স্মৃতিসমাহার

‘দীপান্বিত গুরুকুল’

এ কে শেরাম

‘দীপান্বিত গুরুকুল’- কবি নিতাই সেনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিন্নমেজাজের বই। পড়তে পড়তেই ভাবতে শুরু করেছি। পড়া শেষ করে বই গুটিয়ে রেখে ভাবনায় বুঁদ হয়ে থেকেছি অনেকক্ষণ।

কিছু কিছু বই থাকে বা রচনা, তা সে কবিতাই হোক, গল্প-প্রবন্ধ বা উপন্যাস হোক, অথবা হোক তা অন্য কোনো আঙ্গিকের, কিন্তু সেটি পড়ার সাথে সাথেই মনে হয়, এ রচনা-তো আমার বা এরকম একটি রচনা আমারও হতে পারতো; লেখকের ভাবনার সাথে, বক্তব্যের সাথে বা বিষয়ের সাথে কেমন একাত্মতার এক বোধ জাগে; মনে হয়, আমার বলার কথাটিই লেখক বলে ফেলেছেন অধিকতর দক্ষতা ও নৈপুণ্যের সাথে। কবি নিতাই সেনের ‘দীপান্বিত গুরুকুল’ সে-রকমই একটি বই। বইটি পড়তে পড়তে ভাবি, নিতাই সেন খুবই সৌভাগ্যবান, তিনি তাঁর শিক্ষাজীবনে আমাদের দেশের সেরা মানুষদের স¯েœহ সান্নিধ্য পেয়েছেন; বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষাগুরু হিসেবে পেয়েছেন আনিসুজ্জামান, মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জাহাঙ্গীর তারেক, মাহমুদ শাহ কোরেশী, হায়াৎ মাহমুদ-এর মতো প্রজ্ঞাবান ও যশস্বী শিক্ষক ও লেখকদের। কবি নিতাই সেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। সময়টা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭। লেখকের ভাষায় সে সময়টা ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্বর্ণযুগ। তাঁর জবানিতে যদি বলি- ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে (চট্টগ্রাম) অনার্সে ভর্তির ক’দিন পরই জাফর স্যার ঢাকায় চলে আসেন। জাফর স্যারের শূন্যস্থান পূর্ণ করলেন আমার স্বপ্নের রাজপুত্র, আধুনিক বাংলা কবিতার সৎ এবং একনিষ্ঠ বিশ্বকর্মা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই কিংবদন্তির নায়ক বলে প্রতিষ্ঠিত আবু হেনা মোস্তফা কামাল। সৈয়দ আলী আহসান স্যার ভিসি হয়ে চলে গেলেন রাজশাহী। ড. আনিসুজ্জামান স্যার বিভাগীয় চেয়ারম্যান। ড. কাইয়ুম, ড. মাহমুদ শাহ কোরেশী, ড. আব্দুল আউয়াল, ড. হায়াৎ মাহমুদ, ড. মনিরুজ্জামান, ড. মঞ্জুর মোর্শেদ প্রমুখ দেশের খ্যাতনামা এবং বরেণ্য সাহিত্যিক তখন বাংলা বিভাগের শিক্ষকতায় নিয়োজিত। সম্ভবত এটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল সময়।’ (পৃ. ২৭)।

নিতাই সেন গভীর শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় এবং অপূর্ব রচনাশৈলীতে তাঁর প্রিয় শিক্ষক আনিসুজ্জামান, মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জাহাঙ্গীর তারেক প্রমুখ প্রজ্ঞাবান মানুষের স¯েœহ সান্নিধ্যের স্মৃতিচারণ করেছেন এই গ্রন্থে। এইসব শিক্ষকেরা নিতাই সেনের কাছে কেবল গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক, প্রেরণাদায়ী মানুষই ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন এক দায়িত্বশীল অভিভাবকও, যাঁরা তাঁর জীবনের নানা ক্রান্তিকালে সহায় হয়েছেন, পাশে দাঁড়িয়েছেন অভিভাবকের অসীম ঔদার্যে। তাই তো নিতাই সেন প্রিয় শিক্ষক আনিসুজ্জামানকে নিয়ে লেখা রচনার শিরোনাম দেন ‘আমার প্রিয় শিক্ষক, দায়িত্বশীল অভিভাবক আনিসুজ্জামান’। আনিসুজ্জামান স্যারকে নিয়ে লেখা রচনার এক পর্যায়ে তিনি লেখেন, বাংলা বিভাগের এক ছাত্র চন্দ্র শেখর পুরোহিত বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথে ট্রেন দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসকরা গ্যাংগ্রিনের ভয়ে বাঁ পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলে ড. আনিসুজ্জামান স্যার ডাক্তারদের এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করান। পরে বোর্ডের সিদ্ধান্তে চন্দ্র শেখরের বাঁ পা’টা রক্ষা পায় এবং তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। নিতাই সেনের নিজের জীবনেও আনিসুজ্জামান স্যার নানা ক্রান্তিকালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যেগুলো পরে সঠিক এবং যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ-কারণেই নিতাই সেন আনিসুজ্জামান স্যার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেন, ‘আমার পিতা আমাকে জন্ম দিয়েছেন মাত্র। আমার বিবেক-বৈরাগ্য, পরিমিতিবোধ, শুভ চিন্তা-চেতনা, অসাম্প্রদায়িক ভাবনা বিনির্মাণে স্যারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।’ (পৃ. ১৫)।

