রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের সক্রিয় সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দুই দিনের সরকারি সফরে আজ ঢাকায় আসছেন। তার সফরকালে বাংলাদেশ মূলত রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চায়। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে আগামী ৭ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক হবে। এর আগে সকাল ৮টায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।

রোহিঙ্গা সমস্যার বর্তমান প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিকভাবে মনে করা হয়, চীনের সক্রিয় সমর্থন ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। চীন সাম্প্রতিককালে মায়ানমারের সবচেয়ে বড় বন্ধু এবং উন্নয়ন অংশীদার। মায়ানমারের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকা-ে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন একটি বড় ব্যাপার। চীন রোহিঙ্গা সমস্যার সমধানের ব্যাপারে মায়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তার করলে ইতোমধ্যে গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে সহজ হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মায়ানমার একাধিকবার কথা দিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। এ নিয়ে বাংলাদেশ একাধিকবার অভিযোগও তুলেছে। কিন্তু কাজ হয়নি। চীন এ ব্যাপারে খুব একটা সক্রিয় ভূমিকা নেয়নি। তবে চীন একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় হাজার দেড়েক রোহিঙ্গাকে দিয়ে প্রত্যাবাসন করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সফরে আসছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। চীন সরকারের আগ্রহেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এ সফরে আসছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। এ কারণে বাংলাদেশ চাচ্ছে তারা সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং সমাধানের ব্যাপারে অঙ্গীকার আদায় করতে।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এবারের ঢাকা সফর চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-সংকট এবং চলমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করে, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটের পর চীন একটি বিশেষ অবস্থান গ্রহণ করেছে। সে অবস্থানের পক্ষে চীন তার মিত্র এবং বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর সমর্থন ও সহযোগিতা চায়। এক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশকেও তার আস্থার বলয়ে নিতে চায় চীন। এছাড়া দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতার পাশাপাশি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী চীন।

ঢাকা সফরকালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলবেন বলে কূটনৈতিক সূত্র মনে করছে। এজন্যই নিজের ইচ্ছায় চীন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ঢাকায় পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, কতগুলো হয়নি, কেন হয়নি তা নিয়ে ওয়াং ই ঢাকায় বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে এবার চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরকালে ৮টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত এসব সমঝোতা ও চুক্তির প্রস্তুতি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কাজ করছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত কয়টি চুক্তি ও সমঝোতা সই হবে সেটা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সূত্র জানায়, দুই দেশের মধ্যে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা সইয়ের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে এর মধ্যে রয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক সহযোগিতা, দুর্যোগ প্রতিরোধবিষয়ক সহযোগিতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সহযোগিতা ও দুই দেশের মধ্যে টেলিভিশন প্রোগ্রাম বিনিময়বিষয়ক সহযোগিতা।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশ কি কি বিষয় আলোচনার টেবিলে তুলবে তা নির্ধারণের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গত বুধবার আন্তঃমন্ত্রণালয় ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশে চীনের অর্থ সাহায্যে বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সেসব প্রকল্প যেসব মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়ন হচ্ছে সেসব মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আহূত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিয়ে ভার্চুয়ালি আলোচনা করেছেন। এ আলোচনার বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।

প্রায় পাঁচ বছর পর চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফরে আসছেন। ২০১৭ সালের নভেম্বরে বেইজিং থেকে আফ্রিকা যাওয়ার পথে উড়োজাহাজে জ্বালানি তেল নেয়ার জন্য ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করেছিলেন তিনি। তখন বিমানে বসেই তখনকার পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন ওয়াং ই।

শনিবার, ০৬ আগস্ট ২০২২ , ২২ শ্রাবণ ১৪২৯ ৭ মহররম ১৪৪৪

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ ঢাকায় আসছেন

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের সক্রিয় সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ

কূটনৈতিক বার্তা পরিবেশক

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দুই দিনের সরকারি সফরে আজ ঢাকায় আসছেন। তার সফরকালে বাংলাদেশ মূলত রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চায়। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে আগামী ৭ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক হবে। এর আগে সকাল ৮টায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।

রোহিঙ্গা সমস্যার বর্তমান প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিকভাবে মনে করা হয়, চীনের সক্রিয় সমর্থন ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। চীন সাম্প্রতিককালে মায়ানমারের সবচেয়ে বড় বন্ধু এবং উন্নয়ন অংশীদার। মায়ানমারের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকা-ে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন একটি বড় ব্যাপার। চীন রোহিঙ্গা সমস্যার সমধানের ব্যাপারে মায়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তার করলে ইতোমধ্যে গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে সহজ হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মায়ানমার একাধিকবার কথা দিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। এ নিয়ে বাংলাদেশ একাধিকবার অভিযোগও তুলেছে। কিন্তু কাজ হয়নি। চীন এ ব্যাপারে খুব একটা সক্রিয় ভূমিকা নেয়নি। তবে চীন একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় হাজার দেড়েক রোহিঙ্গাকে দিয়ে প্রত্যাবাসন করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সফরে আসছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। চীন সরকারের আগ্রহেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এ সফরে আসছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। এ কারণে বাংলাদেশ চাচ্ছে তারা সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং সমাধানের ব্যাপারে অঙ্গীকার আদায় করতে।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এবারের ঢাকা সফর চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-সংকট এবং চলমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করে, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটের পর চীন একটি বিশেষ অবস্থান গ্রহণ করেছে। সে অবস্থানের পক্ষে চীন তার মিত্র এবং বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর সমর্থন ও সহযোগিতা চায়। এক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশকেও তার আস্থার বলয়ে নিতে চায় চীন। এছাড়া দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতার পাশাপাশি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী চীন।

ঢাকা সফরকালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলবেন বলে কূটনৈতিক সূত্র মনে করছে। এজন্যই নিজের ইচ্ছায় চীন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ঢাকায় পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, কতগুলো হয়নি, কেন হয়নি তা নিয়ে ওয়াং ই ঢাকায় বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে এবার চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরকালে ৮টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত এসব সমঝোতা ও চুক্তির প্রস্তুতি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কাজ করছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত কয়টি চুক্তি ও সমঝোতা সই হবে সেটা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সূত্র জানায়, দুই দেশের মধ্যে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা সইয়ের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে এর মধ্যে রয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক সহযোগিতা, দুর্যোগ প্রতিরোধবিষয়ক সহযোগিতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সহযোগিতা ও দুই দেশের মধ্যে টেলিভিশন প্রোগ্রাম বিনিময়বিষয়ক সহযোগিতা।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশ কি কি বিষয় আলোচনার টেবিলে তুলবে তা নির্ধারণের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গত বুধবার আন্তঃমন্ত্রণালয় ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশে চীনের অর্থ সাহায্যে বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সেসব প্রকল্প যেসব মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়ন হচ্ছে সেসব মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আহূত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিয়ে ভার্চুয়ালি আলোচনা করেছেন। এ আলোচনার বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।

প্রায় পাঁচ বছর পর চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফরে আসছেন। ২০১৭ সালের নভেম্বরে বেইজিং থেকে আফ্রিকা যাওয়ার পথে উড়োজাহাজে জ্বালানি তেল নেয়ার জন্য ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করেছিলেন তিনি। তখন বিমানে বসেই তখনকার পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন ওয়াং ই।