রবির প্রথম ও শেষ রেলযাত্রা

ইশতিয়াক আলম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮০ বছরের দীর্ঘ জীবনে রেলগাড়িতে চড়েছেন ৬৮ বছর। তাঁর রেলযাত্রা শুরু হয়েছিল ১১ বছর ৯ মাস বয়সে। যাত্রাপথ ছিল হাওড়া-বোলপুর। দূরত্ব ১৪৫ কিলোমিটার বা ৯০ মাইল। তারিখ ১৪ই ফব্রুয়ারি ১৮৭৩ সল; ৪ঠা ফাল্গুন ১২৭৯ বঙ্গাব্দ শুক্রবার। তাঁর শেষ রেলযাত্রাপথও একই, বোলপুর-হাওড়া ২৫ শে জুলাই ১৯৪১; ৯ই শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ। এদিনও ছিল শুক্রবার। এ যাত্রাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা। তাঁর বয়স তখন ৮০ বছর ০২ মাস। অসুস্থ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ডাক্তারের পরামর্শে ইস্ট ইন্ডিয়া রেল কোম্পানির বিশেষ রেলকারে কলকাতা নিয়ে আসা হয় অপারেশনের জন্য। এর অল্প ক’দিন পর ০৭ই আগস্ট ১৯৪১, ২২শে শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ কবিগুরু মারা যান।

রবীন্দ্রনাথ প্রথম রেল বা ট্রেনে চড়েন পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। তখন রেলের যাত্রা বেশি দিন শুরু হয়নি। পৃথিবীতে প্রথম প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলে ইংল্যান্ডের স্টকটন থেকে ডারলিংটন, দূরত্ব মাত্র ২৫ মাইল, তারিখ ১৮২৫ সালের ২৭শে সেপটেম্বর। ভারতে প্রথম রেল চলে ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল বোম্বে থেকে থানে পর্য্যন্ত। পরের বছর ১৮৫৪ সালের ১৬ই আগস্ট প্রথম প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলা শুরু করে হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত।

রবির প্রথম রেলযাত্রা

রবীন্দ্রনাথ প্রথম রেলে যখন চড়েন তখন তাঁর বয়স ১১ বছর ৯ মাস। সেই সময় রেলে নিয়ম ছিল ১২ বছরের নিচের যাত্রী অপ্রাপ্ত বয়স্ক, তার হাফ টিকিটি। তাই রবির বাবা প্রথম শ্রেণির দুটি টিকিট কেটেছেন। একটি ফুল নিজের জন্য অপরটি ছেলে রবির জন্য হাফ। এই হাফ টিকিট নিয়েই যাত্রাপথে হয় বিপত্তি।

প্রথম দিনের যাত্রায় রবি বেশ ভয়ে ভয়ে পিতার সাথে হাওড়া স্টেশন থেকে রেলগাড়িতে ওঠেন। ভয় পাওয়ার কারণ রবির ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ, সে আগে রেল গাড়িতে চড়েছে। তার কথায়, “বিশেষ দক্ষতা না থাকিলে রেলগাড়িতে চড়া এক ভয়ঙ্কর সংকট। পা ফসকাইয়া গেলেই আর রক্ষা নাই। তারপর, গাড়ি যখন চলিতে আরম্ভ করে তখন শরীরের সমস্ত শক্তিকে আশ্রয় করিয়া খুব জোর করিয়া বসা চাই, নহিলে এমন ভয়ঙ্কর ধাক্কা দেয় যে মানুষ কে-কোথায় ছিটকাইয়া পড়ে তাহার ঠিকানা পাওয়া যায় না।”

রবি বাবার সাথে গাড়িতে ওঠেন, গার্ড বাঁশি বাজিয়ে, পতাকা নেড়ে গাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেয়, ইঞ্জিন লম্বা সিটি দিয়ে ছাড়ে। রেলগাড়ি দ্রুতবেগে ছুটতে থাকে। পথে কোনো কিছুই ঘটে না। সন্ধ্যায় নির্বিঘেœ বোলপুর পৌঁছায়। ভাগ্নে সত্যপ্রসাদের কথা শুনে যেমন ভেবেছিলেন, তেমন কিছুই না ঘটায় রবির মনটা বিমর্ষ হয়।

বোলপুরে তখনো শান্তিনিকেতন বা বিশ্বভারতী গড়ে ওঠেনি। রবির পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ধ্যান ও আধ্যাত্মিক চিন্তার জন্য মাঝে মাঝেই কলকাতার কোলাহল থেকে হিমালয়ের নির্জনতায় আশ্রয় নিতেন, ধ্যান ও উপাসনা করতেন। ১৮৬২ সালে একবার বোলপুর থেকে রায়পুর যাওয়ার পথে দেখতে পান এক সীমাহীন প্রান্তর, চারদিকে খোয়াই ও ধু ধু মাঠ। মাঝখানে শুধু দুটি ছাতিম গাছ। তার ছায়ায় সেদিন তিনি কিছু সময় বিশ্রাম ও ঈশ্বরের উপাসনা করেন। রাঢ় বাংলার গৈরিক মাটির শান্ত সমাহিত পরিবেশ তাঁর খুব ভালো লাগে। ছাতিম গাছ দুটিসহ কুড়ি বিঘা জমি ১৮৬৩ সালের ২রা মার্চ রায়পুরের জমিদার ভুবন মোহন সিংহের কাছ থেকে বার্ষিক পাঁচ টাকা খাজনায় (মৌরসী পাট্টায়) গ্রহণ করেন। একটি অতিথিশালাও নির্মাণ করে নাম দেন শান্তিনিকেতন। এর থেকেই পরে জায়গাটির নাম হয় শান্তিনিকেতন।

আশ্রম স্থাপন হয় ১৮৮৮ সালে। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার সুবিধার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০১ সালে স্থায়ীভাবে শান্তিনিকেতনে চলে আসেন এবং পিতার অনুমতি নিয়ে স্থাপন করেন প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদর্শে ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয়। পড়াশোনা শুরু হয় ঐ ১৯০১ সালেই। মাত্র পাঁচজন ছাত্র নিয়ে, কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ, কবির বন্ধুপুত্র সন্তোষ মজুমদার এবং শিক্ষক ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের তিনজন ছাত্রকে (প্রেমকুমার, অশোককুমার, যতীন্দ্রনাথ) নিয়ে।