আবু হেনা মোস্তফা কামাল নিতাই সেনের কাছে ‘স্বপ্নের রাজপুত্র, আধুনিক বাংলা কবিতার সৎ এবং একনিষ্ঠ বিশ্বকর্মা, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কিংবদন্তীর নায়ক’। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে এই শিক্ষকের যোগদান তাই নিতাই সেনের কাছে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাই তিনি বলেন, ‘সে সময়টি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যম-িত এবং বর্ণ-বৈচিত্র্যময় অধ্যায়। তা হল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫। এই তিনটি বৎসর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর রেকর্ড স্থাপন করে। ... ছাত্র সংসদ আয়োজিত সকল অনুষ্ঠানমালার মধ্যমণি ছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তাছাড়া সাহিত্য-সংস্কৃতির এবং প্রগতির জোয়ারে আবেগপ্রবণ তরুণ অভিযাত্রী দলেরও ছিলেন তিনি প্রধান কা-ারি।’ (পৃ. ২৭)। একইভাবে গ্রন্থকার তাঁর দুই প্রিয় শিক্ষক মনিরুজ্জামান এবং জাহাঙ্গীর তারেক সম্পর্কেও আবেগতাড়িত অনেক স্মৃতিচারণ করেছেন।

নিতাই সেন স্মৃতিভারাতুর এই গ্রন্থে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয় শিক্ষকবৃন্দ এবং সে-সময়কার আলোকিত সময়ের স্মৃতিচারণই শুধু করেননি তিনি তাঁর কলেজজীবন, স্কুল ও পাঠশালার সময় এবং অন্যান্য অনেক উজ্জ্বল স্মৃতি নিয়েও আন্দোলিত হয়েছেন। নিতাই সেনের শিক্ষা জীবনে অনেক বৈচিত্র্য ছিল। দারিদ্র্যের কশাঘাত আর জীবন-যন্ত্রণা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে। পাঠশালার পাঠ নিয়েছেন ভবানীপুর (সাহেবের হাট) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানকার প্রধান শিক্ষক মান্নান স্যার ছিলেন তখনকার শিশু নিতাই সেনের কাছে এক স্বপ্নপুরুষ। ‘শিশু বয়সের, শিশু কল্পনার সবচেয়ে রঙিন মানুষ মান্নান স্যার। অতি কোমল, ¯স্নিগ্ধ অথচ ব্যক্তিত্বের ওজনে অত্যন্ত ঋদ্ধ, গম্ভীর, কঠিন মানুষ।’ (পৃ. ৫৮)। এর আগে আরও বেশ কটি জায়গায় পড়াশোনা করেছেন তিনি: নারায়ণ বৌদির মাদুর বিছানো পাঠশালা, বাজারে মনীন্দ্র লাল কুণ্ড মহাশয়ের পরিত্যক্ত দোতলা ঘরের স্কুল হয়ে দৌলতখান বাজারের একমাত্র প্রাথমিক স্কুলেও কিছুদিন পড়েছেন। তারপর মৌলভী স্যারের মেয়ের হাত ধরে একদিন হাঁটতে হাঁটতেই পৌঁছে যান ভবানীপুর (সাহেবের হাট) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, সেখানে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। প্রাথমিকের পাঠপর্ব শেষ করে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন দৌলত খান হাই স্কুলে। সেখান থেকে ১৯৬৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে এসএসসি পাস করে বেরিয়ে আসেন। হাই স্কুল জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে আছে ছিদ্দিক মৌলভী স্যারের বেতের লাঠির স্মৃতি। এই পর্বের রচনার নামও দিয়েছেন ‘ছিদ্দিক মৌলভীর বেতের লাঠি’। এক পর্যায়ে তিনি লিখেছেন, ‘দৌলতখাঁন স্কুলে পড়েছেন অথচ ছিদ্দিক মৌলভী স্যারের বেতের লাঠির ঘা খাননি এমন ছাত্র তখন স্কুলে খুঁজে পাওয়া দায় ছিল। ছিদ্দিক স্যারের কন্যা ফাতেমা সিদ্দিকী আমাদের ক্লাসমেট- সে সূত্রে এবং ভালো ছাত্র হিসেবে অবশ্য আমি স্যারের ¯স্নেহধন্য ছিলাম স্কুল ত্যাগের পরও।’ (পৃ. ৫৪)।

