পৌরাণিক আকাশে রবির পুরাণ

সাদ কামালী

(পূর্ব প্রকাশের পর)

সাহিত্যসৃষ্টি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের মত উত্তরপ্রজন্মের আধুনিক কবি, নাট্যকার শিশিরকুমার দাশের মতো হলেও, বুদ্ধদেবের প্রায় বিপরীত, রবীন্দ্রনাথের ইউরোপীয় মহাকাব্য, মহাভারত-রামায়ণ নিয়ে আলোচনার সময় মেঘনাদবধ মহাকাব্য প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলে লেখেন, ‘মেঘনাদবধ কাব্যে কেবল ছন্দোবদ্ধে ও রচনাপ্রণালীতে নহে, তাহার ভিতরকার ভাব ও রসের মধ্যে একটা অপূর্ব পরিবর্তন দেখিতে পাই। এই পরিবর্তন আত্মবিস্মৃত নহে। ইহার মধ্যে একটা বিদ্রোহ আছে। কবি পয়ারের বেড়ি ভাঙিয়াছেন এবং রাম-রাবণের সম্বন্ধে অনেক দিন হইতে আমাদের মনে যে একটা বাঁধাবাঁধি ভাব চলিয়া আসিয়াছে স্পর্ধাপূর্বক তাহারও শাসন ভাঙিয়াছেন। এই কাব্যে রাম-লক্ষণের চেয়ে রাবণ-ইন্দ্রজিৎ বড়ো হইয়া উঠিয়াছে। যে ধর্মভীরুতা সর্বদাই কোন্টা কতটুকু ভালো ও কতটুকু মন্দ তাহা কেবলই অতি সূক্ষ্মভাবে ওজন করিয়া চলে, তাহার ত্যাগ দৈন্য আত্মনিগ্রহ আধুনিক কবির হৃদয়কে আকর্ষণ করিতে পারে নাই। তিনি স্বতঃস্ফূর্ত শক্তির প্রচণ্ড লীলার মধ্যে আনন্দবোধ করিয়াছেন। এই শক্তির চারিদিকে প্রভূত ঐশ্বর্য। ... কবি সেই ধর্মদ্রোহী মহাদম্ভের পরাভাবে সমুদ্রতীরে শ্মশানে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া কাব্যের উপসংহার করিয়াছেন’ (সাহিত্যসৃষ্টি, রবীন্দ্র-রচনাবলী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৬৪)। পরিণত রবীন্দ্রনাথ একজন আধুনিক কবির বোধ, কিংবদন্তি কাহিনীর ভিতর থেকে কাব্য রুচি সাপেক্ষে চরিত্র নির্বাচন মূল্যায়ন এবং ভাব রসের অপূর্ব সৃষ্টি দেখতে পেলেন। রবীন্দ্রনাথের এরকম দেখাকে বুদ্ধদেব বসু তীব্র কটাক্ষ করতে দ্বিধান্বিত হন না, তিনি অভিযোগ করেন, রবীন্দ্রনাথের ‘এই মন্তব্যে যাথার্থ্য নেই, আছে শুধু চলতি মতের পুনরুক্তি।’ তিনি লেখেন, ‘আমাদের আধুনিক সাহিত্যে মাইকেলের প্রভাব যে বলতে গেলে শূন্য ... তাঁর প্রবর্তিত অমিত্রাক্ষর পর্যন্ত জাদুঘরের মূল্যবান নমুনা হয়েই রইলো,... মাইকেলে আমরা পাই শুধু আকাঁড়া অনুকরণ।’ রবীন্দ্রনাথ শুধু জনরব দ্বারা চালিত হয়েছিলেন এবং মনোযোগ দিয়ে কাব্যটি পড়েননি ব’লে বুদ্ধদেব মনে করেন। কারণ ‘মনোযোগ দিয়ে মেঘনাদবধ কাব্য পড়লে আজকের দিনের যে-কোনো পাঠক বুঝবেন যে প্রকরণের অভিনবত্ব বাদ দিলে তাতে অপূর্ব পরিবর্তন বা বিদ্রোহ কিছুমাত্র নেই, বরং সে-গ্রন্থ দৃষ্টিহীন গতানুগতির একটি অনবদ্য উদাহরণ।’ এর পরেই তিনি তাঁর মাইকেল বধের কারণের প্রতি অলক্ষ্যেই ইঙ্গিত করেন, আর তা হলো বিজাতীয় হয়েও এমন এক রামায়ণ মাইকেল সৃষ্টি করলেন যার নায়ক রাম-লক্ষ্মণ নয়, রাম-লক্ষ্মণকে ছোট ক’রে রাক্ষস রাবণকে নায়ক ক’রে তুলেছেন। এই মহাকাব্যে যে মন প্রকাশ পেয়েছে তাতে বুদ্ধ বিরক্ত। রবীন্দ্রনাথ যেখানে আধুনিক কবির হৃদয় ও আনন্দবোধের লীলা দেখেছেন ‘অমর কাব্য’ বা সাহিত্যরস হিসেবেই। বুদ্ধদেব লেখেন, ‘নামে, (খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ ক’রে মাইকেল নাম ধারণ, হিন্দুধর্মত্যাগ, তো তিনি বিজাতীয়) পানাহারে, নিত্যকর্মে ও নিত্যকার ভাষায় প্রতিশ্রুত বিজাতীয় হওয়া সত্ত্বেও, কিংবা সেইজন্যই, তাঁর রচনায় যে মন প্রকাশ পেয়েছে তা তৎকালীন লোকধর্মের সংকীর্ণ সংস্কার আবদ্ধ।’ যেহেতু মাইকেল প্রতিশ্রুত বিজাতীয় তাই তিনি ‘ব্যাস-বাল্মীকির নৈষ্ঠিক অনুসরণ’ করেন না। যদি ‘করতেন তাহলেও সংস্কার পাষাণের শাপমুক্তি হতো।’ বুদ্ধদেব বসু পুরাণ কবির মহাকাব্য থেকে বেরিয়ে মেঘনাদবধকে নতুন ক’রে প্রাচীন সাহত্যি সৃষ্টির মহাকাব্যিক আয়োজনকে সৃষ্টির জায়গা থেকে দেখাত রাজি নন। ‘মাইকেল’ প্রবন্ধে বিস্তৃতভাবে মেঘনাদ চরিত্রের ব্যাখ্যা তিনি করেন রামায়ণের ‘মহৎ’ আদর্শে। মাইকেল হন তার কাছে উপেক্ষিত। বুদ্ধদেবের আলোচনার ভাষায় সাধারণ শ্রদ্ধা বা শিষ্টাচারও কখনো কখনো লোপ পায় ক্ষোভের প্রকাশের কারণে। তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তন ও রবীন্দ্রনাথের ওপর তার প্রভাব অস্বীকার করেন। মাইকেলের নাম ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘মধুচক্রের মক্ষিকাবৃত্তির চিহ্নমাত্র নেই’ রবীন্দ্রনাথের ওপর। কবি হেমচন্দ্রের প্রভাব থাকলেও মাইকেলের নয়। তিনি বলেন, ‘মাইকেলি’ অমিত্রাক্ষর। মাত্র চার বছর বাংলা সাহিত্য সাধনায় একটি নতুন ছন্দ বাংলা কবিতায় মাইকেল প্রবর্তন ঘটালেন এখানে তাঁর ভূমিকা সূচকের, প্রবর্তকের, অনেক পরে ভারতের সেরা প্রতিভা রবীন্দ্রনাথের হাতে এই অমিত্রাক্ষর ছন্দ পরিশীলিত ও আরও মধুর হয়ে উঠবেই। বুদ্ধদেব মাইকেলের এই শুরুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনা ক’রে মাইকেলের নিন্দার প্রয়াস শুধু মাইকেলের ছন্দের ন্যূনতা নয়, অন্য কিছু, বিজাতীয় কবির বা হিন্দু ধর্মত্যাগীর ‘স্পর্ধা’ ও ‘বিদ্রোহে’ তিনি ক্ষুব্ধ। তিনি তুলনা ক’রে লেখেন, ‘মাইকেল পড়া না-পড়ায় শিক্ষার তারতম্য বটে; রবীন্দ্রনাথ পড়া না-পড়ায় জন্ম-জন্মান্তরের ব্যবধান।’ বুদ্ধদেব বসুর মতে, ‘মাইকেল শুধু ভাষার আওয়াজ শুনতেন- আর আওয়াজটাও খুব কড়া রকমের হওয়া চাই- তার ছবিটা দেখতেন না, ইঙ্গিতের বিচ্ছুরণ অনুভব করতেন না।’ মনোযোগসহ কি বুদ্ধদেব মাইকেলকে পাঠ করেছেন নাকি বিশেষ ‘বিদ্রোহে’ তিনি শুধু বিরক্ত হয়েই ছিলেন! মেঘনাদবধ কাব্যে ভাষা ও রীতির একটি বিশিষ্টতা মাইকেল তৈরি করেছিলেন, এই মহাকাব্যের অন্যপ্রান্তে তাঁর প্রহসন দু’টি সেখানে লোকমুখ-বচনের নিখুঁত অনুকৃতি। গ্রাম ও শহর, পুরুষ ও নারী, এক প্রজন্ম ও অন্য প্রজন্ম, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত, ভিন্ন ভিন্ন বৃত্তি, এইরকম নানা স্তর বিভক্ত সমাজে ব্যবহৃত ভাষার প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র পর্দা ধরা পড়ে মাইকেলের সংলাপ রচনায়। অনায়াসে তিনি গেঁথে নেন বাংলা ইংরেজির মিশ্রণ, ইংরেজির সঙ্গে হিন্দির মিশ্রণ, বাংলা সঙ্গে ফারসির মিশ্রণ- আর এদের মধ্যে দিয়ে সূচিত হয় আমাদের বাস্তব সামাজিক পরিচয়গুলি। সবকিছু নিয়ে ভাষার যে সামাজিক চরিত্র তা পরিস্ফুট হয়ে ওঠে এই দু’টি জীবন্ত নাটকে। বুদ্ধদেব বসু কথিত ‘আজকের দিনের পাঠক’ নাট্যকার কবি শিশিরকুমার দাশের এই অভিমত। ‘মাইকেলি’ ভাষার মৃত্যু ঘোষণা সর্বত্রই হয়তো সত্য নয়, ভাষা প্রকরণের যে ঐতিহ্য সূচিত হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে তা আজও আমাদের ভাষা প্রকরণের ভিত্তিতে কোনো না কোনোভাবে ক্রিয়াশীল।