রবি পিতার সাথে বোলপুরে কাটান ক’দিন। তারপর তাঁরা রওয়ানা দেন উত্তর ভারতের দিকে। বোলপুর থেকে সাহেবগঞ্জ, দানাপুর, এলাহাবাদ, কানপুর। থেমে থেমে যাত্রা, শেষে অমৃতসর। এই অমৃতসর যাওয়র পথে ঘটে সেই ঘটনা। রবির বয়স তখনো ১২ বছরের নিচে, ১১ বছর ৯ মাস।

সেই সময়ের রেলগাড়িতে তিনটি শ্রেণি ছিল। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়। ফার্স্ট ক্লাস বা প্রথম শ্রেণির কামরায় ছিল চারটি বার্থ, দুটো নিচে ও দুটো উপরে।

কামরার একদিকে থাকতো টয়লেট বা মনোরম স্নানঘর। মাঝখানে ম্যান্টেলপিস আয়না, আর ছোট র‌্যাক। মেঝেতে বিছানো পুরু লিনেলিয়াম। কামরার ভেতরে ও বাইরে সব হাতল ছিল ঝকঝকে পিতলের। এ যাত্রায় আগের মতোই দুটি টিকিট কাটা হয়েছে। একটি ফুল এবং অপরটি হাফ। অমৃতসর লাইনে একটি বড় স্টেশনে গাড়ি থামলে টিকিট চেকার ওঠে গাড়িতে। রবিদের কাছে এসে টিকিট দেখতে চান। রবির বাবা টিকিট বের করে দেখালেন। এর পরের বর্ণনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “জীবনস্মৃতি” থেকে:

“টিকিট পরীক্ষক আমাদের টিকিট দেখিল। একবার আমার মুখের দিকে চাহিল। কী একটা সন্দেহ করিল কিন্তু বলিতে সাহস করিল না। কিছুক্ষণ পরে আর একজন আসিল; উভয়ে আমাদের গাড়ির দরজার কাছে উসখুস করিয়া আবার চলিয়া গেল। তৃতীয়বারে বোধহয় স্বয়ং স্টেশন মাস্টার আসিয়া উপস্থিত। আমার হাফটিকিট পরীক্ষা করিয়া পিতাকে জিজ্ঞাসা করিল, এই ছেলেটির বয়স কি বারো বছরের অধিক নহে। পিতা কহিলেন, না।

তখন আমার বয়স এগারো। বয়সের চেয়ে নিশ্চয়ই আমার বৃদ্ধি কিছু বেশি হইয়াছিল। স্টেশন মাস্টার কহিল, ইহার জন্য পুরা ভাড়া দিতে হইবে।

আমার পিতার দুই চক্ষু জ্বলিয়া উঠিল। তিনি বাক্স হইতে তখনই নোট বাহির করিয়া দিলেন। ভাড়ার টাকা বাদ দিয়া অবশিষ্ট টাকা যখন তাহারা ফিরাইয়া দিতে আসিল তখন তিনি সে টাকা লইয়া বাহিরে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিলেন, তাহা প্লাটফর্মের পাথরের মেঝের উপর ছড়াইয়া পড়িয়া ঝনঝন করিয়া বাজিয়া উঠিল।

স্টেশন মাস্টার অত্যন্ত সংকুচিত হইয়া চলিয়া গেল, টাকা বাচাঁইবার জন্য পিতা যে মিথ্যা কথা বলিবেন, এ সন্দেহের ক্ষুদতাপ তাহার মাথা হেঁট করিয়া দিল।”

এই সময়ের রবির দুটি ছবি আমরা দেখে নিতে পারি, বিখ্যাত গগনেন্দ্রনাথের স্কেচ এবং অপরটি ইংরেজ ফটোগ্রাফারের তোলা শ্রী কণ্ঠবাবুর সঙ্গে দাদা সোমেন্দ্রনাথ, ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ ও রবীন্দ্রনাথের গ্রুপ ছবি। ছবি তোলা হয়েছিল তিন বালকের উপনয়নের আগে ১৮৭৩-এর ৬ই ফেব্রুয়ারি। তখন রবির বয়স এগারো। এর ঠিক আট দিন পরে রবি তার পিতার সঙ্গে তার প্রথম রেল যাত্রা করেন এবং বর্ণিত ঘটনা ঘটে।

কয়েকটি স্মরণীয় রেলযাত্রা

শিরোনামের ১ম ও শেষ রেলযাত্রা ছাড়াও কবির অসংখ্য রেলযাত্রার মধ্যে কয়েকটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য রেলযাত্রা উদ্ধৃত করা হলো সংক্ষেপে:

ক। মালগাড়িতে রবীন্দ্রনাথ

১১ বছরের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের গুরুতর অসুস্থতার খবর পেয়ে কবি মুঙ্গের অভিমুখে যাত্রা করেন। সেদিন ছিল ১৯০৭ সালের ২১ নভেম্বর। ঠিক সেই সময়ে কোনও প্যাসেঞ্জার ট্রেন না থাকায় রেল কর্তৃপক্ষ মুশকিলে পড়ে। শেষে তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কবিকে একটি মালবাহী বা গুডস ট্রেনে সেখানে পাঠানোর বন্দোবস্ত করেন। পরের দিন তিনি ছেলের কাছে পৌঁছেছিলেন ঠিকই, কিন্তু শমীন্দ্রনাথকে বাঁচানো যায়নি।

খ। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার ও রেলওয়ে

‘গীতাঞ্জলি’র পাণ্ডুলিপি নিয়ে কবি লন্ডনে যাওয়ার পথে প্রথমে মুম্বাই যান। সেখান থেকে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন পাতালরেলের এক কামরায় সেই পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায়। সেদিন ছিল ১৯১২ সালের ২৭ মে। রেলের ‘হারানো সম্পত্তি দপ্তর’ থেকে কবিকে সেই পাণ্ডুলিপি পরে ফেরৎ দেওয়া হয়। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ১৫ মাস আগে এই ঘটনা ঘটে। কে জানে, সেদিনের সেই পাণ্ডুলিপি ইংল্যান্ডের রেল দপ্তর ফিরিয়ে না দিলে হয়ত কবির নোবেল পুরস্কার পাওয়াই হতো না।

