দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখের অধিক নারীর সংখ্যা বেশি

‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী গত এক দশকে দুই কোটির বেশি মানুষ বেড়ে দেশের জনসংখ্যা বর্তমানে ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন। এই সময়ে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি হয়েছে। শুমারিতে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যুক্ত হয়েছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে। কমেছে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। এছাড়া তরুণ জনসংখ্যার হার বেড়েছে। সাক্ষরতায় ব্যাপক সাফল্য এসেছে। তবে বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার কমলেও জনসংখ্যা ঘনত্ব বেড়েছে।

গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে (বিআইসিসি) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রথম ডিজিটাল ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এমপি। এছাড়া জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক শামসুল আলমও উপস্থিত ছিলেন।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘দেশের জনসংখ্যা নিয়ে অনেকে নানা কথা বলেন। কেউ বলেন ১৮ কোটি, কেউ বলেন ২০ কোটি। তবে এসব কথা অনুমান-নির্ভর। এখন থেকে বলবো আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ। এটাই আসল তথ্য।’ জনশুমারির বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশেই জনশুমারি হয়। কাজটি খুবই জটিল ও সুক্ষভাবে করতে হয়। ১০ বছর পর জনশুমারি করে থাকি। জনশুমারি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নানা গবেষণা ও পরিকল্পনা গ্রহণে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

সারাদেশে জনশুমারি ও গৃহগণনা কার্যক্রম গত ১৫ জুন একযোগে শুরু হয়। গত ২১ জুন জনশুমারি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলায় বন্যা শুরু হওয়ায় এসব জেলায় শুমারি কার্যক্রম ২৮ জুন পর্যন্ত চলে। অনুষ্ঠানে জনশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকল্প পরিচালক দিলদার হোসেন।

প্রাথমিক তথ্যে দেখা গেছে, দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন, যা ১০ বছর আগে অর্থাৎ ২০১১ সালে ছিল ১৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৩ হাজার ৬৯৭ জন। অর্থাৎ এই ১০ বছরে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২ কোটি ১১ লাখ ১৪ হাজার ৯১৯ জন।

এর আগে ২০০১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৪৩ লাখ ৫৫ হাজার ২৬৩ জন। ১৯৯১ সালের জনশুমারিতে ছিল ১০ কোটি ৬৩ লাখ ১৪ হাজার ৯৯২ জন। ১৯৮১ সালে ছিল ৮ কোটি ৭১ লাখ ১৯ হাজার ৯৬৫ জন। আর প্রথম আদমশুমারিতে ১৯৭৪ সালে দেশের জনসংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল ৭ কোটি ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ৭১ জন।

পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি

বাংলাদেশে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা অধিক উঠে এসেছে এবারের জনশুমারিতে। ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে পুরুষের সংখ্যা ৮ কোটি ১৭ লাখ ১২ হাজার ৮২৪ জন ও নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার ২০৬ জন; অর্থাৎ দেশে এখন পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ বেশি।

এর আগে ২০১১ সালের জনশুমারিতে পুরুষের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ২১ লাখ ৯ হাজার ৭৯৬ জন ও নারী ছিলেন ৭ কোটি ১৯ লাখ ৩৩ হাজার ৯০১ জন; অর্থাৎ তখন নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা বেশি ছিল।

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সংখ্যা ১২ হাজার ৬২৯ জন

আগের জনশুমারিগুলোতে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সংখ্যা আলাদাভাবে গণনা করা না হলেও এবারের শুমারিতে তাদের যুক্ত করা হয়েছে। শুমারি অনুযায়ী এখন হিজড়া আছেন ১২ হাজার ৬২৯ জন। এলাকাভিত্তিক বিবেচনায় ৪ হাজার ৫৭৭ জনই বাস করেন ঢাকা বিভাগে। সবচেয়ে কম ৮৪০ জনের বাস সিলেটে। অন্য বিভাগের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ৫৬৩ জন, চট্টগ্রামে ২ হাজার ২৬, খুলনায় এক হাজার ১৪৮, ময়মনসিংহে ৯৭২, রাজশাহীতে এক হাজার ৫৭৪ আর রংপুরে ৯২৯ জন বসবাস করেন।

