শেষরাতের স্বপ্ন

ইকবাল তাজওলী

ইকবাল করিম সাহেব ঘুম থেকে উঠে সকালের চা-নাস্তা সেরে মিনিট ত্রিশেক হয় তাঁর সখের চেয়ারে ঝিম মেরে বসে আছেন তো ঝিম মেরেই বসে আছেন। সাধারণত স্ত্রীর কাছ থেকে ভাব নেয়ার জন্যে বসে থাকার সাধ জাগলে, অথবা, কোনো কিছু নিয়ে ভাবনা-চিন্তায় থাকলে তিনি তাঁর এই শখের চেয়ারে ঝিম মেরে বসে থাকেন। আজ অবশ্য ভাব নেয়ার জন্যে বসে থাকার সাধ তাঁর জাগেনি। আজ তিনি বেশ চিন্তায় পড়ে এই ঝিম মেরে বসে আছেন।

এত বছর পর জীবনের এই শেষবেলায় পর পর তিনদিন সায়রা হোসেন কেন স্বপ্নে এসে তাঁকে বার বার দেখা দিয়ে যাচ্ছে, বার বার সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে! তাও আবার শেষরাতে! শেষরাতের স্বপ্ন সাধারণত সত্যি হয়ে থাকে। মা ও তাঁর একই কথা বলতেন। বলতেন, ‘শেষরাইতোর স্বপ্ন সাধারণত সত্যি অয়রে।’ যদিও এইসব স্বপ্নে-টপ্নে বিশ্বাস-টিশ্বাস তাঁর কোনোদিনই ছিল না। কিন্তু তারপরও কিছু কিছু স্বপ্ন তাঁর জীবনে হুবহু মিলে গেছে।

যেমন, যেবার তিনি এসএসসি পরীক্ষা দিলেন, সেবার রেজাল্ট বের হওয়ার ঠিক আগের রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তিনি সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে ওপারে ধীরেসুস্থে হেঁটে উঠছেন। সত্যি, তিনি সেবার বেশ ভালোভাবেই এসএসসি উতরে গিয়েছিলেন। এইচএসসিতেও একই ঘটনা ঘটল। তিনি ভালোভাবেই উতরে গেলেন। শুধু অনার্স ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার পর তিনি দেখলেন, তাঁর নৌকো ডুবে গেছে, তিনি একটি গাছের গুঁড়ি ধরে সংগ্রাম করে নদী পার হচ্ছেন। সত্যি তিনি সেই সময়ে কোনো মতে টেনেটুনে মার্জিনাল নম্বর পেয়ে পাস করেছিলেন। আর মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার সময় তো তাঁর পারিবারিক বিপর্যয় ঘটল। তিনি শুধু অ্যাডমিশন নিতে পারলেন, কিন্তু অর্থের অভাবে সুদূর চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তাঁর পক্ষে ক্লাস করা সম্ভব হলো না। আর ক্লাস করবেন কী, অকস্মাৎ ধেয়ে আসা ভয়াবহ সেই দুঃসময়ে দিন দশেক বাদে দু-মুঠো ভাতের সংস্থান কীভাবে হবে, সেই ভাবনায় তাঁর দিনরাত তখন উদ্বেগ নিয়ে কাটত। এরকম সময়ও তাঁর ছিল। তারপর তো একটা ব্যবস্থা হল। বড়ো বোন তাঁর চাকরিতে ঢুকলেন। তিনিও বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন। গেলেন রিঅ্যাডমিশনের জন্যে। কিন্তু রিঅ্যাডমিশনের বিষয়-আশয় বন্ধুরা মানলেন না। একজন তো চেষ্টা-চরিত্র করে ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের স্পেশাল পারমিশন নিয়ে ফাইনাল পরীক্ষার জন্যে ফরম ফিলাপের ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু ফরম ফিলাপ করলেই তো হলো না। বই নেই, নোট নেই, কোনো কিছুই তো নেই! কীভাবে কী করবেন তিনি! বন্ধু মানবেন্দ্র দাস শম্ভু এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘কোনো চিন্তা নাই। আমার নোট নিস। আমি আছি তোর জন্যে।’ তারপর তাঁকে আর রুখে কে? এক পরীক্ষা দিয়ে আরেক পরীক্ষার মধ্যে যে গ্যাপ থাকত, সেই গ্যাপের মধ্যে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিয়ে তিনি শিক্ষা জীবনের ইতি টানলেন। তিনি দেখিয়ে দিলেন একাগ্রতা থাকলে দিন কয়েকের প্রস্তুতি নিয়েও ভালোভাবেই সাকসেস হওয়া যায়।

