ডলারের সংকট, বেড়েই চলেছে দাম

গতকাল খোলাবাজারে ১১০-১১২ টাকায় বিক্রি হয়েছে

দ্রতগতিতে বেড়ে চলেছে ডলারের দাম। একদিনের ব্যবধানে এই দাম প্রায় ৭ থেকে ৮ টাকা বেড়েছে। গতকাল খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ১১০ থেকে ১১২ টাকায়। অথচ তার আগের দিনই প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছিল ১০৩ থেকে ১০৫ টাকা। গতকাল কয়েকটি মানি চেঞ্জারস প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মানি চেঞ্জারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম ইসমাইল হক সংবাদকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকালে ডলার বিক্রি শুরু হয় ১০৭ থেকে ১০৮ টাকায়। এরপর প্রায় ১২টার দিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১০ টাকায়। আর বিকেল হতেই কেউ কেউ ১১২ টাকায় বিক্রি করেছে। অর্থাৎ বাজারে ডলারের এতটাই সংকট যে, বিক্রেতারা যে দামই বলছে, সেই দামেই ক্রেতারা কিনে ফেলছে।’

করোনা সংকট শুরু পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ইউএস ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমছে। গত সোমবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকার বিপরীতে ডলারের দাম আরও ২৫ পয়সা বেড়েছে। প্রতি ডলার ৯৪ টাকা ৭০ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ব্যাংকগুলো এই দরে ডলার কিনেছে। গত এক বছরে আন্তঃব্যাংক দাম ৯ টাকা ৯০ পয়সা বেড়েছে।

এর আগে করোনা মহামারীর কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরজুড়ে আমদানি কমে গিয়েছিল। তবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বাড়ছিল। সে কারণে বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যায়। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর বাড়তে শুরু করে আমদানি। এছাড়া রপ্তানি বাড়লেও কমতে থাকে রেমিট্যান্স। এতে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভও কমতে থাকে। এতে বাজারে ডলারের চাহিদা ও দাম দুটোই বাড়তে থাকে। এই খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর আগে কখনো চাহিদা এতটা বাড়েনি।

ডলারের দাম কিভাবে বাড়ছে সেটির একটি উদাহরণ দেন ইসমাইল হক। তিনি সংবাদকে বলেন, ‘ডলারের এতটা সংকট আছে যে, আমরা যে দামই বলছি, সেই দামেই ডলার বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। আমার কাছে দুই হাজার ডলার আছে। সকালে একজন আমাকে ফোন করলো। তারা ১০৭ টাকা দামে ডলার কিনতে চান। একবার আমি মনে করলাম, বিক্রি করে দেবো। পরে সিদ্ধান্ত নিলাম, দেখি দাম আরও বাড়ে কিনা। তাই বিক্রি করলাম না। একটু পর তারা আমাকে ফোন দিয়ে বলল, তারা ১১০ টাকায় কিনতে চান।’

এযাবতকালে ডলারের সংকট যেমনটা বেড়েছে তেমন আগে কখনো বাড়েনি উল্লেখ করে ইসমাইল হক বলেন, ‘চলতি বছর ডলারের যে সংকট দেখা দিয়েছে, তেমন সংকট আগে কখনো দেখা যায়নি। সম্ভবত এমন কেউ আছেন যারা ডলার কিনে মজুদ করছেন। তাই ডলারের দাম এতটা বাড়ছে।’

কারা ডলার মজুদ করতে পারেÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে এটার সঙ্গে ব্যাংকগুলো জড়িত থাকতে পারে। কারণ ব্যাংকগুলোও মনে করছে, ডলারের দাম আরও বাড়বে। তাই তারা খোলাবাজার থেকে ডলার কিনে মজুদ করতে পারে।’

তবে এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম সংবাদকে বলছেন, ‘ডলারটা কোথা থেকে আসলো অর্থাৎ তার উৎস কীÑ এসব কাগজপত্র দেখে খোলাবাজার বা মানি চেঞ্জারদের কাছে থেকে ডলার কিনতে পারে। তবে প্রতিটি ব্যাংকে এর একটা লিমিট দেয়া আছে। এর বাইরে ডলার মজুদ করার সুযোগ নেই। তারা যদি আইন ভেঙে ডলার মজুদ করে তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’

এভাবে ডলারের দাম বাড়তে থাকায় বাজার স্বাভাবিক রাখতে ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২১-২২ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে ৭৬২ কোটি ডলার বিক্রি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই রিজার্ভ থেকে এক অর্থবছরে এত ডলার বিক্রি করা হয়নি। আর এর বিপরীতে বাজার থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকার মতো তুলে নেয়া হয়। অথচ তার আগের অর্থবছরে (২০২০-২১) বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় দর ধরে রাখতে রেকর্ড প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সেই ধারাবাহিকতায় চাহিদা মেটাতে নতুন অর্থবছরেও (২০২২-২৩) ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের ২৫ দিনেই প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপরও বাজারে ডলার সংকট কাটছে না।