তরুণ জনসংখ্যা বেড়ে ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ

নতুন জনশুমারির প্রতিবেদন বলছে, মোট জনসংখ্যার ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী জনসংখ্যার হার সর্বাধিক এবং ৯৫ ও তদূর্ধ্ব বয়সী জনসংখ্যার হার সর্বনি¤œ। ২০১১ সালে তরুণ জনসংখ্যা (১৫-২৪) ছিল ১৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা ২০২২ সালে ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ হয়েছে।

জাতীয় পর্যায়ে প্রতি এক হাজার জন সন্তান জন্মদানে সক্ষম ১৪-১৫ বয়সী নারীর ০ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৩৩২ জন। পল্লী এলাকায় এই সংখ্যা ৩৫১ জন এবং শহর এলাকায় এই সংখ্যা ২৯৫ জন। এছাড়া বিভাগভিত্তিক অনুযায়ী ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৮৩ যা সর্বোচ্চ এবং ঢাকা বিভাগে এ অনুপাত ২৯৮ যা সর্বনি¤œ।

বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার কমেছে

চলতি বছরের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী দেশে জনসংখ্যার বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার কমছে। শুমারি অনুযায়ী এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক দশমিক ২২ শতাংশ। এটি ২০১১ সালে ছিল এক দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং ২০০১ সালে ছিল এক দশমিক ৫৮ শতাংশ।

জনসংখ্যা ঘনত্ব বেড়েছে

দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এবারের শুমারি অনুযায়ী দেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে এখন জনসংখ্যা ঘনত্বের হার এক হাজার ১১৯ জন, যা এক দশক আগে ছিল ৯৭৬ জন। এর আগে ২০০১ সালে ৮৪৩ জন, ১৯৯১ সালে ৭২০ জন, ১৯৮১ সালে ৫৯০ জন এবং ১৯৭৪ সালে প্রতি কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল ৪৮৪ জন।

কমেছে খানার আকার

চলতি বছরের শুমারি ও গৃহগণনার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট খানার সংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ৫১টি, যা গড়ে খানার আকার ৪ জন। এক দশক আগের শুমারির তথ্য অনুযায়ী গড়ে খানার আকার ছিল সাড়ে ৪ জন।

গ্রামাঞ্চলে মানুষের বসবাস আগের মতো

আগের জনশুমারির মতো এবারের জনশুমারিতেও দেখা গেছে, দেশের বেশিরভাগ লোক এখনও গ্রামে বাস করে। জনশুমারি অনুযায়ী গ্রামের জনসংখ্য এবার বেড়েছে প্রায় ৩০ লাখ। অন্যদিকে শহরের জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় দুই কোটি। বর্তমানে বস্তিবাসীর সংখ্যা ১৮ লাখ ৪৮৬ জন বলে উঠে এসেছে নতুন শুমারিতে।

জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে

নতুন শুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ঢাকায় ২ হাজার ১৫৬ জন। আর সবচেয়ে কম বরিশাল বিভাগে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৬৮৮ জন বসবাস করে। দ্বিতীয় অবস্থানে ময়মনসিংহ বিভাগ, এ বিভাগে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস এক হাজার ১৪৬ জন।

তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী, বিভাগটিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব এক হাজার ১২১ জন। এর পরের অবস্থানে রয়েছে রংপুর, বিভাগটিতে ঘনত্ব এক হাজার ৮৮ জন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৭৯ জন, সিলেট বিভাগে ৮৭৩ জন ও খুলনায় ৭৮২ জন।