গ। রেলে চেপে অভিনন্দন

১৯১৩ সালের ২৩ নভেম্বর ৫০০ জন সম্মানিত ব্যক্তিকে নিয়ে একটি বিশেষ ট্রেন এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথকে অভিনন্দন জানাতে কলকাতা থেকে বোলপুরে গিয়েছিল। সে ট্রেনের খবর জানিয়ে কাগজে বিজ্ঞপ্তিও বের হয়েছিল। শান্তিনিকেতন যাওয়ার ভাড়া নির্ধারিত হয়েছিল তিন টাকা চার আনা! কলকাতার সুধিজন গিয়েছিলেন সু-সজ্জিত সে রেলগাড়িতে। ট্রেন ছাড়তে সেদিন ৫৫ মিনিট দেরি হয়েছিল কারণ সভাপতি জগদীশচন্দ্র বসু যথাসময়ে স্টেশনে পৌঁছতে পারেননি! দুপুরে ট্রেন যখন বোলপুরে পৌঁছয় তখন কবির নামে জয়ধ্বনি ওঠে বোলপুরের ভুবনডাঙার আকাশজুড়ে।

৩। শেষ রেলযাত্রা

জুলাই, ১৯৪১। কবির অসুস্থতা তখন বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই জ্বর আসে, খাওয়া-দাওয়াও কমে গেছে কবির। আষাঢ় মাস, কবিকে আনা হয় উত্তরায়ণের ‘উদয়ন’ বাড়ির দোতলায়। সেখানে বসেই কবি তাঁর প্রিয় ঋতু বর্ষার প্রাকৃতিক শোভা দেখেন।

১৬ জুলাই ডা. বিধানচন্দ্র রায় ও আরও ক’জন চিকিৎস এলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষ করে এবং আলোচনায় ঠিক হয় কবিকে কলকাতায় নিয়ে যেয়ে অপারেশ করানো হবে। তাই তাঁর সেবা-শুশ্রুষার জন্য আশ্রম সচিব সুরেন্দ্রনাথ করসহ পাঁচজন পুরুষ এবং মহিলাদের মধ্যে নন্দিতা কৃপালনী, রানি মহলানবিশ, রানী চন্দ ও একজন বিদেশি মহিলা নিয়ে একটি সেবকদল গঠন করা হয়।

২৫ জুলাই রবীন্দ্রনাথ খুব ভোরে উঠে তৈরি হয়ে উদয়ন-এর দোতলায় পুব দিকের জানালায় আশ্রমের দিকে চেয়ে বসেন। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কর্মী ও আশ্রমিকের দল সমবেত কণ্ঠে “এদিন আজি কোনো ঘরে গো খুলে দিল দ্বার” গানটি গাইতে গাইতে উত্তরায়ণ বাড়ির ফটক পেরিয়ে, লাল মাটির কাঁকুরে পথ ধরে উদয়ন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। আশ্রমগুরু রবীন্দ্রনাথ জানালার সামনে দাঁড়িয়ে একান্ত চিত্তে বৈতালিকের সঙ্গীত-অর্ঘ্য গ্রহণ করেন।

কবির কলকাতা যাত্রার সময় এগিয়ে আসে। একে একে আশ্রমিকেরা বেদনার্ত হৃদয়ে জড় হন উত্তরায়ণ প্রাঙ্গণে। অন্তরঙ্গ সেবকরা খুবই সাবধানে বিশেষভাবে তৈরি একটি স্ট্রেচারে করে কবিকে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে আনেন। উদয়ন বাড়ির নিচের বারান্দায় একটি আরামকেদারায় প্রায় অর্ধশায়িতভাবে বসানো হয় কবিকে। তাঁর চোখে নীল চশমা, সমস্ত শরীরে ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট। উদয়ন-এর সামনে এসে দাঁড়ায় আশ্রমের মোটরগাড়ি। কবিকে সরাসরি স্ট্রেচারে করে গাড়িতে তোলার জন্য গাড়ির পিছনের দরজা খুলে দেওয়া হয়। উদয়ন থেকে উত্তরায়ণের গেট অবধি রাস্তার দু’ধারে শ্রদ্ধানত আশ্রমবাসীরা সারিবদ্ধভাবে সজল চোখে দাঁড়িয়ে বিদায় জানায় কবিকে। আকাশে মেঘ, প্রতিটি মানুষের মনেও অস্ফুট ব্যাকুল গুঞ্জরণ। কবির গাড়ি ধীরে ধীরে বোলপুরের দিকে এগিয়ে চলল। আশ্রমিকরা তখন সমস্বরে গাইছেন, আমাদের শান্তিনিকেতন...।

আশ্রম থেকে বোলপুর আসার রাস্তার অবস্থা বেশ খারাপ, খানাখন্দে ভর্তি। বীরভূমের ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড কর্তৃপক্ষ রাতারাতি রাস্তা সংস্কারও করেদেন, যতটা সম্ভব।

গুরতর অসুস্থ কবিকে ১২ চাকার এক সেলুনে চাপিয়ে বোলপুর থেকে হাওড়ায় আনা হয়। ঝাঁকুনি এড়িয়ে এবং যথাসম্ভব আরামের সঙ্গে সঙ্গে নেওয়ার জন্য এ পথের সবচেয়ে ধীরগতির ট্রেন পাকুর প্যাসেঞ্জারের সঙ্গে সেলুনটিকে জুড়ে দেওয়া হয়। তখন তাঁর বয়স আশি বছর দুই মাস। সকাল সাড়ে আটটায় রওনা দিয়ে ট্রেনটি ছয় ঘণ্টায় ১০০ মাইল (১৫০ কিমি) পাড়ি দেয়। সেলুনে তদানীন্তন ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেন্ডেন্ট, এক ঝাঁক সুদক্ষ কর্মী নিয়ে যাত্রাসঙ্গী হন। বর্ধমানে কবির সঙ্গে কথা বললে তিনি না-মিষ্টি-না-নোনতা জাতীয় কোনও বিস্কুট খেতে চান। সহকর্মীদের কাছে কিছু ক্রিম ক্রাকার বিস্কুট ছিল। টিফিন বক্স খুলে কবিকে সেই বিস্কুট দেওয়া হয়। ট্রেনটি দুপুর ২.৪০ মিনিটে হাওড়া স্টেশনের ১৪ নম্বর প্লাটফর্মে এসে পৌঁছায়। ক্লান্ত থাকায় কবিকে কিছুক্ষণ ওয়েটিং রুমে বিশ্রামে রাখা হয়। ঔদিন ২৫শে জুলাই বেলা তিনটা ১৫ মিনিটে রবীন্দ্রনাকে আনা হয় জোড়াসাঁকোয়। পুরোনো বাড়ির দোতলায় ‘পাথর ঘর’-এ তাঁকে নেওয়া হয় স্ট্রেচারে করে।