‘নিজামপুর কলেজ, আমার শিক্ষক ও সতীর্থরা’ শিরোনামযুক্ত রচনায় নিতাই সেন নিজের ঘনঘন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বদলি এবং অনিশ্চিতের পথে যাত্রাকে তুলনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের যশস্বী অধ্যাপক অ্যামি জেরাল্ডিন (এ.জি) স্টকের জীবনের সাথে। তিনি লিখেছেন- ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কৃতি অধ্যাপক অ্যামি জেরাল্ডিন (এ.জি) স্টকের সাহিত্য ছিল ভালোবাসা, আর স্বপ্ন ছিল শিক্ষাদানের জন্য দূরদেশ যাওয়া। তাই ১৯৪৭ সালের গোড়ার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক পদের বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করেন এবং যথারীতি নির্বাচিত হন। একমাত্র মনের জোর এবং অদম্য সাহসের কারণে তরুণী অধ্যাপক সাতচল্লিশের জুলাইয়ে একাকী লিভারপুল থেকে জাহাজে করে রওয়ানা হলেন দূরযাত্রায়। পোর্ট সৈয়দ, লোহিত সাগর, এডেন বন্দর হয়ে জাহাজ বোম্বে নগরে নোঙর করলো। সেখান থেকে ট্রেনে চেপে কলকাতা। কলকাতা থেকে জলপথে নারায়ণগঞ্জ বন্দরে থামলো স্টিমার। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী ট্রেনে ঢাকা, রিকশায় বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘ যাত্রায় এলোমেলো বিধ্বস্ত স্টকের মাথায় তখন অনেক চিন্তা। কোথায় থাকবেন, কীভাবে মানিয়ে নেবেন এ অচেনা শহর, অজানা এ জনপদ?’ (পৃ. ৩৭)। নিতাই সেনও নারায়ণ বৌদির মাদুর বিছানো পাঠশালা, বাজারে মনীন্দ্র লাল কু-ু মহাশয়ের পরিত্যক্ত দোতলা ঘরের স্কুল হয়ে দৌলতখান বাজারের একমাত্র প্রাথমিক স্কুলেও কিছুদিন পড়েছেন। তারপর ভবানীপুর (সাহেবের হাট) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, এবং সেখান থেকে দৌলত খান হাই স্কুলে। স্কুলের পাঠ শেষ করে অনেক পথ পেরিয়ে যান চাঁদপুরে, চাঁদপুর কলেজে ভর্তির জন্য। কলেজে যাওয়ার প্রথম দিনই তিনি প্রত্যক্ষ করেন ছাত্রলীগ ও এনএসএফ এর ছাত্রদের মধ্যে তুমুল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ; আহত হন সাধারণ ছাত্রসহ ৫/৬ জন। কোনোরকম পালিয়ে ফিরে আসেন বাসায়। কলেজের বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভ্রান্ত হন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশের কলেজ খুঁজতে গিয়ে জানতে পারেন চট্টগ্রামের নিজামপুর কলেজের কথা, যার শিক্ষার পরিবেশ খুব ভালো এবং মেধাবী ছাত্রদের কলেজ কর্তৃপক্ষ বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ সুবিধাসহ বিবিধ শিক্ষা সহায়তা প্রদান করে থাকেন। নিতাই সেন ঐ কলেজের অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ খুরশীদের কাছে একটি চিঠি লিখেন। খুব দ্রুত উত্তর আসে, সেখানে যাওয়ার জন্য পথের দিকনির্দেশনাসহ কলেজ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিবরণও ছিল। কোনো কিছু চিন্তা না করেই চাঁদপুর থেকে নিতাই সেন ছুটে যান নিজামপুর কলেজে এবং সেখানে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৭২ সালে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে আইএসসি পাস করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ১ম বর্ষ অনার্সে ভর্তি হন।