মুসলিম বেড়েছে, কমেছে অমুসলিম

দেশে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমেছে। জনশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এখন মুসলমান ৯১.০৪ শতাংশ, যা ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মুসলমানের সংখ্যা ছিল মোট জনগোষ্ঠীর ৯০.৩৯ শতাংশ।

বর্তমান শুমারিতে হিন্দু জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ৭.৯৫ শতাংশ, যা ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ছিল ৮.৫৪ শতাংশ। খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ০.৩০ শতাংশ; যা ২০১১ সালে ছিল ০.৩১ শতাংশ। বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ০.৬১ শতাংশ, যা ২০১১ সালের ছিল ০.৬২ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ০.১২ শতাংশ; যা ২০১১ সালে ছিল ০.১৪ শতাংশ।

দেশে ভাসমান জনসংখ্যা ২২ হাজার

নতুন শুমারি অনুযায়ী বর্তমানে দেশে মোট ভাসমান জনসংখ্যা ২২ হাজার ১১৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৬ হাজার ৭৮৪ জন এবং নারীর সংখ্যা ৫ হাজার ৩৩৫ জন। ভাসমান জনসংখ্যা ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৪৩৯ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে সর্বনি¤œ ৬৯২ জন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৫ হাজার ২১৬ জন, বরিশালে ২ হাজার ১৭৭ জন, খুলনায় এক হাজার ৩২৫ জন, রাজশাহীতে এক হাজার ৩০৩ জন, রংপুরে এক হাজার ৭৪ জন এবং সিলেট বিভাগে ৮৯৩ জন ভাসমান লোকের বসবাস।

সাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬ শতাংশ

নতুন শুমারি অনুযায়ী দেশের সাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষের সাক্ষরতার হার ৭৬.৫৬ শতাংশ এবং নারীদের সাক্ষরতার হার ৭২.৮২ শতাংশ। জনশুমারিতে যুক্ত হওয়া হিজড়া জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৫৩.৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিগত এক দশকে সাক্ষরতার হারে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৫১.৭৭ শতাংশ। আর পুরুষের সাক্ষরতার হার ছিল ৫৪.১১ শতাংশ এবং নারীদের সাক্ষরতার হার ছিল ৪৯.৪৪ শতাংশ।

নতুন শুমারি অনুযায়ী পল্লী এলাকার চেয়ে শহর এলাকায় সাক্ষরতার হার বেশি। পল্লী এলাকার মোট সাক্ষরতার হার ৭১.৫৬ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষের সাক্ষরতার হার ৭৩.২৯ শতাংশ, নারীদের সাক্ষরতার হার ৬৯.৯৩ শতাংশ এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৫১.৯৭ শতাংশ। অন্যদিকে শহর এলাকায় মোট সাক্ষরতার হার ৮১.২৮ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষের সাক্ষরতার হার ৮৩.১৮ শতাংশ, নারীদের ৭৯.৩০ শতাংশ এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৫৫.২৮ শতাংশ।

মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ বিবাহিত

এবারের জনশুমারি অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার ৬৫ দশমিক ২৬ শতাংশ বিবাহিত। ৬৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ বিবাহিত নিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রাজশাহী। এছাড়া ১০ থেকে তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ২৮ শতাংশ অবিবাহিত। বর্তমানে ৯৮ জন পুরুষের বিপরীতে নারীর সংখ্যা ১০০ জন রয়েছে। অন্যদিকে বিবাহ বিচ্ছেদ শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ। বিভাগভিত্তিক বিবেচনায় শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশ নিয়ে বিচ্ছেদে এগিয়ে আছে খুলনা।

প্রাপ্তবয়স্কদের ৭২ শতাংশ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন

এবারের জনশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যার পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে মোবাইল ব্যবহারকারীর হার ৫৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৩০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। তবে ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী অর্থাৎ, প্রাপ্তবয়স্কদের ৭২ দশমিক ৩১ শতাংশই মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন ৮৬ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

