নতুন কারিকুলাম ও ব্রতচারী শিক্ষা

জাকারিয়া স্বাধীন

ব্রত মানে ‘পণ’ বা ‘প্রতিজ্ঞা’। আক্ষরিক অর্থে নিয়ম ও সংযম, আবার তপস্যা অর্থেও ব্রত শব্দ ব্যবহার করা হয়। আলোচ্য ক্ষেত্রে ব্রত হলো স্বদেশের কল্যাণের জন্য প্রতিজ্ঞামূলক জীবনাচরণের চর্চা। আর যিনি এই ব্রত গ্রহণ করবেন তিনিই ব্রতচারী।

জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর ১৮ অধ্যায়ের ‘ঘ’ অংশে ব্রতচারীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে বলা আছে- ‘অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যের বিবেচনায় ব্রতচারী কার্যক্রম অনেকটা স্কাউটিং ও গার্লস গাইডিংয়ের অনুরূপ, তবে এটি এই দেশের সংস্কৃতির ভেতর থেকে উঠে এসেছে। এর মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য-

১. ব্রতচারীর শিক্ষা যোগ্য নাগরিক হওয়া, শ্রমজীবী মানুষকে সম্মান করা, অসাম্প্রদায়িক মননশীল করা, শ্রমজীবী হওয়া, দেশ গড়ার কাজে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালানো এবং মানুষের সেবা করা।

২. এই কার্যক্রমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবান, পরিশ্রমী পরোপকারী সুস্থ মনের মানুষ সৃষ্টিতে সহায়তা করা।

ব্রতচারীর কৌশল সম্পর্কে বলা আছে- ‘নীতিগতভাবে ব্রতচারী কার্যক্রম স্বীকৃতি দেয়া হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এটি চালু করার জন্য উৎসাহ দেয়া হবে।’ যদিও এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র লেখার মধ্যেই রয়ে গেছে ব্রতচারী শিক্ষা।

ব্রতচারী শিক্ষার পুরোধা পুরুষ গুরুসদয় দত্ত। তিনি ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে কুশিয়ারার তীর তৎকালীন শ্রীহট্ট বর্তমান সিলেটের জকিগঞ্জের বীরশ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রখর মেধাবী গুরুসদয় দত্তের শিক্ষা জীবন শুরু হয় বীরশ্রী গ্রামের মাইনর স্কুলে। এরপর শ্রীহট্টের ইংরেজি মাধ্যম স্কুল হয়ে শ্রীহট্টের গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। এফএ পরীক্ষায় প্রথমস্থান অর্জন করে পেয়েছিলেন সিন্ডিয়া স্বর্ণপদক। এরপর প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে পড়াশোনা করেন ক্যামব্রিজের ইমানুয়েল কলেজে। প্রথম ভারতীয় হিসেবে আইসিএস এ প্রথমস্থান অর্জন করেন। ঘোড়া দৌড়ে দারুণ পারদর্শী ছিলেন। বার এসোসিয়েশন পরীক্ষায় প্রথম হয়ে আইনজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ছিলেন বিচার বিভাগে কর্মরত-মহকুমা প্রশাসক, লোক সংস্কৃতির অন্যতম সংগ্রাহক। বাংলার ব্রতচারী সমিতির মুখপত্র ‘ব্রতচারী বার্তা’ পত্রিকা তার অবদান। তিনি জাতীয়তাবাদী নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্বদেশি আন্দোলনে আগ্রহী হয়ে উঠেন।

১৯২৮ সালে বামনগাছীতে রেলওয়ে ওয়ার্কশপের শ্রমিক ও কৃষকদের ওপর ইংরেজ পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায় দুই ব্রিটিশকে শাস্তি প্রদানের ঐতিহাসিক রায় ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল। ব্রিটিশদের নিকট অবিশ্বাস্য ছিল যে একজন বাঙ্গালি ব্রটিশদের শাস্তি দিতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে শাস্তি হিসেবে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় বদলি করা হয়। ১৯৩২ সালে ব্রতচারীকে সমগ্র বাংলায় ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন ‘ব্রতচারী আন্দোলন’। এ সময় ব্রতচারী আন্দোলন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সমগ্র বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি স্কাউটিংয়ের পাশাপাশি ব্রতচারী শিক্ষণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে তিনি কেন্দ্রীয় আইন সভার সদস্য হন।

