ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

রেজাউল করিম খোকন

করোনা-পরবর্তী চাহিদার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। দেশের ভেতরেও পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে বেড়েছে আমদানি। একদিকে আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি ও অন্যদিকে পণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে আমদানি ব্যয়েও। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে আমদানি ব্যয়ের বড় অংশই মেটানো হয়। ফলে রিজার্ভের ওপর হঠাৎ করে চাপ বেড়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম এবং বিদেশে লোকজনের যাতায়াতের কারণে যেভাবে বৈদেশিক মুদ্রার খরচ বেড়েছে, সেভাবে আয় বাড়েনি। ফলে দেশের বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে গিয়ে ডলারের সংকট তৈরি হয়েছে। এতে হুহু করে বাড়ছে ডলারের দাম। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে কখনো এখনকার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি। বিশেষ করে ডলার নিয়ে অনিশ্চয়তায় ব্যবসা চালানো এখন কঠিন হয়ে পড়ছে।

ডলারের দর কাল কত হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমন অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে খরচ কত হবে, বাজারে দাম পাওয়া যাবে কি না, বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা শোধ করা যাবে কি না, তার হিসাব মেলানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে আমদানি কমিয়ে ফেলতে হচ্ছে। এ তো গেল ডলারের দামে অস্থিরতা। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আগস্ট মাসের ডলারের নতুন বিনিময় হার প্রকাশ করেছে। তাতে আগস্ট মাসে ডলার প্রতি বিনিময় হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৩ টাকা ৪০ পয়সা। জুন মাসেও এই বিনিময় হার ছিল ৮৬ টাকা ৭৩ পয়সা। বিনিময় হার বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্যের এবার শুল্ক-করও বাড়তি দিতে হবে। মসলা ও ভোগ্যপণ্যের কোনটি অপ্রয়োজনীয়, তা সরকার সুনির্দিষ্ট করে দিক। এসব পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে ডলার-সংকট কাটানো যাবে না। তার চেয়ে বিলাস পণ্যে বরং কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত। আর ডলারের অস্থিরতা না থাকলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিও স্বাভাবিক থাকবে না।

দেশে ডলার সংকট তৈরি হওয়ায় প্রতিনিয়তই বাড়ছে দাম। মার্কেট স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার সাপোর্ট দেয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করায় দিন শেষে রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৯৪৯ কোটি (৩৯ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন) ডলারে। বৈদেশিক মুদ্রার এ রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। ডলার সংকট নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের মাধ্যমেই ডলারের মূল চাহিদা পূরণ হবে। ডলারের বিনিময় মূল্যের অস্বাভাবিক উত্থানে প্রতি সপ্তাহে আমদানি দায় পরিশোধের সময় লোকসান দিতে হচ্ছে। ডলার সংকটে নতুন করে কাঁচামাল আমদানিতেও এখন আগের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। এমন সব সংকটে দিশাহারা। ডলারের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমদানিনির্ভর সব খাতের উদ্যোক্তাদের কাঁধে বিপুল লোকসানের বোঝা আসছে। সব কোম্পানিই শুধু ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ব্যাপক অঙ্কের লোকসান দিচ্ছে। সরকার বিলাসপণ্য ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হোক। তবে শিল্পের কাঁচামালের ঋণপত্র যাতে সহজে খোলা যায়, সে জন্য সরকারের তদারকি থাকা দরকার। কারণ, কাঁচামাল আমদানি স্বাভাবিক না থাকলে সামনে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে। এ মুহূর্তে ডলারের দাম যাতে স্থিতিশীল থাকে, সে জন্য সরকারের পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