তারপর তো তিনি তরতর করে এগিয়ে গেলেন। বিসিএস দিয়ে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড অফিসার হিসেবে শিক্ষা ক্যাডারে লেকচারার পদে যোগদান করলেন। এবং যোগদান করেই বছর খানিকের মধ্যে ঘটা করে নিজ প্রেমিকা সায়রা হোসেনকে বিয়ে করে ঘরে তুলে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর গিললেন। আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে। শাখে শাখে পাখি ডাকে। কত শোভা চারিপাশে। সত্যি তাঁর আকাশে, বাতাসে, শাখে শাখে তখন অন্যরকম আনন্দ, অন্যরকম ভাব, অন্যরকম ভালোবাসা ছিল। কিন্তু তাঁর এই অন্যরকম আনন্দ, অন্যরকম ভাব-ভালোবাসা খুব বেশিদিন যে স্থায়ী হলো তা কিন্তু না। প্রথম সন্তান সাজিদ জন্ম নেয়ার ঠিক দুই বছর পূর্তির পরদিন জন্মদিন পালন করার নিমিত্তে ঘরে বাইরে যাওয়া আসার প্রাক্কালে স্ত্রী সায়রা হোসেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে তাঁর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল।

মাসুম সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে ভীষণ দোটানায় পড়ে গেলেন তিনি। কী করবেন তিনি? বিয়ে করবেন? করলে কাকে করবেন? আর না করলে? ঘরসংসার চলবে কীভাবে? মা তো আজ আছেন কাল নেই। তাহলে সন্তানের কী হবে? তাছাড়া নিজেরও তো একটা চাহিদা আছে। শেষমেশ অনেক ভেবেচিন্তে মায়ের আকার-ইঙ্গিতে ভরসা পেয়ে শ্যালিকা মমতাজ হোসেনকে ঘরোয়া আয়োজনে বিয়ে করে তিনি ঘরে তুলে আনলেন।

ভাবনা-চিন্তা অনেকটা তাঁর দূর হয়ে গেল। সংসারে আনন্দও ফিরে এল। এই আনন্দে আনন্দে থাকতে থাকতেই একে একে ঘর আরও আলোকিত করে সাবিহা, সুজাতা আর শাহরুখের জন্ম হলো। এবং শাহরুখের জন্মের পর স্ত্রীর আবারও সন্তান ধারণ করার শখে তিনি স্ত্রীকে না জানিয়ে গোপনে ক্লিনিকে গিয়ে নিজের ভাসেকটমি করিয়ে একদম টেনশনফ্রি হয়ে গেলেন।

তখন তিনি অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর, একসময় অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর তারপর প্রফেসরও হলেন। সময় ও নদীর ¯্রােত যেমন কারো জন্যে অপেক্ষা করে না, তেমনি তাঁর বয়সও তাঁর জন্যে অপেক্ষা করল না; থেমেও থাকল না। একসময়ে সরকারি স্বাভাবিক নিয়ম মেনেই তিনি অবসরে চলে গেলেন।

ততদিনে ছোটোছেলে শাহরুখ ব্যতীত সকল ছেলেমেয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সাজিদ বিয়ে করেছে, সাবিহারও বিয়ে হয়েছে।