শেরেবাংলা, শরৎ বসু, সোহরাওয়ার্দী প্রমুখের নিকট বাংলা ভাষা-ভাষী জনগোষ্ঠী নিয়ে স্বাধীন অখণ্ড বাংলার মানচিত্রসহ প্রস্তাব তুলে ধরেন। ১৯৪০ সালের অক্টোবরে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে কলকাতার উপকন্ঠে ‘জোকা’ নামক গ্রামে নিজের ১০১ বিঘা জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্রতচারী গ্রাম’। ১৯৪১ সালের ২৫ জুন গুরুসদয় দত্ত পরলোক গমন করেন। এ কর্মময় মহাপুরুষের জীবনী অধ্যয়ন ও চর্চা হতে পারে পরবর্তী প্রজন্মের পরম পাথেয়। ব্রতচারী কসরত বিশেষ সংগীত ও নৃত্যের সমন্বয়ে হয়ে থাকে। যাতে গভীর দেশপ্রেম প্রকাশ পায়। ‘চলো কোদাল চালাই- ভুলে মানের বালাই’, ‘মোদের বাংলা ভূমির মাটি-সযতনে সবাই মোরা রাখব পরিপাটি’, ‘বাংলার মানুষ আমরা বাংলার সন্তান দল-কর্মে খুঁজি মুক্তি ঐক্যে গড়ি বল’, ‘আমরা বাঙালি সবাই বাংলা মার সন্তান- বাংলা ভূমির জল হাওয়ায় তৈরি মোদের প্রাণ’, ‘ব্রতচারী হয়েই দেখো জীবনে কী মজা ভাই’, প্রার্থনা সংগীত, অতিথিকে স্বাগত জানানো, শিশুতোষ ছড়া-নৃত্য দারুণ মজার ও আকর্ষণীয়। ব্রতচারীর পঞ্চব্রত হচ্ছে-জ্ঞান-শ্রম-সত্য-ঐক্য-আনন্দ। ব্রতচারী প্রতীকের মাধ্যমে যা সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ব্রতচারী আন্দোলনে সদস্যপদ লাভের জন্য প্রথম এই তিনটি উক্তি স্বীকার করতে হয়- ‘আমি বাংলাকে ভালোবাসবো, আমি বাংলার সেবা করব, আমি বাংলার ব্রতচারী হব।’ ব্রতচারী সেøাগান হলো ‘জয় সোনার বাংলা।’

বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীর অষ্টম পৃষ্ঠায় লিখেছেন- ‘খুব ভালো ব্রতচারী করতে পারতাম।’ বঙ্গবন্ধু মাদারীপুর ইসলামিয়া স্কুলে থাকাকালীন ব্রতচারী শিক্ষার সাথে পরিচিত হন। বেরিবেরি রোগ ও চোখের অপারেশনের কারণে শিক্ষায় কয়েক বছরের বিরতি শেষে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর এখানেও পান ব্রতচারী শিক্ষা। এ স্কুলের শিক্ষক গিরিশ বাবু ছিলেন ব্রতচারী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও প্রশিক্ষক। স্কুলে নিয়মিত ব্রতচারী শিক্ষা দেয়া হতো। বঙ্গবন্ধু ব্রতচারী শিক্ষায় এতটাই আকর্ষিত হন যে স্কুলের বাইরেও পাড়ার ছেলেদের নিয়ে একটি ব্রতচারী দল গঠন করে ব্রতচারী শিক্ষা, ভলিবল ও ফুটবল খেলতেন নিয়মিত।

গুরুসদয় দত্তকে গান্ধীজি বলেছিলেন- ‘আমি দুঃখের সাথে স্বীকার করছি আপনার এই আন্দোলনের কথা আমার বহু আগেই জানা উচিৎ ছিল অথচ তা আমি জানতাম না।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার আন্দোলন সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘ব্রতচারী বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক এই কামনা করি।’ বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্কাউট-গার্ল গাইড কার্যক্রম চালু আছে। এসব কার্যক্রমের একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। সম্প্রতি সকল প্রতিষ্ঠানে ও সব শিক্ষার্থীকে স্কাউট শিক্ষা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে; যা খুবই ভালো। তবে যে ব্রতচারী শিক্ষা একান্তই বাংলা ভূমি থেকে উঠে আসা, যা আমাদের আনন্দের মাধ্যমে বাঙালিত্বের শিক্ষা দেয়, ঘটায় আত্মিক বিকাশ, করায় শারীরিক সুস্থতার অনুশীলন, বিশ্ব মানব হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়; সে ব্রতচারী শিক্ষার জন্য আজও ন্যূনতম উদ্যোগ গ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে না উঠা অত্যন্ত দুঃখজনক।

শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনকল্পে চালু হয়েছে নতুন কারিকুলাম; যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য আনন্দের সহিত শিখনে দক্ষতার প্রতিফলন ও যোগ্যতার মূল্যায়ন। আর ব্রতচারী শিক্ষা কার্যক্রম পুরোটাই সক্রিয় অংশগ্রহণে বিপুল আনন্দদায়ক। বলা হয় শিক্ষকতা পেশা নয়, ব্রত। অথচ কোন শিক্ষকেরই নেই ব্রতচারী শিক্ষার সাথে বিন্দুমাত্র পরিচয়।

বাংলার সন্তানদের গড়ার দায়িত্ব যে শিক্ষক সমাজের তাদের জন্য ব্রতচারী শিক্ষার কোন প্রচেষ্টাই নেই! একটু কি আশ্চর্য্য লাগে না? ব্রতচারী শিক্ষা সকল কূপমণ্ডুকতা ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক অনন্য হাতিয়ার। সমাজের সর্বস্তরে রুচির দুর্ভিক্ষ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে মুক্তি দিতে পারে ব্রতচারী শিক্ষা। সম্প্রতি বগুড়ার ঘটনাসহ প্রায়ই শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবক পর্যায় থেকে যে সকল অপ্রীতিকর ঘটনার চিত্র সামনে আসে; ব্রতচারী শিক্ষা থাকলে এমন প্রতিটি পর্যায়ে ইতিবাচক পরিণতি পেত খুব সহজেই।

নিঃসন্দেহে একজন ব্রতচারী প্রশিক্ষিত শিক্ষক অন্য শিক্ষকদের থেকে শতভাগ এগিয়ে থাকেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে । ব্রতচারী শিক্ষার প্রসারে কিছু কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। প্রাথমিক ও হাই স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে (ডিপিএড-বিএড-বিপিএড-এম এড বিষয়ভিত্তিক ও অন্যান্ন) ব্রতচারী কোর্স আবশ্যক করা। শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষণ কোর্সে ব্রতচারী শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।

জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে অন্য ইভেন্টগুলোর সাথে শ্রেষ্ঠ ব্রতচারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে পুরস্কার ও সম্মাননা দেয়া এবং জারিগানের মতো একটি ব্রতচারী দলীয় উপস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করা। জাতীয় দিবস, নববর্ষের আয়োজন, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্রতচারী উপস্থাপনা নিশ্চিত করা। ব্রতচারী আন্দোলনকে পৃষ্ঠপোষকতা ও সামাজিক স্বীকৃতি প্রদান।

যে ব্রতচারী শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনায় জাতীয় শিক্ষা নীতি-২০১০-এ উল্লেখ করা হয়েছে, যে ব্রতচারী শিক্ষা টুঙ্গিপাড়ার খোকাকে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠতে মহিমান্বিত ভূমিকা রাখে, যে ব্রতচারী শিক্ষা বঙ্গবন্ধুর ছেলেবেলায় ব্রিটিশের অধীনে বাংলার প্রতিটি বিদ্যালয়ে চালু হয়, যে ব্রতচারী শিক্ষা আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকট মুছে বিশুদ্ধ বাঙালি পরিচয় তুলে ধরে; সে ব্রতচারী শিক্ষা আজকের বাঙালি সমাজে প্রোথিত করতে না পারা কখনো গৌরবের হতে পারে না।

সময় হয়েছে আত্মোপলব্ধি ও আত্মসমালোচনার। আমরা ছিলাম বাঙালি। আছি বাঙালি হয়ে। নকল ভূষণ আর ধার করা ফ্যাশন রেখে মানুষ হওয়ার যুদ্ধে আমাদের ফিরে যেতে হবে বাঙালিত্বে। বাংলার সন্তানদের মাধ্যমেই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে উদ্ভাসিত হবে বাঙালি পরিচয়। অন্যথায় যতবার মাথা গুজা হবে উটপাখির ন্যয়, ততবার বেজে উঠবে ব্রতচারী বাণী-

মানুষ হ’ মানুষ হ’/ আবার তোরা মানুষ হ’/ অনুকরণ খোলস ভেদী/ কায়মনে বাঙালি হ’/ ... বিশ্ব মানব হবি যদি/ শাশ্বত বাঙালি হ’।

[লেখক : গবেষণা কর্মকর্তা, সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর]