২৬শে জুলাই রবিঠাকুর ছিলেন প্রফুল্ল। ২৭শে জুলাই সকালে রবীন্দ্রনাথ মুখে মুখে বললেন একটি কবিতা, টুকে নিলেন রানী চন্দ। কবিতাটির প্রথম কয়েকটি পঙক্তি হলো:

“প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল সত্তার নতুন আবির্ভাবে, কে তুমি, মেলে নি উত্তর।”

ঠিক হয়েছিল তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার হবে ৩০শে জুলাই। কিন্তু সেটা তাঁকে জানতে দেওয়া হয়নি। বেলা ১১টায় স্ট্রেচারে করে কবিকে আনা হয় অপারেশন-টেবিলে। লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে অপারেশন করা হয়। ১১টা ২০ মিনিটের দিকে শেষ হয় অস্ত্রোপচার।

শরীরে যথেষ্ট যন্ত্রণা হয়েছিল অপারেশনের সময়। কিন্তু তা বুঝতে দেননি কবি। সেদিন ঘুমালেন। পরদিন ৩১শে জুলাই যন্ত্রণা বাড়ে। গায়ের তাপও বাড়ে। নিঃসাড় হয়ে থাকেন কবি। ১লা আগস্ট, কথা বলছেন না কবি। অল্প অল্প জল আর ফলের রস খাওয়ানো হয় তাঁকে। চিকিৎসকেরা শঙ্কিত। ২রা আগস্ট কিছু খেতে চাইলেন না। ৩রা আগস্টও শরীরের কোনো উন্নতি নেই। ৪ঠা আগস্ট সকালে চার আউন্সের মতো কফি খেলেন। জ্বর বাড়ল। ৫ই আগস্ট ডা. নীলরতন সরকার এবং ডা: বিধান রায়কে নিয়ে আসা হয়। রাতে স্যালাইন দেওয়া হলো কবিকে। অক্সিজেন আনিয়ে রাখা হলো। ৬ই আগস্ট, হেঁচকি উঠছিল কবির। পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী ডাকছিলেন, ‘বাবা মশায়!’ একটু সাড়া দিলেন কবি। রাত ১২টার দিকে আরও অবনতি হলো কবির শরীরের। ৭ই আগস্ট ছিল ২২ শ্রাবণ। কবিকে সকাল নয়টার দিকে অক্সিজেন দেওয়া হলো। নিশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে থাকল কবির। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তা একেবারে থেমে গেল।

সেদিন আকাশবাণী থেকে কবির মৃত্যু পথযাত্রার খবর প্রচারিত হওয়ায় তাঁকে শেষ দেখার জন্য অজস্র মানুষ ছুটে আসতে শুরু করে। জমা হওয়া ওই ভিড় জোড়াসাঁকোর পুরোনো বাড়ির দোতলায় পাথরঘর-এ উঠবার জন্য উন্মাদ হয়ে ওঠে। ভেঙে পড়ে সমস্ত শৃঙ্খলা। জনতার চাপে কিছুক্ষণের মধ্যেই কোলাপসিবল গেট ভেঙে পড়ে। কেউ কেউ জল নিকাশি পাইপ বেয়েও উঠতে শুরু করে। ১২টা নাগাদ কবির ডান হাতটা একটু উঠেই নেমে আসে, একটা তীব্র আর্তস্বর ভেসে আসে ঘর থেকে, ‘গুরদেব আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।’ তাঁকে যে ঘরে রাখা হয়েছিলো তার দুটো দরজাই বন্ধ করে দেওয়া হয়। কবির প্রাণহীন দেহটাকে শেষযাত্রার জন্য তৈরি করা হচ্ছে, তখনো উচ্ছৃঙ্খল জনতার বাঁধভাঙা চাপ আছড়ে পড়ছিলো বন্ধ সেই ঘরের দিকে। একদল জনতা টান মেরে দরজার ছিটকানি খুলে ফেলে। তখন কবির নিরাভরণ, প্রাণহীন দেহটিকে স্নান করানো হচ্ছিলো। কবির শবদেহও কৌতূহলী মানুষের অপমানজনক দৃষ্টি থেকে নিস্তার পায় না।

বেলা ৩টা নাগাদ একদল লোক ঘরের মধ্যে ঢুকে ঠাকুরবাড়ির স্বজনদের চোখের সামনে দিয়েই কবির মরদেহ কাঁধে তুলে নিয়ে জয়ধ্বনি দিতে দিতে বেরিয়ে যায়। অনিয়ন্ত্রিত সেই জনতার কাঁধে কবির দেহ, পূর্ব নির্ধারিত কেওড়াতলার বদলে নিয়ে চলে নিমতলার শশ্মানঘাটে। যখন ঘাটে কবির দেহ পৌঁছালো তখন তাঁর মুখমণ্ডল বিকৃত, চুল দাড়ি ছিঁড়ে নিয়েছে উন্মত্ত জনতার কেউ কেউ। সুন্দর ও শান্তির সাধকের কবিকে শেষ বিদায় নিতে হলো উচ্ছৃঙ্খল অশান্ত জনতার হাতে।