নিতাই সেন মাকে নিয়েও একটি রচনা এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মা আমার প্রথম শিক্ষক’। আসলেই তো তাই। যে কোনো সন্তান জন্মের পর মার কাছ থেকেই জীবনের প্রথম পাঠ নেন। মায়ের দেওয়া এই পাঠই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিতাই সেনের মা সুষমা বালা সেন একজন স্বশিক্ষিতা নারী, যাঁর ¯স্নেহ-মায়া-মমতা তাঁর শৈশব-কৈশোরের স্বপ্নময় সময়কে রঙিন ও প্রাণবন্ত করেছে। নিতাই সেনের চোখে ‘মা দশভুজা দুর্গার মতো, সর্ব্বংসহা ধরিত্রীর মতো ছেলে-পুলে, আত্মীয়স্বজন নিয়ে পুরো সংসার সামলাতেন।’ (পৃ. ৫১)। মাকে নিয়ে আমাদের সকলেরই নানা আবেগ-অনুভূতি যেমন থাকে, তেমনি থাকে একধরনের নস্টালজিয়াও। নিতাই সেনও মাকে নিয়ে এক ধরনের স্মৃতিকাতরতায় আপ্লুত হন, আবেগতাড়িত হন। তিনি লিখেন- ‘আমি মনে করি- মা যে কী, এমন কোনো শব্দ বা তার কোনো ব্যাখ্যা পৃথিবীব্যাপী কোনো সন্তানের জানা নেই। এক অক্ষরের ক্ষুদ্রতম শব্দ, অথচ আবেগ ভালোবাসার তীব্রতায় জীবনের সবচেয়ে মধুর উচ্চারণ ‘মা’। জন্মগ্রহণের পর থেকে প্রতিটি মুহূর্ত, জীবনের প্রতিটি পর্বে পর্বে একজন ব্যক্তির নিঃস্বার্থ পরম আশ্রয় তার মা। সকল প্রতিবন্ধকতার সীমাহীন অনুপ্রেরণা। সকল অপরাধের সামনে প্রশ্নহীন হাসিমাখা প্রশ্রয় মা, বিশ্বের সকল ‘মা’কে আমার বিনম্র প্রণাম।’ (পৃ. ৫৩)।

এই গ্রন্থের শেষ রচনা ‘জোবরা গ্রামের স্মৃতি’। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এক সাধারণ গ্রাম ‘জোবরা’। কিন্তু একজন দারুণ ম্যাজিসিয়ানের অলৌকিক ‘ম্যাজিক স্টিকে’র ছোঁয়ায় সাধারণ এই গ্রাম কীভাবে যে অসাধারণ হয়ে উঠেছে, সে কাহিনি আজ সারা বিশ্বের প্রায় সকলেই জানে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। এ জোবরা গ্রামেই তিনি গোড়াপত্তন করেন গ্রামীণ ব্যাংকের। তারপরের কাহিনি তো ইতিহাস। গ্রামীণ ব্যাংক সারা দেশে ছড়িয়েছে; আর দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষত নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের এ মডেল ছড়িয়েছে সারা বিশ্বে। ড. ইউনূস শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আরও কত কী! কিন্তু নিতাই সেন এই রচনার শেষাংশে প্রশ্ন তুলেছেন- ‘কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যাত্রা শুরু করেছিলেন সে স্বপ্ন আজও কি বাস্তবায়িত হয়েছে? আজ জোবরা গ্রামের গ্রামীণ চেহারার ওপর শহুরে জীবনের প্রলেপ পড়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের অনেক আকাশছোঁয়া দালান হয়েছে, কোটি কোটি টাকা মূলধন হয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার সাথে সম্ভবত সাংস্কৃতিক বিকাশ ও এর মেলবন্ধন যথাযথভাবে হতে পারেনি বলে হয়তো আমাদের চেতনার স্তর আজো মধ্যযুগীয় পর্যায়েই রয়ে গেছে।’ (পৃ. ৬৪)।

সব মিলিয়ে নিতাই সেনের ‘দীপান্বিত গুরুকুল’ এক অভিনব গ্রন্থ, অসাধারণ তার বর্ণনা ও রচনাশৈলী। এই গ্রন্থ আমাকে নতুন ভাবনার মুখোমুখি করে দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, পাঠককুল এই গ্রন্থ পাঠে আনন্দিত হবেন, আলোকিত হবেন।

বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৩ , ০৫ মাঘ ১৪২৯, ২৬ জমাদিউল সানি ১৪৪৪