কেবল ছোটোমেয়ে সুজাতাই সমস্যা সৃষ্টি করা অব্যাহত রেখেছে। অতি আদরের ছোটো মেয়ে হওয়ায় এই সুজাতাকে নিয়ে তিনি তার কৈশোরকাল থেকে বলা যায় একাই যন্ত্রণা সহ্য করে চলেছেন। আর এই মেয়ের ব্যাপারে স্ত্রী মমতাজ হোসেন তো সবসময় ড্যামকেয়ার ছিলেন এবং আছেনও। প্রায় বলেনও.‘তুমার আদরোর পুরিরে (মেয়েকে) তুমি সামলাও। আমার অতো আদর নাই, হোয়াগও নাই।’ হ্যাঁ, নান্নামুন্না তাঁর এই মেয়েটিকে তিনিই সখ করে স্ত্রীর পরামর্শ উপেক্ষা করে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। মনে করেছিলেন, ছোটোমেয়ে তাঁর যাক না ইংলিশ স্কুলে। পড়–ক না ইংরেজি মাধ্যমে। দেখিনা ইংরেজি মাধ্যমে দিলে কী হয়? তাঁর তো তখন টাকা-পয়সার অভাব ছিল না। অবশ্য মেয়ে তাঁর অমানুষ হয়নি, মানুষই হয়েছে। এলএলবি অনার্স, এলএলএম করে অ্যাডভোকেট হিসেবে বছর দুয়েক জজকোর্টে প্র্যাকটিস করে এখন ঢাকায় অবস্থান করে সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করছে। কিন্তু তাঁদের যে একটা পারিবারিক ভাবমূর্তি, ভদ্র-সজ্জন যে তাঁরা প্রায় সকলেই, সেই ভদ্র-সজ্জন পারিবারিক গুণটি কিন্তু তাঁর ছোটোমেয়ে সুজাতার মধ্যে সেই কৈশোরকাল থেকে বলা যায় অনেকটাই নেই। আর এই কারণে মাঝেমধ্যে তাঁর মনে এই প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে, এমনি এখনও হয়, রুক্ষ-সুক্ষ মেজাজের এই মেয়েটি কি আসলে তাঁর? তবে এটিও ঠিক যে, তাঁর নিজের ছোটো ফুফু ঠিক এই মেজাজেরই মেয়ে মানুষ ছিলেন। এবং কাউকে কোনো তোয়াক্কা না করে সব সামাজিক নিয়ম-কানুন তসনস করে দিয়ে বই পড়–য়া ছোটো ফুফু তাঁর অবিবাহিতা হিসেবেই শেষমেশ মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন।

‘বাবা, বাবা?’

ছোটো মেয়ের ডাকে তাঁর সম্বিত ফিরে এল। তিনি বিস্ময় নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিরে মা, তুই কখন এলি?’

বাড়ির আর সকলের সঙ্গে নিজ মাতৃভাষায় কথা বললেও তাঁর এই ছোটোমেয়ের সঙ্গে তিনি সবসময় মানভাষায় কথা বলে থাকেন। মেয়েও তাঁর জবাব দেয় একই ভাষায়।

‘কেন, কাল রাতেই তো এলাম। একসঙ্গে রাতের খাবারও খেলাম।’

‘এই দেখ মা, ভুলে গেছি।’

‘বাবা, তোমাকে একটা কথা বলব। তুমি তো স্পষ্টবাদী, আমিও স্পষ্টবাদী।’

‘বল।’

‘বাবা, আমি তাপসকে বিয়ে করে ফেলেছি।’

ইকবাল করিম সাহেব মনে মনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। তাঁর বুক থেকে এই মুহূর্তে বিশাল একশো মণ ওজনের একটি পাথর কোনো ধরনের সুবিধা না করতে পেরে চুপচাপ নেমে মনে হয় যেন চিরবিদায় জানাল তাঁকে।

তিনি এই মুহূর্তে তাপস কী করে, কী তার পরিচয়, কোনো কিছুই জিজ্ঞেস করা সমীচীন মনে করলেন না। রুচির দিক থেকে তাঁর মেয়ে কিন্তু তিনি জানেন সবদিক দিয়েই ফার্স্টক্লাস। আর এই ফার্স্টক্লাস রুচির এই মেয়েকে কী করে এই মুহূর্তে ডিটেইলস জিজ্ঞেস করেন তিনি! না, এই মুহূর্তে ডিটেইলস জিজ্ঞেস করার কোনো দরকার নেই।

তিনি কেবল জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর মাকে বলেছিস?’

‘তুমি বলে দিও, বাবা।’

হ্যাঁ, মোটামুটি সবকিছু তাঁর মনে পড়েছে। মাঝেমধ্যে ঢাকা থেকে বাড়িতে এলে মেয়ে তাঁর ব্যারিস্টার তাপসের কথা বলত। ব্যারিস্টার আদনান তাপস। ঢাকায় সেটেল্ড হওয়া চমৎকার, তুখোড় একজন ব্যারিস্টার; বার-অ্যাট-ল।

এবার তিনি তাঁর স্বভাব মতো মুচকি হাসতে লাগলেন। যেন এই মুহূর্তে তিনি পৃথিবীর সেরা সুখি দেশের সেরা সুখি মানুষ! সুখ তাঁর মুখম-ল বেয়ে উথলে উথলে পড়ছে!