বৃহস্পতিবার, ২৮ জুলাই ২০২২ , ১৩ শ্রাবণ ১৪২৯ ২৯ জিলহজ ১৪৪৩

রবির প্রথম ও শেষ রেলযাত্রা

ইশতিয়াক আলম

image

উদয়নের বাড়ি থেকে স্ট্রেচারে করে নামিয়ে ওঠানো হয় আশ্রমের মোটর গাড়িতে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮০ বছরের দীর্ঘ জীবনে রেলগাড়িতে চড়েছেন ৬৮ বছর। তাঁর রেলযাত্রা শুরু হয়েছিল ১১ বছর ৯ মাস বয়সে। যাত্রাপথ ছিল হাওড়া-বোলপুর। দূরত্ব ১৪৫ কিলোমিটার বা ৯০ মাইল। তারিখ ১৪ই ফব্রুয়ারি ১৮৭৩ সল; ৪ঠা ফাল্গুন ১২৭৯ বঙ্গাব্দ শুক্রবার। তাঁর শেষ রেলযাত্রাপথও একই, বোলপুর-হাওড়া ২৫ শে জুলাই ১৯৪১; ৯ই শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ। এদিনও ছিল শুক্রবার। এ যাত্রাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা। তাঁর বয়স তখন ৮০ বছর ০২ মাস। অসুস্থ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ডাক্তারের পরামর্শে ইস্ট ইন্ডিয়া রেল কোম্পানির বিশেষ রেলকারে কলকাতা নিয়ে আসা হয় অপারেশনের জন্য। এর অল্প ক’দিন পর ০৭ই আগস্ট ১৯৪১, ২২শে শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ কবিগুরু মারা যান।

রবীন্দ্রনাথ প্রথম রেল বা ট্রেনে চড়েন পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। তখন রেলের যাত্রা বেশি দিন শুরু হয়নি। পৃথিবীতে প্রথম প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলে ইংল্যান্ডের স্টকটন থেকে ডারলিংটন, দূরত্ব মাত্র ২৫ মাইল, তারিখ ১৮২৫ সালের ২৭শে সেপটেম্বর। ভারতে প্রথম রেল চলে ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল বোম্বে থেকে থানে পর্য্যন্ত। পরের বছর ১৮৫৪ সালের ১৬ই আগস্ট প্রথম প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলা শুরু করে হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত।

রবির প্রথম রেলযাত্রা

রবীন্দ্রনাথ প্রথম রেলে যখন চড়েন তখন তাঁর বয়স ১১ বছর ৯ মাস। সেই সময় রেলে নিয়ম ছিল ১২ বছরের নিচের যাত্রী অপ্রাপ্ত বয়স্ক, তার হাফ টিকিটি। তাই রবির বাবা প্রথম শ্রেণির দুটি টিকিট কেটেছেন। একটি ফুল নিজের জন্য অপরটি ছেলে রবির জন্য হাফ। এই হাফ টিকিট নিয়েই যাত্রাপথে হয় বিপত্তি।

প্রথম দিনের যাত্রায় রবি বেশ ভয়ে ভয়ে পিতার সাথে হাওড়া স্টেশন থেকে রেলগাড়িতে ওঠেন। ভয় পাওয়ার কারণ রবির ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ, সে আগে রেল গাড়িতে চড়েছে। তার কথায়, “বিশেষ দক্ষতা না থাকিলে রেলগাড়িতে চড়া এক ভয়ঙ্কর সংকট। পা ফসকাইয়া গেলেই আর রক্ষা নাই। তারপর, গাড়ি যখন চলিতে আরম্ভ করে তখন শরীরের সমস্ত শক্তিকে আশ্রয় করিয়া খুব জোর করিয়া বসা চাই, নহিলে এমন ভয়ঙ্কর ধাক্কা দেয় যে মানুষ কে-কোথায় ছিটকাইয়া পড়ে তাহার ঠিকানা পাওয়া যায় না।”

রবি বাবার সাথে গাড়িতে ওঠেন, গার্ড বাঁশি বাজিয়ে, পতাকা নেড়ে গাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেয়, ইঞ্জিন লম্বা সিটি দিয়ে ছাড়ে। রেলগাড়ি দ্রুতবেগে ছুটতে থাকে। পথে কোনো কিছুই ঘটে না। সন্ধ্যায় নির্বিঘেœ বোলপুর পৌঁছায়। ভাগ্নে সত্যপ্রসাদের কথা শুনে যেমন ভেবেছিলেন, তেমন কিছুই না ঘটায় রবির মনটা বিমর্ষ হয়।

বোলপুরে তখনো শান্তিনিকেতন বা বিশ্বভারতী গড়ে ওঠেনি। রবির পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ধ্যান ও আধ্যাত্মিক চিন্তার জন্য মাঝে মাঝেই কলকাতার কোলাহল থেকে হিমালয়ের নির্জনতায় আশ্রয় নিতেন, ধ্যান ও উপাসনা করতেন। ১৮৬২ সালে একবার বোলপুর থেকে রায়পুর যাওয়ার পথে দেখতে পান এক সীমাহীন প্রান্তর, চারদিকে খোয়াই ও ধু ধু মাঠ। মাঝখানে শুধু দুটি ছাতিম গাছ। তার ছায়ায় সেদিন তিনি কিছু সময় বিশ্রাম ও ঈশ্বরের উপাসনা করেন। রাঢ় বাংলার গৈরিক মাটির শান্ত সমাহিত পরিবেশ তাঁর খুব ভালো লাগে। ছাতিম গাছ দুটিসহ কুড়ি বিঘা জমি ১৮৬৩ সালের ২রা মার্চ রায়পুরের জমিদার ভুবন মোহন সিংহের কাছ থেকে বার্ষিক পাঁচ টাকা খাজনায় (মৌরসী পাট্টায়) গ্রহণ করেন। একটি অতিথিশালাও নির্মাণ করে নাম দেন শান্তিনিকেতন। এর থেকেই পরে জায়গাটির নাম হয় শান্তিনিকেতন।

আশ্রম স্থাপন হয় ১৮৮৮ সালে। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার সুবিধার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০১ সালে স্থায়ীভাবে শান্তিনিকেতনে চলে আসেন এবং পিতার অনুমতি নিয়ে স্থাপন করেন প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদর্শে ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয়। পড়াশোনা শুরু হয় ঐ ১৯০১ সালেই। মাত্র পাঁচজন ছাত্র নিয়ে, কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ, কবির বন্ধুপুত্র সন্তোষ মজুমদার এবং শিক্ষক ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের তিনজন ছাত্রকে (প্রেমকুমার, অশোককুমার, যতীন্দ্রনাথ) নিয়ে।