ব্যাংকে ডলারের চাপ কমে আসার আশা করছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। কারণ, জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে আমদানি ঋণপত্র খোলা কমেছে ৩১ দশমিক ৩২ শতাংশ। জুন মাসে ঋণপত্র খোলা হয়েছিল ৭৯৬ কোটি ডলারের, জুলাই মাসে যা কমে হয়েছে ৫৪৭ কোটি ডলার। আমদানি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার পর কমেছে ঋণপত্র খোলা। খোলাবাজারে ডলারের কারসাজি হচ্ছে কি না, তা জানতে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শনে অনিয়ম পাওয়ায় কয়েকটি মানি চেঞ্জারের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। দেখা যায়, বেশির ভাগ মানি চেঞ্জার নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছে না। আবার কেউ কেউ অবৈধ ব্যবসার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের পাশাপাশি খোলাবাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় মানি চেঞ্জার পরিদর্শন শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোয় পরিদর্শনে উঠে এসেছে, অনেক ব্যাংক সীমার বেশি ডলার ধারণ করছে। আবার মুনাফা বাড়াতে বেশি দামে ডলার কিনে আরও বেশি দামে বিক্রি করেছে কিছু ব্যাংক। রপ্তানিকারকদের আয় প্রত্যাবাসন হলেও তা নগদায়ন করেনি। এভাবে সংকট বাড়ানো হয়েছে।

করোনার বড় ধাক্কার পর আমদানির বাইরেও বৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রার খরচ বেড়ে গেছে। করোনার ধাক্কা কাটার পর বিদেশে ঘোরাঘুরিও বেড়েছে, এতে বেড়েছে ভ্রমণ খরচ। আবার বিদেশে চিকিৎসা ও শিক্ষার পেছনেও খরচ বেড়েছে। ফলে এসব খাতে ডলার খরচ বেড়ে গেছে। ফলে ২০২০-২১ অর্থবছরে এসব খাতে বাংলাদেশের যে ডলার খরচ হয়েছিল, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে তার চেয়ে ৩৩ শতাংশ বেশি ডলার খরচ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভিযানে নগদ ডলারের তেজ কিছুটা কমেছে। বাজারে চাহিদার তুলনায় ডলার মিলছে না। ফলে এর দাম বেড়েই চলেছে। খোলাবাজারে ডলারের দাম রেকর্ড ১১২ টাকায় উঠেছিল। ব্যাংকে নগদ ডলার উঠেছিল ১০৮ টাকায়। খোলাবাজার ও ব্যাংকের মধ্যে ব্যবধান ছিল ৪ টাকা। বাজার নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে নামে। তারা তদন্ত শুরু করলে এর দাম কিছুটা কমে যায়। একই সঙ্গে খোলাবাজারে ও মানি চেঞ্জার্স প্রতিষ্ঠানগুলোয় ডলারের লেনদেন কমে যায়। চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে একটি চক্র বাজার থেকে অপ্রয়োজনে ডলার কিনে মজুত করছে।

খোলাবাজার ও বাণিজ্যিক ব্যাংকে ডলারের দাম হুহু করে বাড়ছে। খোলাবাজারে ডলারের দাম ১১২ টাকায় উঠেছিল। ডলারের দাম নিয়ে কারসাজির বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিভিন্ন দেশ করোনা-নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ায় মানুষের বিদেশ ভ্রমণ বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে গত কয়েক মাস ধরে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মুদ্রামানের বিপরীতে ডলারের দাম বাড়ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। আর এরই সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যক্তিরা। শুধু ব্যক্তি নয়, কয়েকটি মানি চেঞ্জার্স, এমনকি বাণিজ্যিক ব্যাংকও এ কারসাজিতে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। বাজারে ডলারের এক ধরনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে একে মুনাফার হাতিয়ারে পরিণত করা হচ্ছে, যা বন্ধ করা জরুরি।

বস্তুত অর্থনীতির নানা কারণে ডলারের দামের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়, তখনই তা হয় বিপত্তির কারণ। ডলারের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু নিত্যপণ্যের বাজারেই পড়ছে না, এর অজুহাতে প্রতিটি সেবা ও সামগ্রীরই দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সার্বিকভাবে এটি দেশের অর্থনীতির জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ডলারের দাম বাড়ার কারণে ব্যবসায়ীদের এলসি খুলতে সমস্যা হচ্ছে। তা ছাড়া খোলাবাজারে অস্বাভাবিক দামের কারণে ডলার পাচারের আশঙ্কাও করছেন অনেকই। কাজেই কারসাজি করে ডলারের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা রোধ করা দরকার কঠোরভাবে। সে ক্ষেত্রে বাজারে কোন কোন গোষ্ঠী বা চক্র ডলার কারসাজিতে জড়িত, তাদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। তবে এ উপায়ে সাময়িকভাবে সমস্যাটি মোকাবিলা করা গেলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধান হলো বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ানো। বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য রিজার্ভ থেকে ডলার ছেড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো আমদানি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেয়া। ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে আমদানি ব্যয় কমানোর কাজটি কঠিন হলেও বিলাসী পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেয়া সহজেই সম্ভব। অবশ্য এ ব্যাপারে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে ইতোমধ্যেই। এ সময়ে আমদানিনির্ভর নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। এ ছাড়া রফতানি আয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া দরকার জোরেশোরে।

