কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সৌদি-ইরানের চুক্তি চীনের ভূমিকায় কঠিন পরীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র

ইরান এবং সৌদি আরব সাত বছর পর আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি হয়েছে। এর ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দেশের মধ্যে আবার বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাও শুরু হবে। সেই সাথে দুই মাসের মধ্যে দু’দেশ পরস্পরের রাজধানীতে তাদের দূতাবাসও খুলবে।

চীনের মধ্যস্থতায় বেইজিং এ দুই দেশের মধ্যে এক আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতোদিন পরস্পর থেকে দূরে থাকা এই দু’টি দেশই এক্ষেত্রে বেইজিংয়ের ভূমিকার প্রশংসা করেছে।

সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ইরান ও চীন- দুই দেশের সঙ্গেই তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন আছে। আবার ইয়েমেনে যে গৃহযুদ্ধ চলছে, সেখানে ইরান এবং সৌদি আরব দুই পরস্পরবিরোধী পক্ষকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে থাকে।

সম্পর্ক পুনর্স্থাপনে সৌদি আরব ও ইরানের আকস্মিক চুক্তি তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে লাগাম টানার সম্ভাব্য পথ আর ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিতের সুযোগসহ যুক্তরাষ্ট্রকে কৌতূহলী হয়ে ওঠার অনেক উপাদানই দিচ্ছে।

এতে আরও একটি উপাদান আছে, যা ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের ব্যাপক অস্বস্তিতে ফেলেছে। সেটি হল- শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের ভূমিকা, তাও এমন এক অঞ্চলে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রভাবের কথা সুবিদিত।

বেইজিংয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে চারদিনের আলোচনার পর শুক্রবার এ চুক্তির ঘোষণা আসে। চুক্তির আগে ওই আলোচনার খবর প্রকাশ্যে আসেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জন কিরবি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িত না থাকলেও, সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়মিতই মার্কিন কর্মকর্তাদের অবহিত করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্য থেকে শুরু করে গুপ্তচরবৃত্তিসহ নানান ইস্যুতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্রমাগত তিক্ত হয়েছে। দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তি নিজেদের সীমানা থেকে অনেক দূরে প্রভাব বিস্তার নিয়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেতেছে।

কিরবি ঘোষিত চুক্তিতে চীনের ভূমিকাকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে বলেছেন, ইরান ও এর প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হামলার পাল্টায় কার্যকর সৌদি প্রতিরোধসহ ভেতরে-বাইরে নানান চাপই তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বসিয়েছে বলে মনে করে হোয়াইট হাউজ।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেফরি ফেল্টম্যানের মতে, ছয় বছর পর একে অপরের দেশে দূতাবাস খুলতে ইরান-সৌদি আরবের রাজি হওয়ার চেয়েও চীনের ভূমিকাই এই চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক বলে মনে হচ্ছে। “এটি ব্যাখ্যা করা হবে বাইডেন প্রশাসনের গালে চপেটাঘাত ও চীনের উত্থানের প্রমাণ হিসেবে, যা সম্ভবত সঠিকই হবে,” বলেছেন ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফেলো ফেল্টম্যান। এমন এক সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে এই চুক্তি হল, যখন তেহরানের পারমাণবিক বোমা অর্জন আটকাতে ২০১৫ সালে তাদের সঙ্গে হওয়া ছয় বিশ্বশক্তির চুক্তি পুনরুজ্জীবনে যুক্তরাষ্ট্রের দুই বছরের ব্যর্থ চেষ্টার মধ্যে ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির গতি বাড়িয়েছে।

ইরানজুড়ে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে কর্তৃপক্ষের সহিংস দমনপীড়ন ও মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে তেহরানের ওপর কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের এই প্রচেষ্টা খানিকটা ব্যাহত হয়েছে। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ব্রায়ান কাতুলিস বলছেন, সুন্নি ও শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্স্থাপনের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে থমকে থাকা আলোচনা নতুন করে শুরুর ‘সম্ভাব্য একটি পথ করে দিতে পারে’, কেননা এবার তারা রিয়াদকেও সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে ধরতে পারবে।