রবি পিতার সাথে বোলপুরে কাটান ক’দিন। তারপর তাঁরা রওয়ানা দেন উত্তর ভারতের দিকে। বোলপুর থেকে সাহেবগঞ্জ, দানাপুর, এলাহাবাদ, কানপুর। থেমে থেমে যাত্রা, শেষে অমৃতসর। এই অমৃতসর যাওয়র পথে ঘটে সেই ঘটনা। রবির বয়স তখনো ১২ বছরের নিচে, ১১ বছর ৯ মাস।

সেই সময়ের রেলগাড়িতে তিনটি শ্রেণি ছিল। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়। ফার্স্ট ক্লাস বা প্রথম শ্রেণির কামরায় ছিল চারটি বার্থ, দুটো নিচে ও দুটো উপরে।

কামরার একদিকে থাকতো টয়লেট বা মনোরম স্নানঘর। মাঝখানে ম্যান্টেলপিস আয়না, আর ছোট র‌্যাক। মেঝেতে বিছানো পুরু লিনেলিয়াম। কামরার ভেতরে ও বাইরে সব হাতল ছিল ঝকঝকে পিতলের। এ যাত্রায় আগের মতোই দুটি টিকিট কাটা হয়েছে। একটি ফুল এবং অপরটি হাফ। অমৃতসর লাইনে একটি বড় স্টেশনে গাড়ি থামলে টিকিট চেকার ওঠে গাড়িতে। রবিদের কাছে এসে টিকিট দেখতে চান। রবির বাবা টিকিট বের করে দেখালেন। এর পরের বর্ণনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “জীবনস্মৃতি” থেকে:

“টিকিট পরীক্ষক আমাদের টিকিট দেখিল। একবার আমার মুখের দিকে চাহিল। কী একটা সন্দেহ করিল কিন্তু বলিতে সাহস করিল না। কিছুক্ষণ পরে আর একজন আসিল; উভয়ে আমাদের গাড়ির দরজার কাছে উসখুস করিয়া আবার চলিয়া গেল। তৃতীয়বারে বোধহয় স্বয়ং স্টেশন মাস্টার আসিয়া উপস্থিত। আমার হাফটিকিট পরীক্ষা করিয়া পিতাকে জিজ্ঞাসা করিল, এই ছেলেটির বয়স কি বারো বছরের অধিক নহে। পিতা কহিলেন, না।

তখন আমার বয়স এগারো। বয়সের চেয়ে নিশ্চয়ই আমার বৃদ্ধি কিছু বেশি হইয়াছিল। স্টেশন মাস্টার কহিল, ইহার জন্য পুরা ভাড়া দিতে হইবে।

আমার পিতার দুই চক্ষু জ্বলিয়া উঠিল। তিনি বাক্স হইতে তখনই নোট বাহির করিয়া দিলেন। ভাড়ার টাকা বাদ দিয়া অবশিষ্ট টাকা যখন তাহারা ফিরাইয়া দিতে আসিল তখন তিনি সে টাকা লইয়া বাহিরে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিলেন, তাহা প্লাটফর্মের পাথরের মেঝের উপর ছড়াইয়া পড়িয়া ঝনঝন করিয়া বাজিয়া উঠিল।

স্টেশন মাস্টার অত্যন্ত সংকুচিত হইয়া চলিয়া গেল, টাকা বাচাঁইবার জন্য পিতা যে মিথ্যা কথা বলিবেন, এ সন্দেহের ক্ষুদতাপ তাহার মাথা হেঁট করিয়া দিল।”

এই সময়ের রবির দুটি ছবি আমরা দেখে নিতে পারি, বিখ্যাত গগনেন্দ্রনাথের স্কেচ এবং অপরটি ইংরেজ ফটোগ্রাফারের তোলা শ্রী কণ্ঠবাবুর সঙ্গে দাদা সোমেন্দ্রনাথ, ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ ও রবীন্দ্রনাথের গ্রুপ ছবি। ছবি তোলা হয়েছিল তিন বালকের উপনয়নের আগে ১৮৭৩-এর ৬ই ফেব্রুয়ারি। তখন রবির বয়স এগারো। এর ঠিক আট দিন পরে রবি তার পিতার সঙ্গে তার প্রথম রেল যাত্রা করেন এবং বর্ণিত ঘটনা ঘটে।

কয়েকটি স্মরণীয় রেলযাত্রা

শিরোনামের ১ম ও শেষ রেলযাত্রা ছাড়াও কবির অসংখ্য রেলযাত্রার মধ্যে কয়েকটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য রেলযাত্রা উদ্ধৃত করা হলো সংক্ষেপে:

ক। মালগাড়িতে রবীন্দ্রনাথ

১১ বছরের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের গুরুতর অসুস্থতার খবর পেয়ে কবি মুঙ্গের অভিমুখে যাত্রা করেন। সেদিন ছিল ১৯০৭ সালের ২১ নভেম্বর। ঠিক সেই সময়ে কোনও প্যাসেঞ্জার ট্রেন না থাকায় রেল কর্তৃপক্ষ মুশকিলে পড়ে। শেষে তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কবিকে একটি মালবাহী বা গুডস ট্রেনে সেখানে পাঠানোর বন্দোবস্ত করেন। পরের দিন তিনি ছেলের কাছে পৌঁছেছিলেন ঠিকই, কিন্তু শমীন্দ্রনাথকে বাঁচানো যায়নি।

খ। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার ও রেলওয়ে

‘গীতাঞ্জলি’র পাণ্ডুলিপি নিয়ে কবি লন্ডনে যাওয়ার পথে প্রথমে মুম্বাই যান। সেখান থেকে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন পাতালরেলের এক কামরায় সেই পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায়। সেদিন ছিল ১৯১২ সালের ২৭ মে। রেলের ‘হারানো সম্পত্তি দপ্তর’ থেকে কবিকে সেই পাণ্ডুলিপি পরে ফেরৎ দেওয়া হয়। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ১৫ মাস আগে এই ঘটনা ঘটে। কে জানে, সেদিনের সেই পাণ্ডুলিপি ইংল্যান্ডের রেল দপ্তর ফিরিয়ে না দিলে হয়ত কবির নোবেল পুরস্কার পাওয়াই হতো না।

