতিক জীবনের উত্থান ও বিতর্ক

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে মারা গেছেন। দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। গতকাল সকালে জাপানের পশ্চিমাঞ্চলীয় নারা শহরে প্রচার কর্মসূচিতে দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হন আবে। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলেও তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলেই জানানো হচ্ছিল। একপর্যায়ে চিকিৎসকদের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী শিনজোর রাজনৈতিক জীবনে ছিল উত্থান ও বিতর্ক।

পাবলিক ব্রডকাস্টার এনএইচকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, নারা শহরে হামলার শিকার হওয়া স্থানের কাছাকাছি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিনজো আবে মারা যান।

পশ্চিমাঞ্চলীয় নারা শহরে প্রচার কর্মসূচিতে বক্তব্য দেয়ার সময় জাপানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর ওপর গুলি চালানো হয়। এরপরই লুটিয়ে পড়েন শিনজো। পরে ঘটনাস্থল থেকে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিবিসি বলছে, প্রচার কর্মসূচিতে বক্তব্য দেয়ার সময় আবেকে পেছন থেকে গুলি করা হয়েছিল।

পৃথক একটি জাপানি সংবাদমাধ্যম কিয়োদো জানায়, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে জাপানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী অচেতন অবস্থায় ছিলেন। হামলার ঘটনার কিছু সময় পর বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, জাপানের রাজধানী টোকিওর সাবেক গভর্নর ইয়োচি মাসুজো টুইটারে দেয়া এক বার্তায় বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কার্ডিওপালমোনারি’তে আক্রান্ত হয়েছেন।

বিবিসি বলছে, জাপানে কোন ব্যক্তির মৃত্যু আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করার আগে এই শব্দটি প্রায়শই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মূলত গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই শিনজো আবে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন।

শিনজো আবের রাজনৈতিক জীবন: উত্থান, বিতর্ক ও মৃত্যু

জাপানে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে পরিচিত ছিলেন তার আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক কৌশলের কারণে। তার অর্থনৈতিক নীতিকে অনেকেই ‘আবেনোমিকস’ নামে ডেকে থাকেন। রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী ৬৭ বছরের এই নেতা দুই বার জাপানের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম কার্যকাল ছিল সংক্ষিপ্ত। ২০০৬ সালে শুরু হয়ে এক বছরের কিছু বেশি সময় ক্ষমতায় থাকলেও এই সময়ে কিছু বিতর্কও তৈরি হয়।

তবে ২০১২ সালে শিনজো আবে বিস্ময়করভাবে ফিরে আসেন এবং দীর্ঘদিন পর ২০২০ সালে স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি যখন দায়িত্ব শুরু করেন জাপানে তখন অর্থনৈতিক মন্দা। কাঠামোগত সংস্থার, মুদ্রা ব্যবস্থা সহজ করা, আর্থিক প্রনোদনা দিয়ে যে অর্থনৈতিক নীতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন তাতে মন্দা কাটিয়ে ফের সচল হয়ে ওঠে জাপানের অর্থনীতি। ২০২০ সালে কয়েক সপ্তাহ ধরে নানা জল্পনার পর পদত্যাগ করেন আবে। ওই সময়ে অন্ত্রের রোগে ভুগছিলেন তিনি। একই রোগের কারণে তাকে ২০০৭ সালেও সরে যেতে হয়। ২০২০ সালে আবে পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন দলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইয়োশিদি সুগা। পরে ক্ষমতায় আসেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা। প্রধানমন্ত্রী না থাকলেও জাপানের রাজনীতিতে ক্ষমতাধর মানুষ ছিলেন আবে।

ক্ষমতায় উত্থান

শিনজো আবে ছিলেন জাপানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিনতারো আবের ছেলে। এছাড়া তার দাদা ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নবুসুকু কিশি। ফলে রাজনৈতিক পরিবারেই জন্ম হয়েছে আবের। তিনি প্রথম পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৯৩ সালে। ২০০৫ সালে তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য হন। ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমি তাকে চিফ কেবিনেট সেক্রেটারি নিয়োগ করেন। ২০০৬ সালে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপানের সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান।

তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন আবেতুমুল জনপ্রিয় ছিলেন আবে

তবে ওই সময়ে বেশ কিছু বিতর্ক তৈরি হয়। সরকার পেনশন রেকর্ড হারিয়ে ফেললে প্রায় পাঁচ কোটি জাপানি ক্ষতিগ্রস্ত হন। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষের নির্বাচনে এলডিপি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেন তিনি।

পরে ২০১২ সালে আবারও প্রধানমন্ত্রী পদে ফিরে আসেন শিনজো আবে। ওই সময়ে তিনি জানান, চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে গেছেন। ২০১৪ ও ২০১৭ সালের নির্বাচনে জিতে জাপানের সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।

তার জনপ্রিয়তা ওঠানামা করেছে কিন্তু মূলত তিনি চ্যালেঞ্জহীন থেকে গেছেন। এর কারণ এলডিপির মধ্যে তার প্রভাব। তৃতীয় মেয়াদে তাকে নেতা বানাতে দলের নিয়মও বদলানো হয়।

একজন বিতর্কিত জাতীয়তাবাদী

প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতিতে আগ্রাসী অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন আবে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জাপানের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সংবিধানও বদলানোর চেষ্টা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া করা ওই সংবিধানকে রক্ষণশীলরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি বাহিনীর লজ্জাজনক পরাজয়ের স্মারক হিসেবে দেখে থাকে।

তার জাতীয়তাবাদী মতামতে প্রায়ই চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বেড়েছে। বিশেষ করে ২০১৩ সালে টোকিওর ইয়াসুকুনি স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনের পর এই উত্তেজনা বাড়ে। বিতর্কিত এই স্মৃতিসৌধটির সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে জাপানের সামরিকায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে হিরোশিমা পিস মেমোরিয়ালে ২০১৬ সালে আবেতৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে হিরোশিমা পিস মেমোরিয়ালে ২০১৬ সালে আবে

বারবার ওই স্মৃতিসৌধে তার ভ্রমণে জাপানের বামপন্থীরাও ক্ষুব্ধ হয়। তারা মনে করেন, এর মাধ্যমে আবে যুদ্ধের সময়ে জাপানের সহিংসতার ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

পদত্যাগ ও মৃত্যু

২০২০ সালের ২৮ আগস্ট আবে পদত্যাগের ঘোষণা দিলে এলডিপির অভ্যন্তরে বিরোধ শুরু হয়। এর কারণ তিনি কোনও উত্তরসূরির নাম ঘোষণায় অস্বীকৃতি জানান। পরে তার দায়িত্ব পান বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও দীর্ঘকালের ক্যাবিনেট সদস্য ইয়োশিদি সুগা। পরে তাকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা। তখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন আবে।

৮ জুলাই আবে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নারাতে এলডিপির এক প্রার্থীর নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিচ্ছিলেন। তার বক্তব্য চলার মাঝে এক বন্দুকধারী তার ওপর গুলি চালায়। ৪১ বছর বয়সী হামলাকারী জাপানের সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের সাবেক সদস্য। এই বাহিনী জাপানের নৌবাহিনীর সমমর্যাদা পেয়ে থাকে।

আবেকে যখন হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখনও তার জ্ঞান ছিল। কিন্তু চিকিৎসকদের সাড়ে চার ঘণ্টার টানা চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মৃত্যু হয় তার।

শনিবার, ০৯ জুলাই ২০২২ , ২৫ আষাড় ১৪২৮ ২৯ জিলহজ ১৪৪৩

বাঁচানো গেল না জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে

রয়েছে রাজনৈতিক জীবনের উত্থান ও বিতর্ক

সংবাদ ডেস্ক

image

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে মারা গেছেন। দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। গতকাল সকালে জাপানের পশ্চিমাঞ্চলীয় নারা শহরে প্রচার কর্মসূচিতে দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হন আবে। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলেও তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলেই জানানো হচ্ছিল। একপর্যায়ে চিকিৎসকদের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী শিনজোর রাজনৈতিক জীবনে ছিল উত্থান ও বিতর্ক।

পাবলিক ব্রডকাস্টার এনএইচকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, নারা শহরে হামলার শিকার হওয়া স্থানের কাছাকাছি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিনজো আবে মারা যান।

পশ্চিমাঞ্চলীয় নারা শহরে প্রচার কর্মসূচিতে বক্তব্য দেয়ার সময় জাপানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর ওপর গুলি চালানো হয়। এরপরই লুটিয়ে পড়েন শিনজো। পরে ঘটনাস্থল থেকে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিবিসি বলছে, প্রচার কর্মসূচিতে বক্তব্য দেয়ার সময় আবেকে পেছন থেকে গুলি করা হয়েছিল।

পৃথক একটি জাপানি সংবাদমাধ্যম কিয়োদো জানায়, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে জাপানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী অচেতন অবস্থায় ছিলেন। হামলার ঘটনার কিছু সময় পর বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, জাপানের রাজধানী টোকিওর সাবেক গভর্নর ইয়োচি মাসুজো টুইটারে দেয়া এক বার্তায় বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কার্ডিওপালমোনারি’তে আক্রান্ত হয়েছেন।

বিবিসি বলছে, জাপানে কোন ব্যক্তির মৃত্যু আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করার আগে এই শব্দটি প্রায়শই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মূলত গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই শিনজো আবে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন।

শিনজো আবের রাজনৈতিক জীবন: উত্থান, বিতর্ক ও মৃত্যু

জাপানে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে পরিচিত ছিলেন তার আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক কৌশলের কারণে। তার অর্থনৈতিক নীতিকে অনেকেই ‘আবেনোমিকস’ নামে ডেকে থাকেন। রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী ৬৭ বছরের এই নেতা দুই বার জাপানের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম কার্যকাল ছিল সংক্ষিপ্ত। ২০০৬ সালে শুরু হয়ে এক বছরের কিছু বেশি সময় ক্ষমতায় থাকলেও এই সময়ে কিছু বিতর্কও তৈরি হয়।

তবে ২০১২ সালে শিনজো আবে বিস্ময়করভাবে ফিরে আসেন এবং দীর্ঘদিন পর ২০২০ সালে স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি যখন দায়িত্ব শুরু করেন জাপানে তখন অর্থনৈতিক মন্দা। কাঠামোগত সংস্থার, মুদ্রা ব্যবস্থা সহজ করা, আর্থিক প্রনোদনা দিয়ে যে অর্থনৈতিক নীতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন তাতে মন্দা কাটিয়ে ফের সচল হয়ে ওঠে জাপানের অর্থনীতি। ২০২০ সালে কয়েক সপ্তাহ ধরে নানা জল্পনার পর পদত্যাগ করেন আবে। ওই সময়ে অন্ত্রের রোগে ভুগছিলেন তিনি। একই রোগের কারণে তাকে ২০০৭ সালেও সরে যেতে হয়। ২০২০ সালে আবে পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন দলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইয়োশিদি সুগা। পরে ক্ষমতায় আসেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা। প্রধানমন্ত্রী না থাকলেও জাপানের রাজনীতিতে ক্ষমতাধর মানুষ ছিলেন আবে।

ক্ষমতায় উত্থান

শিনজো আবে ছিলেন জাপানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিনতারো আবের ছেলে। এছাড়া তার দাদা ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নবুসুকু কিশি। ফলে রাজনৈতিক পরিবারেই জন্ম হয়েছে আবের। তিনি প্রথম পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৯৩ সালে। ২০০৫ সালে তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য হন। ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমি তাকে চিফ কেবিনেট সেক্রেটারি নিয়োগ করেন। ২০০৬ সালে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপানের সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান।

তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন আবেতুমুল জনপ্রিয় ছিলেন আবে

তবে ওই সময়ে বেশ কিছু বিতর্ক তৈরি হয়। সরকার পেনশন রেকর্ড হারিয়ে ফেললে প্রায় পাঁচ কোটি জাপানি ক্ষতিগ্রস্ত হন। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষের নির্বাচনে এলডিপি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেন তিনি।

পরে ২০১২ সালে আবারও প্রধানমন্ত্রী পদে ফিরে আসেন শিনজো আবে। ওই সময়ে তিনি জানান, চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে গেছেন। ২০১৪ ও ২০১৭ সালের নির্বাচনে জিতে জাপানের সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।

তার জনপ্রিয়তা ওঠানামা করেছে কিন্তু মূলত তিনি চ্যালেঞ্জহীন থেকে গেছেন। এর কারণ এলডিপির মধ্যে তার প্রভাব। তৃতীয় মেয়াদে তাকে নেতা বানাতে দলের নিয়মও বদলানো হয়।

একজন বিতর্কিত জাতীয়তাবাদী

প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতিতে আগ্রাসী অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন আবে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জাপানের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সংবিধানও বদলানোর চেষ্টা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া করা ওই সংবিধানকে রক্ষণশীলরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি বাহিনীর লজ্জাজনক পরাজয়ের স্মারক হিসেবে দেখে থাকে।

তার জাতীয়তাবাদী মতামতে প্রায়ই চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বেড়েছে। বিশেষ করে ২০১৩ সালে টোকিওর ইয়াসুকুনি স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনের পর এই উত্তেজনা বাড়ে। বিতর্কিত এই স্মৃতিসৌধটির সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে জাপানের সামরিকায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে হিরোশিমা পিস মেমোরিয়ালে ২০১৬ সালে আবেতৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে হিরোশিমা পিস মেমোরিয়ালে ২০১৬ সালে আবে

বারবার ওই স্মৃতিসৌধে তার ভ্রমণে জাপানের বামপন্থীরাও ক্ষুব্ধ হয়। তারা মনে করেন, এর মাধ্যমে আবে যুদ্ধের সময়ে জাপানের সহিংসতার ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

পদত্যাগ ও মৃত্যু

২০২০ সালের ২৮ আগস্ট আবে পদত্যাগের ঘোষণা দিলে এলডিপির অভ্যন্তরে বিরোধ শুরু হয়। এর কারণ তিনি কোনও উত্তরসূরির নাম ঘোষণায় অস্বীকৃতি জানান। পরে তার দায়িত্ব পান বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও দীর্ঘকালের ক্যাবিনেট সদস্য ইয়োশিদি সুগা। পরে তাকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা। তখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন আবে।

৮ জুলাই আবে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নারাতে এলডিপির এক প্রার্থীর নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিচ্ছিলেন। তার বক্তব্য চলার মাঝে এক বন্দুকধারী তার ওপর গুলি চালায়। ৪১ বছর বয়সী হামলাকারী জাপানের সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের সাবেক সদস্য। এই বাহিনী জাপানের নৌবাহিনীর সমমর্যাদা পেয়ে থাকে।

আবেকে যখন হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখনও তার জ্ঞান ছিল। কিন্তু চিকিৎসকদের সাড়ে চার ঘণ্টার টানা চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মৃত্যু হয় তার।