স্মৃতিসমাহার

‘দীপান্বিত গুরুকুল’

এ কে শেরাম

image

‘দীপান্বিত গুরুকুল’- কবি নিতাই সেনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিন্নমেজাজের বই। পড়তে পড়তেই ভাবতে শুরু করেছি। পড়া শেষ করে বই গুটিয়ে রেখে ভাবনায় বুঁদ হয়ে থেকেছি অনেকক্ষণ।

কিছু কিছু বই থাকে বা রচনা, তা সে কবিতাই হোক, গল্প-প্রবন্ধ বা উপন্যাস হোক, অথবা হোক তা অন্য কোনো আঙ্গিকের, কিন্তু সেটি পড়ার সাথে সাথেই মনে হয়, এ রচনা-তো আমার বা এরকম একটি রচনা আমারও হতে পারতো; লেখকের ভাবনার সাথে, বক্তব্যের সাথে বা বিষয়ের সাথে কেমন একাত্মতার এক বোধ জাগে; মনে হয়, আমার বলার কথাটিই লেখক বলে ফেলেছেন অধিকতর দক্ষতা ও নৈপুণ্যের সাথে। কবি নিতাই সেনের ‘দীপান্বিত গুরুকুল’ সে-রকমই একটি বই। বইটি পড়তে পড়তে ভাবি, নিতাই সেন খুবই সৌভাগ্যবান, তিনি তাঁর শিক্ষাজীবনে আমাদের দেশের সেরা মানুষদের স¯েœহ সান্নিধ্য পেয়েছেন; বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষাগুরু হিসেবে পেয়েছেন আনিসুজ্জামান, মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জাহাঙ্গীর তারেক, মাহমুদ শাহ কোরেশী, হায়াৎ মাহমুদ-এর মতো প্রজ্ঞাবান ও যশস্বী শিক্ষক ও লেখকদের। কবি নিতাই সেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। সময়টা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭। লেখকের ভাষায় সে সময়টা ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্বর্ণযুগ। তাঁর জবানিতে যদি বলি- ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে (চট্টগ্রাম) অনার্সে ভর্তির ক’দিন পরই জাফর স্যার ঢাকায় চলে আসেন। জাফর স্যারের শূন্যস্থান পূর্ণ করলেন আমার স্বপ্নের রাজপুত্র, আধুনিক বাংলা কবিতার সৎ এবং একনিষ্ঠ বিশ্বকর্মা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই কিংবদন্তির নায়ক বলে প্রতিষ্ঠিত আবু হেনা মোস্তফা কামাল। সৈয়দ আলী আহসান স্যার ভিসি হয়ে চলে গেলেন রাজশাহী। ড. আনিসুজ্জামান স্যার বিভাগীয় চেয়ারম্যান। ড. কাইয়ুম, ড. মাহমুদ শাহ কোরেশী, ড. আব্দুল আউয়াল, ড. হায়াৎ মাহমুদ, ড. মনিরুজ্জামান, ড. মঞ্জুর মোর্শেদ প্রমুখ দেশের খ্যাতনামা এবং বরেণ্য সাহিত্যিক তখন বাংলা বিভাগের শিক্ষকতায় নিয়োজিত। সম্ভবত এটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল সময়।’ (পৃ. ২৭)।

নিতাই সেন গভীর শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় এবং অপূর্ব রচনাশৈলীতে তাঁর প্রিয় শিক্ষক আনিসুজ্জামান, মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জাহাঙ্গীর তারেক প্রমুখ প্রজ্ঞাবান মানুষের স¯েœহ সান্নিধ্যের স্মৃতিচারণ করেছেন এই গ্রন্থে। এইসব শিক্ষকেরা নিতাই সেনের কাছে কেবল গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক, প্রেরণাদায়ী মানুষই ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন এক দায়িত্বশীল অভিভাবকও, যাঁরা তাঁর জীবনের নানা ক্রান্তিকালে সহায় হয়েছেন, পাশে দাঁড়িয়েছেন অভিভাবকের অসীম ঔদার্যে। তাই তো নিতাই সেন প্রিয় শিক্ষক আনিসুজ্জামানকে নিয়ে লেখা রচনার শিরোনাম দেন ‘আমার প্রিয় শিক্ষক, দায়িত্বশীল অভিভাবক আনিসুজ্জামান’। আনিসুজ্জামান স্যারকে নিয়ে লেখা রচনার এক পর্যায়ে তিনি লেখেন, বাংলা বিভাগের এক ছাত্র চন্দ্র শেখর পুরোহিত বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথে ট্রেন দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসকরা গ্যাংগ্রিনের ভয়ে বাঁ পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলে ড. আনিসুজ্জামান স্যার ডাক্তারদের এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করান। পরে বোর্ডের সিদ্ধান্তে চন্দ্র শেখরের বাঁ পা’টা রক্ষা পায় এবং তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। নিতাই সেনের নিজের জীবনেও আনিসুজ্জামান স্যার নানা ক্রান্তিকালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যেগুলো পরে সঠিক এবং যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ-কারণেই নিতাই সেন আনিসুজ্জামান স্যার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেন, ‘আমার পিতা আমাকে জন্ম দিয়েছেন মাত্র। আমার বিবেক-বৈরাগ্য, পরিমিতিবোধ, শুভ চিন্তা-চেতনা, অসাম্প্রদায়িক ভাবনা বিনির্মাণে স্যারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।’ (পৃ. ১৫)।