‘মেঘনাদবধ’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথ যেমন যথার্থই দেখেছিলেন, শাশ্বত বিশ্বাস ও সংস্কারে মাইকেলের সৃষ্টি করা ‘অপূর্ব পরিবর্তন’ এবং এই পরিবেশের ভিতরে ‘বিদ্রোহ’। এই বিশেষ পর্যবেক্ষণে রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন ‘নাস্তিক শক্তির স্পর্ধা’ (সাহিত্যসৃষ্টি) এবং মহাকাব্যের শেষে এই স্পর্ধাকেই বিদায়কালে কাব্যলক্ষ্মী নিজের অশ্রুসিক্ত মালাখানি তাহারই গলায় পরাইয়া দিল’ (সাহিত্যসৃষ্টি)। বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথের এই স্পর্ধার গলায় কাব্যলক্ষ্মীর মালা দেখতে অপ্রস্তুত, তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের এ-কথাও গ্রাহ্য নয় যে নাস্তিক শক্তির স্পর্ধাকেই কাব্যলক্ষ্মীর বিদায়কালে মালা পরিয়ে দিলেন।’ কেননা বুদ্ধদেব কাব্যরস এবং কাব্যের মূল ভরকেন্দ্রের আবেগ, মেঘনাদের ট্র্যাজেডি দেখতে রাজি নন, বরং নাস্তিক্য ও স্পর্ধাকে উড়িয়ে তিনি দেখাতে চান মেঘনাদবধ কাব্যে শেষ পর্যন্ত রাবণ বা মেঘনাদের জীবনের কোনো করুণ গাথা, সহানুভূতি নয়, ‘কারণ লক্ষ্মণ যখন মরেও বাঁচলো, তখনই জানলুম যে রাবণের চিতা জ্বলতে আর দেরি নেই, কিন্তু সেই অনির্বাণ আগুনও আমাদের মনকে ছুঁতে পারলো না, কেননা ততক্ষণে দেবদেবীদের কথাবার্তা শুনে আমরা বুঝে নিয়েছি যে রাম ভালোমানুষ আর রাবণটা বদমাস।’ এবং বুদ্ধদেব বসু তার এই বিশ্বাস ও সংস্কার দিয়ে নাস্তিক শক্তির গলায় রবীন্দ্রনাথের উপঢৌকন অগ্রাহ্য করলেন।

সঞ্জয় বলেন, বুঝতেই পারছ জ্যোতি, কোন প্রেক্ষাপটে নব্যতরুণ রবি লিখেছিলেন ওই ‘কাঁচা’ সমালোচনা। এই পাঠে দেখো তোমাকেও দায়বদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে, আমিই বা কেন বুদ্ধকে নয় রবিকে দিয়েই চাচ্ছি একটি অমর কাব্য নির্মাণ করিয়ে নিতে! জ্যোতি বলেন, পণ্ডিতবর সঞ্জয়, শুধু ব্যাস-বাল্মীকি নয়, এমনকি মাইকেলও নয়, বাংলায় তো কৃত্তিবাসও জন্ম নিয়েছেন, তাঁর রামায়ণ বাঙালি পড়েছে রাম-লক্ষ্মণ-সীতার দুঃখে তারা বহুকাল ধ’রে কাঁদছে। আপনি নিশ্চয় জানেন বাল্মীকির তুলনায় কৃত্তিবাস বাংলায় বেশি জনপ্রিয়।

সঞ্জয় জ্যোতিকে প্রায় থামিয়ে বলেন, কৃত্তির কৃতির কথা ভালো করেই জানি। জনপ্রিয় কাব্য সবসময় গুণধর নয়, বহুকাল আগেই কৃত্তিবাসকে