পুঁজিবাজারে অস্থিরতা এবং ব্যাংক আমানতের সুদের হার কম হওয়ায় অনেক সাধারণ মানুষও হয়তো ডলার কিনে মজুত করছেন পরে দাম বৃদ্ধির আশায়। সামগ্রিকভাবে এর পরিমাণ হয়তো খুব বেশি নয়; তবে বিষয়টি মাথায় রেখে মানুষের সঞ্চয়ের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা উচিত। অনাবাসী বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে ডলারে আমানত রাখলে তার ওপর এখন বেশি সুদ দেবে ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সুদের হার নির্ধারণ করে দিয়েছে। এতে করে ডলারে আমানতকারীরা ৪ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাবেন। এই আমানতে সুদের হার নির্ধারণের ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনাবাসী বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে অর্থ জমা করতে আগ্রহী হবেন। এতে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলারের আমানত বাড়বে। ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেবে, এটাই কাম্য। চলমান ডলার সংকটের কারণে গোটা অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, যা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে না। এই সংকট কাটাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে তেমন অস্থির অবস্থা চলতে থাকলে তার প্রভাবে জটিলতার মাত্রা আরও বাড়বে বই কমবে নাÑএটা সবাইকে অনুধাবন করতে হবে এখনই।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

image

খোলাবাজার ও বাণিজ্যিক ব্যাংকে ডলারের দাম হুহু করে বাড়ছে

আরও খবর
টেকসই উন্নয়নে সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি
দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

শনিবার, ০৬ আগস্ট ২০২২ , ২২ শ্রাবণ ১৪২৯ ৭ মহররম ১৪৪৪

ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

রেজাউল করিম খোকন

image

খোলাবাজার ও বাণিজ্যিক ব্যাংকে ডলারের দাম হুহু করে বাড়ছে

করোনা-পরবর্তী চাহিদার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। দেশের ভেতরেও পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে বেড়েছে আমদানি। একদিকে আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি ও অন্যদিকে পণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে আমদানি ব্যয়েও। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে আমদানি ব্যয়ের বড় অংশই মেটানো হয়। ফলে রিজার্ভের ওপর হঠাৎ করে চাপ বেড়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম এবং বিদেশে লোকজনের যাতায়াতের কারণে যেভাবে বৈদেশিক মুদ্রার খরচ বেড়েছে, সেভাবে আয় বাড়েনি। ফলে দেশের বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে গিয়ে ডলারের সংকট তৈরি হয়েছে। এতে হুহু করে বাড়ছে ডলারের দাম। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে কখনো এখনকার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি। বিশেষ করে ডলার নিয়ে অনিশ্চয়তায় ব্যবসা চালানো এখন কঠিন হয়ে পড়ছে।

ডলারের দর কাল কত হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমন অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে খরচ কত হবে, বাজারে দাম পাওয়া যাবে কি না, বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা শোধ করা যাবে কি না, তার হিসাব মেলানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে আমদানি কমিয়ে ফেলতে হচ্ছে। এ তো গেল ডলারের দামে অস্থিরতা। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আগস্ট মাসের ডলারের নতুন বিনিময় হার প্রকাশ করেছে। তাতে আগস্ট মাসে ডলার প্রতি বিনিময় হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৩ টাকা ৪০ পয়সা। জুন মাসেও এই বিনিময় হার ছিল ৮৬ টাকা ৭৩ পয়সা। বিনিময় হার বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্যের এবার শুল্ক-করও বাড়তি দিতে হবে। মসলা ও ভোগ্যপণ্যের কোনটি অপ্রয়োজনীয়, তা সরকার সুনির্দিষ্ট করে দিক। এসব পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে ডলার-সংকট কাটানো যাবে না। তার চেয়ে বিলাস পণ্যে বরং কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত। আর ডলারের অস্থিরতা না থাকলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিও স্বাভাবিক থাকবে না।