মেয়ে এবার তাঁকে প্রশ্ন করল।

‘বাবা, তুমি কি এখন চেয়ারে বসে মায়ের সঙ্গে ভাব নিচ্ছ?’

আনন্দের এই মুহূর্তে কাউকে কি কিছু বলা যায়? তিনি কী বলবেন, আশ্চর্য হয়ে গেলেন। ছেলেমেয়েরা তাহলে তাঁর এই ব্যাপারটি জানে! কিন্তু তিনি তো আজ এই ভাবের মধ্যে নেই।

তিনি ছোটোমেয়েকে সবকিছু শেয়ার করলেন। মেয়ে তাঁর আদ্যোপান্ত শুনে হো হো হেসে উঠল। তিনিও হাসলেন। বাবা-মেয়ের এই হাসি শুনে মমতাজ হোসেনও হেসে হেসে এই হাসিতে যোগ দিলেন। তারপর বললেন, ‘যাও, বালা দেকি কয়েক কেজি মিষ্টি লইয়া আও। মিষ্টিমুখ কর। তাপসোর শ্বশুর অইছো, মিষ্টিমুখ করতায় নানি! তাপস আমারে সালাম জানাইয়া সবকিছু কইছে। ক্ষমাও চাইছে। আগে মিষ্টিমুখ কর, তারপর সবরে জানাও। তারপর প্ল্যান করো কিলা কিতা করতায়।’

আমাদের ইকবাল করিম সাহেব মিষ্টি আনতে বের হয়ে গেলেন।

কিন্তু মিষ্টি নিয়ে তাঁর আর বাড়ি ফেরা হলো না। ফেরার পথে রাস্তা পার হতে গিয়ে একদম বাড়ির দোরগোড়ায় তিনি ট্রাক চাপায় নিহত হলেন। তাঁর হাতে থাকা মিষ্টিগুলো ছিটকে তাঁর বাড়ির গেইট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল।

বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর ২০২২ , ০৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৪

শেষরাতের স্বপ্ন

ইকবাল তাজওলী

image

ইকবাল করিম সাহেব ঘুম থেকে উঠে সকালের চা-নাস্তা সেরে মিনিট ত্রিশেক হয় তাঁর সখের চেয়ারে ঝিম মেরে বসে আছেন তো ঝিম মেরেই বসে আছেন। সাধারণত স্ত্রীর কাছ থেকে ভাব নেয়ার জন্যে বসে থাকার সাধ জাগলে, অথবা, কোনো কিছু নিয়ে ভাবনা-চিন্তায় থাকলে তিনি তাঁর এই শখের চেয়ারে ঝিম মেরে বসে থাকেন। আজ অবশ্য ভাব নেয়ার জন্যে বসে থাকার সাধ তাঁর জাগেনি। আজ তিনি বেশ চিন্তায় পড়ে এই ঝিম মেরে বসে আছেন।

এত বছর পর জীবনের এই শেষবেলায় পর পর তিনদিন সায়রা হোসেন কেন স্বপ্নে এসে তাঁকে বার বার দেখা দিয়ে যাচ্ছে, বার বার সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে! তাও আবার শেষরাতে! শেষরাতের স্বপ্ন সাধারণত সত্যি হয়ে থাকে। মা ও তাঁর একই কথা বলতেন। বলতেন, ‘শেষরাইতোর স্বপ্ন সাধারণত সত্যি অয়রে।’ যদিও এইসব স্বপ্নে-টপ্নে বিশ্বাস-টিশ্বাস তাঁর কোনোদিনই ছিল না। কিন্তু তারপরও কিছু কিছু স্বপ্ন তাঁর জীবনে হুবহু মিলে গেছে।