“সৌদি আরব ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। যদি দুই দেশের মধ্যে নতুন চুক্তিটিকে অর্থবহ ও প্রভাবশালী করতে হয়, তাহলে রিয়াদকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে তার উদ্বেগের বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হবে। নাহলে এই চুক্তি কেবলই নামকাওয়াস্তে থেকে যাবে,” বলেছেন তিনি। এ চুক্তি ইয়েমেনে শান্তি টেকসই করার সম্ভাবনাও বাড়াচ্ছে; ২০১৪ সাল থেকে দেশটিতে চলে আসা সংঘাতকে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে ছায়া যুদ্ধ হিসেবেই দেখা হচ্ছিল।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় গত বছরের এপ্রিলে ইয়েমেনের বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, অক্টোবরে চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হয়। মেয়াদ বাড়াতে পক্ষগুলোর মধ্যে আর কোনো নতুন চুক্তি না হলেও এখন সেখানে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত রয়েছে।

ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত গেরাল্ড ফিয়েরেস্টেইন বলছেন, “কিছু না পেয়ে রিয়াদ এই চুক্তির পথে যেত না, হতে পারে সেটা ইয়েমেনে বা অন্য কোথাও, যা দেখা শক্ত।” চুক্তি স্বাক্ষরে চীনের সংশ্লিষ্টতা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে’ বলে মনে করছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ দূতের দায়িত্ব পালন করা ড্যানিয়েল রাসেল। তিনি বলছেন, বিবাদের পক্ষ না হয়েও এমন একটি কূটনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরে চীনের নিজ থেকে সহায়তার ঘটনা বেশ অস্বাভাবিক।

রবিবার, ১২ মার্চ ২০২৩ , ২৭ ফাল্গুন ১৪২৯, ১৯ শবান ১৪৪৪

কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সৌদি-ইরানের চুক্তি চীনের ভূমিকায় কঠিন পরীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র

image

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের ভূমিকা ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের ব্যাপক অস্বস্তিতে ফেলেছে -বিবিসি

ইরান এবং সৌদি আরব সাত বছর পর আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি হয়েছে। এর ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দেশের মধ্যে আবার বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাও শুরু হবে। সেই সাথে দুই মাসের মধ্যে দু’দেশ পরস্পরের রাজধানীতে তাদের দূতাবাসও খুলবে।

চীনের মধ্যস্থতায় বেইজিং এ দুই দেশের মধ্যে এক আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতোদিন পরস্পর থেকে দূরে থাকা এই দু’টি দেশই এক্ষেত্রে বেইজিংয়ের ভূমিকার প্রশংসা করেছে।

সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ইরান ও চীন- দুই দেশের সঙ্গেই তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন আছে। আবার ইয়েমেনে যে গৃহযুদ্ধ চলছে, সেখানে ইরান এবং সৌদি আরব দুই পরস্পরবিরোধী পক্ষকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে থাকে।

সম্পর্ক পুনর্স্থাপনে সৌদি আরব ও ইরানের আকস্মিক চুক্তি তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে লাগাম টানার সম্ভাব্য পথ আর ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিতের সুযোগসহ যুক্তরাষ্ট্রকে কৌতূহলী হয়ে ওঠার অনেক উপাদানই দিচ্ছে।

এতে আরও একটি উপাদান আছে, যা ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের ব্যাপক অস্বস্তিতে ফেলেছে। সেটি হল- শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের ভূমিকা, তাও এমন এক অঞ্চলে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রভাবের কথা সুবিদিত।

