রোহিঙ্গারা ‘বড় বোঝা’, ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে

তিস্তাচুক্তি নির্ভর করছে ভারতের ওপর

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য ‘বড় বোঝা’। তাদের প্রত্যাবাসনে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।

প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে ‘তিস্তা চুক্তিসহ আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিবণ্টন সমস্যা’ নিয়েও প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘এটি সমাধান হওয়া উচিত। তবে এটি মূলত ভারতের ওপর নির্ভর করছে।’

সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের রাজনীতিতে আসা, ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারস্যাম্য রাখাসহ দ্বিপক্ষীয় নানা ইস্যুতে কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের আগে ও পরে নিজের প্রবাস জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর ভারত সফর করবেন। সরকারি ভ্রমণসূচি অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নয়াদিল্লি পৌঁছাবেন তিনি। ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি।

এই সফরের প্রাক্কালে ভারতীয় গণমাধ্যম এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এএনআই) গতকাল শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। ঢাকায় এসে এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এএনআইয়ের সম্পাদক স্মিতা প্রকাশ।

প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার ওই সাক্ষাৎকার গতকাল সকাল ১০টায় ভারতের অনেক চ্যানেলে সম্প্রচার করার কথাও এক টুইট বার্তায় জানান স্মিতা।

মানবিক দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কথা তুলে ধরে এএনআইকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদিও বর্তমানে তা বাংলাদেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মায়ানমার সরকার বারবার প্রত্যাবাসনের কথা বললেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।’

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করছি, যে তাদেরও কিছু পদক্ষেপ নেয়া উচিত, যাতে তারা দেশে ফিরে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।’

মায়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার ও নিপীড়নের মুখে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা; যেই সংখ্যা এখন ১১ লাখের বেশি।

তিনি বলেন, ‘মানবিক কারণে আমরা এই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি এবং সব সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি। এমনকি এই কোভিডের সময় আমরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সবাইকে টিকা দিয়েছি। আমাদের পরিবেশ বিপজ্জনক। তার ওপর সেখানে কিছু লোক মাদক পাচার বা নারী পাচার বা অস্ত্র সংঘাতের সঙ্গে জড়িত। তাই যত তাড়াতাড়ি তারা দেশে ফিরতে পারে, তা আমাদের দেশের জন্য এবং মায়ানমারের জন্যও মঙ্গলজনক।’

সাক্ষাৎকারে উঠে আসে ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন ইস্যুও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তিস্তার পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও সেগুলো পারস্পরিকভাবে সমাধান করা সম্ভব।

তিনি বলেন, আমাদের এখানে ভারত থেকে পানি আসে, তাই ভারতের আরও উদারতা দেখাতে হবে। কারণ এতে উভয় দেশই লাভবান হবে। কখনো কখনো পানির অভাবে আমাদের জনগণও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে তিস্তায় পানি না পেয়ে আমরা ফসল রোপণ করতে পারিনি এবং আরও অনেক সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাই আমি মনে করি এর সমাধান হওয়া উচিত।

চুক্তি করে যেভাবে গঙ্গা নদীর পানি ভাগ হচ্ছে ঠিক একইভাবে অন্য নদীগুলোর পানিও বণ্টন হওয়া উচিত বলে জানান শেখ হাসিনা। বলেন, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, তাই এটি সমাধান করা উচিত।

ভারতীয়রা ‘বাংলাদেশে হিন্দু মন্দির ভাঙচুরের ভিডিও দেখেছেন’ এমন একটি প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এ ধরনের বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটে কিন্তু আমরা সঙ্গে সঙ্গে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিই।’

এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভারত আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। আমরা সব সময় মনে রাখি ১৯৭১ সালের যুদ্ধে তাদের অবদানের কথা। এমনকি ১৯৭৫ সালে যখন আমার পরিবারের সব সদস্যকে হারালাম, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (ইন্দিরা গান্ধী) আমাদের ভারতে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্র। আমরা সবসময় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বে গুরুত্বারোপ করি। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, এটা শুধু নেতৃত্ব পর্যায়ের জন্য না, এটা জনগণের জন্য। ভারতের মানুষ, প্রধানমন্ত্রী, নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির প্রতি শুভ কামনার পাশাপাশি আমাদের অগ্রাধিকার থাকবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেয়ার ওপর। এই সফর বেশ গুরুত্বপূর্ণ।’

প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে ভারতের বৈরী সম্পর্ক অনেক দিনের। বাংলাদেশ ভারতকে ‘পরীক্ষিত’ বন্ধু বলে। আবার চীনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীন ভারতের চেয়ে এগিয়ে।

অনেক ভারতীয় মনে করে ভারত বাংলাদেশর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হতে পারত। একটি ছোট দেশ হিসেবে ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখেন, এএনআইয়ের এই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি খুবই পরিষ্কার-সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে এটা বলেছিলেন জাতিসংঘে। আমরা তার সেই মতাদর্শ অনুসরণ করে চলি।