বৃহস্পতিবার, ২৮ জুলাই ২০২২ , ১৩ শ্রাবণ ১৪২৯ ২৯ জিলহজ ১৪৪৩

দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখের অধিক নারীর সংখ্যা বেশি

নিজস্ব বার্তা পরিবেশকনিজস্ব বার্তা পরিবেশক

image

‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী গত এক দশকে দুই কোটির বেশি মানুষ বেড়ে দেশের জনসংখ্যা বর্তমানে ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন। এই সময়ে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি হয়েছে। শুমারিতে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যুক্ত হয়েছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে। কমেছে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। এছাড়া তরুণ জনসংখ্যার হার বেড়েছে। সাক্ষরতায় ব্যাপক সাফল্য এসেছে। তবে বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার কমলেও জনসংখ্যা ঘনত্ব বেড়েছে।

গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে (বিআইসিসি) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রথম ডিজিটাল ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এমপি। এছাড়া জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক শামসুল আলমও উপস্থিত ছিলেন।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘দেশের জনসংখ্যা নিয়ে অনেকে নানা কথা বলেন। কেউ বলেন ১৮ কোটি, কেউ বলেন ২০ কোটি। তবে এসব কথা অনুমান-নির্ভর। এখন থেকে বলবো আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ। এটাই আসল তথ্য।’ জনশুমারির বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশেই জনশুমারি হয়। কাজটি খুবই জটিল ও সুক্ষভাবে করতে হয়। ১০ বছর পর জনশুমারি করে থাকি। জনশুমারি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নানা গবেষণা ও পরিকল্পনা গ্রহণে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

সারাদেশে জনশুমারি ও গৃহগণনা কার্যক্রম গত ১৫ জুন একযোগে শুরু হয়। গত ২১ জুন জনশুমারি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলায় বন্যা শুরু হওয়ায় এসব জেলায় শুমারি কার্যক্রম ২৮ জুন পর্যন্ত চলে। অনুষ্ঠানে জনশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকল্প পরিচালক দিলদার হোসেন।

প্রাথমিক তথ্যে দেখা গেছে, দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন, যা ১০ বছর আগে অর্থাৎ ২০১১ সালে ছিল ১৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৩ হাজার ৬৯৭ জন। অর্থাৎ এই ১০ বছরে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২ কোটি ১১ লাখ ১৪ হাজার ৯১৯ জন।

এর আগে ২০০১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৪৩ লাখ ৫৫ হাজার ২৬৩ জন। ১৯৯১ সালের জনশুমারিতে ছিল ১০ কোটি ৬৩ লাখ ১৪ হাজার ৯৯২ জন। ১৯৮১ সালে ছিল ৮ কোটি ৭১ লাখ ১৯ হাজার ৯৬৫ জন। আর প্রথম আদমশুমারিতে ১৯৭৪ সালে দেশের জনসংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল ৭ কোটি ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ৭১ জন।

পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি

বাংলাদেশে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা অধিক উঠে এসেছে এবারের জনশুমারিতে। ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে পুরুষের সংখ্যা ৮ কোটি ১৭ লাখ ১২ হাজার ৮২৪ জন ও নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার ২০৬ জন; অর্থাৎ দেশে এখন পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ বেশি।

এর আগে ২০১১ সালের জনশুমারিতে পুরুষের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ২১ লাখ ৯ হাজার ৭৯৬ জন ও নারী ছিলেন ৭ কোটি ১৯ লাখ ৩৩ হাজার ৯০১ জন; অর্থাৎ তখন নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা বেশি ছিল।

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সংখ্যা ১২ হাজার ৬২৯ জন

আগের জনশুমারিগুলোতে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সংখ্যা আলাদাভাবে গণনা করা না হলেও এবারের শুমারিতে তাদের যুক্ত করা হয়েছে। শুমারি অনুযায়ী এখন হিজড়া আছেন ১২ হাজার ৬২৯ জন। এলাকাভিত্তিক বিবেচনায় ৪ হাজার ৫৭৭ জনই বাস করেন ঢাকা বিভাগে। সবচেয়ে কম ৮৪০ জনের বাস সিলেটে। অন্য বিভাগের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ৫৬৩ জন, চট্টগ্রামে ২ হাজার ২৬, খুলনায় এক হাজার ১৪৮, ময়মনসিংহে ৯৭২, রাজশাহীতে এক হাজার ৫৭৪ আর রংপুরে ৯২৯ জন বসবাস করেন।