বেইজিংয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে চারদিনের আলোচনার পর শুক্রবার এ চুক্তির ঘোষণা আসে। চুক্তির আগে ওই আলোচনার খবর প্রকাশ্যে আসেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জন কিরবি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িত না থাকলেও, সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়মিতই মার্কিন কর্মকর্তাদের অবহিত করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্য থেকে শুরু করে গুপ্তচরবৃত্তিসহ নানান ইস্যুতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্রমাগত তিক্ত হয়েছে। দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তি নিজেদের সীমানা থেকে অনেক দূরে প্রভাব বিস্তার নিয়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেতেছে।

কিরবি ঘোষিত চুক্তিতে চীনের ভূমিকাকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে বলেছেন, ইরান ও এর প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হামলার পাল্টায় কার্যকর সৌদি প্রতিরোধসহ ভেতরে-বাইরে নানান চাপই তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বসিয়েছে বলে মনে করে হোয়াইট হাউজ।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেফরি ফেল্টম্যানের মতে, ছয় বছর পর একে অপরের দেশে দূতাবাস খুলতে ইরান-সৌদি আরবের রাজি হওয়ার চেয়েও চীনের ভূমিকাই এই চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক বলে মনে হচ্ছে। “এটি ব্যাখ্যা করা হবে বাইডেন প্রশাসনের গালে চপেটাঘাত ও চীনের উত্থানের প্রমাণ হিসেবে, যা সম্ভবত সঠিকই হবে,” বলেছেন ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফেলো ফেল্টম্যান। এমন এক সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে এই চুক্তি হল, যখন তেহরানের পারমাণবিক বোমা অর্জন আটকাতে ২০১৫ সালে তাদের সঙ্গে হওয়া ছয় বিশ্বশক্তির চুক্তি পুনরুজ্জীবনে যুক্তরাষ্ট্রের দুই বছরের ব্যর্থ চেষ্টার মধ্যে ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির গতি বাড়িয়েছে।

ইরানজুড়ে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে কর্তৃপক্ষের সহিংস দমনপীড়ন ও মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে তেহরানের ওপর কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের এই প্রচেষ্টা খানিকটা ব্যাহত হয়েছে। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ব্রায়ান কাতুলিস বলছেন, সুন্নি ও শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্স্থাপনের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে থমকে থাকা আলোচনা নতুন করে শুরুর ‘সম্ভাব্য একটি পথ করে দিতে পারে’, কেননা এবার তারা রিয়াদকেও সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে ধরতে পারবে।

“সৌদি আরব ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। যদি দুই দেশের মধ্যে নতুন চুক্তিটিকে অর্থবহ ও প্রভাবশালী করতে হয়, তাহলে রিয়াদকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে তার উদ্বেগের বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হবে। নাহলে এই চুক্তি কেবলই নামকাওয়াস্তে থেকে যাবে,” বলেছেন তিনি। এ চুক্তি ইয়েমেনে শান্তি টেকসই করার সম্ভাবনাও বাড়াচ্ছে; ২০১৪ সাল থেকে দেশটিতে চলে আসা সংঘাতকে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে ছায়া যুদ্ধ হিসেবেই দেখা হচ্ছিল।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় গত বছরের এপ্রিলে ইয়েমেনের বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, অক্টোবরে চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হয়। মেয়াদ বাড়াতে পক্ষগুলোর মধ্যে আর কোনো নতুন চুক্তি না হলেও এখন সেখানে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত রয়েছে।

ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত গেরাল্ড ফিয়েরেস্টেইন বলছেন, “কিছু না পেয়ে রিয়াদ এই চুক্তির পথে যেত না, হতে পারে সেটা ইয়েমেনে বা অন্য কোথাও, যা দেখা শক্ত।” চুক্তি স্বাক্ষরে চীনের সংশ্লিষ্টতা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে’ বলে মনে করছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ দূতের দায়িত্ব পালন করা ড্যানিয়েল রাসেল। তিনি বলছেন, বিবাদের পক্ষ না হয়েও এমন একটি কূটনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরে চীনের নিজ থেকে সহায়তার ঘটনা বেশ অস্বাভাবিক।