যেমন, যেবার তিনি এসএসসি পরীক্ষা দিলেন, সেবার রেজাল্ট বের হওয়ার ঠিক আগের রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তিনি সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে ওপারে ধীরেসুস্থে হেঁটে উঠছেন। সত্যি, তিনি সেবার বেশ ভালোভাবেই এসএসসি উতরে গিয়েছিলেন। এইচএসসিতেও একই ঘটনা ঘটল। তিনি ভালোভাবেই উতরে গেলেন। শুধু অনার্স ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার পর তিনি দেখলেন, তাঁর নৌকো ডুবে গেছে, তিনি একটি গাছের গুঁড়ি ধরে সংগ্রাম করে নদী পার হচ্ছেন। সত্যি তিনি সেই সময়ে কোনো মতে টেনেটুনে মার্জিনাল নম্বর পেয়ে পাস করেছিলেন। আর মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার সময় তো তাঁর পারিবারিক বিপর্যয় ঘটল। তিনি শুধু অ্যাডমিশন নিতে পারলেন, কিন্তু অর্থের অভাবে সুদূর চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তাঁর পক্ষে ক্লাস করা সম্ভব হলো না। আর ক্লাস করবেন কী, অকস্মাৎ ধেয়ে আসা ভয়াবহ সেই দুঃসময়ে দিন দশেক বাদে দু-মুঠো ভাতের সংস্থান কীভাবে হবে, সেই ভাবনায় তাঁর দিনরাত তখন উদ্বেগ নিয়ে কাটত। এরকম সময়ও তাঁর ছিল। তারপর তো একটা ব্যবস্থা হল। বড়ো বোন তাঁর চাকরিতে ঢুকলেন। তিনিও বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন। গেলেন রিঅ্যাডমিশনের জন্যে। কিন্তু রিঅ্যাডমিশনের বিষয়-আশয় বন্ধুরা মানলেন না। একজন তো চেষ্টা-চরিত্র করে ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের স্পেশাল পারমিশন নিয়ে ফাইনাল পরীক্ষার জন্যে ফরম ফিলাপের ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু ফরম ফিলাপ করলেই তো হলো না। বই নেই, নোট নেই, কোনো কিছুই তো নেই! কীভাবে কী করবেন তিনি! বন্ধু মানবেন্দ্র দাস শম্ভু এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘কোনো চিন্তা নাই। আমার নোট নিস। আমি আছি তোর জন্যে।’ তারপর তাঁকে আর রুখে কে? এক পরীক্ষা দিয়ে আরেক পরীক্ষার মধ্যে যে গ্যাপ থাকত, সেই গ্যাপের মধ্যে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিয়ে তিনি শিক্ষা জীবনের ইতি টানলেন। তিনি দেখিয়ে দিলেন একাগ্রতা থাকলে দিন কয়েকের প্রস্তুতি নিয়েও ভালোভাবেই সাকসেস হওয়া যায়।

তারপর তো তিনি তরতর করে এগিয়ে গেলেন। বিসিএস দিয়ে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড অফিসার হিসেবে শিক্ষা ক্যাডারে লেকচারার পদে যোগদান করলেন। এবং যোগদান করেই বছর খানিকের মধ্যে ঘটা করে নিজ প্রেমিকা সায়রা হোসেনকে বিয়ে করে ঘরে তুলে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর গিললেন। আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে। শাখে শাখে পাখি ডাকে। কত শোভা চারিপাশে। সত্যি তাঁর আকাশে, বাতাসে, শাখে শাখে তখন অন্যরকম আনন্দ, অন্যরকম ভাব, অন্যরকম ভালোবাসা ছিল। কিন্তু তাঁর এই অন্যরকম আনন্দ, অন্যরকম ভাব-ভালোবাসা খুব বেশিদিন যে স্থায়ী হলো তা কিন্তু না। প্রথম সন্তান সাজিদ জন্ম নেয়ার ঠিক দুই বছর পূর্তির পরদিন জন্মদিন পালন করার নিমিত্তে ঘরে বাইরে যাওয়া আসার প্রাক্কালে স্ত্রী সায়রা হোসেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে তাঁর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল।

মাসুম সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে ভীষণ দোটানায় পড়ে গেলেন তিনি। কী করবেন তিনি? বিয়ে করবেন? করলে কাকে করবেন? আর না করলে? ঘরসংসার চলবে কীভাবে? মা তো আজ আছেন কাল নেই। তাহলে সন্তানের কী হবে? তাছাড়া নিজেরও তো একটা চাহিদা আছে। শেষমেশ অনেক ভেবেচিন্তে মায়ের আকার-ইঙ্গিতে ভরসা পেয়ে শ্যালিকা মমতাজ হোসেনকে ঘরোয়া আয়োজনে বিয়ে করে তিনি ঘরে তুলে আনলেন।