দেশে ডলার সংকট তৈরি হওয়ায় প্রতিনিয়তই বাড়ছে দাম। মার্কেট স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার সাপোর্ট দেয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করায় দিন শেষে রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৯৪৯ কোটি (৩৯ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন) ডলারে। বৈদেশিক মুদ্রার এ রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। ডলার সংকট নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের মাধ্যমেই ডলারের মূল চাহিদা পূরণ হবে। ডলারের বিনিময় মূল্যের অস্বাভাবিক উত্থানে প্রতি সপ্তাহে আমদানি দায় পরিশোধের সময় লোকসান দিতে হচ্ছে। ডলার সংকটে নতুন করে কাঁচামাল আমদানিতেও এখন আগের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। এমন সব সংকটে দিশাহারা। ডলারের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমদানিনির্ভর সব খাতের উদ্যোক্তাদের কাঁধে বিপুল লোকসানের বোঝা আসছে। সব কোম্পানিই শুধু ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ব্যাপক অঙ্কের লোকসান দিচ্ছে। সরকার বিলাসপণ্য ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হোক। তবে শিল্পের কাঁচামালের ঋণপত্র যাতে সহজে খোলা যায়, সে জন্য সরকারের তদারকি থাকা দরকার। কারণ, কাঁচামাল আমদানি স্বাভাবিক না থাকলে সামনে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে। এ মুহূর্তে ডলারের দাম যাতে স্থিতিশীল থাকে, সে জন্য সরকারের পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

ব্যাংকে ডলারের চাপ কমে আসার আশা করছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। কারণ, জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে আমদানি ঋণপত্র খোলা কমেছে ৩১ দশমিক ৩২ শতাংশ। জুন মাসে ঋণপত্র খোলা হয়েছিল ৭৯৬ কোটি ডলারের, জুলাই মাসে যা কমে হয়েছে ৫৪৭ কোটি ডলার। আমদানি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার পর কমেছে ঋণপত্র খোলা। খোলাবাজারে ডলারের কারসাজি হচ্ছে কি না, তা জানতে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শনে অনিয়ম পাওয়ায় কয়েকটি মানি চেঞ্জারের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। দেখা যায়, বেশির ভাগ মানি চেঞ্জার নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছে না। আবার কেউ কেউ অবৈধ ব্যবসার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের পাশাপাশি খোলাবাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় মানি চেঞ্জার পরিদর্শন শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোয় পরিদর্শনে উঠে এসেছে, অনেক ব্যাংক সীমার বেশি ডলার ধারণ করছে। আবার মুনাফা বাড়াতে বেশি দামে ডলার কিনে আরও বেশি দামে বিক্রি করেছে কিছু ব্যাংক। রপ্তানিকারকদের আয় প্রত্যাবাসন হলেও তা নগদায়ন করেনি। এভাবে সংকট বাড়ানো হয়েছে।

করোনার বড় ধাক্কার পর আমদানির বাইরেও বৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রার খরচ বেড়ে গেছে। করোনার ধাক্কা কাটার পর বিদেশে ঘোরাঘুরিও বেড়েছে, এতে বেড়েছে ভ্রমণ খরচ। আবার বিদেশে চিকিৎসা ও শিক্ষার পেছনেও খরচ বেড়েছে। ফলে এসব খাতে ডলার খরচ বেড়ে গেছে। ফলে ২০২০-২১ অর্থবছরে এসব খাতে বাংলাদেশের যে ডলার খরচ হয়েছিল, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে তার চেয়ে ৩৩ শতাংশ বেশি ডলার খরচ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভিযানে নগদ ডলারের তেজ কিছুটা কমেছে। বাজারে চাহিদার তুলনায় ডলার মিলছে না। ফলে এর দাম বেড়েই চলেছে। খোলাবাজারে ডলারের দাম রেকর্ড ১১২ টাকায় উঠেছিল। ব্যাংকে নগদ ডলার উঠেছিল ১০৮ টাকায়। খোলাবাজার ও ব্যাংকের মধ্যে ব্যবধান ছিল ৪ টাকা। বাজার নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে নামে। তারা তদন্ত শুরু করলে এর দাম কিছুটা কমে যায়। একই সঙ্গে খোলাবাজারে ও মানি চেঞ্জার্স প্রতিষ্ঠানগুলোয় ডলারের লেনদেন কমে যায়। চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে একটি চক্র বাজার থেকে অপ্রয়োজনে ডলার কিনে মজুত করছে।