তরুণ জনসংখ্যা বেড়ে ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ

নতুন জনশুমারির প্রতিবেদন বলছে, মোট জনসংখ্যার ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী জনসংখ্যার হার সর্বাধিক এবং ৯৫ ও তদূর্ধ্ব বয়সী জনসংখ্যার হার সর্বনি¤œ। ২০১১ সালে তরুণ জনসংখ্যা (১৫-২৪) ছিল ১৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা ২০২২ সালে ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ হয়েছে।

জাতীয় পর্যায়ে প্রতি এক হাজার জন সন্তান জন্মদানে সক্ষম ১৪-১৫ বয়সী নারীর ০ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৩৩২ জন। পল্লী এলাকায় এই সংখ্যা ৩৫১ জন এবং শহর এলাকায় এই সংখ্যা ২৯৫ জন। এছাড়া বিভাগভিত্তিক অনুযায়ী ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৮৩ যা সর্বোচ্চ এবং ঢাকা বিভাগে এ অনুপাত ২৯৮ যা সর্বনি¤œ।

বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার কমেছে

চলতি বছরের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী দেশে জনসংখ্যার বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার কমছে। শুমারি অনুযায়ী এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক দশমিক ২২ শতাংশ। এটি ২০১১ সালে ছিল এক দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং ২০০১ সালে ছিল এক দশমিক ৫৮ শতাংশ।

জনসংখ্যা ঘনত্ব বেড়েছে

দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এবারের শুমারি অনুযায়ী দেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে এখন জনসংখ্যা ঘনত্বের হার এক হাজার ১১৯ জন, যা এক দশক আগে ছিল ৯৭৬ জন। এর আগে ২০০১ সালে ৮৪৩ জন, ১৯৯১ সালে ৭২০ জন, ১৯৮১ সালে ৫৯০ জন এবং ১৯৭৪ সালে প্রতি কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল ৪৮৪ জন।

কমেছে খানার আকার

চলতি বছরের শুমারি ও গৃহগণনার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট খানার সংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ৫১টি, যা গড়ে খানার আকার ৪ জন। এক দশক আগের শুমারির তথ্য অনুযায়ী গড়ে খানার আকার ছিল সাড়ে ৪ জন।

গ্রামাঞ্চলে মানুষের বসবাস আগের মতো

আগের জনশুমারির মতো এবারের জনশুমারিতেও দেখা গেছে, দেশের বেশিরভাগ লোক এখনও গ্রামে বাস করে। জনশুমারি অনুযায়ী গ্রামের জনসংখ্য এবার বেড়েছে প্রায় ৩০ লাখ। অন্যদিকে শহরের জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় দুই কোটি। বর্তমানে বস্তিবাসীর সংখ্যা ১৮ লাখ ৪৮৬ জন বলে উঠে এসেছে নতুন শুমারিতে।

জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে

নতুন শুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ঢাকায় ২ হাজার ১৫৬ জন। আর সবচেয়ে কম বরিশাল বিভাগে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৬৮৮ জন বসবাস করে। দ্বিতীয় অবস্থানে ময়মনসিংহ বিভাগ, এ বিভাগে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস এক হাজার ১৪৬ জন।

তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী, বিভাগটিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব এক হাজার ১২১ জন। এর পরের অবস্থানে রয়েছে রংপুর, বিভাগটিতে ঘনত্ব এক হাজার ৮৮ জন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৭৯ জন, সিলেট বিভাগে ৮৭৩ জন ও খুলনায় ৭৮২ জন।