গ। রেলে চেপে অভিনন্দন

১৯১৩ সালের ২৩ নভেম্বর ৫০০ জন সম্মানিত ব্যক্তিকে নিয়ে একটি বিশেষ ট্রেন এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথকে অভিনন্দন জানাতে কলকাতা থেকে বোলপুরে গিয়েছিল। সে ট্রেনের খবর জানিয়ে কাগজে বিজ্ঞপ্তিও বের হয়েছিল। শান্তিনিকেতন যাওয়ার ভাড়া নির্ধারিত হয়েছিল তিন টাকা চার আনা! কলকাতার সুধিজন গিয়েছিলেন সু-সজ্জিত সে রেলগাড়িতে। ট্রেন ছাড়তে সেদিন ৫৫ মিনিট দেরি হয়েছিল কারণ সভাপতি জগদীশচন্দ্র বসু যথাসময়ে স্টেশনে পৌঁছতে পারেননি! দুপুরে ট্রেন যখন বোলপুরে পৌঁছয় তখন কবির নামে জয়ধ্বনি ওঠে বোলপুরের ভুবনডাঙার আকাশজুড়ে।

৩। শেষ রেলযাত্রা

জুলাই, ১৯৪১। কবির অসুস্থতা তখন বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই জ্বর আসে, খাওয়া-দাওয়াও কমে গেছে কবির। আষাঢ় মাস, কবিকে আনা হয় উত্তরায়ণের ‘উদয়ন’ বাড়ির দোতলায়। সেখানে বসেই কবি তাঁর প্রিয় ঋতু বর্ষার প্রাকৃতিক শোভা দেখেন।

১৬ জুলাই ডা. বিধানচন্দ্র রায় ও আরও ক’জন চিকিৎস এলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষ করে এবং আলোচনায় ঠিক হয় কবিকে কলকাতায় নিয়ে যেয়ে অপারেশ করানো হবে। তাই তাঁর সেবা-শুশ্রুষার জন্য আশ্রম সচিব সুরেন্দ্রনাথ করসহ পাঁচজন পুরুষ এবং মহিলাদের মধ্যে নন্দিতা কৃপালনী, রানি মহলানবিশ, রানী চন্দ ও একজন বিদেশি মহিলা নিয়ে একটি সেবকদল গঠন করা হয়।

২৫ জুলাই রবীন্দ্রনাথ খুব ভোরে উঠে তৈরি হয়ে উদয়ন-এর দোতলায় পুব দিকের জানালায় আশ্রমের দিকে চেয়ে বসেন। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কর্মী ও আশ্রমিকের দল সমবেত কণ্ঠে “এদিন আজি কোনো ঘরে গো খুলে দিল দ্বার” গানটি গাইতে গাইতে উত্তরায়ণ বাড়ির ফটক পেরিয়ে, লাল মাটির কাঁকুরে পথ ধরে উদয়ন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। আশ্রমগুরু রবীন্দ্রনাথ জানালার সামনে দাঁড়িয়ে একান্ত চিত্তে বৈতালিকের সঙ্গীত-অর্ঘ্য গ্রহণ করেন।

কবির কলকাতা যাত্রার সময় এগিয়ে আসে। একে একে আশ্রমিকেরা বেদনার্ত হৃদয়ে জড় হন উত্তরায়ণ প্রাঙ্গণে। অন্তরঙ্গ সেবকরা খুবই সাবধানে বিশেষভাবে তৈরি একটি স্ট্রেচারে করে কবিকে দোতলা থেকে নিচে নামিয়ে আনেন। উদয়ন বাড়ির নিচের বারান্দায় একটি আরামকেদারায় প্রায় অর্ধশায়িতভাবে বসানো হয় কবিকে। তাঁর চোখে নীল চশমা, সমস্ত শরীরে ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট। উদয়ন-এর সামনে এসে দাঁড়ায় আশ্রমের মোটরগাড়ি। কবিকে সরাসরি স্ট্রেচারে করে গাড়িতে তোলার জন্য গাড়ির পিছনের দরজা খুলে দেওয়া হয়। উদয়ন থেকে উত্তরায়ণের গেট অবধি রাস্তার দু’ধারে শ্রদ্ধানত আশ্রমবাসীরা সারিবদ্ধভাবে সজল চোখে দাঁড়িয়ে বিদায় জানায় কবিকে। আকাশে মেঘ, প্রতিটি মানুষের মনেও অস্ফুট ব্যাকুল গুঞ্জরণ। কবির গাড়ি ধীরে ধীরে বোলপুরের দিকে এগিয়ে চলল। আশ্রমিকরা তখন সমস্বরে গাইছেন, আমাদের শান্তিনিকেতন...।

আশ্রম থেকে বোলপুর আসার রাস্তার অবস্থা বেশ খারাপ, খানাখন্দে ভর্তি। বীরভূমের ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড কর্তৃপক্ষ রাতারাতি রাস্তা সংস্কারও করেদেন, যতটা সম্ভব।