খোলাবাজার ও বাণিজ্যিক ব্যাংকে ডলারের দাম হুহু করে বাড়ছে। খোলাবাজারে ডলারের দাম ১১২ টাকায় উঠেছিল। ডলারের দাম নিয়ে কারসাজির বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিভিন্ন দেশ করোনা-নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ায় মানুষের বিদেশ ভ্রমণ বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে গত কয়েক মাস ধরে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মুদ্রামানের বিপরীতে ডলারের দাম বাড়ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। আর এরই সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যক্তিরা। শুধু ব্যক্তি নয়, কয়েকটি মানি চেঞ্জার্স, এমনকি বাণিজ্যিক ব্যাংকও এ কারসাজিতে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। বাজারে ডলারের এক ধরনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে একে মুনাফার হাতিয়ারে পরিণত করা হচ্ছে, যা বন্ধ করা জরুরি।

বস্তুত অর্থনীতির নানা কারণে ডলারের দামের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়, তখনই তা হয় বিপত্তির কারণ। ডলারের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু নিত্যপণ্যের বাজারেই পড়ছে না, এর অজুহাতে প্রতিটি সেবা ও সামগ্রীরই দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সার্বিকভাবে এটি দেশের অর্থনীতির জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ডলারের দাম বাড়ার কারণে ব্যবসায়ীদের এলসি খুলতে সমস্যা হচ্ছে। তা ছাড়া খোলাবাজারে অস্বাভাবিক দামের কারণে ডলার পাচারের আশঙ্কাও করছেন অনেকই। কাজেই কারসাজি করে ডলারের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা রোধ করা দরকার কঠোরভাবে। সে ক্ষেত্রে বাজারে কোন কোন গোষ্ঠী বা চক্র ডলার কারসাজিতে জড়িত, তাদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। তবে এ উপায়ে সাময়িকভাবে সমস্যাটি মোকাবিলা করা গেলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধান হলো বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ানো। বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য রিজার্ভ থেকে ডলার ছেড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো আমদানি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেয়া। ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে আমদানি ব্যয় কমানোর কাজটি কঠিন হলেও বিলাসী পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেয়া সহজেই সম্ভব। অবশ্য এ ব্যাপারে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে ইতোমধ্যেই। এ সময়ে আমদানিনির্ভর নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। এ ছাড়া রফতানি আয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া দরকার জোরেশোরে।

পুঁজিবাজারে অস্থিরতা এবং ব্যাংক আমানতের সুদের হার কম হওয়ায় অনেক সাধারণ মানুষও হয়তো ডলার কিনে মজুত করছেন পরে দাম বৃদ্ধির আশায়। সামগ্রিকভাবে এর পরিমাণ হয়তো খুব বেশি নয়; তবে বিষয়টি মাথায় রেখে মানুষের সঞ্চয়ের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা উচিত। অনাবাসী বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে ডলারে আমানত রাখলে তার ওপর এখন বেশি সুদ দেবে ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সুদের হার নির্ধারণ করে দিয়েছে। এতে করে ডলারে আমানতকারীরা ৪ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাবেন। এই আমানতে সুদের হার নির্ধারণের ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনাবাসী বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে অর্থ জমা করতে আগ্রহী হবেন। এতে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলারের আমানত বাড়বে। ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেবে, এটাই কাম্য। চলমান ডলার সংকটের কারণে গোটা অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, যা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে না। এই সংকট কাটাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে তেমন অস্থির অবস্থা চলতে থাকলে তার প্রভাবে জটিলতার মাত্রা আরও বাড়বে বই কমবে নাÑএটা সবাইকে অনুধাবন করতে হবে এখনই।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]