মাত্র ১৬০০ টাকায় মা-মেয়ের বেঁচে থাকার চেষ্টা

কাজল রেখা। বড়ই মিষ্টি মধুর নাম। মায়া ভরানো এ নামটি বাবা-মা রেখেছেন। জন্মই যেন তার আজন্ম পাপ। জন্ম থেকেই পায়ে ভর দিয়ে চলতে পারেন না। হাঁটতে গেলেই লাগে অন্যের সাহায্য। সাধ্যমত চিকিৎসা করেও মিলেনি কোন ফল। তারপরেও থেমে নেই। বান্ধবী আনোয়ারার সাহায্য নিয়ে চলছেন। অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল ছাত্র-ছাত্রী বাড়ি চলে গেছে। আনোয়ারা দাঁড়িয়ে আছেন বান্ধবী কাজল রেখাকে নিয়ে। বাড়ি ফেরার ভ্যান মিললে কাজল রেখাকে ভ্যানে চাপিয়ে তারপর বাড়ি ফিরবেন আনোয়ারা। এ যেন অনন্য বন্ধুত্ব। এ বন্ধুত্বের হয় না কারো সঙ্গে তুলনা।

এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী কাজল রেখা। পড়ছেন সৈয়দপুর উপজেলার লক্ষণপুর স্কুল এন্ড কলেজে। বাড়ি সৈয়দপুর উপজেলার শেষ সীমানায় বদরগঞ্জের মউয়াগাছ এলাকার বুড়িপুকুর গ্রামে। ছয় বছর বয়সে বাবা একরামুল হককে হারিয়েছেন। মা মমিছা বেগম শয্যাশায়ী। বড় ভাই মমিনুল ইসলাম বিয়ে করে ভিন্ন অন্নে খান। থাকার জায়গা ছাড়া চাষাবাদের নেই কোন এক চিলতে জমি। আয় বলতে মাসে ২২৫০ টাকা। এর মধ্যে এ্যামপাথি নামক একটি বেসরকারী সংস্থা মাসে দেন ১৫০০ আর প্রতিবন্ধি ভাতা পান ৭৫০ টাকা। বাড়ি থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব চার কিলোমিটার। প্রতিদিন ভ্যানে চড়ে আট কিলোমিটার রাস্তা যাতায়াত করতে হয়। এজন্য ব্যয় হয় মাসে ৬০০ টাকা। অবশিষ্ট ১৬০০ টাকা দিয়ে মা-মেয়ের বেঁচে থাকার অবিরাম চেষ্টা। আবার মরার ওপর খাড়ার ঘা। মা মমিছা বেগমকে জমদূতে ধরে ফেলেছেন। তার শরীরে বাসা বেধে আছে হৃদরোগ, কিডনী ও লিভার সমস্যা। তাই ছোট প্রতিবন্ধি কাজল রেখা মাকে বাঁচাবেন, না নিজে বেঁচে থাকবেন এই চিন্তা প্রতিমুহূর্তে তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন দামে মা মেয়ের বেঁচে থাকার জন্য এক কেজি চাল কেনারও সামর্থ্য নেই। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা। বই খাতা নিয়ে পড়তে বসলেই পাশে শুয়ে থাকা মায়ের বেঁচে থাকার আঁকুতি মাথায় পীড়া দেয়। তাছাড়াও নিজেই প্রতিবন্ধী, আবার অসুস্থ মা, এ যেন বিধাতার নির্মম পরিহাস। সঙ্গে রয়েছে আর্থিক চরম দৈন্যতা। এতো প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্বেও সামনে এগুতে চাইছেন কাজল রেখা। সবশেষে কথা হয় তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান অধ্যক্ষ রেজাউল করিম রেজার সঙ্গে। তিনি জানালেন, কাজল রেখা ষষ্ঠ শ্রেণি হতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত লক্ষণপুর স্কুল এন্ড কলেজে পড়ছে। বিনা বেতনে তার অধ্যায়নের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার ফরম পূরণ থেকে শুরু করে পরীক্ষার ফি পর্যন্ত তার কাছ থেকে নেওয়া হয় না।

কিন্তু তার মায়ের চিকিৎসা, বেঁচে থাকার অন্ন, ভবিষ্যৎ লেখাপড়ার দায়ভার কে নিবে? তাই তিনি কাজল রেখার ভবিষ্যৎ জীবনকে এগিয়ে নিতে সহায়তা চেয়েছেন সমাজের হৃদয়বান মানুষের কাছে।

