‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞায় ৪৯ বিশিষ্টজনের উদ্বেগ

‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার না করার নির্দেশনা অবিলম্বে প্রত্যাহার করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ৪৯ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তাদের পক্ষে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা গতকাল গণমাধ্যমে এই যৌথ বিবৃতি পাঠান। বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরই ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘আদিবাসী’ শব্দটি উল্লেখের তথ্য স্মরণ করিয়ে বিবৃতিদাতারা বলেন, এখন একটি গোয়েন্দা সংস্থার পরিপত্রের ভিত্তিতে এই বিবৃতিটি দিয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়।

গত ১৯ জুলাই তথ্য মন্ত্রণালয়ের টিভি-২ শাখার উপসচিব শেখ শামছুর রহমান স্বাক্ষরিত এক সার্কুলারে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ছোট ছোট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীকে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ অবস্থায় আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত টক শোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্য ব্যক্তিদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে “আদিবাসী” শব্দটি ব্যবহার না করার বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে প্রচারের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’

বিবৃতিতে বলা হয়, যে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় এই সার্কুলার প্রচার করেছে, সেই সরকারের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের ২৮(ক) ধারায় একাধিকবার আদিবাসী শব্দটি স্পষ্ট করে ব্যবহার করা হয়েছে। এই সার্কুলারটি আসলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার পরিপত্রকে ভিত্তি করেই রচিত এবং তার অনুলিপি হিসেবেই প্রচার করা হয়েছে।

এর এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিবৃতিতে বলা হয়, কোন শব্দটি সংবিধানসম্মত কিংবা অসাংবিধানিক, তা নির্ধারণ করার এখতিয়ার গোয়েন্দা অধিদপ্তর কিংবা তথ্য মন্ত্রণালয়ের সার্কুলার প্রণয়নকারীদের কাছে কখন কীভাবে গেল, তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সঙ্গে আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি, এটি চরম অনধিকার চর্চার পর্যায়ে পড়ে, যা মোটেই কাম্য নয়, আইনসম্মতও নয়।

‘আদিবাসী শব্দটি ব্যবহারে আইনগত কোন ‘প্রতিবন্ধকতা নেই’ দাবি করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমাদের দেশের সংবিধানে সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংবিধানের কোন ধারা বা বিষয় নিয়ে কোন বিতর্ক বা মতান্তর দেখা দিলে তার ব্যাখ্যা একমাত্র দেশের সর্বোচ্চ আদালত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টই দিতে পারবেন। অন্য কোন প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠী বা ব্যক্তি নয়। আর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টেরই এক রায়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে আদিবাসী শব্দটি ব্যবহারে আইনগত কোন প্রতিবন্ধকতা নেই।’

বিবৃতিদাতারা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৭২ সালে যে আইএলও কনভেনশন ১০৭ অনুস্বাক্ষর করে গেছেন, সেখানেও আদিবাসী শব্দটি শুধু ব্যবহারই নয়, তাদের সব অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। এছাড়া কয়েক মেয়াদে ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে আদিবাসী দিবস উপলক্ষে তার দেয়া বাণীতে আদিবাসীদের নিজস্ব পরিচয়ে সব অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।

‘সর্বোপরি সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের ২(ক) ও ২(খ) ধারায় যে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দেয়া রয়েছে, তাতেও এই সার্কুলারে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। একজন কী শব্দ চয়ন করলেন, তাতে রাষ্ট্রের কারও কিছু বলার নাই, যদি এই শব্দ ব্যবহারে অন্য কারও প্রতি বিদ্বেষ বা ঘৃণা না ছাড়ানো হয়।’

বিবৃতিদাতারা হলেন- হামিদা হোসেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সুলতানা কামাল, বদিউল আলম মজুমদার, শিরীন হক, অধ্যাপক পারভীন হাসান, খুশী কবির, ইফতেখারুজ্জামান, মোস্তাফিজুর রহমান, ফেরদৌস আজীম, আবুল বারকাত, রানা দাশগুপ্ত, মেঘনা গুহঠাকুরতা, আহরার আহমেদ, জেড আই খান পান্না, শারমিন মুর্শিদ, রেহনুমা আহমেদ, শহিদুল আলম, শাহীন আনাম, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, গীতি আরা নাসরিন, সুমাইয়া খায়ের, তবারক হোসাইন, সারা হোসেন, শামসুল হুদা, কাজল দেবনাথ, রোবায়েত ফেরদৌস, শাহনাজ হুদা, সুব্রত চৌধুরী, সঞ্জীব দ্রং, সামিনা লুৎফা, মোহাম্মদ তানজিম উদ্দিন খান, জাকির হোসেন, তাসনিম সিরাজ মাহবুব, বীনা ডি’ কস্টা, মো. নুর খান, রানী ইয়েন ইয়েন, জোবাইদা নাসরীন, নোভা আহমেদ, রেজাউল করিম চৌধুরী, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, নীনা গোস্বামী, দীপায়ন খীসা, মাহরুখ মহিউদ্দিন, পল্লব চাকমা, রেজাউল করিম লেনিন, সায়দিয়া গুলরুখ, হানা শামস আহমেদ ও অরূপ রাহী।