মুসলিম বেড়েছে, কমেছে অমুসলিম

দেশে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমেছে। জনশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এখন মুসলমান ৯১.০৪ শতাংশ, যা ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মুসলমানের সংখ্যা ছিল মোট জনগোষ্ঠীর ৯০.৩৯ শতাংশ।

বর্তমান শুমারিতে হিন্দু জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ৭.৯৫ শতাংশ, যা ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ছিল ৮.৫৪ শতাংশ। খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ০.৩০ শতাংশ; যা ২০১১ সালে ছিল ০.৩১ শতাংশ। বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ০.৬১ শতাংশ, যা ২০১১ সালের ছিল ০.৬২ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ০.১২ শতাংশ; যা ২০১১ সালে ছিল ০.১৪ শতাংশ।

দেশে ভাসমান জনসংখ্যা ২২ হাজার

নতুন শুমারি অনুযায়ী বর্তমানে দেশে মোট ভাসমান জনসংখ্যা ২২ হাজার ১১৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৬ হাজার ৭৮৪ জন এবং নারীর সংখ্যা ৫ হাজার ৩৩৫ জন। ভাসমান জনসংখ্যা ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৪৩৯ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে সর্বনি¤œ ৬৯২ জন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৫ হাজার ২১৬ জন, বরিশালে ২ হাজার ১৭৭ জন, খুলনায় এক হাজার ৩২৫ জন, রাজশাহীতে এক হাজার ৩০৩ জন, রংপুরে এক হাজার ৭৪ জন এবং সিলেট বিভাগে ৮৯৩ জন ভাসমান লোকের বসবাস।

সাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬ শতাংশ

নতুন শুমারি অনুযায়ী দেশের সাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষের সাক্ষরতার হার ৭৬.৫৬ শতাংশ এবং নারীদের সাক্ষরতার হার ৭২.৮২ শতাংশ। জনশুমারিতে যুক্ত হওয়া হিজড়া জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৫৩.৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিগত এক দশকে সাক্ষরতার হারে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৫১.৭৭ শতাংশ। আর পুরুষের সাক্ষরতার হার ছিল ৫৪.১১ শতাংশ এবং নারীদের সাক্ষরতার হার ছিল ৪৯.৪৪ শতাংশ।

নতুন শুমারি অনুযায়ী পল্লী এলাকার চেয়ে শহর এলাকায় সাক্ষরতার হার বেশি। পল্লী এলাকার মোট সাক্ষরতার হার ৭১.৫৬ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষের সাক্ষরতার হার ৭৩.২৯ শতাংশ, নারীদের সাক্ষরতার হার ৬৯.৯৩ শতাংশ এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৫১.৯৭ শতাংশ। অন্যদিকে শহর এলাকায় মোট সাক্ষরতার হার ৮১.২৮ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষের সাক্ষরতার হার ৮৩.১৮ শতাংশ, নারীদের ৭৯.৩০ শতাংশ এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৫৫.২৮ শতাংশ।

মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ বিবাহিত

এবারের জনশুমারি অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার ৬৫ দশমিক ২৬ শতাংশ বিবাহিত। ৬৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ বিবাহিত নিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রাজশাহী। এছাড়া ১০ থেকে তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ২৮ শতাংশ অবিবাহিত। বর্তমানে ৯৮ জন পুরুষের বিপরীতে নারীর সংখ্যা ১০০ জন রয়েছে। অন্যদিকে বিবাহ বিচ্ছেদ শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ। বিভাগভিত্তিক বিবেচনায় শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশ নিয়ে বিচ্ছেদে এগিয়ে আছে খুলনা।

প্রাপ্তবয়স্কদের ৭২ শতাংশ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন

এবারের জনশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যার পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে মোবাইল ব্যবহারকারীর হার ৫৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৩০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। তবে ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী অর্থাৎ, প্রাপ্তবয়স্কদের ৭২ দশমিক ৩১ শতাংশই মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন ৮৬ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।