আমি মনে করি, আমাদের উচিত জনগণকে কেন্দ্র করে কাজ করা। কীভাবে তাদের আরও ভালো জীবন দেয়া যায়, কীভাবে তাদের জীবনমান আরও ভালো করা যায়। আমি সব সময়ই বলি, আমাদের একমাত্র শত্রু দরিদ্রতা। কাজেই চলুন একসঙ্গে কাজ করি দরিদ্রতা কমাতে। দক্ষিণ এশিয়া, চীন সব জায়গাতেই জনগণের জন্য একটি উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে আমাদের কাজ করতে হবে, তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হবে।

আমি মনে করি, ভারত ও চীনের মধ্যে যদি কোন সমস্যা থেকেও থাকে, সেখানে আমি নাক গলাতে চাই না। আমি চাই আমার দেশের উন্নয়ন। ভারত আমাদের ঠিক পাশের রাষ্ট্র, সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী। আমাদের মধ্যে খুবই ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের মধ্যে কিছু বিষয়ে সমস্যা রয়েছে এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে আমরা এর মধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি। আপনি জানেন, পানি বণ্টন চুক্তি, সীমান্ত সমস্যা সমাধান হয়েছে। ২ দশক ধরে ভারতে থাকা আমাদের রিফুজিদের আমি ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি এবং পার্বত্য শান্তি চুক্তির সময় তাদের সেটেল করেছি।

আমি মনে করি ছিটমহল বিনিময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। অনেক দেশ এর জন্য যুদ্ধ করে, কিন্তু আমরা তা করিনি। বন্ধুত্বের মাধ্যমে আমরা এই সমস্যার সমাধান করেছি এবং ছিটমহল বিনিময় করেছি। আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই সব সংসদ সদস্যদের এবং ভারত সরকারকে, তারা আইন পাস করায় এই সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি।

অনেকে, বিশেষ করে পাশ্চাত্য দেশ থেকে আমাকে এই প্রশ্ন করেন। ভারত ও চীন উভয় দেশের জন্যই আমার মনে হয়, আমাদের যুদ্ধ করা উচিত না। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কোন সমস্যা থাকলে তা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা উচিত। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন আপনি পাশাপাশি থাকবেন, তখন কিছু সমস্যা আসবেই, থাকবেই। সেগুলো আপনি সমাধান করতেই পারেন। আমাদের কিছু সমস্যা আছে, কিন্তু আমরা আলোচনা চালিয়ে যাব এবং নিজেরা সমাধান করে নিতে পারব।

আমাদের দেশের উন্নয়নের জন্য যারাই অফার করবে, আমাদের জন্য তার মধ্যে যেগুলো সুইটেবল হবে, সেটা আমরা নিব।’

সোমবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ , ২১ ভাদ্র ১৪২৯ ৮ সফর ১৪৪৪

এএনআইকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গারা ‘বড় বোঝা’, ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে

তিস্তাচুক্তি নির্ভর করছে ভারতের ওপর

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য ‘বড় বোঝা’। তাদের প্রত্যাবাসনে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।

প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে ‘তিস্তা চুক্তিসহ আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিবণ্টন সমস্যা’ নিয়েও প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘এটি সমাধান হওয়া উচিত। তবে এটি মূলত ভারতের ওপর নির্ভর করছে।’

সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের রাজনীতিতে আসা, ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারস্যাম্য রাখাসহ দ্বিপক্ষীয় নানা ইস্যুতে কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের আগে ও পরে নিজের প্রবাস জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর ভারত সফর করবেন। সরকারি ভ্রমণসূচি অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নয়াদিল্লি পৌঁছাবেন তিনি। ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি।

এই সফরের প্রাক্কালে ভারতীয় গণমাধ্যম এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এএনআই) গতকাল শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। ঢাকায় এসে এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এএনআইয়ের সম্পাদক স্মিতা প্রকাশ।

প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার ওই সাক্ষাৎকার গতকাল সকাল ১০টায় ভারতের অনেক চ্যানেলে সম্প্রচার করার কথাও এক টুইট বার্তায় জানান স্মিতা।

মানবিক দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কথা তুলে ধরে এএনআইকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদিও বর্তমানে তা বাংলাদেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মায়ানমার সরকার বারবার প্রত্যাবাসনের কথা বললেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।’

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করছি, যে তাদেরও কিছু পদক্ষেপ নেয়া উচিত, যাতে তারা দেশে ফিরে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।’

মায়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার ও নিপীড়নের মুখে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা; যেই সংখ্যা এখন ১১ লাখের বেশি।

তিনি বলেন, ‘মানবিক কারণে আমরা এই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি এবং সব সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি। এমনকি এই কোভিডের সময় আমরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সবাইকে টিকা দিয়েছি। আমাদের পরিবেশ বিপজ্জনক। তার ওপর সেখানে কিছু লোক মাদক পাচার বা নারী পাচার বা অস্ত্র সংঘাতের সঙ্গে জড়িত। তাই যত তাড়াতাড়ি তারা দেশে ফিরতে পারে, তা আমাদের দেশের জন্য এবং মায়ানমারের জন্যও মঙ্গলজনক।’

সাক্ষাৎকারে উঠে আসে ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন ইস্যুও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তিস্তার পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও সেগুলো পারস্পরিকভাবে সমাধান করা সম্ভব।