দিয়ে একটি সঞ্জয় চরিত বা পুরাণ লিখিয়ে নিতে পারতাম, তা না ক’রে রবি পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হলো। কৃত্তিবাস বাঙালি, সঞ্জয় ভারতের। কৃত্তিবাস বাংলায় প্রিয় হয়েছে কাব্যগুণে নয়, আত্মীয়তার কারণে। তোমাকে বলি, কৃত্তিবাসের রামায়ণ ঠিক বাল্মীকির অনুবাদ নয়, রামায়ণের বাংলা রূপকার। এই কাব্যে রাম লক্ষ্মণ সীতাসহ রাক্ষস দানব দেব দেবতা সবাই বাঙালি। এর ভিতরে বর্ণিত পরিবেশ সমাজ সবই বাঙালির। কিন্তু এর আত্মার সঙ্গে বাল্মীকির রামায়ণের আত্মার পার্থক্য কবি মাত্রই বোঝে। কৃত্তিবাস অপেক্ষাকৃত নতুন, তাঁর নৈতিকতা কালের মোড়কে, আদি কবি উপলব্ধির মতো নয়। এজন্য বাল্মীকিতে বর্ণিত রাম, লক্ষ্মণের উত্তেজনা, আদর্শবাদিতা নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা, সীতার প্রতি রামের আচরণ কৃত্তিবাসে এ-সবের বদল ঘটে নৈতিকতার মাপকাঠিতে। যেমন মনে কর, বাল্মীকিতে আছে রামের বনবাসের খবর পেয়ে উত্তেজিত লক্ষ্মণ বলছে, ‘ওই কৈকেয়ী-ভজা বুড়ো বাপকে আমি বধ করবো।’ অথবা লঙ্কাকাণ্ডের যুদ্ধের পর সীতাকে যখন রাম পরিত্যাগ করে তখন সীতা রামকে বলে, ‘প্রাকৃতজন’ বা ইতরজন। কৃত্তিবাসের নতুন মন, কিন্তু মহাকাব্য সৃষ্টির মন নয়। এসবকে ক্ষুদ্রতা হিসেবে দেখেন এবং বর্জন করেন। আদি কবির কাছে মহাকাব্যের বাস্তবতায় সম্পূর্ণতা তৈরি হবে, হবে নির্মম নিরাসক্ত। মহাকাব্যে করুণ রসের মত্ততা বা শুধু বীরত্বের বিশেষ আয়োজন ঘটবে না, এর কণ্ঠস্বর কখনো কাঁপে না, বড়ো ঘটনা আর সামান্য ঘটনার ভেদ নেই, সবই সমান। রবির অনেক পরে এক কবির জন্ম ঘটে, নাম বুদ্ধদেব বসু, ওর কথা আগেই বলেছি, তুমি তাকে দেখোনি, কারণ তাঁর এখনো জন্ম হয়নি, তাঁর আলোচনায় লেখা আছে, ‘মহাকাব্যের বাস্তবতা এমনই নির্ভীক যে সংগতি রক্ষার দায় পর্যন্ত তার নেই; তুচ্ছ আর প্রধানকে সে পাশাপাশি বসায়, কিছু লুকায় না, কিছু ঘুরিয়ে বলে না, বড়ো বড়ো ব্যাপার দু-তিন কথায় সারে... মানব স্বভাবের কোনো মন্দেই তার চোখের পাতা যেমন পড়ে না, তেমনি ভালোর অসম্ভব আদর্শকেও নিতান্ত সহজে চালিয়ে দেয়। সেই জন্য মহাভারতে দেখতে পাই চিরকালের সমস্ত মানবজীবনের প্রতিবিম্বন; তাতে এমন মন্দের সন্ধান পাই যাতে এই ঘোর কলিতে আমরা আঁতকে উঠি, আবার ভালোও অপরিসীম, অনির্বাচনীয় রূপে ভালো...। শুধু পৃষ্ঠাসংখ্যায় নয়, জীবনদর্শনের ব্যাপ্তিতে রামায়ণ অনেকটা ছোটো, কিন্তু কাব্য হিসেবে এবং কাহিনী বিশেষে তাতে ঐক্য বেশি এবং আমরা যাকে কবিত্ব বলি তাতে রামায়ণ সম্ভবত সমৃদ্ধতর’ (রামায়ণ, সাহিত্যচর্চা)।

জ্যোতির মনে হলো নিচু আকাশ থেকে যে নক্ষত্রটা ছুটে জায়গা বদল করেছিল, সে আবার তার জায়গায় ফিরে আসে, তার আলোর সূক্ষ্ম ঝলক তাঁর চোখে বিঁধেছিল। তাই চোখের ওপর হাত ডলে জ্যোতি বলেন, তাহলে পণ্ডিতবর বুদ্ধদেবও হতে পারেন আপনার জীবনের নবরূপকার! সঞ্জয় দ্রুত বলেন, তা যে পারে না তার উদাহরণ আমরা আগেই পেয়েছি। মহাকাব্য দু’টি কাব্য ও চিরকালের ইতিহাস ছাড়াও বুদ্ধদেবের কাছে ইতিহাস ও বিশ্বাসের আকর গ্রন্থ হিসেবে মূল্যবান। সে-কারণে মধুকবির নতুন কাব্যের রস ও বৈচিত্র্য আস্বাদ না ক’রে বিরক্ত হলেন। কিন্তু রবি মহাকাব্যের মর্যাদায় মেঘনাদবধকে পাঠ করলেন পরিণত বয়সে। আবার দেখ রামায়ণ প্রবন্ধেই রবি কাব্য বিচারের আদর্শ সম্পর্কে সতর্ক ক’রে দিয়েছেন, বলছেন, ‘রামায়ণ-মহাভারতের যে সমালোচনা তা অন্য কাব্য সমালোচনার আদর্শ হইতে স্বতন্ত্র। রামের চরিত্র উচ্চ কি নীচ, লক্ষ্মণের চরিত্র আমার ভালো লাগে কি মন্দ লাগে এই আলোচনাই যথেষ্ট নহে’ (রামায়ণ, রর, ৩য়)। প্রবন্ধের অন্য স্তবকে বলছেন, মহাভারত ও রামায়ণ সম্পর্কে, ‘ইহার সরল অনুষ্টুপ ছন্দে ভারতবর্ষের সহস্য বৎসরের হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হইয়া আসিয়াছে’ (্ঐ)। কিন্তু বুদ্ধ হালনাগাদ আদর্শে কাব্যের শ্রেষ্ঠত্বের বিচার করছেন। শুধু এই নয়, মহাকাব্যের শক্তি রবির মধ্যেই দেখেছি, এমন ব্যাপ্তি ও কবিত্ব ভারতে আর দেখতে পাচ্ছি না। যা বলো ভাই, রবিকে দিয়ে সঞ্জয়পুরাণ লেখাতেই হবে। তোমরা এখনো রবির খবর জানো না, হয়তো ওর সম্ভাবনা আঁচ করতে পার, রবি মহাকাব্য মহাভারত থেকে কতো আখ্যান নিয়ে অসাধারণ ও স্বাধীন কাব্য রচেছেন, মহাকাব্যের কাহিনীর পুনরাবৃত্তি না ক’রে নিজের কবিত্ব ও চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে তাতে, কিন্তু তা মহাকাব্যের সমালোচনা নয়, বলতে পারো মহাকাব্যের রূপ, কাহিনী ও সত্যকেও আরও বিস্তৃত করেছেন। ও কোথাও বলেন না কোন্ মহাকাব্যটি অধিকতর ’সমৃদ্ধতর’, মহাকাব্য দু’টির ইতিহাসই এমন যে কাব্যদু’টি সৃষ্টি ও পরিবর্দ্ধিত হয়েছে বিভিন্ন কবির হাতে বিভিন্ন সময়ে।

জ্যোতি বলেন, তাহলে রবি কি তেমন প্রাচীন কবিদের একজন যার হাতে মহাকাব্য বর্ধিত পরিবর্তিত হবে বা হয়েছে! সঞ্জয় মাথার ওপর হাত ঘুরিয়ে ঋষিদের মতো লম্বা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেন, এমন ঠিক নয়। ঘটনা নিজের মতো প্রকাশ করার স্বাধীনতা নিয়েছে রবি, ফলে রবি প্রাচীন কবিদের দাসত্ব না ক’রে নিজের মতো রূপ তৈরি ক’রে নিয়েছেন, ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। যেভাবে ঘটেছে পুরাণে, যে সুর ছন্দে আন্দোলিত আদি কবিদের কাব্য, রবীন্দ্রনাথ সেই সুর ছন্দে নিজের স্বর ও স্বাক্ষর যুক্ত করেছেন, নিজের মতো ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করেছেন স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশে, সেই প্রকাশে কাব্য-আত্মা দলিত নয় বরং ব্যঞ্জনাময় এবং কালের উপযোগী ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। সবইতো কাব্য ও স্বপ্ন আকাক্সক্ষার ইতিহাস, যা সময়ের ঘটনা থেকে নয় কবির হৃদয়ে জন্ম নেয় স্বাধীনভাবে; যুক্তি সংগতি সম্ভব অসম্ভবের বিচার হবে কাব্যসত্যের আদলতে, সমালোচকের কাঠগড়ায় নয়। যেমন দেখ রবির লেখা ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্য নাটকটি মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা থেকে অনেকই অন্য রকম। রূপ-যৌবন ও নারীসত্তার প্রতি পুরুষের উপেক্ষা চিত্রাঙ্গদাকে পীড়িত করে, সব নারীকেই করবে হয়তো। বসন্ত ও মদন দেবের সহযোগিতায় ওই উপেক্ষার বদলে প্রেম ও সম্মান আদায় ক’রে ছাড়ে অর্জুনের। কিন্তু পুরুষের কাছে এই নারী সম্পূর্ণ নিবেদন করেও আত্মাভিমান ও আত্ম-স্বাতন্ত্র্যের বোধে তৃপ্ত হতে পারে না একান্ত নিজের কাছে। বসন্ত ও মদনের কাছ থেকে ধার নেয়া রূপ ও মদির যৌবন চিত্রাঙ্গদার নিজের দেহে বহন করলেও একান্ত অন্তর্গতভাবে আত্মার সঙ্গে দেহ সৌন্দর্যের সতীন সম্পর্ক অনুভব করে। আত্মসম্মানবোধ সংবেদী চিত্রাঙ্গদা গভীরে দীর্ণ হয়, নরলোকের অশান্তি দেহসুখ ছাপিয়ে জেগে ওঠে অন্তরে। ধার করা বাহ্যিক রূপের মোহ দিয়ে ভোলানোয় অস্বস্তি রবির সৃষ্টি করা চিত্রাঙ্গদার, আদি কবির নয়। চিত্রাঙ্গদার কণ্ঠে তার সেই অন্তরগূঢ় বোধের কথা শোনো,