গুরতর অসুস্থ কবিকে ১২ চাকার এক সেলুনে চাপিয়ে বোলপুর থেকে হাওড়ায় আনা হয়। ঝাঁকুনি এড়িয়ে এবং যথাসম্ভব আরামের সঙ্গে সঙ্গে নেওয়ার জন্য এ পথের সবচেয়ে ধীরগতির ট্রেন পাকুর প্যাসেঞ্জারের সঙ্গে সেলুনটিকে জুড়ে দেওয়া হয়। তখন তাঁর বয়স আশি বছর দুই মাস। সকাল সাড়ে আটটায় রওনা দিয়ে ট্রেনটি ছয় ঘণ্টায় ১০০ মাইল (১৫০ কিমি) পাড়ি দেয়। সেলুনে তদানীন্তন ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেন্ডেন্ট, এক ঝাঁক সুদক্ষ কর্মী নিয়ে যাত্রাসঙ্গী হন। বর্ধমানে কবির সঙ্গে কথা বললে তিনি না-মিষ্টি-না-নোনতা জাতীয় কোনও বিস্কুট খেতে চান। সহকর্মীদের কাছে কিছু ক্রিম ক্রাকার বিস্কুট ছিল। টিফিন বক্স খুলে কবিকে সেই বিস্কুট দেওয়া হয়। ট্রেনটি দুপুর ২.৪০ মিনিটে হাওড়া স্টেশনের ১৪ নম্বর প্লাটফর্মে এসে পৌঁছায়। ক্লান্ত থাকায় কবিকে কিছুক্ষণ ওয়েটিং রুমে বিশ্রামে রাখা হয়। ঔদিন ২৫শে জুলাই বেলা তিনটা ১৫ মিনিটে রবীন্দ্রনাকে আনা হয় জোড়াসাঁকোয়। পুরোনো বাড়ির দোতলায় ‘পাথর ঘর’-এ তাঁকে নেওয়া হয় স্ট্রেচারে করে।

২৬শে জুলাই রবিঠাকুর ছিলেন প্রফুল্ল। ২৭শে জুলাই সকালে রবীন্দ্রনাথ মুখে মুখে বললেন একটি কবিতা, টুকে নিলেন রানী চন্দ। কবিতাটির প্রথম কয়েকটি পঙক্তি হলো:

“প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল সত্তার নতুন আবির্ভাবে, কে তুমি, মেলে নি উত্তর।”

ঠিক হয়েছিল তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার হবে ৩০শে জুলাই। কিন্তু সেটা তাঁকে জানতে দেওয়া হয়নি। বেলা ১১টায় স্ট্রেচারে করে কবিকে আনা হয় অপারেশন-টেবিলে। লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে অপারেশন করা হয়। ১১টা ২০ মিনিটের দিকে শেষ হয় অস্ত্রোপচার।

শরীরে যথেষ্ট যন্ত্রণা হয়েছিল অপারেশনের সময়। কিন্তু তা বুঝতে দেননি কবি। সেদিন ঘুমালেন। পরদিন ৩১শে জুলাই যন্ত্রণা বাড়ে। গায়ের তাপও বাড়ে। নিঃসাড় হয়ে থাকেন কবি। ১লা আগস্ট, কথা বলছেন না কবি। অল্প অল্প জল আর ফলের রস খাওয়ানো হয় তাঁকে। চিকিৎসকেরা শঙ্কিত। ২রা আগস্ট কিছু খেতে চাইলেন না। ৩রা আগস্টও শরীরের কোনো উন্নতি নেই। ৪ঠা আগস্ট সকালে চার আউন্সের মতো কফি খেলেন। জ্বর বাড়ল। ৫ই আগস্ট ডা. নীলরতন সরকার এবং ডা: বিধান রায়কে নিয়ে আসা হয়। রাতে স্যালাইন দেওয়া হলো কবিকে। অক্সিজেন আনিয়ে রাখা হলো। ৬ই আগস্ট, হেঁচকি উঠছিল কবির। পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী ডাকছিলেন, ‘বাবা মশায়!’ একটু সাড়া দিলেন কবি। রাত ১২টার দিকে আরও অবনতি হলো কবির শরীরের। ৭ই আগস্ট ছিল ২২ শ্রাবণ। কবিকে সকাল নয়টার দিকে অক্সিজেন দেওয়া হলো। নিশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে থাকল কবির। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তা একেবারে থেমে গেল।

সেদিন আকাশবাণী থেকে কবির মৃত্যু পথযাত্রার খবর প্রচারিত হওয়ায় তাঁকে শেষ দেখার জন্য অজস্র মানুষ ছুটে আসতে শুরু করে। জমা হওয়া ওই ভিড় জোড়াসাঁকোর পুরোনো বাড়ির দোতলায় পাথরঘর-এ উঠবার জন্য উন্মাদ হয়ে ওঠে। ভেঙে পড়ে সমস্ত শৃঙ্খলা। জনতার চাপে কিছুক্ষণের মধ্যেই কোলাপসিবল গেট ভেঙে পড়ে। কেউ কেউ জল নিকাশি পাইপ বেয়েও উঠতে শুরু করে। ১২টা নাগাদ কবির ডান হাতটা একটু উঠেই নেমে আসে, একটা তীব্র আর্তস্বর ভেসে আসে ঘর থেকে, ‘গুরদেব আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।’ তাঁকে যে ঘরে রাখা হয়েছিলো তার দুটো দরজাই বন্ধ করে দেওয়া হয়। কবির প্রাণহীন দেহটাকে শেষযাত্রার জন্য তৈরি করা হচ্ছে, তখনো উচ্ছৃঙ্খল জনতার বাঁধভাঙা চাপ আছড়ে পড়ছিলো বন্ধ সেই ঘরের দিকে। একদল জনতা টান মেরে দরজার ছিটকানি খুলে ফেলে। তখন কবির নিরাভরণ, প্রাণহীন দেহটিকে স্নান করানো হচ্ছিলো। কবির শবদেহও কৌতূহলী মানুষের অপমানজনক দৃষ্টি থেকে নিস্তার পায় না।

বেলা ৩টা নাগাদ একদল লোক ঘরের মধ্যে ঢুকে ঠাকুরবাড়ির স্বজনদের চোখের সামনে দিয়েই কবির মরদেহ কাঁধে তুলে নিয়ে জয়ধ্বনি দিতে দিতে বেরিয়ে যায়। অনিয়ন্ত্রিত সেই জনতার কাঁধে কবির দেহ, পূর্ব নির্ধারিত কেওড়াতলার বদলে নিয়ে চলে নিমতলার শশ্মানঘাটে। যখন ঘাটে কবির দেহ পৌঁছালো তখন তাঁর মুখমণ্ডল বিকৃত, চুল দাড়ি ছিঁড়ে নিয়েছে উন্মত্ত জনতার কেউ কেউ। সুন্দর ও শান্তির সাধকের কবিকে শেষ বিদায় নিতে হলো উচ্ছৃঙ্খল অশান্ত জনতার হাতে।