ভাবনা-চিন্তা অনেকটা তাঁর দূর হয়ে গেল। সংসারে আনন্দও ফিরে এল। এই আনন্দে আনন্দে থাকতে থাকতেই একে একে ঘর আরও আলোকিত করে সাবিহা, সুজাতা আর শাহরুখের জন্ম হলো। এবং শাহরুখের জন্মের পর স্ত্রীর আবারও সন্তান ধারণ করার শখে তিনি স্ত্রীকে না জানিয়ে গোপনে ক্লিনিকে গিয়ে নিজের ভাসেকটমি করিয়ে একদম টেনশনফ্রি হয়ে গেলেন।

তখন তিনি অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর, একসময় অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর তারপর প্রফেসরও হলেন। সময় ও নদীর ¯্রােত যেমন কারো জন্যে অপেক্ষা করে না, তেমনি তাঁর বয়সও তাঁর জন্যে অপেক্ষা করল না; থেমেও থাকল না। একসময়ে সরকারি স্বাভাবিক নিয়ম মেনেই তিনি অবসরে চলে গেলেন।

ততদিনে ছোটোছেলে শাহরুখ ব্যতীত সকল ছেলেমেয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সাজিদ বিয়ে করেছে, সাবিহারও বিয়ে হয়েছে।

কেবল ছোটোমেয়ে সুজাতাই সমস্যা সৃষ্টি করা অব্যাহত রেখেছে। অতি আদরের ছোটো মেয়ে হওয়ায় এই সুজাতাকে নিয়ে তিনি তার কৈশোরকাল থেকে বলা যায় একাই যন্ত্রণা সহ্য করে চলেছেন। আর এই মেয়ের ব্যাপারে স্ত্রী মমতাজ হোসেন তো সবসময় ড্যামকেয়ার ছিলেন এবং আছেনও। প্রায় বলেনও.‘তুমার আদরোর পুরিরে (মেয়েকে) তুমি সামলাও। আমার অতো আদর নাই, হোয়াগও নাই।’ হ্যাঁ, নান্নামুন্না তাঁর এই মেয়েটিকে তিনিই সখ করে স্ত্রীর পরামর্শ উপেক্ষা করে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। মনে করেছিলেন, ছোটোমেয়ে তাঁর যাক না ইংলিশ স্কুলে। পড়–ক না ইংরেজি মাধ্যমে। দেখিনা ইংরেজি মাধ্যমে দিলে কী হয়? তাঁর তো তখন টাকা-পয়সার অভাব ছিল না। অবশ্য মেয়ে তাঁর অমানুষ হয়নি, মানুষই হয়েছে। এলএলবি অনার্স, এলএলএম করে অ্যাডভোকেট হিসেবে বছর দুয়েক জজকোর্টে প্র্যাকটিস করে এখন ঢাকায় অবস্থান করে সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করছে। কিন্তু তাঁদের যে একটা পারিবারিক ভাবমূর্তি, ভদ্র-সজ্জন যে তাঁরা প্রায় সকলেই, সেই ভদ্র-সজ্জন পারিবারিক গুণটি কিন্তু তাঁর ছোটোমেয়ে সুজাতার মধ্যে সেই কৈশোরকাল থেকে বলা যায় অনেকটাই নেই। আর এই কারণে মাঝেমধ্যে তাঁর মনে এই প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে, এমনি এখনও হয়, রুক্ষ-সুক্ষ মেজাজের এই মেয়েটি কি আসলে তাঁর? তবে এটিও ঠিক যে, তাঁর নিজের ছোটো ফুফু ঠিক এই মেজাজেরই মেয়ে মানুষ ছিলেন। এবং কাউকে কোনো তোয়াক্কা না করে সব সামাজিক নিয়ম-কানুন তসনস করে দিয়ে বই পড়–য়া ছোটো ফুফু তাঁর অবিবাহিতা হিসেবেই শেষমেশ মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন।

‘বাবা, বাবা?’

ছোটো মেয়ের ডাকে তাঁর সম্বিত ফিরে এল। তিনি বিস্ময় নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিরে মা, তুই কখন এলি?’