আজ প্রাতে উঠে, নৈরাশ্যধিক্কার বেগে

অন্তরে অন্তরে টুটিছে হৃদয়। মনে

পড়িতেছে একে একে রজনীর কথা।

বিদ্যুৎবেদনাসহ হতেছে চেতনা।

অন্তরে বাহিরে মোর হয়েছে সতিন

আর তাহা নারিব ভুলিতে। সপতœীরে

স্বহস্তে সাজায়ে সযতনে, প্রতিদিন

পাঠাইতে হবে, আমার আকাক্সক্ষাতীর্থ

বাসরশয্যায়; অবিশ্রাম সঙ্গে রহি

প্রতিক্ষণ দেখিতে হইবে চক্ষু মেলি

তাহার আদর। ওগো, দেহের সোহাগে

অন্তর জ্বলিবে হিংসানলে, হেন শাপ

নরলোকে কে পেয়েছে আর।

তোমাকে একটা কথা বলে রাখি, রবির বিশাল কর্মরাজির মধ্যে আরও বহু বহু নারী চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে, রবির বিশেষ ক’রে মেয়েদের নিয়ে নিজের ভাবনাও লিখবেন কিন্তু কালে তা গৃহীত নাও হতে পারে, ওর নারী চিন্তার পুরাতনী ভাব লোকে সমালোচনা করবে যদিও এর সত্য ও বাস্তব রূপ উপেক্ষা করা যাবে না। অভিভূত জ্যোতি ঠাকুরের দিকে চেয়ে সঞ্জয় বলেন, চিত্রাঙ্গদা অসাধারণ কাব্য, গীতিধর্মী কাব্য নাটক। জ্যোতি বলেন, অদৃষ্ট দ্রষ্টা, রবি তার জীবনকালে যা যা রচনা করেছেন তার সব পাঠ শেষ করেছেন! শোনো জ্যোতি, দিব্যদৃষ্টিসম্পন্নের জন্য এ কোনো বিস্ময়কর কাজ নয়। তবে আমি তোমাকে শুধু বলছি পুরাণের আখ্যান ব্যবহার ক’রে নিজের স্বাধীন কাব্যবোধ থেকে কী সব রসসৃষ্টি করেছেন তার কিছু নমুনা। আদি কবিদের চিন্তা ও কাহিনীকে রবি কাব্য নির্মাণের প্রতিভায় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেখেই মূলত আমি ঠিক ক’রে নিয়েছি রবিই সেই কবি এই সঞ্জয়ের জীবনকে যে ব্যাসদেবের বর থেকে আরও বড়ো বরে নায়ক ক’রে তুলতে পারবেন। তুমি দেখো এই চিত্রাঙ্গদা নাট্য ভাবনাটি তাঁর মনে কিভাবে তৈরি হলো! প্রথমে সে জীবনের সত্য, বাস্তবতার গভীর একটি বোধ দ্বারা আলোড়িত হলো, তারপর সেই আলোড়নকে কাব্যে প্রকাশ করার ভাবনায় চিত্রাঙ্গদা উপাখ্যানটি তার মাথায় আসে। মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা উপাখ্যানটি তেমন বড়ো কিছু নয়। সংস্কৃত তেরটি শ্লোকে যে আখ্যান বর্ণিত হয়েছে তাতে আত্মসচেতন, বোধোজ্জ্বল কোনো রমণীর গল্প সেখানে নেই। মহাভারতের আদি পর্বের অর্জুন বনবাস পর্বাধ্যায়-এ চিত্রাঙ্গদার খবর আমরা জানি। যাই হোক, এখন রবির কাছ থেকেই শোনো ‘চিত্রাঙ্গদা’ সূচনার কথা-

“অনেক বছর আগে রেলগাড়িতে যাচ্ছিলাম শান্তি নিকেতন থেকে কলকাতার দিকে। তখন বোধ করি চৈত্র মাস হবে। রেল লাইনের ধারে ধারে আগাছার জঙ্গল। হলদে বেগনি সাদা রঙের ফুল ফুটেছে অজস্র। দেখতে দেখতে এই ভাবনা এল মনে যে আর কিছুকাল পরেই রৌদ্র হবে প্রখর, ফুলগুলি তাদের রঙের মরীচিকা নিয়ে যাবে মিলিয়ে- তখন পল্লীপ্রাঙ্গণে আম ধরবে গাছের ডালে ডালে, তরুপ্রকৃতি তার অন্তরের নিগূঢ় রস-সঞ্চয়ের স্থায়ী পরিচয় দেবে আপন অপ্রগলভ ফল সম্ভারে। সেই সঙ্গে কেন জানি হঠাৎ আমার মনে হলো সুন্দরী যুবতী যদি অনুভব করে যে সে তার যৌবনের মায়া দিয়ে প্রেমিকের হৃদয় ভুলিয়েছে তাহলে সে তার সুরূপকেই আপন সৌভাগ্যের মুখ্য অংশে ভাগ বসাবার অভিযোগে সতিন ব’লে ধিক্কার দিতে পারে। এ যে তার বাইরের জিনিস, এ যেন ঋতুরাজ বসন্তের কাছ থেকে পাওয়া বর, ক্ষণিক মোহ বিস্তারের দ্বারা জৈব উদ্দেশ্য সিদ্ধ করবার জন্যে। যদি তার অন্তরের মধ্যে যথার্থ চরিত্রশক্তি থাকে তবে সেই মোহযুক্ত শক্তির দানই তার প্রেমের পক্ষে মহৎলাভ, যুগল জীবনের জয়যাত্রার সহায়। সেই দানে আত্মার স্থায়ী পরিচয়, এর পরিণামে ক্লান্তি নেই, অবসাদ নেই, অভ্যাসের ধূলিপ্রলেপে উজ্জ্বলতার মালিন্য নেই। এই চারিত্রশক্তি জীবনের দ্রুব সম্বল, নির্মল প্রকৃতির আশু প্রয়োজনের প্রতি তার নির্ভর নয়। অর্থাৎ এর মূল্য মানবিক, এ নয় প্রাকৃতিক।”

“এ ভাবটাকে নাট্য আকারে প্রকাশ-ইচ্ছা তখনই মনে এল, সেই সঙ্গে মনে পড়ল মহাভারতের চিত্রাঙ্গদার কাহিনী। এই কাহিনীটি কিছু রূপান্তর নিয়ে অনেকদিন আমার মনের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল। অবশেষে লেখবার আনন্দিত অবকাশ পাওয়া গেল উড়িষ্যায় পাণ্ডুরা বলে এক নিভৃত পল্লীতে গিয়ে” (রবীন্দ্র-রচনাবলী, ২য় খণ্ড, “চিত্রাঙ্গদার সূচনা”)। জীবন-সায়াহ্নে রবি ‘চিত্রাঙ্গদার সূচনা’র এই খবর জানিয়ে গেছেন। কাব্য, নাট্য ও সঙ্গীতগুণ রচনাটি মুগ্ধ করে। জ্যোতি এই সূচনার কথা জানত না, কথাও নয়। পরবর্তী প্রজন্মের একটি পাঠে সব প্রসঙ্গই উঠে এসেছে, চিত্রাঙ্গদা আলোচনা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মেয়েদের নিয়ে ভাবনা চিন্তার খোঁজখবর, ও রবীন্দ্রনাথের চারপাশের পরিবেশের কিছু খবর এতে রয়েছে। ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ২৮ জুলাই ২০২২ , ১৩ শ্রাবণ ১৪২৯ ২৯ জিলহজ ১৪৪৩