সোমবার, ১৫ মে ২০২৩ , ০১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০, ২৪ শাওয়াল ১৪৪৪

নতুন কারিকুলাম ও ব্রতচারী শিক্ষা

জাকারিয়া স্বাধীন

ব্রত মানে ‘পণ’ বা ‘প্রতিজ্ঞা’। আক্ষরিক অর্থে নিয়ম ও সংযম, আবার তপস্যা অর্থেও ব্রত শব্দ ব্যবহার করা হয়। আলোচ্য ক্ষেত্রে ব্রত হলো স্বদেশের কল্যাণের জন্য প্রতিজ্ঞামূলক জীবনাচরণের চর্চা। আর যিনি এই ব্রত গ্রহণ করবেন তিনিই ব্রতচারী।

জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর ১৮ অধ্যায়ের ‘ঘ’ অংশে ব্রতচারীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে বলা আছে- ‘অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যের বিবেচনায় ব্রতচারী কার্যক্রম অনেকটা স্কাউটিং ও গার্লস গাইডিংয়ের অনুরূপ, তবে এটি এই দেশের সংস্কৃতির ভেতর থেকে উঠে এসেছে। এর মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য-

১. ব্রতচারীর শিক্ষা যোগ্য নাগরিক হওয়া, শ্রমজীবী মানুষকে সম্মান করা, অসাম্প্রদায়িক মননশীল করা, শ্রমজীবী হওয়া, দেশ গড়ার কাজে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালানো এবং মানুষের সেবা করা।

২. এই কার্যক্রমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবান, পরিশ্রমী পরোপকারী সুস্থ মনের মানুষ সৃষ্টিতে সহায়তা করা।

ব্রতচারীর কৌশল সম্পর্কে বলা আছে- ‘নীতিগতভাবে ব্রতচারী কার্যক্রম স্বীকৃতি দেয়া হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এটি চালু করার জন্য উৎসাহ দেয়া হবে।’ যদিও এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র লেখার মধ্যেই রয়ে গেছে ব্রতচারী শিক্ষা।

ব্রতচারী শিক্ষার পুরোধা পুরুষ গুরুসদয় দত্ত। তিনি ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে কুশিয়ারার তীর তৎকালীন শ্রীহট্ট বর্তমান সিলেটের জকিগঞ্জের বীরশ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রখর মেধাবী গুরুসদয় দত্তের শিক্ষা জীবন শুরু হয় বীরশ্রী গ্রামের মাইনর স্কুলে। এরপর শ্রীহট্টের ইংরেজি মাধ্যম স্কুল হয়ে শ্রীহট্টের গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। এফএ পরীক্ষায় প্রথমস্থান অর্জন করে পেয়েছিলেন সিন্ডিয়া স্বর্ণপদক। এরপর প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে পড়াশোনা করেন ক্যামব্রিজের ইমানুয়েল কলেজে। প্রথম ভারতীয় হিসেবে আইসিএস এ প্রথমস্থান অর্জন করেন। ঘোড়া দৌড়ে দারুণ পারদর্শী ছিলেন। বার এসোসিয়েশন পরীক্ষায় প্রথম হয়ে আইনজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ছিলেন বিচার বিভাগে কর্মরত-মহকুমা প্রশাসক, লোক সংস্কৃতির অন্যতম সংগ্রাহক। বাংলার ব্রতচারী সমিতির মুখপত্র ‘ব্রতচারী বার্তা’ পত্রিকা তার অবদান। তিনি জাতীয়তাবাদী নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্বদেশি আন্দোলনে আগ্রহী হয়ে উঠেন।

১৯২৮ সালে বামনগাছীতে রেলওয়ে ওয়ার্কশপের শ্রমিক ও কৃষকদের ওপর ইংরেজ পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায় দুই ব্রিটিশকে শাস্তি প্রদানের ঐতিহাসিক রায় ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল। ব্রিটিশদের নিকট অবিশ্বাস্য ছিল যে একজন বাঙ্গালি ব্রটিশদের শাস্তি দিতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে শাস্তি হিসেবে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় বদলি করা হয়। ১৯৩২ সালে ব্রতচারীকে সমগ্র বাংলায় ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন ‘ব্রতচারী আন্দোলন’। এ সময় ব্রতচারী আন্দোলন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সমগ্র বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি স্কাউটিংয়ের পাশাপাশি ব্রতচারী শিক্ষণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে তিনি কেন্দ্রীয় আইন সভার সদস্য হন।