আবু হেনা মোস্তফা কামাল নিতাই সেনের কাছে ‘স্বপ্নের রাজপুত্র, আধুনিক বাংলা কবিতার সৎ এবং একনিষ্ঠ বিশ্বকর্মা, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কিংবদন্তীর নায়ক’। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে এই শিক্ষকের যোগদান তাই নিতাই সেনের কাছে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাই তিনি বলেন, ‘সে সময়টি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যম-িত এবং বর্ণ-বৈচিত্র্যময় অধ্যায়। তা হল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫। এই তিনটি বৎসর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর রেকর্ড স্থাপন করে। ... ছাত্র সংসদ আয়োজিত সকল অনুষ্ঠানমালার মধ্যমণি ছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তাছাড়া সাহিত্য-সংস্কৃতির এবং প্রগতির জোয়ারে আবেগপ্রবণ তরুণ অভিযাত্রী দলেরও ছিলেন তিনি প্রধান কা-ারি।’ (পৃ. ২৭)। একইভাবে গ্রন্থকার তাঁর দুই প্রিয় শিক্ষক মনিরুজ্জামান এবং জাহাঙ্গীর তারেক সম্পর্কেও আবেগতাড়িত অনেক স্মৃতিচারণ করেছেন।

নিতাই সেন স্মৃতিভারাতুর এই গ্রন্থে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয় শিক্ষকবৃন্দ এবং সে-সময়কার আলোকিত সময়ের স্মৃতিচারণই শুধু করেননি তিনি তাঁর কলেজজীবন, স্কুল ও পাঠশালার সময় এবং অন্যান্য অনেক উজ্জ্বল স্মৃতি নিয়েও আন্দোলিত হয়েছেন। নিতাই সেনের শিক্ষা জীবনে অনেক বৈচিত্র্য ছিল। দারিদ্র্যের কশাঘাত আর জীবন-যন্ত্রণা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে। পাঠশালার পাঠ নিয়েছেন ভবানীপুর (সাহেবের হাট) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানকার প্রধান শিক্ষক মান্নান স্যার ছিলেন তখনকার শিশু নিতাই সেনের কাছে এক স্বপ্নপুরুষ। ‘শিশু বয়সের, শিশু কল্পনার সবচেয়ে রঙিন মানুষ মান্নান স্যার। অতি কোমল, ¯স্নিগ্ধ অথচ ব্যক্তিত্বের ওজনে অত্যন্ত ঋদ্ধ, গম্ভীর, কঠিন মানুষ।’ (পৃ. ৫৮)। এর আগে আরও বেশ কটি জায়গায় পড়াশোনা করেছেন তিনি: নারায়ণ বৌদির মাদুর বিছানো পাঠশালা, বাজারে মনীন্দ্র লাল কুণ্ড মহাশয়ের পরিত্যক্ত দোতলা ঘরের স্কুল হয়ে দৌলতখান বাজারের একমাত্র প্রাথমিক স্কুলেও কিছুদিন পড়েছেন। তারপর মৌলভী স্যারের মেয়ের হাত ধরে একদিন হাঁটতে হাঁটতেই পৌঁছে যান ভবানীপুর (সাহেবের হাট) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, সেখানে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। প্রাথমিকের পাঠপর্ব শেষ করে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন দৌলত খান হাই স্কুলে। সেখান থেকে ১৯৬৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে এসএসসি পাস করে বেরিয়ে আসেন। হাই স্কুল জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে আছে ছিদ্দিক মৌলভী স্যারের বেতের লাঠির স্মৃতি। এই পর্বের রচনার নামও দিয়েছেন ‘ছিদ্দিক মৌলভীর বেতের লাঠি’। এক পর্যায়ে তিনি লিখেছেন, ‘দৌলতখাঁন স্কুলে পড়েছেন অথচ ছিদ্দিক মৌলভী স্যারের বেতের লাঠির ঘা খাননি এমন ছাত্র তখন স্কুলে খুঁজে পাওয়া দায় ছিল। ছিদ্দিক স্যারের কন্যা ফাতেমা সিদ্দিকী আমাদের ক্লাসমেট- সে সূত্রে এবং ভালো ছাত্র হিসেবে অবশ্য আমি স্যারের ¯স্নেহধন্য ছিলাম স্কুল ত্যাগের পরও।’ (পৃ. ৫৪)।

‘নিজামপুর কলেজ, আমার শিক্ষক ও সতীর্থরা’ শিরোনামযুক্ত রচনায় নিতাই সেন নিজের ঘনঘন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বদলি এবং অনিশ্চিতের পথে যাত্রাকে তুলনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের যশস্বী অধ্যাপক অ্যামি জেরাল্ডিন (এ.জি) স্টকের জীবনের সাথে। তিনি লিখেছেন- ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কৃতি অধ্যাপক অ্যামি জেরাল্ডিন (এ.জি) স্টকের সাহিত্য ছিল ভালোবাসা, আর স্বপ্ন ছিল শিক্ষাদানের জন্য দূরদেশ যাওয়া। তাই ১৯৪৭ সালের গোড়ার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক পদের বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করেন এবং যথারীতি নির্বাচিত হন। একমাত্র মনের জোর এবং অদম্য সাহসের কারণে তরুণী অধ্যাপক সাতচল্লিশের জুলাইয়ে একাকী লিভারপুল থেকে জাহাজে করে রওয়ানা হলেন দূরযাত্রায়। পোর্ট সৈয়দ, লোহিত সাগর, এডেন বন্দর হয়ে জাহাজ বোম্বে নগরে নোঙর করলো। সেখান থেকে ট্রেনে চেপে কলকাতা। কলকাতা থেকে জলপথে নারায়ণগঞ্জ বন্দরে থামলো স্টিমার। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী ট্রেনে ঢাকা, রিকশায় বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘ যাত্রায় এলোমেলো বিধ্বস্ত স্টকের মাথায় তখন অনেক চিন্তা। কোথায় থাকবেন, কীভাবে মানিয়ে নেবেন এ অচেনা শহর, অজানা এ জনপদ?’ (পৃ. ৩৭)। নিতাই সেনও নারায়ণ বৌদির মাদুর বিছানো পাঠশালা, বাজারে মনীন্দ্র লাল কু-ু মহাশয়ের পরিত্যক্ত দোতলা ঘরের স্কুল হয়ে দৌলতখান বাজারের একমাত্র প্রাথমিক স্কুলেও কিছুদিন পড়েছেন। তারপর ভবানীপুর (সাহেবের হাট) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, এবং সেখান থেকে দৌলত খান হাই স্কুলে। স্কুলের পাঠ শেষ করে অনেক পথ পেরিয়ে যান চাঁদপুরে, চাঁদপুর কলেজে ভর্তির জন্য। কলেজে যাওয়ার প্রথম দিনই তিনি প্রত্যক্ষ করেন ছাত্রলীগ ও এনএসএফ এর ছাত্রদের মধ্যে তুমুল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ; আহত হন সাধারণ ছাত্রসহ ৫/৬ জন। কোনোরকম পালিয়ে ফিরে আসেন বাসায়। কলেজের বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভ্রান্ত হন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশের কলেজ খুঁজতে গিয়ে জানতে পারেন চট্টগ্রামের নিজামপুর কলেজের কথা, যার শিক্ষার পরিবেশ খুব ভালো এবং মেধাবী ছাত্রদের কলেজ কর্তৃপক্ষ বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ সুবিধাসহ বিবিধ শিক্ষা সহায়তা প্রদান করে থাকেন। নিতাই সেন ঐ কলেজের অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ খুরশীদের কাছে একটি চিঠি লিখেন। খুব দ্রুত উত্তর আসে, সেখানে যাওয়ার জন্য পথের দিকনির্দেশনাসহ কলেজ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিবরণও ছিল। কোনো কিছু চিন্তা না করেই চাঁদপুর থেকে নিতাই সেন ছুটে যান নিজামপুর কলেজে এবং সেখানে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৭২ সালে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে আইএসসি পাস করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ১ম বর্ষ অনার্সে ভর্তি হন।

নিতাই সেন মাকে নিয়েও একটি রচনা এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মা আমার প্রথম শিক্ষক’। আসলেই তো তাই। যে কোনো সন্তান জন্মের পর মার কাছ থেকেই জীবনের প্রথম পাঠ নেন। মায়ের দেওয়া এই পাঠই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিতাই সেনের মা সুষমা বালা সেন একজন স্বশিক্ষিতা নারী, যাঁর ¯স্নেহ-মায়া-মমতা তাঁর শৈশব-কৈশোরের স্বপ্নময় সময়কে রঙিন ও প্রাণবন্ত করেছে। নিতাই সেনের চোখে ‘মা দশভুজা দুর্গার মতো, সর্ব্বংসহা ধরিত্রীর মতো ছেলে-পুলে, আত্মীয়স্বজন নিয়ে পুরো সংসার সামলাতেন।’ (পৃ. ৫১)। মাকে নিয়ে আমাদের সকলেরই নানা আবেগ-অনুভূতি যেমন থাকে, তেমনি থাকে একধরনের নস্টালজিয়াও। নিতাই সেনও মাকে নিয়ে এক ধরনের স্মৃতিকাতরতায় আপ্লুত হন, আবেগতাড়িত হন। তিনি লিখেন- ‘আমি মনে করি- মা যে কী, এমন কোনো শব্দ বা তার কোনো ব্যাখ্যা পৃথিবীব্যাপী কোনো সন্তানের জানা নেই। এক অক্ষরের ক্ষুদ্রতম শব্দ, অথচ আবেগ ভালোবাসার তীব্রতায় জীবনের সবচেয়ে মধুর উচ্চারণ ‘মা’। জন্মগ্রহণের পর থেকে প্রতিটি মুহূর্ত, জীবনের প্রতিটি পর্বে পর্বে একজন ব্যক্তির নিঃস্বার্থ পরম আশ্রয় তার মা। সকল প্রতিবন্ধকতার সীমাহীন অনুপ্রেরণা। সকল অপরাধের সামনে প্রশ্নহীন হাসিমাখা প্রশ্রয় মা, বিশ্বের সকল ‘মা’কে আমার বিনম্র প্রণাম।’ (পৃ. ৫৩)।

এই গ্রন্থের শেষ রচনা ‘জোবরা গ্রামের স্মৃতি’। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এক সাধারণ গ্রাম ‘জোবরা’। কিন্তু একজন দারুণ ম্যাজিসিয়ানের অলৌকিক ‘ম্যাজিক স্টিকে’র ছোঁয়ায় সাধারণ এই গ্রাম কীভাবে যে অসাধারণ হয়ে উঠেছে, সে কাহিনি আজ সারা বিশ্বের প্রায় সকলেই জানে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। এ জোবরা গ্রামেই তিনি গোড়াপত্তন করেন গ্রামীণ ব্যাংকের। তারপরের কাহিনি তো ইতিহাস। গ্রামীণ ব্যাংক সারা দেশে ছড়িয়েছে; আর দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষত নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের এ মডেল ছড়িয়েছে সারা বিশ্বে। ড. ইউনূস শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আরও কত কী! কিন্তু নিতাই সেন এই রচনার শেষাংশে প্রশ্ন তুলেছেন- ‘কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যাত্রা শুরু করেছিলেন সে স্বপ্ন আজও কি বাস্তবায়িত হয়েছে? আজ জোবরা গ্রামের গ্রামীণ চেহারার ওপর শহুরে জীবনের প্রলেপ পড়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের অনেক আকাশছোঁয়া দালান হয়েছে, কোটি কোটি টাকা মূলধন হয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার সাথে সম্ভবত সাংস্কৃতিক বিকাশ ও এর মেলবন্ধন যথাযথভাবে হতে পারেনি বলে হয়তো আমাদের চেতনার স্তর আজো মধ্যযুগীয় পর্যায়েই রয়ে গেছে।’ (পৃ. ৬৪)।

সব মিলিয়ে নিতাই সেনের ‘দীপান্বিত গুরুকুল’ এক অভিনব গ্রন্থ, অসাধারণ তার বর্ণনা ও রচনাশৈলী। এই গ্রন্থ আমাকে নতুন ভাবনার মুখোমুখি করে দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, পাঠককুল এই গ্রন্থ পাঠে আনন্দিত হবেন, আলোকিত হবেন।