পৌরাণিক আকাশে রবির পুরাণ

সাদ কামালী

image

১৯৩১ সালে ৭০তম জন্যবার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

(পূর্ব প্রকাশের পর)

সাহিত্যসৃষ্টি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের মত উত্তরপ্রজন্মের আধুনিক কবি, নাট্যকার শিশিরকুমার দাশের মতো হলেও, বুদ্ধদেবের প্রায় বিপরীত, রবীন্দ্রনাথের ইউরোপীয় মহাকাব্য, মহাভারত-রামায়ণ নিয়ে আলোচনার সময় মেঘনাদবধ মহাকাব্য প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলে লেখেন, ‘মেঘনাদবধ কাব্যে কেবল ছন্দোবদ্ধে ও রচনাপ্রণালীতে নহে, তাহার ভিতরকার ভাব ও রসের মধ্যে একটা অপূর্ব পরিবর্তন দেখিতে পাই। এই পরিবর্তন আত্মবিস্মৃত নহে। ইহার মধ্যে একটা বিদ্রোহ আছে। কবি পয়ারের বেড়ি ভাঙিয়াছেন এবং রাম-রাবণের সম্বন্ধে অনেক দিন হইতে আমাদের মনে যে একটা বাঁধাবাঁধি ভাব চলিয়া আসিয়াছে স্পর্ধাপূর্বক তাহারও শাসন ভাঙিয়াছেন। এই কাব্যে রাম-লক্ষণের চেয়ে রাবণ-ইন্দ্রজিৎ বড়ো হইয়া উঠিয়াছে। যে ধর্মভীরুতা সর্বদাই কোন্টা কতটুকু ভালো ও কতটুকু মন্দ তাহা কেবলই অতি সূক্ষ্মভাবে ওজন করিয়া চলে, তাহার ত্যাগ দৈন্য আত্মনিগ্রহ আধুনিক কবির হৃদয়কে আকর্ষণ করিতে পারে নাই। তিনি স্বতঃস্ফূর্ত শক্তির প্রচণ্ড লীলার মধ্যে আনন্দবোধ করিয়াছেন। এই শক্তির চারিদিকে প্রভূত ঐশ্বর্য। ... কবি সেই ধর্মদ্রোহী মহাদম্ভের পরাভাবে সমুদ্রতীরে শ্মশানে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া কাব্যের উপসংহার করিয়াছেন’ (সাহিত্যসৃষ্টি, রবীন্দ্র-রচনাবলী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৬৪)। পরিণত রবীন্দ্রনাথ একজন আধুনিক কবির বোধ, কিংবদন্তি কাহিনীর ভিতর থেকে কাব্য রুচি সাপেক্ষে চরিত্র নির্বাচন মূল্যায়ন এবং ভাব রসের অপূর্ব সৃষ্টি দেখতে পেলেন। রবীন্দ্রনাথের এরকম দেখাকে বুদ্ধদেব বসু তীব্র কটাক্ষ করতে দ্বিধান্বিত হন না, তিনি অভিযোগ করেন, রবীন্দ্রনাথের ‘এই মন্তব্যে যাথার্থ্য নেই, আছে শুধু চলতি মতের পুনরুক্তি।’ তিনি লেখেন, ‘আমাদের আধুনিক সাহিত্যে মাইকেলের প্রভাব যে বলতে গেলে শূন্য ... তাঁর প্রবর্তিত অমিত্রাক্ষর পর্যন্ত জাদুঘরের মূল্যবান নমুনা হয়েই রইলো,... মাইকেলে আমরা পাই শুধু আকাঁড়া অনুকরণ।’ রবীন্দ্রনাথ শুধু জনরব দ্বারা চালিত হয়েছিলেন এবং মনোযোগ দিয়ে কাব্যটি পড়েননি ব’লে বুদ্ধদেব মনে করেন। কারণ ‘মনোযোগ দিয়ে মেঘনাদবধ কাব্য পড়লে আজকের দিনের যে-কোনো পাঠক বুঝবেন যে প্রকরণের অভিনবত্ব বাদ দিলে তাতে অপূর্ব পরিবর্তন বা বিদ্রোহ কিছুমাত্র নেই, বরং সে-গ্রন্থ দৃষ্টিহীন গতানুগতির একটি অনবদ্য উদাহরণ।’ এর পরেই তিনি তাঁর মাইকেল বধের কারণের প্রতি অলক্ষ্যেই ইঙ্গিত করেন, আর তা হলো বিজাতীয় হয়েও এমন এক রামায়ণ মাইকেল সৃষ্টি করলেন যার নায়ক রাম-লক্ষ্মণ নয়, রাম-লক্ষ্মণকে ছোট ক’রে রাক্ষস রাবণকে নায়ক ক’রে তুলেছেন। এই মহাকাব্যে যে মন প্রকাশ পেয়েছে তাতে বুদ্ধ বিরক্ত। রবীন্দ্রনাথ যেখানে আধুনিক কবির হৃদয় ও আনন্দবোধের লীলা দেখেছেন ‘অমর কাব্য’ বা সাহিত্যরস হিসেবেই। বুদ্ধদেব লেখেন, ‘নামে, (খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ ক’রে মাইকেল নাম ধারণ, হিন্দুধর্মত্যাগ, তো তিনি বিজাতীয়) পানাহারে, নিত্যকর্মে ও নিত্যকার ভাষায় প্রতিশ্রুত বিজাতীয় হওয়া সত্ত্বেও, কিংবা সেইজন্যই, তাঁর রচনায় যে মন প্রকাশ পেয়েছে তা তৎকালীন লোকধর্মের সংকীর্ণ সংস্কার আবদ্ধ।’ যেহেতু মাইকেল প্রতিশ্রুত বিজাতীয় তাই তিনি ‘ব্যাস-বাল্মীকির নৈষ্ঠিক অনুসরণ’ করেন না। যদি ‘করতেন তাহলেও সংস্কার পাষাণের শাপমুক্তি হতো।’ বুদ্ধদেব বসু পুরাণ কবির মহাকাব্য থেকে বেরিয়ে মেঘনাদবধকে নতুন ক’রে প্রাচীন সাহত্যি সৃষ্টির মহাকাব্যিক আয়োজনকে সৃষ্টির জায়গা থেকে দেখাত রাজি নন। ‘মাইকেল’ প্রবন্ধে বিস্তৃতভাবে মেঘনাদ চরিত্রের ব্যাখ্যা তিনি করেন রামায়ণের ‘মহৎ’ আদর্শে। মাইকেল হন তার কাছে উপেক্ষিত। বুদ্ধদেবের আলোচনার ভাষায় সাধারণ শ্রদ্ধা বা শিষ্টাচারও কখনো কখনো লোপ পায় ক্ষোভের প্রকাশের কারণে। তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তন ও রবীন্দ্রনাথের ওপর তার প্রভাব অস্বীকার করেন। মাইকেলের নাম ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘মধুচক্রের মক্ষিকাবৃত্তির চিহ্নমাত্র নেই’ রবীন্দ্রনাথের ওপর। কবি হেমচন্দ্রের প্রভাব থাকলেও মাইকেলের নয়। তিনি বলেন, ‘মাইকেলি’ অমিত্রাক্ষর। মাত্র চার বছর বাংলা সাহিত্য সাধনায় একটি নতুন ছন্দ বাংলা কবিতায় মাইকেল প্রবর্তন ঘটালেন এখানে তাঁর ভূমিকা সূচকের, প্রবর্তকের, অনেক পরে ভারতের সেরা প্রতিভা রবীন্দ্রনাথের হাতে এই অমিত্রাক্ষর ছন্দ পরিশীলিত ও আরও মধুর হয়ে উঠবেই। বুদ্ধদেব মাইকেলের এই শুরুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনা ক’রে মাইকেলের নিন্দার প্রয়াস শুধু মাইকেলের ছন্দের ন্যূনতা নয়, অন্য কিছু, বিজাতীয় কবির বা হিন্দু ধর্মত্যাগীর ‘স্পর্ধা’ ও ‘বিদ্রোহে’ তিনি ক্ষুব্ধ। তিনি তুলনা ক’রে লেখেন, ‘মাইকেল পড়া না-পড়ায় শিক্ষার তারতম্য বটে; রবীন্দ্রনাথ পড়া না-পড়ায় জন্ম-জন্মান্তরের ব্যবধান।’ বুদ্ধদেব বসুর মতে, ‘মাইকেল শুধু ভাষার আওয়াজ শুনতেন- আর আওয়াজটাও খুব কড়া রকমের হওয়া চাই- তার ছবিটা দেখতেন না, ইঙ্গিতের বিচ্ছুরণ অনুভব করতেন না।’ মনোযোগসহ কি বুদ্ধদেব মাইকেলকে পাঠ করেছেন নাকি বিশেষ ‘বিদ্রোহে’ তিনি শুধু বিরক্ত হয়েই ছিলেন! মেঘনাদবধ কাব্যে ভাষা ও রীতির একটি বিশিষ্টতা মাইকেল তৈরি করেছিলেন, এই মহাকাব্যের অন্যপ্রান্তে তাঁর প্রহসন দু’টি সেখানে লোকমুখ-বচনের নিখুঁত অনুকৃতি। গ্রাম ও শহর, পুরুষ ও নারী, এক প্রজন্ম ও অন্য প্রজন্ম, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত, ভিন্ন ভিন্ন বৃত্তি, এইরকম নানা স্তর বিভক্ত সমাজে ব্যবহৃত ভাষার প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র পর্দা ধরা পড়ে মাইকেলের সংলাপ রচনায়। অনায়াসে তিনি গেঁথে নেন বাংলা ইংরেজির মিশ্রণ, ইংরেজির সঙ্গে হিন্দির মিশ্রণ, বাংলা সঙ্গে ফারসির মিশ্রণ- আর এদের মধ্যে দিয়ে সূচিত হয় আমাদের বাস্তব সামাজিক পরিচয়গুলি। সবকিছু নিয়ে ভাষার যে সামাজিক চরিত্র তা পরিস্ফুট হয়ে ওঠে এই দু’টি জীবন্ত নাটকে। বুদ্ধদেব বসু কথিত ‘আজকের দিনের পাঠক’ নাট্যকার কবি শিশিরকুমার দাশের এই অভিমত। ‘মাইকেলি’ ভাষার মৃত্যু ঘোষণা সর্বত্রই হয়তো সত্য নয়, ভাষা প্রকরণের যে ঐতিহ্য সূচিত হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে তা আজও আমাদের ভাষা প্রকরণের ভিত্তিতে কোনো না কোনোভাবে ক্রিয়াশীল।

‘মেঘনাদবধ’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথ যেমন যথার্থই দেখেছিলেন, শাশ্বত বিশ্বাস ও সংস্কারে মাইকেলের সৃষ্টি করা ‘অপূর্ব পরিবর্তন’ এবং এই পরিবেশের ভিতরে ‘বিদ্রোহ’। এই বিশেষ পর্যবেক্ষণে রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন ‘নাস্তিক শক্তির স্পর্ধা’ (সাহিত্যসৃষ্টি) এবং মহাকাব্যের শেষে এই স্পর্ধাকেই বিদায়কালে কাব্যলক্ষ্মী নিজের অশ্রুসিক্ত মালাখানি তাহারই গলায় পরাইয়া দিল’ (সাহিত্যসৃষ্টি)। বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথের এই স্পর্ধার গলায় কাব্যলক্ষ্মীর মালা দেখতে অপ্রস্তুত, তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের এ-কথাও গ্রাহ্য নয় যে নাস্তিক শক্তির স্পর্ধাকেই কাব্যলক্ষ্মীর বিদায়কালে মালা পরিয়ে দিলেন।’ কেননা বুদ্ধদেব কাব্যরস এবং কাব্যের মূল ভরকেন্দ্রের আবেগ, মেঘনাদের ট্র্যাজেডি দেখতে রাজি নন, বরং নাস্তিক্য ও স্পর্ধাকে উড়িয়ে তিনি দেখাতে চান মেঘনাদবধ কাব্যে শেষ পর্যন্ত রাবণ বা মেঘনাদের জীবনের কোনো করুণ গাথা, সহানুভূতি নয়, ‘কারণ লক্ষ্মণ যখন মরেও বাঁচলো, তখনই জানলুম যে রাবণের চিতা জ্বলতে আর দেরি নেই, কিন্তু সেই অনির্বাণ আগুনও আমাদের মনকে ছুঁতে পারলো না, কেননা ততক্ষণে দেবদেবীদের কথাবার্তা শুনে আমরা বুঝে নিয়েছি যে রাম ভালোমানুষ আর রাবণটা বদমাস।’ এবং বুদ্ধদেব বসু তার এই বিশ্বাস ও সংস্কার দিয়ে নাস্তিক শক্তির গলায় রবীন্দ্রনাথের উপঢৌকন অগ্রাহ্য করলেন।

সঞ্জয় বলেন, বুঝতেই পারছ জ্যোতি, কোন প্রেক্ষাপটে নব্যতরুণ রবি লিখেছিলেন ওই ‘কাঁচা’ সমালোচনা। এই পাঠে দেখো তোমাকেও দায়বদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে, আমিই বা কেন বুদ্ধকে নয় রবিকে দিয়েই চাচ্ছি একটি অমর কাব্য নির্মাণ করিয়ে নিতে! জ্যোতি বলেন, পণ্ডিতবর সঞ্জয়, শুধু ব্যাস-বাল্মীকি নয়, এমনকি মাইকেলও নয়, বাংলায় তো কৃত্তিবাসও জন্ম নিয়েছেন, তাঁর রামায়ণ বাঙালি পড়েছে রাম-লক্ষ্মণ-সীতার দুঃখে তারা বহুকাল ধ’রে কাঁদছে। আপনি নিশ্চয় জানেন বাল্মীকির তুলনায় কৃত্তিবাস বাংলায় বেশি জনপ্রিয়।

সঞ্জয় জ্যোতিকে প্রায় থামিয়ে বলেন, কৃত্তির কৃতির কথা ভালো করেই জানি। জনপ্রিয় কাব্য সবসময় গুণধর নয়, বহুকাল আগেই কৃত্তিবাসকে

দিয়ে একটি সঞ্জয় চরিত বা পুরাণ লিখিয়ে নিতে পারতাম, তা না ক’রে রবি পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হলো। কৃত্তিবাস বাঙালি, সঞ্জয় ভারতের। কৃত্তিবাস বাংলায় প্রিয় হয়েছে কাব্যগুণে নয়, আত্মীয়তার কারণে। তোমাকে বলি, কৃত্তিবাসের রামায়ণ ঠিক বাল্মীকির অনুবাদ নয়, রামায়ণের বাংলা রূপকার। এই কাব্যে রাম লক্ষ্মণ সীতাসহ রাক্ষস দানব দেব দেবতা সবাই বাঙালি। এর ভিতরে বর্ণিত পরিবেশ সমাজ সবই বাঙালির। কিন্তু এর আত্মার সঙ্গে বাল্মীকির রামায়ণের আত্মার পার্থক্য কবি মাত্রই বোঝে। কৃত্তিবাস অপেক্ষাকৃত নতুন, তাঁর নৈতিকতা কালের মোড়কে, আদি কবি উপলব্ধির মতো নয়। এজন্য বাল্মীকিতে বর্ণিত রাম, লক্ষ্মণের উত্তেজনা, আদর্শবাদিতা নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা, সীতার প্রতি রামের আচরণ কৃত্তিবাসে এ-সবের বদল ঘটে নৈতিকতার মাপকাঠিতে। যেমন মনে কর, বাল্মীকিতে আছে রামের বনবাসের খবর পেয়ে উত্তেজিত লক্ষ্মণ বলছে, ‘ওই কৈকেয়ী-ভজা বুড়ো বাপকে আমি বধ করবো।’ অথবা লঙ্কাকাণ্ডের যুদ্ধের পর সীতাকে যখন রাম পরিত্যাগ করে তখন সীতা রামকে বলে, ‘প্রাকৃতজন’ বা ইতরজন। কৃত্তিবাসের নতুন মন, কিন্তু মহাকাব্য সৃষ্টির মন নয়। এসবকে ক্ষুদ্রতা হিসেবে দেখেন এবং বর্জন করেন। আদি কবির কাছে মহাকাব্যের বাস্তবতায় সম্পূর্ণতা তৈরি হবে, হবে নির্মম নিরাসক্ত। মহাকাব্যে করুণ রসের মত্ততা বা শুধু বীরত্বের বিশেষ আয়োজন ঘটবে না, এর কণ্ঠস্বর কখনো কাঁপে না, বড়ো ঘটনা আর সামান্য ঘটনার ভেদ নেই, সবই সমান। রবির অনেক পরে এক কবির জন্ম ঘটে, নাম বুদ্ধদেব বসু, ওর কথা আগেই বলেছি, তুমি তাকে দেখোনি, কারণ তাঁর এখনো জন্ম হয়নি, তাঁর আলোচনায় লেখা আছে, ‘মহাকাব্যের বাস্তবতা এমনই নির্ভীক যে সংগতি রক্ষার দায় পর্যন্ত তার নেই; তুচ্ছ আর প্রধানকে সে পাশাপাশি বসায়, কিছু লুকায় না, কিছু ঘুরিয়ে বলে না, বড়ো বড়ো ব্যাপার দু-তিন কথায় সারে... মানব স্বভাবের কোনো মন্দেই তার চোখের পাতা যেমন পড়ে না, তেমনি ভালোর অসম্ভব আদর্শকেও নিতান্ত সহজে চালিয়ে দেয়। সেই জন্য মহাভারতে দেখতে পাই চিরকালের সমস্ত মানবজীবনের প্রতিবিম্বন; তাতে এমন মন্দের সন্ধান পাই যাতে এই ঘোর কলিতে আমরা আঁতকে উঠি, আবার ভালোও অপরিসীম, অনির্বাচনীয় রূপে ভালো...। শুধু পৃষ্ঠাসংখ্যায় নয়, জীবনদর্শনের ব্যাপ্তিতে রামায়ণ অনেকটা ছোটো, কিন্তু কাব্য হিসেবে এবং কাহিনী বিশেষে তাতে ঐক্য বেশি এবং আমরা যাকে কবিত্ব বলি তাতে রামায়ণ সম্ভবত সমৃদ্ধতর’ (রামায়ণ, সাহিত্যচর্চা)।

জ্যোতির মনে হলো নিচু আকাশ থেকে যে নক্ষত্রটা ছুটে জায়গা বদল করেছিল, সে আবার তার জায়গায় ফিরে আসে, তার আলোর সূক্ষ্ম ঝলক তাঁর চোখে বিঁধেছিল। তাই চোখের ওপর হাত ডলে জ্যোতি বলেন, তাহলে পণ্ডিতবর বুদ্ধদেবও হতে পারেন আপনার জীবনের নবরূপকার! সঞ্জয় দ্রুত বলেন, তা যে পারে না তার উদাহরণ আমরা আগেই পেয়েছি। মহাকাব্য দু’টি কাব্য ও চিরকালের ইতিহাস ছাড়াও বুদ্ধদেবের কাছে ইতিহাস ও বিশ্বাসের আকর গ্রন্থ হিসেবে মূল্যবান। সে-কারণে মধুকবির নতুন কাব্যের রস ও বৈচিত্র্য আস্বাদ না ক’রে বিরক্ত হলেন। কিন্তু রবি মহাকাব্যের মর্যাদায় মেঘনাদবধকে পাঠ করলেন পরিণত বয়সে। আবার দেখ রামায়ণ প্রবন্ধেই রবি কাব্য বিচারের আদর্শ সম্পর্কে সতর্ক ক’রে দিয়েছেন, বলছেন, ‘রামায়ণ-মহাভারতের যে সমালোচনা তা অন্য কাব্য সমালোচনার আদর্শ হইতে স্বতন্ত্র। রামের চরিত্র উচ্চ কি নীচ, লক্ষ্মণের চরিত্র আমার ভালো লাগে কি মন্দ লাগে এই আলোচনাই যথেষ্ট নহে’ (রামায়ণ, রর, ৩য়)। প্রবন্ধের অন্য স্তবকে বলছেন, মহাভারত ও রামায়ণ সম্পর্কে, ‘ইহার সরল অনুষ্টুপ ছন্দে ভারতবর্ষের সহস্য বৎসরের হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হইয়া আসিয়াছে’ (্ঐ)। কিন্তু বুদ্ধ হালনাগাদ আদর্শে কাব্যের শ্রেষ্ঠত্বের বিচার করছেন। শুধু এই নয়, মহাকাব্যের শক্তি রবির মধ্যেই দেখেছি, এমন ব্যাপ্তি ও কবিত্ব ভারতে আর দেখতে পাচ্ছি না। যা বলো ভাই, রবিকে দিয়ে সঞ্জয়পুরাণ লেখাতেই হবে। তোমরা এখনো রবির খবর জানো না, হয়তো ওর সম্ভাবনা আঁচ করতে পার, রবি মহাকাব্য মহাভারত থেকে কতো আখ্যান নিয়ে অসাধারণ ও স্বাধীন কাব্য রচেছেন, মহাকাব্যের কাহিনীর পুনরাবৃত্তি না ক’রে নিজের কবিত্ব ও চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে তাতে, কিন্তু তা মহাকাব্যের সমালোচনা নয়, বলতে পারো মহাকাব্যের রূপ, কাহিনী ও সত্যকেও আরও বিস্তৃত করেছেন। ও কোথাও বলেন না কোন্ মহাকাব্যটি অধিকতর ’সমৃদ্ধতর’, মহাকাব্য দু’টির ইতিহাসই এমন যে কাব্যদু’টি সৃষ্টি ও পরিবর্দ্ধিত হয়েছে বিভিন্ন কবির হাতে বিভিন্ন সময়ে।

জ্যোতি বলেন, তাহলে রবি কি তেমন প্রাচীন কবিদের একজন যার হাতে মহাকাব্য বর্ধিত পরিবর্তিত হবে বা হয়েছে! সঞ্জয় মাথার ওপর হাত ঘুরিয়ে ঋষিদের মতো লম্বা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেন, এমন ঠিক নয়। ঘটনা নিজের মতো প্রকাশ করার স্বাধীনতা নিয়েছে রবি, ফলে রবি প্রাচীন কবিদের দাসত্ব না ক’রে নিজের মতো রূপ তৈরি ক’রে নিয়েছেন, ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। যেভাবে ঘটেছে পুরাণে, যে সুর ছন্দে আন্দোলিত আদি কবিদের কাব্য, রবীন্দ্রনাথ সেই সুর ছন্দে নিজের স্বর ও স্বাক্ষর যুক্ত করেছেন, নিজের মতো ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করেছেন স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশে, সেই প্রকাশে কাব্য-আত্মা দলিত নয় বরং ব্যঞ্জনাময় এবং কালের উপযোগী ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। সবইতো কাব্য ও স্বপ্ন আকাক্সক্ষার ইতিহাস, যা সময়ের ঘটনা থেকে নয় কবির হৃদয়ে জন্ম নেয় স্বাধীনভাবে; যুক্তি সংগতি সম্ভব অসম্ভবের বিচার হবে কাব্যসত্যের আদলতে, সমালোচকের কাঠগড়ায় নয়। যেমন দেখ রবির লেখা ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্য নাটকটি মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা থেকে অনেকই অন্য রকম। রূপ-যৌবন ও নারীসত্তার প্রতি পুরুষের উপেক্ষা চিত্রাঙ্গদাকে পীড়িত করে, সব নারীকেই করবে হয়তো। বসন্ত ও মদন দেবের সহযোগিতায় ওই উপেক্ষার বদলে প্রেম ও সম্মান আদায় ক’রে ছাড়ে অর্জুনের। কিন্তু পুরুষের কাছে এই নারী সম্পূর্ণ নিবেদন করেও আত্মাভিমান ও আত্ম-স্বাতন্ত্র্যের বোধে তৃপ্ত হতে পারে না একান্ত নিজের কাছে। বসন্ত ও মদনের কাছ থেকে ধার নেয়া রূপ ও মদির যৌবন চিত্রাঙ্গদার নিজের দেহে বহন করলেও একান্ত অন্তর্গতভাবে আত্মার সঙ্গে দেহ সৌন্দর্যের সতীন সম্পর্ক অনুভব করে। আত্মসম্মানবোধ সংবেদী চিত্রাঙ্গদা গভীরে দীর্ণ হয়, নরলোকের অশান্তি দেহসুখ ছাপিয়ে জেগে ওঠে অন্তরে। ধার করা বাহ্যিক রূপের মোহ দিয়ে ভোলানোয় অস্বস্তি রবির সৃষ্টি করা চিত্রাঙ্গদার, আদি কবির নয়। চিত্রাঙ্গদার কণ্ঠে তার সেই অন্তরগূঢ় বোধের কথা শোনো,