শেরেবাংলা, শরৎ বসু, সোহরাওয়ার্দী প্রমুখের নিকট বাংলা ভাষা-ভাষী জনগোষ্ঠী নিয়ে স্বাধীন অখণ্ড বাংলার মানচিত্রসহ প্রস্তাব তুলে ধরেন। ১৯৪০ সালের অক্টোবরে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে কলকাতার উপকন্ঠে ‘জোকা’ নামক গ্রামে নিজের ১০১ বিঘা জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্রতচারী গ্রাম’। ১৯৪১ সালের ২৫ জুন গুরুসদয় দত্ত পরলোক গমন করেন। এ কর্মময় মহাপুরুষের জীবনী অধ্যয়ন ও চর্চা হতে পারে পরবর্তী প্রজন্মের পরম পাথেয়। ব্রতচারী কসরত বিশেষ সংগীত ও নৃত্যের সমন্বয়ে হয়ে থাকে। যাতে গভীর দেশপ্রেম প্রকাশ পায়। ‘চলো কোদাল চালাই- ভুলে মানের বালাই’, ‘মোদের বাংলা ভূমির মাটি-সযতনে সবাই মোরা রাখব পরিপাটি’, ‘বাংলার মানুষ আমরা বাংলার সন্তান দল-কর্মে খুঁজি মুক্তি ঐক্যে গড়ি বল’, ‘আমরা বাঙালি সবাই বাংলা মার সন্তান- বাংলা ভূমির জল হাওয়ায় তৈরি মোদের প্রাণ’, ‘ব্রতচারী হয়েই দেখো জীবনে কী মজা ভাই’, প্রার্থনা সংগীত, অতিথিকে স্বাগত জানানো, শিশুতোষ ছড়া-নৃত্য দারুণ মজার ও আকর্ষণীয়। ব্রতচারীর পঞ্চব্রত হচ্ছে-জ্ঞান-শ্রম-সত্য-ঐক্য-আনন্দ। ব্রতচারী প্রতীকের মাধ্যমে যা সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ব্রতচারী আন্দোলনে সদস্যপদ লাভের জন্য প্রথম এই তিনটি উক্তি স্বীকার করতে হয়- ‘আমি বাংলাকে ভালোবাসবো, আমি বাংলার সেবা করব, আমি বাংলার ব্রতচারী হব।’ ব্রতচারী সেøাগান হলো ‘জয় সোনার বাংলা।’

বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীর অষ্টম পৃষ্ঠায় লিখেছেন- ‘খুব ভালো ব্রতচারী করতে পারতাম।’ বঙ্গবন্ধু মাদারীপুর ইসলামিয়া স্কুলে থাকাকালীন ব্রতচারী শিক্ষার সাথে পরিচিত হন। বেরিবেরি রোগ ও চোখের অপারেশনের কারণে শিক্ষায় কয়েক বছরের বিরতি শেষে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর এখানেও পান ব্রতচারী শিক্ষা। এ স্কুলের শিক্ষক গিরিশ বাবু ছিলেন ব্রতচারী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও প্রশিক্ষক। স্কুলে নিয়মিত ব্রতচারী শিক্ষা দেয়া হতো। বঙ্গবন্ধু ব্রতচারী শিক্ষায় এতটাই আকর্ষিত হন যে স্কুলের বাইরেও পাড়ার ছেলেদের নিয়ে একটি ব্রতচারী দল গঠন করে ব্রতচারী শিক্ষা, ভলিবল ও ফুটবল খেলতেন নিয়মিত।

গুরুসদয় দত্তকে গান্ধীজি বলেছিলেন- ‘আমি দুঃখের সাথে স্বীকার করছি আপনার এই আন্দোলনের কথা আমার বহু আগেই জানা উচিৎ ছিল অথচ তা আমি জানতাম না।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার আন্দোলন সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘ব্রতচারী বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক এই কামনা করি।’ বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্কাউট-গার্ল গাইড কার্যক্রম চালু আছে। এসব কার্যক্রমের একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। সম্প্রতি সকল প্রতিষ্ঠানে ও সব শিক্ষার্থীকে স্কাউট শিক্ষা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে; যা খুবই ভালো। তবে যে ব্রতচারী শিক্ষা একান্তই বাংলা ভূমি থেকে উঠে আসা, যা আমাদের আনন্দের মাধ্যমে বাঙালিত্বের শিক্ষা দেয়, ঘটায় আত্মিক বিকাশ, করায় শারীরিক সুস্থতার অনুশীলন, বিশ্ব মানব হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়; সে ব্রতচারী শিক্ষার জন্য আজও ন্যূনতম উদ্যোগ গ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে না উঠা অত্যন্ত দুঃখজনক।

শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনকল্পে চালু হয়েছে নতুন কারিকুলাম; যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য আনন্দের সহিত শিখনে দক্ষতার প্রতিফলন ও যোগ্যতার মূল্যায়ন। আর ব্রতচারী শিক্ষা কার্যক্রম পুরোটাই সক্রিয় অংশগ্রহণে বিপুল আনন্দদায়ক। বলা হয় শিক্ষকতা পেশা নয়, ব্রত। অথচ কোন শিক্ষকেরই নেই ব্রতচারী শিক্ষার সাথে বিন্দুমাত্র পরিচয়।

বাংলার সন্তানদের গড়ার দায়িত্ব যে শিক্ষক সমাজের তাদের জন্য ব্রতচারী শিক্ষার কোন প্রচেষ্টাই নেই! একটু কি আশ্চর্য্য লাগে না? ব্রতচারী শিক্ষা সকল কূপমণ্ডুকতা ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক অনন্য হাতিয়ার। সমাজের সর্বস্তরে রুচির দুর্ভিক্ষ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে মুক্তি দিতে পারে ব্রতচারী শিক্ষা। সম্প্রতি বগুড়ার ঘটনাসহ প্রায়ই শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবক পর্যায় থেকে যে সকল অপ্রীতিকর ঘটনার চিত্র সামনে আসে; ব্রতচারী শিক্ষা থাকলে এমন প্রতিটি পর্যায়ে ইতিবাচক পরিণতি পেত খুব সহজেই।

নিঃসন্দেহে একজন ব্রতচারী প্রশিক্ষিত শিক্ষক অন্য শিক্ষকদের থেকে শতভাগ এগিয়ে থাকেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে । ব্রতচারী শিক্ষার প্রসারে কিছু কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। প্রাথমিক ও হাই স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে (ডিপিএড-বিএড-বিপিএড-এম এড বিষয়ভিত্তিক ও অন্যান্ন) ব্রতচারী কোর্স আবশ্যক করা। শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষণ কোর্সে ব্রতচারী শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।

জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে অন্য ইভেন্টগুলোর সাথে শ্রেষ্ঠ ব্রতচারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে পুরস্কার ও সম্মাননা দেয়া এবং জারিগানের মতো একটি ব্রতচারী দলীয় উপস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করা। জাতীয় দিবস, নববর্ষের আয়োজন, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্রতচারী উপস্থাপনা নিশ্চিত করা। ব্রতচারী আন্দোলনকে পৃষ্ঠপোষকতা ও সামাজিক স্বীকৃতি প্রদান।

যে ব্রতচারী শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনায় জাতীয় শিক্ষা নীতি-২০১০-এ উল্লেখ করা হয়েছে, যে ব্রতচারী শিক্ষা টুঙ্গিপাড়ার খোকাকে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠতে মহিমান্বিত ভূমিকা রাখে, যে ব্রতচারী শিক্ষা বঙ্গবন্ধুর ছেলেবেলায় ব্রিটিশের অধীনে বাংলার প্রতিটি বিদ্যালয়ে চালু হয়, যে ব্রতচারী শিক্ষা আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকট মুছে বিশুদ্ধ বাঙালি পরিচয় তুলে ধরে; সে ব্রতচারী শিক্ষা আজকের বাঙালি সমাজে প্রোথিত করতে না পারা কখনো গৌরবের হতে পারে না।

সময় হয়েছে আত্মোপলব্ধি ও আত্মসমালোচনার। আমরা ছিলাম বাঙালি। আছি বাঙালি হয়ে। নকল ভূষণ আর ধার করা ফ্যাশন রেখে মানুষ হওয়ার যুদ্ধে আমাদের ফিরে যেতে হবে বাঙালিত্বে। বাংলার সন্তানদের মাধ্যমেই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে উদ্ভাসিত হবে বাঙালি পরিচয়। অন্যথায় যতবার মাথা গুজা হবে উটপাখির ন্যয়, ততবার বেজে উঠবে ব্রতচারী বাণী-

মানুষ হ’ মানুষ হ’/ আবার তোরা মানুষ হ’/ অনুকরণ খোলস ভেদী/ কায়মনে বাঙালি হ’/ ... বিশ্ব মানব হবি যদি/ শাশ্বত বাঙালি হ’।

[লেখক : গবেষণা কর্মকর্তা, সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর]