অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান তিনি

সেলিনা হোসেন

আমি যখন কলেজের ছাত্রী তখন এক অদৃশ্য শওকত ওসমান আমার সামনে বিমূর্ত হয়েছিলেন। আমি তাকে দেখিনি, কিন্তু তাকে বুঝতে শুরু করেছিলাম। সে বোঝার শুরু একজন লেখকের রচনা পাঠের মুগ্ধতা থেকে। তখন ১৯৬৪ সাল। রাজশাহী

মহিলা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ি। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাস। দারুণ হইচই। বলা হচ্ছে, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এ এক তীব্র প্রতিবাদ। ঢাকার খবর মফস্বলে পৌঁছতে সময় লাগে না। আমরাও গোগ্রাসে বইটা পড়ে ফেলি। ৬৪ সালে কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে আমাদের শিক্ষকরা ঠিক করেন ‘ক্রীতদাসের হাসি’ মঞ্চস্থ’ করা হবে। তারা আমাকে নায়িকা নির্বাচিত করেন। আমি তো মেহেরজানের ভূমিকা পেয়ে মহাখুশি।

আমার জীবনের প্রথম অভিনয়। অভিনয় করতে পারব কিনা তা না জেনেই খুশি হয়ে গিয়েছিলাম। আমার বিপরীতে তাতারীর ভূমিকায় অভিনয় করে আমার বান্ধবী সুফিয়া। ও বেশ বড়সড়, লম্বা। নায়কের চরিত্রে ভালোই মানায় ওকে। তবে ওর পাশে নিজেকে বেশ ছোট মনে হচ্ছিল। রিহার্সেলের সময় সবাই আমাকে নিয়ে হাসত। সে ছবির দিকে তাকালে সেই সময় এবং শওকত ওসমান আমার সামনে এক হয়ে যায়। একটি সময় এবং একজন লেখক কলেজে পড়া একটি মেয়েকে এভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তখন তো স্বপ্নেও ভাবিনি যে তিনি আমার এত কাছের মানুষ হবেন।

অদৃশ্য শওকত ওসমান দৃশ্যমান হলেন আমার জীবনে। সেটা কখন, কিভাবে তা আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে, পরিচয় হয়েছিল বাংলা একাডেমিতে।

আমি যতই তাকে দেখেছি ততই অনুভব করেছি কত গভীর জীবনবোধ তার। সংস্কারমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে মুক্ত মনের মানুষ। আলোকিত করেন চারপাশের মানুষকে। সাহসী জীবনবোধ তাকে তাড়িত করেছে সারা জীবন। এমন সাহস ছিল বলেই আইয়ুব খানের দোর্দ- সামরিক শাসনের মাঝে লিখলেন তাতারী আর মেহেরজানের গল্প। প্রেমিক তাতারীর প্রাণখোলা হাসি সহ্য করতে পারে না খলিফা হারুনর রশিদ। তিনি তাতারীকে হাসি বন্ধ করার হুকুম দিলেন। তাতারীর সাফ জবাব, মৃত্যুবরণ করতে রাজি আছি, কিন্তু হাসি বন্ধ করতে নয়।

শেষ পর্যন্ত মৃত্যুই বরণ করে তাতারী। এভাবে জীবনের পক্ষের সত্যকে চিনিয়ে দেন শওকত ওসমান। এ চেনায় কোনও ভুল নেই।

এখন আবার শওকত ওসমান আমার জীবন থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কিন্তু তবু তিনি দৃশ্যমান। সাহিত্য এবং সমাজের অজস্র ভাবনার মাঝে তার উজ্জ্বল উপস্থিতি আমাদের জীবনের উজ্জ্বল উদ্ধার। আমি অনবরত তার বলিষ্ঠ, সাহসী উচ্ছারণের

মাঝে নিজের পরিশুদ্ধি চাই। এই দৃশ্যমান মানুষটিই আমার নমস্য।

[লেখক : কথাসাহিত্যিক]

রবিবার, ১৪ মে ২০২৩ , ৩১ বৈশাখ ১৪৩০, ২৩ শাওয়াল ১৪৪৪

স্মরণ

অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান তিনি

সেলিনা হোসেন

আমি যখন কলেজের ছাত্রী তখন এক অদৃশ্য শওকত ওসমান আমার সামনে বিমূর্ত হয়েছিলেন। আমি তাকে দেখিনি, কিন্তু তাকে বুঝতে শুরু করেছিলাম। সে বোঝার শুরু একজন লেখকের রচনা পাঠের মুগ্ধতা থেকে। তখন ১৯৬৪ সাল। রাজশাহী

মহিলা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ি। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাস। দারুণ হইচই। বলা হচ্ছে, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এ এক তীব্র প্রতিবাদ। ঢাকার খবর মফস্বলে পৌঁছতে সময় লাগে না। আমরাও গোগ্রাসে বইটা পড়ে ফেলি। ৬৪ সালে কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে আমাদের শিক্ষকরা ঠিক করেন ‘ক্রীতদাসের হাসি’ মঞ্চস্থ’ করা হবে। তারা আমাকে নায়িকা নির্বাচিত করেন। আমি তো মেহেরজানের ভূমিকা পেয়ে মহাখুশি।

আমার জীবনের প্রথম অভিনয়। অভিনয় করতে পারব কিনা তা না জেনেই খুশি হয়ে গিয়েছিলাম। আমার বিপরীতে তাতারীর ভূমিকায় অভিনয় করে আমার বান্ধবী সুফিয়া। ও বেশ বড়সড়, লম্বা। নায়কের চরিত্রে ভালোই মানায় ওকে। তবে ওর পাশে নিজেকে বেশ ছোট মনে হচ্ছিল। রিহার্সেলের সময় সবাই আমাকে নিয়ে হাসত। সে ছবির দিকে তাকালে সেই সময় এবং শওকত ওসমান আমার সামনে এক হয়ে যায়। একটি সময় এবং একজন লেখক কলেজে পড়া একটি মেয়েকে এভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তখন তো স্বপ্নেও ভাবিনি যে তিনি আমার এত কাছের মানুষ হবেন।

অদৃশ্য শওকত ওসমান দৃশ্যমান হলেন আমার জীবনে। সেটা কখন, কিভাবে তা আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে, পরিচয় হয়েছিল বাংলা একাডেমিতে।

আমি যতই তাকে দেখেছি ততই অনুভব করেছি কত গভীর জীবনবোধ তার। সংস্কারমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে মুক্ত মনের মানুষ। আলোকিত করেন চারপাশের মানুষকে। সাহসী জীবনবোধ তাকে তাড়িত করেছে সারা জীবন। এমন সাহস ছিল বলেই আইয়ুব খানের দোর্দ- সামরিক শাসনের মাঝে লিখলেন তাতারী আর মেহেরজানের গল্প। প্রেমিক তাতারীর প্রাণখোলা হাসি সহ্য করতে পারে না খলিফা হারুনর রশিদ। তিনি তাতারীকে হাসি বন্ধ করার হুকুম দিলেন। তাতারীর সাফ জবাব, মৃত্যুবরণ করতে রাজি আছি, কিন্তু হাসি বন্ধ করতে নয়।

শেষ পর্যন্ত মৃত্যুই বরণ করে তাতারী। এভাবে জীবনের পক্ষের সত্যকে চিনিয়ে দেন শওকত ওসমান। এ চেনায় কোনও ভুল নেই।

এখন আবার শওকত ওসমান আমার জীবন থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কিন্তু তবু তিনি দৃশ্যমান। সাহিত্য এবং সমাজের অজস্র ভাবনার মাঝে তার উজ্জ্বল উপস্থিতি আমাদের জীবনের উজ্জ্বল উদ্ধার। আমি অনবরত তার বলিষ্ঠ, সাহসী উচ্ছারণের

মাঝে নিজের পরিশুদ্ধি চাই। এই দৃশ্যমান মানুষটিই আমার নমস্য।

[লেখক : কথাসাহিত্যিক]