রবিবার, ৩১ জুলাই ২০২২ , ১৬ শ্রাবণ ১৪২৯ ১ মহররম ১৪৪৪

‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞায় ৪৯ বিশিষ্টজনের উদ্বেগ

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার না করার নির্দেশনা অবিলম্বে প্রত্যাহার করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ৪৯ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তাদের পক্ষে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা গতকাল গণমাধ্যমে এই যৌথ বিবৃতি পাঠান। বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরই ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘আদিবাসী’ শব্দটি উল্লেখের তথ্য স্মরণ করিয়ে বিবৃতিদাতারা বলেন, এখন একটি গোয়েন্দা সংস্থার পরিপত্রের ভিত্তিতে এই বিবৃতিটি দিয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়।

গত ১৯ জুলাই তথ্য মন্ত্রণালয়ের টিভি-২ শাখার উপসচিব শেখ শামছুর রহমান স্বাক্ষরিত এক সার্কুলারে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ছোট ছোট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীকে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ অবস্থায় আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত টক শোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্য ব্যক্তিদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে “আদিবাসী” শব্দটি ব্যবহার না করার বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে প্রচারের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’

বিবৃতিতে বলা হয়, যে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় এই সার্কুলার প্রচার করেছে, সেই সরকারের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের ২৮(ক) ধারায় একাধিকবার আদিবাসী শব্দটি স্পষ্ট করে ব্যবহার করা হয়েছে। এই সার্কুলারটি আসলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার পরিপত্রকে ভিত্তি করেই রচিত এবং তার অনুলিপি হিসেবেই প্রচার করা হয়েছে।

এর এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিবৃতিতে বলা হয়, কোন শব্দটি সংবিধানসম্মত কিংবা অসাংবিধানিক, তা নির্ধারণ করার এখতিয়ার গোয়েন্দা অধিদপ্তর কিংবা তথ্য মন্ত্রণালয়ের সার্কুলার প্রণয়নকারীদের কাছে কখন কীভাবে গেল, তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সঙ্গে আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি, এটি চরম অনধিকার চর্চার পর্যায়ে পড়ে, যা মোটেই কাম্য নয়, আইনসম্মতও নয়।

‘আদিবাসী শব্দটি ব্যবহারে আইনগত কোন ‘প্রতিবন্ধকতা নেই’ দাবি করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমাদের দেশের সংবিধানে সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংবিধানের কোন ধারা বা বিষয় নিয়ে কোন বিতর্ক বা মতান্তর দেখা দিলে তার ব্যাখ্যা একমাত্র দেশের সর্বোচ্চ আদালত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টই দিতে পারবেন। অন্য কোন প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠী বা ব্যক্তি নয়। আর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টেরই এক রায়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে আদিবাসী শব্দটি ব্যবহারে আইনগত কোন প্রতিবন্ধকতা নেই।’

বিবৃতিদাতারা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৭২ সালে যে আইএলও কনভেনশন ১০৭ অনুস্বাক্ষর করে গেছেন, সেখানেও আদিবাসী শব্দটি শুধু ব্যবহারই নয়, তাদের সব অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। এছাড়া কয়েক মেয়াদে ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে আদিবাসী দিবস উপলক্ষে তার দেয়া বাণীতে আদিবাসীদের নিজস্ব পরিচয়ে সব অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।

‘সর্বোপরি সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের ২(ক) ও ২(খ) ধারায় যে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দেয়া রয়েছে, তাতেও এই সার্কুলারে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। একজন কী শব্দ চয়ন করলেন, তাতে রাষ্ট্রের কারও কিছু বলার নাই, যদি এই শব্দ ব্যবহারে অন্য কারও প্রতি বিদ্বেষ বা ঘৃণা না ছাড়ানো হয়।’

বিবৃতিদাতারা হলেন- হামিদা হোসেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সুলতানা কামাল, বদিউল আলম মজুমদার, শিরীন হক, অধ্যাপক পারভীন হাসান, খুশী কবির, ইফতেখারুজ্জামান, মোস্তাফিজুর রহমান, ফেরদৌস আজীম, আবুল বারকাত, রানা দাশগুপ্ত, মেঘনা গুহঠাকুরতা, আহরার আহমেদ, জেড আই খান পান্না, শারমিন মুর্শিদ, রেহনুমা আহমেদ, শহিদুল আলম, শাহীন আনাম, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, গীতি আরা নাসরিন, সুমাইয়া খায়ের, তবারক হোসাইন, সারা হোসেন, শামসুল হুদা, কাজল দেবনাথ, রোবায়েত ফেরদৌস, শাহনাজ হুদা, সুব্রত চৌধুরী, সঞ্জীব দ্রং, সামিনা লুৎফা, মোহাম্মদ তানজিম উদ্দিন খান, জাকির হোসেন, তাসনিম সিরাজ মাহবুব, বীনা ডি’ কস্টা, মো. নুর খান, রানী ইয়েন ইয়েন, জোবাইদা নাসরীন, নোভা আহমেদ, রেজাউল করিম চৌধুরী, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, নীনা গোস্বামী, দীপায়ন খীসা, মাহরুখ মহিউদ্দিন, পল্লব চাকমা, রেজাউল করিম লেনিন, সায়দিয়া গুলরুখ, হানা শামস আহমেদ ও অরূপ রাহী।