বুধবার, ২৭ জুলাই ২০২২ , ১২ শ্রাবণ ১৪২৯ ২৮ জিলহজ ১৪৪৩

ডলারের সংকট, বেড়েই চলেছে দাম

গতকাল খোলাবাজারে ১১০-১১২ টাকায় বিক্রি হয়েছে

রেজাউল করিম

image

দ্রতগতিতে বেড়ে চলেছে ডলারের দাম। একদিনের ব্যবধানে এই দাম প্রায় ৭ থেকে ৮ টাকা বেড়েছে। গতকাল খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ১১০ থেকে ১১২ টাকায়। অথচ তার আগের দিনই প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছিল ১০৩ থেকে ১০৫ টাকা। গতকাল কয়েকটি মানি চেঞ্জারস প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মানি চেঞ্জারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম ইসমাইল হক সংবাদকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকালে ডলার বিক্রি শুরু হয় ১০৭ থেকে ১০৮ টাকায়। এরপর প্রায় ১২টার দিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১০ টাকায়। আর বিকেল হতেই কেউ কেউ ১১২ টাকায় বিক্রি করেছে। অর্থাৎ বাজারে ডলারের এতটাই সংকট যে, বিক্রেতারা যে দামই বলছে, সেই দামেই ক্রেতারা কিনে ফেলছে।’

করোনা সংকট শুরু পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ইউএস ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমছে। গত সোমবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকার বিপরীতে ডলারের দাম আরও ২৫ পয়সা বেড়েছে। প্রতি ডলার ৯৪ টাকা ৭০ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ব্যাংকগুলো এই দরে ডলার কিনেছে। গত এক বছরে আন্তঃব্যাংক দাম ৯ টাকা ৯০ পয়সা বেড়েছে।

এর আগে করোনা মহামারীর কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরজুড়ে আমদানি কমে গিয়েছিল। তবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বাড়ছিল। সে কারণে বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যায়। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর বাড়তে শুরু করে আমদানি। এছাড়া রপ্তানি বাড়লেও কমতে থাকে রেমিট্যান্স। এতে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভও কমতে থাকে। এতে বাজারে ডলারের চাহিদা ও দাম দুটোই বাড়তে থাকে। এই খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর আগে কখনো চাহিদা এতটা বাড়েনি।

ডলারের দাম কিভাবে বাড়ছে সেটির একটি উদাহরণ দেন ইসমাইল হক। তিনি সংবাদকে বলেন, ‘ডলারের এতটা সংকট আছে যে, আমরা যে দামই বলছি, সেই দামেই ডলার বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। আমার কাছে দুই হাজার ডলার আছে। সকালে একজন আমাকে ফোন করলো। তারা ১০৭ টাকা দামে ডলার কিনতে চান। একবার আমি মনে করলাম, বিক্রি করে দেবো। পরে সিদ্ধান্ত নিলাম, দেখি দাম আরও বাড়ে কিনা। তাই বিক্রি করলাম না। একটু পর তারা আমাকে ফোন দিয়ে বলল, তারা ১১০ টাকায় কিনতে চান।’

এযাবতকালে ডলারের সংকট যেমনটা বেড়েছে তেমন আগে কখনো বাড়েনি উল্লেখ করে ইসমাইল হক বলেন, ‘চলতি বছর ডলারের যে সংকট দেখা দিয়েছে, তেমন সংকট আগে কখনো দেখা যায়নি। সম্ভবত এমন কেউ আছেন যারা ডলার কিনে মজুদ করছেন। তাই ডলারের দাম এতটা বাড়ছে।’

কারা ডলার মজুদ করতে পারেÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে এটার সঙ্গে ব্যাংকগুলো জড়িত থাকতে পারে। কারণ ব্যাংকগুলোও মনে করছে, ডলারের দাম আরও বাড়বে। তাই তারা খোলাবাজার থেকে ডলার কিনে মজুদ করতে পারে।’

তবে এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম সংবাদকে বলছেন, ‘ডলারটা কোথা থেকে আসলো অর্থাৎ তার উৎস কীÑ এসব কাগজপত্র দেখে খোলাবাজার বা মানি চেঞ্জারদের কাছে থেকে ডলার কিনতে পারে। তবে প্রতিটি ব্যাংকে এর একটা লিমিট দেয়া আছে। এর বাইরে ডলার মজুদ করার সুযোগ নেই। তারা যদি আইন ভেঙে ডলার মজুদ করে তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’

এভাবে ডলারের দাম বাড়তে থাকায় বাজার স্বাভাবিক রাখতে ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২১-২২ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে ৭৬২ কোটি ডলার বিক্রি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই রিজার্ভ থেকে এক অর্থবছরে এত ডলার বিক্রি করা হয়নি। আর এর বিপরীতে বাজার থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকার মতো তুলে নেয়া হয়। অথচ তার আগের অর্থবছরে (২০২০-২১) বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় দর ধরে রাখতে রেকর্ড প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সেই ধারাবাহিকতায় চাহিদা মেটাতে নতুন অর্থবছরেও (২০২২-২৩) ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের ২৫ দিনেই প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপরও বাজারে ডলার সংকট কাটছে না।