তিনি বলেন, আমাদের এখানে ভারত থেকে পানি আসে, তাই ভারতের আরও উদারতা দেখাতে হবে। কারণ এতে উভয় দেশই লাভবান হবে। কখনো কখনো পানির অভাবে আমাদের জনগণও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে তিস্তায় পানি না পেয়ে আমরা ফসল রোপণ করতে পারিনি এবং আরও অনেক সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাই আমি মনে করি এর সমাধান হওয়া উচিত।

চুক্তি করে যেভাবে গঙ্গা নদীর পানি ভাগ হচ্ছে ঠিক একইভাবে অন্য নদীগুলোর পানিও বণ্টন হওয়া উচিত বলে জানান শেখ হাসিনা। বলেন, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, তাই এটি সমাধান করা উচিত।

ভারতীয়রা ‘বাংলাদেশে হিন্দু মন্দির ভাঙচুরের ভিডিও দেখেছেন’ এমন একটি প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এ ধরনের বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটে কিন্তু আমরা সঙ্গে সঙ্গে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিই।’

এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভারত আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। আমরা সব সময় মনে রাখি ১৯৭১ সালের যুদ্ধে তাদের অবদানের কথা। এমনকি ১৯৭৫ সালে যখন আমার পরিবারের সব সদস্যকে হারালাম, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (ইন্দিরা গান্ধী) আমাদের ভারতে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্র। আমরা সবসময় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বে গুরুত্বারোপ করি। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, এটা শুধু নেতৃত্ব পর্যায়ের জন্য না, এটা জনগণের জন্য। ভারতের মানুষ, প্রধানমন্ত্রী, নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির প্রতি শুভ কামনার পাশাপাশি আমাদের অগ্রাধিকার থাকবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেয়ার ওপর। এই সফর বেশ গুরুত্বপূর্ণ।’

প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে ভারতের বৈরী সম্পর্ক অনেক দিনের। বাংলাদেশ ভারতকে ‘পরীক্ষিত’ বন্ধু বলে। আবার চীনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীন ভারতের চেয়ে এগিয়ে।

অনেক ভারতীয় মনে করে ভারত বাংলাদেশর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হতে পারত। একটি ছোট দেশ হিসেবে ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখেন, এএনআইয়ের এই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি খুবই পরিষ্কার-সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে এটা বলেছিলেন জাতিসংঘে। আমরা তার সেই মতাদর্শ অনুসরণ করে চলি।

আমি মনে করি, আমাদের উচিত জনগণকে কেন্দ্র করে কাজ করা। কীভাবে তাদের আরও ভালো জীবন দেয়া যায়, কীভাবে তাদের জীবনমান আরও ভালো করা যায়। আমি সব সময়ই বলি, আমাদের একমাত্র শত্রু দরিদ্রতা। কাজেই চলুন একসঙ্গে কাজ করি দরিদ্রতা কমাতে। দক্ষিণ এশিয়া, চীন সব জায়গাতেই জনগণের জন্য একটি উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে আমাদের কাজ করতে হবে, তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হবে।

আমি মনে করি, ভারত ও চীনের মধ্যে যদি কোন সমস্যা থেকেও থাকে, সেখানে আমি নাক গলাতে চাই না। আমি চাই আমার দেশের উন্নয়ন। ভারত আমাদের ঠিক পাশের রাষ্ট্র, সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী। আমাদের মধ্যে খুবই ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের মধ্যে কিছু বিষয়ে সমস্যা রয়েছে এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে আমরা এর মধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি। আপনি জানেন, পানি বণ্টন চুক্তি, সীমান্ত সমস্যা সমাধান হয়েছে। ২ দশক ধরে ভারতে থাকা আমাদের রিফুজিদের আমি ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি এবং পার্বত্য শান্তি চুক্তির সময় তাদের সেটেল করেছি।

আমি মনে করি ছিটমহল বিনিময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। অনেক দেশ এর জন্য যুদ্ধ করে, কিন্তু আমরা তা করিনি। বন্ধুত্বের মাধ্যমে আমরা এই সমস্যার সমাধান করেছি এবং ছিটমহল বিনিময় করেছি। আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই সব সংসদ সদস্যদের এবং ভারত সরকারকে, তারা আইন পাস করায় এই সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি।

অনেকে, বিশেষ করে পাশ্চাত্য দেশ থেকে আমাকে এই প্রশ্ন করেন। ভারত ও চীন উভয় দেশের জন্যই আমার মনে হয়, আমাদের যুদ্ধ করা উচিত না। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কোন সমস্যা থাকলে তা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা উচিত। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন আপনি পাশাপাশি থাকবেন, তখন কিছু সমস্যা আসবেই, থাকবেই। সেগুলো আপনি সমাধান করতেই পারেন। আমাদের কিছু সমস্যা আছে, কিন্তু আমরা আলোচনা চালিয়ে যাব এবং নিজেরা সমাধান করে নিতে পারব।

আমাদের দেশের উন্নয়নের জন্য যারাই অফার করবে, আমাদের জন্য তার মধ্যে যেগুলো সুইটেবল হবে, সেটা আমরা নিব।’