আজ প্রাতে উঠে, নৈরাশ্যধিক্কার বেগে

অন্তরে অন্তরে টুটিছে হৃদয়। মনে

পড়িতেছে একে একে রজনীর কথা।

বিদ্যুৎবেদনাসহ হতেছে চেতনা।

অন্তরে বাহিরে মোর হয়েছে সতিন

আর তাহা নারিব ভুলিতে। সপতœীরে

স্বহস্তে সাজায়ে সযতনে, প্রতিদিন

পাঠাইতে হবে, আমার আকাক্সক্ষাতীর্থ

বাসরশয্যায়; অবিশ্রাম সঙ্গে রহি

প্রতিক্ষণ দেখিতে হইবে চক্ষু মেলি

তাহার আদর। ওগো, দেহের সোহাগে

অন্তর জ্বলিবে হিংসানলে, হেন শাপ

নরলোকে কে পেয়েছে আর।

তোমাকে একটা কথা বলে রাখি, রবির বিশাল কর্মরাজির মধ্যে আরও বহু বহু নারী চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে, রবির বিশেষ ক’রে মেয়েদের নিয়ে নিজের ভাবনাও লিখবেন কিন্তু কালে তা গৃহীত নাও হতে পারে, ওর নারী চিন্তার পুরাতনী ভাব লোকে সমালোচনা করবে যদিও এর সত্য ও বাস্তব রূপ উপেক্ষা করা যাবে না। অভিভূত জ্যোতি ঠাকুরের দিকে চেয়ে সঞ্জয় বলেন, চিত্রাঙ্গদা অসাধারণ কাব্য, গীতিধর্মী কাব্য নাটক। জ্যোতি বলেন, অদৃষ্ট দ্রষ্টা, রবি তার জীবনকালে যা যা রচনা করেছেন তার সব পাঠ শেষ করেছেন! শোনো জ্যোতি, দিব্যদৃষ্টিসম্পন্নের জন্য এ কোনো বিস্ময়কর কাজ নয়। তবে আমি তোমাকে শুধু বলছি পুরাণের আখ্যান ব্যবহার ক’রে নিজের স্বাধীন কাব্যবোধ থেকে কী সব রসসৃষ্টি করেছেন তার কিছু নমুনা। আদি কবিদের চিন্তা ও কাহিনীকে রবি কাব্য নির্মাণের প্রতিভায় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেখেই মূলত আমি ঠিক ক’রে নিয়েছি রবিই সেই কবি এই সঞ্জয়ের জীবনকে যে ব্যাসদেবের বর থেকে আরও বড়ো বরে নায়ক ক’রে তুলতে পারবেন। তুমি দেখো এই চিত্রাঙ্গদা নাট্য ভাবনাটি তাঁর মনে কিভাবে তৈরি হলো! প্রথমে সে জীবনের সত্য, বাস্তবতার গভীর একটি বোধ দ্বারা আলোড়িত হলো, তারপর সেই আলোড়নকে কাব্যে প্রকাশ করার ভাবনায় চিত্রাঙ্গদা উপাখ্যানটি তার মাথায় আসে। মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা উপাখ্যানটি তেমন বড়ো কিছু নয়। সংস্কৃত তেরটি শ্লোকে যে আখ্যান বর্ণিত হয়েছে তাতে আত্মসচেতন, বোধোজ্জ্বল কোনো রমণীর গল্প সেখানে নেই। মহাভারতের আদি পর্বের অর্জুন বনবাস পর্বাধ্যায়-এ চিত্রাঙ্গদার খবর আমরা জানি। যাই হোক, এখন রবির কাছ থেকেই শোনো ‘চিত্রাঙ্গদা’ সূচনার কথা-

“অনেক বছর আগে রেলগাড়িতে যাচ্ছিলাম শান্তি নিকেতন থেকে কলকাতার দিকে। তখন বোধ করি চৈত্র মাস হবে। রেল লাইনের ধারে ধারে আগাছার জঙ্গল। হলদে বেগনি সাদা রঙের ফুল ফুটেছে অজস্র। দেখতে দেখতে এই ভাবনা এল মনে যে আর কিছুকাল পরেই রৌদ্র হবে প্রখর, ফুলগুলি তাদের রঙের মরীচিকা নিয়ে যাবে মিলিয়ে- তখন পল্লীপ্রাঙ্গণে আম ধরবে গাছের ডালে ডালে, তরুপ্রকৃতি তার অন্তরের নিগূঢ় রস-সঞ্চয়ের স্থায়ী পরিচয় দেবে আপন অপ্রগলভ ফল সম্ভারে। সেই সঙ্গে কেন জানি হঠাৎ আমার মনে হলো সুন্দরী যুবতী যদি অনুভব করে যে সে তার যৌবনের মায়া দিয়ে প্রেমিকের হৃদয় ভুলিয়েছে তাহলে সে তার সুরূপকেই আপন সৌভাগ্যের মুখ্য অংশে ভাগ বসাবার অভিযোগে সতিন ব’লে ধিক্কার দিতে পারে। এ যে তার বাইরের জিনিস, এ যেন ঋতুরাজ বসন্তের কাছ থেকে পাওয়া বর, ক্ষণিক মোহ বিস্তারের দ্বারা জৈব উদ্দেশ্য সিদ্ধ করবার জন্যে। যদি তার অন্তরের মধ্যে যথার্থ চরিত্রশক্তি থাকে তবে সেই মোহযুক্ত শক্তির দানই তার প্রেমের পক্ষে মহৎলাভ, যুগল জীবনের জয়যাত্রার সহায়। সেই দানে আত্মার স্থায়ী পরিচয়, এর পরিণামে ক্লান্তি নেই, অবসাদ নেই, অভ্যাসের ধূলিপ্রলেপে উজ্জ্বলতার মালিন্য নেই। এই চারিত্রশক্তি জীবনের দ্রুব সম্বল, নির্মল প্রকৃতির আশু প্রয়োজনের প্রতি তার নির্ভর নয়। অর্থাৎ এর মূল্য মানবিক, এ নয় প্রাকৃতিক।”

“এ ভাবটাকে নাট্য আকারে প্রকাশ-ইচ্ছা তখনই মনে এল, সেই সঙ্গে মনে পড়ল মহাভারতের চিত্রাঙ্গদার কাহিনী। এই কাহিনীটি কিছু রূপান্তর নিয়ে অনেকদিন আমার মনের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল। অবশেষে লেখবার আনন্দিত অবকাশ পাওয়া গেল উড়িষ্যায় পাণ্ডুরা বলে এক নিভৃত পল্লীতে গিয়ে” (রবীন্দ্র-রচনাবলী, ২য় খণ্ড, “চিত্রাঙ্গদার সূচনা”)। জীবন-সায়াহ্নে রবি ‘চিত্রাঙ্গদার সূচনা’র এই খবর জানিয়ে গেছেন। কাব্য, নাট্য ও সঙ্গীতগুণ রচনাটি মুগ্ধ করে। জ্যোতি এই সূচনার কথা জানত না, কথাও নয়। পরবর্তী প্রজন্মের একটি পাঠে সব প্রসঙ্গই উঠে এসেছে, চিত্রাঙ্গদা আলোচনা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মেয়েদের নিয়ে ভাবনা চিন্তার খোঁজখবর, ও রবীন্দ্রনাথের চারপাশের পরিবেশের কিছু খবর এতে রয়েছে। ক্রমশ...