বুধবার, ২৭ জুলাই ২০২২ , ১২ শ্রাবণ ১৪২৯ ২৮ জিলহজ ১৪৪৩

মাত্র ১৬০০ টাকায় মা-মেয়ের বেঁচে থাকার চেষ্টা

প্রতিনিধি, সৈয়দপুর (নীলফামারী)

image

সৈয়দপুর (নীলফামারী) : বান্ধবী আনোয়ারার সঙ্গে প্রতিবন্ধী মেধাবী শিক্ষার্থী কাজল রেখা (ডানে) -সংবাদ

কাজল রেখা। বড়ই মিষ্টি মধুর নাম। মায়া ভরানো এ নামটি বাবা-মা রেখেছেন। জন্মই যেন তার আজন্ম পাপ। জন্ম থেকেই পায়ে ভর দিয়ে চলতে পারেন না। হাঁটতে গেলেই লাগে অন্যের সাহায্য। সাধ্যমত চিকিৎসা করেও মিলেনি কোন ফল। তারপরেও থেমে নেই। বান্ধবী আনোয়ারার সাহায্য নিয়ে চলছেন। অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল ছাত্র-ছাত্রী বাড়ি চলে গেছে। আনোয়ারা দাঁড়িয়ে আছেন বান্ধবী কাজল রেখাকে নিয়ে। বাড়ি ফেরার ভ্যান মিললে কাজল রেখাকে ভ্যানে চাপিয়ে তারপর বাড়ি ফিরবেন আনোয়ারা। এ যেন অনন্য বন্ধুত্ব। এ বন্ধুত্বের হয় না কারো সঙ্গে তুলনা।

এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী কাজল রেখা। পড়ছেন সৈয়দপুর উপজেলার লক্ষণপুর স্কুল এন্ড কলেজে। বাড়ি সৈয়দপুর উপজেলার শেষ সীমানায় বদরগঞ্জের মউয়াগাছ এলাকার বুড়িপুকুর গ্রামে। ছয় বছর বয়সে বাবা একরামুল হককে হারিয়েছেন। মা মমিছা বেগম শয্যাশায়ী। বড় ভাই মমিনুল ইসলাম বিয়ে করে ভিন্ন অন্নে খান। থাকার জায়গা ছাড়া চাষাবাদের নেই কোন এক চিলতে জমি। আয় বলতে মাসে ২২৫০ টাকা। এর মধ্যে এ্যামপাথি নামক একটি বেসরকারী সংস্থা মাসে দেন ১৫০০ আর প্রতিবন্ধি ভাতা পান ৭৫০ টাকা। বাড়ি থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব চার কিলোমিটার। প্রতিদিন ভ্যানে চড়ে আট কিলোমিটার রাস্তা যাতায়াত করতে হয়। এজন্য ব্যয় হয় মাসে ৬০০ টাকা। অবশিষ্ট ১৬০০ টাকা দিয়ে মা-মেয়ের বেঁচে থাকার অবিরাম চেষ্টা। আবার মরার ওপর খাড়ার ঘা। মা মমিছা বেগমকে জমদূতে ধরে ফেলেছেন। তার শরীরে বাসা বেধে আছে হৃদরোগ, কিডনী ও লিভার সমস্যা। তাই ছোট প্রতিবন্ধি কাজল রেখা মাকে বাঁচাবেন, না নিজে বেঁচে থাকবেন এই চিন্তা প্রতিমুহূর্তে তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন দামে মা মেয়ের বেঁচে থাকার জন্য এক কেজি চাল কেনারও সামর্থ্য নেই। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা। বই খাতা নিয়ে পড়তে বসলেই পাশে শুয়ে থাকা মায়ের বেঁচে থাকার আঁকুতি মাথায় পীড়া দেয়। তাছাড়াও নিজেই প্রতিবন্ধী, আবার অসুস্থ মা, এ যেন বিধাতার নির্মম পরিহাস। সঙ্গে রয়েছে আর্থিক চরম দৈন্যতা। এতো প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্বেও সামনে এগুতে চাইছেন কাজল রেখা। সবশেষে কথা হয় তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান অধ্যক্ষ রেজাউল করিম রেজার সঙ্গে। তিনি জানালেন, কাজল রেখা ষষ্ঠ শ্রেণি হতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত লক্ষণপুর স্কুল এন্ড কলেজে পড়ছে। বিনা বেতনে তার অধ্যায়নের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার ফরম পূরণ থেকে শুরু করে পরীক্ষার ফি পর্যন্ত তার কাছ থেকে নেওয়া হয় না।

কিন্তু তার মায়ের চিকিৎসা, বেঁচে থাকার অন্ন, ভবিষ্যৎ লেখাপড়ার দায়ভার কে নিবে? তাই তিনি কাজল রেখার ভবিষ্যৎ জীবনকে এগিয়ে নিতে সহায়তা চেয়েছেন সমাজের হৃদয়বান মানুষের কাছে।