বাড়ির আর সকলের সঙ্গে নিজ মাতৃভাষায় কথা বললেও তাঁর এই ছোটোমেয়ের সঙ্গে তিনি সবসময় মানভাষায় কথা বলে থাকেন। মেয়েও তাঁর জবাব দেয় একই ভাষায়।

‘কেন, কাল রাতেই তো এলাম। একসঙ্গে রাতের খাবারও খেলাম।’

‘এই দেখ মা, ভুলে গেছি।’

‘বাবা, তোমাকে একটা কথা বলব। তুমি তো স্পষ্টবাদী, আমিও স্পষ্টবাদী।’

‘বল।’

‘বাবা, আমি তাপসকে বিয়ে করে ফেলেছি।’

ইকবাল করিম সাহেব মনে মনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। তাঁর বুক থেকে এই মুহূর্তে বিশাল একশো মণ ওজনের একটি পাথর কোনো ধরনের সুবিধা না করতে পেরে চুপচাপ নেমে মনে হয় যেন চিরবিদায় জানাল তাঁকে।

তিনি এই মুহূর্তে তাপস কী করে, কী তার পরিচয়, কোনো কিছুই জিজ্ঞেস করা সমীচীন মনে করলেন না। রুচির দিক থেকে তাঁর মেয়ে কিন্তু তিনি জানেন সবদিক দিয়েই ফার্স্টক্লাস। আর এই ফার্স্টক্লাস রুচির এই মেয়েকে কী করে এই মুহূর্তে ডিটেইলস জিজ্ঞেস করেন তিনি! না, এই মুহূর্তে ডিটেইলস জিজ্ঞেস করার কোনো দরকার নেই।

তিনি কেবল জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর মাকে বলেছিস?’

‘তুমি বলে দিও, বাবা।’

হ্যাঁ, মোটামুটি সবকিছু তাঁর মনে পড়েছে। মাঝেমধ্যে ঢাকা থেকে বাড়িতে এলে মেয়ে তাঁর ব্যারিস্টার তাপসের কথা বলত। ব্যারিস্টার আদনান তাপস। ঢাকায় সেটেল্ড হওয়া চমৎকার, তুখোড় একজন ব্যারিস্টার; বার-অ্যাট-ল।

এবার তিনি তাঁর স্বভাব মতো মুচকি হাসতে লাগলেন। যেন এই মুহূর্তে তিনি পৃথিবীর সেরা সুখি দেশের সেরা সুখি মানুষ! সুখ তাঁর মুখম-ল বেয়ে উথলে উথলে পড়ছে!

মেয়ে এবার তাঁকে প্রশ্ন করল।

‘বাবা, তুমি কি এখন চেয়ারে বসে মায়ের সঙ্গে ভাব নিচ্ছ?’

আনন্দের এই মুহূর্তে কাউকে কি কিছু বলা যায়? তিনি কী বলবেন, আশ্চর্য হয়ে গেলেন। ছেলেমেয়েরা তাহলে তাঁর এই ব্যাপারটি জানে! কিন্তু তিনি তো আজ এই ভাবের মধ্যে নেই।

তিনি ছোটোমেয়েকে সবকিছু শেয়ার করলেন। মেয়ে তাঁর আদ্যোপান্ত শুনে হো হো হেসে উঠল। তিনিও হাসলেন। বাবা-মেয়ের এই হাসি শুনে মমতাজ হোসেনও হেসে হেসে এই হাসিতে যোগ দিলেন। তারপর বললেন, ‘যাও, বালা দেকি কয়েক কেজি মিষ্টি লইয়া আও। মিষ্টিমুখ কর। তাপসোর শ্বশুর অইছো, মিষ্টিমুখ করতায় নানি! তাপস আমারে সালাম জানাইয়া সবকিছু কইছে। ক্ষমাও চাইছে। আগে মিষ্টিমুখ কর, তারপর সবরে জানাও। তারপর প্ল্যান করো কিলা কিতা করতায়।’

আমাদের ইকবাল করিম সাহেব মিষ্টি আনতে বের হয়ে গেলেন।

কিন্তু মিষ্টি নিয়ে তাঁর আর বাড়ি ফেরা হলো না। ফেরার পথে রাস্তা পার হতে গিয়ে একদম বাড়ির দোরগোড়ায় তিনি ট্রাক চাপায় নিহত হলেন। তাঁর হাতে থাকা মিষ্টিগুলো ছিটকে তাঁর বাড়ির গেইট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল।